Sufi Faruq Ibne Abubakar (সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর)

কোন পথে গেল গান – কবীর সুমন -৩ বই সংগ্রহ

Kabir Sumon | কবীর সুমন

আফ্রিকান- আমেরিকানদের গানে শোনা গিয়েছে; ‘Nobdy knows the troubles I have seen. Nobody knows but you jesus’ অথবা ‘Sometimes I feel like a motherless child.’ কালক্রমে আফ্রিকান- আমেরিকানদের সঙ্গীত- আঙ্গীক (Blues jazz) শ্বেতাঙ্গ সঙ্গীতশিল্পীদেরও আপন হয়ে ওঠে। ছয়ের দশক থেকে আমেরিকায় কৃষ্ণাঙ্গরা নাগরিক অধিকার অর্জনের লক্ষ্যে অহিংসা আন্দোলন শুরু করেন। তেমনি কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানদের মধ্যে সাধারণভাবে এক রাজনৈতিক জাগরণ দেখা দেয়- শ্বেতাঙ্গপ্রধান সমাজে তাঁদের অবস্থান ও মর্যাদার প্রশ্নে। তার পাশাপাশি শ্বেতাঙ্গ সমাজেও, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে, দেখা দেয় অভুতপূর্ব এক রাজনৈতিক চেতনা- ভিয়েতনামে আমেরিকার গায়ে পড়া যুদ্ধের বিরুদ্ধে এবং তৃতীয় বিশ্বের মানুষের সংগ্রামী তৎপরতার পক্ষে। ছাত্রছাত্রীদের একটি অংশ আমেরিকার ধনবাদী সমাজের্ ওপর বীতশ্রদ্ধ হয়ে আরও সাধাসিধে, আরও সরল জীবনযাত্রার সন্ধানে ভারত ও ভারতীয় দর্শনের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ওঠেন। দেখা দেয প্রতিবাদী বীটনিক ও হিপি সংস্কৃতি। তেমনই, ছয়ের দশকের গোড়ায় কিউবার বিপ্লবের তরঙ্গ আমেরিকার প্রগতিশীল ও বামমনস্কদের মনেও নাড়া দেয় প্রবলভাবে। এইভাবে, নানান দিক দিয়ে আমেরিকার সমাজে একটা বড় ধরণের আলোড়ন দেখা দেয়। সাহিত্যে ও গানবাজনাতেও এর লক্ষণীয় প্রভাব পড়ে। তার আগের দেড় দশকে ক্ষণজন্মা লোকশিল্পী ও ‘সংরাইটার’ উডি গাথরি ও তাঁর বন্ধু পীট সীগারের তৈরি গানগুলির মধ্যে দিয়ে যুগোপযোগী গান রচনা ও পরিবেশনার একটি দৃঢ় বনিয়াদ তৈরি হয়ে গিয়েছিল। বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার, উডি গাথরির নেতৃত্বে আমেরিকায় লোকগানের নবজাগরণের অর্থ কিন্তু এই ছিল না যে শিল্পীরা শুধু সনাতন পল্লীগীতি গেয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁরা বাস্তবজীবন, শ্রমজীবীদের জীবনের সুখদুঃখ সঙ্কট, ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন, রাষ্ট্র ও বিত্তবান সমাজের দমননীতি ইত্যাদি নানান বিষয়ে গান লিখছিলেন, সুরও দিচ্ছিলেন, যে সুরে মাঝেমাঝেই সনাতন আমেরিকান পল্লীগীতির প্রভাব পড়ছিল। ছয়ের দশকে বিটলসদের মত ভূবনজয়ী নতুন শিল্পগোষ্ঠীর গানেও ক্রমে দেখা দিতে লাগল, বিচ্ছিন্নভাবে হলেও, অন্য ভাবনা। জন লেননের শান্তির গান ‘Give peace a chance’ বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল ওই সময়ে। তেমনই বিটলসদের পর নতুন গান কারিগরদের সারিতে বব ডিলান তাঁর আশ্চর্য কাব্যগুণসমৃদ্ধ গানগুলির দারুন প্রায় প্রফেট হয়ে দাঁড়ালেন পশ্চাত্যের তরুণ সমাজের। তাঁর গানেও প্রেম প্রাধান্য পেল না, প্রাধান্য পেল যুগচেতনা, ব্যক্তিভাবনা। ছয়ের দশকে সারা বিশ্ব যুবশক্তির সে স্ফুর্তি ও বিষ্ফোরণ দেখতে পেল, তার আওতায় নতুন গানের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য- পাশ্চাত্য দুনিয়ার অন্যান্য ভাষাতেও। প্রথাগত প্রেমের গান সেখানে আর আগের প্রাধান্যের জায়গা রইল না। নতুন গান- কারিগররা প্রেমের গানও লিখতে লাগলেন অন্য মেজাজে। মনে রাখা দরকার, কিউবার বিপ্লব, তারপর গোটা লাতিন আমেরিকা জুড়েই মার্কিন প্রভুত্ববাদ বিরোধী চেতনা, জনগণের মুক্তি আকাঙ্খা, দারিদ্র ও বৈষম্যমোচনের লক্ষ্যে নানান র‌্যাডিকাল চিন্তা ও কাজের ধারাবাহিকতা, বৈপ্লবিক তৎপরতা, ১৯৭৯ সালে নিকারাগুয়ায় সানদিনিস্তা বিপ্লবীদের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল, গুয়াতেমালা ও এল সালভাদরে বৈপ্লবিক উদ্যোগ, মার্কিন সরকারের নিরবিচ্ছিন্ন দাদাগিরি ও গুণ্ডামি- এই সবকিছুর পরিপ্রেক্ষিতে গোটা লাতিন আমেরিকা ও উত্তর আমেরিকাজুড়ে ‘নিউ সং’আন্দোলন প্রবল উৎসাহে এগিয়েছিলেন আটের দশক পর্যন্ত।এই নিউ সং –এর এক্তিয়ারে যাঁরা গান লিখেছেন, গাইছিলেন, তাঁদের গানে ধারা দিচ্ছিল জীবণের নানান বিষয়। তাতে প্রেমও ছিল। কিন্তু তা সাবেক বাজার চলতি প্রেমের গানের ধারার অঙ্গ আর ছিল না। তাঁদের প্রেমের গান তখন তাঁদের সার্বিক জীবনদশর্নের অঙ্গ। সাতের দশকের গোড়ার দিক থেক লেনার্ড কোহেন নামে ক্যানাডার যে ‘সংরাইটার’ ও গায়ক ধূমকেতুর মত উদয় হন, তাঁর প্রায় প্রতিটি গান দার্শনিক অভিব্যক্তি। প্রেমের গানও। তেমনি, জার্মান ভাষায় ভলফ রিয়ারমানের গানেও ধরা দিচ্ছিল ব্যক্তিজীবন, সমাজ ও রাজনীতি সম্পর্কে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, নতুন উচ্চারণ। এই সব শিল্পীদের গানের মধ্যে দিয়ে কয়েক দশক ধরে পাশ্চাত্যের আধুনিক গান অর্জন করে নিচ্ছিল নতুন নতুন সংজ্ঞা, যেগুলির সঙ্গে চার ও পাঁচের দশকের বাজারচলতি গানগুলির বিষয়গত ও মানসিকতাগত তেমন মিল ছিল না আর ভাষাটা ইংরিজি, জার্মান বা ফারাসি হলেও ভাষার ব্যবহার, বিষয়বস্তু আর আঙ্গিক হয়ে পড়েছিল আলাদা।

আশ্চর্য, আধুনিক বাংলা গানে কিন্তু চার থেকে আট দশক পর্যন্ত লিরিকের বিষয়বস্তু ও আঙ্গিকের দিক দিয়ে নামমাত্র কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া চিরাচরিত ধারার বাইরে বিশেষ কিছু পাওয়া যায়নি। আধুনিক সমাজ, নগরজীবন পরিবর্তনশীল। এমন নয় যে, তিনের দশক থেকে আটের দশক অবধি আমাদের সমাজ এক জায়গায় থেমে ছিল। মানুষের ব্যক্তিজীবন ও সমাজজীবনে সমানে পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছিল। সত্যি বলতে আমাদের উপমহাদেশে এবং আমাদের দেশে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে গিয়াছিল।রাজনীতি ও অর্থনীতিতে তো বটেই। এর প্রভাব বাস্তব জীবনে, মানুষের মন মানসিকতায় পড়তে বাধ্য এবং তা পড়ছিলও, কিন্তু আধুনিক বাংলা গানের মূল বিষয় হিসেবে থেকে যাচ্ছিল সেই প্রেম। শুধু তাই নয়, সে প্রেমের অভিব্যক্তিও প্রথাসর্বস্ব। অজয় ভট্টাচার্যের লিরিকে উল্লেখযোগ্য কাব্যগুণ ছিল। সুবোধ পুরকায়স্থ, শৈলেন রায়, প্রণব রায়, হীরেন বসু, নির্মল ভট্টাচার্য, পবিত্র মিত্রর লিরিক শুনে আজও বোঝা যায় বাংলা গান লেখার রীতি তাঁদের দখলে ছিল। কাব্যগুণ যে অনুপস্থিত তাও সর্বাংশে বলা যাবে না। কিন্তু লিরিকগুলি কোন দিক দিয়েই সেই তিন ও চারের দশকের প্রথাগত গান মানসিকতা ছেড়ে বেরতে পারেনি। মোহিনী চৌধুরী ছিলেন উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী এই গীতিকারের লিরিক আজও আধুনিক। ঈর্ষণীয় লিরিকভাষা ও শৈলীর অধিকারী ছিলেন তিনি। ‘আমি দুরন্ত বৈশাখী ঝড়’, ‘জেগে আছি কারাগারে’, ‘মুক্তির মন্দির সোপানতলে কত প্রাণ হল বিলিদান’ এবং অণ্যান্য গানের লিরিকে তাঁর আবেদন ত্রিকালস্পর্শী। তিনি ছিলেন বাংলার সেই কতিপয় গীতিকারের একজন যাঁদের রচনা ক্রিয়াপদের শুদ্ধ ও চলিত রূপের সহাবস্থান দোষে দুষ্ট ছিল না। তেমনি আরও পরে মুকুল দত্ত,ভাস্কর বসু ও অমিয় দাশগুপ্তর লেখা গানে পাওয়া গিয়েছে লিরিক ভাবনা, রূপকল্পচিন্তা, নির্মাণ ও শব্দচয়নের উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। তেমনি একাধারে গীতিকার সুরকার গায়ক দিলীপ সরকারের গানে পাওয়া গিয়েছিল আলাদা একটা আবেদন, যেমন ‘তন্দ্রা এল, বল জাগি কেমন করে’ (ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য), ‘কে যায় সাথীহারা মরু সাহারায়/ সবর্নাশা পথের ইসারায়’ (হেমন্ত মুখোপাধ্যায়)। কিন্তু এ- হেন দিলীপ সরাকারেরও ‘কাঠফাটা রোদে/ পিচ ঢালা পথে/ শীতের রাতে/ রিক্সা চালাই মোরা রিক্সাওয়ালা’ গানটি প্রমাণ করে দেয় আধুনিক বাঙালির মানসে ‘গান’ কতটা জীবন বিছিন্ন ছিল। সুরতালছন্দ কথা মিলিয়ে গানটি শুনলে মনে হবে হাতরিক্সা টানার মত সুখকর, আনন্দদায়ক কাজ জগতে আর নেই। এটাও সমান লক্ষ্যণীয় যে গানটি বাঁধছেন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর এক বাঙালি যিনি বা যাঁর শ্রণীর মানুষ কোনও দিনই হাতরিক্সা চালাননি এবং চালাবেনও না। ‘মোরা’ রিক্সা চালই না। যাঁরা এই কাজটি করেন, তাঁরা আধুনিক গান বাঁধেন কি? রবীন্দ্রনাথ যেটাকে ‘সৌখিন মজদুরি’ বলেছেন, এ হল আধুনিক বাংলা গানে তারই উদাহরণ। এ হেন ‘কৃত্রিম পণ্যে’ আধুনিক বাংলা গানের ‘পসরা ব্যর্থ’ হয়েছে নানান সময়ে। কিন্তু শুধু এই একটি গানের জন্য দিলীপ সরকারের নিতিবাচক মূল্যায়ন অনুচিত। মরন খেলার মাতনে আজ জীবন বাজি রাখবি কে/ সুখের ঘরে শয্যা ফেলে শূন্য হাতে আসবি কে’র মতো লাইনও তিনি লিখতে পেরেছেন , দিতে পেরেছেন উপযুক্ত সুর।

তেমনি, পাঁচের দশকে গৌরিপ্রসন্ন মজুমদারের কিছু কিছু লিরিকে পাওয়া গিয়েছিল স্মরণীয় কাব্যগুণ ও আধুনিকতা। এমন গান তিনি বিলক্ষণ লিখেছেন যা প্রেমের গান নয়। যেমন, ‘ঝাউ এর পাতা ঝিরঝিরিয়ে ঘুমপাড়ানি গান গায়’ ‘আমার গানের স্বরলিপি লেখা রবে’ (হেমন্ত মুখোপাধ্যায়/ সুরকার নচিকেতা ঘোষ)। কিন্তু কত দূরে আর নিয়ে যাবে বল’র মতো ব্যতিক্রমী প্রেমের গান (কন্ঠশিল্পী ও সুরকার মন্না দে) লিখতে পারলেও তার অধিকাংশ গানেই প্রেমের অভিব্যক্তি প্রথাগত। তারই মধ্যে এই শক্তিশালী গীতিকার নানান ছায়াছবির দৃশ্যের প্রয়োজনে এমন গান সাফল্যের সঙ্গে লিখতে পেরেছিলেন যেগুলি প্রেমের গান নয়, যেমন ‘জীবন নদীর জোয়ারভাটায় কত ঢেউ ওঠে পড়ে’ ( সতীনাথ মুখোপাধ্যায়/ সুরকার অনুপম ঘটক)। শ্যামল গুপ্তর লিরিকেও আমরা পেয়েছি উল্লেখযোগ্য কাব্যগুণ। তাঁর লেখা ‘ও আমার মনযমুনার অঙ্গে অঙ্গে ভাবতরঙ্গে কতই খেলা/ বধূ কি তীরে বসে মধুর হেসে দেখবে শুধু সারা বেলা’ ( মান্না দে) বা ‘এই ভাল এই বসন্ত নয়, এবার ফিরে যাই/ দূরেই তুমি থেক/ আবার কোন বসন্ত দিন তোমার আরও কাছে/ ফিরিয়ে নিয়ে আসবে আমায় দেখ’ অম্লান থেক যাবে বাংলা আধুনিক গানের ইতিহাসে। প্রেমের গানেও তিনি মাঝেমাঝে এমন বাহাদুরি দেখিয়েছেন যার জুড়ি পাওয়া ভার। কিন্তু তাঁর বেশিরভাগ গানের বিষয় সেই প্রেম। পুলক বন্দ্যোবাধ্যায় সম্পর্কেও একই কথা খাটে। বরং আরও পরে জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায় ও শিবদাস বন্দ্যাপধ্যায়ের লিরিকে আমরা পেয়েছি প্রথাছুট শব্দচয়ন নির্মান ও লিরিকচিন্তা। এমনকি প্রেমের গান লিখতে গিয়েও জটিলেশ্বর আনতে পেরেছেন দৃষ্টিভঙ্গি ও উচ্চারণের নতুনত্ব যা তাঁকে আলাদা করে দেয় ‘তোমার সঙ্গে দেখা না হলে/ ভালবাসার দেশটা আমার দেখা হত না/ তুমি না হাত বাড়িয়ে দিলে এমন একটা পথে চলা শেখা হত না।‘ এই গানেরই শেষ লাইন : ‘তুমি আখর না চেনালে আজও কিছুই লেখা হত না’/ -এই যে বাচনভঙ্গি, শব্দচয়ন, এর মধ্যে প্রথানুগত্য নেই, নেই ক্রিয়াপদের সাধু-চলিত রূপের বিসদৃশ সহাবস্থান। এইখানে জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের গান যুগোপযোগী হয়ে উঠতে পেরেছিল ছয় ও সাতের দশকে।

মুকুল দত্ত, ভাস্কর বসু, অমিয় দাশগুপ্ত ও শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ছাড়া মোহিনী চৌধুরী পরবর্তী বেশিরভাগ আধুনিক গীতিকারের লিরিকে সাধু-চলিতের ধাক্কাধাক্কি আধুনিক বাংলা গানের দেহে এক বিপত্তি বিশেষ। এই উৎপাত বাংলা গানের আধুনিক হয়ে ওঠার পথে এক উল্লেখযোগ্য অন্তরায় হয়েই থেকে গিয়েছিল বড্ড বেশিকাল। সলিল চৌধুরির মতো নিরীক্ষামনস্ক ও সৃজনশীল সঙ্গীতকারও অনেক সময় এ দিকে মন দেননি। যুগোপযোগী, দেশি-বিদেশি সাঙ্গীতিক উপাদান মেশানো সুর ও যন্ত্রাণুষঙ্গের আবহে ছ’এর দশকে তিনি লিখেছেন ‘যদি কিছু আমারে শুধাও / কী যে তোমারে কব/ নীরবে চাহিয়া রব/ না বলা কথা বুঝিয়া নাও।‘ অথবা ‘এমন দিনে তুমি মোর কাছে নাই’(আহা ঐ আঁকাবাঁকা যে পথ যায় সুদূরে)।সুর ছন্দ যন্ত্রণুষঙ্গ চূড়ান্ত আধুনিক।আর লিরিকে আমারে তোমারে কব শুধাও, চাহিয়া,বুঝিয়া মোর নাই। ভাবলে অবাক হতে হয় যে এত আধুনিক সঙ্গীতকারও সুরের আধুনিকতা ও কথার এই সাবেকিয়ানার দ্বন্দ্ব মেনে নিচ্ছেন। তাঁর আপত্তি নেই গানের দেহে সামঞ্জস্যের এই শোচনীয় অভাবে। আটের দশকেও তিনি লিখে ফেলছেন- ‘যতদূর চাহি আর কিছু নাহি’ (আর কিছু স্মরণে নেই)।

আধুনিক বাংলা কবিতাতেও ক্রিয়াপদের সাধু ও চলিত রূপের সহাবস্থান, আমার আর মোর এর সহগমন এককালে স্বীকৃত ছিল। কিন্তু বাংলার কবিরা তা বর্জন করেন। আধুনিক বাংলা গানের লিরিকে কিন্তু এই ব্যাপার্টি দীর্ঘকাল বিরজ করেছে। আধুনিক গানের কথা, তার শব্দ চয়ন, আঙ্গিক ও বাচন ভঙ্গি নিয়ে বাঙালি যে দীর্ঘকাল আত্মতুষ্টি ও মানসিক জাড্যকে মেনে নিয়েছিল, এ হল তারই প্রমাণ। দেশি-বিদেশি উপকরণ ও উপাদান মিশ্রিত আধুনিক সুর, আধুনিক আঙ্গিকে যন্ত্রপ্রয়োগের সঙ্গে সাধু চলিত মেশানো কথার উপস্থিতি যে বিসদৃশ এই বোধটাই বাংলা গানের নির্মাতা ও শিল্পীদের দীর্ঘকাল ছিল কিনা সন্দেহ।

পরবর্তী যুগে ও সমকালে বাংলা আধুনিক গান সম্পর্কে আধুনিক বাঙালির যে সার্বিক ধারণা তার ভেতরে এই ধরনের দ্বন্দ্ব কাজ করে গিয়েছে, এখনও যাচ্ছে। যার ফলে এই শিল্পরূপ নিয়ে আমরা সত্যিই গুরুত্ব দিয়ে ভেবেছি ও ভাবছি কি না এই প্রশ্নটি এসে পড়তে বাধ্য।

তারই মধ্যে কিন্তু চারের দশক থেকে সাতের দশকের মধ্যেই নির্মল গঙ্গোপাধ্যায়, সরোজ দ্ত্ত, গোপাল দাশগুপ্ত, প্রবীর মজুমদার, সুধীন দাশগুপ্ত, প্রসূন মিত্রর মতো গীতিকাররা ( গোপাল দাশগুপ্ত, প্রবীর মজুমদার ও সুধীন দাশগুপ্ত সুরকার হিসেবেও স্মরণীয়)। বিভিন্ন গানে প্রমাণ দিতে পেরেছেন যে আধুনিক বাংলা গানের লিরিক রচনার সর্বজনস্বীকৃত দস্ত্তর তাদের আয়ত্বে। প্রবীর মজুমদারের কোন কোন গান, এমনকি প্রেমের গানও যেমন ‘এই নীলনির্জন সাগরে’ আশ্চর্য চকমকির মতো জ্বলে উঠেছে, কখনও আবার এমনিতে ‘গান’ না লেখা লেখক কবি বেতার, গ্রামোফোন রেকর্ড বা ছায়াছবির প্রয়োজনে বাংলা গান লিখে উল্লেখযোগ্য স্বকীয়তার পরিচয় দিয়েছিলেন, যেমন, প্রেমেন্দ্র মিত্র ,তারা শঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, বিমলচন্দ্র ঘোষ। বিমলচন্দ্র ঘোষের লেখা ‘সুরের আকাশে তুমি যে গো শুকতারা’ ‘শোনো বন্ধু শোনো, প্রাণহীন এই শহরের ইতিকথা’র লিরিকগুণ মোহিণী চৌধুরীর বৈশিষ্ট্যের কথা স্মরণে আনতে চায় আমাদের তেমনি, আকাশবাণীর রম্যগীতিতে তারাশঙ্করের লেখা, জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের সুর দেওয়া ও মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া ‘আমার প্রাণের রাধার কোন ঠিকানা’ আজও বাংলার যে কোন সিরিয়াস গীতিকারের কাছে একটি দৃষ্টান্ত হতে পারে। দৃষ্টান্ত হতে পারে ‘ডাকহরকরা’ ছবিতে সুধীণ দাশগুপ্তর বিস্মরণ অসাধ্য সুরসংযোজনায় তাঁর লেখা গানগুলি।

আকাশবাণীর রম্যগীতি ছিল আধুনিক বাংলা গানের এক যুগান্তকারী পরীক্ষাগার। হিন্দি ছবির গানের দাপট রুখতে এককালের কেন্দ্রীয় তথ্য ও বেতার সম্প্রচার দপ্তরের মন্ত্রী কেশকার পাঁচের দশকে রম্যগীতি বা সুগত সঙ্গীতের পরিকল্পনা করেন। রম্যগীতির আওতায় সুরকার, গীতিকার কন্ঠশিল্পী ও যন্ত্রশিল্পীরা বাজারে তাঁদের কাজ জনপ্রিয় হল বা হবে কিনা, সেই দুর্ভাবনায় জড়িয়ে না পড়ে খোলা মনে গান বাজনা নিয়ে সৃজনশীল কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলেন। এ ব্যাপারে রাষ্ট্র ছিল অর্থদাতা। সে সময়ে সরকারি টাকায় ভারতের বিভিন্ন বেতার কেন্দ্রে তাড়াতাড়ি সঙ্গীত রেকর্ডিংয়ের জন্য বিশেষ স্টুডিও তৈরি হয়ে যায়, নিযুক্ত হয়ে যান সঙ্গীত প্রযোজক ও কম্পোজার। রমাগীতিততে যে গানগুলি রেকর্ড করা হত, সেগুলি ‘স্টুডিও রেকর্ড’, গ্রামোফোন ডিস্ক নয়। এই সব গান শোনা যেত কেবল বেতারের রম্যগীতি অনুষ্ঠানে। আকাশবাণীর এই বিভাগেই জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ, গোপাল দাশগুপ্ত, সুরেন পাল, আলি আকবর খান, তিমির বরণ, অনিল বাগচি, ভি বালসারা, অলকনাত দে, নিখিল ঘোষ, দুনিচাঁদ বড়াল, সলিল চৌধুরি, প্রবীর মজুমদারের মতো সুরকাররা এমন বেশ কিছু সুরসৃষ্টি করেন যা যে কোনও সভ্য জাতির গর্বের বিষয় হওয়ার কথা। সুকুমার রায়ের কবিতায় সুর সংযোজনা এই রম্য রীতিতেই হয়েছিল।সুর করেছিলেন এবং গানগুলি প্রযোজনা করেছিলেন জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ, সঙ্গীতাচার্য, যাঁর প্রতিভা ও সৃজনশীলতা অবিশ্বাস্যরকম। ‘গন্ধ বিচার’, ‘রোদে রাঙা ইটের পাঁজা’, ‘দাঁড়ে দাঁড়ে দ্রুম’ ইত্যাদি গানের রেকর্ডিং- এ কন্ঠ দিয়েছিলেন জ্ঞানপ্রকাশ স্বয়ং, সঙ্গে রসজগতের আর এক বিস্ময় অজিত চট্টোপাধ্যায়, আলপনা বন্দ্যোবাধ্যায়। জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের সুর, পরিচালনা ও গাওয়ার রসায়ণে সুকুমার রায়ের কবিতাগুলী যে রূপ পেয়েছিল তা অবিশ্বাস্য, অকল্পনীয়। এমন এক্সপেরিমেন্ট পৃথিবীতে বিরল। বাংলার নাগরিক মানসে এগুলি স্থান পেয়েছে কি? সঙ্গীত থেকে আমরা যে কতটা দূরে, তার প্রমাণ আমাদের এই বেরসিক অজ্ঞতা। তেমনি বাংলা গানের আর এক নিরঙ্কুশ ‘জিনিয়াস’ সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক, বাঁশিশিল্পী অলকনাথ দে-র সুরে শ্যামল মিত্রর গাওয়া ‘আমর এ বেভুল প্রণের সঙ্গোপনে’, দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া ‘সেই পাখি আজও আছে কি’, নির্মলা মিশ্রর গাওয়া ‘চেয়ে বসে থাকি’, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গাওয়া ‘যে দোলায় দোলনচাঁপা’ আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্রের রম্যগীতির ফসল।

পাঁচের দশকের মধ্যেই আধুনিক বাংলা গান নির্মাণ, অনুশীলন, প্রযোজনা ও পরিবেশনার ধারাবাহিকতার মধ্যে দিয়ে একটা নির্দিষ্ট আকার পেয়ে গিয়েছিল। কাঠামোর দিক দিয়ে: স্থায়ী, প্রথম অন্তরা, সঞ্চারী, দ্বিতীয় অন্তরা। অথবা স্থায়ী, অন্তরা, অন্তরা। কখনও তিনটি অন্তরা। কোনও কোনও বাঙালি সঙ্গীত সমালোচক বাংলা গানের কাঠামোর বর্ণনা দিতে গিয়ে ‘স্থায়ী অন্তরা সঞ্চারী আভোগ’ এই পর্ববিন্যাসের কথা বলেছেন। ‘আভোগ’ ব্যাপারটি কিন্তু ধ্রুপদের অঙ্গ। বাস্তবে বাংলার বিভিন্ন ও মহাবিচিত্র পল্লীগীতি, শ্যামাসঙ্গীত ও আধুনিক গানের কাঠামোয় কিন্তু ধ্রুপদী ‘আভোগ’ মেলে না। মেলে বরং স্থায়ী- অন্তরা- সঞ্চারী- অন্তরা অথাবা স্থায়ী- অন্তরা- অন্তরার কাঠামো। মনে রাখা দরকার, এই নির্দিষ্ট কাঠামোর বাইরেও বাংলা গান রচিত হয়েছে। মুধু স্থায়ীর সুরের পুনরাবৃত্তিতে একাধিক স্তবকের সমাহারেও বাংলা গান তৈরি হয়েছে। আবার, স্থায়ীর পরেই অন্তরার সপ্তক- বৈশিষ্ট এড়িয়ে সঞ্চারীর মেজাজে মন্দ্র সপ্তকে যাওয়ার দৃষ্টান্তও আছে, যদিও বিরল। রবীন্দ্রনাথের ‘আমি চঞ্চল হে’ এর একটি স্মরণীয় উদাহরণ। যে কাঠামোগুলির কথা আমি বললাম, কয়েকটি ব্যতিক্রমের কথা বাদ দিলে, সেগুলিই মেনে নিয়েছিল বাঙালি, এমনকি ভারতের আরও কয়েকটি জাতি।

গীতিকার ও সুরকাররা ওই কাঠামোগুলিকে মেনেই ক্রমাগত গান বাঁধছিলেন। সাধারণ একটা রূপ এইভাবে স্বীকৃতি পেয়ে গিয়েছিল। তেমনি বেশিরভাগ গান শুনে মনে হয় ‘প্রেম’ ই যে হবে আধুনিক গানের প্রধান বিষয়, তাও মেনে নেওয়া হয়েছিল সাধারণভাবে। বাংলা সাহিত্যে, কবিতায়, সাংবাদিকতায়, বাংলার জনজীবনে সময়ের সঙ্গে যতই বিষয়গত ও ভাষাগত পরিবর্তন আসুক, বাংলা আধুনিক গানের লিরিকে ও কথা সুর মিলিয়ে সার্বিক, আবেদনে প্রেম ছাড়া অন্য কোনও বিষয় সহজে পাওয়া যাচ্ছিল না। আবার বলী, ব্যতিক্রম অবশ্যই ছিল, যেমন সলিল চৌধুরির কিছু গান ( সুকান্ত ভট্টাচার্যর কবিতায় সুর দিয়ে ‘রানার’, সত্যেন্দ্রনাথ দ্ত্তর কবিতায় সুর দিয়ে ‘পাল্কির গান’, নিজের কথায়-সুরে ‘গাঁয়ের বধূ’, ‘ধান কাটার গান’, ‘নৌকা বাওয়ার গান’, ‘সেই মেয়ে’, ‘পথে এবার নামো সাথী’, ‘আয় বৃষ্টি ঝেঁপে’, ‘প্রান্তরের গান আমার’), সত্যেন্দ্রনাথ দত্তর কবিতায় অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুরে ‘ছিপখান তিন দাঁড়’, পরেশ ধরের কথায়- সুরে ‘ওরে ও মাঝি রাঙাস্বপন দেশে যাব’ , ‘শান্ত নদীটি’, ‘ফুলের মত ফুটলো ভোর’ (জোয়ারের গান) পরেশ ধরের লেখায় সলিল চৌধুরির সুরে ‘ধিতাং ধিতাং বোলে’। লক্ষ্যণীয়, এই সঙ্গীতকাররা সকলেই রাজনীতি সচেতন, কেউ কউ বামপন্থী রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে জড়িতও ছিলেন। পঞ্চাশের দশকে হমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গওয়া সলিল চৌধুরির দুটি গান, ‘ পথহারব বলে এবার পথে নেমেছি’ ও ‘ দুরন্ত ঘূর্ণির এই লেগেছে পাক’ প্রেমের গান নয়। মনে রখা দরকার উল্লেখিত এই গানগুলি প্রেমের গান না হওয়া সত্ত্বেও দারুণ জনপ্রিয় হয়েছিল। অর্থাৎ আধুনিক গানকে জনপ্রিয় ও বাণিজ্যসফল করে তুলতে হলে প্রেমের ওপরেই ভর করতে হবে, এমন কোনও দাবি বাংলা গানের শ্রোতাদের ছিল বলে মনে হয় না। থাকলে আধুনিক বাংলা গানের সম্ভারে এই ব্যতিক্রমী গানগুলি সমাদর পেত না। অন্যদিকে, গানের লিরিকে প্রেম ছাড়া অন্য কোনও বিষয় এসে পড়লে গ্রামোফোন কোম্পানি বেঁকে বসবে আকাশবাণীও সে রকম গানের রেকর্ড বাজাবে না তাও বলার জো নেই, কারণ ব্যতিক্রমী গান দস্তুরমতো রেকর্ডও হয়েছিল, আকাশবাণী কলকাতা থেকে নিয়মিত বেজেওছিল। অথচ, কার্যত দেখা গেল অধিকাংশ লিরিকে ‘প্রম’ই প্রধান্য পাচ্ছে এবং তার অবিব্যক্তি হয়ে পড়ছে একই ধাচের। ভাবালুতা আর এক দরণের সাজানো সুখদুঃখই হয়ে দাড়াল লিরিকের বৈশিষ্ট্য। আর একটি দিকও লক্ষ্য করার মতো। বয়স বাড়ার সঙ্গে মানুষের প্রেমানুভূতি ও প্রেমের প্রকাশভঙ্গি পাল্টায়। আরও পরিণত বয়স ও মানসিকতায় তা আর বয়ঃসন্ধি ও যৌবনের মতো থাকে না। বয়স্ক মানুষের জীবনে প্রেম থাকে যথেষ্টই। যৌবন উত্তীর্ন মানুষও প্রেমে পড়েন। কিন্তু সেই আবেগ, অনুভব ও সংরাগের প্রকাশ হয় অন্যরকম। বাংলা ভাষায় এমন প্রেমের কবিতার সংখ্যা কম নয় যেগুলির উপজীব্য পরিণত বয়সের প্রেম। কিন্তু আধুনিক বাংলা গানের লিরিকে এই দিকটি আদৌ প্রাধান্য পায়নি। ফলে, পরিণত বয়সের, এমনকি প্রবীন কন্ঠশিল্পীদের কন্ঠে শোনা গেছে কিশোর কিশোরী বা সদ্য যুবক যুবতী সুলভ প্রেমের আকুতি, যা এক কথায় বেমানান। কিছু ব্যতিক্রম সত্ত্বেও সাধারণভাবে বাংলার আধুনিক গীতিকাররা লিরিক, মানুষের আবেগ ও সংরাগের বয়সোচিত বিবর্তন এবং বেঁচে থাকার বিচিত্র অভিজ্ঞতার প্রতি সুবচার করতে পারেননি। সুবিচার করতে পারেননি তাঁরা বাস্তব জীবনের বিভিন্ন দিক ও মানুষের মনস্তত্ত্বের প্রতি। ‘হিউমার’ বস্তুটি নিদারুণভাবে অনুপস্থিত থেকেছে বাংলা গানে। তেমনি মনুষে মানুষে সম্পর্কের যে নানান দিক আছে, যেমন বাৎসল্য, বন্ধুতা, বাবা মাকে নিয়ে আবেগ ও ভাবনা ( ‘মা’ কে নিয়ে দু’একটি গান পাঁচের দশক থেকে যদি বা হয়েছে, ‘বাবা’ কে নিয়ে ১৯৯২ সালের আগে কোনও আধুনিক বাংলা গান রচিত ও রেকর্ড হয়েছে বলে আমার অন্তত জানা নেই) , সেগুলিও আধুনিক লিরিকে গরহাজির। এর ফলে আধুনিক বাংলা গানে মস্ত একটা ফাঁক থেকেই গিয়েছিল এবং প্রশ্রয় পাচ্ছিল।

১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষের সময় থেকে শুরু হল সাধারণভাবে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে এবং সুনির্দিষ্টভাবে ‘রবীন্দ্র সঙ্গীত’ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ার যুগ। আকাশবাণীর অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রচারের সময় দওয়া হল বাড়িয়ে। গ্রামোফোন কোম্পানিগুলিও আরও বেশি সংখ্যায় রবীন্দ্রসঙ্গীত রেকর্ড করতে লাগল। সেই সময় (৪৫ আর পি এম ও ৩৩ আর পি এম ডিস্কের যুগ এ দেশে তখনও আসেনি) রবীন্দ্রনাথের নৃত্যনাট্যের অ্যালবাম বের করতে শুরু করল গ্রামোফোন কোম্পানি অফ ইন্ডিয়া (অধুনা সা রে গা মা ) । অ্যালবামগুলি ছিল ৭৮ আর পি এমের কিছু ডিস্কের সমাহার। বাঙালি শ্রোতাদের মধ্যে অনেকেই জীবনে প্রথম ঘরে বসে রবীন্দ্রনাথের নৃত্যনাট্যের গানগুলি পর পর শোনার সুযোগ পেলেন।

রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ থেকে বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবনে রবীন্দ্রসঙ্গীত চর্চা এবং সাধারণ মধ্যবিত্ত জীবনে রবীন্দ্রসঙ্গীত শেখা ও শোনার যে জোয়ার এল, তার তোড়ে আধুনিক বাংলা গান চর্চায় একটু ভাটা পড়ল। আধুনিক বাংলা গান বিষয়ে আলোচনা আমাদের দেশে কমই হয়। যেটুকু হয়ে থাকে, তাতে এই দিকটি তেমন গুরুত্ব পায় না। রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষকে ঘিরে দেশ জুড়ে বিপুল সরকারি অর্থ ও লোকবল কাজে লাগিয়ে যে ব্যাপক উৎসব ও কর্মকান্ড শুরু হল, ভারতের স্বাধীনতা লাভের পর তা আর দেখা যায়নি। শিক্ষিত বাঙালি পেয়ে গেল এমন এক বিগ্রহ, যাঁর নাম নিতে পারলে সাতখুন মাপ, যাঁর নামের নিশান সর্বোচ্চ, সবার বশ্যতা আদায় করার মতো সাংস্কৃতিক ধ্বজা, যিনি, আজকের পরিভাষায় বলতে গেলে, সবচেয়ে জোরালো ও কার্যকর সাংস্কৃতিক ‘আইকন’। ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’ এমন একটি নাম, যাঁর সম্পর্কে বিরুদ্ধাচারণের ন্যূনতম আভাস শিক্ষিত বাঙালি সহ্য করতে নারাজ। তাঁর সব কিছু প্রশ্নাতীত। গানে তাঁর সবকটি সৃষ্টি তুলামূল্য। ‘বলি ও আমার গোলাপবালা’ গানটি ‘আমি চঞ্চল হে, আমি সুদূরের পিয়াসী’র মতোই উৎকৃষ্ট ।সব কটি গান প্রশ্নরিক্তাতায় একই ভাবে ভক্তি-গদগদ চিত্তে অনন্তকাল গেয়ে যাওয়া যায়। শ্রোতারাও সেগুলি এই বিশ্বসংসার যতদিন থাকবে ততদনি একই ভাবে, ভক্তিভরে শুনে যাবেন- শিক্ষিত, সংস্কৃতিমান বাঙালির বোধহয় এটাই দাবি। মোট কথা, কারুরই সমস্ত কাজ ও সৃষ্টি যে সমমাত্রিক উৎকর্ষের দাবিদার হতে পারে না, কোনও কোনও গান যে কারুর কারুর একটু বেশি বা কম ভাল লাগতে পারে, এই কথাগুলি অন্য যে কোনও স্রষ্টার ক্ষেত্রে বাংলার শিক্ষিত শ্রেনীর একটি বড় অংশ মানতে রাজি। কেবল রবীন্দ্রনাথ রবীন্দ্রসঙ্গীতের কথা উঠলেই সে সম্মতি আর যেন থাকতে চায় না। এতদিন পর রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে বাঙালি হয়ত আগের চেয়ে একটু স্বাভাবিক হয়ে উঠতে পেরেছে। কিন্তু ছয়ের দশকে বিরাজ করছিল অন্য অবস্থা। আধুনিক বাংলা গানকে সম্বল করে সাংস্কৃতিকভাবে জাতে ওঠার কোনও সুযোগ ছিল না। রবীন্দ্রসঙ্গীতকে কেন্দ্র করে সেই সুযোগ মিলল। এর ফলে আধুনিক গানের জুটতে লাগল উপর্যুপুরি অনাদর, অবহেলা।

ছয়ের দশকে, আমি তখন ছাত্র, শিক্ষিত বয়স্ক কোনও বাঙালি আমায় গান গাইতে বললে আমি যদি আমার প্রিয় কোনও আধুনিক গান শোনাতাম, তো তিনি প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই নাক সিটকে বলে উঠতেন, ‘এ মা, এ আবার কী গান! রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইলে না যে!’ বেতারে আমি ১৯৯৬ সাল থেকে আধুনিক ও রবীন্দ্রসঙ্গীত দুই –ই গাইতাম বলে বিভিন্ন সময় শিক্ষিত বয়স্করা ( বলা বাহুল্য বাঙালি) আমায় বলেছেন, ‘আবার ওই ছাইপাশ আধুনিক গান কেন? শুধু রবীন্দ্রঙ্গীত গাইলেই তো হয়’। যে আধুনিক গানগুলি তখন ও তার পরে বেতারে গাইতাম, সেগুলি আকাশবাণীর অনুমোদিত গীতিকারদের লেখা এবং আমার সুর করা। গানগুলির লিরিক নোবেল জয়ের যোগ্য কাব্যগুণসমৃদ্ধ ছিল না ঠিকই, কিন্তু তাই বলে স্থুল অনাড়ি হাতের ফসলও ছিল না। বাঙালির সঙ্গীতমানসের অন্তত আরও দুই ‘আইকন’ অতুলপ্রসাদ ও রজনীকান্তর অধিকাংশ গানের চেয়ে সে দিনের কিছু গীতিকারের রচনা খারাপ ছিল না মোটেও। সে কথা সবিনয়ে জানাতে গিয়ে প্রচুর বকুনিও খেয়েছি অনেক বয়স্ক মানুষের কাছে, যাঁদের বেশিরভাগই আসলে বেরসিক, সুর বধির। এই ধরনের কর্তাভজা ‘ডগমা’ যে সমাজে বা লোকস্তরে সজীব থাকে, সেখানে সৃজনশীলতা প্রশ্রয় পেতে পারে না।

রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ ও রবীন্দ্রসঙ্গীত চর্চাধিক্যের ধাক্কায় আধুনিক বাংলা গানের হাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল কতকটা দুয়োরানীর মতো। ভদ্রলোকে ঠিক পুঁছতে চায় না, অথচ তা হয়ে চলেছে। অত বড় একটা ক্ষেত্র। এত গুণী, সৃজনশীল মানুষ দীর্ঘকাল এই ক্ষেত্রে কর্মরত। বেশ কিছু স্মরণীয় গান আমাদের কাছে পৌছে দিয়েছেন এঁরা। অথ, রবীন্দ্রনাথ, দ্বিজেন্দ্রলাল, অতুলপ্রসাদ, রজনীকান্ত, কাজী নজরুল ইসলামের গানের যে সাংস্কৃতিক কুলমহিমা, তা আধুনিক গানেই নেই। হিমাংশু দত্ত, অনুপম ঘটক, রবীন চট্টোপাধ্যায়, সুধীরলাল চক্রবর্তীর মতো সুরকারদেরও বাঙালি তার সাংস্কৃতিক ‘আইকন’ দের পাশে বসাতে নারাজ। এও এক বিচিত্র ব্যাপার। ছেলেবেলা থেকে শুনে আসছি এক শ্রেণীর ‘শিক্ষিত’ বাঙালি সগর্বে ঘোষণা করে আসছেন- ‘আমি শুধু ক্ল্যাসিকাল মিউজিক শুনি’। আর –একদল : ‘আমি ভাই রবীন্দ্রসঙ্গীত ছাড়া আর কিছু শুনি না’। সুরতালছন্দ যাঁদের কিছু বলে, যাঁদের মস্তিষ্কে বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলে থাকে, তাঁরা কখনও এমন কথা বলতে পারে না। এ বুল যাঁরা আওড়ান তাঁদের সুরবধির ও সঙ্গীতবধির ছাড়া আর কিছু বলার জো আছে কি? কেউ কেউ আবার গদগদ চিত্তে সেই নিধুবাবু ধরণের বৈঠকী গানেই থেকে গিয়েছেন। আর এক শিবির চারের দশকে আটকে গিয়ে ঘুরে চলেছে কেটে যাওয়া গ্রামোফোন ডিক্সের মতো। এঁরা সকলেই কিন্তু ভয়ানক সঙ্গীতাবোদ্ধা।

ছয়ের দশকে দ্বিতীয়ার্ধ থেকে পশ্চিমবঙ্গে এল নজরুলগীতির জোয়ার। রবীন্দ্রনাথের মতোই কাজী নজরুল ইসলাম সহস্রাধিক গান রচনা করেছিলেন। ছয়ের দশকের আগে গ্রামোফোন রেকর্ডে তার সামান্যই ধরা ছিল। নজরুল প্লাবন শুরু হতে গ্রামোফোন কোম্পানিগুলি অনেক বেশি সংখ্যায় নজরুলগীতির রেকর্ড বের করতে শুরু করল। মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, যিনি এতদিন আধুনিক গানের প্রথম শ্রণীর শিল্পী ও সুরকার হিসিবেই পরিচিত ছিলেন, এবারে নজরুলগীতির ডাকসাইটে শিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেন। বড় বড় প্রেক্ষাগৃহে শুরু হল তাঁর নজরুলগীতির একক অনুষ্ঠান। কোনও বাঙালী কন্ঠশিল্পীর একক অনুষ্ঠান ছয়ের দশকের কলকাতায় এক নতুন সংযোজন। তেমনি, বাংলা গানের আসরে শুরু হল আর এক নতুন ব্যাপার : রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যা। একজন শিল্পী রবীন্দ্র সঙ্গীতে, আর একজন নজরুলগীতিতে। ছয়ের দশকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে সত্তর দশকের মাঝামাঝি পেরিয় এই রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যা অনেক শ্রোতা টানতে পেরেছে। লক্ষ্যণীয় : ১) শিক্ষিত, সংস্কৃতিমান বাঙালি সেই সময়ে তাঁদের গানের দুটি ‘আইকন’ কে অভ্যেসের পৌনঃপুনিকতার মাধ্যমে সামাজিক সাংস্কৃতিকভাবে প্রতিষ্ঠা করে দিলেন। ২) আধুনিক বাংলা গান ( যার মধ্যে হিমাংশু দ্ত্তর গানও পড়ে যায়, যদিও ‘হিমাংশুগীতি’ নামটি কেউ কেউ ব্যবহার করতেন) সাংস্কৃতিকভাবে মর্যাদা পেল না, যদিও সামাজিক অর্থনৈতিকভাবে তার একটা জায়গা থেকে গেল।

এই দ্বিতীয় ব্যাপারটির দিকে তাকালে দেখা যাবে, ছয়ের দশক থেকেই আধুনিক বাংলা গান ‘বেসিক সং’ (অর্থাৎ ছায়াছবি বা নাটকের জন্য রচিত নয় এমন গান) ও ছায়াছবির গানের রেকর্ড হিসেবে বাজারে হাজির থাকলেও, তার জোরালো প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়াল হিন্দি ছবির গান। বাংলা চলচ্চিত্রের বাজার তখনও শক্তিশালী। একাধিক হিন্দি ছবির হিরো ততদিনে পশ্চিমবঙ্গে যথেষ্ট জনপ্রিয় হয়ে উঠলেও, উত্তম কুমারের জনপ্রিয়তা কমিয়ে দেওয়ার মতো শক্তি তাঁদের ছিল না। তার মধ্যে বিশ্বজিৎ ও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ও হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন যথেষ্ট আকর্ষণীয়। তেমনি, কোনও কোনও ক্ষেত্রে অনিল চট্টোপাধ্যায়ের ভূমিকাও ছিল রীতিমতো ওজনদার। অনিল বাগচি, নচিকেতা ঘোষ, সুধীন দাশগুপ্ত, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় ও শ্যামল মিত্রর সুরের এবং হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, শ্যামল মিত্র, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় ও আরতি মুখোপাধ্যায়ের কন্ঠের আবেদন বাংলা চলচ্চিত্রে তখনও অম্লান। কিন্তু তা হলেও, পশ্চিমবঙ্গে হিন্দি ছায়াছবি ক্রমান্বয়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে হিন্দি ছবির গানও জনপ্রিয়তার হিসেবে বাংলা আধুনিক গানের চেয়ে বেশি জোরে ছুটতে শুরু করে দিয়েছে ততদিনে। আমার মনে আছে, ১৯৬৬ সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর আর্টস কলেজে যে নবীনবরণ উৎসব হল, তাতে একজন বহিরাগত শিল্পী শুধু হিন্দি ছবির গানই গাইলেন। এই ধরনের অনুষ্ঠান ক্রমান্বয়ে বাড়তে লাগল। তার কয়েক বছরের মধ্যেই আমরা দেখতে পেলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য কলেজগুলির বিনোদন অনুষ্ঠানে বাংলা গানের পাশাপাশি হিন্দি গান যথেষ্টই হচ্ছে। গোটা পশ্চিমবঙ্গের কথা বলতে পারব না, তবে কলকাতার অন্যান্য কলেজের অনুষ্ঠানেও যে হিন্দি গান যথেষ্টই ছিল, আমরা, সে-যুগের নবীনের দল তার সাক্ষী। ১৯৭০- ৭১ সালে, দক্ষিণ কলকাতার কোনও কোনও মুক্ত অনুষ্ঠানে বন্ধুবান্ধবদের সৌজন্যে কিছু অনুষ্ঠান করতে গিয়ে দেখেছিলাম আমার মতো কোনও বাঙালি শিল্পী একটি বাংলা গান গাওয়ার পরই জনতা ‘হিন্দি হিন্দি’ বলে চিৎকার করছে। আরও ঢের বেশি নামজাদা বাঙালি গায়ক- গায়িকাদের বেলা ঠিক এতটা না হলেও, মাঠ-ময়দানের অনুষ্ঠানে পর পর খানতিনেক বাংলা গান হয়ে যাওয়ার পর বাঙালিরাই উশখুশ করতেন এবং হিন্দি গানের দাবি জানাতেন। ছয় ও সাতের দশকে এক শ্রণীর বাঙালি গায়ক- গায়িকাকে পাওয়া গিয়েছিল, যাঁদের নিজেদের কোনও জনপ্রিয় গান ছিল না। তাঁরা অর্কেস্ট্রা সঙ্গে আনতেন এবং সাধারণত একটি রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়ার পরই হিন্দি গান গাইতেন একের পর এক। এই শিল্পীদের খুব কদর ছিল। কন্ঠশিল্পী হিসেবে এঁরা বিরাট দক্ষতার অধিকারী না হলেও, নেহাত ফেলনা ছিলেন না। তেমনি, দু’একজন বাঙালি শিল্পী সে যুগে অনুষ্ঠানস ফল হয়ে উঠেছিলেন যাঁরা শুধু হারমোনিয়াম আর তবল নিয়ে গাইতেন- জনপ্রিয় বাংলা ও হিন্দি গান। এঁদের মধ্যে মলয় মুখোপাধ্যায় বেশ তৈরি গায়ক ছিলেন। একাধিকবার প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে তাঁর গান শুনেছি ছয়ের দশকের শেষে। তিনি মান্না দে- র রেকর্ড করা বাংলা ও হিন্দি গান গেয়ে আসর মাত করতেন। একটি অনুষ্ঠান করে ফেরার পথে মোটর দুর্ঘটনায় মারা যান তিনি। আমরা হারালাম এক প্রতিভাবান তরুণ গায়ককে। মৃত্যুর আগে তিনি একটি আধুনিক বাংলা গানের রকর্ড করে গিয়েছিলেন। দুটি গানই আমার আজও মনে আছে: ‘শ্রীমতি যে কাঁদে’ আর ‘কিছু নেই তবু দিতে চাই’।

পাঁচের দশকের প্রথম দিকেই পশ্চিমবঙ্গে যে পুরুষ কন্ঠশিল্পীরা আকাশবাণী কলকাতার অনুষ্ঠান ( যা সে যুগে ‘লাইভ’ ছিল, পরে ‘টেপরেকর্ডিং’ চালু হয়) ও গ্রামোফোন রেকর্ডের মাধ্যমে শ্রোতাদের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন এবং কারুর কারুর ক্ষেত্রে যে পরিচিতি বিপুল খ্যাতিতে পরিণত হয়, তাঁরা ছাড়াও পাঁচের দশকের শেষদিকে আরও অন্তত দু’জন গায়ককে আমরা পেয়েছিলাম যাঁরা সে সময় ব্যাপক জনপ্রিয়তার অধিকারী না হলেও অনেকের মনে জায়গা করে নিতে পেরেছিলেন। সুদাম বন্দ্যোপাধ্যায় ও জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়। সময়ের বিচার এঁদের দু’জনকে পাঁচের শিল্পীই বলতে হয়, যদিও সতর্কতার সঙ্গে, কারণ পাঁচের গোড়ার দিকের শিল্পীদের সারিতে এঁরা ছিলেন না। জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায় নিজে গীতিকার ও সুরকারও ছিলেন ( এখনও আশা করি তাই-ই আছেন)। শুধু তাই নয়, ছয় ও সাতের দশকে তাঁর লেখা বেতার অনুষ্ঠানগুলির জন্য কেউ কেউ উন্মুখ হরয় থাকতেন, কারন লেখা গানে একটি আলাদা মাত্রা পাওয়া যেত। সাতের দশকের মাঝামাঝির মধ্যে, পশ্চিমবঙ্গে যখন রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা ও হানাহানি তুঙ্গে, বেতারে শোনা জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের স্বরচিত গান ‘ এ কোন সকাল রাতের চেয় অন্ধকার’ ও ‘এ কেমন রাত পোহাল দিন যদি আর এল না’ আমার কাছে অন্তত আধুনিক বাংলা গানের একমাত্র যুগোপযোগী উচ্চারণ বলে মনে হয়েছিল। বস্তুত, অমন কালোপযোগী বাংলা গান তার আগেও শুনিনি, পরেও বিশেষ না। সাতের দশকের গোড়ার দিকে ‘এ কেমন রাত পোহাল’ গানটি বেতারে আরও কোনও কোনও শিল্পীকে গাইতে শুনেছি। রবীন্দ্রনাথের একটি বাক্য অনেক সুধী বারবার উদ্ধুত করেছেন- ‘জীবনে জীবন যোগ করা’। এটি না হলে ‘ গানের পসরা’ কৃত্রিমতায় ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা রবীন্দ্রনাথের ছিল। তাঁর যে উত্তরসূরীরা পশ্চিমবঙ্গে আধুনিক বাংলা লিখে যাচ্ছিলেন, প্রথামাফিক গান লেখার ক্ষমাতা তাঁদের অনেকের থাকলেও আধুনিক গানে ‘জীবনে জীবন যোগ করার’ কাজটি তাঁরা বিশেষ করে উঠতে পারছিলেন না। এ কাজটি করতে পারলে বাংলার শ্রোতা তার পরিচয় পেয়ে যেত, কারণ বেতার ছিল দীর্ঘকাল আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। বাড়িতে বসে, লোককর্ণের অন্তরালে কেউ যদি তেমন কাজ করে থাকেন তো সেটি অন্তরালেই থেকে গিয়েছে। প্রাকশ্যে যা শোনা গিয়েছে তার ভিত্তিতে বলতে হয় ছ-এর দশকের শেষ দিক থেকে শুরু করে সাতের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত আমাদের সমাজে নিত্যজীবনের যে অবস্থা দাঁড়িয়েছিল তার পরিসরে জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের পূর্বোক্ত দুটি গানে জীবণ যুক্ত হয়েছিল জীবনের সঙ্গে। আটপৌরে, বাস্তব জীবনের সঙ্গে মিলে গেল গানের জীবন। গানকে সারাক্ষণ বা থেকে থেকেই আটপৌরে জীবনের গায়ে গায়ে লেগে থাকতে হবে এমন দাবি আমার অন্তত নেই। কিন্তু নিত্যজীবন, মানুষের (আমরা ধরে নিই না কেন- গান যিনি লিখেছেন তারই) সুখ- দুঃখ, আনন্দ- বেদনা, বোধ (তা সে এক মুহুর্তেরই হোক না হয়), অভাব-অভিযোগ, স্বপ্ন, দুঃস্বপ্ন, নিশ্চয়তা অনিশ্চয়তা, আশঙ্কা, কামনা, পছন্দ অপছন্দ, ভালবাসা, ঘৃণা, সাফল্য-ব্যর্থতার কোনও স্বাক্ষরই যদি গানে না থাকে, গান যদি কেবল তুমি- আমি-তুমি- আমি করে বছরের পর বছর কাটিয়ে দেয় তাহলে যে বড় একমাত্রিক একঘেয়ে হয়ে দাঁড়ায় ব্যাপারটা। এ প্রসঙ্গে গুটিকয়েক ব্যতিক্রমের কথা বলে দায় এড়ানো যাবে না। ছ-এর দশকের শেষ দিক থেকে সাতের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত যেভাবে কলকাতায় বেঁচেছিলাম। (১৯৭৫ সালের মে মাসে আমি বাধ্য হয়ে বিদেশে চলে যাই), যা যা দেখছিলাম শুনছিলাম পড়ছিলাম জানছিলাম বুঝছিলাম ভাবছিলাম, সেই নিত্য- অভিজ্ঞতার নিরিখে মনে হয়েছিল ‘এ কোন সকাল রাতের চেয়ে অন্ধকার’ ও ‘এ কেমন রাত পোহাল দিন যদি আর এর না’ অকৃত্রিমভাবে ওই যুগমুহূর্তের গান। শুধু কথার জন্য নয়। সুরতাল লয় আর কথা সুর মেলানো আঙ্গিকের জন্যেও সমান মাত্রায়। ওই কথাগুলিই অন্য কোনও সুরেতালে শুনলে আমার মনে অন্তত ওই ধাক্কাটা লাগত না।