Sufi Faruq (সুফি ফারুক)

তুমি আর ভবিষ্যৎ যাচ্ছ হাত ধরে পরস্পর… আর্টিকেল/ওপিনিয়ন সংগ্রহ

লাইসেন্সবিহীন অবৈধ যানবাহনের চাবি

প্রিয় তারুণ্য,
তোমরা চোখে হাত দিয়ে দেখিয়ে দিলে – আজ আইন মান্যকারী জনতা, সমাজের নীতি-নৈতিকতার আয়না গণমাধ্যম, মাঠে আইন প্রয়োগকারী আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, কাগজে আইন প্রয়োগকারী আমলা, আইন প্রণয়নকারী রাজনীতিবিদ, আইনের রক্ষক বিচারপতি, সবাই প্রতিনিয়ত আইন ভাঙ্গছে। কেউই আজ সত্য, ন্যায়, নিষ্ঠার পরাকাষ্ট নয়। সবারই ত্রুটিপূর্ণ কাগজের কারণে ধরা পড়া, অসংখ্য গাড়ির বিশাল চাবির গোছা দেখিয়ে, তারই নগ্ন প্রমাণ দিয়ে দিলে।

এর মাধ্যমে তোমরা প্রমাণ করলে- দেশ নামের এই আসনটির প্রতিটি পায়া আজ নড়বড়ে। কার আগে কে ভেঙ্গে পড়বে, সবাই সেই প্রতিযোগীতা করছে। আর এই সব পায়াকে শক্ত করে আটকে রাখে যেই ফ্রেম, যার নাম “নৈতিকতা”, সেটা ভয়াবহ ক্যান্সারে আক্রান্ত।

তোমরা দেখালে- আমাদের দেশের, সমাজের– আইন, নীতি, নৈতিকতার বাস্তব অবস্থা। দেশের আইনের বই বা সংবিধানে যাই লেখা থাকুক, প্রয়োগ ভিন্ন কথা বলে। এর পাশাপাশি প্রতিষ্ঠিত সামাজিক আইনটি হচ্ছে –নিজের জন্য বা নিজের আত্মীয় বা বন্ধুদের জন্য আইন ভঙ্গ করতে পারাটাই ক্ষমতাবান বা সফলের লক্ষণ।

তোমরা বোঝালে– আমরা সবাই একজন অন্যজনের দিকে আঙ্গুল তুলে বলছি “তুমি ন্যাংটো”। কিন্তু নিজের নেংটো দেহের দিকে তাকাচ্ছি না।

তুমি শেখ সাদির সেই কবিতাটি আবার আমার মুখে এনে দিলে – বুজুর্গি বা আকাল আস্ত না বা সাল। বুজুর্গ (আদর্শিক ও প্রজ্ঞাবান মানুষ) বয়স হলেই হয় না। নীতি, নৈতিকতা আদর্শে তোমরা বয়স্কদের চেয়ে অনেক উঁচুতে, নমস্য।

প্রিয় নবীন কিশোর,
তুমি হাত দিয়েছ এক ভয়াবহ জায়গায়। যেখানে আমরা সবাই নীতি, নৈতিকতা, আইনের কথা বলে মুখে ফেনা তুলছি। অথচ আমাদের একজনের হাত অন্যজনের পকেটে। সততার বিজ্ঞাপনে কান পাতা দায়, অথচ সেই সততা টর্চ জ্বালিয়ে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

আমার নিজের গল্পটিই দেখো –
আমি একজন সাবেক কর্পোরেট কর্মী। নিজের জীবন ও কাজগুলো চালানোর জন্য কিছু ব্যবসা দাঁড় করিয়েছি। রাজনীতিতে এসেছি দেশ ও জনগণের বৃহত্তর কল্যাণ করার স্বপ্ন নিয়ে নিয়ে।

ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা কাজের কারণে দেশের বেশ কিছু রাজনীতিবিদ, গণমাধ্যম-কর্মী, সরকারি আমলা, বিচারকের সাথে পরিচয় আছে। এজন্য আমার অনেক আত্মীয়, বন্ধু, কর্মী ভাবে আমি বেশ ক্ষমতাবান। তারা অনেকেই প্রত্যাশা করেন আমি সেই ক্ষমতার অপব্যবহার করে তাদের সুবিধা দেই, বা অন্তত গুড ফিল দেই।

ধরো, আমি যখন নিজ এলাকায় ব্রিজের টোল দেই, তখন আমার কর্মীরা ভাবেন, নেতার ক্ষমতা নেই। আমার সারথি/ড্রাইভার সাহেবকে যখন লেন মেনে চলতে বলি, উল্টো রাস্তায় যেতে নিষেধ করি, ট্রাফিক পুলিশকে ধৈর্য ধরে কাগজ পত্র দেখাতে বলি, তখন সারথি সাহেব বিরক্ত হন, ভাবেন এ কেমন নখ-দন্তহীন নেতার গাড়ি আমি চালাই? যখন বলি “টাকা নিয়ে চাকরি দিতে পারবো না”, তখন নেতাকর্মী বিরক্ত হন। অবৈধভাবে পরিচিত ব্যবসায়ী বন্ধুকে যখন কাজ নিয়ে দিতে চাই না, তখন তিনি ভাবেন আমি এখনও যথেষ্ট ক্ষমতাবান নই। বাড়িতে যাতায়াতের পথে ফেরিতে, নিজের গাড়ির লাইন ভেঙ্গে না যেতে পারলে সহযাত্রীদের কাছে ইজ্জত রাখা দায়। পরিচিত বিচারক বন্ধুর মাধ্যমে যখন কাউকে অবৈধ বেইল করিয়ে দিতে পারি না, তখন আমার কর্মী/আত্মীয় গোস্বা হন। আমার প্রতিষ্ঠানে যে বৃত্তি শুধুমাত্র সুবিধা বঞ্চিত মানুষের জন্য, সেটা সচ্ছল কাউকে দেবার জন্য আত্মীয়-বন্ধু-সহকর্মী তদবির করেন, না দিলেই গোস্বা।

একটা নগ্ন বাস্তবতা কি জানো?
এসব অনৈতিক বিষয়ে যত কম প্রশ্রয় দেবো, আমার ক্ষমতা পাবার গতি তত ধীর হবে (যেটা প্রতিদিন হাড়ে টের পাচ্ছি)। আর যারা খুব কৌশল করে এগুলোকে প্রশ্রয় দিতে পারবে, তাদের ক্ষমতা পাবার গতি বিদ্যুৎ গতিতে বাড়বে। বাড়তে বাড়তে একসময় দৈত্যের মতো হয়ে যায়।

ভাই আমার,
আজ তোমরা যে রোগের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছে, তার মূল বীজাণু কিন্তু আমাদের সবার ঘরে, তোমারও ঘরে। যেই ঘাতক গাড়ি তোমাকে হত্যা করছে, সেই ঘাতক গাড়িটি তোমাদের কারও বাবা-চাচা-মামার। যেই ঘাতক চালক আজ তোমাকে হত্যা করছে, সে তোমাদের কারও ভাই। যেই সার্জেন্ট ঘুষ খেয়ে ওই গাড়ি ছাড়ছে, সেও তোমাদের কারও আপন জন। এরকম ভাবে তোমার মৃত্যুর পিছনে যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে জড়িত, তারা তোমার কারও বাবা-মামা-চাচা-ফুপা-ভাই-বোন। তোমাকে হত্যা করছে তোমারই একজন আপনজন। হত্যা করছে এবং পার পেয়ে যাচ্ছে, কারণ ওই ঘরে তোমার যে কিশোর বন্ধুটি আছে, যার বাবা হত্যাকারী, সে নিজের বাবার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াচ্ছে না।

অনেক দিনের জমাট বাঁধা ক্ষোভের কারণে তুমি রাস্তায় নেমেছ। কিন্তু তোমার এই রাস্তার যুদ্ধটা সাময়িক। যদি সত্যিই সমাধান করতে চাও, তবে মূল যুদ্ধটা তোমার ঘরে। যুদ্ধ তোমার অনিয়ম করা পরিবারের সদস্য, আত্মীয়ের বিরুদ্ধে। লাঠি ফালা নিয়ে সেই যুদ্ধ নয়। যুদ্ধ নৈতিকতা দিয়ে।

নিশ্চিত করো, তোমার বাবা ফিটনেস বিহীন গাড়ি চালাবেন না, ক্ষমতা থাকলে চালাতে দেবেন না। তোমার বাবা-মা-ভাই-বোন আত্মীয় এরকম কেউ ঘাতক বা তার সহযোগী হবে না।

তুমি এই আন্দোলনে তোমার বাবা মাকে নিয়ে এসে, সারা দিন রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রাখার ক্ষমতা রাখো। তার মানেই তুমিই একমাত্র ক্ষমতা রাখো তাকে নৈতিক বানানোর, আইন মান্যকারী বানানোর। রাষ্ট্র, সমাজ কেউই তোমার মতো ক্ষমতাবান না।

তুমি পারবে, কারণ তারুণ্য মূল সত্যের বয়স। বয়স বাড়ার সাথে আপোষে আপোষে তুমি ক্ষয় হয়ে যাবে। আজকের যুদ্ধটা যদি তুমি করতে পারো তবে তোমাকে এবং তোমার উত্তর প্রজন্মকে আর এভাবে ক্ষয়ে যেতে হবে না।

প্রিয় তারুণ্য,
তোমরা বারবার বলছ তোমরা বঙ্গবন্ধুকে ধারণ করো, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে শ্রদ্ধা করো। প্রয়োজনে বঙ্গবন্ধুর নমেই প্রতি পাড়ায় মহল্লায় একটি নৈতিকতা কমিটি গড়ে তোল। আমাদের কোন দলের লেজুড় হয়ে না, নিজেদের জন্য নিজেরা করো। সেখান থেকে তোমার সমাজের প্রতিটি মানুষের অনৈতিক কাজের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ঘৃণা প্রকাশ করো। মনে রেখো – তোমাদের ঘৃণা এই বীজাণুর বিরুদ্ধে সবচেয়ে মারাত্মক অস্ত্র।

প্রিয় ভাই আমার,
তিনটি বিষয় থেকে তোমাদের সাবধান থাকতে বলব।

আমাদের দেশে এক শ্রেণীর অমানুষ আছে, যারা মানুষের সেন্টিমেন্ট নিয়ে খেলা করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে। তোমাদের ব্যানারের পিছনে দাঁড়িয়ে, তোমাদের নৈতিক শক্তি ও তোমাদের মুষ্টিবদ্ধ হাতকে বিক্রি করে টাকার বান্ডিল কামায়। এরকম কোন লোককে তোমাদের দলে ভিড়তে দিয়ো না। সে সুশীল-কুশিল-নেতা-কর্মী যেই হোক। এরকম কেউ এলে বলে দিয়ো- আপনি বাড়ি যান, গিয়ে আপনার সন্তানকে পাঠান।

সাবধান থেকো আরেকদল থেকে। যারা ক্ষমতার অবৈধ সুযোগ ভোগ করে, আবার তোমাদের আন্দোলনে নিজেদের যুক্ত করে নাম পরিচ্ছন্ন করবে। এদেরকে নিজেদের আগে সংশোধন হতে বলো। অবৈধ ক্ষমতায় যা যা ভোগ করেছে, সেগুলো আগে ত্যাগ করতে বলো।

তোমরা প্রতিবাদ করার মহান দায়িত্বটি নিয়েছ। ভবিষ্যতে যদি কোন বিষয়ে রাষ্ট্রব্যবস্থা, সমাজব্যবস্থার উপরে বিরক্ত হয়ে প্রতিবাদ করতে চাও, তখন নিজেরা রুখে দাঁড়াবে। নিজেদের স্পৃহা কোন স্বার্থান্বেসী মহলের হাতে ব্যবহৃত হতে দেবে না। সমাজ পরিবর্তনে অহিংস, সিস্টেমেটিক, দীর্ঘ মেয়াদী প্রতিবাদ সবচেয়ে কার্যকর। প্রতিবাদ মাঠে মারা যায় সহিংস হলে, দীর্ঘ জনদুর্ভোগ তৈরি করলে, রাতারাতি বাস্তবতা বিবর্জিতভাবে ফলাফল চাইলে।

পরিশেষে তোমার জন্য শামসুর রহমানের দুটো লাইন:

তুমি আর ভবিষ্যৎ যাচ্ছ হাত ধরে পরস্পর
সর্বত্র তোমার পদধ্বনি শুনি,দুঃখ তাড়ানিয়া
তুমি তো আমার ভাই,হে নতুন,সন্তান আমার

তোমাদের জয় হোক।
তারুণ্যের জয় হোক।
জয় বাংলা।
জয় বঙ্গবন্ধু।
বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।


সুফি ফারুক
সাবেক, তথ্য প্রযুক্তি প্রধান
উদ্যোক্তা ও রাজনীতিক

 

(এই লেখাটি আমার একান্ত ব্যক্তিগত অনুভূতি, এর সাথে আমার সম্পৃক্ত কোন দল বা প্রতিষ্ঠানের অফিশিয়াল মতামতের কোন সম্পর্ক নেই)