Sufi Faruq Ibne Abubakar (সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর)

কোন পথে গেল গান – কবীর সুমন -২ বই সংগ্রহ

Kabir Sumon | কবীর সুমন

আমাদের সমাজে বেতার ও গ্রামোফোন আসার পর থেকে সঙ্গীত জগতে যে আলোড়ন দেখা দেয়, তা যদি শিক্ষানিরপেক্ষ ও সাঙ্গীতিকভবে নির্গুণ ও বাকসর্বস্ব হত, তাহলে বেতার বা গ্রামোফোন কোনওটাই চলত না। কারবার উঠে যেত। ওস্তাদের কাছে তালিম নিয়ে লোকে কামার বা রাজমিস্ত্রি হয়েছে, তেমনি সে যুগে (স্বাভাবিকভাবেই) ওস্তাদ বা কোনও শিক্ষকের কাছে তালিম নিয়ে গায়ক-বাদক হয়েছে। উপমাহদেশে কারুর কাছে তালিম ছাড়া, শুধু কানে শুনে যুগন্ধর কন্ঠশিল্পী হতে পেরেছেন, গুণীদের তারিফ পেয়েছেন সম্ভবত একমাত্র মৈজুদ্দিন। তিনি ছিলেন স্বভাব গায়ক এবং অবিশ্বাস্যরকম শ্রুতিধর। কিন্তু সচরাচর, ধ্রুপদী সঙ্গীতে দস্তারমতো প্রশিক্ষণ নিয়ে তবেই মানুষ শিল্পী হিসেবে আসরে প্রবেশাধিকার পেয়ে এসেছে যুগ যুগ ধরে। লঘু সঙ্গীতও ব্যতিক্রম নয়। সঙ্গীতশিক্ষা, রেওয়াজ, পরিশ্রম ছাড়া, শুধু খবরকাগজ, বন্ধুভাবাপন্ন সাংবাদিক, টেলিভিশন চ্যানেল, মদতদাতা চ্যানেলকর্তা বা কর্মীর জোরে গানবাজনায় নাম করে যাওয়ার রীতি যদি বরাবর দুনিয়ায় থাকত, সারা পৃথিবীতে সঙ্গীতের যে কী হাল হত, তা কল্পনা করে নিতে অসুবিধে হবে না যদি কেউ আজকের পশ্চিমবঙ্গ আর বাংলাদেশের দিকে তাকান।

ব্রিটিশ আমল থেকে উপমহাদেশের বেতারে গানবাজনা করতে গেলে পরীক্ষা দিতে হত। সেই ‘অডিশনে’ শুধু একটি তানপুরা আর তবলার সঙ্গতে গাইতে ও বাজাতে হত। পরীক্ষাকরা বসে থাকতেন আলাদা ঘরে। পরীক্ষার্থীর গান তাঁরা স্পিকারে শুনতেন। পাঁচের দশকের মাঝামাঝির ঠিক পর থেকে আকাশবাণীর সঙ্গে আমার পরিচয়। ১৯৬৬ সালে ( আমর বয়স তখন ১৭) আমি যখন ‘জেনারেল প্রোগ্রাম’ বা ‘বড়দের অনুষ্ঠানের’ জন্য প্রথম বেতারে অডিশন দিই, পরীক্ষকদের কাউকে দেখতে পাচ্ছিলাম না। তাঁরা স্টুডিওর স্পিকারে নির্দেশ দিচ্ছিলেন, আমি তা পালন করছিলাম। অডিশনে পাস করলে তবেই মানুষ বেতারে গান করার যোগ্যতা অর্জন করত। উত্তীর্ণ পরীক্ষার্থীদের, অডিশনে কে কেমন গাইলেন তার ভিত্তিতে বিভিন্ন শ্রেণীতে ফেলা হত। পাঁচের দশকে ‘এ’ ‘বি’ আর ‘স’- এই তিনটি শ্রেণী ছিল। ছয়ের দশক থেকে ‘সি’ গ্রেডটি তুলে দেওয়া হল, সম্ভবত বলতে বা শুনতে খারাপ লাগে বলে। তখন দাঁড়াল, এ, বি-হই আর বি। এই শ্রেণীর হিসেবে বেতারে অনুষ্ঠানের ডাক পেত লোকে। এ আর বি-হাই শিল্পীরা ডাক পেতেন বেশি, ঘনঘন, বি শিল্পীরা তার চেয়ে কম। বেতার অনুষ্ঠানে খারাপ গাইলে নামী গায়কদেরও আকাশবাণী থেকে জানানো হত। পর পর অনুষ্ঠান খারাপ হলে শিল্পীদের দেওয়া হত সতর্কতা বিজ্ঞপ্তি। বি গ্রেড থেকে সি গ্রেডে নামিয়ে দেওয়ার ঘটনা বারবার না ঘটলেও, একাধিকবার ঘটেছে আকাশবাণীতে পাঁচের দশকে। তেমনি, প্রথম অডিশনে তলার গ্রেড পেলে শিল্পীর অধিকার ছিল কিছুদিন পরে রি-অডিশন দেওয়ার। বাংলার একাধিক নামী শিল্পী চারের দশকেও পাঁচের দশকের গোড়ায় প্রথম অডিশনে একেবারে তলার শ্রেণী পেয়েছিলেন (তাও বারবার পরীক্ষা দিয়ে)। কিছুকাল পরে তাঁরা আবার পরীক্ষা দিয়ে ওপরের শ্রেণীতে ওঠেন। একাধিকবার অডিশনে অকৃতকার্য হয়েছিলেন যাঁরা, তাঁদের একজন ছিলেন সতীনাথি মুখোপাধ্যায়। এমনকি তিনি! এ জন্য, কী আশ্চর্য, তাঁর মনে গর্বও ছিল। একবারও তাঁকে বলতে শুনিনি, আমার মতো আর্টিস্টকে ফেল করিয়ে দিল! বরং, খুব ছোটবেলায় তাঁকে বলতে শুনেছি, ‘তামার বাবা যখন অডিশন বোর্ডে ছিলেন, আমি তখন কয়েকবার ফেল করেছি, পরে তাঁর হাতেই করেছি পাস। কী কড়া আর নির্ভেজাল মানুষই না ছিলেন বড়দা। কোথাও একটু ত্রুটি হলে কোনও ক্ষমা নেই। আবার সত্যিই নিখুঁত গাইলে বুকে টেনে নেওয়া!’

বেতারের কষ্টিপাথরে যাচাই হয়ে যাঁরা বেরিয়ে আসতেন, তাঁদেরই গানবাজনা শুনত উপমাহাদেরশের মানুষ, শুধু উপমাহাদেশ কেন, সারা পৃথিবীর মানুষ। তেমনি, বেতার অনুমোদিত সুরকার ও গীতিকাররাও ছিলেন। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বেতারে গানের কথার ব্যাপারে বাধানিষেধ আছে, থাকতে বাধ্য। সব কথা বেতারে বলা যায় না। তেমনি, সব বিষয়ে গানও লেখা যায় না যদি সে- গান বেতারে প্রচারিত হতে হয়। কিন্তু বিষয়ের সীমা সত্বেও কোন গানের লিরিক আদৌ লিরিক হয়ে উঠেছে তা বোঝার মতো মানুষ আকাশবাণীতে বিলক্ষণ ছিলেন। এ নিয়ে তর্কের অবকাশ থাকতেই পারে। কেউ বলতেই পারেন, আকাশবাণী থেকে প্রচারিত অধিকাংশ গানের কথা ছিল একই বিষয়নির্ভর, একঘেয়ে শব্দ ও রূপকল্পে ভরা, একাধিক দিক দিয়ে পৌনঃপুনিকতা দোষে দুষ্ট। কিন্তু সে ব্যাপারে আকাশবাণীর তেমন কিছু করার ছিল না। কোনও গীতিকার যদি উদ্ভাবনপটু ও সৃজনশীর না হন তো আকাশবাণীর বা রাষ্ট্রকে সে জন্য দায়ী করা যুক্তিসঙ্গত নয়। কারণ ওরই মধ্যে এক সময়ে আমরা জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের ‘এ কেমন রাত পোহাল দিন যদি আর এলা না’, ‘পদ্মপাতায় রেখেছ আমার মনের সুধা’. ‘এ কোন সকাল রাতের চেয়েও অন্ধকারে’,’আমি ফুলকে যেদিন কেঁদেসেধে আমার সাজি ভরেছি’র মতো লিরিক পেয়েছি সাতের দশকের প্রথমার্ধে। গানগুলি আকাশবাণী কলাকাতা কেন্দ্রের আধুনিক গানের অনুষ্ঠানে প্রচারিত হত। এই সুযোগে বলে রাখি, আমার ‘হাল ছেড় না বন্ধু’,’আমায় যদি দেখতে চাও’,’কতটা পথ পেরলে তবে পথিক বলা যায়’ ইত্যাদি গান গ্রামোফোন রেকর্ড করার প্রায় এক বছর আগে আকশবাণী কলকাতা কেন্দ্রের আধুনিক গানের নিয়মিত অনুষ্ঠানে আমিই গেয়েছিলাম, শুধু গিটার বাজিয়েই, কারণ গীতিকার হিসেবে অনুমোদন আমি পেয়ে গিয়েছিলাম তার মধ্যেই। রাষ্ট্রীয় বিধিনিষেধের আওতায় থেকেও গ্রহণযোগ্য লিরিক দেখা যায়, যদি ক্ষমতা থাকে। আকাশবাণীর অনুমোদনের জন্য আর সকলের মতো আমাকেও বিভিন্ন বিষয়ে পঁচিশটি গান জমা দিতে হয়েছিল। তার মধ্যে ঋতু, প্রেম, দেশপ্রেম, ভক্তি ইত্যাদি বিষয়ও ছিল।

তিন, চার ও পাঁচের দশকে সুরকার হিসেবে যাঁরা বাঙালি সমাজে বিশিষ্ট হয়ে ওঠেন, তাঁরাও নিঃসন্দেহে বড় মাপের শিক্ষা, প্রতিভা ও সৃজনশীলতার অধিকারী ছিলেন। আমি লজ্জিত যে বাংলাদেশের আধুনিক সঙ্গীত জগৎ সম্পর্কে আমার ধারণা খুবই সীমিত। কিন্তু তাও পাঁচ ও ছয়ের দশকে বাংলাদেশের ( তখনও পূর্ব পাকিস্থান) আবদুল আহাদ, আবদুল লতিফ, ধীর আলি মিয়াঁ, কাদের জমিরি, আবদুল হালিম চৌধুরি, সমর দাস, আলতাফ মাহমুদ, খান আতাউর রহমান, সুবল দাস, সত্য সাহা, আনোয়ার পারভেজ, আলি হোসেন, করিম শাহাবুদ্দিন, আজাদ রহমান, রবিন ঘোষের মতো সুরকাররা ( অনেকের নাম আমার ঠিক জানা নেই) যে কাজ করে গিয়েছেন, তার পরতে পরতে তাঁদের শিক্ষা, বিবর্তন, প্রতিভা ও সৃজনশীরতার পরিচয়। পশ্চিমবঙ্গের সুরকারদের পাশাপাশি এঁদের এবং এঁদের পরবর্তী প্রজন্মের সুরকার, যেমন আলম খান, আলাউদ্দিন আলি, দেবু ভট্টাযার্য, আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের সুরগুলি না শুনলে এ রাজ্যের বাঙালির অভিজ্ঞতা চিরকাল একপেশে আর আধাখেঁচড়াই থেকে যাবে। এতদিন ধরে এ রাজ্যে সেই ট্র্র্যাডিশনটাই চালু। মোট কথা, গায়ক-গায়িকাদের মতো, যন্ত্রীদের মতো, সুরকাররাও ছিলেন যোগ্যতার অধিকারী। আচমকা একদিন ‘পি আর’ অর্থাৎ ‘পাবলিক রিলেশনস’ এর জোরে প্রচারমাধ্যমের ঢাক পিটিয়ে, কাগজে ছবিটবি ছাপিয়ে, টিভি চ্যানেলে সাক্ষৎকার দিয়ে কেউ ঘোষণা করে ফেললেন যে তিনি সঙ্গীতকার, এমন কালচার তিন, চার, পাঁচ, ছয়, সাত, এমনকি আটের দশকেও বাঙালির ছিল না। থাকলে আমরা পঙ্কজ মল্লিক, রাইচাঁদ বড়াল, কাজী নজরুল ইসলাম, কমল দাশগুপ্ত, দুর্গা সেন, অনুপম ঘটক, রবিন চট্টোপাধ্যায়, শচীন দেববর্মন, সুধীরলাল চক্রবর্তী, সঙ্গীতাচার্য জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ, কালীপদ সেন, পরেশ ধর, অনিল বাগচি, সলিল চৌধুরি, নচিকেতা ঘোষ, সুধীন দাশগুপ্ত, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, ভি বালসরা, অলোকনাথ দে কাউকেই পেতাম না। পেতাম না সুরকার হিসেবে সতীনাত মুখোপাধ্যায়, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, শৈলেন মুখোপাধ্যায়, ভূপেন হাজারিকাকে।

কৃতী মানুষদের নামের তালিকা দেওয়া আমার এই লেখার উদ্দেশ্য নয়, তাই কিছু নাম বাদ পড়েছে। মোট কথা, জীবন ও জীবিকার অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো রাগসঙ্গীত ও লঘুসঙ্গীতও তালিম, ধারাবাহিক অনুশীলন ও ব্যবহারিক অভিজ্ঞতালব্ধ শিক্ষার পথ ধরেই মানুষের ‘শিল্পী’ হয়ে ওঠার কথা। দীর্র্ঘকাল সেই রেওয়াজই ছিল এ দেশে। বেতারের প্রবেশিকা পরীক্ষায় যোগ্যতা অর্জন করলে তবেই লোকে গ্রামোফোন রেকর্ড করার ভাবতে পারত। সেখানেও পরীক্ষা ছিল। বিভিন্ন কোম্পানির সঙ্গীতবিশারদরা আবেদনকারীর গান শুনতেন-কী এ দেশে, কী বিদেশে। আকাশবাণীর সঙ্গে রেকর্ড কোম্পানিগুলির চুক্তি ছিল। গ্রামোফোন ডিস্ক বেরলে আকাশবাণীর হাতে তা আসত।
বেতারের নানান অনুষ্ঠানে তা বাজত। অর্থাৎ শ্রোতারা বেতারে যে গ্রামোফোন রেকর্ডগুলি শুনতেন, সে গুলিও ছিল যোগ্য শিল্পীদেও গাওয়া, সুর করা, লেখা। তার মানে এই নয় যে প্রতিটি গান খুব উচ্চমানের ছিল, ছিল খুব স্মরণীয়। তা হওয়া সম্ভবও নয়। কিন্তু ন্যূনতম একটা মান যে অন্তত বেশিরভাগ গ্রামোফোন রেকর্ডেরই ছিল, তাতে সন্দেহ নেই।

আধুনিক বাংলা গান গত পরশুর খোকা নয়। উনিশ শতক থেকে এ নিয়ে ভাঙাগড়া, পরীক্ষানিরীক্ষা, অনুশীলন ও চর্চা হতে থাকে। এ-দেশে বেতার ও গ্রামোফোন আসার ফলে সঙ্গীত হয়ে ওঠে সামাজিকভাবে গতিশীল। রেকর্ডের ব্যবসার জন্য গানের চাহিদাও বাড়তে থাকে। দুয়ের দশকের দ্বিতীয়ার্ধে ম্যানুয়াল রেকর্ডিংয়ের জায়গায় চালু হয়ে যায় বৈদ্যুতিক রেকর্ডিং প্রযুক্তি আমাদেও এই শহরে। গ্রামোফোনের ক্ষেত্রে প্রায়োগিক উন্নতি মোটামুটি অল্পকালের মধ্যেই অনেকটা এগিয়ে যাওয়ায় রেকর্ডিংয়েরর মান এবং গ্রামোফোন কোম্পানির উৎপাদন ক্ষমতা দুই-ই যায় বেড়ে। ফলে আরও গান, গানের গীতিকার, সুরকার, গায়ক-গায়িকা আর যন্ত্রশিল্পীর প্রয়োজন দেখা দেয়। বাংলায় এসে পড়ে পেশাদার সঙ্গীতশিল্পীদের যুগ। কাজী নজরম্নল ইসলাম, যেমন, আমাদের দেশের প্রথম প্রজন্মের পেশাদার সঙ্গীতকারদের অন্যতম ছিলেন। সঙ্গীতসৃষ্টি ও সঙ্গীত পরিবেশনার সুযোগ ও পরিসর অল্প সময়ের মধ্যে অনেকটা বেড়ে যাওয়ায় সৃষ্টির একটা হুল্লোড় পড়ে যায় বাংলায়। যে প্রশ্নটি এখানে স্বাভাবিকভাবে ওঠার কথা-একসঙ্গে অতজন সৃজনশীল মানুষ গানের জগতে জুটলেন কী করে। সুযোগ বাড়লেই যে সৃজনশীলতা বাড়বে, বৃদ্ধি পাবে গুনী মানুষের সংখ্যা, তা বোধহয় বলা যায় না। এই মুহূর্তে ক্যাসেট ও সিডিতে, নানান টিভি চ্যানেলে, এফ এম বেতার চ্যানেলে, এমনকি বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি উৎসবে-জলসায় বাংলা গান গেয়ে-বাজিয়ে প্রচারের সুযোগ এতটাই বেশি যে, মাত্র দু,দশক আগে তা কল্পনাও করা যেত না। কিন্তু গানের মতো গান সেখানে কটা শোনা যাচ্ছে? ক’জনের গানবাজনা শুনলে ইচ্ছে হয় আরও শুনতে? ফি মরশুমে, ফি বছর হাজার হাজার নতুন গান। বিলিতি ইঁদুর আর গিনিপিগও হকচকিয়ে যাবে সমকালীন বাঙালির গান-প্রসবের বহর দেখে। কিন্তু কটি গান গুনগুন করতে ইচ্ছে করছে কারুর? তাহলে, গাজবাজনা প্রচারের সুযোগ বাড়লেই যে ভাল গানবাজনার বহর আর যোগ্য, সৃজনশীল সঙ্গীতকার, সঙ্গীতশিল্পীর সংখ্যা ও বাড়বে, তা সত্য না-ও হতে পারে। কিন্তু এটা সত্যি যে, বিশ শতকের তিন থেকে পাঁচের দশকের মধ্যে পেশাদার বাংলা গানের জগতে অনেক গুণী মানুষের এক বিস্ময়কর সমাগম হয়েছিল। পাওয়া গিয়েছিল মনে দাগ কাটার মতো, মনে রাখার মতো অনেক গান। কেন এটা ঘটেছিল শুধু সেটাই হয়ত একটা আলাদা গবেষণার বিষয় হতে পারে। এই লেখার পরিসরে শুধু এটুকুই জল্পনার ভঙ্গিতে বলা যায় যে, দীর্ঘকাল ধরে চর্চা হতে হতে বাংরা গান নতুন নতুন রূপে প্রকাশিত হওয়ার অভুতপূর্ব একটা সুযোগ বেতার – গ্রামোফোন – জলসা এই তিনটি নতুন ব্যাপারের মধ্যে দিয়ে এসে পড়ায় বাঙালি সঙ্গীতকার, শিল্পী ও শিক্ষার্থীদের মনে একটা জোরালো স্ফুর্তি সম্ভবত দেখা দিয়েছিল। ওই সুযোগটি ছিল একবারেই অভিনব, তাই ওই স্ফুর্তি। কিন্তু শুধু স্ফুর্তি, উদ্দীপনা, এসো – কিছু একটা করে ফেলি গোছের বেপরোয়া ভাব দিয়ে সৃষ্টি হয় না, কাজের ধারাবাহিকতাও বজায় রাখা যায় না। শিক্ষা, তালিম, অনুশীলন, অধ্যবসায়, ভাল কাজ শোনা, এই দিকগুলি যদি সে যুগে বাংলায় জোরালো না হত তো ওই গুণী সমাবেশ ঘটত না, মিলত না ভাল গানের ওই সম্ভার।

গানবাজনা লোকে শোনে প্রধানত সুর – তাল – ছন্দের আকর্ষণে। গানের কথা নিয়ে মানুষ সচরাচর তেমন চিন্তিত হয়ে ওঠে না। তেমনি, যে মন নিয়ে মানুষ কবিতা পড়ে বা শোনে, সেই মন নিয়ে মানুষ গান শোনে না। রবীন্দ্রনাথ তাঁর একটি নিবন্ধে মোক্ষম লিখেছেন: ‘ কবিতার কথা পড়িবার জন্য আর গানের কথা শুনিবার জন্য। ‘ তাঁর মতো কাব্যপ্রাণ, কাব্যনিষ্ঠ মানুষও ওই দুই কথাকে ‘ এক তুলাদণ্ডে ওজন করিবার ‘ ব্যাপারে সাবধান করে দিয়েছেন তাঁর পাঠক শ্রোতাদের। সেই সঙ্গে তিনি অবশ্য জানাতে ছাড়েননি যে, তাঁর মন থেকে যখন গান এল তখন তা কথা আর সুরের গলাগলির ‘ পরিণমাই হল। এই কথা সুরের গলাগলির দিকটা খেয়াল রাখাটা জরুরি। আধুনিক বাংলা গানের প্রধান আবেদন ছিল সুরে তালে। সুর এমনই এক শক্তি যার ম্যাজিকে অতি অকিঞ্চিৎকর কথাও পার পেয়ে যেতে পারে। কিন্তু তার একটা সীমা থাকে। সীমাটা বোধহয় সময়ই ঠিক করে দেয়। অথবা, এভাবেও বলা যেতে পারে যে, সময় ও যুগমুহূর্ত ওই সীমা সম্পর্কে কোনও কোনও মানুষকে সচেতন করে তোলে। বেঁচে থাকার চেষ্টায়, জীবণধারণের প্রয়োজনে সাধারণ-অসাধারণ মানুষের এত সময় আর মেহনত যায় যে সঙ্গীত, গান, কবিতার মতো বিষয়ে সচেতন থাকার অবকাশ তার হয় না। তা ছাড়া, সঙ্গীত বা ওই ধরনের শিল্পের ব্যাপারে সবাই সমান মাত্রায় সংবেদনশীল নন। পৃথিবীতে এমন মানুষ নেহাত কম নন, সুর যাদের কিছুই বলে না। তবু সকলেই সঙ্গীত শোনেন। সেই ‘ শোনা ‘ সবার ক্ষেত্রে একরকম নয়, সবার ভেতরে সুর তাল ছন্দ সমমাত্রিক প্রতিক্রিয়া ঘটায় না, এক ধরনের অনুরণন তোলে না। তবু শোনেন সকলেই। এখানেই সঙ্গীতের সঙ্গে মানুষের এক আশ্চার্য সম্পর্কের সূত্র রয়েছে।

অন্য সব জাতির মতো বাঙালিও বেতার ও গ্রামোফোনের যুগে যে বাংলা গান শুনেছে, তার প্রধান কৃতিত্ব সুরকার, কন্ঠশিল্পী ও যন্ত্র শিল্পীদেরই পাওনা। বাণিজ্যিক গানের প্রযোজনায় যন্ত্রীদের ভূমিকা যে কত বিশিষ্ট ও অপরিহার্য তা কেউ সচরাচর বলেন না। গ্রামোফোন রেকর্ডিংয়ের প্রথম যুগে বাজনা থাকত খুব কম, কারণ রেকর্ডিং পদ্ধতি তখন এতই অনগ্রসর ছিল যে বেশি বাজনা ধ্বনির দিক দিয়ে কোনও কাজেই লাগত না। তা ছাড়া, বিশ শতকের একবারে প্রথম দিকে শহরে এত যন্ত্রীও হয়ত ছিলেন না। রেকর্ডিং প্রযুাক্তির উন্নতির সঙ্গে একদিকে আরও বেশি বাজনা প্রয়োগ করা সম্ভব হয়ে ওঠে, আর অন্যদিকে নানান বাজনা শিখে রপ্ত করার দিকেও নিশ্চয়ই মন যায় আরও বেশি মানুষের। মনে রাখা দরকার, উনিশ শতক থেকেই কিছু দক্ষ ইউরোপীয় যন্ত্রী এবং অর্কেস্ট্রা পরিচালক কলকাতায় বাস করতে শুরু করেন। সাহেব ও সাহেবি রুচির বাঙালি উচ্চবিত্তদের বিনোদনের জন্য অর্কেস্ট্রার ব্যবস্থা ছিল। এই যন্ত্রীদের কাছে আমাদের দেশের মানুষ ক্রমেই বেশি সংখ্যায় তালিম নিতে থাকেন। স্মরনীয় এটাও যে, বিভিন্ন ইউরোপীয় যন্ত্র ইউরোপীয়দের সঙ্গে এ দেশে এসে পড়েছিল অনেক আগেই আমাদের সাধারণ, এমনকি গ্রামের শিল্পীদের মধ্যেও ইউরোপীয় বাদ্য যন্ত্রের কদর যে কতটা ছিল, তা যাত্রার আবহ সঙ্গীতে কর্নেট, ক্ল্যারিনেট, বেহালা প্রভৃতি যন্ত্রের প্রয়োগ থেকেই বোঝা যায়।

তেমনি অতীতেও দেখা-শোনা যেত, আজও দেখা -শোনা যায় কলকাতার চিৎপুরের সাধারণ ব্যন্ডপার্টিগুলিতে আমাদের দেশের সাধারণ শিল্পীরা ড্রামসের তালে তালে ক্ল্যারিনেট, টিউবা, ট্রাম্পেট ইত্যাদি পাশ্চাত্যের যন্ত্র দিয়ে জনপ্রিয় দেশি গানের সুর বাজাচ্ছেন। দীর্ঘকাল এই ব্যান্ডপার্টিগুলি আমাদের দেশের বিভিন্ন উৎসবের অঙ্গ থেকেছেন, আজও আছেন। আরও কম -খরচের ‘ তাসা’ – পার্টিতেও বিভিন্ন কাড়া, নাকাড়া ( বা নাগরা ), ঢোলক ইত্যাদি তাল যন্ত্রে অনবদ্য – উদ্দাম তাল বাজতে থাকে, আর মূল গানটি বাজে ক্ল্যারিনেট, ওবো, সানাই এবং গত কিছু বছর যাবৎ বৈদ্যুতিক ‘টাইসোকোটো ‘ যন্ত্রে। যন্ত্রীরা সকলে নিতান্ত সাধারণ ঘরের মানুষ। পাশ্চাত্য সঙ্গীত শেখার সুযোগ তাঁরা কোথাও পাননা। কিন্তু পাশ্চাত্যের যন্ত্রগুলি তাঁদের আপন।

আশ্চর্য, একাধিক ইউরোপিয় দেশ (ব্রিটেন সবচেয়ে দীর্ঘকাল ) আমাদের উপমহাদেশে উপনিবেশ গেড়েছিল। অথচ এই ভূগণ্ডের একটি বাজনা বা সঙ্গীত- আঙ্গিককেও তার কেউ তাদের সঙ্গীত সৃষ্টিতে টেনে নিতে পারেনি। এদিকে দিয়ে বাদ্যযন্ত্রগুলির পাশে ইউরোপীয় বাজনাগুলিকে স্থান দিয়েছে -আপন আঙ্গিকে, ভালবেসে। আর্থিক দিক দিয়ে আমাদের উপমহাদেশ দরিদ্র। কিন্তু এই ভূখণ্ডের সাধারণ মানুষ সঙ্গীতে ঢের বেশি বিত্তশালী ও উদার পাশ্চাত্যের চেয়ে। রবিশঙ্করের মুন্সিয়ানার স্বাদ পেয়ে, শুনেছি, তসকানিনির মত সঙ্গীতকার এমনভাবে সিমফনি রচনা করেছিলেন যাতে রবিশঙ্কর তাতে বাজাতে পারেন। কিন্তু পশ্চাত্যে সেতার ও তবলা যন্ত্রদুটি সমাদর পেয়েছে ভরতীয় শিল্পীদের কৃতিত্বের কারণেই।

কলকাতায় বেতার অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার পর একজন প্রসিদ্ধ বেতার কথক ও শিল্পী নিয়মিত ক্ল্যারিনেট বাজিয়ে শোনাতেন। কালক্রমে পিয়ানো, অর্গ্যান, বেহালা, ভিয়োলা, চেলো, ডাবল বেস ( যা মন্দ্র সপ্তকে তালে তালে বাজে), ইউরোপীয় বাঁশি, পিক্কোলো, ট্রাম্পেট ইত্যাদি যন্ত্রের দক্ষ শিল্পী তৈরি হয়ে যান। কলকাতার সঙ্গীতশিল্পে বাঙালিদের পাশাপাশি অ্যাংলো ইন্ডিয়ান, পাঞ্জাবি, বিহারি, উত্তর প্রদেশি, নেপালি শিল্পীরাও বাজাতেন। একজন প্রবীন নেপালি ‘সি ট্রাম্পেট’ শিল্পীর সঙ্গে আমারই আলাপ হয়েছিল ১৯৭৯ সালে কলকাতায়, বিখ্যাত jazz শিল্পীদল ‘ মিঙ্গাস ডিনাস্টি ‘ যখন কলকাতায় বাজাতে এসেছিলেন। তাঁদের কর্মশালায় বাঙালি শিল্পী প্রায় ছিলেনই না। ছিলেন বরং কয়েকজন অ্যাংলো ইন্ডিয়ান শিল্পী এবং সেই নেপালি বাদক। অন্য দিকে, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর ব্যান্ডও স্বাভাবিকভাবেই ছিল আমাদের দেশে ব্রিটিশ উপনিবেশের কারণে। ওই দুই ব্যান্ডের প্রয়োজন মেটাতে ভারতীয়দের যন্ত্রসঙ্গীত শিখিয়ে দিয়েছিলেন ব্রিটিশ শিল্পীরা। বিশ শতকের গোড়া থেকেই এই রেওয়াজ ছিল। এই সব ব্যান্ডের ভারতীয় সদস্যরা পাশ্চাত্যের পদ্ধতিতেই বাজনা বাজতেন, ইউরোপীয় স্বরলিপিতেও পুরোদস্তর অভ্যস্ত ছিলেন। এই ভাবে একাধিক দিক দিয়ে ইুউরোপীয় বাদ্যযন্ত্রগুলি আমাদের দেশে কায়েম হয়ে উঠেছিল, সেই সব যন্ত্র শেখানোর মানুষও তৈরি হয়ে উঠেছিলেন। তবলা, পাখোয়াজ, খোল, ঢোল, ঢোলক, মন্দিরা, সেতার, সরোদ, বাঁশি, সারেঙ্গি, এস্রাজ, দিলরুবার মতো উপমহাদেশীয় যন্ত্র তো ছিলই, ছিলেন সেগুলি শেখানো ও শিখে নিয়ে বাজানোর মতো মানুষ। রেকর্ডিং প্রুযুক্তির উন্নতি, গানবাজনার প্রসার, জনজীবনে বেতারের ভূমিকা বৃদ্ধি, বাংলা গানের ব্যবসার প্রসার, চলচ্চিত্রে সঙ্গীতপ্রয়োগ- এই সব কারণে পেশাদার যন্ত্রশিল্পীদের ভূমিকা ও চাহিদাও ক্রমাগত বেড়ে যায়।

খুব কম শ্রোতাই গানের প্রযোজনায় ও রেকর্ডিং -এ বাজনার ভূমিকা সম্পর্কে সচেতন। সঙ্গীতের কান যার আছে তিনি সবকিছুর ভেতর থেকে কেবল কন্ঠসঙ্গীতকে আলাদা করে তুলে নেবেন এবং শুধু সেটারই রস আস্বাদন করবেন, যন্ত্রসঙ্গীতের রস আদৌ পাবেন না এটা অসম্ভব। যন্ত্রপ্রয়োগ সম্পর্কে বিশ্লেষণধর্মী কোন কথাই যখন বাংলা ভাষায় প্রচলিত সঙ্গীত আলোচনা ও সমালোচনায় হয় না তখন এ -বিষয়ে একটি সিদ্ধান্তেই আসা সম্ভব: ‘সঙ্গীত’ বিষয়টি বিচার্য নয়। শুধু তাই নয়। গানের নয়, সঙ্গীতের রসগ্রহণের ক্ষমতাও বোধহয় ‘ সঙ্গীত আলোচক ‘ ও ‘ সঙ্গীত সমালোচকের’ নেই। থাকলে তো তাঁরা যন্ত্রসঙ্গীতের দিকটা উহ্য বা নিতান্তই দায়সারা একটা জায়গায় রেখে দিতে পারতেন না। আর, সঙ্গীত বোঝার ক্ষমতা তাঁদের যখন নেই তখন ‘গান’ ( যে বস্তুটিতে কথার সঙ্গে সুরতালও থাকতে বাধ্য ) নিয়ে কথা বলা ও লেখার অধিকার তাঁদের আদৌ আছে কি? লক্ষণীয় বাংলা ভাষায় চলচ্চিত্র নিয়ে সে সিরিয়াস লেখালিখি হয়ে থাকে সেখানেও চলচ্চিত্রে সঙ্গীত প্রয়োগ নিয়ে প্রায় কিছুই বলা হয় না। অথচ, নিছক নেপথ্যে ব্যবহৃত গানই নয় সঙ্গীত বস্তুটাই চলচ্চিত্রের অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক। শুধু গানের কথা নিয়ে নয়, সুরতাল ও সঙ্গীত নিয়ে আমরা চিন্তত হতাম, এ- বিষয়ে আমাদের কান ও মগজ যদি থাকত তো আমাদের মনে থাকতে পারত যে আকাশবাণীতে এককালে এস এল দাস নামে একজন বাদ্য যন্ত্র- উদ্ভাবক ছিলেন যিনি প্রচলিত কয়েকটি যন্ত্রের ভিত্তিতে নতুন বাদ্যযন্ত্র তৈরি করছিলেন : মন্দ্রবাহার ও কোয়েলা। মন্দ্রবাহার ছিল বড় মাপের একটি দিলরুবাগোছের যন্ত্র যা দাঁড়িয়ে ছড় টেনে বাজাতে হত এবং যার আওয়াজ ছিল ইউরোপিয় যন্ত্র ‘চেলোর ‘ মত- মন্দ্রস্বরবিশিষ্ট। ‘চেলোর ‘ মত হলেও মন্দ্রবাহারের ধ্বনিবৈশিষ্ট ছিল একটু আলাদা। আমার মনে আছে, ১৯৭১ সালের আকাশবাণীর একটি বিশেষ রেকর্ডি- এ পঙ্কজ কুমার মল্লিকের পরিচালনায় কাজ করার সময় দেখেছিলাম- শুনেছিলাম মন্দ্রাবাহার বাজছে। তিনি আমায় বলেছিলেন ওটি বিরল এক যন্ত্র এবং ওই যন্ত্র বাজানোর শিল্পী আর বেশিদিন থাকবে না। বাঙালি যে কী পরিমান সঙ্গীত- বিতৃষ্ণ, অসঙ্গীতমনস্ক এবং পঙ্কজ কুমার মল্লিকের দূরদৃষ্টি যে কতটা ছিল তার প্রমাণ মন্দ্রবাহার যন্ত্রটি কালক্রমে লোপ পেয়েছে। কারুর স্মৃতিকথায়, আলাপচারিতে বা লেখায় ওই যন্ত্রটির কোন উল্লেখ পাওয়া যায় না। আজ যাঁরা প্রবীণ এবং যাঁরা দাবি করেন যে কলকাতার সঙ্গীত জগতের সঙ্গে তাঁদের এককালে ঘনিষ্ঠ যোগ ছিল তাঁদের কিন্তু মন্দ্রবাহার যন্ত্রটির কথা মনে থাকা উচিত। তেমনি ‘কোয়েলা ‘ যন্ত্রটিও ছিল ছড়- টানা, যদিও আকারে ছোট, আওয়াজে তারসপ্তকনির্ভর। মিষ্টি, চিকন আওয়াজ ছিল কোয়েলার। এই যন্ত্রটির উল্লেখও কোন প্রবীন বাঙালি সঙ্গীত- আলোচকের লেখায় পাওয়া যায় না। অথচ এগুলি ছিল বাঙালিরই উদ্ভাবন।

মন্দ্র সপ্তকটি সঙ্গীতে খুব জরুরি। গানবাজনায় মন্দ্র ধ্বনিটি না থাকলে বনেদটাই যেন পাকা হয় না। এই কারণে ভারতের চার তারের তানপুরা যন্ত্রে একটি তার দেয় খরজের ‘সা’। প্রথমে ( রাগ অনুসারে) পঞ্চম বা মধ্যম বা নিখাদ, তারপর মধ্য সপ্তকের তারের ‘সা’ দুটি, শেষে খরজের ‘সা’। মন্দ্রধ্বনিবিশিষ্ট এই খরজের ‘সা’ টি না থাকলে ধ্বনির দিক দিয়ে ‘সুর’ কায়েম হতে পারত না। সঙ্গীত শুধু মধ্য ও তার সপ্তক নির্ভর হলে তা ভেসে বেড়ায়, মোকাম পায় না। আমাদের উপমহাদেশের অধিকাংশ চামড়ার তালবাদ্যে ( মৃদঙ্গ, পাখোয়াজ, তবলা, খোল, ঢোল, বাংলা ঢোল, ইত্যাদি) চড়া আওয়াজের সঙ্গে খাদের আওয়াজেরও সংস্থান থাকে- শিল্পীরা বাঁ হাত দিয়ে এই গম্ভীর ধ্বনিটি তোলেন।পাশ্চাত্য সঙ্গীতে যেখানে সঙ্গীতরচনা ও অর্কেস্ট্রারচনায় বিভিন্ন যন্ত্রের ধ্বনিবৈশিষ্টের প্রতি কঠোর আনুগত্য রক্ষা করা হয়ে আসছে আজ বহু শতাব্দী ধ’রে, মন্দ্রধ্বনি এবং সেই ধ্বনিবিশিষ্ট যন্ত্রের ব্যবাহার অপরিহার্য। হার্পসিকর্ড, পিয়ানো, অর্গ্যান একর্ডিয়ন, ক্লাসিকাল গিটার, ‘ফোক’ গিটার ব্যাঞ্জো- সব যন্ত্রেই তার সপ্তকের সঙ্গে মন্দ্র সপ্তক ব্যবহার করার শুধু উপায় আছে তাই নয়, রচনায় ও বাজনার শৈলীতে তা অনিবার্য। লঘুসঙ্গীতে মন্দ্র স্বরের সঙ্গে ছন্দটিও ধরে রাখার জন্য পাশ্চাত্যে ‘বেস’ (bass) যন্ত্র ব্যবহার করা হয়ে আসছে দীর্ঘকাল। ‘জ্যাজ ‘- এ আজও অনেকে ব্যবহার করে থাকেন ‘আপরাইট বেস’ বা ‘একুস্টিক ডাবল বেস’। কয়েক দশক আগেও এই ‘বেস ‘ যন্ত্রটি পাশ্চাত্যের আধুনিক গানের সঙ্গেও ব্যবহার করা হত। কালক্রমে তার জায়গা নিয়েছে ‘ইলেকট্রিক বেস গিটার ‘। পাশ্চাত্য সঙ্গীতায়োজন পদ্ধতির প্রভাবে উপমাহদেশেও তিনের দশকের পর থেকে আধুনিক গানের রেকর্ডিং এ ‘ডাবল বেস ‘ ব্যবহার করা হতে থাকে। এর ফলে সঙ্গীত প্রযোজনায় ধ্বনির দিক থেকে একটি আলাদা মাত্রা আসে। পঙ্কজ কুমার মল্লিক, অনুপম ঘটক, রবিন চট্টোপধ্যায়ের মত সঙ্গীত পরিচালকরা তাঁদের কাজে এই যন্ত্রটি ব্যবহার করতেন। পাঁচের দশকের পর থেকে এটির ব্যবহার কলকাতায় অন্তত কমে আসে। এর সঠিক কারণ আমি জানি না। এমন হওয়া বিচিত্র নয় যে এই যন্ত্রের শিল্পী একটা সময়ের পর আর তৈরি হননি। যন্ত্রটিও আর আমদানি হত না। কিন্তু প্রতিবেশী বাংলাদেশে চলচ্চিত্রের গানের রেকর্ডিং-এ ‘ডাবল বেস’- এর ব্যবহার সাতের দশকেও ছিল। বাংলাদেশের সুরকার আনোয়ার পারভেজ ( বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের যে দেশাত্মবোধক গানগুলি পশ্চিমবঙ্গে খুবই শোনা যেত সে গুলির অন্যতম ‘জয় বাংলা বাংলার জয় ‘ এর তিনি ছিলেন সুরকার) নিজে এই যন্ত্র বাজাতেন। আটের দশক থেকে সারা উপমহাদেশেই লঘুসঙ্গীতের রেকর্ডিং- এ, এমনকি জলসাতেও ‘বেস’ যন্ত্রটি আবার ফিরে আসে ‘বেস গিটারের ‘ রূপ নিয়ে। গত দুই দশকে এই যন্ত্রটি অপরিহার্য হয়ে উঠেছে রেকর্ডিং- এ। উপমহাদেশে ও বাংলা গানের আধুনিক রেকর্ডিং ব্যবস্থায় কত বিচিত্র বাজনা যে ব্যবহার করা হয়ে আসছে শুধু তারই ভিত্তিতে আধুনিক সঙ্গীতের বিবর্তন বিষয়ে জরুরি গবেষনা সম্ভব। পাশ্চাত্যে তা আগেই হয়ে গিয়েছে, কারণ সেখানে সঙ্গীত বিষয়টিকে তার যোগ্য গুরুত্ব দেওয়া হয়ে থাকে। আমাদের দেশে সঙ্গীত নিয়ে ইতহাসনিষ্ঠ আলোচনা আজও শুরু হতে পারেনি, কারণ আসলে আমরা সঙ্গীত নিয়ে চিন্তিত নই। ফলে, বাংলা গান বিষয়ক আলোচনায় বাজনা ও যন্ত্রসঙ্গীত বিষয়টি স্থান পায় না। গানের রেকর্ডিং- এ, বেতার অনুষ্ঠানে ও চলচ্চিত্র শিল্পে যন্ত্রীদের ভূমিকাও অনুল্লিখিতই থেকে যায়। বাঙালির গান শোনার আনন্দের উৎসে সুরকার, গায়ক, গীতিকারদের পাশাপাশি আমাদের দেশের অসামান্য যন্ত্রীরাও ছিলেন। শচীন দেববর্মনের গাওয়া ‘জানি ভ্রমরা কেন কথা কয় না ‘ গানের রেকর্ডিং- এ দিলরুবা যন্ত্রের সিদ্ধ পুরুষ দক্ষিণামোহন ঠাকুর তাঁর যন্ত্র দিয়ে সুরের যে উক্তি রেখেছিলেন, সেটিকে মানব সভ্যতার একটি সেরা সম্পদ বললে একটুও অত্যুক্তি করা হয় না। এ রকম উদাহরণ আরও অনেক দেওয়া যায়। তেমনি, বাংলা গানের সুরকারদের সৃজনবৈচিত্র্যের পাশে সে- গানের গীতিকারদের অবদান যে তুলনামূলকভাবে কিঞ্চিৎ নিশ্প্রভ ছিল, এই উক্তির পক্ষেও উদাহরণ দেওয়া যায় যথেষ্ট। গুনী গীতিকার কিছু কম ছিলেন না। অজয় ভট্টাচার্য, সুবোধ পুরকায়স্থ, বাণী কুমার, হীরেন বসু, প্রণব রায়, পবিত্র মিত্র, মোহিনী চৌধুরি, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, শ্যামল গুপ্ত ,পুলক বন্দোপাধ্যায় – এঁদের লেখা গান আধুনিক যুগের বাঙালি দীর্ঘকাল শুনেছে। কিন্তু বাংলা গান যাঁরা ভালবেসেছেন, তাঁরা যদি নিজেদের প্রশ্ন করেন, যে গানগুলি তাঁদের মনে আজও ছোটবড় ঢেউ তোলে, সেগুলির মূল আবেদন কী কথায়, নাকি সুরে ও কন্ঠশিল্পীদের গায়কীতে, তাহলে উত্তরটা হয়ত তাঁরা নিজেরাই পেয়ে যাবেন। এখানে রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত উক্তির প্রসঙ্গ টানা যেতেই পারে। কিন্তু এ প্রশ্নও কম গুরুত্বময় হবে না যে, ভাষা যখন একটা আছেই, গান লেখা ও সে- গানে সুরারোপ করা যখন হচ্ছেই, জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার প্রয়োগে নানান পরীক্ষানিরীক্ষা যখন হয়েই চলেছে, আমাদের দৈনন্দিন জীবন, ভাবনাচিন্তা, আবেদগের অভিব্যক্তি, বাচনভঙ্গি যখন একজায়গায় থেমে নেই, তখন বাংলা গানের কথায় কেন বড্ড বেশি কাল ধরে একই বিষয়, একই ধরনের রূপকল্প ও বাকভঙ্গি চলতে থাকবে? গীতিকারদের মধ্যে যাঁদের রচনায় আধুনিক কাব্যগুণ ও কল্পনার জোর ছিল, তাঁদের লিরিক তো নিজগুণে আলাদা মাত্রা পেয়েছেই, তা ছাড়াও সে- লিরিক আরও স্মরণীয় হয়ে উঠেছে তাঁদের আশপাশের অন্য গীতিকারদের রচনার একমাত্রিকতার কারণেও: অজয় ভট্টচার্য, মোহিনী চৌধুরি, পরেশ ধর, সলিল চৌধুরি, মুকুল দ্ত্ত, অমিয় দাশগুপ্ত, জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়। বলা বাহুল্য, এঁদের সকলের কৃতিত্ব এক মাপের নয়। তেমনি, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের কোন কোন গানেও পাওয়া গিয়েছে ব্যতিক্রমী কল্পনাবৈাশিষ্ট্য ও কাব্যগুণ, যেমন মন্না দে- র সুর করা গাওয়া ‘কত দুরে আর নিয়ে যাবে বল’, অথবা নচিকেতা ঘোষের সুর করা ও হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া ‘আমার গানের স্বরলিাপি লেখা রবে’, ‘ঝাউয়ের পাতা ঝিরঝিরিয়ে ঘুমপাড়ানি গান গায়’ ইত্যাদি।

আধুনিক বাংলা গানের প্রধান উপজীব্য ছিল প্রেম। বিশ শতকের তিনের দশক থেকে আটের দশক পর্যন্ত বাঙালি যত গান বেতার ও রেকর্ডে শুনেছে, ভক্তিগীতি ও পল্লীগীতি বাদে তার প্রায় সবটা জুড়ে প্রেমই বিরজ করেছে। অভ্যাসের পৌন:পুনিকতার মধ্যে দিয়ে ‘প্রেমই হয়ে দাড়িয়েছিল আধুনিক বাংলা গানের প্রধান উপজীব্য। তারই মধ্যে যমোদাদুলাল মন্ডল নামে ( শুনেছি তিনি একজন চিকিৎক ছিলেন) একজন শিল্পী ‘ক্যালকাটা নাইন্টিন ফর্টিথ্রি অক্টোবর’ (Calcuta1943 october) নামে একটি গান রেকর্ড করেছিলেন। চমকপ্রদ সেই গান ( শুরুই হচ্ছে ইংরেজি কথা দিয়ে) ছিল, লিরিকের দিক দিয়ে, সেই সময়ের একটি ছবি। তাতে কোন প্রেমের আলেখ্য ছিল না। ছিল যুদ্ধের সময়ে কলকাতার অবস্থার কথা। ‘সি আর পি মিলিটারি / পথে পথে ভিখিরি / সব জিনিসের বাড়ল দর / ক্যালকাটা নাইন্টিন ফর্টিথ্রি অক্টোবর।‘ সচারাচর কেউ এই গানটির উল্লেখ করেন না। আরও অনেক কৌতুহলোদ্দীপক গানের সঙ্গে এটিও হারিয়ে গিয়েছে। কিন্তু লক্ষ্য করার মত – সুরতাল গায়নশৈলীর দিক দিয়ে একটি নিখাদ আধুনিক বাংলা গানের সেই লিরিক ছিল আক্ষরিক অর্থে নাগরিক চেতনা অদ্ভুত। অর্থাৎ এমন নয় যে, ‘প্রেম’ ছাড়া অন্য বিষয়ে কেই আধুনিক বাংলা গান বাঁধতে চেষ্টা করেননি, কিন্তু আধুনিক বাংলা গানের সৃষ্টি, ব্যবসা ও চর্চার ধারাবাহিকতায় কালক্রমে ‘প্রেম’ ই হয়ে পড়েছিল লিরিকের সবচেয়ে চর্চিত বিষয়। এর ফলে আধুনিক গানের বিষয় ও আবেদন একপেশে হয়ে পড়েছিল।

পাশ্চাত্য লঘু সঙ্গীত বলতে আমাদের দেশের বেতারে ইংরিজি গানই শোনা যেত এবং শোনা যায়। তিন, চার ও পাঁচের দশকে ইংরেজি ভাষী দুনিয়াতেও প্রেমের গানের রেকর্ডই বেশি শোনা যেত। আমেরিকায় কৃষ্ণাঙ্গদের গানবাজনার ( এখন এঁদের আর ওই নামে ডাকা হয় না, বলা হয় ‘আফ্রিকান আমেরিকান’, যেটা যুক্তিসঙ্গত) নিজস্ব কিছু আঙ্গিক ছিল, যেগুলিতে প্রেম ছাড়াও অন্য বিষয় স্থান পেত। গস্পেল ও স্পিরিচুয়ালে মাঝেমধ্যে শোনা যেত বর্ণবাদী সমাজে তাঁদের জীবনের টানাপোড়েন ও বিষাদের কথা। এঁদের পূর্বপুরুষ পূর্বনারীদের জোর করে ধরে আনা হয়েছিল আমেরিকায় এবং তাঁদের বিক্রী করে দেওয়া হয়েছিল ক্রিতদাস হিসাবে।