Sufi Faruq Ibne Abubakar (সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর)

কোন পথে গেল গান – কবীর সুমন -৪ বই সংগ্রহ

Kabir Sumon | কবীর সুমন

সুদাম বন্দ্যোপাধ্যায়ের গানের মতো জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের স্বরচিত গানের গ্রামোফোন রকর্ডও (তাঁর প্রথম রেকর্ডটি ছিল সলিল চৌধুরির কথায় সুরে) বেতারে বাজত। অনেকে তাঁর ভক্তও ছিলেন। কিন্তু অকিঞ্চিৎকর একঘেয়ে সাজানো সাজানো বহু ব্যবহৃত কথা ও রূপকল্পের পৌনঃপুনিকতা এবং আরও কিছু কারণে আধুনিক বাংলা গান সম্পর্কে পশ্চিমবঙ্গের অনেক শ্রোতার মনে পাঁচের দশকের সেই উৎসাহটা আর না থাকার কারণেই হয়ত আমর মধ্যে জটিলেশ্বরের কিছু গান যা ঘটাচ্ছিল তা আশপাশের অনেকের মধ্যেই ঘটাতে পারছিল না। তা ছাড়া, আধুনিক বাংলা গানের কাছে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি মধ্যশ্রণীর মনে বিশেষ কোনও প্রত্যাশাও আর ছিল না বোধহয়। এ ছাড়াও ভেবে দেখা দরকার আধুনিক বাংলা গান বা সেইভাবে বলতে গেলে সঙ্গীতকে কি বাংলার নগরবাসীরা কোনওদিনই বুদ্ধিবৃত্তি ও মেধার অবিব্যক্তি হিসেবে দেখেছে? দেখতে চেয়েছে? আধুনিক বাংলা কবিতার চেয়ে আধুনিক বাংলা গান নিঃসন্দেহে আরও বেশি সংখ্যক মানুষের কাছে পৌছতে পেরেছে, পৌছে থাকে। সারা পৃথিবীতেই সঙ্গীত, বিশেষ করে পল্লীসঙ্গীত বা লোকসঙ্গীত এবং লঘুসঙ্গীত (আধুনিক গান, ‘পপমিউজিক’ ) মুদ্রিত সাহিত্য, কবিতার চেয়ে ঢের বেশি মানুষের মনে পৌঁছে গিয়েছে এবং যাচ্ছে। কিন্তু, পাশ্চাত্যের কথা বাদ দিলে, আমাদের দেশে, বাংলাভাষাভাষী বিরাট অঞ্চলে আধুনিক কবিতা আর আধুনিক গানকে মানুষ একই চোখে- কানে – দেখে- শোনে কি? সঙ্গীতের সঙ্গে যে মানুষের মেধা, সৃজনশীলতা ও দর্শনের অবিচ্ছেদ্য যোগ আছে আমরা কি তা আদৌ বুঝতে ও মেনে নিতে শিখেছি। ওস্তাদ আমীর খান, ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খান, পণ্ডিত নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায়, পন্ডিত রবিশঙ্কর, ওস্তাদ বিলায়েত খান বা সঙ্গীতাচার্য জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষকে কি কেউ এ দেশে ‘ইন্টেলেকচুয়াল’ বলে স্বীকার করবেন? বিষ্ণ দে-র কবিতা পড়ে তাঁকে নিঃসন্দেহে ভাবুক ‘ইন্টেলেকচুয়াল’ বলে মেনে নেবেন যে কোনও বাঙালি। কিন্তু সুকান্ত ভট্টাচার্যর রানার বা সত্যেন দত্তর পাল্কির গান সুর দিতে গিয়ে সলিল চৌধুরিকে যে মেধা প্রয়োগ করতে হয়েছিল তার পর আমরা কি তাঁকে এক ইন্টেলেকচুয়াল স্রষ্টা বলেছি? আজও বলছি কি? কোনও দিন বলে উঠতে পারব কি?

জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের গানের পৃথক বৈশিষ্ট্য সত্ত্বেও, তাঁর যথেষ্ট গুনগ্রাহী থাকা সত্ত্বেও ছ’এর দশকে এবং সাতের গোড়াতেও গায়ক হিসেবে জনপ্রিয়তার সেই মাত্রাটি তিনি বোধহয় পাননি যা পিন্টু ভট্টাচার্য পেয়েছেলেন। তেমনি, ছয়ের দশকের শেষ দিকে আর এক প্রশিক্ষত গায়ক দীপঙ্কর চট্টোপাধ্যায় তাঁর বেতার অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচিত হয়ে ওঠেন। সুদাম ও জটিলেশ্বররের মতোই স্বকীয় গায়কীর অধিকারী ছিলেন তিনি। জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের কাথায় সুরে তাঁর গ্রামোফোন রেকর্ড ‘যে গানখানি শুনিয়ে যাই তোমায় বারেবার’ ও ‘যে আকাশে ঝরে বাদল/ সে আকাশে চাঁদ উঠবে কি’ (এই গানটি দীর্ঘকাল আগে কৃষ্ণচন্দ্র দে রেকর্ড করেছিলেন বলে শুনেছি) অনেক শ্রোতার মনেই এই কন্ঠশিল্পী সম্পর্কে উৎসাহ জাগাতে পেরেছিল। কিন্তু সার্বিক জনপ্রিয়তার হিসেবে পিন্টু ভট্টাচার্যর সমকক্ষ তিনিও বোধহয় হতে পারেন নি। অব্শ্য সুরকার হিসেবও দীপঙ্কর চট্টোপাধ্যায় দাগ কেটেছিলেন বাংলা গানের ইন্ডাস্ট্রিতে, যদিও বেশি কাজ তিনি করেননি।

‘বেসিক রেকর্ডের’ নানান গান , যেমন ‘চল না দীঘার সৈকত ছেড়ে’, ‘সেই প্রথম সেই তো শেষ’, ‘জানি পৃথিবী আমায় যাবে ভূলে’, এবং বেতার অনুষ্ঠানের জন্য ছ’এর শেষ ও সাতের দশকে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পেরেছিলেন পিন্টু ভট্টাচার্য। কন্ঠস্বর ও গায়কীর দিক দিয়ে সুদাম , জটিলেশ্বর, দীপঙ্করের মতো তাঁরও ছিল স্বকীয় একটি অবস্থান। মধ্যবিত্ত বাঙালিদের মধ্যে অনেকেই সম্ভবত পিন্টু ভট্টাচার্যর নরম, অনুচ্চ কন্ঠের রোমান্টিকতার ভক্ত হয়ে পড়েছিলেন। জলসায় তাঁকে বাংলা – হিন্দি মিশিয়ে গাইতে হয়নি বাজার ধরে রাখার জন্য।

ছয়ের দশকের পুরুষ- শীল্পীদের মধ্যে অনুপ ঘোষালও রীতিমতো খ্যাতি অর্জন করেন, তবে আধুনিক গানের ‘বেসিক রেকর্ডের’ জন্য নয়, সত্যজিৎ রায়ের ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন, এর প্লে- ব্যাক শিল্পী হিসেবে। কন্ঠসঙ্গীতে দস্তরমতো তালিম পাওয়া, সুদক্ষ গায়ক অনুপ ঘোষাল বেতারে আধুনিক গান ও নজরুলগীতি গেয়ে অনেক বেতার শ্রোতার মনে নাড়া দিলেও ‘গুগাবাবা’য় গুপীর গানগুলি গাওয়ার আগে তিনি বাংলার বৃহত্তর শ্রোতাসমাজে আলাদা কোনও জায়গা করে নিতে পারেননি। সত্যজিৎ রায়ের ছবিটি বেরনোর পর অনুপ ঘোষালের নাম হল। তারপর একাধিক ছায়াচবিতে প্লে- ব্যাক করেন তিনি, কিন্তু সে জন্য বাঙালি তাকে কতটা মনে রেখে ছে, সন্দেহ। অনুপ ‘বেসিক রেকর্ড’ ও করেছিলেন। আকাশবাণীর নানান অনুষ্ঠানে সেগুলি বাজতও। কিন্তু সত্যি বলতে, পিন্টু ভট্টাচার্যর বেসিক রেকর্ডের গানগুলি শ্রোতাসাধারণের মনে জনপ্রিয়তার যে মাত্রা পেয়েছিল, অনুপ ঘোষালের ‘বেসক’ গানগুলি তা পায়নি। ওই সময়, অনুপ ঘোষাল জীবনানন্দ দাসের ‘হায় চিল’ কিবতাটিতে সুরারোপ করে গেয়েছিলেন। নিরীক্ষামূলক কাজ হিসেবে ঘটনাটি স্মরন যোগ্য। জীবনানন্দ দাশের কোনও কবিতায় সুর দিয়ে কোনও গ্রামোফোন রেকর্ড তার আগে কখনও বেরিয়েছিল বলে আমার জানা নেই। সেই সঙ্গে এটাও ভাবার মতো যে, বাংলা কবিতায় সুর সংযোজন করে গ্রামোফোন রেকর্ডে তা পরিবেশন করার ঘটনা পাঁচের দশকের পর আর ঘটেনি। সুকান্ত ও সত্যেন দত্তর কবিতায় সলিল চৌধুরির দেওয়া সুর হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গায়কিতে বাংলা গানের ইতিহাসে লাইটহাউস হয়ে ওঠার পর অভিজিতের সুরে গেয়েছিলেন শ্যামল মিত্র, তাঁর স্বভাবসিদ্ধ অসামান্য দক্ষতায়। সুধীন দাশগুপ্তর সুরে প্রেমেন্দ্র মিত্রর ‘ সাগর থেকে ফেরা’ কবিতাটি গেয়ে রেকর্ড করেছিলেন স্বয়ং হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, যাঁর গাওয়া রানার ও পাল্কির গান বাংলা গানের ইতিহাসে মাইলস্টোন। ‘সাগর থেকে ফেরা’ য় চমৎকার সুর দিয়ে ( তিনিই পারতেন) সুধীন দাশগুপ্ত কবিতাটিকে একটি স্মরণযোগ্য গানে রূপান্তরিত করেন। অথচ রানার ও পাল্কির গানের মতো এই গান দখল করতে পারেনি বাঙালি শ্রোতার মন। বাংলাদেশে তবু বাংলা গানের বিবর্তনমূলক এক সঙ্কলনে ‘সাগর থেকে ফেরা’ স্থান পেয়েছিল বলে জানি। বাংলাদেশের নাট্যব্যক্তিত্ব আলি জাকের আমায় জানিয়েছিলেন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে এই গানটি বিস্মৃত বললে বাড়িয়ে বলা হয় না। বিনোদনের দুনিয়াটা যে কখন কোন নিয়মে চলে, শ্রোতারা যে কোন জিনিসটি কোন মুহুর্তে কীভাবে নেন, তার কোনও হিসেবই কষা যায় না। যাই হোক, অনুপ ঘোষাল জীবনানন্দ দাশের কবিতায় সুর দিয়ে রেকর্ড করার বেশ কয়েক বছর পর বাংলা গানে একটা নতুন স্বাদ পাওয়া গেল। কবিতায় সুর দিতে গিয়ে (বিশেষ করে এমন একটি কবিতায়) অনুপ ঘোষাল কিন্তু বাংলা আধুনিক গানের কিসিমের বাইরে যাননি। কবিতার মেজাজ যথাসম্ভব অক্ষুন্ন রেখেই তিনি সুর করেছিলেন, গানটি পরিবেশন করেছিলেন। আজকের সুরকাররা যদি গানিট শুনে দেখেন, ভেবে দেখেন সুর সংযোজনার আঙ্গিকটি, হয়ত লাভবান হবেন। মহিলা শিল্পীদের মধ্যে যাঁরা ছয়ের দশকে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন, তাঁদের অন্যতমা আরতি মুখোপাধ্যায়। বাংলা ছবির নতুন প্লে-ব্যাক শিল্পী হিসেবে তিনি বপিুল সমাদর পান। বস্তুত, পশ্চিমবঙ্গে প্লে-ব্যাক গায়িকা হিসেবে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের পর আর কেউই অত জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারেননি। শুধু জনপ্রিয়তা নয়, সুরে অব্যর্থ স্বরপ্রক্ষেপ, স্বাভাবিক শিষ্ট উচ্চারণ, বিভিন্ন ধরনের গানের আঙ্গিকে চমৎকার দখল, সাবলীল গায়কী এবং কাঙ্খিত আবেগ সংযতভাবে ফুটিয়ে আরতি মুখোপাধ্যায় যে উৎকর্ষ দেখিয়েছিলেন, বাংলা গানে তা অবিস্মরণীয়। আধুনিক সুরের ইডিয়মের পাশাপাশি আরতি মুখোপাধ্যায় সঙ্গীতাচার্য জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের লেখায়-সুরে রম্যগীতিতে এবং বিশ্বেও এক বিরাট সারেঙ্গি-শিরোমণি ওস্ত্মাদ সাগিরুদ্দিনের সুরে ঠুংরিভাঙা যে গানগুলি গ্রামোফোন রেকর্ডে গেয়েছিলেন, সেগুলির আবেদন কখনও নিষ্প্রভ হওয়ার কথা নয়। পশ্চিমবঙ্গে, অন্তত অধিকাংশ সঙ্গীত-শ্রোতা ও সঙ্গীত সমালোচকের বিচার বিবেচনাস্পৃহা ও রসবোধ যে কোন মাপের তা বোঝা যায় কোথাও কোনও আলোচনায় আরতি মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া এই গানগুলির বিন্দুমাত্র উল্লেখ না দেখে। আজকের নবীন প্রজন্ম জানতেও পারলেন না, কোন মাপের এক শিল্পী এ-দেশে ছয় ও সাতের দশকে গান গেয়ে গিয়েছেন। বলা বাহুল্য, ছায়াছবির ‘হিট’ গান এবং জনপ্রিয় হয়ে ওঠা’ বেসিক রেকর্ড, ও তাঁর এত ছিল যে, অনুষ্ঠানে তাকে হিন্দি গান গাইতে হত না। মহিলা-শিল্পীদেও মধ্যে ছয়ের দশকের আর এক আবিস্কার শিপ্রা বসু। দারুণ তার কণ্ঠ, উঁচু দরের প্রতিভা। বেতারশিল্পী হিসেবে যথেষ্ট সুনাম অর্জন করলেও, বাস্তবিক পক্ষে তাঁর যোগ্য সমাদর তিনি পাননি। মনে রাখা দরকার, আধুনিক বাংলা গানের উজ্জ্বল শিল্পী মনে রাখা দরকার আধুনকি বাংলা গানরে উজ্জল শিল্পী বলতে আমরা আজও যাদের মনে রেখিছি, আরতি মুখোপাধ্যায় বাদে তাঁরা সকলেই পাঁচের দশকের শিল্পী। শিপ্রা বসুর মতো বড় মাপের দক্ষতার অধিকারীও যে উপযুক্ত স্থান পেলেন না, ছয়ের দশক থেকে বাংলা গানের জগতে ঘটে যাওয়া পরিবর্তনগুলিই তার জন্য দায়ী। ছয়ের দশকের শেষদিকে পশ্চিমবঙ্গেও মহিলা-কণ্ঠশিল্পীদেও মধ্যে প্রধান সংযোজন সম্ভবত হৈমন্তী শুক্লা। খেয়াল থেকে শুরু করে আধুনিক গান পর্যন্ত নানানআঙ্গিকে তিনি উল্লেখযোগ্যরকম কুশলী। পুরোপুরি তালিমপ্রাপ্ত ও তেজি অথচ ভারী শ্রুতিসুখকর কণ্ঠের অধিকারী এই শিল্পী ও বাংলা গানের আসরে তাঁর জনপ্রিয় আধুনিক গানের পাশাপাশি নজরুলগীতি ও রাগপ্রধান গান গেয়েছেন, হিন্দি ছবির গান নয়। কিন্তু খাঁটি সত্যি হল এই যে, সাতের দশক থেকে হিন্দি গানের দাপটে বাংলা গানের জনপ্রিয়তা লক্ষ্যণীয় মাত্রায় কমে গিয়েছিল।

দোষটা কি তাহলে হিন্দি গানের? হিন্দি গান বলতে পাঁচের দশক থেকে সারা উপমহাদেশের মানুষই সম্ভবত হিন্দি ছায়াছবির গান বুঝেছেন। পশ্চিমবঙ্গেও বাঙালি সঙ্গীতশিক্ষার্থীরা পাঁচের দশকের আগে থেকে অন্যান্য গানের সঙ্গে হিন্দি ভজনও শিখতেন। খেয়াল শিক্ষার্থীরা তো হিন্দি বন্দিশের সঙ্গে পরিচিত হতেনই। তিন ও চারের দশকে বাংলার একাধিক বরেণ্য শিল্পী যেমন, পঙ্কজকুমার মল্লিক হিন্দি গান গয়ে গোটা উপমহাদেশে বিপুল খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। গানে হিন্দি ভাষার সঙ্গে কোনও বিরোধ বাঙালির কোনও দিনই ছিল না।

পাঁচ ও ছয়ের দশকে হিন্দি চলচ্চিত্র যেমনই হোক, সেই চলচ্চিত্র শিল্পের সঙ্গীতকাররা যে অসামান্য সৃজনশীলতা, উদ্ভাবন ক্ষমতা ও সঙ্গীতবোধের অধিকারী ছিলেন তাতে সন্দেহের কোনও অবকাশই নেই। নৌশাদ, রওশন, মদনমোহন, শচীন দেববর্মন, ওপি নাইয়ার, খৈয়াম, জয়দেব, সলিল চৌধুরি, শঙ্কর-জয়কিষণ নামগুলিই তো যথেষ্ট। সুর ও চলনের দিক দিয়ে ওই দুই দশকে এত ভাল ভাল হিন্দি গান হিন্দি ছায়াছবিতে শোনা গিয়েছিল, যে সুররসিক মানুষের কাছে সেগুলি আদরণীয় না হয়ে ওঠার কোনও কারণ ছিল না। তেমনি, ১৯৮৪ সালে এক সাক্ষাকারে সলিল চৌধুরি আমায় বলেছিলেন, হিন্দি চলচ্চিত্রশিল্পে গান লেখার কাজে পাঁচের দশক থেকেই হিন্দুস্থানি ও হিন্দি কবিদের সাহায্য নেওয়া হয়েছিল। ফলে হিন্দি ছবির গানে লিরিকে কাব্যগুণ সেই সময়ের আধুনিক বাংলা গানের তুলনায় ছিল বেশি। অন্যদিকে, হিন্দি ছায়াছবির বেশিরভাগ প্লে-ব্যাক শিল্পী ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ বহুমুখী গায়নক্ষমতার অধিকারী। মুম্বইয়ের চলচ্চিত্র শিল্পে তখন থেকেই দারুণ সব দক্ষ যন্ত্রসঙ্গীত শিল্পীর সমাবেশ ঘটেছিল। ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সেরা যন্ত্রীরা মুম্বইয়ে চলে যেতেন, সেখানে বসত নিতেন এবং সেখানকার স্টুডিওগুলিতে কাজ করতেন। হিন্দি ছবির প্রয়োজনায় বাংলার চেয়ে অনেক বেশি টাকা খাটত, ফলে সঙ্গীত-প্রয়োজনাতেও এখানকার তুলনায় বেশি টাকা নিয়োগ করা হত। এই সমস্ত কারণে হিন্দি ছবির যে সব গান সে-যুগে রেকর্ড হত, সেগুলি সাধারণ শ্রোতার মনোযোগ আকর্ষণ করার পক্ষে যথেষ্ট। দর্শক-শ্রোতাসাধারণের (আমাদের দেশের কোটি কোটি অশিক্ষিত ও অর্দ্ধশিক্ষিত মানুষই বরাবর জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের প্রধান পেট্রন) মন জয় করার ক্ষমতা যে বাংলা ছবির চেয়ে ঢের বেশি নাচগানজেল্লা-ভরপুর হিন্দি ছবির ক্রমশই বেড়ে উঠছিল তা ছয়ের দশকেই হয়ে উঠেছিল দিবালোকের মতো স্পষ্ট। জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের মাধ্যমে জনরুচির ক্ষয়ও ঘটছিল ক্রমান্বয়ে। বিনোদন বলতে সাধারণ মানুষ, এমনকি বাংলার শিক্ষিত মধ্যবিত্তের একাংশও ক্রমশই মেনে নিচ্ছিলেন চটুল গান-বাজনা, কথায় কথায় অঙ্গভঙ্গিসহকারে নাচ, মার্কামারা কিছু একই ধাঁচের গল্প, চরম ভাবালুতা ও সেই সঙ্গে পেশিশক্তি প্রদর্শন, আজগুবি সব ঘটনা এবং কল্পিত বৈভবের চটক, যা নিদারুণ অর্থনৈতিক বৈষম্যপীড়িত এই দেশে দরিদ্রদের কাছে রূপকথার বর্ণালী বয়ে আনে। গান বিচ্ছিন্ন কোন ও বস্তু নয়। সমাজের আর পাচঁটা জিনিস, মানুষের বাস্তব জীবন তার নানান সমস্যা, সুখদুঃখ, পাওয়া ও না-পাওয়া, সমাজের সার্বিক অবস্থা, ব্যক্তির অবস্থান, নানান মতবাদ, শ্রেণীগত অবস্থান, উৎপাদন ব্যবস্থা, বিপণন ব্যবস্থা, সাধারণভাবে বাণিজ্য ও অর্থনীতির দশা-সব কিছুর সঙ্গেই গান ও তার বাণিজ্যের সম্পর্ক। পাঁচের দশকের পর ছয়ের দশকে পশ্চিমবঙ্গে রাজনীতি ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে একাধিক পরিবর্তন ঘটতে থাকে। একদিকে, কংগ্রেস দলের একাধিপত্য হল বামপন্থীদের দিক দিয়ে প্রবল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। বামপন্থী রাজনীতি ও মতবাদ এই রাজ্যে পাঁচের দশক থেকেই জোরালো ছিল। ছয়ের দশকে তা আরও জোরালো এবং ঘাতপ্রতিঘাতময় হয়ে উঠল। চীন-ভারত যুদ্ধের পর কমিউনিস্ট পার্টি ভাগ হয়ে গেল। তেমনি বিধান সভার ভোটে কংগ্রেস হয় যুক্তফ্রন্টের কাছে পরাজিত। উত্তরবঙ্গের নকশালবাড়ি ও ফাঁসিদেওয়ায় কৃষক অভ্যুস্থানের সূত্রে নতুন মার্কসবাদী-লেনিনবাদী কমিউনিস্ট পার্টি জন্ম নিল। নকশালবাড়ির কৃষক অভ্যুত্থান প্রবল নাড়া দিল এ রাজ্যেও বেশ কিছু রাজনীতি সচেতন মানুষ ও যুবসমাজের একাংশকে। রাজ্যে সাধারণভাবে বামপন্থীদেও ক্ষমতা বৃদ্ধি ট্রেড ইউনিয়নগুলির জোরালো রাজনৈতিক উচ্চরণ, ধর্মঘট, মার্কসবাদী-লেনিনবাদী আন্দোলন, বিভিন্ন মার্কসবাদী দলের মধ্যে মতবাদগত বিরোধ ও সঙ্ঘর্ষ, যুবশক্তির আবেগময় উৎসার ইত্যাদি কারণে ভারতের শ্রেষ্ঠী সমাজের দৃষ্টিতে কলকাতা তার বাণিজ্য-আকর্ষণ হারাতে থাকল। ছয়ের দশকেই, যেমন, ভারতের কেন্দ্রীয় অসামরিক বিমান পরিবহণ দপ্তরের মন্ত্রীর উদ্যোগে একাধিক বিদেশি বিমানসংস্থা কলকাতা থেকে তাদের সার্ভিস তুলে নেয়। তার আগে বহির্বিশ্বের সঙ্গে বিমান-মাধ্যমে কলকাতার নিয়মিত যোগ ছিল। কলকাতা বন্দরের প্রতিও ভারত সরকার বৈরী মনোভাব গ্রহণ করল। রাজনৈতিক রেষারেষি, সঙ্ঘর্ষ, সশস্ত্র আন্দোলন, পুলিশি দমন-উদ্যোগ ও পীড়ন, নাগরিক জীবনে প্রাত্যহিক অনিশ্চয়তা, অস্থিরতা ইত্যাদিও সমাহারে কলকাতার নিত্যজীবন ছয়ের দশকে অনেকটাই পাল্টে গিয়েছিল। চলচ্চিত্র ইন্ডাষ্ট্রির মতো বাংলা গানের ইন্ডাষ্ট্রিকেও তখন বাঁচাতে হচ্ছিল সেই অবস্থার মধ্যে। সমাজে, চারদিকে যে এত কিছু ঘটে যাচ্ছিল, বাংলা চলচ্চিত্রে বিক্ষিপ্তভাবে হলেও তার প্রতিফলন ঘটেছিল। সত্যজিৎ রায়ের ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ মৃণাল সেনের ‘ইন্টারভিউ’ সেই যুগমুহূর্তেও দলিল হয়ে উঠেছিল। বাংলার আধুনিক গানে কিন্তু তার কোন ও প্রতিফলন ঘটছিল না। আধুনিক বাংলা গান তার চিরাচরিত ভাবালুতাপূর্ণ প্রেম, সেই প্রেমের একঘেয়ে অভিব্যক্তি, প্লাস্কিটকের ফুল দিয়ে ঘর সাজানোর মতো সাজানো দুঃখ, একই রকম কথা বহুব্যবহারে জীর্ণ রূপকল্প আর মিষ্টি মিষ্টি সুর নিয়ে চালিয়ে যাচ্ছিল তার বালিতে মুখ গোঁজা উঁপাখির সংসার। অন্যদিকে, হিন্দি ছবির গানের জয়যাত্রার বিপরীতে বাংলা আধুনিক গানের আবেদন ক্রমাগত কমে যাচ্ছে-এটা বুঝতে পেরে গ্রামাফোন কোম্পানি অফ ইন্ডিয়া বাংলার ভাল ভাল শিল্পীদের দিয়ে জনপ্রিয় হিন্দি গানের সুরে বাংলা গান গাওয়ানো শুরু করল। ব্যবসার দিক দিয়ে কিন্তু সে উদ্যোগ কোম্পানিকে কোনও সাফল্যই এনে দিল না। প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যয়ের মতো শিল্পীদের দিয়ে রেকর্ড করানো ওই সব গান কোনও শ্রোতা মনে রাখতে পেরেছিলেন বা মনে রাখতে চেয়েছিলেন বলেও মনে হয় না। ছয়ের দশকের গোড়ায় ‘লিমবোরক’ নামে একটি বিদেশি যন্ত্রসঙ্গীতের সুর কলকাতায় খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। সেই সুরে ইলা বসুকে দিয়ে রেকর্ড করানো হল: ‘যদি না ভালবাসিতাম/এ মালা গেঁথে আনিতাম/তবে আর তুমি না এল জীবনে ক্ষতি ছিল কী’-বেচারি ইলা বসু (এক দক্ষ কণ্ঠশিল্পী), বেচারা বাংলা গান, বেচারা বাঙালি! গানের প্রযোজক, গীতিকার কারোর মথাতেই আসেনি যে ছোট ছোট সুরের টুকরোয়, সে-যুগে আবিশ্ব-জনপ্রিয় ‘টুইস্ট’ নাচের তালে বাঁধা, নাগরিক ‘স্মার্টনেস’-এ মোড়া ‘লিমবোরক’- এর স্ফূর্তির সঙ্গে ‘ভালবাসিতাম’, ‘আনিতাম’ গোছের শব্দ ও তাদের অনুষঙ্গ হাস্যকররকম বেমানান। ছয়ের দশকের শেষের দিক থেকেই বাংলা আধুনিক গানের এই ছিল প্রবণতা। ভাল সুর যে একটাও হচ্ছিল না তা নয়। কিন্তু যত দিন যাচ্ছিল ততই আরও স্পষ্ট বোজা যাচ্ছিল যে পশ্চিমবঙ্গে বাংলা গানের গীতিকার, সুরকার, শিল্পী ও প্রয়োজকরা স্নায়ুতাড়িত। দিশাহারা তাঁরা। তাঁদের একের পর এক কাজে সমানে ধরা দিচ্ছে সৃজনশীলতা ও আত্মবিশ্বাসের অভাব। আধুনিক কথাটির একটি বড় শর্ত হল যুগোপযোগিতা। সেই বস্তুটি আধুনিক বাংলা গানে কোনওদিনই ঠিক ছিল কি? সুর, গায়কি, যন্ত্রসঙ্গীতের প্রয়োগ হয়ে উঠছিল যুগোপযোগী। কিন্তু লিরিক? গানের সার্বিক আবেদন? এ কথা সত্যি যে মানুষ গান শোনে মূলত সুর তাল ছন্দের কারণে। কিন্তু তাই বলে ‘কথা’ কে সে কি কোনও গুরুত্বই দেয় না? তা যদি না দিত তাহলে বাংলার পল্লীগীতিতে ‘কথা’র মধ্য দিয়ে যুগ যুগ ধরে এত বিচিত্র ভাবনা, অনুভব, আবেগ ও বর্ণনা প্রকাশিত হল কী করে? মানুষ তো তাহলে একই ধনের কথায় বিভিন্ন ধরনের সুর লাগিয়ে লাগিয়ে চালিয়ে দিতে পারত! বাংলার পল্লীগীতিতে সুর তাল ছন্দ কাঠামো গায়কি ও বাদনরীতির (সব ধরনের গানে একই ধরনের যন্ত্রাণুষঙ্গ কোনদিনই থাকেনি) বিপুল বৈচিত্রের সঙ্গে ওতপ্রোত জড়িয়ে আছে ‘কথা’র, লিরিকের বৈচিত্র। তাতে নানান ঋতু, সামাজিক পালাপর্বণ, অনুষ্ঠান, জীবনদর্শন, দেবদেবীর পুজো, আল্লাহ্পাক ও রসুলকে ঘিরে আবেগ, ‘সেকিউলার রোমান্স’, কাজ, অভাব-অভিযোগ, নিঃসঙ্গতা, প্রেম, বিরহ, জীবনস্ফূর্তি, নাচ, হাস্যরস, ‘হিউমর’ কিছুই বাদ পড়েনি। এই বিচিত্র বিষয়সমৃদ্ধ গানও তো বাংলার ঘরোয়া ও সামাজিক সম্পদ। সে তুলনায় বাংলার আধুনিক গানে? সময়ের বহমানতায় সমাজের নানান স্তরের পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে, বদল আসছে ব্যক্তিজীবনে, দৃষ্টিভঙ্গিতে, বোধে, অনুভবে, আবেগে, ভাষার প্রকাশভঙ্গিতে, দর্শনে। কিছুই আর সেই আগের অবস্থায় থেমে থাকতে চাইছে না। বাংলার গ্রুপ থিয়েটারের নাটক, বাংলা কবিতা, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, পত্রিকার নিবন্ধ, নতুন ধারার কাহিনীচিত্র ও তথ্যাচিত্রে পাঁচের দশক থেকে কত দিকবদল ঘটে গেল। আগেকার কত উপাদান ও বয়ান বর্জন করল মানুষ। তৈরি করে নিল নতুন প্রকাশভঙ্গি যা তার ক্রমাগত পাল্টে যাওয়া জীবন ও বোধের সঙ্গে সাযুজ্য রক্ষা করতে পারে। বাংলা গানের নির্মাতা ও শিল্পীরা কিন্তু তাঁদেও কাজ ও উচ্চারণে সেদিকে নজরই দিলেন না। সমকালীনতার কোনও সাক্ষ্যই রাখলেন না তাঁরা গানের কথা-সুর-তালছন্দেও মিলিত অভিব্যক্তিতে। গানকে করে তুললেন না সামাজিক জীবন, রাজনৈতিক জীবন ও ব্যক্তিজীবনের জঙ্গমে সামিল। বছরের পর বছর শুধু কিছু আপ্তবাক্য আর অপরিবর্তনীয় উপাদানের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে গেলেন। কেউ বলতে পারেন, আহা, গান বা সঙ্গীতের কাছে আমি যাই প্রাত্যহিক জীবনের দুঃখকষ্ট আর চাপ ভুলতে। গান যেন আমার স্নায়ুর চাপ কমাতে সাহায্য করে, গান যেন আমার বাস্তব জীবনটা অল্প কিছুক্ষণের জন্য হলেও ভুলিয়ে দিতে পারে।’-এ দাবি অন্যায় নয়। সঙ্গীতের একটি কাজ অবশ্যই মানুষের এই দাবি পূরণ। কিন্তু সেটি একটি কাজ, একটি দিক মাত্র। একটি সঙ্গীতের একমাত্র, এমনকি প্রধান কাজও নয়। সাহিত্য, পেন্টিং, নাটক, চলচ্চিত্র ও নাচের মতো সঙ্গীতের একমাত্র, এমনকি প্রধান কাজও নয়। সাহিত্য, পেন্টিং, নাট, চলচ্চিত্র ও নাচের মতো সঙ্গীতের কাজ অভিব্যক্ত। সঙ্গীতকারের নানান আবেগ, ভাবনা ও বক্তব্য সঙ্গীতে মধ্যে দিয়ে ফুটে উঠবে এটাই সভ্যতার দাবি। পৃথিবীর বড় বড় সঙ্গীতকার এটাই করে গেছেন। আমাদের দেশের ঐতিহ্যময় রসশাস্ত্রেও নাটক, সঙ্গীত ও নৃত্যে যে নানান রসের প্রকাশের কথা বলা আছে (যার মধ্যে আদিরস বা করুণ রসই শুধু নয়, বীররস এমনকি বীভৎস রসের কথাও রয়েছে) তা খামখেয়ালবশত নয়। কণ্ঠসঙ্গীতে (ধ্রুপদখেয়াল) ও তারযন্ত্র বাদনে যে গমকের প্রয়োগ, তার উদ্দেশ্য কারুণ্য বা প্রেমাবেগের হাওয়ায় ভেসে যাওয়ার ভাব জাগানো আদৌ নয়। গান বা সঙ্গীত মাঝে মাঝে স্ফূর্তির তারল্যে ভসিয়ে দিক মানুষকে, ভুলিয়ে দিক সাময়িকভাবে তার অস্তিত্বের গুরুভার, অস্বস্তিতে দিক স্বস্তি, এমনকি ঘুর পাড়াক-এ দাবি অবশ্যই স্বাভাবিক। দুনিয়ার প্রতিটি সমাজ ঘুমপড়ানি গান তৈরি করেছে, করেছে বিশুদ্ভ অবসরযাপন ও স্ফূর্তি করার সঙ্গীত। কিন্তু কেবল ওই কাজগুলিই সঙ্গীতের একমাত্র কাজ হোক-এমন দাবি অস্বাভাবিক, সঙ্গীতবিরোধী, সভ্যতারিবোধী, মানুষের স্বভাববিরোধী। জার্মান সঙ্গীতস্রষ্টাও দার্শনিক হান্স ভেরনার হেনৎসে তাঁর ‘সঙ্গীত ও রাজনীতি’ গ্রন্থে লিখেছেন: ‘সঙ্গীত দাসও তৈরি করতে পারে।’ বাংলার আধুনিক গানের ক্ষেত্রে কথাটি ভেবে দেখা দরকার। ভাবা দরকার আমাদের সামগ্রিক সঙ্গীতচিন্তা ও বিনোদনচিন্তা সম্পর্কেও। এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গে, বাংলাদেশে, বস্তুত সারা উপমহাদেশে সঙ্গীত ইন্ডাষ্ট্রি যা করে চলেছে, এমনকি যৌবনের সাঙ্গীতিক অভিব্যক্তির নামেও যা হয়ে চলেছে, তা দাস বানানোর এক বিপুল উদ্যোগ ছাড়া অন্য কিছু কি?

একাত্তর সালে একটি ঘটনা ঘটল যা বাঙালির এক হাজার বছরের ইতিহাসে বাঙালি জাতির জীবনে সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী ঘটনা। পৃথিবীর প্রথম বাঙালি রাষ্ট্র জন্ম নিল। বাংলাদেশ। পশ্চিমবঙ্গের আধুনিক বাংলা গানের জগৎ যে তখন কোন হাঁড়ির হালে পর্যবসিত, তার প্রমাণ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম নিয়ে একটি মাত্র আধুনিক বাংলা গান রচিত, পরিবেশিত ও রেকর্ডবদ্ধ হল: গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের লেখা, অংশুমান রায়ের সুর করা ও গাওয়া। ডিস্কের অপর পিঠে এককালে বিখ্যাত গিটারশিল্পী সুজিত নাথের ক্যনা করবী নাথ ওই গানটিরই ইংরেজি সংস্কারণ গাইলেন। অংশুমান রায়ের গানটি সে মুহুর্তে যে বিপুল সমাদর পেয়েছিল, তা প্রায় নজিরবিহীন। এ থেকে প্রমাণিত হয় যুগোপযোগী, যুগমুহূর্তের দাবি মেটানোর যোগ্য একটি বাংলা গান পাওয়া যেগেল বাংলার সাধারণ মানুষ তা লুফে নিতে প্রস্তুত ছিলেন। পশ্চিমবাংলার দিকে দিকে, রাস্তার মোড়ে মোড়ে, বিভিন্ন পার্বণে, অনুষ্ঠানে তখন এই গানটির রেকর্ড লাউডস্পিকারে বাজত। গানটির ধুয়ো ‘বাংলাদেশ, আমার বাংলাদেশ’ বেশ কিছুদিন ধরে বাংলার জনমানস দখল করে ছিল। ভীষণ চিন্তাশীল, সারাক্ষণ সব কিছুর চুলচেরা বিচার বিশ্লেষণ করে যাওয়ার ঠিকেদারি নেওয়া, সদা-সিনিকাল বঙ্গসন্তানরা ওই গানটি কোন কানে শুনছিলেন, আদৌ শুনছিলেন কিনা, ঠিক জানি না। আমি জানি সাধারণ মানুষদের কথা। তাঁরা সহজেই বরণ করে নিয়েছিলেন গানটি। ওই সময়ে গ্রামোফোন কোম্পানি অফ ইন্ডয়া সলিল চৌধুরির চারটি পুরনো গানের সঙ্কলন বের করেছিল (৪৫ আর পি এম/এক্সেন্ডেড প্লে রেকর্ড) ‘বাংলা আমার বাংলা’ নাম দিয়ে। নেপথ্যে কোরাস, অগ্রভূমিতে মান্না দে ও সবিতা চৌধুরি। দুজনের, বিশেষ করে মান্না দে-র গায়কিতে ‘মানব না বন্ধনে’ সেই যুগমুহূর্তে (বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ তখন চলছে, চলছে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধও) এক জুৎসই উচ্চারণ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু লক্ষ্য না করে উপায় নেই যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, তিরিশ লক্ষ বাঙালির শাহাদাত বরণ, বাঙালি জাতির প্রথম সার্বভৌম উচ্চারণের মতো ঘটনাও সলিল চৌধুরির কাছ থেকেও একটি নতুন গান আদায় করতে পারেনি। তিনি শুধু ‘মানব না বন্ধনে’ গানটিতে (গানটি তার তিন দশক আগে তৈরি) একটি নতুন স্তবক জুড়ে দিয়েছিলেন মাত্র: মাগো বাংলা আর কতদিন/নিজভূমে পরবাসী প্রতিদিন/রব, পদেপদে গঙ্গাপদ্মা হায়/রক্তনদী হয়ে বয়ে বয়ে যায়/মাগো তোর কোটি কোটি সন্তানে/নেয় প্রতিজ্ঞা আর সব না। একই সময়ে শচীন দেববর্মন রেকর্ড করেন তাঁ অনেককাল আগে রেকর্ড-করা বিখ্যাত একটি গান ‘শুনি তাক্ ডুম্ তাক্ ডুম্ বাজে, বাজে ভাঙা ঢোল’ ভেঙে তৈরি একটি গান। ‘ভাঙা ঢোল’-এর জায়গায় বসানো হল ‘বাংলাদেশের ঢোল।’ টাক ডুম্ টাক্ ডুম’ বাদে আর সবই দেওয়া হল এখানে ওখানে পাল্টে। ভাঙা ঢোল-এর ভাঙা গান। গোটা একটা নতুন গান কিন্তু পাওয়া গেল না। পশ্চিমবঙ্গের বাংলা গানের ইন্ডাষ্ট্রি থেকে আমরা ওই রকম এক যুগমহূর্তেও পেয়েছিলাম তাহলে আংশুমান রায়ের কণ্ঠে-সুরে, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের লেখা একটিমাত্র গান, সলিল চৌধুরির পুরনো একটি গানের শেষে জরে দেওয়া নতুন একটি স্তবক। এবং শচীন দেববর্মনের গাওয়া পুরনো গান ভাড়া একটি গান যেটিকে নতুন গান বলতে বাধে। পশ্চিমবঙ্গে বাংলা গানের ইন্ডাষ্ট্রির বাইরে বাংলায় নতুন গান রচনার বিচ্ছিন্ন কিছু উদ্যোগ সাতের দশকেই দেখা যায়। রাজনৈতিক দিক দিয়ে এই দশক ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে সামরিক-রাজনৈতিক দিক দিয়ে এই দশক ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে সামরিক-রাজনৈতিক মুক্তি সংগ্রামরে মধ্যে দিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। পশ্চিমবঙ্গ কেঁপে ওঠে নকশালপন্থী রাজনৈতিক উচ্চারণে। সঙ্ঘর্ষের রাজনীতি ও প্রশাসনের কঠোর ও প্রতিহিংসামূলক পদক্ষেপ ও দমননীতি ডেকে আনে নাগরিক জীবনে অদৃষ্টপৃর্ব অনিশ্চয়তা। সাতের দশকেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ঘোষণা করেন জরুরি অবস্থা। সেই ঝকমারির দশকেই শোনা যায় প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের কিছু রাজনৈতিক বক্তব্য সম্বলিত বাংলা গান, যদিও সেগুলি তখন রেকর্ড করা হয়নি। রেকর্ড না থাকায় এবং বেতার বা অন্য কোন গণমাধ্যমে এই গানগুলি শোনার সুযোগ না থাকায় এগুলি প্রচার পায়নি। নকশালপন্থী রাজনীতির সমর্থকরা অনেকেই প্রতুল মখোপাধ্যয়ের কোনও কোনও গানের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। সে রকমেই এক একটিভিস্টের কাছে আমি ১৯৭৯ সালে কয়েকটি গান শুনি। প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের গানগুলি কিন্তু তখন গণসঙ্গীত নামেই পরিচিত ছিল। আমি নিজেও সাতের দশকের মাঝামাঝি গান তৈরি করতে শুরু করি। এ কেমন আকাশ দেখলে তুমি, ভাল লাগছে না অসহ্য এই দিনকাল, ‘কে তৈরি করেছিল তাজমহল’, শহীদ কাদরির কবিতার ধাক্কায় ‘রাষ্ট্র’ সাতের দশকেই তৈরি। এগুলিও তখন রেকর্ড করা হয়নি। নাগরিক নামের একটি শিল্পীগোষ্ঠী, আমি যার সদস্য ছিলাম, ১৯৭৯ সালে গানগুলি গাইছিলেন, যদিও খুব কম মানুষই গানগুলি শোনার সুযোগ পেয়েছিলেন সে-সময়ে। একই সময়ে মহীনের ঘোড়গুলি, নামে কলকাতার এক শিল্পীগোষ্ঠী কিছু নতুন গান তৈরি করেন। তাঁদের গানগুলির সুর ছিল ইংরেজি গান-ঘেঁষা এবং লিরিকেনগরজীবনের কিছু কথা স্থান পাচ্ছিল। গৌতম চট্টোপাধ্যায় ছিলেন এই গোষ্ঠীর একজন শিল্পী, সৃজনশীল মানুষ। এঁদের গানে এক ধরনের নতুনত্ব ধরা দিচ্ছিল, কিন্তু খুঁটিয়ে শুনলে এও মনে হচ্ছিল যে এঁরা তখনও এঁদের গানের ‘ভাষা’ পুরোপুরি খুঁজে পাননি। তাছাড়া এক ধরনের নাগরিক ভাবালুতাও পাওয়া যাচ্ছিল এঁদের গানে। ধারাবাহিকভাবে গান রচনা ও পরিবেশন করে গেলে হয়ত লিরিকনির্মাণে, সুরসংযোজনায় ও গায়কীতে তাঁদের গান কালক্রমে আরও সুঠাম দেহ পেত। কিন্তু রচনার ধারাবাহিকতা রক্ষা করেননি। আটের দশকে ইন্দ্রজিত সেন, ইন্দ্রনীল সেন, প্রবুদ্ধ বন্ধ্যোপধ্যায়, গৌতম নাগ এবং আরও কয়েকজন ‘নগর ফিলোমেল’ নাম নিয়ে তৎকালীন গ্রামোফোন কোম্পানি অফ ইন্ডিয়া থেকে একটি নতুন গানের এলবাম বের করেন। ক্যাসেটের ওপর লেখা ছিল সহর সঙ্গীত’। অর্থাৎ এই শিল্পী দল ঘোষণা করেই নগরজীবনকেন্দ্রিক গান পরিবেশন করতে চাইছিলেন। এই এলবামের নগর ফিলোমেলের গাওয়া মহীনের ঘোড়াগুলির গানও ছিল, সেই সঙ্গে নতুন কিছু গান। গৌতম নাগের লেখা ‘বিজনের চায়ের কিবন’ নিঃসন্দেহে নগর জীবনকেন্দ্রিক গান, যার কথা ও সুরের বিষন্নতা স্পর্শ করে। কিন্তু নগর ফিলোমেল বা গৌতম নাগ নতুন গান রচনা ও চর্চার ধারাবাহিকতা রক্ষা করেননি। এ ব্যাপারে তাঁর মহীনের ঘোড়াগুলির মতোই। পরবর্তীকালে নগর ফিলোমেলের ইন্দ্রনীল সেন বরং ‘রিমেক’ গান গেয়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন, যুগোপযোগী নতুন গান গেয়ে নয়। গানের কথা-সুর-গায়কি-যন্ত্রানুষঙ্গের কায়েমি প্রথার বাইরে গিয়ে বিষয়বস্তু ও আঙ্গিকের দিক দিয়ে নতুন গান তৈরি করা এবং শ্রোতাসমাজে তার জন্য জাগয়া দখল করে নেওয়ার জন্য সৃষ্টি ও চর্চার ধারাবাহিকতা যে কতটা অপরিহার্য তা বুঝতে গেলে ইংরেজি দুনিয়ার ‘সংরাইটারদের’ দিকে একবার তাকানো দরকার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ও ইংল্যান্ডে, লঘু সঙ্গীতের দুনিয়ার পাঁচ ও ছ-এর দশকে ‘সংরাইটার’দের যুগ এসেছিল। তার আগে, পাশ্চাত্যে আধুনিক গানের যে ধারা ছিল, প্রেম ছিল যে গানের মূল উপজিব্য এবং যে গানের লেখক ও সুরকার ছিলেন সচরাচরআলাদা, ‘সংরাইটারা’ তা থেকে বেরিয়ে গিয়ে গানের এক নতুন দুনিয়া সৃষ্টি করে ফেললেন। এরা নিজেরা গান লিখতেন, সুর করতেন গাইতেন। ফলে, নতুন নতুন গান তাঁদের যার যার ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি, ভাবনা ও দর্শনের অভিব্যক্তি হয়ে উঠল। গান হয়ে উঠল ‘স্টেটমেন্ট’। তার আগে গানের এই দার্শনিক ভূমিকাটা ছিল না। গানের ভূমিকা ছিল নিছক বিনোদন। কিন্তু ‘সংরাইটারদের’ যুগ শুরূ হওয়ায় স্থানকালের পরিসরে গান নানান বিষয়ে ব্যক্তির চিন্তাধারা, মতবাদ, দৃষ্টিভঙ্গি ও দর্শনের প্রতিনিধি হয়ে উঠল। ছ-এর দশকে আমেরিকায় ও ইংল্যান্ডে সংরাইটারদের প্রতাপ ও জনপ্রিয়তা এমন জায়গায় পৌছল যে সাধারণ ‘পপ’ গানের ছয়-পূর্ববর্তী আধিপত্য আর রইল না। ছ-এর দশকে ছিল বীটল্স গোষ্ঠীর আবিশ্ব জনপ্রিয়তা, আনুষ্ঠানে যা এক ধরনের গণ হিস্টিরিয়া ডেকে আনত। বীটলসরা নিজেরাই গন লিখতেন, সুর করতেন, গাইতেন, বাজাতেন। প্রথম দিকে বয়ঃসন্ধিসুলভ প্রেমের গান বাঁধলেও কালক্রমে তাঁরা লিরিক ও সুরে দিক দিয়ে আরও সিরিয়াস গানও রচনা করেন। কিন্তু তা হলেও, দার্শনিক দিক দিয়ে তাঁদের গান সেই যুগের যুগচেতনার প্রতিনিধি হয়ে উঠতে পারেনি যা সেই যুগেই, অর্থাৎ ছ-এর দর্শকে বব ডিলানের গান হয়ে উঠতে পেরেছিল, বা তার কিছু পরে ক্যানাডার সংরাইটার লেনার্ড কোহেনের গান। বীটিলস গোষ্ঠীকে সংরাইটার বলা যাবে না। কারণ সংরাইটার একক ব্যক্তি। একজনের লেখা-সুর-করা গাওয়া গানের ধারাবাহিকতার মধ্যে দিয়ে সময় ও ব্যক্তির মাধ্যকার যে সম্পর্ক ফুটে ওঠে তা বীটলসদের গানে ফুটে ওঠেনি। এই বিবর্তন দেখা গিয়েছিল পীট সীগার, বব ডিলান, ফিল অক্স, জোন বায়েজের গানে। সাতের দশকে জার্মানিতেও ‘লীডারমাখার দের (যার আক্ষরিক অর্থ গান-গান-নির্মাতা) আবেদন আনল নতুন যুগ। আমরা অবশ্য জার্মানি বা ফ্রান্সের আধুনিক গান সম্বন্ধে খবর বিশেষ রাখি না, প্রধানত ভাষার কারণে। ইংরেজি ভাষার মাধ্যমটি থাকায় আমেরিকা ও ইংল্যান্ডের গানের জগতের সঙ্গেই আমাদের যোগ। লক্ষ্যণীয়, সাত ও আটের দশকেও শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, বাংলাদেশেও যে শিল্পীরা জনপ্রিয়া ইংরেজি গানের আঙ্গিক বরণ করে নিচ্ছিলেন, তাঁরা কিন্তু সংরাইটারদের সৃষ্টির চেয়ে ছ-এর দশকের ইংরেজি ‘পপ’ আঙ্গিকটিকেই প্রাধান্য দিচ্ছিলেন বেশি। বীটলসদের গান ছিল গোত্রের দিক দিয়ে ‘পপ’ এবং পাশ্চাত্যের উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েরাই ছিলেন তাঁদের প্রধান শ্রোতা। একটি পর্যায়ে লন্ডন সিস্ফনি অর্কেস্ট্রার মত সম্ভ্রন্ত ধ্রুপর্দী যন্ত্রীদল বীটলসদের গানের সঙ্গে অর্কেস্ট্রো রচনা করে ও বাজিয়ে গ্রামোফোন রেকর্ড করেছিরেন। লেনার্ড বার্নস্টীনের মতো বিরাট সিস্ফনি-পরিচালক, পিয়ানিস্ট ও সঙ্গীতকারও বলেছিলেন-বীটলসদের কোন কোন গান সাঙ্গীতিকভাবে এত উন্নত যে সেগুলিকে স্বচ্ছন্দে শুবার্টের ‘লীডার’-এর (জার্মান ভাষায় ‘লীড’ মানে গান, ‘লীডার’ বহুবচন: প্রখ্যাত ধ্রুপদী জার্মান সঙ্গীতকার শুবার্ট বিভিন্ন গানে সুরারোপ করে সেগুলিকে মার্গসঙ্গীতের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং সেই গানগুলি তাঁ ‘লীডার’ নামেই পরিচিত) পাশে স্থান দেওয়া যায়। আমাদের দেশের ‘মহান’ সঙ্গীতজ্ঞরা যদি পাশ্চাত্যের ওই প্রবাদপ্রতীম সঙ্গীতকারের ঔদার্য থেকে একটু শিক্ষা নিতেন। যাই হোক, কোন কোন গানের উন্নত সাঙ্গীতেক বৈশিষ্ট সত্বেও বীটলসদের গানে এমন কোনও দর্শন ধারা বাহিকভাবে ধরা দেয়নি যার দরুণ তাঁদের গানের প্রফেট বলা যেতে পারে। বব ডিলান বা লেনার্ড কোহেন, সংরাইটার হিসেবে, সেই জায়গাটি পেয়েছিলেন। সাতের দশক থেকে কলকতায় বিচ্ছিন্নভাবে যাদের গোষ্ঠীবদ্ধ উদ্যোগে ইংরেজি গানের কিসিমঘেষা কিছু গান পাওয়া যাচ্ছিল তাঁদের কাজে আমেরিকা ও ইংল্যান্ডে সংরাইটারদের গানের প্রভাব অতটা ধরা দিচ্ছিল না, যতটা মিলছিল পশ্চাত্যের ছ-এর দশকোচিত ‘পপ’ মিউজিকের অনুরণন। অর্থাৎ সে-সময়ের স্থানকালের পরিসরে তাঁদের গানের দেহে ভাষা পাচ্ছিল না ব্যক্তির বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি, মন্তব্য, দর্শন। বলা বাহুল্য, দর্শন বলতে আমি এ-ক্ষেত্রে কান্ট বা হেগেলের দর্শন বোঝাতে চাইছি না। প্রতিটি গান একটি আলাদা সৃষ্টি। তার স্বল্প পরিসরেও বিভিন্ন বিষয়ে ও প্রসঙ্গে গান-নির্মাতার দৃষ্টিভঙ্গি, মনোভাব, চিন্তা উচ্চারিত হতে পারে। সেই উচ্চারণ কিন্তু লক্ষ্যণীয় মাত্রায় ছিল না। যেটুকু ছিল তা নিতান্ত বিক্ষিপ্তভাবে অপরিণত অবস্থায়। ইংরেজি পপ গানের ধরণ ও আবেদন (আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্র থেকে প্রতি রবিবার দুপুরে প্রচারিত মিউজিকাল ব্যান্ডবক্স অনুষ্ঠানটির দৌলতে পাঁচের দশক থেকে অসংখ্য ইংরেজি পপ গান শোনা গিয়েছে) বাংলা গানে সরাসরি সঞ্চারিত করে আধুনিক বাংলা গানের বাজারে নতুন কোনও বিক্রি-হুজুগ তোলা যায় কিনা, শ্রোতাদের মনে উৎসাহ আনা যায় কিনা সেই চেষ্টাও প্রমোফোন কোম্পানি অফ ইন্ডয়া করতে ছাড়েননি সাতের দশকের গোড়ায়। এই উদ্যোগপ্রসূত গানগুলির রেকর্ডে ‘বাংলা পপ’ তকমাও সাটা হয়েছিল। রানু মখোপাধ্যায় ও শ্রাবন্তী মজুমদারের কণ্ঠে সে সময় এই আঙ্গিকের কিছু গান শোনা গিয়েছিল। রানু মখোপাধ্যায়ের একটি গান ‘বুশি পল’ কলকাতা কেন্দ্রের অনুরোধের আসরে বাজতও মাঝোমাঝে। কুচকুচে কালো সে যে জাতে স্প্যানিয়াল’ এই ছিল গানটির শুরু। নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী। গানটির সুরে ও গায়কিতে ছিল এককালের জনপিয় মার্কিন পপশিল্পী কনি ফ্রান্সিসের গানের প্রভাব। স্মৃতিনির্ভর আমার এই লেখায় আমি কখনও কখনও অসহায়বোধ করছি কারণ কোন গানের কে সুরকার, কে গীতিকার তা আমার আর হুবহু মনে নেই। তবে যতদূর মনে পড়ে ভি বালসারা কয়েকটি গানের সুর দিয়েছিলেন, আর কয়েকটি গান লিখেছিলেন গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার। বাংলা পপ গোত্রের আর একটি গ্রামোফোন রেকর্ডে ছিল-মা আমায় বলেছে আমি নাকি বড় হয়েছি। বাস্তবিকই ইংরেজি পপ আঙ্গিকে তৈরি ও গাওয়া এই গানটিও ব্যকিক্রমী আবেদন এনেছিল্ গ্রামোফোন কোম্পানির এইসব বাংলা পপ গানের রেকর্ড শুনে তখন মনে হয়েছিল এগুলির উদ্দেশ্য নবীন শ্রোতাদের আকর্ষণ করা। কারণ, আধুনিক বাংলা গানের প্রচলিত ধারায় যাঁরা তখন অভ্যস্ত সেই উত্তীর্ণ-কৈশোর ও মধ্যবয়সী শ্রেতাদের এই ধরনের গান শুনে খুব আকৃষ্ট হওয়ার কথা ছিল না। এই বাংলা পপ গানগুলি সে-যুগে বাংলার কিশোর-কিশোরীরে কেমন লেগেছিল তা জানার উপায় নেই, কারণ সঙ্গীত বিষয়ে জনমত যাচাইয়ের রীতি আমাদের দেশে তখনও ছিলনা, এখনও নেই। তবে ‘বাংলা পপ’ মার্কা গ্রামোফোন রেকর্ড গ্রামোফোন কোম্পানি অফ ইন্ডয়া কয়েকটির পর আর বিশেষ বের করেননি বলে ধরে নেওয়া যেতে পারে যে গানের বাজারে রেকর্ডগুলি তেমন চলেনি। চললে এই গোত্রের গানের রেকর্ড আরও বেরোত। ‘বাংলা পপ’ তকমায় কিছু আধুনিক গানের গ্রামোফোন রেকর্ড প্রকাশের এই উদ্যোগ থেকে বোঝা যায়: প্রচলিত বাংলা আধুনিক গানের ধরণধারন ও কথা-সুর-গায়কির বক্তব্যর বাইরে বেরনো যে দরকার, ইন্ডাষ্ট্রির একটি অংশ তা উপলব্ধি করেছিল। কারণ, ছ-এর দশক শেষ হওয়ার আগে থেকেই আধুনিক বাংলা গানের ব্যবসায় মন্দা দেখা দিতে থাকে। শুধু তাই নয়, গান সমাজেরই অঙ্গ। বিচিত্র নাগরিক জীবনের সঙ্গে গান যদি একটি সম্পর্ক ও সামঞ্জস্য রক্ষা না করতে পারে, নাগরিক জীবন ও ব্যক্তি-সমজের সম্পর্কের বিচিত্র দিকগুলিকে এড়িয়ে গান যদি কেবল একই দিকে চলতে থাকে বছরের পর বছর তাহলে সেই গানের ধারা মজে যেতে বাধ্য ।কথা সুর গায়কীর কাঠমোগত ও চরিত্রগত দ্বন্দ্বের কারণে আধুনিক বাংলা গান ছ-এর দশক থেকেই স্রোতহীন নদীর মতো হয়ে পড়ছিল, মজে যাচ্ছিল।