Sufi Faruq (সুফি ফারুক)

কোন পথে গেল গান – কবীর সুমন -৫ বই সংগ্রহ

Kabir Sumon | কবীর সুমন

সাতের দশকে, বাজারচলতি গানের ধারার বাইরে বাংলা গান বানানো ও গাওয়ার সীমিত ও বিচ্ছিন্ন কিছু চেষ্টা কলকাতার রজ্ঞন প্রসাদ (প্রসাদরঞ্জন) ও বহরমপুরের হর্ষ দাশগুপ্তও করেছিলেন। যতদূর জানি, পীট সীগারের গাওয়া লিটল বক্সেস’ গানটির বাংলা অনুবাদ করেছিলেন রঞ্জনপ্রসাদ। কিছু গান বেঁধেওছিলেন। শুনে মনে হয় এই গানগুলির প্রেরণায় ছিল ইংরেজি গানের ধারা। আধুনিক বাংলা গানের ধারায় ও ইডিয়মে এঁরা কেউ ধারাবাহিকভাবে গান বাঁধেননি। সামাজিকভাবে এই ধরনের গান সীমিত ছিল সংক্ষিপ্ত পরিসরে। গ্রামোফোন রেকর্ড বা বেতারের মাধ্যমে প্রচারিত হয়ে এগুলি সামাজিকভাবে গতিশীল হয়ে ওঠেনি। এ প্রসঙ্গে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার মনে রাখা দরকার। গান শুধু বাঁধলেই হয় না। সেই গান দক্ষ কণ্ঠে গাওয়াটাও সমান জরুরি। অদক্ষ, পরিশীলনহীন কণ্ঠে ভাল গানও অনেকসময় শ্রোতাকে তুষ্ট করতে পারে না। যে কোনও ভাষায় নতুন গান বেঁধে গাওয়ার ব্যাপারে এই দিকটা মাথায় থাকা দরকার। ১৯৮৫ সালে নাগরিক শিল্পীগোষ্ঠীর পরিবেশনায় আমার তৈরি গান গ্রামোফোন রেকর্ড করার ব্যাপারেগ্রামোফোন কোম্পানি অফ ইন্ডিয়ার তৎকালীন কর্মকর্তা বিমান ঘোষ আমায় বলেছিলেন গানগুলির ঠিকমতো, পেশাদার দক্ষতায় গাওয়া না হলে কোনও সুফল পাওয়া যাবে না। তিনি আমায় মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, সলিল চৌধুরির গানগুলি পাঁচের দশক থেকে অত জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পেরেছিল শুধু রচনার গুণে নয়, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, লতা মুঙ্গেশকরের মত কণ্ঠশিল্পীদের গুনেও। তিনি এমনকি কণ্ঠশিল্পীদের গুণপনার বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। দীর্ঘকাল আকাশবণীতে কাজ করে বিচিত্র অভিজ্ঞতা সঞ্চয় এবং ভারতের বিভিন্ন শিল্পীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরিচয়ের সুবাদে বিমান ঘোষ সেদিন যে মত দিয়েছিলেন তা খাঁটি। ভাল গান বা জরুরি গান শুধু রচনা করলেই হবে না, দক্ষতার সঙ্গে তা পরিবেশনও করতে হবে। দ্বিতীয় শর্তটি সম্ভবত প্রথমটির চেয়ে বেশি জরুরি। আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, অনেক গান আমরা আজও শুনে যাই, বারবার শুনি কণ্ঠশিল্পীর আবেদনের কারণে। সেই গানগুলি হয়ত ‘গান’ হিসেবে দুর্বল। দক্ষ পরিশীলিত পরিবেশনার গুণে সেই দুর্বল গানগুলিও শুনতে ভালো লাগে।

বাজারছুট নতুন বাংলা গান রচনা ও পরিবেশনার ক্ষেত্রেও এই ব্যাপারটি নিশ্চই ছিল এবং আছে। সাতের দশকে এবং তার পরেও যাঁরা চেষ্টা করেছিলেন নতুন আঙ্গিকে, নতুন বক্তব্য নিয়ে গান তৈরি করতে, গায়ক হিসাবে তাঁরা কতটা গ্রহণযোগ্য ছিলেন সেটা খুব বড় প্রশ্ন। এ-ব্যাপারে নিজের সম্পর্কে এবং সঙ্গীত সম্পর্কে ভুল ধারণার বশবর্তী হওয়ার দরুণ সযত্নে পালিত কোন আত্মশ্লাঘা বা অভিমান নিতান্তই অকাজের। বক্তব্য যত জরুরি আর ভালই হোক, যে গায়ক/গায়িকার কণ্ঠ থেকে সেটি বেরচ্ছে সেই কণ্ঠ ও গায়কী লোকর যদি ভাল না লাগে তো মুশকিল। গানের রচয়িতা যদি নিজে এমনিতে ভাল গায়ক না হন তো খুব ভাল গানও মাঠে মারা যেতে পারে। সাতের দশকে পশ্চিমবঙ্গের কোন কোন ব্যক্তির নতুন গান বাঁধার বিক্ষিপ্ত প্রয়াস ১৯৪৩ সালে যশোদাদুলাল মণ্ডলের ঐকিক প্রয়াসের কথা মনে করিয়ে দেয়। ১৯৯২ সালে ‘তোমাকে চাই’ প্রকাশের পর নতুন বাংলা গানের জোয়ার যখন এল তখন টেলিবিশনে প্রতুল মুখোপাধ্যয়ের মত রঞ্জনপ্রসাদকে ও দেখা শোনা গিয়েছে। তেমনি, রাজনৈতিক বক্তব্যসম্বলিত গান রচনার কাজে বিপুল চক্রবর্তীও সক্রিয় হয়েছিলেন। সুলেখক বিপুল চক্রবর্তীর গানে বরং আধুনিক বাংলা গানের ধারার স্পর্শ গাওয়া গিয়েছিল। সাত, আট ও নয়ের দশকে গণসঙ্গীত পর্যায়ে অনুপ মুখোপাধ্যয়ের কণ্ঠেও শোনা গিয়েছিল কবিতায় সুরারোপিতা কিছু নতুন গান। আধুনিক বাংলা গানের ধারার সঙ্গে বিলক্ষন পরিচিত ও বাংলা গানপ্রেমী অনুপ মুখোপাধ্য ও বিপুল চক্রবর্তীর মত গীতিকার-সুরকার যদি নয়ের দশকে বাংলা গানের ইন্ডাস্ট্রিতে গীতিকার ও সুরকার হিসাবে কাজ করতে পারতেন তাহলে এই ক্ষেত্রটি উপকৃত হত বলেই মনে হয়। আটের দশকে বিনয় চক্রবর্তী বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কিছু কবিতায় তাক লাগানোর মত সুর দিয়েছিলেন। ‘আমার মা যখন মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে আছ’ আর তোর কি কোনও তুলনা হয়’ তার উচু মনের দুটি কাজ। আফশোষের বিষয়, তিনিও সুরকার হিসেবে বাংলা গানের ইন্ডাষ্ট্রিতে এলেন না। অথবা, বাংলা গানের জগৎ তাঁর কাছ থেকে কাজ আদায় করে নিতে পারল না।

বাংলার নাগরিক সমাজে পশ্চিাত্যের ‘রক্’ অঙ্গিকে বাংলা গান তৈরি করে তা পরিবেশন করার ক্ষেত্রে পথিকৃতের ভূমিকা নিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের কেউ বা কোন শিল্পীগোষ্ঠী নন, বাংলাদেশের আজম খান। অজ্ঞতা ও সেইসঙ্গে সম্ভবত উন্নাসিকতার কারণে পশ্চিমবঙ্গের ‘বাংলা রক্’ আলোচক ও বোদ্ধারা সাতের দশকের গোড়ার দিকে প্রতিবেশি বাংলাদেশে ‘বাংলা রকের’ যে উদ্ভব ও বিকাশ হয়েছিল সে সম্পর্কে কিছু বলেন না। এত ইতিহাসনিষ্ঠার অভাব ছাড়া আর কিছুই প্রতিফলিত হয় না। কলকাতায় বা পশ্চিমবঙ্গে সাতের দশকে এখানকার প্রধানত ইংরিজি গান-ঘোঁষা কয়েকজন নাগরিক শিল্পী বিচ্ছিন্নভাবে কিছু গান তৈরি করে ও সুযোগ অনুযায়ী প্রকাশ্যে পরিবেশন করে গানের শ্রোতাদের ওপর বলার মত কোন প্রভাব ফেলতে পারেনি।

বাংলাদেশের ‘বাংলা রক্’ শিল্পীরা কিন্তু সাতের দশকের গোড়ার দিক থেকেই প্রভাব ফেলতে পেরেছিলেন তাঁদের দেশে, যুবসমাজের ওপর। আজম খান ও বাংলাদেশের রক্ জোয়ার সম্বন্ধে কিছু বলার আগে ভেবে দেখা দরকার ‘বাংলা রক্’ বলতে কী ধরনের সঙ্গীত বা গান বোঝায়। প্রতমত, সঙ্গীতের বিচারে এই গানগুলি আধুনিক বাংলা গানের ইডিয়মগুলি ও কাঠামোর বাইরে। কাঠামোর দিক দিয়ে এগুলির মিল বরং ইংরিজিভাষী দুনিয়ায় লোকসঙ্গীত ও জনপ্রিয় লঘু সঙ্গীতের সঙ্গে। ওই দুই শ্রেণীর গানের কাঠামো: স্তবক/কোরাস বা ধুয়ো/দ্বিতীয় স্তবক/একই কোরাস বা ধুয়ো/তৃতীয় স্তবক / একই কোরাস বা ধুয়ো- ইত্যাদি। বাংলার অধিকাংশ গোত্রের পল্লীগীতি ও আধুনিক গানের সাধারণ কাঠামো: স্থায়ী/অন্তরা/স্থায়ীতে ফেরা/ সঞ্চারী ( যদি থাকে) দ্বিতীয় অন্তরা/ স্থায়ীতে ফেরা- অন্তরার সংখ্যা তিন হলেও কাঠামো একই থাকে। ‘রাংলা রক্’ শিল্পীরা এই কাঠামো রক্ষা করেন না। গায়কীর ক্ষেত্রে, আধুনিক বাংলা গানে সাধারণত কণ্ঠপ্রক্ষেপ, স্বরপ্রক্ষেপ হয় সামঞ্জস্যপূর্ণ। কোন নাটক বা চলচ্চিত্রের কোন দৃশ্যের প্রয়োজনে মঞ্চশিল্পী বা নেপথ্য-গায়ক-গায়িকাকে হয়ত গানের বিশেষ কোন জায়গা হঠাৎ মাত্রতিরিক্ত জোর দিয়ে বা আগের অংশের সঙ্গে সমাঞ্জসহীনভাবে উচ্চকিত, তীর্যক বা কর্কশ ভঙ্গিতে গাইতে হতে পারে। অথবা, নাটক বা চলচ্চিত্রের গান না হলে ও গানটির কথা, সুর ও ভাব হয়ত এমন যে ব্যক্তব্যের প্রতি সুবিচার করতে গেলে গানটি একটি বিশেষ ভঙ্গিতে গাইতে হবে যা তীব্র, জোরাল, এমনকি কর্কশ। কিন্তু সচরাচর আধুনিক বাংলা গানে কণ্ঠপ্রক্ষেপ সুসমঞ্জস হয়ে থাকে। হিন্দুস্তানী ও দক্ষিণ ভারতীয় মার্গসঙ্গীতেও তাই, যদিও সরবিস্তার, তান ও সরগম করার সময় কোথাও কোথাও আবেগ বা অন্য কোন রস অথবা বিশেষ কোন আঙ্গিকের কিসিম ফুটিয়ে তোলার জন্য কণ্ঠশিল্পী গলাটা একটু উচ্চগ্রামে বা অন্য রঙে লাগাতে ও খেলাতে পারেন। এটা স্বীকৃত। কিন্তু সেই গোত্রের কণ্ঠসঙ্গীতেও বন্দিশ গাওয়ার সময় বা এমনিতে, রাগরূপ ফুটিয়ে তোলার সময়, স্বরবিস্তার-তান সরগমের সময় কণ্ঠপ্রক্ষেপ সুসমঞ্চস ও মসৃনই হয়ে থাকে। ‘বুক’ অঙ্গিকে কিন্তু ধবেই নেওয়া হয় যে গায়কের এই দায় নেই। শুধু তাই নয়। প্রথম থেকে এবং আগাগোড়া (অনভ্যস্ত কানে বিসদৃশ লাগতে পারে) জোরাল মায় কর্কশ ভঙ্গিতে বেসুরের নয়) গান গাওয়ারই দায় থাকে যেন রক্ শিল্পীদের। তার প্রধান কারণ, পাশ্চাত্যে, সুললিত ভঙ্গিতে একই ধরনের গান গেয়ে যাওয়ার স্বস্তিদায়ক কৃত্রিমতার বিরুদ্ধে নতুন অস্বস্তিদায়ক বক্তব্যের উচ্চারণের প্রচলিত ধারার মত। কণ্ঠপ্রক্ষেপ ও যন্ত্রাণুষঙ্ঘের সামগ্রিকতায় স্বস্তিদায়ক, অধিকাংশত মসৃন। এখানেই তার বিনোদনমূল্য। আকস্মিক কোন উচ্চকিত স্বরপ্রক্ষেপ সেখানে আচল। উঁচু পর্দায় যাওয়ার সময়ও কণ্ঠশিল্পীকে মধ্যসপ্তকের সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষা করতে হয়। যার গলা চড়ায় যত স্বচ্ছন্দই হোক, উঁচু পর্দায় যাওয়ার সময় মধ্য সপ্তকের চেয়ে বেশি জোর লাগবেই, কারণ তখন ফুসফুস থেকে বেশি হাওয়া বের করতে হয়। সেই কাজটি যিনি সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে করতে পারেন, কণ্ঠশিল্পী হিসেবে তিনিই গ্রাহ্য ও বরেণ্য। রক্ আঙ্গিকে কিন্তু স্বরপ্রক্ষেপের সামঞ্জস্য রক্ষা করার এই শর্তটি নেই। বরং সেটিকে আগ্রাহ্য করার মধ্যেই রক্ শিল্পীর স্বকীয়তা এবং অস্তিত্বের যুক্তি। মনে রাখা দরকার, গ্রামোফোন রেকডিং চালু হবার পর কয়েক দশক ধরে পাশ্চাত্যের প্রথাগত আধুনিক গানের বিষয় ছিল প্রধানত প্রেম। সেই প্রেমের অভিব্যক্তি ও ছিল বেশিরভাগ আধুনিক বাংলা গানের মত মোটের ওপর একই রকম সৌখিন, সাজানো-গোছানো। গানের মাধ্যমে অন্য বক্তব্য পেশ করার তাগিদে পাশ্চাত্যের এক শ্রেণীর শিল্পী যুক্তিসঙ্গতভাবে অন্য গায়কী সন্ধান করতে থাকেন। নতুন বক্তব্যসম্বলিত লোকগানের আন্দোলনে সংরাইটার-গায়করা বর্জন করেন সে-যুগের কেতাদুরস্ত ‘সৌখিন’ গায়নভঙ্গি। খোলা গলায়, অনাড়ষ্ট ভঙ্গিতে, দরকার হলে একটু অমসৃনভাবেও গান গাইতে থাকেন তাঁরা। তাঁদের সঙ্গে মাত্র গুটিকয়েক যন্ত্র বাজত। সাধারণত একটি গিটার, বেশি হলে একাধিক গিটার, হয়ত একটি ‘ফিড্ল্’ বা লোকায়ত আঙ্গিকে বাজানো বেহাল, একটি তালযন্ত্র। সবাই কিন্তু, একুস্টিক, অর্থাৎ একটিরও আওয়াজ বৈদ্যুতিক এম্পলিফায়ারের সাহায্যে আলাদা করে বাড়িয়ে দেওয়া হত না। যন্ত্রের সামনে মাইক্রোফোন রাখা হত বড়জোর। কিন্তু বৈদ্যুতিক গিটার, কীবোর্ডস যেমন ইলেকট্রিক আরর্গ্যান) ইত্যাদি উদ্ভাবনের পর পপ্ সঙ্গীতে সেগুলি ব্যবহার করা হতে থাকে। যতদিন এই ধরনের যন্ত্র ছিল না, লঘু সঙ্গীতে একুস্টিক যন্ত্রই ব্যবহার করা হত। কিন্তু রক্ সঙ্গীতের উদ্ভব বৈদ্যুতিক যন্ত্রের যুগে। শধু তাই নয়। ইলেকট্রনিক প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি ও নিত্যনতুন ইলেকট্রনিক যন্ত্র উদ্ভবন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বৈদ্যুতিক বাজনার আওয়াজ নানান ধরণের ফিলটারের সাহায্যে ইচ্ছেমত বাড়ানো কমানো এবং পালটে দেওয়ার উপায়ও আবিষ্কৃত হল। ইলেকট্রিক গিটার থেকে এমন আওয়াজ বের করা সম্ভব হয়ে উঠল যা অতীতে কল্পানাও করা যেত না। ইকুস্টিক যন্ত্রে যে ধ্বনি অসম্ভব, ইলেকট্রনিক যন্ত্রে তা সম্ভব হয়ে উঠতে লাগল। ‘সিন্থেসাইজার ‘ যন্ত্র উদ্ভাবনের পর বিভিন্ন বৈদ্যুতিক তরঙ্গ মিশিয়ে লোপ-পাস ও ‘হাই-পাস’ ফিলটারের সাহায্যে এমনিতে-অসম্ভব বিচিত্র ধ্বনি সৃষ্টি করা সম্ভব হয়ে উঠল। যন্ত্রসঙ্গীতের চরিত্র ও ধ্বনিবৈশিষ্ট পালটে যেতে লাগল প্রতিনিয়ত।
রক্ সঙ্গীত বৈদ্যুতিক বাজনার যুগের সঙ্গীত। আধুনিক সঙ্গীতের আলোচনায় এটা মনে রাখা জরুরি। সিন্থেসাইজার যন্ত্র জলভাত হয়ে ওঠার আগেই রক্ এর উদ্ভব, কিন্তু ইলেকট্রিক গিটার ও ইলেকট্রিক অর্গ্যানের সঙ্গে সে আঙ্গাঙ্গি জড়িত। একুস্টিক যন্ত্রের সঙ্গে রক্ চলে না। ইলেকট্রিক বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজ একুস্টিক যন্ত্রের চেয়ে বেশি জোরালো বলে তার সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে রক্ গায়কদের আরও জোরে গাইতে হয়। ইলেকট্রিক গিটার ও কীবোর্ডস দিয়ে যন্ত্রীরা আবার নানা এফেক্টস প্রসেসরের সাহায্যে বিচিত্র সাব ধ্বনি (মনে রাখা দরকার এই ধ্বনিবৈচিত্র কিস্তু শিল্পী ও শ্রেতার মনে নানান আবেগ সঞ্চার করতে পারে, অতএব এই ব্যাপারটিকে হালকাভাবে দেখা অনুচিত) বের করতে পারেন, করেনও। তাই রক্ গায়ককে সেই বুঝে কণ্ঠপ্রক্ষেপ করতে হয়। স্বাভাবিকভাবেই, এই অঙ্গিকের কারণে গায়কী হয়ে ওঠে আরও উচ্চকিত, জোরাল, কাটা কাটা, অমসৃন। গুণগতভাবে এটা কিন্তু অসাঙ্গীতিক নয়। আমাদের দেশে অনেক শ্রোতার মনে রক্ সম্পর্কে ভুল ধারণা- খানিকটা পাশ্চাত্যের ভাল রক্ অঙ্গিক না শোনার কারণে, খানিকটা সাংস্কৃতিক দূরত্বের কারণে, আর খানিকটা আমাদের দেশগুলির ‘রক্ শিল্পীদের কারণে।
বাংলাদেশের ‘বাংলা রক্ ‘ এবং কিছুটা হলেও এখানকার ‘বাংলা রক্ ‘ নিয়ে কিছু ভাবা বা বলার আগে রক্ গায়কীর চারিত্রিক দিকটা, কিভাবে কোন অবস্থায় তার উৎপত্তি এবং সঙ্গীতের মঞ্চে ও রেকর্ডি-এ তার প্রয়োগই বা কেমন এই দিকগুলি মাথায় রাখা একান্ত দরকার। সবচেয়ে ভাল এই লেখার পাঠক যদি ছয় ও সাতের দশকের ধ্রুপদী রক্ শিল্পীদের গানবাজনা শুনতে চেষ্ঠা করেন। তাহলে তারা বুঝতে পারবেন আঙ্গিকটি একসময়ে তার জন্মস্থানে কেমন ছিল এবং ‘বাংলা রক্ ‘ তা থেকে সব দিক দিয়েই কতটা দূরে। কলকতায় মহীনের ঘোড়াগুলি যখন গানবাজনা শুরু করেন, তখন কিন্তু তাঁরা ঠিক রক্ অঙ্গিক অনুসরণ করছিলেন না। তাদের মধ্যে তেমন কোন উচ্চকিত ভাব ছিল না। ছিল বরং পপ-এর স্বস্তিদায়ক মসৃনতা। বাংলাদেশে, সত্তরের গোড়ায় যে বাংল রক্ শুরু হল তা কিন্তু গায়কী ও ইলেকট্রিক বাদ্যযন্ত্র প্রয়োগের দিক দিয়ে মূল রকের আরও কাছাকছি। লিরিক বক্তব্য এবং অস্তিত্বের বিচিত্র অভিজ্ঞতা থেকে নানান বিষয়ে নতুন গান রচনার দিক দেয়ে নয়। বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার
৬৩
যে গত চার দশকে দুনিয়াজুড়ে তার বিভিন্ন অবিব্যক্তি সত্বেও রক্ কিন্তু পরিশীলিত এক সঙ্গীত-আঙ্গিক। হাঠৎ কোন খামখেয়াল বা অপটুত্ব থেকে এর উৎপত্তি নয়। বড় বড়, উচুমাত্রায় প্রশিক্ষিত ও ওস্তাদ শিল্পীরা, বিশেষ করে যন্ত্রীরা এই আঙ্গিক নিয়ে এক নাগাড়ে কাজ করে গেছেন, আজও করছেন। জন উইলিয়ামসের মত আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ক্লাসিকাল গিটারশিল্পী, যিনি পাশ্চাত্য ক্লাসিকাল গিটারের এক কুলগুরু আন্দ্রেস সেগোভিয়ার নিজের হাতে তৈরি ছাত্র, ধ্রুপদী সঙ্গীতের মাধ্যমে তিনি আজকের যুগের কথাগুলি, ভাবগুলি আর প্রকাশ কতে পারছেন না। তেমনি, জ্যাজ সঙ্গীতে উচ্চমানের দক্ষতার অধিকারী শিল্পীরাও রক্ সঙ্গীতে আত্মনিয়োগ করেন, যেমন আমেরিকার আল ডি মিয়োলা। আরও অনেক বাঘা বাঘা শিল্পী রক-এর সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন, যেমন এরিক ক্ল্যাপটন, যাঁকে অনেকেই গিটারের ঈশ্বর মনে করেন। তেমনি, রক্ লিরিক রচনাতেও যুগান্তকারী কাজ হয়েছে কয়েক দশক ধরে। লোকসঙ্গীতের আঙ্গিক ছেড়ে বব ডিলানের মত লিরিক-শিল্পী রক্ ব্যান্ড গড়ে তোলেন। তাঁর অসামান্য লিরিকশৈলীর স্টেটমেন্ট রক্ সঙ্গীতকে সমৃদ্দ করেছে। লিরিক- রচনায় সর্বকালের বিষ্ময় লেনার্ড কোহেনআগাগো রক্-এর সঙ্গেই যুক্ত। এমন উদাহরণ আরও দেওয়া যায়। বড় বড় সঙ্গীতশিল্পী ও লিরিক-শিল্পীদের অবদনের মধ্যে দিয়ে রক্ হয়ে উঠেছে অত্যন্ত পরিশীলিত, বাঙময়, বিচিত্র ও যুগোপযোগী এক আঙ্গিক। বিষয়বস্তু ও সাঙ্গীতিক অভিব্যক্তির পরিবর্তনশীল সমন্বয়ে রক্ মানবজাতির এক গুরুত্বময় সৃষ্টি। বাংলাদেশে ও তাপরপর পশ্চিমবঙ্গে বাংলা রক্ নামে যা শুরু হয়েছিল এবং আজও চলছে তা সাঙ্গীতিকভাবে ও লিরিকবৈশিষ্টর দিক দিয়ে পাশ্চাত্যের বিরটি রক্ ধারার ধারেকাছেও আসে না। পাশ্চাত্যের অনুকরণে নানান ইলেকট্রনিক ধ্বনি নির্মাণ যন্ত্রের সাহায্যে ইলেকট্রিক গিটার, কীবোর্ডস এবং ড্রামস প্রয়োগ এবং উচ্চকিত গায়নভঙ্গি ছাড়া সাধারন বৈশিষ্ট বলতে কিছুই প্রায় ছিল না,আজওনেই। বিশেষ করে লিরিক রচনা ও শিল্প-সম্মত স্টেটমেন্ট’-এর দিকে দিয়ে বাংলার রক্ গোড়া থেকেই মারাত্মক দুর্বল। সেই দুর্বলতা নিয়েই বাংলার রক্ সম্রাট আজম খানের শুরু। কিন্তু আজম খান থেকে বাংলাদেশে যে ব্যাপারাটি শুরু হল, বাংলাদেশের অসংখ্য মানুষ, বিশেষ করে তরুণ সমাজের ওপর তার বিপুল প্রভাবের কারণে সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এই ফেনমেনন’টি লক্ষ্য করার মত, আলোচনা করার মত। বাংলাদেশে গানের মঞ্চে আজম খানের আবির্ভাব বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পরেই। ওরে সালেকা ওরে মালেকা ওরে ফুলবানু পারলি না বাচাঁতে রেললাইনের ঐ বস্তিতে, ‘আমি যারে চাই রে, ‘অনামিকা, চুপ’ ইত্যাদি গানের জন্য তিনি অল্পকালের মধ্যেই বাংলাদেশে অসাধারণ জনপ্রিয়তা অজন করেন। সেই জনপ্রিয়তার মাত্রা ও পরিস্বর পশ্চিমবঙ্গের কোন শিল্পী বা এ
৬৪
রাজ্যের শ্রোতাকূল কল্পনাও করতে পারবেন না। আজম খান নিজে কোন যন্ত্র বাজিয়ে গাইতেন না। তাঁর গানের সঙ্গে গিটার, কীবোর্ড, ড্রামস বাজত। দশ বারো বছর আজম খান ছিলেন বাংলাদেশের একচ্ছএ রক-সম্রাট। তারপর তিনি আর গান করেননি। কিন্তু আজও তিনি যদি গান করতে মঞ্চে ওঠেন তো দর্শক ও ভক্ত সমাগম যা হবে তা দুই বাংলার অন্য কোন শিল্পীর ভাগ্যেই জুটবে না। তাঁর অসংখ্য ভক্তের কাছে তিনি আজও গুরু। লক্ষ লক্ষ বাঙালির মনে তাঁর অদ্ভুত আবেদনের কারণে ক্ষীণকায়, লম্বা, আপনভোলা, প্রতিষ্ঠানবিমুখ, প্রচারনিস্পৃহ আজম খান সিরিয়াস গবেষণার বিষয় হতে পারেন। সঙ্গীত ও সমাজের সম্পর্ক বাংলা বিদ্দজ্জনদের মস্তিস্কে কোনদিনই তেমন গুরুত্ব পায়নি। (ফলে এই মস্তিস্কটি ও আমার মতে গবেষণার বিষয় হওয়া উচিত)। আর আধুনিক সঙ্গীত ও তার সামাজিক ভূমিকা তো বিষয় হিসেবে ব্রাত্যই থেকে গেল। তাই আজম খানের সঙ্গীত, পরিবেশনার আঙ্গিক ও গণ-আবেদন নিয়ে এখনও গবেষণাধর্মী কোন কাজই হল না, আকল্পনীয়রকম জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও আজম খান বাংলা দেশের সমাজে প্রান্তবাসিই থেকে গিয়েছেন। কিছু বছর আগে জনশ্রুতি ছিল যে তিনি ঢাকার কমলাপুর এলাকায় একটি ক্যাসেটের দোকান দিয়েছেন। পাড়ায় তিনি ফুটবলও খেলতেন।
সত্তর দশকের গোড়ায় বাংলার রক্ সম্রাট আজম খানের পর পাওয়া গিয়েছিল ‘জিঙ্গা’ গোষ্ঠীকে। ভাই-বোন-ভাবি (বৌদি) দের তৈরি এই ‘ব্যান্ড-‘ নিজেদের তৈরি গান গাইতেন, নিজেরাই গিটার, কীবোর্ডস, ড্রামস বাজাতেন। এদের গানের কথায় সময়সচেতনতার উপাদান ছিল না। সুরে ও গায়নভঙ্গিতে ছিল লঘু পাশ্চাত্যসঙ্গীতের আদল। মন্দ্রকণ্ঠের অধিকারী এক ভাই ‘বেস’ গাইতেন, পাশ্চাত্যের ধ্রুপদী বৃন্দসঙ্গীত, স্পিরিচুয়াল, গস্পের ইত্যাদি সমবেত- গানে যেমন কেউ কেউ ‘বেস’ বা মন্দ্র পর্দায় গান। এদের দুটি জনপ্রিয় গান ছিল-দূরালাপনী দ্বারা হল নব পরিচয়’ ও তোমার জীবনে এল কি আজ বুঝি নতুন কোন অভিসার। ‘রক্’ ‘পপ’ বিলিতি যন্ত্রের সঙ্গত, বিলিতি গায়নরীতি- আর তারই মাঝখানে দ্বারা আর নব। গানের কথা সে-যুগের বাজারচলতি আধুনিক বাংলা গানের থেকে আলাদা কিছু নয়। মুল পার্থক্যটি ছিল গায়কী ও পরিবেশনায়। ভাবলে আশ্চর্য লাগে দু’হাজার সালের পর, এমনকি ২০০৪ ও ২০০৫ সালেও পশ্চিমবঙ্গে থেকে থেকেই যেসব ‘আধুনিক’ গান শোনা যাচ্ছে (কোন কোন গান আবার ব্যান্ডের’) সেগুলির কথা মূলত ঐ ধরনেরই। অর্থাৎ তিরিশ-চল্লিশ বছরেরও আধুনিক গানের কথা, ভাব ও আবেদন সম্পর্কে অনেক শহুরে, আধুনিক কেতাদূরস্ত বাঙালিরর মনে বিশেষ কোন পরিবর্তন হল না। আজম খান ও জিঙ্গা গোষ্ঠরি গানের গ্রামোফোন রেকর্ডও হয়েছিল বাংলাদেশে। স্বাধীনতার অর্জিত হওয়ার পর কয়েক বছর বাংলাদেশে গ্রামোফোন রেকর্ড তৈরি হয়েছিল। তারপর আর হয়নি। ফিরোজ সাই নামে এক গায়ক ঐ
৬৫
সময় জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। ইস্কুল খুইলাছে রে মওলা ও ‘এক সেকেন্ডের নাই ভরসা’ তাঁর দুটি লোকপ্রিয় গান। একবার, ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির একটি অনুষ্ঠানে ‘এক সেকেন্ডের নাই ভরসা’ গানটি গেয়ে মঞ্চ থেকে নেমে এসে একটি সিগারেট ধরিয়েই মারা যান এই শিল্পী। ঐ গানটির মর্ম আক্ষরিক অর্থেই প্রমাণিত হয়ে গেল যেন। ‘রক’ আঙ্গিকে বাংলা গান গেয়ে বাংলাদেশে ফিরদৌস ওয়াহিদ, রেনেসা গোষ্ঠী, জান আলম, ‘চাইম’, সোল্স্, ব্যান্ড- ও খুব নাম করেছিলেন। ফিরদৌস ওয়াহিদ ও জানে আলম ছিলেন একক রকশিল্পী। ফিরদৌসের ‘মামুনিয়া,’ রেনোসা গোষ্ঠীর ‘হৃদয় কাদামাটির কোনও মুর্তি নয়’,’ সোল্স্’-এর ‘মন শুধু ছুয়েছে’ বাংলাদেশের অনেক মানুষ আজও মনে রেছেন। এইভাবে, সাতের দশক থেকেই বাংলাদেশে ‘বাংলা রক্’ আঙ্গিকের চর্চা রীতিমত শুরু হয়ে যায় এবং বিপুল সংখ্যক মানুষ, বিশেষ করে, যুবসমাজের তার বড় ধরনের প্রভাব পড়ে। এঁদের মধ্যে সবাই যে ঠিক পাশ্চাত্যের ‘রক্’ আঙ্গিকের হুবহু অনুকরণ করছিলেন তা নয়। যেমন ‘জিঙ্গা’ গোষ্ঠীর গানে পপ্ অঙ্গিকের প্রভাবই ছিল বেশি। খুঁটিয়ে শুনলে বোঝা যায়, বাংলাদেশের একাধিক ‘রক্’ শিল্পীর গানের সুরগত ও গায়কীগত আঙ্গিকে’রক্’ এর চেয়ে ‘পপের’ প্রভাবই বেশি ছিল। তবে সাধারণভাবে, এরা কেউই বাংলাদেশের আধুনিক গান ও ছায়াছবির গানের পরিমন্ডলে থাকেননি। প্রধানত সঙ্গীত অনুষ্ঠানের মাধ্যমেই শ্রোতারা এদের আওতায় আসতেন। উল্লেখযোগ্য, এঁদের গানে সামাজিক রাজনৈতিক বা অস্তিত্বগত ভাবনা সাতের দশকে তেমন ধরা দেয়নি। লিরিকে এরা কেউই এমন কোন বিষয়বস্তু- আঙ্গিক সমন্বয় গড়ে তুলতে পারেননি যা এঁদের গানকে শিল্পের দিক দিয়ে বিশেষ স্হান দিতে পারে। সমান, হয়ত তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ; এই সব বাংলা রক্ গান যাঁরা লিখেছেন এবং আজও লিখছেন লিরিক লেখার ক্ষমতাই তাদের ছিল বা আছে বলে মনে হয় না। তারা হয়ত খুবই অনুপ্রণিত, দারুণ উৎসাহী, নতুন কিছু বলতে বদ্ধপরিকর। কিন্তু লিরিকে সেই কথা বলতে গেলে যেভাবে বলা দরকার সেই প্রকাশপদ্ধতি ও নির্মাণপদ্ধতির শিক্ষা ও চর্চা তাঁদের আছে বলে মনে হয় না। লিরিক নির্মাণের কোন একটি বিশেষ পদ্ধতি নেই। সারা পৃথিবীর পল্লীগীতিকারা যুগ যুগ ধরে নানান কথা নানান ভাবে বলতে চেয়েছেন ও পেরেছেন বিভিন্ন ধরণের সুরে তালে। আধুনিক গানেও এর অন্যাথা হয়নি। কবিতার মত লিরিক নিয়ে ও মানুষ নিরন্তর পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়ে গেছে ও যাচ্ছে। কিন্তু বক্তব্যে লিরিকের শরীর দিতে গেলে কি কিছু শর্ত পালন করতেই হয়। মুক্ত ছন্দও কিন্তু নিয়মের অনুগামী। মুখের কথার মত লিরিকও প্রলাপের স্তরে চলে যেতে পারে যদি তা অসংলগ্ন হয়। এই অসলগ্নতাই আগাগোড়া পেয়ে বসেছে যেন এই ধরণের বাংলা গানে। ফলে, এক ধরনের ছেলেমানুষির ছাপ সর্বত্র। মোটামুটি চলনসই একটা গান লিখতে গেলে ও ছন্দ ও মাত্রার যে বোধ
৬৬
থাকা একান্ত দরকার, তাও এই ধরণর অধিকাংশ গানে পাওয়া যায় না। ভাল ভাল কথা শোনা যায়, শোনা যায় নিরুদ্দিষ্ট বা চলে যাওয়া প্রেমিকার জন্য হাহুতাশ, এমনকি মৌলবাদবিরোধী গর্জন বা কোন একটি বিষয় সম্পর্কে প্রবল আপত্তির কথা। কিন্তু তার মধ্যে না আছে স্তবক রচনার দক্ষতা, না আছে মাত্রাবোধ। দু’একটি ব্যতিক্রমের কথা বাদ দিলে বেশিরভাগ সময় মনে হয় উদভ্রান্ত কোন মানুষের প্রলাপ। প্রতিটি গানের লিরিককে নির্মাণশৈলীর এক আদর্শ উদাহরণহয়ে উঠতে হবে সে-দাবি সুস্থমস্তিস্কের কোন মানুষই জানাবে না। কিন্তুগানেরকথাগুলি শুধু শব্দ বাক্যের অসংলগ্ন সমষ্টি হয়ে উঠবে এটাও তো মেনে নেওয়া মুশকিল। পশ্চিবঙ্গেও ন’এর দশক থেকে যে বাংলা রক ব্যান্ড সঙ্গীত জোরেসোরে শুরুহয় সেখানেও লিরিকনির্মাণ ও সুরচিন্তা-সুরপ্রয়োগের দিক দিয়ে তেমন কিছু খুব কমই পাওয়া গেছে যা সিরিয়াস বিবেচনার যোগ্য। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের এই পর্যায়ের গান বাজনা শুনে বরং মনে হয় বড় কোন মাঠে বা পরিসরে ভয়ানক জোরে আধুনিক এম্পলিফায়ারও বড় বড় স্পীকারে মাধ্যমে এই ‘সঙ্গীত’ বিপুল সংখ্যক শ্রোতার সামনে শারীরিক কসরৎ ও অঙ্গভঙ্গি সহকারে (নিন্দার্থে বলা নয়, নিতান্ত বর্ণনা হিসেবে বলা) পরিবেশন করে শ্রোতাদের মাতিয়ে ও নাচিয়ে দেওয়াই ব্যান্ড শিল্পীদের মুখ্য উদ্দেশ্য।
সঙ্গীতের সমাজতাত্বিক বিবেচনার দিক দিয়ে কিন্তু বলা দরকার যে সাতের দশকে বাংলাদেশের বাংলা রক্ ও পপ্ শিল্পীরা তাদের সমাজে যে জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পেরেছিলেন, কলকাতার ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’ বা অন্য কেউ তা পারেননি ঐ অঙ্গিকের সঙ্গীতের মাধ্যমে। তাছাড়া, এই সঙ্গীত আন্দোলন কলকাতার ঢের আগে ঢাকায় শুরু হয়েছিল। তেমনি এটাও উল্লেখযোগ্য যে ছ’এর দশক শেষ হবার ঠিক পরপরই কলকতার গ্রামোফোন কম্পানি অফ ইন্ডিয়া ‘ পপ’ নামে যে ধরণের গানের রেকর্ড বের করেন, সুল তাল ছন্দ- গায়কী ও পরিবেশনার সম্মিলিত আঙ্গিকের দিক দিয়ে তা মহীনের ঘোড়াগুলির ‘পপ্’ প্রয়াসেরও আগেকার, যদিও এই শিল্পীদল সমবেত কণ্ঠ প্রয়োগ করেছিলেন এবং একটু অন্য ধরণের লিরিক লিখতে চেষ্ঠা করেছিলেন বলে তাদের আবেদন অন্যরকম ছিল।
‘পপ’ই হোক আর ‘রক’ই হোক, বাংলাদেশে পশ্চিমবঙ্গে সাতের দশকে পাশ্চাত্যসঙ্গীতঘেষা যে গানগুলি তৈরি ও পরিবেশিত হয়েছিল সেগুলি কিন্তু লিরিকের দিক দিয়ে যুগচেতনার বাহন ছিল না। দুই দেশে ও সারা পৃথিবীতে তখন যে অবস্থা, সাধারণ মানুষের জীবনে যে ঘাতপ্রতিঘাত, নাগরিকদের দৈনিন্দন জীবন তখন যে-রকম, সচেতন ব্যক্তির মনে তখন যে সব প্রশ্ন, সুখ-দুঃখ আশা-হতাশা স্বপ্ন-দুঃস্বপ্ন তার কিছুই সাতের দশকের বাংলা পপ বা রক গানের লিরিকে সঙ্গীতচিন্তায় ফুটে ওঠেনি। এই গোত্রের বাংলা গানগুলিতে মেলেনি নতুন কোন দার্শনিক জিজ্ঞাসা বা অভিব্যক্তি। এদের প্রেরণাস্তলে ইংরিজিভাষী
৬৭
দুনিয়ার আধুনিক সঙ্গীতের কিছু অবয়ব স্পষ্টতই ছিল বলে আন্তর্জাতিক সঙ্গীতের যে কোন সিরিয়াস পর্যবেক্ষক বলতে বাধ্য হবেন যে পাঁচের দশকের পর থেকেই পাশ্চাত্যে বাস্তবমুখী, বিশ্বমুখিী ও দার্শনিক দিক দিয়ে অন্তমুর্খী যে ‘সংরাইটাররা’ ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছিলেন তাঁদের প্রথাবিমুখ, বৈপ্লবিক লিরিকবৈশিষ্ট ও সঙ্গীতবৈশিষ্ট এঁদের আদর্শ ছিল না। এঁরা চাইছিলেন না গানের মাধ্যমে কোন মৌলিক প্রশ্ন তুলতে, কোন ‘স্টেটমেন্ট’ করতে। যুগমুহূর্তের গান- প্রফেট হওয়ার ক্ষমতা এদের ছিল না। সেই বৈশিষ্টের আভাস বরং সাতের দশকের গোড়ায় এমন একটি বাংলা গানে পাওয়া গিয়েছিল যেটি ‘পপ’ বা ‘রক’ নয়, নিতান্তই প্রচলিত আধুনিক বাংলা গানের ধারায়, একটি হারমোনিয়াম নিয়েই গাওয়া যায় এ কোন সকাল রাতের চেয়ে ও অন্ধাকর।’- রাত্রি সে তো স্বভাবে মলিন, তাকে সয়ে থাকা যায়/ভোরের আলোর পানে চেয়ে থাকা যায়/ সে – ভোর অন্ধ হল, কী হবে এখন / তার যে কথা ছিল আলো দেবোর।;- এই লিরিকে, সুরের এবং জটিলশ্বর মুখোপাধ্যায় তার এই গানটি যেভাবে গেয়েছিলেন সেই গায়কীতে অনিবার্যভাবে ধরা দিয়েছেল সাতের গোড়ার নাগরিক অস্তিত্ব, ভাবনা, মন্তব্য, বাস্তবের পরিসরে সংবেদনশীল ব্যক্তির একান্ত উচ্চারণ। এই গানটি বরং ‘স্টেটমেন্ট’ হয়ে উঠতে পেরেছিল। আমার কাছে অন্তত সেই যুগমুহূর্তের জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায় হয়ে উঠেছিলেন গানের একজন প্রফেট। পরিশীলিত লিরিকশৈলী, বহুব্যবহৃত রূপকল্প পরিহার করে লিরিক লেখার ক্ষমতা এবং উপযুক্ত সুরসংযোজনার দক্ষতা- সব মিলিয়ে তিনিই বরং বাংলা গানের এমন এক ‘ভাষা’ আনছিলেন যা আগে কখনও শুনিনি, যা প্রকৃত অর্থে আধুনিক, যুগোপযোগী।
আটের দশক যখন এল, পশ্চিমবঙ্গের আধুনিক বাংলা গানের জগৎ ও ব্যবসা তখন এত নিষ্প্রভ যে, তা নিয়ে কোনও আলোচনাই চলে না। এই দশকে এ বিষয়ে আলাদা করে দীর্ঘশ্বাস ফেলার কোনও হেতুও ছিল না। কারণ, শুধু দীর্ঘশ্বাস নয়, আধুনিক বাংলা গানের নাভিশ্বাস উঠছিল তার ঢের আগের থেকেই। সাতের শেষ ও আটের প্রায় মাঝামাঝি পর্যন্ত অন্তরা চৌধুরির শিশুকণ্ঠে সলিল চৌধুরির কয়েকটি গান এবং ভূপেন হাজারিকার গাওয়া সুর করা, শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা কিছু গানের অ্যালবাম গ্র্রামোফোন কোম্পনিকে ভাল ব্যবসা দিয়েছিল। মোটের ওপর ভাল ব্যবসা দিতে পেরেছিল সাতের দশকেই মান্না দে-র গাওয়া বছরের নানান ঋতুভিত্তিক ও রাগাশ্রয়ী গানের একটি অ্যালবামও। কিন্তু বাংলা গানের ক্ষেত্রে কোনও নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারেনি সেই গানগুলি। বরং ভূপেন হাজারিকার গানগুলি খুবই লোকপ্রিয় হয়ে উঠেছিল, মানুষ উৎসাহ নিয়ে শুনছিল। সত্যি বলতে, তার অ্যালবামের বেশিরভাগ গান কিন্তু নতুন গান ছিল না। ওগুলি তার বেশ কিছুকাল আগের সুর ও ভাব যা অসময়িা ভাষায় এককালে খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। আসমে। ‘গঙ্গা বইছ
৬৮
কোন’ গানটি তার এক দশক আগে ক্যালকাটা ইয়ুথ কয়্যারের পরিবেশনায় বারবার শোনা গিয়েছিল। অর্থাৎ, ওই যুগমুহূর্তের জোরালো প্রয়োজনে রচিত তেমন কোনও আধুনিক গান সেই সম্ভারে ছিল না। সার্বিক আবেদনে ছিল আধুনিক বাংলা গান নয় গণসঙ্গীতের মেজাজ। ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘের অনুরণনই বহন করছিল ‘আমি এক যাযাবর’ অ্যালবামটি। আটের দশকে বাংলা গানের ইন্ডাষ্ট্রিতে পুরোদস্তুর পাওয়া গিয়েছিল হিন্দুস্তানি রাগসঙ্গীতে রীতিমতো তালিমপ্রাপ্ত এক কণ্ঠশিল্পীকে, কণ্ঠের ওপর যার দখল উঁচু মানের। অজয় চক্রবর্তী। সঙ্গীতাচার্য জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের ছাত্র তিনি। তারই কথায় সুরে আধুনিক গানের একটি অ্যালবাম তিনি করেন। গানগুলি নতুন ছিল না, কিন্তু রচনা ও গাওয়ার গুণে রসিক শ্রোতাদের আনন্দ দিতে পেরেছিল বৈকি। এর পর অজয় চক্রবর্তী আরও গানের ক্যাসেট করেন, আটের দশকে প্রকাশ্য গানের অনুষ্ঠানে হয়ে ওঠেন নিয়মিত শিল্পী। আজও নানান অনুষ্ঠানে পাওয়া যায় তাকে। কিন্তু অজয় চক্রবর্তীর বাংলা গানে যুগ, দৃষ্টিভঙ্গি, সঙ্গীতভাবনার চলমান বিবর্তনের কোনও পরিচয় পাওয়া যায়নি। এদিক দিয়ে তিনি আরও কিছু ঘুনী কণ্ঠশিল্পীর মতো প্রথামাফিক। কথাটা কিন্তু নিন্দে- অর্থে বলা নয়। প্রশিক্ষিণপ্রাপ্ত, অভিজ্ঞ কণ্ঠশিল্পীরা তো আর নিজেরা গান বাঁধেন না। সেই দাবি তাদের কাছে করাও চলে না। আটের দশকের মধ্যে পরিশ্চমবঙ্গের গানের জগতে ইন্দ্রাণী সেন, শ্রীরাধা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অরুন্ধতী হোমচৌধুরি প্রতিষ্ঠালাভ নিৎসন্দেহে উল্লেখযোগ্য ঘটনা। কণ্ঠমাধুর্য, কণ্ঠের ওপর নিয়ন্ত্রণ, একাধিক সপ্তকে স্বরপ্রক্ষেপে এদের দক্ষতা, স্বাভাবিক উচ্চারণ এবং বিভিন্নধরনের গান সাবলীলভাবে গাওয়ার ক্ষমতার নিরিখে এরা উচ্চ মানের শিল্পী। চার, পাঁচ ও ছয়ের দশকের বড় শিল্পীদের পাশে এদের স্বচ্ছন্দে বসানো যায়। কয়েক দশক ধরে এরা শ্রেতাদের আনন্দ দিতে পেরেছেন। সত্যি বলতে সার্বিক বিচারে এদের তুল্য কণ্ঠশিল্পী আটের দশকের পর মহিলাদের মধ্যে এসেছেন কিনা সন্দেহ। পুরুষদের মধ্যে শিবাজি চট্টোপাধ্যায় ও সৈকত মিত্রও আধুনিক বাংলা গানের গায়ক হিসেবে আটের দশকেই সুনাম অর্জন করেন। তবে, শিবাজি চট্টোপাধ্যায়ের কণ্ঠে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও সৈকত মিত্রের কণ্ঠে শ্যামল মিত্রের গায়কির প্রতিধ্বনি তাঁদের সঙ্গীতব্যক্তিত্বকে আটকে রেখে দিয়েছে একটি বিশেষ স্তরে। পশ্চিমবঙ্গের এই মহিলা ও পুরুষ শিল্পীরা কিন্তু শুধু’রিমেক’ করেননি। পেশাদার অপেশাদার গীতকার-সুরকারদের বাঁধা আধুনিক গানের ক্যাসেট তারা বিলক্ষণ করেছেন। অধিকাংশ গানের কিন্তু আধুনিক গানের প্রথাগত বৈশিষ্টই পাওয়া গিয়েছে। যুগমুহূতনির্ভর কোনও নতুন উচ্চারণ, লিরিক- সুরের নতুন কোনও আঙ্গিক পাওয়া যায়নি। আবার বলছি, সে জন্য এরা দায়ী নন। প্রামোফোন বা ক্যাসেট কোম্পানিগুলির কর্মকর্তাদরে এই দিকটি ভেবে দেখা উচিত ছিল।