Sufi Faruq Ibne Abubakar (সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর)

কান পেতে রই … আর্টিকেল ওপিনিয়ন, গান খেকো

ভারতভূমির সঙ্গীতে দারুণ একটা বিষয় আছে। এখানে একই সাথে স্বতন্ত্র দুটি সম্পূর্ণ সঙ্গীরধারা পাশাপাশি প্রতিষ্ঠিত এবং বহমান। নেপাল থেকে শুরু করে বাংলাদেশ, পুরো উত্তর ভারত, পাকিস্তান হয়ে আফগানিস্তান পর্যন্ত উত্তর ভারতীয় ধারা, যাকে বলে হিন্দুস্থানি সঙ্গীত। আর বিন্ধ্য পর্বতের ওপারে দক্ষিণ ভারত। সেখানে চলে কর্নাটকি। বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের নভেম্বরের নিয়মিত আয়োজনে উত্তর-ভারতীয় সঙ্গীতের পাশাপাশি দক্ষিণ ভারতীয় সঙ্গীত বা কর্ণাটক সঙ্গীতেরও আয়োজন ছিল, এবারও থাকছে।

দক্ষিণ ভারতীয় সঙ্গীতে আমার জ্ঞানগম্যি সীমিত বলেই এ লেখাটি হিন্দুস্তানি সঙ্গীতের যাত্রাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে। আমি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের একজন শিক্ষানবিশ শ্রোতা। তাও আবার একেবারে শুরুর দিকের। কান-মন-জ্ঞান এখনও এত চোস্ত হয়ে ওঠেনি, যা দিয়ে ছাপার যোগ্য লেখা তৈরি সম্ভব। তাই আমার এই “চেষ্টা”র আগে আপনাদের যদি “অপ” শব্দটি জুড়ে দিতে ইচ্ছে হয়, তবে নিশ্চিন্তে সেটা দেবেন। সাফ জানিয়ে দিচ্ছি – আমি সুরের ভুবনের নান্দনিকতা দিয়ে গানের ব্যাকরণ উপস্থাপন করতে বসিনি। তারচেয়ে বরং সোজা সিঁড়ি বেয়ে হাঁচড়ে-পাঁচড়ে সুরলোকের আসরে যাবার রাস্তা পর্যন্ত পৌঁছানোর অভিজ্ঞতাটা বলে যাবার একটা চেষ্টা করছি মাত্র।

এক কথায় বললে, হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শোনা মানে একটি “রাগ” শোনা। হতে পরে কণ্ঠে বা যন্ত্রে। সেই রাগের ওপরে বিভিন্ন ধরনের রীতির, বিভিন্ন ধরনের গায়কী/গতকারিতে শোনা এবং তার রসাস্বাদন। ব্যস!

রাগই আমাদের হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ভিত্তি এবং মুল শোভা। রাগ মানে নির্দিষ্ট কিছু স্বরকে নিয়ে নির্দিষ্ট নিয়ম-কানুনের মধ্যে থেকে,বুননের মাধ্যমে গড়ে তোলা একটি সুরযাত্রা। নিয়ম-কানুন ঠিক রেখে সেটা যতো খুশি ইমপ্রোভাইজ করা যায়, মানে আরও মিহি করে বোনা যায়। রাগের স্বর ও নিয়ম-কানুন নির্দিষ্ট হবার কারণে ওই রাগ যখনই গাওয়া/বাজানো হয়, তখনই এক ধরনের নির্দিষ্ট পরিবেশ এবং ভাবের সৃষ্টি হয়। এখানেই হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের জাদু। যদি আপনি মেঘ মালহার (মল্লার) রাগ শুনতে অভ্যস্ত হন, যেকোনো ঋতুতে আপনি কোনো বদ্ধ জায়গায় চোখ বন্ধ করে ১৫/২০ মিনিট গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনলে বৃষ্টি অনুভব করবেন।

একটি রাগ শুধুমাত্র আকার (আ, ই, উ শব্দ করে) বা সারগম দিয়ে (সা-নি) গেয়ে বা বাজিয়ে পরিবেশন করা যায়। রাগের অবয়ব পুরো প্রতিষ্ঠা করা যায়। একসময় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মূল রীতিটা এরকমই ছিল। তবে যুগে যুগে পরিবেশন আরও আকর্ষণীয় করার জন্য সঙ্গীতকে বিভিন্ন প্রকারে অলঙ্কৃত করা হয়েছে। পণ্ডিত-ওস্তাদরা বিভিন্ন ধরনের গায়ন/বাদনরীতি (ধ্রুপদ, খেয়াল) উদ্ভাবন করেছেন। বিভিন্ন অঞ্চলের লোকসঙ্গীতের গায়কী থেকেও এসেছে গায়কীর বিভিন্ন অঙ্গ। বড় শিল্পীদের গায়কী/গতকারির স্বতন্ত্রতা নিয়ে তৈরি হয়েছে বিভিন্ন ঘরানা বা স্কুল। বিভিন্ন ঘরানা বিভিন্ন গায়নরীতিতে বিভিন্ন রাগে তৈরি হয়েছে সুন্দর সব বন্দিশ। তাই রাগের পাশাপাশি উপভোগ করার আছে গায়নশৈলীর ভিন্নতা। এজন্য একই রাগ ভিন্ন রীতিতে ভিন্ন অঙ্গে ভিন্ন ঘরানার গায়কের কাছে শুনে ভিন্নরকম অনুভূতি পাবেন। হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের কণ্ঠের প্রতিষ্ঠিত দুটি ধারা: ধ্রুপদ ও খেয়াল। উপশাস্ত্রীয় ধারাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ধারা ঠুমরি। এছাড়া যন্ত্রসঙ্গীত তো রয়েছেই।

এই সব ধরনের সঙ্গীত পরিবেশন করা হয় বৈঠকী চালে। পরিবেশন মূলত একক (solo) হয়। মানে প্রধান একজন গায়ক/বাদককে কেন্দ্র করে সব আয়োজন। তিনি কণ্ঠ দিয়ে বা বাদ্যযন্ত্র দিয়ে সুরের নেতৃত্ব দেন, বাকিরা সঙ্গত ও সহায়তা করেন। যুগলবন্দীর ক্ষেত্রে গায়ক/বাদক একাধিক হতে পারে। যুগলবন্দীর শিল্পীরা আগে থেকে নিজেদের মধ্যে একটা বোঝাপড়া করে নেন। ইম্প্রোভাইজ করলেও ওই বোঝাপড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেন। প্রধান শিল্পীকে একটানা টোনিক সাপোর্ট দেবার জন্য সাথে ১/২ জন তানপুরাবাদক থাকেন (এঁরা সচরাচর প্রধান শিল্পীর শিষ্য হন)। একজন তালবাদ্য বাদক থাকেন, যিনি তবলা বা পাখোয়াজ নিয়ে তাল বা ঠেকা ধরে রাখেন। কণ্ঠশিল্পীর হাত সচরাচর খালি থাকে। কখনও তাঁর হাতে সুরমণ্ডল বা তানপুরা থাকতে পারে। কণ্ঠশিল্পীকে সুরের আবহ ধরে রাখার সহায়তা করার জন্য আগের যুগে একজন সারেঙ্গীবাদক থাকতেন, যে কাজটা এখন হারমোনিয়াম দিয়ে করা হয়ে থাকে। সারেঙ্গী বা হারমোনিয়ামবাদক গায়ককে অনুসরণ করে গায়কের সুরের আবেশ তাঁর যন্ত্রে ধরে রাখেন। প্রধান শিল্পী বসেন মাঝখানে, সবার সামনে। শিল্পীর পিছনে তানপুরাবাদকরা থাকেন। ডানপাশে থাকে তবলা, বামে সারেঙ্গী/হারমোনিয়াম। যুগলবন্দী হলে প্রধান দুজন শিল্পী পাশাপাশি বসেন। অনেক সময় জ্যেষ্ঠ্যতা অনুসারে শিল্পী সামনে পিছনে বসতে পারেন।

কন্ঠসঙ্গীত ও যন্ত্রসঙ্গীতের উপস্থাপনার মধ্যে কিছু পার্থক্য আছে। পাশাপাশি ধ্রুপদ, খেয়াল, ঠুমরি বা যন্ত্রসঙ্গীতের অনেকগুলো অংশ থাকে, যেগুলো শিল্পী একটির পর একটি জোড়া দিয়ে পরিবেশন করেন। তবে সব শিল্পী একই ক্রমে যে জোড়া দেবেন তা নয়। তাঁর শিক্ষা, চর্চা বা বিশ্বাসভেদে এই ক্রমের পরিবর্তন হয়। কখনও গায়কের মেজাজ বা শ্রোতার ধরনের কারণেও উপস্থাপনায় ভিন্নতা আসতে পারে।

হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সবচেয়ে পুরাতন ধারা/শৈলী হলো ধ্রুপদ। সুর-তালের বিশুদ্ধতার দিক দিয়ে এখানে বাধা-নিষেধ বেশি। এর সাথে তালের জন্য ব্যবহার করা হয় পাখোয়াজ। এই গানের চরিত্র অপেক্ষাকৃত গম্ভীর। শুরু হয় আলাপ দিয়ে। সনাতন মন্ত্রের মতো – আ, রে, নি, না, রি, ই, নোম, তোম শব্দগুলো ব্যবহার করে আলাপ করা হয়। এখানে খুব যত্ন করে বিস্তার করে রাগের রূপ ফুটিয়ে তোলা হয়। আলাপ শুরু হয় খুব ধীরগতিতে… অতি-বিলম্বিত বা বিলম্বিত লয়ে। সচরাচর ষড়জ (টোনিক স্বর) থেকে আলাপ শুরু হয়। কখনও রাগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্বর বা বাদী স্বর থেকেও আলাপ শুরু হতে পারে। এরপর শিল্পী প্রথমে নিচের দিকের সপ্তকে গিয়ে (গম্ভীর স্বরে) সেখানের এই রাগের বৈশিষ্ট্যগুলো ফুটিয়ে তোলেন। তারপরে ওপরের দিকের সপ্তকের কাজ দেখিয়ে, আবার ষড়জে ফেরেন। এখানে শিল্পী ধীরে ধীরে রাগটির পরিচয় করান। নোটগুলো ধরে ধরে শ্রোতাদের দেখান। গুরুত্বপূর্ণ (বাদী-সমবাদী) স্বরগুলোকে প্রতিষ্ঠিত করেন। একে একে রাগের ভাঁজ খোলেন, যেন একটা ক্যানভাসে শিল্পী একের পর এক টান দিয়ে ক্রমশ অস্পষ্ট ছবিকে মূর্ত করে তুলছেন। ধ্রুপদের এই অংশটি সবচেয়ে জটিল ও দুরূহ। শিল্পীর রাগ বোঝার গভীরতা এবং উপস্থাপনদক্ষতার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা হয় আলাপে। যে শিল্পী যতো দক্ষ, তিনি ততো সুন্দর করে আলাপের মাধ্যমে রাগের মূলভাব প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেন। শ্রোতার মনে রাগের ছায়া তৈরি হয়ে যায়। আলাপের সময় কিন্তু তালযন্ত্র ব্যবহার করা হয় না।

আলাপ শেষে আসবে বাণী বা কথা। সেখানে তালবাদ্য যোগ হবে। ধ্রুপদের প্রবন্ধের চারটি ধাতু/তুক বা অংশ থাকে। স্থায়ী, অন্তরা, সঞ্চারী, আভোগ তুকগুলো সচরাচর ৪ লাইনের সাহিত্য, হিন্দি/উর্দু বা ব্রজভাষায় রচিত। আবার কেবল স্থায়ী ও অন্তরা এ দুই তুকের ধ্রুপদ গানের প্রচলনও আছে। প্রথমে গাওয়া হয় স্থায়ী। এরপর অন্তরা হয়ে আবার স্থায়ীতে ফেরা হয়। তারপর সঞ্চারী, আভোগ গেয়ে আবার স্থায়ীতে ফেরা। সচরাচর ৭, ১০ বা ১২ মাত্রায় বাঁধা সাহিত্য গাওয়া হয়। ১০ মাত্রার সাদরা বা ১৪ মাত্রার ধামার বেশি প্রচলিত।

ধ্রুপদের আনন্দ এর দীর্ঘ, বিস্তারিত, বিশুদ্ধ আলাপে। এছাড়া তাল নিয়ে খেলাও দারুণ। শিল্পী কখনও কখনও শুরু করা লয় থেকে আড়াই বা তিনগুণ পর্যন্ত গতি বাড়ান। কান সমৃদ্ধ হতে থাকলে একসময় ধ্রুপদের অলঙ্কারগুলোর (আশ, ন্যাস, মীড়, গমক, মূর্ছান, স্পর্শন ও কম্পন) বিশেষ আনন্দ পাওয়া যায়। তবে নতুন শ্রোতার জন্য ধ্রুপদের চেয়ে খেয়ালের জগতে ঢুকে আনন্দ নেয়া সহজ।

খেয়াল এখন হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও প্রচলিত ধারা। খেয়াল মানেই ফ্রি ইমপ্রোভাইজেশন, যেখানে শাস্ত্রীয় রীতিনীতি বজায় রেখেও শিল্পী পূর্ণ স্বাধীনতা নিয়ে ইমপ্রোভাইজ করতে পারেন। এই ইমপ্রোভাইজেশনের কারণেই একই শিল্পীর একই রাগের ভিন্ন ভিন্ন পারফরমেন্সের মধ্যেও অনেক নতুনত্ব পাওয়া যায়। ফ্রি ইমপ্রোভাইজেশন হলেও শিল্পী সচরাচর কয়েকটি ধাপে খেয়াল পরিবেশন করেন এবং ওই ধাপগুলোর মধ্যেই ইমপ্রোভাইজেশনের সুযোগ নেন।

ধ্রুপদের চেয়ে খেয়ালের অংশ বা অঙ্গ বেশি। অঙ্গের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক আছে। তবে গোয়ালিয়র ঘরানাকে যেহেতু সকল ঘরানার জননী ধরা হয়, তাই তাদের আট অঙ্গের খেয়াল সর্বজনগ্রাহ্য। তবে আজ যেসব নামী গায়ক আছেন, তাঁদের বেশিরভাগই এই আট অঙ্গ হুবহু অনুসরণ করেন না। কেউ আবার কোনো অংশ গানই না। আবার কেউ বাইরে থেকে একটি অংশ যোগ করে দেন। তবে আমরা যদি অষ্টাঙ্গের ধারণাটা রাখি, তবে অন্য সব খেয়াল বুঝতে বেগ পাবার কথা নয়।

গোয়ালিয়রের খেয়ালের শুরুতে আলাপ নেই। সুর লাগিয়েই বন্দিশ গাওয়া শুরু। তবে আগ্রা ঘরানার গায়কেরা শুরুতে ধ্রুপদের মতো আলাপ করতেন। এখন কেউ কেউ সুর লাগিয়ে সংক্ষিপ্ত আলাপ করেন যেটাকে আওচার বলে। এরপর মূল খেয়াল শুরু হয় বন্দিশ-এ-নায়েকী দিয়ে। এই অংশে ওই খেয়ালের বন্দিশ বা মূল সাহিত্য ও সুরের যিনি রচয়িতা, তাঁর সেই মূল সুর অপরিবর্তিত রেখে গাওয়া হয়। এখানে কয়েকবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ওই ক’লাইনই গাওয়া হবে। এরপর শিল্পী চলে যাবেন বন্দিশ-এ-গায়কীতে, যেখানে তিনি মূল কম্পোজিশনটি ইমপ্রোভাইজ করার সুযোগ পান। এখানে তিনি নিজের দক্ষতা দেখাবার সুযোগ পাবেন। এর পরে শিল্পী চলে যাবেন রাগকে আরও বিস্তৃত করতে। এটাকে বিস্তার বা বড়হত বলে। এখানে রাগের স্বরগুলোর বিভিন্ন কম্বিনেশন করে শিল্পী পরিবেশন করবেন। কিছুটা গানের কথা গাইবেন, আবার মাঝে সুরের বিভিন্ন কম্বিনেশনগুলো ঢুকিয়ে দেবেন। সেই সুরগুলো শুধুমাত্র আ-কার বা স্বরের নামগুলো দিয়ে গাইতে পারেন। এভাবে শুনতে শুনতে কখন দেখবেন ঢুকে পড়বেন বহলাওয়া নামের একটা মজার রাজ্যে, যেখানে দোলনায় দোলার মতো খেলা হবে। আ-কারে রাগের সুরের ওপর দিয়ে ঘোরাঘুরি করবেন শিল্পী। হালাকা চালে ঘোরাঘুরির মধ্যে খুব আলতো করে সুর ছুঁয়ে যাবেন মীড় নিয়ে। কখনও বা একটু জোরে লাফ দেবার মতো হবে গমক দিয়ে। এরপরে আসবে বোল-বাঁট বা বোলবন্টন। এখানে বন্দিশের কথাগুলো বিভিন্নভাবে তালের প্যাটার্নের মধ্যে ভাগ করে দেবেন শিল্পী। শিল্পীর তালের ওপরে দখল দেখা যাবে এখানে। তালের ওপরে কখনও দীর্ঘ করে গানের কথা বসাবেন, কখনও সংক্ষিপ্ত করে। এ পর্যায়ে এসে গানের চরিত্র কিছুটা বদলে যাবে। এখন শুরু হবে সুর আর গতির খেলা। সুরের বিভিন্ন প্যাটার্নের ওপর দিয়ে দ্রুততার সাথে ওঠা-নামা, চরকিকাটা, দৌড়-ঝাঁপ, যেটাকে আমরা তান বলি। তবে প্রথম শুরু হবে গানের কথা নিয়েই, যেটাকে বলা হয় বোলতান। সুরের ওই সব প্যাটার্নের ওপরে গানের কথা বসিয়ে দ্রুত ওঠানামা করা হবে। এটা খানিকক্ষণ চলার পরে আসবে তান। এখানে আ-কারে বা স্বরের নাম ধরে (সারগাম) দ্রুত ওঠানামা হতে থাকবে। এখানে শিল্পী তাঁর কণ্ঠশৈলী, সুরের ও তালের ওপরে দখল একসাথে দেখাবার সুযোগ পাবেন। মৌলিক স্তরের শ্রোতাদের অন্য অঙ্গগুলো ভালো লাগতে সময় লাগলেও এই অংশটি ভালো লাগবে সহজেই। এরপরে সেই গতির মধ্যে দিয়ে ঢুকে যাবে তার পরের অংশে, যার নাম লয়কারি। লয়কারি মানে বিভিন্ন প্রকারের গতির খেলা। এখানে শিল্পী তাঁর নিজের দখল অনুযায়ী লয় বাড়িয়ে দেখাতে থাকবেন। কে কতো গুণ গেলেন, এটা গণনার বিষয়। তবে খুব তৈরি গলা ছাড়া দ্রুতলয়ের তান বা লয়কারি আনন্দের বদলে কানের পীড়ার কারণ হতে পারে।

এগুলো তো গেলো খেয়ালের অঙ্গের কথা। কান সাফ হতে থাকলে একসময় খেয়ালকে আরও সুন্দর করার জন্য বিশেষায়িত লহক, গমক, ডগর, মীড়, সুঁত, ঘসীট ধরনের জিনিসগুলোর সূক্ষ্ম মজা পাওয়া যাবে।

খেয়াল গাওয়া শেষ করে কোনো কোনো শিল্পী তারানা (বা তেলানা) গাইতে পারেন। তারানা গাওয়া হয় “নোম তানা দের্‌না দের্‌না তাদানি ওদানি দের দানি ইয়া লালি” ধরনের শব্দ ব্যবহার করে।

যন্ত্রশিল্পীদের আলাদা বাদনরীতি আছে। তবে এখন ধ্রুপদ বা খেয়াল গায়েনশৈলীর অনেককিছু ঢুকে গেছে ওখানে। তবে কণ্ঠসঙ্গীতের মতো একইভাবে এখানে ঘর, শিক্ষা বা শিল্পীর নিজস্বতার কারণে বাজনার ধারা ভিন্ন হতে পারে। তবে আমরা একটা সাধারণ ধারণা দাঁড় করাবার চেষ্টা করতে পারি, যেটা মোটামুটি সবার মধ্যে কমন।

যন্ত্রীরা প্রায় সকলেই আলাপ দিয়ে শুরু করেন। ধ্রুপদের মতো অতো বিস্তারিত না হলেও খেয়ালের মতো আবার অতো সংক্ষিপ্তও নয়। এর মাঝামাঝি আকারের একটা আলাপ হবে। তারপরে আসবে জোড়। জোড় মানে দুটি অংশকে জোড়া দেয়া। আলাপ আর কম্পোজড্ কম্পোজিশনকে জোড়া দেবার কাজ। এ অংশে শিল্পী ক্রমশ ছন্দে প্রবেশ করেন। এতোক্ষণ ধরে বিস্তার করা রাগকে জোড়া দেবার কাজ চলে কম্পোজড্ কম্পোজিশন বা গতের সাথে। তবে জোড় খুব দীর্ঘ হয় না।

এরপর আসবে বিলম্বিত গৎ। এখানে গৎ বা বন্দিশ বিলম্বিত লয়ে শুরু করা হয়। মূল সুরে বিলম্বিত লয়ে বিভিন্নভাবে গতের স্থায়ী অন্তরাকে প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে গতের বিভিন্ন অংশের বিস্তারিত কম্পোজিশন দেখা যায়। এরপর খেয়ালের মতোই শিল্পী ইমপ্রোভাইজ করার ক্ষমতা দেখান। এরপর শিল্পী চলে যান দ্রুত গতে। এখানে দ্রুত লয়ে তাল বাজানো হয়। বিলম্বিত গৎ একসময় মসীদখানী গৎ এবং দ্রুত গৎ রেজাখানী গৎ নামে পরিচিত ছিল। এখান থেকে বাজনা ঘন হতে থাকে। এরপর যন্ত্রসঙ্গীত শেষ হয় ঝালা দিয়ে। এসময় বাদ্যযন্ত্রে ঝড় ওঠে। শিল্পী তাঁর সব দক্ষতা দিয়ে রাগের স্বরগুলোতে খুব দ্রুত চলতে থাকেন। ঝালার পরে শিল্পী হালকা মেজাজের ওই রাগের উপরে তৈরি ধুন (উপশাস্ত্রীয় বা ফোক কোনো কম্পোজিশন) বা তারানা বাজাতে পারেন।

আসরের প্রাথমিক শ্রোতা বা বোদ্ধা উভয়কেই আনন্দ দেয় ঠুমরি। ঠুমরি (কেউ কেউ ঠুংরি বলেন) হিন্দুস্তানি উপশাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং জনপ্রিয় ধারা। ঠুমরি হলো চঞ্চল স্বভাবের ভাবপ্রধান গান। এ গানে প্রেম, বিরহ, বিবাদ, অপেক্ষা, অভিমান, অভিযোগ, মিলনের অভিব্যক্তিগুলো সুর ও বাণীর সংমিশ্রণে ফুটিয়ে তোলা হয়। এজন্য শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের চেয়ে ঠুমরি অনেক বেশি বাণীপ্রধান। প্রতিটি শব্দ স্পষ্ট করে উচ্চারণ করা হয় এবং প্রতিটি শব্দের আবেগকে সময় নিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়। ঠুমরি ব্রজ, হিন্দি, উর্দু, পাঞ্জাবি ভাষায় রচিত হয়েছে। এছাড়া বাংলাসহ অন্যান্য কিছু ভাষায়ও কিছু রচনা আছে। বেনারস, পাঞ্জাবসহ হাতেগোনা কয়েকটি গায়ন রীতিতে গাওয়া হয় ঠুমরি।

সচরাচর সহজ তাল ও হালকা রাগে বাঁধা হয় ঠুমরি। রাগের শুদ্ধতার চেয়ে বেশি নজর দেয়া হয় বোলের বা অভিব্যক্তির প্রকাশের উপরে। ঠুমরির স্থায়ীর পাশাপাশি একাধিক অন্তরা থাকে। খটকা, মুড়কি, গিটকিরি এবং পুকার ঠুমরি গানের প্রধান অঙ্গ। খটকা মানে ঝুঁকে ঝুকে বোল বলা হয়, গিটকিরি তানের মতো বোল হয় সুরের কম্পনের সাথে, কয়েকটি সুরের উপরে শান্ত চালে বোল বসিয়ে তৈরি মুড়কি। পুকার এর মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে আসে কাতরতা। গানের বাণীর সাথে এগুলো মিশিয়ে সুন্দর বোল তৈরি করে উপস্থাপন করা হয়। এজন্য একই লাইনের কাব্য বহু অভিব্যক্তিতে প্রকাশ প্রায়।

সবার জীবন সুরেলা হোক।

=================================================================================
বেঙ্গল সঙ্গীত উৎসবকে সামনে রেখে গত বছরের লেখা: অসুরের সুরলোকযাত্রা (চারবেলা চারদিকে প্রকাশিত)

 

সিরিজের বিভিন্ন ধরনের আর্টিকেল সূচি:

গান খেকো সিরিজ- সূচি
শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ব্যাকরণ বা শাস্ত্র সূচি
রাগ শাস্ত্র- সূচি
রাগ চোথা- সূচি
রাগের পরিবার ভিত্তিক বা অঙ্গ ভিত্তিক বিভাগ
ঠাট ভিত্তিক রাগের বিভাগ
সময় ভিত্তিক রাগের বিভাগ
ঋতু ভিত্তিক গান (ঋতুগান) এর সূচি
রস ভিত্তিক রাগের বিভাগ
উত্তর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের রীতি/ধারা
সঙ্গীতের ঘরানা- সূচি
সুরচিকিৎসা- সূচি
শিল্পী- সূচি
প্রিয় গানের বানী/কালাম/বান্দিশ- সূচি
গানের টুকরো গল্প বিভাগ

Declaimer:

শিল্পীদের নাম উল্লেখের ক্ষেত্রে আগে জ্যৈষ্ঠ-কনিষ্ঠ বা অন্য কোন ধরনের ক্রম অনুসরণ করা হয়নি। শিল্পীদের সেরা রেকর্ডটি নয়, বরং ইউটিউবে যেটি খুঁজে পাওয়া গেছে সেই ট্রাকটি যুক্ত করা হল। লেখায় উল্লেখিত বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত যেসব সোর্স থেকে সংগৃহীত সেগুলোর রেফারেন্স ব্লগের বিভিন্ন যায়গায় দেয়া আছে। শোনার/পড়ার সোর্সের কারণে তথ্যের কিছু ভিন্নতা থাকতে পারে। আর টাইপ করার ভুল হয়ত কিছু আছে। পাঠক এসব বিষয়ে উল্লেখে করে সাহায্য করলে কৃতজ্ঞ থাকবো।

*** এই আর্টিকেলটির উন্নয়ন কাজ চলমান ……। আবারো আসার আমন্ত্রণ রইলো।



সর্বশেষ মন্তব্য

আপনার মন্তব্য দিন