Sufi Faruq Ibne Abubakar (সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর)

হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের পরিবেশনা গান খেকো

একটি রাগ শুধুমাত্র আকার (আ, ই, উ শব্দ করে) বা সারগম দিয়ে (সা-নি) গেয়ে বা বাজিয়ে পরিবেশন করা যায়। রাগের অবয়ব পুরো প্রতিষ্ঠা করা যায়। একসময় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মূল রীতিটা এরকমই ছিল। তবে যুগে যুগে পরিবেশন আরও আকর্ষণীয় করার জন্য সঙ্গীতকে বিভিন্ন প্রকারে অলঙ্কৃত করা হয়েছে। পণ্ডিত-ওস্তাদরা বিভিন্ন ধরনের গায়ন/বাদনরীতি (ধ্রুপদ, খেয়াল) উদ্ভাবন করেছেন। বিভিন্ন অঞ্চলের লোকসঙ্গীতের গায়কী থেকেও এসেছে গায়কীর বিভিন্ন অঙ্গ। বড় শিল্পীদের গায়কী/গতকারির স্বতন্ত্রতা নিয়ে তৈরি হয়েছে বিভিন্ন ঘরানা বা স্কুল। বিভিন্ন ঘরানা বিভিন্ন গায়নরীতিতে বিভিন্ন রাগে তৈরি হয়েছে সুন্দর সব বন্দিশ। তাই রাগের পাশাপাশি উপভোগ করার আছে গায়নশৈলীর ভিন্নতা। এজন্য একই রাগ ভিন্ন রীতিতে ভিন্ন অঙ্গে ভিন্ন ঘরানার গায়কের কাছে শুনে ভিন্নরকম অনুভূতি পাবেন। হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের কণ্ঠের প্রতিষ্ঠিত দুটি ধারা: ধ্রুপদ ও খেয়াল। উপশাস্ত্রীয় ধারাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ধারা ঠুমরি। এছাড়া যন্ত্রসঙ্গীত তো রয়েছেই।

 

প্রথমে আলাপ করা যাক বৈঠকি পরিবেশন নিয়ে:

আগে আলোচনা করা হয়েছে রেকর্ডিং সঙ্গীত শোনার বিষয়ে। কিন্তু ভারতিয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শোনার রীতি মুলত বৈঠকি আসরে। আল্টিমেট মজা পাবার জন্য বৈঠকি আসরের বিকল্প নেই। বৈঠকি পরিবেশনা কিছু রীতি-নীতির মধ্যে থেকে করা হয়। পরিবেশনা মজা নিতে হলে সেই নিয়মগুলো বোঝা দরকার।

সঙ্গীতের ধরন অনুযায়ী পরিবেশনের নিয়ম কানুনে ভিন্নতা আছে। সব জনরার সঙ্গীত একই ক্রমে গাওয়া/বাজানো হয় না। পাশাপাশি কন্ঠে সঙ্গীত এবং যন্ত্রসঙ্গীতের উপস্থাপনের মধ্যে কিছু পার্থক্য আছে।

এই নোটে সংক্ষিপ্ত পরিসরে আমরা কন্ঠসঙ্গীতে খেয়াল এবং একটি যন্ত্রসঙ্গীতের বৈঠকি পরিবেশন নিয়ে আলাপ করবো।

বৈঠকের নিয়ম:

সব ধরনের ভারতিয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত পরিবেশন করা হয় বৈঠকি স্টাইলে। পরিবেশন মূলত একক (solo) হয়। মানে প্রধান একজন গায়ক/বাদককে কেন্দ্র করে সব আয়োজন। তিনি কণ্ঠ দিয়ে বা তার বাদ্যযন্ত্র দিয়ে সুরের নেতৃত্ব দেন, বাঁকিরা সহায়তা করেন। যুগলবন্দীর ক্ষেত্রে গায়ক/বাদক একাধিক হতে পারে। যুগলবন্দীর শিল্পীরা আগে থেকে নিজেদের মধ্যে একটা বোঝাপড়া করে নেন। ইম্প্রোভাইজ করলেও, ওই বোঝাপড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেন।

প্রধান শিল্পিকে একটানা টোনিক সাপোর্ট দেবার জন্য সাথে ১/২ জন তানপুরা বাদক থাকেন (এরা সচরাচর প্রধান শিল্পীর শিষ্য হন)। একজন তালবাদ্য বাদক থাকেন, যিনি তবলা বা পাখোয়াজ নিয়ে তাল-ঠেকা ধরে রাখেন। যন্ত্রসঙ্গীত শিল্পীর আর কিছু লাগে না।

কণ্ঠশিল্পীর হাত সচরাচর খালি থাকে। কখনও তার হাতে সুরমন্ডল বা তানপুরা থাকতে পারে। কণ্ঠশিল্পীকে সুরের আবহাওয়া ধরে রাখার সহায়তা করার জন্য, একজন সারেঙ্গী বাদক থাকেন বা হারমোনিয়াম বাদক থাকেন। সারেঙ্গী বা হারমোনিয়াম বাদক গায়ককে অনুসরণ করে, গায়কের সুরের আবেশ তার যন্ত্রে ধরে রাখেন।

প্রধান শিল্পী বসেন মাঝখানে, সবার সামনে। শিল্পীর পিছনে তানপুরা বাদকরা থাকেন। ডানপাশে থাকে তবলা, বামে সারেঙ্গী/হারমনিয়াম। যুগলবন্দী হলে প্রধান দুজন শিল্পী পাশাপাশি বসেন। অনেক সময় জ্যৈষ্ঠতা অনুসারে শিল্পী সামনে পিছনে বসেতে পারে।

আগে এ ধরনের অনুষ্ঠান হতো ঘরোয়া মহফিল হিসেবে। যেখানে শিল্পী এবং শ্রোতা একই উচ্চতায় মেঝেতে বসতো। তাদের মধ্যে ভাব বিনিময় হতো। আজকাল বেশি শ্রোতাকে একবারে গান শোনানোর জন্য সাউন্ড সিস্টেম ব্যাবহারের প্রয়োজন হয়। শিল্পিকে সবাই যেন দেখতে পারে সেজন্য স্টেজ বানানো হয়।

 

বৈঠকি ধ্রুপদ পরিবেশন: ধ্রুপদ

 

খেয়াল পরিবেশনের বিস্তারিত পাওয়া যাবে – খেয়াল – লিঙ্কে

 

যন্ত্র সঙ্গীত পরিবেশন (Performance of Instrumental Music): যন্ত্র সঙ্গীত পরিবেশন – লিঙ্কে

 

নোট:

আমি যে ধারাবাহিকতায় বর্ননা করেছি, সেটা প্রত্যেকে ঘরানা বা শিল্পির জন্য প্রযোয্য নাও হতে পারে। এমনকি শিল্পি স্থান, কাল পাত্র ভেদে পারফরমেন্স এর ধারাবাহিকতায় পরিবর্তন করতেও পারেন। কখনও একটি অংশকে দু ধরনের টেম্পোতে ভাগ করে নিতে পারেন। তবে পারফরমেন্স সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারনা তৈরি হলে সেটা বুঝতে খুব একটা কষ্ট হবে না।

 

এবার কিছু বিশেষ অঙ্গ নিয়ে আলাপ করা যাক:

 

আলাপ (Alap) :

খেয়াল পরিবেশন শুরু হয় “আলাপ” দিয়ে। এটা খেয়াল বা ধ্রুপদ পরিবেশনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আলাপ শুরু হয় খুব ধীর গতিতে “অতি বিলম্বিত” বা “বিলম্বিত লয়ে” (সময় কম থাকলে মধ্যলয়েও শুরু হতে পারে)। তালবাদ্য সহায়তা ছাড়া, আকার বা অর্থহীন শব্দ (নোম, তোম) দিয়ে আলাপ করা হয়। সচরাচর ষড়জ (টনিক স্বর) থেকে আলাপ শুরু হয় (কখনও বাদী স্বর থেকেও আলাপ শুরু হতে পারে)। এরপর শিল্পি প্রথমে নিচের দিকের সপ্তকে গিয়ে, সেখানের এই রাগের নোটগুলো শোনান। তারপরে উপরের দিকের সপ্তকের নোটগুলোকে দেখিয়ে, আবার সড়জে ফেরেন।

এখানে শিল্পী ধীরে রাগটির পরিচয় করান। নোটগুলো ধরে ধরে শ্রোতাদের দেখান। গুরুত্বপুর্ন স্বরগুলোকে (বাদী-সমবাদী) স্বরদের প্রতিষ্ঠিত করেন। একে একে রাগের সুন্দর মিউজিক্যাল ফ্রেইজগুলোর ভাঁজ খোলেন। যেন একটা ক্যানভাসে শিল্পী এক এক টান দিয়ে ক্রমশ পোট্রেইটের মুল অবয়ব তৈরি করতে থাকেন।

পারফরমেন্সের এই অংশটি সবচেয়ে চ্যালেন্জিং। শিল্পীর রাগ বোঝার গভীরতা এবং উপস্থাপনের দক্ষতার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা হয় আলাপে। যে শিল্পী যত দক্ষ, তিনি তত সুন্দর করে আলাপের মাধ্যমে রাগের মূলভাব প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেন। শ্রোতার মনে রাগের ছায়া তৈরি হয়ে যায়। তবে নতুন শ্রোতাদের এই বিভাগটি খুব ভাল নাও লাগতে পারে। রাগটা যত ধরতে থাকবে, এই অংশের মজা তত বাড়বে।

আজ এই তাড়াহুড়োর শ্রোতে আলাপের প্রচলন ক্রমশ কমে আসছে। খেয়ালিয়ারাও দ্রুত আলাপ শেষ করে বান্দিশ/গাত এ ঢুকে পড়েন। এখন খুব বিস্তারিত আলাপের প্রচলণ মুলত ধ্রপদিয়ারাই ধরে রাখছেন।

আলাপ-গান সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানার জন্য এই সিরিজের “সঙ্গীতের ধারা (Genre)” বিভাগের “আলাপ-গান” আর্টিকেলটি দেখতে পারেন।

 

বান্দিশ (Bandish):

আলাপের পরেই আসে বান্দিশ। বান্দিশকে চিজ (Cheez) বা গাত (Gaat) ও বলা হয়। কণ্ঠ সঙ্গীতের ক্ষেত্রে বলে বান্দিশ, যন্দ্রসঙ্গীতের ক্ষেত্রে বলে চিজ বা গাত। এ অংশ পারফরমেন্সের যেকোন সময় গাইতে/বাজাতে পারে। তবে শেষ তান করার আগে বান্দিশ শেষ করতে হয়।

বান্দিশ/চিজ/গাত মানে কম্পোজড্ কম্পোজিশন। একটি নিদ্রিষ্ট রাগের আধারে, নিদ্রিষ্ট তালের উপরে নিবন্ধিত। সুর, তাল নিদ্রিষ্ট হবার কারনে, ইমপ্রোভাইজেশনের সুযোগ খুব সামান্য। আমাদের সবার কান কম্পোজড কম্পোজিশনে অভ্যস্ত হওয়ায়, সঙ্গীতের এই অংশতে কমিউজিকেট করা সবচেয়ে সহজ হয়। তাই সব ধরনের শ্রোতা, সবচেয়ে আগে বান্দিশ অংশটি উপভোগ করতে পারেন।

বান্দিশ খেয়ালের সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ন অংশও বটে। খেয়ালের বান্দিশ দু অংশে বিভক্ত – “স্থায়ী” এবং “অন্তরা”। এছাড়া ধ্রপদের বান্দিশে “সন্চরি” এবং “আভোগী” নামে আরও দুটি অংশ থাকে।

বিভিন্ন ঘরানার কিছু সিগনেচার পুরানো বন্দিশ রয়েছে। এর বাইরে এখনো বিভিন্ন গুনি গায়ক নতুন বান্দিশ কম্পোজ করে গেছেন। তবে এখনও পুরোনো বান্দিশগুলোই বেশি জনপ্রিয়।

 

তান (Taan):

পারফরমেন্সের শেষে সচরাচর তান করেন শিল্পী। এই অংশে শিল্পী রাগের নোটগুলোর উপর দিয়ে বিভিন্ন ছন্দে খুব দ্রুত আসা যাওয়া করেন। তানের মাধ্যমে একটু জমিয়ে পারফর্মেন্স শেষ করা হয়।

তানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য তানগুলো হলো : বোল তান, সাপাঠ বা শুদ্ধ তান, কুট তান, মিশ্র তান, গমক তান। এছাড়া বিভিন্ন ঘরানায় তৈরি বিভিন্ন ধরনের তানও প্রচলিত ছিল (যেমন : পাল্টা তান, হলক তান, জটকা তান, গীতকারি তান, ইত্যাদি)।

বোলতান গাওয়া হয় বান্দিশের শব্দগুলো থেকে শব্দ বেছে নিয়ে। সাপাট তানের গতিপথ সরল (দুটি বা তিনিটি সপ্তকের রাগের আরোহ আবরোহের স্বরগুলো বেছে নিয়ে সোজা যাওয়া আসা করে সাপাট তান করা হয়)। কুটতানের গতিপথের এরকম কোন চরিত্র নেই।

এই অংশে দেখা যায় শিল্পির তৈয়ারি। রাগের বেঝাপড়ার চেয়ে বেশি প্রমান হয়, শিল্পির গলার উপরে নিয়ন্ত্রনের মাত্র। কিছু শ্রোতা তান শুনতে খুব পছন্দ করেন। হালকা মেজাজের পারফরমেন্সে তানগুলো ভাল চলে। খুব গরুমম্ভীর পারফর্মেন্স বাড়তি তানের কারনে নষ্ট হতে পারে।



আপনার মন্তব্য দিন