Sufi Faruq Ibne Abubakar (সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর)

মুসলিমরা কেন জ্ঞান বিজ্ঞানে পিছিয়ে? নোট

মাহে রমজানে গঠিত আমাদের বায়তুল হিকমাহ পাঠচক্র থেকে রাজিব হাসান লিখেছিলেন মুসলিমদের জ্ঞান-বিজ্ঞানে অবদান নিয়ে। আমি তার পরের লেখাটি লিখেছিলাম – যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে সেই সোনালী সময় এসেছিল, “বায়তুল-হিকমাহ” কে ঘিরে একটি আলোকিত সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা নিয়ে।

আজ লিখবো সেই সময়টি কিভাবে শেষ হল? এরপর যুগযুগে কেন আমরা আর সেরকম সমাজ তৈরি করতে পারলাম না, জ্ঞান-বিজ্ঞানে কিভাবে ক্রমশ পিছিয়ে পড়লাম তা নিয়ে।

অনেকেই বলেন মঙ্গোল আক্রমণের কারণ বায়তুল হিকমা ধ্বংস হয়েছে, মুসলিমদের জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা থেমে গেছে। ধ্বংস হয়ে যাবার অংশ টুকু সত্য, তবে থেমে গিয়েছিল তার আগেই।

আব্বাসীয় শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় “বায়তুল-হিকামহ” থেকে জ্ঞান বিজ্ঞানের জ্যোতি যখন ছড়িয়ে পড়ছে, তখনই ক্রমশ আর একটি অর্থোডক্স-গোঁড়া মুসলিম থিওলাজির স্কুল শক্তিশালী হয়ে উঠছিল। তাদের বেশি কটি গ্রুপের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী গ্রুপটির নাম আশারি। তারাই বলা শুরু করেছিলেন- কাফেরদের জ্ঞান (গ্রিক, হিন্দু, ইত্যাদি) পড়ে আমাদের ইমান-আকিদা নষ্ট হচ্ছে, আমরা মুল ইসলাম থেকে দুরে সরে যাচ্ছি। তাই মুসলিমদের কোরআন, সিরাত, হাদিস এর বাইরে কোন লেখাপড়া নিষ্প্রয়োজন। এসব নিয়েই ভিন্ন মতের বিতর্কের সংস্কৃতির বদলে শুরু হয় সংঘর্ষ। খলিফার ভিন্নমত, মুতাজিলাদের মত, মুতাকাল্লিমুন অন্যদের মত, আশারিদের মত নিয়ে চরম উত্তেজনা তৈরি হয়। তবে শেষ পর্যন্ত জয় হয় অর্থোডক্সদের (মূলত আশারি অনুসারীদের)। আমরা “ইকরা” থেকে সরে যাই। বায়তুল হিকমাহ ভাইব্রেন্ট জ্ঞান-কেন্দ্র থেকে শুধুমাত্র একটি বন্ধ্যা প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয়। আজকে আমরা যেসব মুসলিম দার্শনিক-বিজ্ঞানীদের নিয়ে গর্ব করি তাদের ও তাদের অনুসারীদের বইপত্র পুড়িয়ে দেয়া হয়, কাউকে হত্যা করা হয়, কাউকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়, কেউ বা পালিয়ে গিয়ে বাঁচে। মঙ্গোল আক্রমণের আগেই আসলে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা বন্ধ হয়ে গিয়েছি, সোনালী সময় শেষ হয়ে গিয়েছিল। এর পরে মঙ্গোল আক্রমণের মধ্য দিয়ে সেই বন্ধ্যা প্রতিষ্ঠাটিকে ধ্বংস হয়।

এই সময়টার দিকে তাকালে বোঝা যায়- লেখা-পড়া বা জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিরোধী ছিল সেই সময়ের অর্থোডক্স আলেমরাই। তাদের উদ্যোগেই অস্ত যায় মুসলিমদের একমাত্র সোনালী সময়ের সূর্য। আজ আমরা যেসব মুসলিম বিজ্ঞানীদের নিয়ে গর্ব করছি, তাদের নামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান খুলো ব্যবসা বাণিজ্য করছি, তাদেরকে আমরা সীমাহীন অত্যাচার করেছিলাম আমাদের আলেমদের কথাতেই। সেসব আলোকিত মানুষদের আমরা ইসলাম থেকে বিতাড়িত করেছিলাম, নাস্তিক বা ইসলামের শত্রু ঘোষণা করেছিলাম। মহান আল্লাহর কি বিচার দেখুন; সেইসব মজলুম দার্শনিক-বিজ্ঞানীদের নাম দিয়েই আধুনিক সমাজে আমাদের মুখ রক্ষা করতে হচ্ছে।

এবার চলুন আর একটু আগাই।
এখন সুপার পাওয়ার আমেরিকা। তার আগে ছিল ব্রিটেন। তার আগে কারা ছিল? ছিল মুসলিম “উসমানীয় সাম্রাজ্য”। এই সাম্রাজ্য ধ্বংস হবার জন্য প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সামরিক বিজ্ঞান, ডিপ্লোম্যাটিক ফেইলিওর সহ বেশ কিছু কারণ আছে। তবে একটি কারণকে আমি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেই। তা হল শায়খ উল ইসলামের “প্রেস মেশিন” এর উপরে দেয়া ফতোয়। ১৪৪০ সালে জার্মানিতে প্রেস মেশিন আবিষ্কার হয়। সারা ইয়োরোপে ভাইরাসের মতো জ্ঞান-বিজ্ঞানের বইপত্র ছড়িয়ে পড়ে। এই সময় উসমানীয়া সাম্রাজ্যের অর্থোডক্স আলেম গ্রুপ “শায়খ উল ইসলাম” ফতোয় দেয় “প্রেস মেশিন” হারাম। ফলে পরবর্তী প্রায় আড়াই শত বছর খেলাফতে উসমানীয়তে প্রেস মেশিন হারাম থাকে।

একদিকে ইয়োরোপ হাজার বছর এগিয়ে গেল। অন্যদিকে আমরা সেই একই যায়গায় থাকলাম। এমনকি ইয়োরোপে পৌঁছানো বায়তুল হিকমার অনুবাদ করা সেইসব জ্ঞান ও দর্শনের (গ্রীক, হিন্দুস্থানি, আরব, ইত্যাদি) বইগুলো প্রিন্ট হয়ে ইয়োরোপে সাধারণ মানুষের হাতে হাতে পৌঁছে গেল। আর আমরা থাকলাম একটি ফতোয়া আঁকড়ে ধরে। “ইকরা”র সাথে এমন শত্রুতার নিদর্শন কি আর পাওয়া যাবে?

এবার চলুন আর একটু আগাই।
ব্রিটিশ শাসনামলে আমরা ইংরেজি পড়াকে ফতোয়া দিয়ে বন্ধ করেছি। স্যার সৈয়দ আহমেদ যখন আলীগড় মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করলেন, তখন আমাদের অর্থোডক্স আলেমরা এর বিরুদ্ধে ৬৪ টা ফতোয়া জারি করেছিলেন। সুন্নি, শিয়া, বেরেলভি, দেওবন্দী, আহলে হাদিস, আরও কি কি সব আমাদের মুসলিমদের শতাধিক ফিরকা। একজন আরেকজনকে বলে কাফের। কিন্তু “ইকরা”র বিরুদ্ধে তারা সবাই এক ছিলেন এক। সবাই বলেছিলেন এই লোকটা “কাবিলে গারদানজানী” (মানে গলা কেটে হত্যার যোগ্য)। গৌরখপুরের আলেম ইমদাদ আলী সাহেবের তাতেও মন ভরে নাই। তিনি মক্কা-মদিনাতে গিয়ে আরও ৮টা ফতোয়া নিয়ে এলেন। ঘোষণা হল “এই লোক উহুদি নাসারার চর। সামর্থ্য বান সকল মুসলমানের জন্য তার গর্দান কাটা ফরজ”।

এই হল মহান আল্লাহর প্রথম আদেশ “ইকরা” র উপরে আমাদের ইমান ও আমল। আল্লাহর উপহার দেয়া সবচেয়ে দামী জিনিস “মস্তিষ্ক” টাকে ব্যবহারের উদাহরণ।
অন্য জ্ঞান বিজ্ঞানের বই তো দুরে থাক, আমাদের ফরজ পাঠ্য বইটি যখন স্থানীয় ভাষায় অনুদিত হয়েছে, তখন সেখানের আলেমরা এরকম ফতোয়া লাগিয়েছে। এরকম উদাহরণ দিতে গেলে আরও বহু আছে। সেই তালিকা আর না বাড়াই।

আমাদের শিক্ষা-দীক্ষা-জ্ঞান-বিজ্ঞানে-অর্থনীতিতে পিছিয়ে পড়ার দীর্ঘ ইতিহাস আছে, নগ্ন সত্য আছে। সেগুলো জানতে হবে, সেগুলোর কারণ বুঝতে হবে এবং সেগুলো থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। যেসব ঘটনা যেন রিপিট না হয় সেটা নিশ্চিত করতে হবে। আমরা যদি সত্যিই জ্ঞান-বিজ্ঞানে আগাতে চাই! আর যদি না চাই, তবে কিভাবে তা থেকে দুরে থাকা যায় সেটার মডেল তো ইতিহাসে আছেই!
আসুন উত্তর খুঁজি: আমাদের জ্ঞ্যন বিজ্ঞানের চর্চার যুগে যুগে বিরধিতা করা হয়েছে কেন? কি দিয়ে? কারা করেছে? “ইকরা”র সাথে আমাদের শত্রুতা কি?