Sufi Faruq (সুফি ফারুক)

যদি আর বাঁশী না বাজে – কাজী নজরুল ইসলাম (মে ২৪, ১৮৯৯ – আগস্ট ২৯, ১৯৭৬) বক্তৃতা সংগ্রহ

Kazi Nazrul Islam; কাজী নজরুল ইসলাম

Kazi Nazrul Islamবন্ধুগণ,
আপনারা যে সওগাত আজ হাতে তুলে দিলেন আমি তা মাথায় তুলে নিলুম। আমার সকল তনু মন ও প্রাণ আজ বীণার মত বেজে উঠেছে । তাতে শুধু একটি মাত্র সুর ধ্বনিত হয়ে উঠছে – আমি ধন্য হলুম, আমি ধন্য হলুম। আমায় অভিনন্দিত আপনারা সেই দিনই করেছেন যেদিন আমার লেখা আপনাদের ভালো লেগেছে।

বিংশ শতাব্দীর অসম্ভবের সম্ভাবনার যুগে আমি জন্মগ্রহণ করেছি, এরই অভিযান সেনা দলের তূর্য বাদকের একজন আমি, এই হোক আমার সবচেয়ে বড় পরিচয়। আমি এই দেশে, এই সমাজে জন্মেছি বলেই শুধু এই দেশের, এই সমাজেরই নই, আমি সকল দেশের সকল মানুষের।।

কবি চায়না দান, কবি চায় অঞ্জলি, কবি চায় প্রীতি। কবিতা আর দেবতা সুন্দরের প্রকাশ। সুন্দরকে স্বীকার করতে হয় যা সুন্দর তাই দিয়ে। সুন্দরের ধ্যান, তার স্তবগান ই আমার ধর্ম। তবু বলছি আমি শুধু সুন্দরের হাতে বীণা পায়ে পদ্মফুলই দেখিনি, তার চোখে চোখ ভরা জল ও দেখেছি। শ্মশানের পথে, গোরস্থানের পথে তাকে ক্ষুধা জীর্ণ মূর্তিতে ব্যথিত পায়ে চলে যেতে দেখেছি, যুদ্ধ ভূমিতে তাকে দেখেছি, কারাগারের অন্ধকূপে তাকে দেখেছি, ফাঁসির মঞ্চে তাকে দেখেছি। আমাকে বিদ্রোহী বলে খামোখা লোকের মনে ভয় ধরিয়ে দিয়েছেন কেউ কেউ। এই নিরীহ জাতটাকে আঁচড়ে কামড়ে তেড়ে নিয়ে বেড়াবার ইচ্ছা আমার কোনদিনই নেই। আমি বিদ্রোহ করেছি, বিদ্রোহের গান গেয়েছি অন্যায়ের বিরুদ্ধে, অত্যাচার এর বিরুদ্ধে। যা মিথ্যা, কলুষিত, পুরাতন, পচা, সেই মিথ্যা সনাতনের বিরুদ্ধে, ধর্মের নামে ভণ্ডামি ও কুসংস্কার এর বিরুদ্ধে।

কেউ বলেন আমার বানী যবন কেউ বলেন কাফের। আমি বলি ও দুটোর কোনটাই না। আমি শুধু হিন্দু মুসলিম কে এক জায়গায় ধরে নিয়ে হ্যান্ডশেক করানোর চেষ্টা করেছি, গালাগালি কে গলাগলি তে পরিণত করার চেষ্টা করেছি। সে হাত এ হাত মেলানো যদি হাতাহাতি থেকে অশোভন হয়ে থাকে তাহলে ওরা আপনিতেই আলাদা হয়ে যাবে। আমার গাঁটছড়ার বাঁধন কাটতে তাদের কোন বেগ পেতে হবেনা, কেননা একজনের হাতে আছে লাঠি আরেকজনের আস্তিনে আছে ছুরি। হিন্দু মুসলিম দিনরাত হানাহানি জাতিতে জাতিতে বিদ্বেষ, যুদ্ধ বিগ্রহ, মানুষের জীবনে একদিকে কঠোর দারিদ্র, ঋণ, অভাব অন্যদিকে লোভী ও সুদে চক্রের ব্যাংকে কোটি কোটি টাকা পাষাণ স্তূপের মত জমা হয়ে আছে। এ অসাম্য ভেদ দুর করতেই আমি এসেছিলাম। আমার কাব্যে, সঙ্গীতে, কর্মজীবনে অভেদ সুন্দর সাম্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম।

আমি যশ চাইনা, খ্যাতি চাইনা, প্রতিষ্ঠা চাইনা, নেতৃত্ব চাইনা। জীবন আমার যত দুঃখময় হউক, আনন্দের গান, বেদনার গান গেয়ে যাব আমি। দিয়ে যাব নিজেকে নিঃশেষ করে সকলের মাঝে বিলিয়ে। সকলের বাঁচার মাঝে থকব আমি বেঁচে – এই আমার ব্রত, এই আমার সাধনা এই আমার তপস্যা।

রবীন্দ্রনাথ আমায় প্রায়ই বলতেন, দেখ উন্মাদ, তোর জীবনে শেলীর মত, কীটস্ মত খুব বড় একটা ট্রাজেডি আছে, তুই প্রস্তুত হ্। জীবনে সেই ট্রাজেডি দেখবার জন্য আমি কতদিন অকারণে অন্যের জীবন অশ্রুর পরশে আচ্ছন্ন করে দিয়েছি, কিন্তু আমারই জীবনে রয়ে গেল বিশুষ্ক মরুভূমির মত তপ্ত, মেঘের ঊর্ধ্বে শূন্যে র মত কেবল হাসি, কেবল গান ,কেবল বিদ্রোহ। আমার বেশ মনে পড়ছে একদিন আমার জীবনের মহা অনুভূতির কথা। আমার ছেলে মারা গেছে, আমার মন তীব্র পুত্রশোকে যখন ভেঙ্গে পড়ছে ঠিক সেই দিনই সেই সময় আমার বড়িতে হাসনাহেনা ফুটেছে, আমি প্রাণ ভরে হাসনাহেনার গন্ধ উপভোগ করেছিলাম। আমার কবিতা ,আমার গান আমার জীবনের অভিজ্ঞতার মধ্য হতে জন্ম নিয়েছে।

যদি কোনদিন আপনাদের প্রেমের প্রবল টানে আমাকে আমার একাকীত্বের পরম শূন্য থেকে অসময়ে নামতে হয়, সেদিন মনে করবেন না আমি সেই নজরুল, সেই নজরুল অনেকদিন আগে মৃত্যুর খিড়কি দুয়ার দিয়ে পালিয়ে গেছে। মনে করবেন পূর্ণত্বের তৃষ্ণা নিয়ে যে একটি তরুণ এই ধরায় এসেছিল, অপূর্ণতার বেদনায় তারই বিগত আত্মা যেন স্বপ্নে আপনাদের মাঝে কেঁদে গেল।

যদি আর বাঁশী না বাজে, আমি কবি বলে বলছিনে, আমি আপনাদের ভালবাসা পেয়েছিলাম সেই অধিকারে বলছি, আমায় আপনারা ক্ষমা করবেন, আমায় ভুলে যাবেন। বিশ্বাস করুন, আমি কবি হতে আসিনি আমি নেতা হতে আসিনি, প্রেম দিতে এসেছিলাম, প্রেম পেতে এসেছিলাম। সেই প্রেম পেলাম না বলে এই প্রেমহীন নীরস পৃথীবি থেকে নীরব ও অভিমানে চিরদিনের জন্য বিদায় নিলাম।।

যেদিন আমি চলে যাব, সেদিন হয়তবা বড় বড় সভা হবে, কত প্রশংসা কত কবিতা বেরুবে হয়ত আমার নামে। দেশপ্রেমী, ত্যাগী, বীর, বিদ্রোহী – বিশেষণের পর বিশেষণ ।টেবিল ভেঙ্গে ফেলবে থাপ্পড় মেরে, বক্তার পর বক্তা।

এই অসুন্দরের শ্রদ্ধা নিবেদনের শ্রাদ্ধ দিনে বন্ধু তুমি যেন যেওনা। যদি পারো, চুপটি করে বসে আমার অলিখিত জীবনের কোন একটি কথা স্মরণ কর। তোমার ঘরের আঙিনায় বা আশে পাশে যদি একটি ঝরা পায়ে পেষা ফুল পাও সেইটিকে বুকে চেপে বল, বন্ধু, আমি তোমায় পেয়েছি।

তোমাদের পানে চাহিয়া বন্ধু আর আমি জাগিবনা

কোলাহল করি সারা দিনমান কারো ধ্যান ভাঙিবনা

নিশ্চল নিশ্চুপ আপনার মনে পুড়িব একাকী

গন্ধ বিধুর ধুপ।



আপনার মন্তব্য দিন