Sufi Faruq Ibne Abubakar (সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর)

উদ্যোক্তা সিরিজ- বিজ্ঞাপন প্রসঙ্গ উদ্যোক্তা উন্নয়ন, নোট

Television Commercial

দেশিয় টেলিভিশনে প্রচুর TVC (Television Commercial) দেখানো হয়- এই অভিযোগটা একটা সর্বজনীন অভিযোগ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ব্যস্ততার জন্য সংবাদ, কিছু টকশো এবং টাইগারদের ম্যাচ ছাড়া টেলিভিশনের সামনে আমার খুব একটা বসা হয় না। প্রাইভেট সেক্টরে শীর্ষ পদে চাকুরী, টেলিভিশনে বেশকিছু অনুষ্ঠানের সাথে সংশ্লিষ্টতা আর নিজস্ব উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত কয়েটা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থাকায় প্রশ্নটা আমার কাছেও আসে। টিভিতে কেন এত বিজ্ঞাপন দেয় কোম্পানিগুল। কখনও এটা ব্রেকে একই টিভিসি ৩-৫ বার দেখায়!

মজার ব্যাপার কি জানেন, শুধু টিভিসি নয়, সাধারণত আমরা বিজ্ঞাপন দেখি পত্রপত্রিকায়, রাস্তার ধারে হোর্ডিংয়ে, পোস্টারে। এর মাধ্যমে নতুন-নতুন পণ্যের সঙ্গে পরিচিত হই। তবে অনেক সময় বেশি-বেশি বিজ্ঞাপন দেখে আমারা বিরক্তি হলেও, ঐ পণ্য কেনার সময়ে তা কিছুটা হলেও আমাদের প্রভাবিত করে- নইলে এত বড় বিজ্ঞাপন শিল্প গড়ে উঠত না।
খেয়াল করে দেখবেন, প্রডাক্ট কেনায় সময় প্রথমে কিন্তু আপনি সেই ব্রান্ডের কথায় ভাবেন, যেগুলোর বেশি বেশি বিজ্ঞাপন দেখেন। কেও যদি সাজেশন চায় আপনি সেই ব্রান্ডগুলোর কথা বলবেন। কখনও দেখবেন না- কেও বলে, এই কোম্পানি প্রচুর বিজ্ঞাপন দেয়, এদের প্রোডাক্ট/সার্ভিস নিবো না।

একাডেমিক ল্যাংগুয়েজের বাইরে- সোজা বাংলায় বললে, বিজ্ঞাপনের উদ্দেশ্যটা থাকে টার্গেট কাস্টোমারকে যতটা সম্ভব বেশিবার বলা, আমরা আপনার কাঙ্ক্ষিত প্রোডাক্ট তৈরি করে অপেক্ষা করছি।

বিজ্ঞাপনের কাজটা কি? বিজ্ঞাপন- পণ্য সম্পর্কে ক্রেতার জ্ঞানগত উপযোগ সৃষ্টি করে। অনেক সময় চাহিদাও তৈরি করে দেয়।

উন্নত বিশ্বে ইনফোমার্শিয়াল দেখান হয়। এগুলো এক আধ মিনিটের টিভিসি নয়। বহুক্ষণ ধরে কোন কোম্পানি তাদের পণ্য গল্পের ছলে বা সেলিব্রেটিদের দিয়ে নানান লোকের ইন্টার্ভিউয়ের মাধ্যমে তুলে ধরে। আমাদের দেশেও এমন মাঝে মাঝে দেখি- এটাও বিজ্ঞাপন- যদিও অনেক সময়েই সেটা পরিষ্কার করে বলা হয় না। যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরণের প্রোগ্রামের আগে সেটা যে বিজ্ঞাপন সেটা জানানো বাধ্যতামূলক।

বিজ্ঞাপনের আরেকটা বড় মাধ্যম চলচ্চিত্র। যে গাড়ি নায়িকা চালাচ্ছেন- সেই গাড়ির লোগো-র উপরে ক্যামেরা ফেলা, যে ল্যাপটপ ব্যবহার করা হচ্ছে- সেটাকে ফোকাস করা, ইত্যাদি। একাধিক কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করে প্রযোজকরা সেইসব ব্রান্ড ছবিতে দেখাচ্ছেন। আমাদের চলচ্চিত্র, টেলিছবি এমনকি নাটকেও সেই প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। গত বছর (২০১৪ সালে) বিভিন্ন কোম্পানি ২.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ করেছে নিজেদের প্রোডাক্ট হলিউডের সিনেমায় প্রচারে করতে। নায়কের হাতে একটি মুঠোফোন যেখানে ব্র্যান্ডের নাম স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, বা রিংটোনে মোবাইল ফোন অপারেটরের থিমটোন যেটা সহজেই বোঝা যায়- এসব দৃশ্য অনেক আগে থেকেই দেখানো হয়ে আসছে। এটি এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, হলিউড-বলিউডের নায়ক বা নায়িকা সিনেমার চুক্তিতে এর জন্য আলাদা ভাবে টাকা দাবি করছেন। কেনই বা দাবি করবে না? নায়কের চুলের স্টাইল দেখে রাতারাতি যদি ভক্তরা নিজেদের চুলের স্টাইল বদলে ফেলতে পারে। তাহলে, কেনাকাটার সময় কেন নায়কের ব্রান্ড কিনবে না?

যারা চলচ্চিত্রকে শিল্পের মাধ্যম বলে মনে করেন, তাঁরা অবশ্যই এ ব্যাপারে বিরক্ত। মার্কেটিংয়ের সাপ্তাহিক পত্রিকা হ্যারিসন’স তাদের প্রতিবেদনের মাধ্যমে সর্ব প্রথম এ বিষয়ে সোচ্চর হয়। ১৯১৯ সালের কমেডি ছবি ‘দ্য গ্যারাজ’-এ রেড ক্রাউন গ্যাসোলিন ব্র্যান্ড দেখানোর জন্যে পত্রিকাটি সমালোচনা করে। গত শতাব্দীর ২০ দশকে করোনা টাইপরাইটার কোম্পানি ফার্স্ট ন্যাশনাল পিকচার্সের সঙ্গে একটা চুক্তি করে নানান ছবিতে তাদের টাইপরাইটার দেখাতে শুরু করে। এ নিয়ে যথেষ্ট হৈচৈ হয় হ্যারিসন’স রিপোর্টে। প্রসঙ্গত এর উল্টোটাও ঘটে। ছবিতে কোন বিশেষ ব্র্যান্ড অপ্রীতিকর ভাবে ব্যবহার করা হয়েছে বলে সেই ব্র্যান্ডের নির্মাতারা প্রযোজককে ছবি থেকে সেই অংশ বাদ দিতে বাধ্য করেছেন- এমন খবরও শোনা গেছে। সেক্ষেত্রে ছবির নির্মাতাদের আর্থিক ক্ষতি স্বীকার করতে হয়েছে।

ঢাকার পথে ঘাটে চলার সময় দেখবেন ইউরোপের বিভিন্ন ফুটবল টিমের জার্সি পরে চলাফেরা করছে বিভিন্ন বয়েসের ছেলেরা। এদের মধ্যে বেশির ভাগকে দেখা যাবে কোন দিন মাঠে গিয়ে ফুটবলে লাথিই মারেনি। ভালো করে খেয়াল করে দেখবেন জার্সিতে কিন্তু ঐসব ক্লাবের স্পন্সরের নামও রয়েছে। ক্লাবগুলো তো টাকা পেয়েছে স্পন্সরের নাম লেখানোর জন্য। কিন্তু ভক্তরা কেন স্পন্সরের নাম লেখা জার্সি কিনছে? কারণটা হল: বিজ্ঞাপনটা সেই জার্সির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। লিওনেল মেসি-ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো পরা জার্সি স্পন্সর ছাড়া বেমানান লাগবে বলে। ভক্তরা তাই নিজের পয়সা খরচ প্রচার করে যাচ্ছে বিজ্ঞাপন।

যে ভাবে চলছে এভাবে চলতে থাকলে, বিভিন্ন মাধ্যমে বিজ্ঞাপন বাড়বে বৈকি কমবে না। আপনি যখন কাস্টমর, আপনার হাতে যখন আ-নে-ক চয়েস; তখন তো প্রডাক্টের গুণগানের জন্য বেশি বিজ্ঞাপন ছাড়া তো উপায় নাই।



আপনার মন্তব্য দিন