Sufi Faruq (সুফি ফারুক)

কোন পথে গেল গান – কবীর সুমন -১ বই সংগ্রহ

Kabir Sumon | কবীর সুমন

গবেষণাগ্রন্থ লেখা আমার উদ্দেশ্য ছিল না। অগ্রজপ্রতীম সাংবাদিক ও বাংলাগানপ্রেমী শ্রী অলক চট্টোপাধ্যায় আমায় বলেছিলেন ২০০৫ সালের শারদীয় আজকালের জন্য একটি লেখা লিখতে। লেখাটির নামও তিনিই রেখেছিলেন:কোন পথে গেল(শ্যামা নয়)গান। সেই সঙ্গ আমার পিছনে খাড়া করে রেখেছিলেন নিয়মিত তাগাদা নামে একটি বস্তু। ফলে খুব অল্প সময়ে তৈরি করে ফেলেছিলাম লেখাটি। ছাপার পর পাঠকরা নিশ্চয়ই দেখতে পেয়েছিলেন তাড়াহুড়োর মূল্য আমায় দিতে হয়েছে অন্ত্মত একটি ব্যাপারে-পুনরাবৃত্তি। এই প্রমাদ দু’একটি জায়গায় ঘটেছে। পরে আজকাল প্রকাশনী জানালেন এই লেখাটিই তাঁরা বই আকারে বের করতে চান। তবে হ্যাঁ, এবারে তাঁরা একটু সময় দিলেন সেরকম বুঝলে আরও কিছু যোগ করার, অল্পবিস্তর ঘষামাজা করার। তাঁরা এও জানালেন যে পুরো লেখাটা আমি যদি চাই এমনকি ঢেলে সাজাতেও পারি। ঢেলে সাজানো মানে নতুন করে লেখা। আমি ভেবে দেখলাম- নতুন করে লিখতে গেলে ২০০৫-এর দুর্গাপুজো ( যে সময়ে ‘শারদীয়’ সংখ্যাগুলি বেরোয়) আর আসছে বইমেলার জন্য বই তৈরি করে ফেলার চূড়ান্ত সময়সীমা অর্থাৎ বড়জোর নভেম্বরের শেষের মধ্যে যে সময়টুকু পাওয়া যাবে তা যথেষ্ট নয়। বছরখানেক সময় পেলে এইরকম বিষয়ে একটা জুৎসই বই তবু লেখার কথা ভাবা যায়। তখন রচনা-আঙ্গিক করে তোলা যায় মেদহীন, বিষয়ের পরস্পরা করে তোলা যায় আরও যথাযথ। কিন্তু অন্যদিক দিয়ে দেখলে- কোনও পাঠ্যবই বা গবেষণাগ্রন্থ লেখা তো আমার উদ্দেশ্য ছিল না। সেই উদ্দেশ্য এখনও নেই। সেরকম লোকই আমি নই। ১৯৬৯ সালে বিএ পাশ করার পার এমএ পড়তে পড়তে সেই যে লেখাপাড়া ছেড়ে কর্মক্ষেত্রে ঢুকেছি তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ের ধার মাড়াইনি আর। গবেষণা করা, সেই গবেষণার ভিত্তিতে মাপজোক করে প্রমাণ আকারের বই লেখা কাকে বলে জানি না। সেই শিক্ষাই আমার নেই। শ্রী অলক চট্টোপাধ্যায়ের খোঁচায় হুট করে যা লিখতে গুরুত্ব করে দিয়েছিলাম সেই প্রক্রিয়ার মধ্যে একটা তাৎক্ষণিকতা ছিল, ছিল সাত-দিনে-লিখে-ফেলতেই-হবের তাড়া (তাঁর দিক থেকে) আর সঙ্কল্প (আমার দিক থেকে)। এইভাবে দুনিয়ায় লেখালেখির বাইরেও বেশ কিছু কাজ হয়েছে। এরও একটা আলাদা স্বাদগন্ধ, মেজাজ আছে। নতুন করে লিখতে গেলে সেই মেজাজটা থাকত না। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের একটি কবিতায় ছিল-‘তোমায় আমি অল্প একটু ভাবাতে চাই’। শারদীয় আজকালের এই লাখাটির উদ্দেশ্যও ছিল সেই রকমই। যে বইটির জন্য এই ভূমিকা লিখছি সেটিরও উদ্দেশ্য তো একই। তাহলে আর কেঁচে গণ্ডুষ করা কেন? বিষয়টি এমন এবং এই্‌ বিষয়ে বাংলা বা অন্য কোনও ভাষায় লেখা এত কম হয়েছে যে বাংলা পড়ে বুঝতে পারেন এমন পাঠকের কাছে এটি প্রথমত হাজির করাই একটা বড় কাজ। মাপজোক নিয়ে, হিসেব করে, সবকিছুর প্রতি সুবিচার করে এই কাজটাই করতে গেলে (আগেই বলেছি) অনেক সময় দরকার। তবে না সুনির্মিত কাজের বিশেষ আবেদনটি পাওয়া যায়। তখন কাজটিকে করে তোলা যায় বাহুল্যবর্জিত, সুসম্বন্ধ, টানটান, এমনকি সংক্ষিপ্ত। এক বিখ্যাত ইউরোপীয় সঙ্গীতকারের কাছে তাঁর প্রেমিকা নাকি আদর করে বলেছিলেন তাঁর জন্য এক রাত্তিরে একটি ছোট্ট ‘সোনাটা’ রচনা করে ফেলতে। সারারাত কাজ করে সকাল বেলায় সেই সঙ্গীতকার তাঁর প্রেমিকাকে ছোট্ট নয় বিশাল একটি রচনার স্বরলিপি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। সঙ্গে একটি চিরকুটে লিখে দিয়েছিলেন ( যে ভাষায় ঘটনাটির কথা পড়েছি সেই ভাষাতেই উদ্ধৃতি দিচ্ছি, নয়ত রসের ব্যাঘাত ঘটতে পারে): Darling,I didn’t have enough time to be brief দেখবেন, কেউ যেন আবার প্রকাশককে দোষ দেবেন না তাঁরা আমায় লেখার জন্য অনেকটা সময় দেননি বলে। তাহলে ওই সঙ্গীতকারের প্রেমিকাকেও তো দোষ দিতে হয়। যথেষ্ট বা তার চেয়েও বেশি সময় পেলে লেখাটি হয়ত আরও টানটান হত। কিন্তু আমি যেহেতু রীতিদুরস্ত গবেষক বা কোনও প্রতিষ্ঠান-স্বীকৃত গবেষণা গ্রন্থপ্রণেতা নই তাই আমার লেখা বই, আঙ্গিক একটু অন্যরকম হলেও, সব মিলিয়ে খুব আলাদা কিছু হত বলে মনে হয় না।

দীর্ঘকাল একাধিক দেশে বেতার সাংবাদিকতা করেছি। বিভিন্ন পত্রিকায় প্রবন্ধ নিবন্ধ লিখে গিয়েছি সেই ১৯৭৬ সাল থেকে। প্রথমে সুমন চট্টোপাধ্যায়ের নামে, তারপর মানব মিত্র নামে বছর আষ্টেক। তারপর আবার সুমন চট্টোপাধ্যায় নামেও লিখেছি। এই আজকাল থেকেই বেরিয়েছিল আমার লেখা ‘হয়ে ওঠা গান’। ২০০০ সালে আমি ভারতের আইন মোতাবেক এফিডেভিট করে এবং কলকাতার একটি ইংরেজি ‌ও একটি বাংলা দৈনিক পত্রিকায় যথাবিহিত বিজ্ঞপ্তি দিয়ে আমার নাম পরিবর্তন করি। তখন থেকে আমি কবীর সুমন। এছাড়া অন্য কোনও নাম আমার নেই, তা থাকতেও পারে না যেহেতু প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেটের এজলাসে এফিডেভিট করে আমি এই নতুন নামটি নিয়েছি। ঠিক যেমন মহম্মদ আলি। কেউ তাঁকে ভুলেও আর কেসিয়াস ক্লে বলে না, বলার কথাও নয়। সেটাই স্বাভাবিক।

১৯৯৩ সালের শারদীয় আজকালে বেরিয়েছিল আমার আত্মজীবনীমূলক লেখা ‘হয়ে ওঠা গান’। পরের বই মেলায় তা বই আকারেও প্রকাশিত হয়। লেখাটির বিস্তার ছিল আমার ছেলেবেলা থেকে ১৯৯২ সালে আমার স্বরচিত গানের প্রথম এলবাম ‘তোমাকে চাই’- এর প্রকাশকাল পর্যন্ত। এমন হতেই পারে যে ‘হয়ে ওঠা গান’ পড়েননি এমন কেউ কেউ হয়ত ‘কোন পথে গেল গান’ বইটি পড়বেন। কে লিখছে বইটি? সঙ্গীত, বাংলা গান সম্পর্কে কিছু বলার বা লেখার অধিকার তার কতটা আছে বা আদৌ আছে কি? স্বাভাবিক কৌতুহল থেকেই এ- ধরনের প্রশ্ন তাঁর মনে আসতে পারে। তাই নিজের সম্পর্কে অল্প কিছু কথা এই ভূমিকায় লিখছি। ২০০৫ সালের শারদীয় আজকালে ‘কোন পথে গেল গান’ লিখতে গিয়ে আমার আকাশবাণীর অভিজ্ঞতা ও গান বাঁধার শুরু ইত্যাদি প্রসঙ্গে লিখেছিলাম পাঠকের পরিপ্রেক্ষিত চিন্তার কথা ভেবে। সেই অংশগুলি এই বইতে থেকে গেল। নিচের কথাগুলি থেকে ‘হয়ে ওঠা গান’ লেখাটি যাঁরা পড়েননি তাঁদের বুষতে সুবিধে হবে গানবাজানায় আমার হয়ে ওঠা কেমনধারা ছিল।

বাল্যকালেই আমার সঙ্গীতশিক্ষা শুরু হয়ে যায়। প্রয়াত কালীপদ দাসের কাছে আমি ১৪ বছর খেয়াল শিখতে চেষ্টা করি। বাংলা আধুনিক গান, রবীন্দ্রনাথের গান, কাজী নজরুল ইসলামের গান, হিমাংশু দত্তর গান (সবই আসলে আধুনিক বাংলা গান ) আমি শিখতে চেষ্টা করেছি সুধীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়, নীহারবিন্দু সেন, নিখিলচন্দ্র সেন, মণি চক্রবর্তীর কাছে। এঁদের কেউ আর নেই। ১৯৬৬ সালে একবার আকাশবানীর একটি কাজে সঙ্গীতাচার্য জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের কাছে ভজন শেখার সুযোগ পেয়েছিলাম। ১৯৭১ সালে আকাশবাণীরই একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে পঙ্কজ কুমার মল্লিকের পরিচালনায় মাসাধিক মহলা দিয়ে স্টুডিও রেকর্ড করার সুযোগ পেয়ে গিয়েছিলাম। ১৯৭২ সালে প্রথম গ্রামোফোন রেকর্ড সময় ভাগ্যে জুটেছিল ‍সুবিনয় রায়ের প্রশিক্ষন। পাশ্চাত্য কন্ঠসঙ্গীতের তালিম আমি নিয়মিত আলাদাভবে পাইনি। কিন্তু কৈশোরে কলকাতার একটি স্কুলে এক সঙ্গীতজ্ঞ পর্তূগীজ-ভারতীয় ফাদারের কাছে একটি ইংরেজি অপেরায় প্রধান একটি ভূমিকায় অভিনয় করার তালিম পেয়েছিলাম রীতিমতো, কয়েক মাস ধরে। অপেরা, কাজেই গান। নানান দৃশ্যে, নানান পরিস্থিতিতে বিভিন্ন ধরনের গানের মধ্যে দিয়ে সংলাপ, গানের মধ্যে দিয়েই অভিনয়। সেই সঙ্গে সেই সংলাপ-গানগুলি মঞ্চে কিভাবে অভিনয় করে গাইতে হবে তারও শিক্ষা, অর্থাৎ অপেরা-অভিনয়। ১৯৮৬ সালে আমি জার্মানির কোলোন শহরে এক ইতালীয় গুরুর কাছে ক্লাসিকাল গিটারের পাঠ নিতে শুরু করেছিলাম।

গানবাজনা শুনছি বোধহয় জ্ঞানকর্ণ ফোটারও আগে থেকে। ভাগ্যিস সুধীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় ও উমা ভট্টাচার্যর (চট্টোপাধ্যায়) ছেলে হয়ে জন্মেছিলাম। তাই আমার স্মরনাতীত কাল থেকেই শুনেছি বাবা মা গান গাইছেন বা হঠাৎ গান গেয়ে উঠছেন, গুনগুন করছেন, গ্রামোফোন রেকর্ড বাজাচ্ছেন, রেডিওয় গান শুনছেন ও শোনাচ্ছেন। সব ধরনের গান ও বাজনা। শুনতে আর গুনগুন করে হলেও গাইতে যদি ভাল লাগে তা হলেই হল। আমার মাকে আমার কৈশোরে রবির সুরে মহম্মদ রফির গাওয়া ‘চৌধরি কা চাঁদ) গানটি গুনগুন করতে শুনেছি। বাবা মাঝেমাঝেই আমার বড়ভাইকে বলতেন, হেমন্তর সুরে’এই বালুকা বেলায় আমি লিখেছিনু’ গানটা একবার গা তো। আমায় বলতেন, মান্নাবাবুর সুরে ‘ ও আমার মন যমুনার অঙ্গে অঙ্গে’টা একবার গাইতে চেষ্টা কর। আমার কৈশোরে আমার মা প্রায়ই আমার কাছে মহম্মদ রফির গাওয়া ‘এ জীবনে যদি আর কোনও দিন দেখা হয় দুজনার’ মান্না দের গাওয়া ‘একই অঙ্গে এত রূপ দেখিনি তো আগে’ এইসব গান শুনতে চাইছেন। এঁরা দুজনই আমর জন্মের আগে রবীন্দ্রনাথের গান, হিন্দি ভজন রেকর্ড করতেন। চলচ্চিত্রের নেপথ্যশিল্পী হসেবে আমর বাবা রবীন্দ্রনাথের গান, হিমাংশু দত্তর গান ও অন্য রচয়িতাদের গান রেকর্ড করেছিলেন। কান আর মন দুটোই ছিল তাঁদের বরাবর খোলা। সঙ্গীত নিয়ে আমাদের পরিবারে কোনও শুচিবায়ুগ্রস্ততা, একগুঁয়েমি বা শিবিরভজা বেরসিকপনা ছিল না। তেমনি, আমাদের শোনার অভিজ্ঞতায় গানের চেয়ে বাজনার ভূমিকা কম ছিল না কোনও অংশেই। আমার ক্ষেত্রে তো যন্ত্রসঙ্গীতের ভূমিকা আমার জ্ঞানকর্ণ ফোটার সময় থেকেই আরও বড়। ছেলেবেলায় দেখেছি আমর বাবা, এমনিতে মহা রাশভারি মানুষ, মাউথ অর্গ্যান বা হারমোনিকা বাজাচ্ছেন। আমার দাদা আর আমিও বাজাতাম। আমি আজও বাজাই। যে মানুষ দাবি করেন যে তিনি শুধু গান শোনেন, বাজনা শোনেন না বা যন্ত্রসঙ্গীত ভালবাসেন না, তিনি আসলে গানও শুনতে জানেন না। আসলে তিনি সঙ্গীত ভালবাসেন না, সুরতালছন্দ তাঁকে বলে না কিছুই। বাংলা গানের দুর্ভাগ্য যে এই গানের দুনিয়ায় ভাল কন্ঠশিল্পী যেমন এসেছেন, তেমনি এসেছেন ভাল যন্ত্রশিল্পী, অথচ যন্ত্রশিল্পীদের কথা, বাংলা গানে যন্ত্রসঙ্গীতের প্রয়োগের কথা কেউ বলেনইনি তেমন। অর্থাৎ ‘সঙ্গীত’ হিসেবে বাংলা গান কজন শুনেছেন সেটাই প্রশ্ন। ফলে বাংলায় যে ভাল সুরকাররা এসেছেন তাঁদের অবদানও আসলে বিশেষ আমল পায়নি। সঙ্গীতের কান যদি না থাকে তাহলে কোনও সুরকারের কী বৈশিষ্ট ও কৃতিত্ব সেটাই বা কে বুঝবে।

বাংলা গান শোনা আমাদের সামাজে বরাবরই একপেশে। ফলে, কালক্রমে কিছু জনপ্রিয় গায়ক গায়িকা ও তাঁদের স্মৃতি ঘিরেই আমাদের গানপ্রেম আবর্তিত। সেই সঙ্গে ‘আমি বাপু রবীন্দ্রসঙ্গীত ছাড়া কিছু শুনি না’ ‘আমি বাবা রবীন্দ্র-নজরুল-দ্বিজেন্দ্রলাল-অতুলপ্রসাদ-রজনীকান্তর বাইরে কিছু মানতে রাজি নই’ ‘আধুনিক বটে সলিল চৌধুরি, আর কেউ দাঁড়াতে পারে?’ গোছের বেরসিক, একদেশদর্শী, সুরবধির মানসিকতার শুধু বহিপ্রকাশই নয়, সগর্ব উচ্চারণ। অনেকে আবার এ নিয়ে লেখালিখিও করেছেন। তিনের দশকের আগে থেকে বাংলা গান ও আধুনিক বাংলা গানের জগতে ধারাবাহিকভাবে যেসব কাজ হয়ে এসেছে, অনেক কলমধারী পণ্ডিত সেগুলির মধ্যে থেকে পরমহংসের মতো ছেঁকে নিয়েছেন তাঁদের পছন্দসই অমুক-সঙ্গীত বা তমুকগীতি। কয়েক দশক আগে কলকাতার কিছু বিদ্দজ্জন হঠাৎ মেতে উঠেছিলেন নিধুবাবুর টপ্পা ও বৈঠকী গান নিয়ে। অন্যদিকে এঁরাই আবার রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আর কিছুই মানেন না। তাঁদের মগজে ঢোকেনি রবীন্দ্রনাথ নিজেই বৈঠকী গানের সাবেকি স্থুলতামিশ্রিত বৈশিষ্টের বিপরীতে পরিশীলিত আধুনিক বাংলা গান তৈরি করতে চেষ্টা করে গিয়েছেন সারা জীবন। এমনিতে যাঁরা পদ্যে রবীন্দ্রনাথকে ছেড়ে হঠাৎ ঈশ্বর গুপ্তকে নতুন করে আবিষ্কার করার কথা ভুলেও ভাবেন না, তাঁরাই ব্রতী হয়েছিলেন বৈঠকী গানের তালঠোকা ‘সাবেকিয়ানায়’ ফিরে যেতে ( ‘সাবেকিয়ানা’ কথাটি রবীন্দ্রনাথই ব্যবহার করেছিলেন তাঁর অন্তত একটি প্রবন্ধে)। ইতিমধ্যে বাংলা আধুনিক গানে যে কী অসামান্য সব সুরকার ও শিল্পী এসে গিয়েছেন, সৃষ্টি করে গিয়েছেন তার খবর বাংলার অনেকে ‘শিক্ষিত’, ‘সংস্কৃতিবান’ মানুষ মনে রাখার প্রয়োজন বোধ করেননি। আসলে সেই ক্ষমতাও তাঁদের ছিল না, কারণ আদতে তাঁরা সুর-বধির, ছন্দ-বধির।

আধুনিক বাংলা গানকে বাঁচতে হয়েছে গানবাজনার বাজারে, সাধারণ মান শ্রোতার ভাল লাগায়। একটি শিল্পরূপ হিসেবে আধুনিক বাংলার সামজে, ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর জীবনে তার অবস্থান, আধুনিক বাঙালির সাঙ্গীতিক-সাংস্কৃতিক, দার্শনিক ও রাজনৈতিক উচ্চারণ হিসেবে তার ভূমিকা এসব নিয়ে কোনও আলোচনাই, যেমন শিক্ষিত সমাজে হয়নি, তেমনি হয়নি এই গান-রূপের সাঙ্গীতিক বিশেস্নষণ। অথচ, জনপ্রিয় গান, লঘু সঙ্গীত দিয়ে একটি সমাজ ও জাতিকে যে কোনও সময়ে ও যুগমুহূর্তে যতটা ভাল চেনা যায় অন্য অনেক কিছু দিয়েই তা যায় না। আরও অনেক ক্ষেত্রের মতো এই ক্ষেত্রেও পাশ্চাত্যে দীর্ঘকাল ধরে গবেষণামূলক কাজ হয়ে আসছে, আজও হয়ে চলেছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে ও বাংলাদেশে তা এখনও শুরুই হল না। আশ্চর্য, আধুনিক বাংলা গানের আবেদনকে কিন্তু আমরা বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে এড়াতে পারি না। এই দ্বন্দের ফল বর্তেছে আধুনিক গান ও বাংলার সঙ্গীত এবং বাংলা সমাজ-দুয়েরই ওপর। আধুনিক বাঙালির ব্যক্তিত্ব, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ, মাপকাঠি, মনোভাব এবং ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে সঙ্গীত ও গানবাজনার ভূমিকা-সব ক্ষেত্রেই এই দ্বন্দ্বের প্রভাব। গুলিয়ে যাওয়া একটা আধাখেঁচড়া ব্যাপার আগাগোড়া এমনই প্রশ্রয় পেয়েছে যে আজ আধাঁখেচড়াও কিছু নেই, সবটাই নিপাট গুলিয়ে যাওয়া, অবয়বহীন, কিম্ভুতকিমাকার একটা বিষয় যার মাথামুণ্ডু নেই, আছে শুধু নিষ্প্রাণ, বিরক্তিকর, পুনরাবৃত্তিমূলক, মেধাহীন, শেকড়হীন, অর্থহীন, আনন্দহীন একটি বস্তুকে নিয়ে যে করে হোক-ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা, মর্মান্তিকরকম হাস্যকর ও বিরক্তিকর চেষ্টা।

পাঁচের দশককে আধুনিক বাংলা গানের স্বর্ণযুগ বলেন অনেকে। কেন যে বলেন কে জানে। শুধু কি এই কারণে যে ওই দশকে অনেক ভাল গায়ক-গায়িকার গান শোনা গিয়েছিল’ কানে এসেছিল অনেক ভাল সুর? তাই যদি হয় তো কথার দিকটার ( গানের কথা কে অনেকেই এখনও ‘বাণী’ বলে থাকেন) কী হবে? লিরিক রচনায় বাংলার ‘গীতিকার’ কূল কি সে সময়ে নতুন কিছু করে দেখাতে পেরিছিলেন? বিচার করলে দেখা যাবে তা না। সুর-তাল-ছন্দ-গায়কীর দিক দিয়ে পাঁচের দশকের আধুনিক গান যতটা মনগ্রাহী হতে পেরেছিল, কথার দিক দিয়ে তা সাধারণভাবে মোটেও পারেনি। কয়েকটি ব্যতিক্রমের নজির দেখিয়ে এই বক্তব্যকে খণ্ডন করা যাবে না। গান বস্তুটি যেহেতু ন্যূনতমভাবে কথা ও সুরের সমাহার তাই কথা দুর্বল হলে শুধু সুরের গুণে তা কি এতটাই বরণীয় হতে পারে যে আমরা একটি বিশেষ দশককে প্রশ্নাতীতভাবে ‘স্বর্ণযুগ’ বলতে পারি? সন্দেহ নেই, পাঁচ ও ছয়ের দশকে বাংলার সুরকাররা স্মরণীয় নিরীক্ষামনস্কতা ও উদ্ভাবনক্ষমতার পরিচয় দিতে পেরেছিলেন নানান আধুনিক গানে। অনেক গান বাস্তবিকই শুধু সুরের জন্যেই স্থায়ী জায়গা করে নিতে পেরেছে সুররসিক শ্রোতার মনে। কিন্তু যে ‘আধুনিক’ বাঙালি সেই যুগে আধুনিক বাংলা কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ পড়েছে, আধুনিক নাটক দেখেছে, বেঁচে থেকেছে এক পরিবর্তনশীল পরিবেশে, যেখানে অনেক সাবেক ভাবনা, ধারণা ও উচ্চারণ আর খাপ খায়নি বাস্তব অস্তিত্বের সঙ্গে, সেই মানুষ কি সেই সময়ের ‘আধুনিক বাংলা গানের’ মধ্যে সুর-কথা-গায়কী সব মিলিয়ে সত্যিই আধুনিকতা খুঁজে পেয়েছে? এমন একজনও কি ছিলেন না যিনি তা পাননি, যাঁর মনে আধুনিক বাংলা গানের কাঠামোগত দ্বন্দ্ব নিয়ে প্রশ্ন জেগেছিল? লিরিকের সাবেকিয়ানা, জাড্য, একমুখীতা কি সেই বাঙালি শ্রোতার কাছে একটা বেখাপ্পা দ্বন্দ্ব হিসেবে উপস্থিত হয়নি? এ নিয়ে আলোচনা চলতেই পারে, যদি সে আলোচনা আদৌ হয়। মুশকিল হল আধুনিক বাংলা গান নিয়ে যুক্তিগ্রাহ্য আলোচনাই হল না এখনও। কোনও কোনও ‘গুরুস্থানীয়’ মানুষ, বড় শিল্পী বা নামকরা পণ্ডিত একটা মত প্রকাশ করেন, অন্য সকলে গ্রহণ করেন আর আউড়ে যান সেটাই। প্রশ্নমনস্কতার স্থান এখানে নেই। অথচ রাস্তাঘাট, অন্দরমহলে, অফিসকাছারিতে, স্কুলকলেজে মানুষ এই বিষয়ে কথা বলে। অর্থাৎ মানুষের বক্তব্য আছে, সে কিছু বলতে চায়। কিন্তু মনের কথাগুলি উপযুক্ত উল্লেখ ও যু্ক্তির মাধ্যমে লিপিবদ্ধ করার দায় সাধরণ মানুষের নেই। সে দাবি তাঁদের কাছ থেকে করা যায় না। এই দাবি করা যায় সঙ্গীত, সংস্কৃতি, শিল্প, সমাজ ইত্যাদি বিষয়ে যাঁরা রীতিমতো ভাবনাচিন্তা ও লেখালিখি করেন তাঁদের কাছ থেকে। তাঁরা কিন্তু এ ব্যাপারে এগিয়ে আসেননি। বেশিরভাগ কিছু আপ্তবাক্য ও দায়সার কথা আউড়ে গেছেন ও যাচ্ছেন। সঙ্গীত-সাহিত্য আজও গড়ে ওঠেনি বাংলা ভাষায়। গড়ে ওঠেনি সঙ্গীত বিশ্লেষণের ভাষা ও সংস্কৃতি। এই বাস্তব পটভূমিতেই এ বইটি লেখা।

শারদীয় আজকালের জন্য লিখতে লিখতে এবং লেখাটি প্রাকাশিত হবার পর আর একবার পড়তে পড়তে মনে হয়েছিল কয়েকটি দিক আর একটু খোলসা করলে ভাল হয়। ভাল হয় আরও কয়েকটি ব্যাপারে উল্লেখ করলে। বই আকারে প্রকাশের জন্য লিখতে গিয়ে সেই কাজগুলি করতে চেষ্টা করেছি। আরও কিছু কথা বলার ছিল, কিন্তু সেগুলি বলতে গেলে এই বইটি সত্যিই ফের ঢেলে সাজাতে হবে। সেই ধৈর্য ও সময় আমার নিজেরই আছে কি?

দীর্ঘকাল গানবাজনা শুনেছি। আজও শুনছি। গানবাজনার প্রেমিক ও চর্চাকারী হিসেবেই নিজেকে দেখতে ভালবাসি। এই লেখায় এমন অনেক কিছু, এমন অনেক ব্যক্তির উল্লেখ আছে, খুব কম বাঙালিই যা এবং যাঁদের মনে রেখছেন। অনেক গান ভুলে গিয়েছে বাংলার মানুষ। অনেক গানের রেকর্ডও আর পাওয়া যায় না। আগেকার অনেক শিল্পী ও স্রষ্টা মারা গেছেন। সঙ্গীতকার ও শিল্পীরা তাঁদের কাজ ও ভাবনা নিয়ে কিছু লিখে রেখে যাবেন- এই ঐতিহ্য ও অভ্যেসটাই উপমাহাদেশে নেই। পাশ্চাত্যে এটি আছে। সেখানে তাই আজকের সঙ্গীত লেখকদের অনেক সুবিধে হয়। কিন্তু আমাকে নির্ভর করতে হয়েছে প্রধানত আমার স্মৃতির ওপরেই। এর ফলে কিছু এদিক-ওদিক হয়ে থাকতেই পারে। সে জন্য আমি দুঃখিত। কিন্তু সেই ‘দুঃখ” বড় মাপের নয়। গানবাজনা, আধুনিক বাংলা গানের অনেক কিছু যে আমি মনে রেখেছি, অনেক গানও যে আমি আজও মনে রাখতে পেরেছি সে জন্য আমি গর্বিত। আমি গর্বিত, কারণ আমি জানি যে বাঙালি তার গানবাজনায় যে উাদার মনোভাব দেখিয়েছে, দেশি-বিদেশি নানান উপাদান মিশিয়ে নতুন নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার যে সাহস দেখিয়েছি, আধুনিক বাংলা গানের মধ্যে দিয়ে বাঙালি যে আবিশ্ব-আধুনিকতার নজির রাখতে পেরেছে তা পৃথিবীর আর কোনও জাতি বোধহয় পারেনি। এই একটি ক্ষেত্রে অন্তত বাঙালি জাতির উদারতা, সাহস, নিরীক্ষামনস্কতা ও সৃজনশীলতার কোনও তুলনা নেই। আধুনিক বাংলা গানের মাধ্যমে বাঙালি সঙ্গীতের এমন কিছু ‘ইডিয়াম’ সৃষ্টি করতে পেরেছে যা তার নিজস্ব ( বাংলার অনেক মানুষ তা সচেতনভাবে ধরতে পারেননি হয়ত, কারন এই ব্যাপারগুলি ধরতে হলে কিছু শর্ত পূরণ হওয়া দরকার। প্রথমত ‘গান’ শোনার সময় শুধু ‘গান’ নয় ‘সঙ্গীত’ শোনর ধাত থাকা দরকার। এই সঙ্গীত একটা সামগ্রিক ব্যাপার, যা শুধু গায়ক-গায়িকার গলা থেকে বেরয় না। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাটা আজও এমন যে ছেলেবেলা থেকে মানুষের কানে সুসম্বদ্ধভাবে সঙ্গীত পৌছে দেওয়া হয় না। পাশ্চাত্যে প্রতিটি কিন্ডারগার্টেন ও স্কুলে ছেলেমেয়েদের উপযুক্ত গানবাজনার ব্যবাস্থা থাকে। আমদের দেশে প্রাত্যহিক পাঠ শুরু হওয়ার আগে বড় জোর একটি প্রার্থনা গান হয়, যা আদৌ সুখশ্রাব্য নয়, যার মধ্যে কোনও আনন্দ বা মজা নেই। আছে গুরুগম্ভীর একটা ভাব যা শিশুমন ও কিশোরমনে গানবাজনার প্রতি বিরক্তি জাগিয়ে তোলার পক্ষে যথেষ্ট। সুখের বিষয়, ছোটরা ওই বস্তুটিকে আদৌ ‘গান’ ভাবেন না। গানবাজনা শোনেন তাঁরা স্কুলের বাইরে।

আমাদের দেশে ছেলেমেয়েদের গানবাজনা শিখতে পাঠানো হয় সঙ্গীত শিক্ষায়তনে বা শিক্ষকদের কাছে। তাঁরা কিছু পরীক্ষায় পাসও করেন। কিন্তু সঙ্গীত বিদ্যালয় বা সঙ্গীত শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের মনে ‘সঙ্গীত’ সম্পর্কে সার্বিক কোনও ধারণা বা উৎসাহ জাগিয়ে তোলার কথা ভাবেন বলে মনে হয় না। অনুসন্ধিৎসা ও প্রশ্নমনস্কতার কোনও স্থান সেখানে নেই।

অনেক কিছুই তাহলে ‘নেই’। এত ‘নেই’-এর মধ্যে কোনও শিল্পরূপ, আঙ্গিক তাহলে বেঁচে থাকবে কি শুধু বাজারকে অবলম্বন করে? বোধহয় তাই। আর সে ক্ষেত্রে তাহলে বাজারের অনুবর্তী হয়ে চলাই হবে মোটের ওপর এই শিল্পরূপের ধর্ম। বেচারা বাংলা আধুনিক গান আমাদের সমাজে সেই ধর্মই পালন করে চলেছে, আজও চলছে। এরও সমাজতত্ত্ব নিয়ে ভাল কাজ হতে পারে। অবশ্য সঙ্গীত বা সঙ্গীতের কোনও বিশেষ রূপের সমাজত্ত্ব নিয়ে কাজ করতে গেলে ‘সঙ্গীত’ বিষয়টি সম্পর্কে সম্যক শিক্ষা ও ধারণাও থাকা চাই। কোনও দিন হয়ত সেই কাজ বাংলা ভাষায় হবে।

‘কোন পথে গেল গান’ আধুনিক বাংলা গানের ইতিহাস নয়। চার ও পাঁচের দশকের আধুনিক বাংলা গান নিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে হলেও কিছু লেখালেখি হয়েছে। কোনও কোনও শিল্পীকে নিয়ে তো হয়েছেই। একাধিক শিল্পী গত কুড়ি বছরে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন মিডিয়ায়। সেগুলি থেকেও শ্রোতারা পেয়েছেন কিছু মূল্যবান খবর, অন্তত ওই শিল্পীদের সম্পর্কে। কিন্তু সাতের দশক ও আটের দশকে ধুকতে থাকা বাংলা গানের ইন্ডাষ্ট্রি যে নয়ের দশকের গোড়া থেকে অসংখ্য শ্রোতার টাটকা নতুন উৎসাহের ঝাপটায় দুলে উঠল, পাইকারি ও খুচরো ব্যবসায় অর্থাৎ গানবাজনার বাজারেও যে এল অভূততপূর্ব এক জোয়ার (সমাজতত্ত্ব ও অর্থনীতির দিক দিয়ে যা দস্তরমতো গবেষণার দাবিদার, অথচ তা আজও হয়নি) সেই যুগমুহূর্ত পর্যন্ত আধুনিক বাংলা গান এল কীভাবে, কী ধরনের অবস্থার মধ্য দিয়ে কোন পথে তা নিয়ে লেখা এখন পর্যন্ত খুব কমই হয়েছে। যেটুকু হয়েছে তাতে অনেক জরুরি বিষয় ও ভাবনা স্থান পায়নি। তার কারণ, এ ধরনের লেখা দাঁড় করাতে গেলে পাঁচ দশকের আধুনিক বাংলা গান ও বাজনা শোনার অভিজ্ঞতা যেমন থাকতে হবে, অসংখ্যা গান যেমন মনে থাকতে হবে, তেমনি থাকতে হবে সঙ্গীত জগতের অনেক ব্যক্তিত্ব ও ব্যাপার এবং সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সময়, সমাজ, সমকালীন ইতিহাস ইত্যাদির প্রেক্ষিতে সঙ্গীত, আধুনিক বাংলা গান নিয়ে আলোচনা করার ইচ্ছে ও যোগ্যতা। এ কথাটি প্রথমেই স্পষ্ট ভাষায় বলা দরকার। শুধু স্মৃতি রোমন্থন, প্রিয় কিছু শিল্পীর স্মৃতিচারণ ও প্রশংসা আদৌ যথেষ্ট নয়। আধুনিক বাংলা গান বিষয়টি সার্বিকভাবে, সময়, সমাজ, মহুর্ত এবং অন্যান্য বিষয়ের পরিপ্রেক্ষিতে না দেখলে তার প্রতিই সুবিচার করা যাবে না। তেমনি আধুনিক বাংলা গানের শরীরে এবং তার জগতে কোন কোন দ্বন্দ্ব ছিল তা নিয়ে ও নির্মোহ হয়ে ভাবা দরকার, সেগুলি শনাক্ত করা একান্তই প্রয়োজন। দীর্ঘকাল সৃষ্টি ও চর্চার ধারাবাহিকতার পর বর্তমানে যে বাংলা গান রচনা করা হচ্ছে তার ঘাটতি, দুর্বলতা ও দ্বন্দ্ব কোথায় কোথায়, পরিবশটাই বা কেমন, গান তৈরি, প্রযোজনা, উৎপাদন ও বিপণনের ক্ষেত্রটি কীভাবে পাল্টে গিয়েছে, কোন কোন নতুন ব্যাপার এসে উপস্থিত হয়েছে, পালটে যাওয়া যুগে ‘আধুনিক বাংলা গান’ বস্তুটিকে সমকালীন স্রষ্টা ও শিল্পীরা কোন চোখে, কীরকম মন দিয়ে দেখছেন, তাঁদের ক্ষমতা ও অক্ষমতাই বা কোথায়, পরিবর্তনগুলি কোথায় কোথায় হয়েছে- এই এতগুলি দিক কিছুটা হলেও বিবেচনা না করলে যুক্তিগ্রাহ্য কোনও সিরিয়াস আলোচনা হওয়া সম্ভব নয়। আমি যে সবকটি দিকের প্রতি সুবিচার করতে পেরেছি সে দাবি আমার নেই। কিন্তু অল্প সময়ে যথাসম্ভব চেষ্টা করেছি। ইংরেজি ‘essay’ কথাটি এসেছে ফরাসি ভাষার ক্রিয়াপদ essayer থেকে, যার অর্থ ‘চেষ্টা করা’। আমার এই লেখাটি আক্ষরিক অর্থেই একটি ‘essay। চেষ্টা তার বেশি কিছু নয়। এর মধ্যে দিয়ে আমি আমার পর্যবেক্ষণ, ধারণা ও সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দিতে চেয়েছি উৎসাহী মানুষের কাছে। আবার বলছি, টানা লিখেছি, গবেষণাগ্রন্থ লিখতে চাইনি, অনেক সময়ে কথা বলে যাওয়ার ভঙ্গিতেই লিখে গিয়েছি, তাই দু-এক জায়গায় পুনরাবৃত্তি এসে গিয়েছে। একটা কথা বলতে গেয়ে তার সূত্রে অন্য কথাও ( অবান্তর নয়) এসে গিয়েছে বিষয়টিকে আরও খুলে দেওয়ার জন্য। বাংলা গানের প্রসঙ্গ থেকে পাশ্চাত্যের গান, কোন পরিবেশে, কোন সময়ে গানের একটি বিশেষ ধরন বা বৈশিষ্ট্য দেখা দিয়েছিল সেই কথাও এসে পড়েছে। যাঁর যথেষ্ট সময় নিয়ে আলোচনাগ্রন্থ লেখার আঙ্গিকে বইলেখেন তাঁরা এই ধরনে বিস্তরের স্বার্থে সম্ভবত আলাদা পরিচ্ছেদ বানিয়ে দিতেন। আমি তা দিইনি। অত গুছিয়ে লেখার লক্ষ্য আমার ছিল না। এ জন্য আমি দুঃখিত নই। আমার স্মৃতিতে অনেক কথা ছিল, আজও আছে, আমার ভাবনায় আছে আরও অনেক কথা। তার কিছুটা বেরিয়ে এসেছে এই বইতে। আমি যদি কাউকে এই কথাগুলি সামনে বসে বলতাম, তাহলে যেমন হত, আমার এই বইটি তেমনই। তার বেশি কিছু নয়।

পশ্চিমবঙ্গে খুব কম মানুষই বাংলাদেশের সঙ্গীত জগৎ সম্পর্কে কিছু জানেন। আধুনিক বাংলা গান নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের কোনও শিল্পী বা লেখক যখন কিছু বলেন বা লেখেন তখন মনে হয় বাংলা আধুনিক গান যেন বাংলার শুধু এই রাজ্যেই হয়েছে, হয়ে থাকে। আমি চেষ্টা করেছি অল্প কিছু জায়গায় ও সীমিত মাত্রায় হলেও বাংলাদেশের কথা বলতে, যদিও আমার জ্ঞানও খুবই কম। এ ব্যাপারে শ্রীমতী সাবিনা ইয়াসমীনের কাছে আমি ঋণী। অনেক তথ্য তিনিই আমায় দিয়েছেন।

সর্বশেষে আমর ঋণ স্বীকার করতে চাই শ্রী অলক চট্টোপাধ্যায়ের কাছে, যিনি আমায় নানাভাবে উৎসাহ ও তাড়া দিয়েছেন এই লেখাটি লিখতে। দীর্ঘকাল তিনি ভালবেসে আধুনিক বাংলা গান শুনে এসছেন। ভালবেসে স্মরণ করছি আমি শ্রীশচীদুলাল দাসকেও। যার মতো সুররসিক ও গান প্রেমী মানুষ কমই দেখেছি এ জীবনে। আজও তিনি হঠাৎ টেলিফোন করে বলেন, সুমন, এই গানটা একবার শোনো তো। এই বলে তিনি ক্যাসেট প্লেয়ারে বা সি ডি প্লেয়ারে একটি পুরনো, ভুলে যাওয়া গানের রকর্ড বাজান। কত সময়ে আমরা দুজন মিলে টেলিফোনেই একটি গানের স্থায়ী, অন্তরা বা সঞ্চারী গেয়েছি, অমন সুর আর হবে না বলে হাহুতাশ করেছি। এই বইটি আমি তাঁদের দুজনকেই উৎসর্গ করলাম।

আজকাল পত্রিকা ও প্রকাশনার কাছেও আমি ঋণী আমার অদ্ভুত সব লেখা তাঁরা কষ্ট করে প্রকাশ করেন বলে।

৩১ ডিসেম্বর -২০০৫
কলকাতা

এই তো সেদিন এক শনিবার দুপুরে গড়িয়াহাটয় দেখলাম তিন কিশোর গল্প করতে করতে হেঁটে যাচ্ছেন। প্রত্যেকের হাতেই গিটার। দুজনের গিটার খাপবন্দী। একজন তাঁর খাপখোলা গিটারটি কাঁধে নিয়ে হাঁটছেন। দৃশ্যটি আমায় মুহূর্তে ফিরিয়ে নিয়ে গেল আমার ছেলেবেলায়। ১৯৫৭ বা’ ৫৮ সাল। দক্ষিণ কলকাতার এস আর দাশ রোডের এক প্রতিবেশীর বড় মেয়েকে দেখতাম খাপে-ঢাকা একটি গিটার নিয়ে বাজনার স্কুলে যেত। বয়সে আমার চেয়ে অনেকটাই বড়। রঙিন শাড়ি আর হিল তোলা জুতো পরে গিটার হাতে সটান হেঁটে যেতেন। আমরা, রাস্তায় খেলতে থাকা পাড়ার ছোটদের দল, সরে গিয়ে তাঁকে পথ করে দিতাম। মাঝেমাঝে সেই দিদিদের বাড়ি থেকে গিটারের সুর ভেসে আসত। পরিচিত কোনও বাংলা আধুনিক গানের সুর। সে- গিটার আর বর্তমানে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা গিটার কিন্তু এক জিনিস নয়। তখন ছিল হাওয়াইয়ান গিটারের যুগ। কোলে শুইে য়, একাধিক আঙুলে প্লেকট্রাম পরে, ইস্পাতের একটি চকচকে বার দিয়ে বাোতে হত সেই গিটার। আমদের দেশে আর বাংলাদেশে আজ লোকে গিটার বলতে বোঝে বাংলায় আমরা যাকে ‘স্প্যানিশ গিটার’ বলে থাকি। গিটার যন্ত্রটি পৃথিবীর যে গোলার্ধে সবচেয়ে চালু, সেখানে কিন্তু আমদের ‘স্প্যানিশ’কে নিছক গিটারইি বলা হয়। স্পেনে যে গিটার জনপ্রিয় এবং একাধিক লোকনৃত্যের অনুষঙ্গ হিসেবে চালু, তার আকার একটু অন্যরকম, বেশ কিছুকাল হল তার তারগুলি নাইলনের, তা ছাড়া সেটি আগুলের নখ দিয়ে বাজাতে হয়। ইট ‘ক্লাসিকাল গিটার’ নামেই বেশি পরিচিত। যাই হোক, আজকের ওই তিন কিশোর আধুনিক বাংলা গান বা দুর্দান্ত হিট কোনও হিন্দি ছবির গানের সুর তাঁদের গিটারে তুলবেন বলে মনে হয় না। তাঁরা শিখবেন গিটারে নানান অবস্থান থেকে সপ্তকের স্বরগুলি আর বিভিন্ন কর্ড বিবিধ ছন্দে বাজাতে, যদিও তাতে আট মাত্রা আর ছ’মাত্রাই সম্ভবত হবে একমাত্র অবলম্বন। উপমহাদেশেসমেত পৃথিবীর আরও কোনও কোনও দেশে পাঁচ মাত্রা (jazzএ বিলক্ষণ আছে), সাত মাত্রা, দশ মাত্রার যে তালগুলি অনেককাল ধরে বর্তমান, আমাদের দেশের আজকের গিটার শিক্ষার্থীরা তার পরিচয় সহজে পাবেন না কারণ আজকের জনপ্রিয় গানগুলি ওই তালগুলি এড়িয়ে চলে।

আমার ছেলেবেলার সেই পাড়াতুতো দিদির আমলে কিন্তু হাওয়াইয়ান গিটার শিক্ষার্থীদের ওই সব তাল এড়িয়ে যাওয়ার জো ছিল না। সে যুগে কাহারবা আর দাদরা তাল বাদ দিলেও গান, গানের সুর জনপ্রিয় হতে পারত। ধরা যাক, পাঁচের দশকে বেতারে বারবার শোনা ‘মেঘ কালো আঁধার কালো, আর কলঙ্ক যে কালো’। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া, নচিকেতা ঘোষের সুর, গীতিকার ছিলেন প্রিয়ব্রত। গানটি ছিল সাত মাত্রায়। তেমনি, সত্যেন্দ্রনাথ দত্তর ‘পাল্কির গান’- এ সুর দিতে গিয়ে সলিল চৌধুরি একাধিক তালফেরতা ব্যবহার করেছিলেন। ছ’মাত্রার দাদরা ( সেকালে ‘ডবল দাদরা’ বলা হত), আট মাত্রার কাহারবা, সাত মাত্রার তেওড়া- সবই ছিল। বস্তুত, গানটি ‘ডবল দাদরা’য় শুরু হয়ে এবং গানের বেশিরভাগটায় সেই তাল আর দুলুনি বজায় রেখে শেষ হচ্ছে কিন্তু একটু ঢিমে সাত মাত্রায়।

সাত মাত্রায় প্রয়োগ আমরা পাঁচ ও ছয়ের দশকে আরও কিছু স্মরণযোগ্য বাংলা আধুনিক গান পেয়েছি। যেমন, সলিল চৌধুরির লেখা, নচিকেতা ঘোষের সুর করা, সবিতা চৌধুরির গাওয়া ‘আঁধারে লেখে গান হাজার জোনকি’। সলিল চৌধুরির লেখায়-সুরে ‘নৌকা বাওয়ার গান’ ( ‘ও মাঝি ভাইও’) সাত মাত্রায় অনবদ্য। তাঁরই আর একটি গান ‘সেই মেয়ে’-তেও (সচিত্রা মিত্রর গাওয়া) তালফেরতায় সাত মাত্রা।

আমার সেই পাড়াতুতো দিদি ও তাঁর সহশিক্ষাথীরা গানবাজনার যে পরিবেশে ছিলেন তাতে সঙ্গীতের নানান বৈচিত্র্য ও উপাদানের স্থান ছিল। রেডিও চালালে যে গানবাজনা শোনা যেত তা যে শুধু বৈচিত্র্যপূর্ণ ছিল তা নয়, ছিল ছাঁকনিতে ছেঁকে নেওয়াও। বোতারে বা গ্রামোফোনে যত গানবাজনা হত, তার সবটা উৎকৃষ্ট ছিল না মোটেও। মামুলি জিনিস ও ছিল প্রচুর। কিন্তু গানবাজনার ছিটেফোটাও শেখেননি, গলা বা হাত বেসুর, কোনও দিক দিয়েই আড় ভাঙেনি এমন মানুষের গান বা বাজনা প্রকাশ্যে শোনা যেত না। এমনকি পাড়ার জলসাতেও সে সব স্থানীয় ‘উদীয়মান’ শিল্পীর গানবাজনা শোনা যেত, তাও নেহাত ফ্যালনা ছিল না। নয়ের দশকের মাঝামাঝি থেকে এখন পর্যন্ত, বিশেষ করে গত বছর পাঁচেকে পশ্চিমবঙ্গে আমরা যে ‘সঙ্গীতশিল্পীদের’ (?) গানবাজনা শুনছি, সমাজে, টেলিভিশনে যাঁদের অনুষ্ঠানের পর অনুষ্ঠান দেখছি-শুনছি, কোনও কোনও পত্রিকায় যাঁদের ছবি দেখছি, তাঁদের অনেকেরই মান সে-যুগের পাড়ার জলসার ‘উদীয়মান শিল্পীদের’ চেয়েও অনেক নিচু। সে-যুগের সেই শিল্পীদের মধ্যে বেশিরভাগই কোনওদিন নাম করতে পারেননি। আজকের এই গাইয়ে-বাজিয়েরা কিন্তু দস্তরমতো নাম করে গিয়েছেন, গানবাজনা(?) করে ভাল রোজগার করেছেন, এঁদের বেশিরভাগ কস্মিনকালে সঙ্গীতশিক্ষা না করেও ইদানীং এমনকি গানের প্রতিযোগিতায় বিচারকের ভূমিকাতেও থাকছেন, ভাষণ দিচ্ছেন সঙ্গীত সম্পর্কে।

উপযুক্ত প্রশিক্ষিণ আর অভ্যেস ছাড়া কেউ সচরাচর মিস্ত্রি, ঘরামি, কামার, কুমোর, তাঁতি, ছুতোর, নাপিত, হালুইকর, ময়রা, দর্জি, কসাই, মালি, চাষী, জেলে, মাঝি, গেছো-কিছুই হতে পারে না। নিজের নিজের ক্ষেত্রে কোনও দিন কিছুই শেখেনি, কোনও অভিজ্ঞতাই নেই এমন মানুষদের নিয়ে কোনও সমাজ না পারে গড়ে উঠতে, না পারে চলতে। যদি এমন দিন আসে যে খান-দুই বাক্য আগে উল্লেখিত মানুষরা, পেশাজীবীরা আসলে কেউ কোনও কাজ শেখেননি জানেন না, অথচ প্রত্যেকেই নিজেকে অমুক তমুক বলছেন এবং নানান পেশায় কাজ করতে চাইছেন, তো বুঝতে হবে সার্বিক অরাজকতা ও ধ্বংস আসন্ন।