Sufi Faruq Ibne Abubakar (সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর)

১৯৭১ সালের ১লা মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

পহেলা মার্চ হঠাৎ ঘোষণা হলো জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য বাতিল। তারপরই বাংলাদেশের মানুষের সামনে উচিয়ে ধরা হলো মিলিটারির বন্দুক। নিরস্ত্র মানুষ, মজুর, শ্রমিক এবং ছাত্র ভাইয়েরা এই ঘোষণার প্রতিবাদ জানিয়েছিল, নির্বিচারে গুলি চালানো হয়েছে তাদের উপর। গত সপ্তাহে যারা মারা গেছে তারা সব অমর শহীদ। গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার জন্য তারা প্রাণ দিয়েছে। এই শহীদদের ‘দুস্কৃতকারী’ আখ্যা দেওয়া চুড়ান্ত মিথ্যা। প্রকৃত দুস্কৃতকারী তারাই যারা বাংলাদেশের মানুষের উপর নিলর্জ্জ সন্ত্রাসের রাজত্ব চালাচ্ছে।
বড়ই দুঃখের কথা, গত সপ্তাহে যে নৃশংস কান্ড ঘটে গেল, তা নিজে যাচাই করে দেখার জন্য প্রেসিডেন্ট একবার ঢাকায় আসতে পারলেন না। উনি বলেছেন, এই নাকি ‘সামান্যতম’ অস্ত্রের ব্যবহার-তাতেই যদি হাজার হাজার মানুষ মরে, তাহলে ‘যথোপযুক্ত’ ব্যবহার মানে কি দেশশুদ্ধ সবাইকে খতম করা? বাংলাদেশে নিরস্ত্র মানুষের ওপর অস্ত্রশক্তির এই নগ্ন অত্যাচারের প্রচন্ড ধিক্কার জানাচ্ছি আমি।

জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বন্ধ
বলা হয়েছে যে জাতীয় পরিষদ স্থগিত রাখার হুকুম নাকি ‘ভুল বোঝাবুঝি’ হয়েছে। আমি প্রেসিডেন্টকে জিজ্ঞাসা করতে চাই, পরিষদের একটি সংখ্যালঘিষ্ট দলের প্ররোচনাতেই কি এই বাতিলের সিন্ধান্ত নেওয়া হয় নাই? সংখ্যাগরিষ্ঠ দল এবং পশ্চিম দিকের অনেকগুলি ছোট ছোট দলের সদস্যদের ঘোষিত নীতির বিরুদ্ধেই কি এটা করা হয় নাই?
আমরা চেয়েছিলাম ১৫ ফেব্রুয়ারীর অধিবেশন বসুক। কিন্তু ঐ বিশেষ সংখ্যালঘিষ্ঠ দলটি চেয়েছে মার্চের প্রথম সপ্তাহে। ওনাদের ইচ্ছেটাই প্রাধান্য পেল, ৩ মার্চ অধিবেশন ডাকা হলো। অথচ ওনারাই অধিবেশনে যোগ দিতে নারাজ হলেন। প্রথমে ওনারা অত্যন্ত আপত্তিকরভাবে জানালেন যে, ঐ দলের সদস্যরা ঢাকায় এলে বিপদে পড়বেন এবং তাদের নাকি ফন্দি করে বন্দি করে রাখা হবে। তারপর তারা বললেন, ঐ দল আসবেন। এ তো গেল। এরপর ভাব দেখালেন যে, ও দলের সকল সদস্য পদত্যাগ করবেন। পরেই আবার বললেন পদত্যাগ করবেন না। কিন্তু ওদের বাদ দিয়ে জাতীয় পরিষদ বসলে ওরা গণআন্দোলন করবেন। এমনও হুমকি দিলেন যে, পরিষদের অধিবেশনে যারা যোগ দেবে, জনতা তাদের উপর প্রতিশোধ নেবে আর জনতা যদি প্রতিশোধ না নেয়, তাহলে ঐ পার্টিও কর্মীরা তাদের খতম করবে।
এদিকে কিন্তু আমাদের সংসদীয় দল ঢাকায় এসে জমায়েত হয়েছে এবং পশ্চিম খন্ডের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিভিন্ন দলের সদস্যরা এসে পৌঁছেছেন। মূখ্য নির্বাচনী কমিশনারও এসে গেছেন এবং নারী সদস্যদের নির্বাচনের দিন নির্দিষ্ট হয়েছে ২ মার্চ। অধিবেশন উদ্বোধন করার জন্য প্রেসিডেন্টের ১ মার্চ পৌঁছে যাবার কথা। ২৪ ফেব্রুয়ারীর বিবৃতিতে আমরা সংবিধান রচনা সম্পর্কে আমাদের মতামত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছি। এমনকি আমরা একথাও আবার জানিয়ে দিয়েছি যে জাতীয় পরিষদের যে কোন সদস্য-পাকিস্তানের যে কোন অঞ্চলেরই হোক-এই ঐতিহাসিক দায়িত্বে মতামত দিয়ে আমাদের সহযোগিতা করুণ। ২৭ ফেব্রুয়ারী আমরা বলেছি যে, অধিবেশন শুরু হবার আগে কেউ যদি কোন একটি ব্যাপারেও যুক্তি সম্মত আপত্তি তোলেন, আমরা মেনে নেব। কিন্তু এ প্রস্তাবও যারা অগ্রাহ্য করলে, তাদের মনোভাবকে কি উদ্দেশ্যমূলক বলা যায় না?
১ লা মার্চ হঠাৎ রেডিও বিবৃতিতে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন মুলতবি রাখার কথা ঘোষণা করা হলো। এজন্য যুক্তি দেখানো হলো কি না, বোঝাবোঝির জন্য আরও সময় দরকার। এ কথাও বলা হলো যে পূর্ব পশ্চিম পাকিস্তানের নেতাদের মধ্যে রাজনৈতিক বৈষম্য দেখা দিয়েছে। এতে বাংলাদেশের লোক কি একথা মনে করতে পারে না যে, একটি সংখ্যালঘু দলের প্ররোচনায় একটি গণতান্ত্রিক অধিকারে নির্লজ্জের মতো হস্তক্ষেপ করা হয়েছে? এই সঙ্গে সঙ্গে সামরিক বাহিনীর তৎপরতার ফলে এই ধারণা আরো দৃঢ় হয়। এতেই বোঝা যায়, ওদিককার সংখ্যালঘু দলের কথা মতন না চললে এদিককার সংখ্যাগরিষ্ট দলকে রাজনৈতিক সংঘর্ষের বদলে সামরিক সংঘর্ষের মুখোমুখি হতে হবে।

বাঙ্গালীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র
২৪ ফেব্রুয়ারীর বিবৃতিতে আমরা সাবধান করে দিয়েছিলাম যে, দেশে যখনই গণতান্ত্রিক হস্তান্তরের সম্ভাবনা দেখা যায়, তখনই ষড়যন্ত্রকারীরা তা বানচাল করে দেবার জন্য উঠে পরে লাগে। পশ্চিমের শ্রেণী স্বার্থের ধ্বজ্জাধারীরা সংখ্যায় ক্ষুদ্রের চেয়ে ক্ষুদ্র হয়েও বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারকে ধ্বংস করে দেয়। পশ্চিমের সাধারণ মানুষের অধিকারও তারা দমন করে রাখে। পশ্চিমের সাধারণ মানুষের অধিকারও তারা দমন করে রাখে। ১৯৫৩ সালে পাঞ্জাবী শাসকগোষ্ঠির ষড়যন্ত্রে বাঙ্গালী প্রধানমন্ত্রীকে হঠে যেতে হয়। ১৯৫৪ সালে ঐ ষড়যন্ত্রকারীরাই বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকার ভেঙ্গে দেয়। ১৯৫৯ সালে যখন সাধারণ নির্বাচনের কথা হয়েছিল, তখনও পাঞ্জাবের স্বার্থ সম্পন্ন লোভীগোষ্ঠী ক্ষমতা দখল করে রাখে। আজো তারা সেই খেলা খেলছে।
একটা সোজা কথা জানিয়ে দিতে চাই, রাজনৈতিক দলের সম্মেলন আমি কখনোই চাইনি। আমি শুধু প্রেসিডেন্টকে জানিয়ে দিয়েছিলাম, বাংলাদেশে যে বিভৎস হত্যাকান্ড চলছে, তিনি নিজে এসে সেটা দেখে যান। আমাদের এখানকার কার্যসূচী বন্ধ রেখে রাওয়াল পিন্ডিতে গিয়ে মিটিং করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। তাছাড়া একথাও মনে করিয়ে দিয়েছিলাম যে, সংবিধান সংক্রান্ত যে কোন আলোচনা সংসদেই করতে হবে, তার আগে গোপন আলোচনার কোন মানে হয় না।
এত কথা বলতে হলো শুধু এই অভিযোগ খন্ডন করার জন্য যে, আওয়ামী লীগ কখনোই ক্ষমতা হস্তান্তরে বাঁধা সৃষ্টি করেনি। তাছাড়া যে দল সম্পূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠ-তার পক্ষে এ রকম বাঁধা সৃষ্টি করে কি কোন লাভ হয়? দেশের জনসাধারণ এবং সারা পৃথিবী আজ স্পষ্টই জেনে গেছে যে পশ্চিমের একটি মাত্র সংখ্যালঘু দল অনবরত বাঁধা সৃষ্টি করে যাচ্ছে। একথাও বোঝা যাচ্ছে যে প্রেসিডেন্ট ঐ সংখ্যালঘু দলের কাছে নথি স্বীকার করতেই তাঁর নৈতিক দায়িত্ব অনুভব করলেন।
যে কোন সুবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষই আজ একটা কথা প্রশ্ন তুলতে পারে ঃ দেশের নিরস্ত্র জনসাধারণকে খুন করে সামরিক বাহিনী কি দেশের অখন্ডতা, সমভাতৃত্ব এবং নিরাপত্তা অক্ষুন্ন রাখছে? না কি, তারাই এভাবে দেশের বিচ্ছিন্নতা ব্যাপারে প্রধান কারণ হয়ে দাড়াচ্ছে।

নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ক্ষমতা
নির্বাচন হয়ে যাবার পর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের থেকে বেশী আইনগত অধিকার আর কারুর নাই? কোন ব্যক্তি বিশেষই নির্বাচিত প্রতিনিধিদের চেয়ে বেশী ক্ষমতা দাবী করতে পারে না।

বাংলাদেশের মানুষের অবিসংবাদী প্রতিনিধি হিসেবে আমরা জোরের সঙ্গে বলতে চাই যে আমরাই বাংলাদেশ চালানোর ব্যাপারে একমাত্র আইন সঙ্গত ক্ষমতাবান। বস্তুত, সংখ্যাগরিষ্ঠতার বলে গোটা দেশেরই ক্ষমতার অধিকারী আমরা। গত সাত দিনের ঘটনার বুঝা যাচ্ছে যে, বাংলাদেশে সরকারের সমস্ত শাখা আমাদের আইন সঙ্গত পরিচালক হিসাবে গ্রহণ করেছে এবং আমাদের সব নির্দেশ দিয়েছে।

আজ প্রেসিডেন্ট এবং ইসলামাবাদ সরকারের এই চরম সত্য বোঝা উচিৎ। বাংলাদেশের জনসাধারণ রায় দিয়েছে যে, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ক্ষমতার ব্যাপাওে কারুর বাঁধা সৃষ্টি করা আর সহ্য হবে না।

এরপর প্রস্তাব এসেছে ২৫ মার্চ অধিবেশন বসবার। আমরা বার বার বলেছি অধিবেশন যথাসম্ভব আগে শুরু করতে। আজ দেশের অবস্থা অস্বাভাবিক ও সাংঘাতিক। দেশে ত্রাশের রাজত্ব চালাবার চেষ্টা হচ্ছে। হাজার হাজার মানুষ নিহত হওয়ার খবর আসছে, সব দিক থেকে ধ্বনি হচ্ছে গণহত্যা বন্ধ করতেই হবে। পশ্চিম পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ এবং পৃথিবীর শুভবুদ্ধি সম্পন্ন সব মানুষেরই এই দাবি।

জাতীয় পরিষদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা কি ত্রাসের রাজত্বের কাছে নতি স্বীকার করবেন? যতদিন সংঘর্ষ চলবে, যতদিন পশ্চিমাঞ্চল থেকে দলে দলে সেনাবাহিনী ও অস্ত্র আনানো হবে, যতদিন দমননীতি অব্যাহত থাকবে, যতদিন বাংলাদেশের উপর গুলি চালানোর খবর আসবে-ততদিন বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেবার কথা ভাববে না। তারা কি বন্দুকের মুখে গণতান্ত্রিক অধিকার নিতে যাবে?

আওয়ামী লীগের প্রস্তাব
প্রেসিডেন্ট যদি সত্যই চান যে, জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসুক, তাহলে এই কয়টি ব্যবস্থা তাঁকে অবিলম্বে গ্রহণ করতে হবে:
সমস্ত সামরিক বাহিনীকে এক্ষুণি ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে ব্যারাকে।
১. নাগরিকদের উপর গুলি চালনা বন্ধ করতে হবে। আর একটি গুলির আওয়াজও শোনা যাবে না।
২. সরকারী কাজে সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপ চলবে না। কোন সরকারী কর্মচারির উপর প্রতিশোধ-মূলক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না।
৩. আইন পরিচালনার ভার নিবে পুলিশ আর পূর্ব পাকিস্তানরাইফেলস্ বাহিনী। দরকার হলে আওয়ামী লীগের স্বেচ্ছা-সেবকরা তাদের সাহায্য করবে।
৪. মার্শাল কানুন অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে।
৫. নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে অবিলম্বে ক্ষমতা দিতে হবে। যদি সামরিক অত্যাচার চলে, আমাদের নিরস্ত্র মানুষ মারা যায়-তাহলে জাতীয় পরিষদ যে কার্যকর হবে না, সে সম্পর্কে কোন সন্দেহ রাখার দরকার নেই।

সংগ্রাম শুরু হয়েছে
আমাদের দেশের মানুষ পৃথিবীকে জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা আর শোষিত কলোনি হয়ে থাকবে না। তারা স্বাধীন দেশের স্বাধীন মানুষ হতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। আমাদের অর্থনীতিকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে হবে। আমাদের পরিশ্রমী মানুষদের বাঁচাতে হবে দারিদ্র, রোগ এবং বেকারত্ব থেকে। সাইক্লোন বিধ্বস্ত এলাকায় লক্ষ লক্ষ মানুষ এখনো পুর্নবসতি পায়নি। ক্ষমতাশীল চক্র যদি এগুলো বানচাল করতে চায়, তাহলে আমাদের জনসাধারণ দীর্ঘস্থায়ী মুক্তির লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত। আমরা এই সংগ্রামের নেতৃত্ব দেবার জন্য প্রতিশ্রুতিবন্ধ এবং মুক্তি আমরা আনবোই। শত শত শহীদের রক্ত আমরা ব্যর্থ হতে দেব না।
আমাদের সংগ্রামের প্রথম পর্ব শুরু হয়ে গেছে এদেশের নির্ভিক মানুষ অসাধারণ সাহস ও আত্ম প্রত্যয়ের পরিচয় দিয়েছে। বুলেটকে তারা অগ্রাহ্য করেছে, কারফিউ অস্বীকার করেছে সংঘবন্ধভাবে। অভিসন্ধি নিয়ে যেসব কুৎসিত সমাজ বিরোধী লুটেরা বাঙ্গালী-প্রবাঙ্গালী কিংবা বিভিন্ন ধর্র্মীয় ব্যাক্তিদের মধ্যে বিভেদ জাগাতে চেয়েছিল-জনসাধারণ এবং আওয়ামী লীগের সেচ্ছাসেবকরা তাদের চক্রান্ত ব্যর্থ করে দিয়েছে। তাদের অভিনন্দন জানাই। আবার আমি সবাইকে মনে করিয়ে দিতে চাই, বাংলাদেশে যারা আছে তারা সবাই বাঙ্গালী-তাদের জীবন সম্পত্তি এবং সম্মান আমরা রক্ষা করবই। আমরা গর্বের সঙ্গে বলতে পারি আমাদের স্বেচ্ছাসেবকরা কাজে নামবার পর সে রকম কোন অবাঞ্চিত ঘটনা ঘটেনি।
আমাদের এ সংগ্রাম চলবেই।
সংগ্রহ-মুজিবুরের রচনা সংগ্রহ



আপনার মন্তব্য দিন