Sufi Faruq Ibne Abubakar (সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর)

সাইবার বুলিং বিজ্ঞান, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি

একটি ফেসবুক একাউন্ট, একটি ব্লগ বা একটি ইউটিউব একাউন্ট একজন সাধারণ মানুষকে বিনা অর্থ বিনিয়োগে বানিয়ে দিতে পারে একটি শক্তিশালী মিডিয়ার মালিক । শুধু মিডিয়া নয়, মাল্টিমিডিয়ার মালিক । সেটা এক দিনে যতবার খুশি, নিখরচায়, নিজের ইচ্ছেমতো নিজেকে প্রকাশ করতে পারে । প্রকাশের পর যেকোন সময় আবারো দেখার জন্য পাবলিক প্লেসে সংরক্ষন করতে পারে । পাঠক বা দর্শকের সাথে ইচ্ছেমতো যতবার খুশি মিথস্ক্রিয়া করতে পারে । সেই মিথস্ক্রিয়াও আবার মাল্টিমিডিয়াতে । কনটেন্ট যদি ভালো হয়, সুযোগ আছে সারা বিশ্বের পাঠক/দর্শককে জয় করে নেবার । কোন লাইসেন্স দরকার নেই, বর্ডার ব্যারিয়ার নেই, অবকাঠামো বা রেগুলেটরি খরচ নেই । গতানুগতিক কোন গণমাধ্যম আজ পর্যন্ত জনগনকে নিজেকে প্রকাশের নিখরচায় এই সুযোগের ছোট্ট অংশও দিতে পারেনি । তথ্য প্রযুক্তি দিয়েছে, সাইবার জগৎ দিয়েছে, সামাজিক গণমাধ্যম দিয়েছে ।

প্রতিটি কল্যাণমুখী প্রযুক্তিই তার চরিত্রের অংশ হিসেবে নিয়ে আসে কিছু অকল্যাণের ঝুঁকি । সে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার যতখানি কল্যাণের ক্ষমতা রাখে তার অপব্যবহার তার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতির ক্ষমতা রাখে । ইন্টারনেট বা সাইবার জগতের সেই ঝুঁকির দিকটি হচ্ছে সাইবার বুলিং ও সাইবার ক্রাইম ।

সাইবার বুলিং বৈশ্বিক সমস্যা । প্রযুক্তির অগ্রগতির সাথেই এই সমস্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে । বিশ্বজুড়ে সাইবার বুলিং এর মূল টার্গেট শিশুরা । ৪৩% শিশুরা এর শিকার হয়, কেউ কেউ একাধিকবার । এর মধ্যে মাত্র ১০% কাউকে জানায়, বাকিরা চুপচাপ সহ্য করে । ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা আক্রান্ত হয় দ্বিগুণ। ২০% এর উপরে এর প্রভাব ডিপ্রেশন থেকে শুরু করে আত্মহত্যা পর্যন্ত গড়ায় । সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশের ৪৯% স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীই সাইবার বুলিং-এর নিয়মিত শিকার। আর প্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে তা ক্রমশ বাড়ছে। বিশ্বজুড়ে সাইবার বুলিং-এর শিকার শিশুদের মাঝে ডিপ্রেশন, স্কুল/কলেজে না যাওয়ার প্রবণতা, ইনসমনিয়া এমনকি আত্মহত্যার প্রবণতাও দেখা যায়। এখন পর্যন্ত একাধিক আত্মহত্যার ঘটনার মূল খুঁজতে গিয়ে জানা গেছে, অনলাইনে হেনস্তা হওয়া ও পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে আত্মহত্যাই শেষ পথ হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছে ভিক্টিমরা। আমাদের দেশে এ ধনের ঘটনাগুলো এখনও সঠিক ভাবে রিপর্ট হচ্ছে না বলে আমরা অফিশিয়ালি তোমন কিছু জানতে পারছি না।

সাইবার বুলিং মূলত এক ধরনের অনলাইন আচরণ (লেখা, বলা, ছবি-ভিডিও দিয়ে প্রকাশ করে) যা কাউকে লজ্জা, ভয়, হুমকি, অপদস্থ, বিব্রত হবার অনুভব করায় । এটা বহু রকম হতে পারে। যেমন কাউকে ইচ্ছে করে কোন মেসেজিং গ্রুপ থেকে বাদ দিয়ে নিচু অনুভব করানো । মেসেজে বা কমেন্টে কাউকে বাজে নোংরা গালিগালাজ দেয়া। সম্পর্কের ক্ষেত্রে অনুপযুক্ত যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ কথা বলা । কাউকে কিছু বলে হুমকি দেয়া বা ভয় দেখানো । কারও গোপন কিছু প্রকাশ করে দিয়ে লজ্জা দেয়া । কারও সরলতার সুযোগ নিয়ে তার গোপন তথ্য, ছবি বা ভিডিও দেখা (অন্য কোথাও প্রকাশ না করলেও)। অন্য কারও একাউন্টে সুযোগ পেয়ে ঢুকে আজে বাজে তথ্য ছড়ানো । ফেইক প্রোফাইল বা অন্য কেউ সেজে প্রোফাইল তৈরি করা । কারও দূর্বল কোন বিষয় অন লাইনে তুলে ধরে খোঁচানো বা হাস্যরস করা ।

আমাদের দেশে এই বিষয়টি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি বৈশ্বিক চিত্রের সাথে আমাদের সাইবার বুলিং এর অনেক মিলের পাশাপাশি বেশ কিছু পার্থক্যও রয়েছে । প্রথম পার্থক্যটি রুচি, মূল্যবোধ ও সংস্কৃতিতে । উন্নত বিশ্বে যেসব আচরণকে সাইবার বুলিং বলে স্বীকৃতি দেয়া হয়, তার কিছু আচরণ এখনও আমাদের সমাজে মোটামুটি গ্রহণযোগ্য এবং সাধারণ আচরণ । আবার সমাজের বিভিন্ন শ্রেণিতেও এর স্বীকৃতিও ভিন্ন । তাই অপেক্ষকৃত শিক্ষিত, রুচিশীল ও সংবেদনশীল মানুষগুলো অপেক্ষাকৃত নিম্নরুচির মানুষদের কাছে নিয়মিত সাইবার বুলিং এর শিকার হচ্ছেন । যারা বুলিং করছে তারা অনেক ক্ষেত্রে বুঝতেই পারছে না যে তারা আসলে বুলিং করছে, একটি অপরাধ করছে । এখানে যেমন জনসমক্ষে কারও মোটা হয়ে যাওয়া বা চুল পড়ে যাওয়া নিয়ে রসিকতা করা কারও কারও কাছে নিতান্তই রসিকতা । কাউকে হঠাৎ করে কোন উপদেশ দেয়া (যেটাতে বোঝায় যে উনি আসলে এই মুহুর্তে সেই উপদেশটির উল্টো চলছেন) বিষয়টিও ভাল উপদেশ হিসেবে গ্রহণযোগ্য । অথচ এই বিষয়দুটো রীতিমতো সাইবার বুলিং, কারন এটা কাউকে মানসিক ভাবে খাটো করতে পারে । দ্বিতিয়টি হচ্ছে: এখানে শিশুদের চেয়ে প্রাপ্ত বয়স্কদের সাইবার বুলিং বেশি হয় । মেয়েদের ক্ষেত্রে এর পরিমাণ সবচেয়ে বেশি । কারন ওই ধরনের প্রযুক্তিতে আমাদের শিশুদের খুব ক্ষুদ্র একটি অংশেরই আনাগোনা রয়েছে । ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দেয়া তথ্য মতে – দেশের অনলাইনে থাকা তিন-চতুর্থাংশ নারীই সাইবার নিপীড়নের শিকার । এদের মধ্যে মাত্র ২৬% অনলাইনে হেনস্তার বিষয়টি প্রকাশ্যে এনে অভিযোগ করেন, এবং অন্যরা সামাজিকতার ভয়ে গোপন রাখেন। মেয়েদের বুলিং এর বেশিরভাগ বিষয়বস্তু যৌনতা কেন্দ্রীক । আর আমাদের খেলোয়াড়সহ অনলাইন সেলিব্রেটিদের অনলাইন বুলিং এর অনেক খবর তো ইতমধ্যে আমরা বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় দেখেছি। তৃতীয়ত: আমাদের দেশে সংঘবদ্ধ হয়ে বুলিং করার এই কাজটি অপেক্ষাকৃত বেশি হয় । ধর্ম ও ধর্মীয় কুসংস্কার ও রাজনীতি আমাদের সংঘবন্ধ সাইবার বুলিং এর উপাদান । চতুর্থত: আমাদের দেশে অনেক ক্ষেত্রে অপরাধী ও ভিক্টিম দু’দিকেরই প্রযুক্তি ব্যবহার বিষয়ে জানা বোঝার অভাবে কিছু সাইবার বুলিং এর ঘটনা ঘটে । এখানে অনেক ক্ষেত্রে সাইবার বুলিং এর সুচনা হয় ভিকটিমের স্বেচ্ছা সহযোগীতায় । তার মানে এই নয় যে ভিক্টিম নিজে ভিক্টিম হবে জেনেও সহায়তা করেছে । বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভিক্টিম যখন এটার সূচনা করেছে তখন সে এর সুদূুরপ্রসারী প্রভাব সম্পর্কে জানতোই না ।

সাইবার বুলিং সমস্যাটি মোকাবেলা এক-দুটি উদ্যোগের বিষয় নয়। এখানে হোলিস্টিক এপ্রোচ দরকার। প্রথম সমস্যা আমাদের চিন্তায়-ধারনায়। আমাদের চিন্তার একটি বড় সিমাবদ্ধতা হচ্ছে সাইবার জগৎটিকে আমরা এখনও আমাদের আশপাশের সাধারণ জগতের মতোই পুর্ণ জগৎ হিসেবে ভাবতে পারি না । আমাদের কাছে সাইবার জগৎটি এখনও একটি সাধারণ জানালার মতো, যেটা চাইলেই বন্ধ করা বা খোলা যায়, যেটা লুকিয়ে রাতে খুললে হয়ত কেউ দেখছে না ভাবি । আমারা ভাবি এটা একটা স্লেট বা ব্ল্যাকবোর্ডের মতো, লেখার পরে চাইলেই মুছে ফেলা যায় । আসলে বাস্তবতা হচ্ছে ইন্টারনেটের জগৎটি আমাদের আশেপাশের জগতের মতো প্রায় পুর্ণ একটি জগৎ । কিছু ক্ষেত্রে সাইবার জগতে আমাদেরকে দেখার চোখ বাস্তব জগতের চেয়ে অনেক বেশি। আবার সাইবার জগতের কোন কিছু লিখলে বা বললে চিরতরে মুছেও ফেলা যায়না, কোন না কোন তথ্য প্রমান থেকেই যায়। এই ধারনাটা পরিস্কার না থাকায় আমরা সাইবার জগতে এমন সব আচরন করে ফেলি যেটা আমরা বাস্তব জগতে করতে লাজ্জা বা ভয় পাই। আমরা জানি না সাইবার জগতে আমাদের সবাই দেখছে, আরও বেশি বেশি দেখছে এবং সব কিছুর লিখিত রেকর্ড থাকছে। এই গণসচেতনতা তৈরি সাইবার বুলিং মোকাবেলায় আমাদের প্রথম কাজ।

এসব সমস্যায় পড়লে সবচেয়ে আগে জানাতে হবে পরিবারকে । পরিবারে না জানিয়ে আগ বাড়িয়ে কোন কিছু করতে হলে হিতে বিপরীত হতে পারে, কারণ নিজের পরিবারের চেয়ে সঠিক পরামর্শ বা সদুপদেশ আর কেউই দিবে না । এক্ষেত্রে পরিবারের অভিভাবকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ন। সবার আগে হতে হবে সন্তানের বন্ধু । সাইবার বুলিং কী, অপরিচিত বা অনলাইন বন্ধুরা কেন অনিরাপদ এবং তাদের সাথে কেন ব্যক্তিগত কিছু শেয়ার করা যাবে না – এসব সন্তানদের বুঝিয়ে বলতে হবে । সম্ভব হলে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে সন্তানদের সাথে যুক্ত থাকতে হবে । সর্বোপরি সন্তানরা অনলাইনে কী করছে তার ওপর নজর রাখতে হবে । সন্তানকে আত্মবিশ্বাস দিতে হবে সন্তানরা খুব খারাপ কোন ভুল করলেও আপনিই তাকে সবচেয়ে আন্তরিকতা দিয়ে রক্ষা করবেন । বাইরের কেউ নয় । অনেকের পরিবারে জানাতে ভয় করলে বা সমস্যা হলে খুব কাছের কোন বন্ধুকে জানানো উচিত; যে তার পাশে থেকে এই লড়াইটা লড়তে পারবে ।

বিষয়টি কখনও পারিবারিক আওতা পেরিয়ে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে আইনি ব্যবস্থা নেয়া যায়। অনেকেই ভাবে এই লড়াইটা করাই সবচেয়ে কঠিন । পুলিশ, গোয়েন্দা, আদালত ছুটাছুটি ! কিন্তু কিছু ধাপ অনুসরণ করলে এই কঠিন কাজই খুব সহজ হয়ে যায় । প্রথম কাজ হচ্ছে জিডি করা। নিজের নাম, পিতা-মাতার নাম, ঠিকানা সব তথ্য সঠিকভাবে দিয়ে একটি আবেদন পত্র লিখে স্থানীয় থানায় যেতে হবে সাথে নিতে হবে সাইবার হ্যারাজের প্রমাণ । মানে যে মেসেজ, কমেন্ট, যে পেইজ আপনাকে হয়রান করেছে তার স্ক্রিনশটের প্রিন্টেড কপি । সেখানে ভিকটিমের বক্তব্যও থাকতে পারে , কিন্তু সেটাও স্ক্রিনশটে দেয়া উচিত, যাতে করে পুলিশ বক্তব্য ও ঘটনার স্বচ্ছতা বুঝতে পারে। জিডির কপিটি রিসিভ করিয়ে “ঢাকা মেট্রোপলিটন ওমেন সাপোর্ট ডিভিশন” এ যোগাযোগ করা যায়। বিটিআরসি থেকে এ ধরনের সমস্যা সমাধানে সাহায্য পাওয়া যায়। যাওয়া যেতে পারে ডিএমপির সাইবার ক্রাইম বিভাগে।

আমাদের দেশে এখন বুলিং বিষয়টি নতুন। এখন থেকে সমন্বিতভাবে প্রতিরোধ করলে বিষয়টি নিয়ন্ত্রনে থাকবে। অনেক সময় পরিবার , বন্ধুবান্ধব সবাই বলবে ‘ছেড়ে দে, দরকার নেই’। কিন্তু সচেতন নাগরিক হিসেবে আপনাকে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করা দরকার । মনে রাখবেন চুপ করে থাকলে সমস্যা কমবে না বরং বাড়বে । আজ আপনি প্রতিরোধ করলে আগামীতে আরেকজন অন্যায় করার আগে বহুবার ভাববে। সবার অনলাইন জীবন সুন্দর হোক।