Sufi Faruq (সুফি ফারুক)

অপপ্রচারের জবাব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

পাকিস্তানের জাগ্রত জনগণের মনে আজ আর কোন সন্দেহ থাকার অবকাশ নাই যে, ষড়যন্ত্রকারী কায়েমী স্বার্থবাদী আর তাদের ফর্মাবরদাররা আজ জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা শাসনতন্ত্র প্রণয়ন ও জনগণের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তরের কার্যক্রম বানচাল করিবার জন্য শেষবারের মতো উম্মত্ত প্রয়াসে মাতিয়াছে।

বার কোটি মানুষের ভাগ্য এতই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার যে, ইহা লইয়া ছিনিমিনি খেলার অবকাশ নাই। গত এক সপ্তাহ ধরিয়া জাতিকে যে সন্যাসরোগীসুলভ ও রাজনৈতিক খ্যাপামি দেখিতে হইতেছে উহার অবসানে সময় আসিয়াছে। জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা একটি শাসনতন্ত্র রচনা ও তাহাদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর বানচালের জন্য সুপরিকল্পিতভাবে একটি কৃত্তিম সংকট সৃষ্টি করা হইতেছে।
জনগণের প্রতি স্বীয় দায়িত্ব সস্পর্কে সচেতন মেজরিটি পার্টি আওয়ামী লীগ তীক্ত বিতর্কের দ্বারা পরিবেশ বিষাক্ত করিতে আগ্রহী না হওয়ার দরুণ এতদিন ইচ্ছাকৃতভাবেই নিরব থাকিয়াছি। গণতান্ত্রিক রীতিনীতিতে সুদৃঢ়ভাবে বিশ্বাসী বলিয়াই আওয়ামী লীগ মনে করে যে একমাত্র জাতীয় পরিষদে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ শাসনতান্ত্রিক প্রশ্নের সুরাহা হইতে পারে এবং হওয়া উচিৎ। এই লক্ষ্য সামনে রাখিয়াই আওয়ামী লীগ অবিলম্বে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহবানের দাবী জানাইয়া আসিতেছিল। এই দল বরাবরই প্রতিটি রাজনৈতিক দল ও নেতার সঙ্গে আলোচনায় সম্মত থাকিয়াছে।

দলীয় নেতৃবৃন্দকে লইয়া আমি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎকারে মিলিত হই এবং দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের নির্বাচনী রায়প্রাপ্ত ছয় দফা শাসনতান্ত্রিক ফর্মূলার প্রতিপাদ্য ব্যাখ্যা করি। ইহার পর পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জেড এ ভুট্টোর সঙ্গে আমার স্বাক্ষাৎ হয়। আমার সহকর্মীরা তাহার সহকর্মীদের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠকে মিলিত হন। আমরা তাদের বুঝাইতে চাহিয়াছি যে, ছয় দফা ভিত্তিক ফেডারেল ইস্কিমের স্বপক্ষে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনতার ঐতিহাসিক রায় ঘোষিত হওয়ার পর ইহা এখন জনগণের সম্পদ। জনগণ আওয়ামী লীগকে ছয় দফার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র রচনার জন্য ম্যান্ডেট দিয়াছে এবং আওয়ামী লীগ এই ম্যান্ডেটটি বাস্তবায়নের অবিচল প্রতিজ্ঞায় আবদ্ধ। তবে ছয় দফা বাস্তবায়িত হইলে পাঞ্জাব, সিন্ধু সীমান্ত বা বেলুচিস্তানের ন্যায্য স্বার্থ বা ফেডারেল সরকারের কার্যকারিতা ক্ষুন্ন হইবে বলিয়া কাহারো মনে ভ্রান্ত ধারণা থাকিলে তা নিরসনের জন্য আমরা ছয় দফার প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ দিতে রাজী আছি।

আগে পশ্চিশ পাকিস্তানে দলীয় সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করিয়া পরে ঢাকা আসিয়া আবার আলোচনা শুরু করিবেন এই অজুহাত তুলিয়া পিপলস পার্টিই ঢাকায় গুরুত্ত্বপূর্ণ ও বিস্তারিত আলোচনা মুলতবি রাখিয়া যায়। এদিকে আওয়ামী লীগ ৬ দফার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র রচনা ওয়াদার পুনরাবৃত্তির পাশাপাশি দেশকে একটি স্থায়ী শাসনতন্ত্র প্রদানের জন্য সকল মহলের ওলেমায়ে ইসলামের মৌলানা নুরানী, নওয়াব আকবার খান ভক্তি, মওলানা গোলাম গাউস সহ জারতি ও মৌলানা মুফতি মাহমুদ (জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম) ও অন্যান্য পশ্চিমাঞ্চলীয় নেতার সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হই। একই সঙ্গে আমরা অবিলম্বে জাতীয় পরিষদের বৈঠক ডাকার জন্য চাপ দিতে থাকি। পরিষদের অধিবেশন ডাকিতে বিলম্ব হইয়াছে এবং শেষ পর্যন্ত উহা ডাকার আগেই দুইটি মাস অতিক্রান্ত হইয়া গিয়াছে। শেষ পর্যন্ত যখন তেশরা মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহুত হইয়াছে তখন মুহুর্তের জন্য হইলেও মনে হইয়াছে, যে কুচক্রি শক্তি প্রতিবার গণতান্ত্রিক পন্থায় জনগণের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় সক্রিয় হইয়া উঠিত তাহাদের উপর যুক্তিবাদী শক্তির বিজয় সুচিত হইয়াছে। এই গণবিরোধী শক্তি ১৯৫৪ সালে পূর্ব বাংলায় একটি নির্বাচিত সরকারকে বাতিল করিয়াছে, ১৯৫৮ সালে সামরিক আইন জারি করিয়াছে এবং তারপর প্রতিটি গণ-আন্দোলন বানচালের অশুভ প্রচেষ্টায় লিপ্ত হইয়াছে।
জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহুত হইবার পরবর্তী ঘটনা প্রবাহই স্বাক্ষ্য দেয় যে, এই ষড়যন্ত্রকারী শক্তি আর একবার ছোবল হানার প্রস্তুতি নিতেছে। জনাব ভুট্টো এবং পি-পি-পি আকস্মিকভাবে এমন সব ভাবভঙ্গি ও কথাবার্তা চালাইতেছেন যাহার উদ্দেশ্য মনে হয় জাতীয় পরিষদের স্বাভাবিক কর্মধারা বিঘ্নিত করিয়া শাসনতান্ত্রিক ধারাকে বানচাল করা। আর এইভাবেই তারা জনগণের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর প্রতিহত করিতে চান।

পিপলস পার্টিও সেক্রেটারি জেনারেল জনাব জে,এ, রহিম এক বিবৃতিতে বলেয়াছিলেন, ‘আমরা দেখিয়াছি পূর্ব পাকিস্তানযে আসলেই একটি কলোনি ইহা অতৃপ্ত মানসিকতার কথা নয়-কঠিন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তব।’ কিন্ত তা স্বত্বেও ৬ দফার বিরুদ্ধে উত্থাপিত কতিপয় মৌলিক আপত্তি সানধানতার সঙ্গে বিশ্লেষণ করিলেই দেখা যাইবে যে, ইহা বাংলাদেশকে কলোনি হিসাবেই বজায় রাখার সুপরিকল্পিত কার্যক্রম ছাড়া আর কিছুই নয়।

প্রধানত: কেন্দ্র কর্তৃক বৈদেশিক বাণিজ্য, বৈদেশিক সাহায্য ও বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেই দেশের অপরাংশের কায়েমী স্বার্থবাদীদের তরক্কির জন্য বাংলাদেশের সাত কোটি মানুষের উপর ঔপনিবেশিক শোষণ চলিয়াছে, বাংলার সম্পদ পাচার করিয়াছে। এইভাবেই প্রাপ্ত বৈদেশিক সাহায্যের শতকরা আশি ভাগেরও বেশী পশ্চিম পাকিস্তানের কায়েমী স্বার্থবাদীদের কল্যাণে ব্যায়িত হইয়াছে। গত ২৩ বছরের মোট আমদানীর দুই-তৃতীয়াংশ আসিয়াছে পশ্চিম পাকিস্তানে। বাংলাদেশের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার ৫ শত কোটি টাকা পশ্চিম পাকিস্তানে খরচ করা হইয়াছে। পশ্চিম পাকিস্তানের মুষ্টিমেয় মুনাফা শিকারী শিল্পপতির স্বার্থে বাংলাদেশকে সাতকোটি লোকের ‘সংরক্ষিত বাজার’ হিসাবে ব্যবহার করা হইয়াছে। আর এই নির্মম শোষণের ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতি অনিবার্য বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে। দিকে দিকে দূর্ভিক্ষের করাল ছায়া-অর্থ নাই, সংগতি নাই। বাংলাদেশের মানুষ আজ ভয়াবহ আকালের আবর্তে নিক্ষিপ্ত হইয়াছে। যা কিছুই ঘঁটুক না কেন, আমরা আর এই অবস্থা চলিতে দিতে পারি না।
বৈদেশিক বাণিজ্য ও সাহায্য কেন্দ্রের হাতে না থাকিলে এ হেন নির্মম শোষণ চলিতে পারিল না। এই পটভূমিতে কেন্দ্রের হাতে বৈদেশিক বাণিজ্য ও সাহায্য বহাল রাখার জন্য জেদ নগ্নভাবে এই সত্যই প্রকট করিয়া তোলে যে, ইহার উদ্দেশ্য জাতীয় সংহতি অর্জন নয়। বরং বাংলাদেশের উপর ঔপনিবেশিক শোষণ অব্যাহত রাখার জন্য প্রধান হাতিয়ার গুলো কেন্দ্রের হাতে রাখা।

পিপলস পার্টির অন্য একটি উক্তিতে এই সত্যের যথাথতা প্রমানিত হয়। দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট পরিষদ গঠনের দাবী সমর্থনে খাঁটি ফেডারেশনের (উহার অর্থ যাহাই হউক না কেন, কারণ কোন দুইটি ফেডারেশনই যখন একে অন্যের সহিত সাদৃশ্যপুণ্য নহে) নীতি গ্রহণের প্রস্তাব করা হইয়াছে। যাহার দ্বিতীয় কক্ষে সকল ইউনিটের সমান প্রতিনিধিত্ব থাকিতে হইবে বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। অপর কথায়, ধরুণ, দ্বিতীয় কক্ষের সদস্য সংখ্যা একশত হইলে উহাতে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হইবেন মাত্র বিশজন। এইভাবে বহত্তর জনসংখ্যা অধ্যুষিত বাংলাদেশকে একটি গুরুত্ত্বহীন সংখ্যালঘু ইউনিটে পরিণত করার প্রস্তাব দেয়া হইয়াছে। প্রকৃতপক্ষে পাকিস্তানের দক্ষিণপন্থি প্রতিক্রিয়াশীল চক্র ইতিপূর্বে কখনো বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব শতকরা বিশ ভাগে হ্রাস করার প্রস্তাব উত্থাপন করিতে সাহস পায় নাই। কিন্তু সংখ্যা সাম্যের ভিত্তিতে প্রতিনিধিত্বের বর্তমান প্রস্তাব গৃহীত হইলে বাংলাদেশ অন্য পরিষদে জনসংখ্যার ভিত্তিতে প্রতিনিধিত্ব থাকা সত্বেও অসহায় সংখ্যালঘু ইউনিটে পরিণত হইবে। এই পদ্ধতিতে অপর অঞ্চলের সংখ্যালঘুরা কেন্দ্রের উপর নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত রাখিবে। এভাবে কেন্দ্রীয় সরকার গঠিত হইলে যে সরকার বৈদেশিক সাহায্য ও বাণিজ্যের ক্ষমতাবলে ঔপনিবেশিক শোষণের পুরাতন পদ্ধতি স্বাচ্ছন্দে চিরস্থায়ীভাবে কায়েম করিবে। এইসব প্রস্তাব কেন্দ্রীয় আমলাদের সঙ্কীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি কায়েম করিবে। এইসব প্রস্তাব কেন্দ্রীয় আমলাদের সঙ্কীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির প্রকৃষ্ট প্রমান বহণ করিতেছে। তাহারা এভাবে তাহাদের প্রভু পশ্চিম পাকিস্তানী কায়েমী স্বার্থবাদীদের মনোরঞ্জন অব্যাহত রাখিতে পারিবে। -গত ২৩ বৎছর যাবৎই তাহারা বিশ্বস্ততার সহিত তাহাদের ঐসব প্রভুর সেবা করিয়া আসিতেছে।

সেইজন্য সমান প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে একটি কার্যকরি দ্বিতীয় কক্ষ গঠনের প্রস্তাব অন্তত পাকিস্তানের আদর্শে খাঁটি ফেডারেশনের জন্য মোটেই কার্যকরি নমুনা নহে, বরং উহা বাংলাদেশে ঔপনিবেশিক শোষণ চিরস্থায়ী করার অশুভ পায়তারা মাত্র।
৬ দফা কর্মসূচির বিরুদ্ধে উত্থাপিত অন্যান্য আপত্তি চিরাচরিতভাবে বিকৃত তথ্য পরিবেশনেরই সামিল এবং বাংলাদেশের মানুষ এবং পশ্চিম পাকিস্তানের নির্যাতিত জনগণের মধ্যে ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি করাই ইহার মুল উদ্দেশ্য। ৬ দফা কর্মসূচীতে ফেডারেশন সরকারকে ফেডারেশনের অঙ্গরাজ্যগুলির কৃপার উপর নির্ভরশীল হইতে হইবে বলিয়া যে পরোক্ষ ইঙ্গিত করা হইয়াছে আসলে তাহা নহে। বরং উহাতে ফেডারেল সরকার কর্তৃক সাক্ষাৎ শাসনতান্ত্রিক বিধান মতে পর্যাপ্তভাবে রাজত্ব ও বৈদেশিক মুদ্রা বিলি-বন্টনের স্পষ্ট বিধান রহিয়াছে; যাহার ফলে ফেডারেল আইন পরিষদ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের উপর ফেডারেল কর আরোপের ক্ষমতা লাভ করিবে।

ফেডারেশনের বিভিন্ন ইউনিটের সম্পদ হইতে প্রথম ব্যয় বরাদ্দ বাবদ উক্ত কর আদায় করা যাইবে।

অনুরূপভাবে বৈদেশিক বাণিজ্য ও সাহায্য বিভিন্ন অঙ্গ রাজ্যের উপর ছাড়িয়া দিলে ফেডারেল সরকারের পক্ষে বৈদেশিক নীতি পরিচালনার ক্ষেত্রে অলঙ্ঘনীয় অসুবিধা দেখা দিবে বলিয়া যে আপত্তি তোলা হইয়াছে, তাহাও ঠিক নহে। কারণ, যুগে যুগে এ কথা পুনরনুমোদিত হইয়াছে যে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য বৈদেশিক বাণিজ্য ও সাহয্যের ক্ষেত্রে যে ক্ষমতার অধিকারী হইবে তা দেশের বৈদেশিক নীতির কাঠামোর মধ্যে ব্যবহার করা হইবে।

বাংলাদেশের লোক ও পশ্চিমাঞ্চলের নির্যাতিত জনগণের মধ্যে তিক্ততার সৃষ্টির জন্য যে প্রচেষ্টা চালানো হইতেছে তাহা চরম অসহণীয় অবস্থায় পৌঁছিয়াছে। দুর্ভাগ্যের বিষয় বাঙ্গালীদের প্রকৃত ‘শত্রু’ বলিয়া চিত্রায়িত করা হইয়াছে, যাহাদের নিকট গেলে পশ্চিম পাকিস্তানী প্রতিনিধিরা নাকি ‘হোস্টেজ’ হিসেবে আটকা পরিয়া যাইবে। জাতীয় পরিষদকে কসাইখানা আখ্যা দিয়া পরিষদের বাঙ্গালী সদস্যদের প্রতি অযাচিত মন্তব্য করা হইয়াছে।

এইসব বাজে অভিযোগ উত্থাপনের একমাত্র কারণ এই যে, জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ঢাকায় আহ্বান করা হইয়াছে। দেশের সকল প্রধান প্রধান কেন্দ্রীয় সংস্থা পশ্চিম পাকিস্তানে অবস্থিত বলিয়া বাঙ্গালীরা যখন বিগত তেইশ বৎসরে সকল সময়ই তথায় যাতায়াত করিতেছে, বিশেষত: সেক্ষেত্রে অনুরূপ প্রতিক্রিয়া শুধু অশোভনই নয়, বরং অযৌক্তিকও। এভাবে আবহাওয়া বিষাক্ত করিয়া তুলিলে বাঙ্গালীরা কি ন্যায় সঙ্গত ভাবে প্রশ্ন করিতে পারে না যে, তাহাদিগকে পশ্চিম পাকিস্তানে গমণের জন্য আহ্বান জানানো হইবে কি না? আরো কতিপয় উক্তি এই ব্যাপারে আলোকপাত করিয়াছে যাহার মধ্য হইতে উপরোক্ত উক্তি মনোভাব টের পাওয়া যায়।

পিপলস পার্টির জনৈক সদস্য গত ২০ শে ফেব্রুয়ারী ‘পাকিস্তানটাইমস’ পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে দাবী করিয়াছে যে, ‘জনগণ অবশ্যই দেশের অখন্ডতার প্রশ্নে তাহাদের সঠিক মনোভাব ব্যক্ত করিবে এবং মৌলিক ব্যাপারে যে কোন প্রকারের আপোষ মীমাংসা প্রত্যাখান করিবে; আসন্ন মারাত্বক বিপর্যয়ের হাত থেকে সমগ্র দেশকে রক্ষা করার কোন ক্ষমতা যখন তাহাদের থাকিবে না, তখন অন্তত যেটুকু পারা যায়, দেশের সে অংশটুকু রক্ষার জন্যও চেষ্টা করিবে। সঠিক রাজনৈতিক পন্থা হইতেই যেটুকু পারা যায় সেটুকু রক্ষা করা এবং দেশের অখন্ডতা ভঙ্গের প্রচেষ্টা বা প্রস্তাব না করা। আমরা অবশ্যই আওয়ামী লীগকে তাহার ৬ দফা হইতে সরিয়া দাড়াইতে বলিব এবং তাহা উহা না করিলে আমরা অবশ্যই যে কোন মূল্যে পশ্চিম পাকিস্তানে ৬ দফা প্রবর্তনের প্রচেষ্টাকে ঠেকাইব’।

এখানে দুইটি তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়ের উল্লেখ করা হইয়াছে। উহার একটি হইতেছে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ মিথ্যা অভিযোগ। উহাতে অভিযোগ করা হইয়াছে যে, আওয়ামী লীগ পশ্চিম পাকিস্তানের উপর ছয় দফা চাপাইয়া দেওয়ার চেষ্টা করিতেছে। ছয় দফা কর্মসূচি আসলে ফেডারেশনভুক্ত ইউনিটগুলির স্বায়ত্বশাসনের নিরাপত্তা বিধানেরই কর্মসূচি। যদি পশ্চিম পাকিস্তানের ফেডারেশনভূক্ত ইউনিটগুলি একেবারে একই হারে বাংলাদেশের মতো স্বায়ত্ব শাসন না চায় অথবা যদি তাহারা কেন্দ্রের হাতে কিছু অতিরিক্ত ক্ষমতা ছাড়িয়া দিতে চায় কিংবা কতিপয় আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠানে আগ্রহী হয় তবে ছয় দফা ফর্মূলা তাহাদের পক্ষে অন্তরায় হইবে না। প্রকৃতপক্ষে আওয়ামী লীগও কোন সময়েই এমন কোন ভূমিকা গ্রহণ করে নাই যে, ছয় দফা ফেডারেশনভূক্ত পশ্চিম পাকিস্তানী ইউনিটগুলির উপর চাপাইয়া দেওয়া হইবে। অপর যে বিষয়টি লক্ষণীয় ভাবে উত্থাপন করা হইয়াছে তাহা হইতেছে এই যে, যদি বাংলাদেশকে অতীতের শর্তের মধ্যে আবদ্ধ না রাখা যায়, অর্থাৎ যদি উহাকে কলোনি হিসেবে বজায় না রাখা যায় এবং তাহার পরিবর্তে যদি বাংলাদেশ সংখ্যাগরিষ্টদের প্রদেশ হিসেবে উহার ন্যায় সঙ্গত ভূমিকা পালন করে, তবে পশ্চিম পাকিস্তানকে বাঁচাইতে হইবে।

কিন্তু প্রশ্ন হইতেছে ‘কাহার নিকট হইতে’ এবং ‘কাহার জন্য’ বাঁচাইতে হইবে? স্পষ্টত নিবন্ধকার ইহাই দেখাইতে চান যে পশ্চিম পাকিস্তানকে সেই বাঙ্গালীদেরই হাত হইতে বাঁচানো হইয়াছে যাহারা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ওয়াদা পালনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ এবং তিনি ইহাতে পশ্চিম পাকিস্তানের সেই স্বার্থান্বেষী মহলের জন্যই বাঁচাইতে চাহেন যাহারা এইরূপ গণতান্ত্রিক পরিবেশে টিকিয়া থাকিবেন না এবং যাহাদের পশ্চিম পাকিস্তানের নিপীড়িত অবহেলিত জনগণকে শোষণের অধিকার নিশ্চিত হইবে। এমনকি নিবন্ধকার বাংলাদেশের ব্যাপারে উক্ত স্বার্থান্বেষী মহলের ‘স্বাধিকার হারাইতে হইলেও পশ্চিম পাকিস্তানে তাহাদের এই শোষণের অধিকারকে নিশ্চিত করিতে চান বলিয়া মনে হয়। পাকিস্তানের জাগ্রত জনগণের মনে এই ব্যাপারে কোন সন্দেহ থাকা উচিৎ নয় যে, ষড়যন্ত্রকারী এবং স্বার্থান্বেষী মহল ও তাদের তোষামদকারীরা নির্বাচিত সদস্যদের দ্বারা প্রণীত একটি শাসনতন্ত্র গ্রহণ ও তাদের হস্তেই ক্ষমতা হস্তান্তরকে বানচাল করার শেষ বেপরোয়া অপচেষ্টায় মাতিয়া উঠিয়াছে। তাহাদের এরূপ বেপরোয়া মনোভাব এতই চরম আকার ধারণ করিয়াছে যে তাহারা জাতীয় অখন্ডতার ব্যাপারে উদ্বিগ্ন হওয়ার ভাব করিয়া পাকিস্তানের অস্তিত্ব লইয়াও জুয়া খেলিতে ইচ্ছুক। তাহারাই পাকিস্তানের জনগণের গণতান্ত্রিক ও শাসনতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যে একত্রে বাস করার ভিত্তি তৈরির শেষ সুযোগ বানচাল করিয়া পাকিস্তানের অখন্ডতার উপর একটি চরম আঘাত হানিতে উদ্যত হইয়াছে।

পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে যে শাসনতন্ত্র গৃহীত হইবে-তাহার লক্ষ্যই হইবে উক্ত মিলনের ভিত্তি রচনা করা। আমরা এখনো এই ফোরামে স্বার্থক প্রচেষ্টা চালাইতে প্রস্তুত রহিয়াছি এবং ইহাই আমাদের এই দেশকে একটি স্থায়ী শাসনতন্ত্র প্রদানে ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনের জন্য একমাত্র উপযুক্ত ফোরাম। এই দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে আমরা পাকিস্তানের প্রত্যেক অংশের জাতীয় পরিষদ সদস্যকে সহযোগিতা করিতে আহ্বান জানাই।

পাকিস্তানের নির্যাতিত জনগণ ও বাংলাদেশের জাগ্রত জনতা, কৃষক, শ্রমিক ও ছাত্র জনগণের বিজয় বানচালের ষড়যন্ত্র প্রতিহত করার জন্য প্রস্তুত হইতে হইবে। যাহারা ‘অনভিপ্রেত সংখ্যাগরিষ্ঠের একনায়ত্ব’ ও ‘নির্বাচিতের সেচ্ছাচার’ সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তাহাদের প্রতি আমাদের জবাব হইতেছে, পাকিস্তানের জনগণ সংখ্যালঘু একনায়কত্ব সহ্য করিবে না। এমনকি ক্ষমতার দ্বারা সমর্থনপুষ্ট হইলেও কোন স্বৈরাচারই তাদের ভীত করিতে পারিবে না।

আমরা যে ক্ষমতাকে স্বীকার করি তাহা হইতেছে জনগণের ক্ষমতা। জনগণ সকল স্বৈরাচারীকেই নতি স্বীকার বাধ্য করিয়াছে। কারণ, স্বৈরাচারী ক্ষমতার দন্ড জাগ্রত জনগণের সংকল্পের আঘাতের কাছে টিকিয়া থাকিতে পারে না।

যে কোন ভবিষৎ স্বৈরাচারির ইতিহাস হইতে শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত। আমরা ষড়যন্ত্রের অশুভ শক্তির প্রতি কোন প্রকার বিবেক বর্জিত পায়তারা না করার অথবা বারো কোটি মানুষের ভাগ্য লইয়া খেলা না করার জন্য সর্তকবাণী উচ্চারণ করিতেছি। যদি কেহ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে বাঁধা প্রদানের বা বানচাল করার চেষ্টা করে তবে বাংলাদেশ, পাঞ্জাব, সিন্ধু, উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ এবং বেলুচিস্তানে জাগ্রত জনগণের পবিত্র দায়িত্ব হইবে তাহা প্রতিরোধ করা। আমি বাংলাদেশের জাগ্রত জনগণকে আমাদের মাটি হইতে গণবিরোধী শক্তিকে যে কোন উপায়ে নির্মূল করার জন্য প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানাইব।

আমরা আজ প্রয়োজন হইলে জীবন বিসর্জন দিব-যাহাতে আমাদের ভবিষৎ বংশধরদের একটি কলোনিতে বাস করিতে না হয়; যাহাতে তাহারা একটি স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হিসাবে সম্মানের সহিত মুক্ত জীবন যাপন করিতে পারে, সেই প্রচেষ্টাই আমরা চালাইব।

পাকিস্তানের অস্তিত্ব বিপন্ন…ইত্যাদি কথা শুনিতে শুনিতে আমরা ক্লান্ত হইয়া পড়িয়াছি। যখনই বাংলার মানুষ তাহাদের ন্যায্য দাবী-দাওয়া উত্থাপন করিয়াছে, তখনই শোষকগণ ইসলাম ও সংহতি বিপন্নের কথা তুলিয়াছে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের নির্বাচনী বিজয় বানচাল এবং ১৯৫৮ সালে সাধারণ নির্বাচন ঠেকাইয়া সামরিক আইন জারী-বিভিন্ন সময়, বারবার এইসব বাজে ধূয়া তোলা হইয়াছে। আমরা এইসব ভূয়া সংহতিবাজদের চাইতে অনেক বেশি খাঁটি পাকিস্তানী। এইসব নুইসেন্স আমরা আর সহ্য করিতে রাজী নই।

বাংলার উপকুলে মহাপ্রলয়ে যখন ১০ লক্ষ লোক প্রাণ হারাইয়াছে, লক্ষ লক্ষ লোক অন্তহীন দুর্দশার মধ্যে তখন এইসব সংহতিবাজের অনেকেই বাংলায় আসিয়া তাহাদের দেখিতে পারেন নাই।

অনেকেই জানিতে চান, আমি পশ্চিম পাকিস্তানসফর করিতেছি না কেন? নির্বাচনের আগে আমি পশ্চিম পাকিস্তানের সফরে গিয়াছি, আমার দল বিভিন্ন প্রদেশে প্রতিদ্বন্ধিতা করিয়াছে। অর্থাৎ যারা আজ সংহতির ডঙ্কা বাজাইতেছেন, তাদের অনেকেই বাংলাদেশে কোন পার্টি অফিস নাই-দুর্দিনে তাঁহারা এখানে আসেন না। জাতীয় সংহতি এখনো বিপন্ন হয় নাই। তবে কেউ যদি তেমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করে তার জন্য আমাদের কোন দায়-দায়িত্ব নাই।
সংগ্রহ-মুজিবুরের রচনা সংগ্রহ পৃষ্ঠা ১৪৭



আপনার মন্তব্য দিন