Sufi Faruq Ibne Abubakar (সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর)

ইসলাম, বর্ণবাদ (কাস্ট-সিস্টেম), স্বাধীনতা সংগ্রাম ও আমাদের বাংলাদেশ নোট

আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের অনেকগুলো বড় অর্জনের একটি হল বাংলাদেশের মুসলিমদের মধ্যে বর্ণবাদ (কাস্ট সিস্টেমের) অবসান।
অবাক হচ্ছেন? আমাদের মুসলিমদের মধ্যে আবার বর্ণবাদ কি? উঁচু-নিচু জাত কি? এটা তো শুধুমাত্র হিন্দুদের সমস্যা।

না এটা শুধুমাত্র হিন্দুদের সমস্যা না। আমাদের মধ্যেও একই সমস্যা আছে।
আরবে কোরাইশ আর নন-কোরাইশ সমমর্যাদার নন। আরব আর নন-আরব সমমর্যাদার নন। আর ভারতীয় মুসলিমদের মধ্যে “আশরাফ” “আত্রাফ” “আরজাল” ছাড়াও ১৫০+ কাস্ট আছে।
ভারতে সেটা কাস্ট হিসেবেই চলছে। পাকিস্তানে সেই প্র্যাকটিসটা আছে “রক্ত-বংশপরিচয়-জাতিগোষ্ঠী” দিয়ে। বিশ্বাস না হলে ভারত-পাকিস্তানের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের সাথে মিশে দেখুন। এখনও সমাজ-সামাজিকতা, পারিবারিক বিয়েতে সেটা স্পষ্ট।

পাকিস্তান হবার পরে আমদের ইসলামিক রাষ্ট্রের প্রথম মোহভঙ্গ হয়েছিল বর্ণবাদের কারণেই। পাকিস্তান গঠন হবার পর থেকে যত দিন যাচ্ছিল, ততই তথাকথিত আশরাফ মুসলমানদের জন্য রিজার্ভ রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা, লাইসেন্স, পারমিট স্পষ্ট হচ্ছিল। “আশরাফ” মুহাজির হলেও তার গুরুত্ব আমাদের মতো “আত্রাফ” ভূমিপুত্রদের চেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছিল। যে ধর্মের সমতা আর ন্যায্যতার লোভ দেখিয়ে পাকিস্তানে ডাকা হয়েছিল, সেই ধর্মের দোহাই দিয়েই হচ্ছিল বৈষম্য আর শোষণ। ইসলামিক এস্টেট পাকিস্তান মানে দেখা গেল মূলত “আশরাফ” মুসলিমের দ্বারা “আত্রাফ” মুসলিমদের শোষণ। সেটা টিকিয়ে রাখতো মোল্লা আর আর্মি। এই ঘটনা বোঝার পর থেকেই বাঙ্গালি সেকুলার রাষ্ট্রবাদের দিকে গেছে, তারা বুঝতে পেরেছে রাষ্ট্রের সাথে ধর্মের সংযোগ থাকলে ধর্মের নামে শোষণ চলবেই। তাই আমাদের সেকুলার রাষ্ট্রবাদের মুল কারণ মুসলমানদের থেকে হিন্দুদের রক্ষা করা না, বরং তথাকথিত অভিজাত মুসলিমদের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা।

স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে মূলত “আত্রাফ” বাঙ্গালি মুসলিমদের উত্থান হয়েছে। বাঙ্গালির মনোজগতে সেই পরিবর্তন সবচেয়ে ভালো বুঝেছিল আওয়ামীলীগ। তারা সেই পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে “আওয়ামী মুসলিম লীগ” থেকে “আওয়ামীলীগ” হয়েছে। সেই চেতনাকে ধারন করে আওয়ামীলীগ আত্রাফ মুসলিম বাঙ্গালির রাজনৈতিক ব্যনার হয়েছে। স্বাধীনতা সংগ্রামে যেসব “আশরাফ” মুসলিম আমাদের সাথে ছিলেন, তারা তথাকথিত শ্রেনীমর্যদা ত্যাগ করেই এসেছিলেন। ছয় দফার সময় আসতে আসতে বাঙ্গালির মনোজগৎ থেকে বর্ণবাদ বিতাড়িত হয়ে গিয়েছিল (ফখা চৌধুরীর মতো কিছু অতি আশরাফ ছাড়া)। বাঙ্গালি আত্মপরিচয়ে গর্বিত হয়েছিল, কনফিডেন্স ফিরে পেয়েছিল।

স্বাধীনতা সংগ্রামের ফলেই আজ ভারত-বাংলাদেশে-পাকিস্তানের মধ্যে তথাকথিত ছোট জাত থেকে কনভার্টেড (আমরা প্রায় সবাই) মুসলিমগন বাংলাদেশেই সবচেয়ে ভালো আছে, সবচেয়ে বেশি সমতা ও ন্যায্যতার সুবিধা ভোগ করছে। ইসলামের মুল স্পিরিট যদি সমতা আর ন্যায্যতা হয়, তবে বাংলাদেশ এখন এই তিনটি রাষ্ট্রের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ইসলামিক রাষ্ট্র।

সুতরাং হিন্দুদের কাস্ট সিস্টেম নিয়ে হাসাহাসির কিছু নাই। ওই ময়লা একসময় আমাদের গায়েও ছিল। সেই সাথে আসুন ভুলে না যাই যে সেখান থেকে আমাদের উত্তরণ হয়েছে কিভাবে, কোন পথে।