Sufi Faruq (সুফি ফারুক)

উদ্যোক্তার তেমন কোন বিনিয়োগের প্রয়োজন নেই উদ্যোক্তা উন্নয়ন, নোট

উদ্যোক্তার তেমন কোন বিনিয়োগের প্রয়োজন নেই | Capital Investment

নতুন উদ্যোক্তাদের সাথে কথা বলতে গেলে প্রথমেই তাদের চিন্তিত দেখি – ব্যবসা শুরুর বিনিয়োগ নিয়ে।

এই বিনিয়োগের পরিমাণটা কত হবে? কি ভাবে এই অর্থসংস্থান হবে? রিটার্ন ঠিক মত হবে তো?

এই বিনিয়োগ সংক্রান্ত দুঃচিন্তায় হারিয়ে যায় সৃজনশীল হাজার হাজার সম্ভাবনাময় উদ্যোগ। আমাদের সাধারণ ধারণা হল, ব্যবসা শুরু করতে অনেক টাকা লাগে। এটা কিছু ক্ষেত্রে ঠিক, তবে সব ক্ষেত্রে ঠিক ধারনা না। উদ্যোক্তা হিসেবে পথ চলা শুরু করতে তেমন কোন বিনিয়োগের প্রয়োজন নেই।
আমার এই কথা কিছুটা বিশ্বাস করতে সবার কষ্ট হয়। এজন্যই সাক্ষী ডেকে আনি ‘মার্কেটিং গুরু’ অধ্যাপক ফিলিপ কটলারকে।
শুরুর বিনিয়োগ নিয়ে ‘মার্কেটিং গুরু’র দারুণ একটা বক্তৃতা পড়েছিলাম বছর ১০-১৫ আগে। ক্যামব্রিজ মার্কেটিং কলেজের মার্কেটিং-বিষয়ক এক বিতর্ক প্রতিযোগিতার সমাপনি অনুষ্ঠানে ‘দি ফিউচার অফ মার্কেটিং’ শিরোনামে তিনি বক্তৃতাটি দিয়ে ছিলেন। তাঁর সেই বক্তৃতার কয়েকটি অংশের অনুবাদ তুলে দিলাম:

নিজের মধ্যে মার্কেটিংয়ের কিছু বিশেষ গুণাবলি থাকলে একেবারে শূন্য থেকে শুরু করা যায়। ব্যবসা শুরু করার জন্য প্রচুর বিনিয়োগের দরকার হয় না। আমি এখন নিউইয়র্কের একজন ভদ্রলোকের কথা জানি তিনি একদিন নিউইয়র্কের এক বড় ফ্যাশন হাউসে একটা সুন্দর সোয়েটার নিয়ে গেলেন। ওখানে গিয়ে কর্তৃপক্ষকে জানালেন, তিনি এ রকম ভালো মানের আরও অনেক সোয়েটার তাদের দিতে পারবেন মাত্র ১০ মার্কিন ডলারে। যেগুলো তার ২৫- ৩০ মার্কিন ডলারে বিক্রি করতে পারবে। ফ্যাশন হাউসটি সোয়েটার কিনতে রাজি হয়ে গেল ভদ্রলোকটি হংকংয়ের একটি গার্মেন্টস থেকে মাত্র ৭ মার্কিন ডলারে সেই সোয়েটার বানিয়ে একটি জাহাজ কোম্পানিকে অর্ডার দিল নিউইয়র্কে সেই ফ্যাশন হাউসে সরাসরি চালান পৌঁছে দেওয়ার। এভাবেই সেসব মালামাল পৌঁছে গেল জায়গামতো। মাঝখান থেকে ভদ্রলোক কিছু অর্থ উপার্জন করলেন। এমনকি ওই সব মালামাল রাখতে কোনো গুদাম ভাড়া করার খরচও দরকার হলো না। এতে তেমন কিছু বিনিয়োগ না করেও সে ভালো পরিমাণ অর্থ উপার্জন করলো। এবার কোম্পানির পর্যায়ের কথা বলি। ‘নাইকি’ বিশ্বমানের উন্নত জুতা তৈরির জন্য বিখ্যাত হলেও তারা কিন্তু নিজে কোনো জুতা তৈরি করে না। তাদের জুতা তৈরির কোনো কারখানাই নেই। তারা শুধু উন্নত মানের জুতার নকশা বানায় তাদের ল্যাবে। এরপর সেগুলো সঠিকভাবে মার্কেটিং করে বিশ্বব্যাপী। তোমার উৎপাদন খরচ আরেকটি কোম্পানির চেয়ে বেশি হলে কেন তুমি বেশি খরচ করে সেই জিনিসটা বানাবে? তুমি তো তাদের কাছ থেকে সেই জিনিসটা কিনে নিয়ে মার্কেটিং করলেই পারো। এতে তোমার বড় কারখানা লাগবে না, অনেক বেশি বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে না। শুধু সুন্দর সময়োপযোগী মার্কেটিং ম্যানেজমেন্ট জানলেই চলবে।

বিদ্যমানে মার্কেটে সুবিধা না করতে পারলে তৈরি করতে হবে নতুন মার্কেট, মার্কেটিঙয়ে আনতে হবে নতুনত্ব। এমটাই করতে পারলে নিয়ন্ত্রণ নেয়া যাবে বাজারে। সিএনএন যেমন তৈরি করেছে নতুন মার্কেটিং যাকে বলা হচ্ছে ‘রিয়েলটাইম ২৪ ঘণ্টা বিশ্ব সংবাদ’। ফেডেক্স উন্নয়ন করেছে নতুন মার্কেটের যার নাম দিয়েছে ‘রাতারাতি ডেলিভারি’।

অনেক সময় নতুন কিছু মার্কেট তৈরি করা যা না। তখন নতুন করে চিন্তা ভাবনা করে বাড়াতে হবে বা কমাতে হবে পণ্য বা সেবার বিভাগ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাইয়ের দোকান বার্নস এন্ড নোবল বইয়ের দোকানে এনেছিল নতুনত্ব। তারা বাইয়ের দোকানকে বানিয়ে ফলেছে কমিউনিটি সেন্টার। সপ্তাহের প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে রাত ১১ অবধি আপনি সেখানে বাই ছাড়াও রয়েছে কফি খাওয়ার ব্যবস্থা, বই সম্পর্কে লেখকের অডিও মূল্যয়, গান শোনার ব্যবস্থা, চাইলে সেখানে রাখা বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে পারফর্ম করার সুযোগ। এ ছাড়া নির্মল আড্ডার পরিবেশ তো তাই। তাই সেখানে বই-প্রেমী না হলেও ছুটে যায় সবাই।

তবে মনে রেখো, মার্কেটিং মানে শুধু ব্যবসা করে মুনাফা অর্জন নয়, ক্রেতারা কি চায়, কীভাবে চায়, কেন চায়, ক্রেতারা তাদের পয়সা ঠিকভাবে উসুল করতে পারছে কি না, তা নিশ্চিত করাও তোমাদের দায়িত্ব। গ্রাহককে কোনো কিছু যেকোনোভাবে গছিয়ে দেওয়াটা মার্কেটিংয়ের উদ্দেশ্য নয়। নৈতিকতা বজায় রেখে সুষ্ঠু মার্কেটিং করে অর্জিত সাফল্যই প্রকৃত সাফল্য।

ওস্তাদ কটলারের সাথে গলা মিলিয়ে আমি চুনোপুঁটি সুফি ফারুক আর একটা কথা বলতে চাই – পৃথিবীর সব মানুষের সবগুলো সমস্যাই হচ্ছে ব্যবসার সম্ভাবনা। এর মধ্যে কিছু মানুষের যেকোনো সমস্যার সমাধান করার কাজকে একটা বৈধ কমার্শিয়াল শেপ দেয়াটাই ব্যবসা। সেখানে জন্য পুঁজির চেয়ে বেশি দরকার ইউনিক দৃষ্টিভঙ্গি।



আপনার মন্তব্য দিন