Sufi Faruq (সুফি ফারুক)

কোন পথে গেল গান – কবীর সুমন -৬ বই সংগ্রহ

Kabir Sumon | কবীর সুমন

দক্ষ, পেশাদার গায়ক- গায়িকারা সবাই হঠাৎ নতুন ধারার গান লিখে সুর করতে শুরু করবেন, এ দাবি বা আশা বাতুলতা। সাতের দশকের শেষদিকেই সঙ্গীত ইন্ডাষ্ট্রি ও সঙ্গীতের বাজারে এমন একটি ব্যাপার এল সঙ্গীত, তার প্রতিরূপায়ণ, তার ব্যবসা, মানুষের গানবাজনা শোনার এবং সার্বিকভাবে সমাজের যার প্রভাব হল দুরপ্রসারি; মিউজিক ক্যাসেট। এই দশক থেকেই গ্রামোফোন ডিস্কের জায়গায় ক্যাসেটের প্রচলন হতে থাকে এবং ক্যাসেটের ব্যবহার বাড়তে ও থাকে দ্রুতগতিতে। আটের দশকের মাঝামাঝি পর দেখা গেল বাংলা গানের ব্যবসায় গ্রামোফোন ডিস্কের জায়গাটা প্রায় পুরোপুরিই দখল করে নিয়েছে মিউজিক ক্যাসেট। এর পরিণামে আগের একাধিক বনিয়াদি ব্যাপার প্রায় ভোজবাজির মতো মিলিয়ে গেল্ প্রথমত কারিগরি দিক দিয়ে স্টুডিয়োয় কোনও কিছু রেকর্ড করে তার ক্যাসেট বের করা গ্রামোফোন ডিস্ক তৈরি করার চেয়ে ঢের বেশি সহজসাধ্য। দ্রুতগতিতে বিরাট সংখ্যায় ক্যাসেট কপি করার যে লুপ বিন মেশিন দরকার তা দামি। সে যন্ত্রব্যবস্থা বসাতে গেলে অনেক টাকা বিনিয়োগ করতে হয়, মেশিন চালানোর বিশেষ প্রশিক্ষিণপ্রাপ্ত লোক লাগে, উপযুক্ত শীততাপনিয়ন্ত্রিত জায়গাও লাগে। এটা পুরোদস্তুর কারিগরি শিল্পের সামিল। ক্নিতু আটের দশকের গোড়া থেকেই দ্রুতগতিতে একটি মাস্টার ক্যাসেট থেকে একটি, দুটি বা তিনটি ফাকা ক্যাসেট কপি করার যন্ত্র এ দেশে তো বটেই, এই শহরেও একাধিক ব্যক্তির কাছে এসে গিয়েছিল। এই যন্ত্রগুলি ছোটখাটো কুটিরশিল্পের মতো ছোট একটি জায়গায় বসিয়ে আদক্ষ মানুষকেও এগুলি চালানোর পদ্ধতি একটু শিখিয়ে দিয়ে দিব্যি একটা ব্যবসা চালানো যায়। ক্যাসেট কপি কারা ওই যন্ত্র বিদেশ থেকেআমদানি করতে হলেও সেগুলি আকারে মোটামুটি ছোট, ফলে চোরপথেও আনা সম্ভবছিল, তাছাড়া লুপ বিন মেশিনের চেয়ে ওই ধরনের যন্ত্রের দাম অনেক কম। আটের দশকে কলকতার বিভিন্ন ব্যবসায়ী তাই এই ব্যবসায় নেমে পড়েছিলেন। গ্রামোফোন রেকর্ড করার ব্যবাপরে কোম্পানিগুলি সেই সাবেককাল থেকেই একাধিক শর্ত আরোপ করে আসছিল। প্রধান শর্ত ছিল শিল্পীর যোগ্যতা। রেকর্ডি যন্ত্রশিল্পীদের পারিশ্রমিক, গ্রামোফোন ডিস্ক ছাপার খরচ- সব কিছু কোম্পানিগুলিই দিত। তাই তারা বুঝে নিত, যে শিল্পীর গান তারা রোকর্ড করছে, বাজারে তার কোনও সম্ভাবনা আছে কিনা। নতুন শিল্পীদের বেলা কোম্পানিগুলি খুবই সতর্ক থাকত। ক্যাসেটের প্রচলন হওয়ায় যে কোনও স্টুডিও আর কিছু যন্ত্রী ভাড়া করে নিজের মতো গান রেকর্ড করে নিয়ে সেগুলি ক্যাসেটে কপি করিয়ে যে কোনও ছাপাখানায় গিয়ে প্রচ্ছদ ছাপিয়ে যে কোন সংখ্যার ক্যাসেট মোড়কবন্দী করে বাজারে ছাড়ার বা ইচ্ছে হলে নিজেই জনে জনে বিক্রি করার রাস্তা খুলে গলে। রেকর্ড করার যোগ্যতার শর্তটি আর রইল না। আটের দশকেই কলকাতার চাঁদনিতে এমন অনেক সংস্থা গজিয়ে ওঠে, যাদের কাছে একটি মাস্টর টেপ বা মাস্টার ক্যাসেট নিয়ে গেলে তারাই বরাতমাফিক ক্যাসেট কপি করিয়ে দিতে, প্রচ্ছদ ছাপিয়ে দিতে, মোড়কবন্দী করা ক্যাসেটগুলিকোর্ডবোর্ড বাক্সে সরবরাহ করত বরাতদাতাকে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ আবার টাকার বিনিময়ে কোনও একটি ‘লেবেল’ থেকে ক্যাসেট প্রকাশ করিয়ে দিতে, যদিও সেই ক্যাসেট কোন দোকানি রাখবেন, এমন স্থিরতা ছিল না। অর্থাৎ টাকা খরচ করতে পারলে নিজের গান, বাজনা বা আবৃত্তির ক্যাসেটে বের করা আর কোনও সমস্যাই রইল না ক্যাসেটের যুগ এ দেশে কায়েম হয়ে যাওয়ায়। গ্রামোফোন ডিস্কের যুগ অস্তমিত হওয়া ও ক্যাসেট- যুগের জায়যাত্রা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কলকাতার নানান জায়গায় রেকর্ডিং স্টুডিও গজিয়ে উঠতে লাগল। ঘণ্টা বা ‘শিফট’ অনুযায়ী ভাড়া নিলেই হল। তিন থেকে ছয়ের দশক পর্যন্ত (তখনও গ্রামোফোন ডিস্কের যুগ) গঙ্গীত পরিচালক ও তাঁর সহকারীই গানের করকর্ডিংয়ে যন্ত্রসঙ্গীত রচনা ও পরিচালনা করতেন। ক্যাসেটের যুগ শুরু হওয়ার পর গ্রামোফোন কোম্পানিগুলি এবং সঙ্গীত ইন্ডাষ্ট্রির এতকালের নিয়ম ও রীতি বাতিল হয়ে যাওয়ায় ‘অ্যারেঞ্জার’ দের আগমন ঘটল স্টুডিয়োয়। কেউ গান রেকর্ড করতে চাইলে গানগুলি তিনি ক্যাসেটে অ্যারেঞ্জারকে দেবেন, অরেঞ্জার সেগুলি যন্ত্রানুষঙ্গ রচনা করে তার স্বরলিপি তৈরি করবেন, গায়কের আর্থিক ক্ষমতা অনুসারে অ্যারেঞ্জারিই যন্ত্রশিল্পীদের নিয়োগ করবেন, চাইকি তিনিই বলে দেবেন কোন স্টুডিয়োয় রেকর্ডিং হবে; নির্ধারিত দিনে অ্যারেঞ্জাররাই যন্ত্রশিল্পীদের হাতে স্বরলিপি তুলে দিয়ে তাঁদের দিয়ে এবং গায়ককে দিয়ে মহাড়ার পর পরিচালকের ভূমিকা নেবেন। তাঁরই তত্ত্বাবধানে রেকর্ডিং হয়ে যাবে। এইভাবে অনেক দক্ষ যন্ত্রশিল্পী অল্পকালের মধ্যে অ্যারেঞ্জার হয়ে উঠলেন। শুধু তাই নয়, শহরের নানান জায়গায় স্টুডিও তৈরি হয়ে যাওয়া, নিজের টাকায় বা কোন ও সংস্থার আর্থিক দায়িত্বে ক্যাসেট প্রকাশের লক্ষ্যে গান রেকর্ড করতে আগ্রহী মানুষের সংখ্যা দ্রুতগতিতে বেড়ে যাওয়ায় অনেক নতুন যন্ত্রশিল্পীও হলেন তৈরি। অনেকেই নিয়মিত কাজ পেতে থাকলেন। পশ্চিমবঙ্গের যন্ত্রশিল্পীদের আয় আগের তুলনায় বেড়ে গেল। কোনও কোনও রেকর্ডিং স্টুডিয়োর মালিক ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে এবং প্রয়োজনীয় শর্তগুলি পূরণ করে ক্যাসেট কোম্পানি খুলে বসলেন। এই সব কোম্পানি তাদের পছন্দ অনুযায়ী শিল্পীদের গান রেকর্ড করে বাজারে ছাড়তে শুরু করল। শুধু তাই নয়, টাকার বিনিময়ে তারা যে কোনও ব্যক্তির গান বিক্রয়-উপযুক্ত চেহারার ক্যাসেটে সেই ব্যক্তির হাতে তুলে দিতে লাগল। নির্মিত ক্যাসেটের সংখ্যা নির্ভর করত টাকার পরিমাণের ওপর। এই ধরনের ক্যাসেট দোকানিরা সচরাচর স্বেচ্ছায় রাখতে চাইতেন না। কিন্তু শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার উচ্চাশায় অনেকেই মানসম্মান খুইয়ে তাঁদের ক্যাসেট দোকানিদের পীড়াপীড়ি করে দোকানে রাখার ব্যবস্থা করে ফেলতে লাগলেন। বিক্রির ওপর অনেকে দোকানিকে কমিশনও দিলেন। এইভাবে গানের ব্যবসার ও গানবাজানার দুনিয়ার একাধিক নতুন দিক খুলে গেল। সেই সময় থেকে আজ পর্যন্ত গ্রাম বাংলার কত সরল মানুষ যে কলকাতা থেকে তাঁদের গানের ক্যাসেট বের করার লোভে জমিজমা বাঁধা রেখে বা মহাজনের কাছ থেকে টাকা ধার করে শেষ পর্যন্ত (দাদাঠাকুরের ভাষায়) ‘মান আর money‘ দিুটিই খুইয়েছেন, তার কোনও ইয়াত্তা নেই। অনেক শহুরে মানুষও শিল্পী হিসেবে দাড়াতে চেয়ে একে তাকে ধরে প্রচুর টাকা খরচ করে ক্যাসেট বের করেছেন গজিয়ে ওঠা নানান কোম্পানি থেকে। সব দিক দিয়েই ঠকেছেন বেচারিরা। আর, বেচারি বাংলা গান? গ্রামোফোন রেকর্ডের যুগে ৭৮ আর পি এমের একটি ডিস্কে দুটি করে গান থাকত। ৪৫ আর পি এমের আমলে স্ট্যান্ডার্ড প্লে ডিস্কে হলে থাকত সেই দুটি গানই, আর ‘একস্টেন্ডেড প্লে’ হলে একটি ডিস্কে চারটি গান। পুজোর গান, বসন্ত বন্দনা বা অন্য কোনও উপলক্ষে কোনও শিল্পীর একেবারে চারটি নতুন গান বেরচ্ছে, এমন নজির বাংলা গানের ইন্ডাষ্ট্রিতে নিতান্ত কমই ছিল। বড় বড় শিল্পেীদেরও দুটি করে আধুনিক গানই বেরত। ৩৩ আর পি এমের লং প্লে রেকর্ডের আমলে একটি ডিস্কে আরও বেশি সংখ্যক গান থাকা সম্ভব হয়ে উঠল। কিন্তু কোনও শিল্পীর গাওয়া একবারে টাটকা নতুন আধুনিক বাংলা গানের একটা আস্ত লং প্লে ডিস্ক বেরচ্ছে, এমন ঘটনা পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গীত ইন্ডাষ্ট্রির ইতিহাসে বড় জোর দু-একবার ঘটেছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর, যেমন, বাংলাদেশের কণ্ঠশিল্পী সাবিনা ইয়াসমীনের নতুন আধুনিক গানের একটি লং প্লে রেকর্ড বের করেছিল এইচ এম ভি। সচরাচর লং প্লে ডিস্কগুলি হত আগেই রেকর্ডে প্রকাশিত এক বা একাধিক শিল্পী’র গানের সঙ্কলন। বরং কোনও শিল্পীর গাওয়া ও পর পর রেকর্ড করা রবীন্দ্রসঙ্গীত ও নজরুলগীতির লং প্লে ডিস্ক বের করেছে কোম্পানিগুলি, যেমন দেবব্রত বিশ্বাসের রবীন্দ্রসঙ্গীত ও মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের নজরুলগীতি। ক্যাসেটের যুগে কিন্তু দুটি গানের ক্যাসেট বের করার উপায় রইল না। এমনকি চারটি গানের ক্যাসেটও নয়ের দশকের আগে বেরোয়নি, তাও দু-একজনের, যেমন পীযূষকান্তি সরকারের গাওয়া রবীন্দ্রসঙ্গীত। চারটি গানের ক্যাসেট লুপ বিন মেশিন ছাড়া বের করা মুশিকিল। শুধু তাই নয়, তাতে পড়তায় পোষায় না। এক দফায় অন্তত আট-দশটি গান ক্যাসেটে থাকতেই হবে। এর ফলে সঙ্গীতকার ও শিল্পীদের ওপর চাপ বেড়ে গেল একবারে অনেকটা। গ্রামোফোন রেকর্ডের যুগের থেকে এ এক বিরাট ও মৌলিক ফারাক। একজন সঙ্গীতকার ও গীতিকার ও সুরকার একজন শিল্পীর জন্য ভেবেচিন্তে দুটি ভাল গান এক মরশুমে তৈরি করতেই পারেন। কিন্তু একবারে আট-দশটি গান! একাধিক গীতিকার ও সুরকারকে দিয়ে ওই গানগুলি তৈরি করালে গানগুলির মধ্যে সে সামঞ্জস্য থাকবে, তার কোনও নিশ্চয়তা নেই। তেমনি, গ্রামোফোন রেকর্ডের যুগে কণ্ঠশিল্পীরা রেকর্ডিংয়ে যাওয়ার আগে বেশ কয়েক দিন ধরে দুটি গান শিখে, বারবার গেয়ে সড়গড় করে নিতে পারতেন। ক্যাসেটের যুগে সেই অবকাশ আর রইল না। রেকর্ডিংয়ের খরচের কারণে খুব কম গায়ক-গায়িকাই যথেষ্ট সময় পান গানগুলি মন দিয়ে, ধরে ধরে গাওয়ার। যাঁরা নিজের টাকায় রেকর্ড করছে, এমনকি যাঁরা কোম্পানির টাকাতেই রেকর্ড করছেন কিন্তু যাঁরা বাজারে ওজনদার নন (এমন শিল্পীই বেশি) তাঁদের কিন্তু যথাসম্ভব কম সময়ে আট-দশটি গান গেয়ে দিতে হয়। ফলে উৎকর্ষ মার খাওয়ার সম্ভাবনাটা বাড়ে। অন্যদিকে, একটি ক্যাসেট হাতে পেলে সব কটি গান মন দিয়ে বারবার শুনবেন, এমন ক’জন শ্রোতা থাকেন? বেশিরভাগ শ্রোতাই সব গান মন দিয়ে শোনেন না, শুনলেও বড় জোর একবার-দু’বার। ফলে বেশ কিছু গান সব ক্যাসেটেই কম-বেশি উপেক্ষিত হয়ে থাকে। গ্রামোফোন ডিস্কের যুগে (একটি ডিস্কে যখন দুটি গান থাকত) গান আরও ধীরেসুস্থে, মন দিয়ে শোনা যেত। ক্যাসেটের যুগে শুধু গান-নির্মাতা, গায়ক ও যন্ত্রশিল্পীদের ওপরেই নয়, শ্রোতা ও ক্রেতার ওপরেও চাপ গেল অনেকটা বেড়ে। এই সব ব্যাপারের প্রভাব বাংলা গানের ওপর খুব বেশি পড়েছে ক্যাসেটের যুগ কায়েম হয়ে যাওয়ার পর।

সাতের দশক থেকে বাংলা গানের জগতে যে যুগান্তকারী ব্যাপারগুলি ঘটে গিয়েছে, তার প্রধান সূত্রগুলি মনে রাখা জরুরি, যদি গান যে কোনও পথে গেল বা যেতে বাধ্য হল তা বুঝতে হয়:-
১. ক্যাসেটের যুগে গান লেখা, সুর করা ও গাওয়ার যোগ্যতার দিকটা প্রায় উঠে গেল। যোগ্যতা-যাচাইয়ের মানদণ্ডহীনতার রীতি হয়ে গেল কায়েম। অর্থাৎ যা খুশি তাই শিখে দেওয়া, সুর করে দেওয়া, গেয়ে দেওয়া সম্ভব। ২. কেউ একা ক্যাসেট করলেই তাঁর ওপর আটটি বা দশটি গান জোগাড় করা ও শিখে নেওয়ার চাপ এসে পড়ল এক-একবারে অনেক গান তৈরি করার বাধ্যবাধকতা।
৩. কারিগরি পদ্ধতির দিক দিয়ে ক্যাসেট উৎপাদন ও প্রকাশ গ্রামোফেন ডিস্ক উৎপাদনের চেয়ে অনেক সহজ এবং যে কেউ নিজের টাকায় ব্যক্তিগত প্রকাশনা-উদ্যোগ হিসেবে অথবা কোনও কোম্পানির লেবেলে যে কোনও সময় ক্যাসেট বের করতে পারেন বলে বাংলা আধুনিক গানের ক্যাসেটের সংখ্যা ক্রমন্বয়ে বাড়তে লাগল। কিন্তু ভাল গান বা সত্যি বলতে গান হিসেবে আদৌ মেনে নেওয়া যায় এমন গানের সংখ্যা বাড়ল না, বরং আশঙ্কাজনক মাত্রায় কমতে লাগল।

আতি- উৎপাদন যে কোনও ক্ষেত্রেই ভয়াবহ পরিণামের দিকে ঠেলে দেয় মানুষ ও সমাজকে। আটের দশক থেকে আমাদের দেশে নতুন নতুন ক্যাসেট প্রকাশের যে ঘনঘটা দেখা দিল, তা বিষ্ময়কর। এর বেশিরভাগটাই অপচয়ের সাক্ষ্য বহন করেছে, আজও করছে এবং চারদিক দেখে মনে হচ্ছে ভবিষ্যতেও করে যাবে। উৎকর্ষ ও যোগ্যতার কোনও মাপকাঠি গানের রেকর্ডিং ও ব্যবসায় আর না থাকায় দেখা দিয়েছে এক চরম অরাজকতা। নয়ের দশকে আধুনিক গানের যে পর্ব শুরু হল, তার কোথাও হয়ত এই অধমেরও সামান্য একটু ভূমিকা আছে তাই ও বিষয়ে সবিস্তারে কিছু বলা আমার সাজে না। সে সময়ও এখনও আসেনি। কিন্তু নয়ের ঘটনাধারা নিয়ে আদৌ কিছু না বললে এই লেখাটি নেহাতই অর্থহীন হয়ে পড়ে, তাই কিছু লিখতেই হবে। সেই সঙ্গে আমার হয়ে ওঠার কথাও সংপেক্ষপে উল্লেখ না করলে পাঠকদের পরিপ্রেক্ষিত- ভাবনায় ফাঁক থেকে যেতে পারে। আধুনিক বাংলা গানের অন্তনির্হিত দুর্বলতা, দ্বন্দ্ব ও সমস্যা, সমাজ ও ব্যক্তির জীবনে গানের ভূমিকা, আমার জীবনেও যুগে বাংলা গানের স্থান ইত্যাদি বিষয়ে আমার মনে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছিল ছয়ের দশকের শেষ থেকেই। সাতের দশকের একেবারে গোড়ায় তা তীব্র হয়ে ওঠে। আমার জীবনের প্রথম সুরটি আমি দিয়েছিলাম তের-চোদ্দ বছর বয়সে, রবীন্দ্রনাথের প্রথম জীবনের একটি কবিতায়। সতের বছর বয়সে (১৯৬৬) আমি প্রেমেন্দ্র মিত্রর ‘কোনদিন গেছ কি হারিয়ে’ কবিতাটিতে সুর করি। ১৯৬৭-৬৮ সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে মিউজিক ক্লাব ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বৃন্দসঙ্গীত দল তৈরি হওয়ার পর ওই গানটি আমরা গাইতমও। সতের বছর বয়স থেকেই আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্রের অনুষ্ঠানে নিয়মিত আধুনিক বাংলা গান গাওয়ার তাগিদে আমি নিয়মিত সুরও করতে থাকি। সময়টা খেয়াল রাখা দরকার। ছয়ের দশকে আধুনিক বাংলা গানের লিরিকে সুর দিয়ে বেতারে বছরে অন্তত ছটি অনুষ্ঠানে গাইতে গেলে (প্রতিটি অনুষ্ঠান হত পনেরো বা দশ মিনিটের) যথেচ্ছাচারের কোনও সুযোগ ছিল না। তখন ও টেলিভিশন আসেনি পশ্চিমবঙ্গে। বেতারই ছিল একমাত্র মাধ্যম। অসংখ্য মানুষ নিয়মিত রেডিও শুনতেন এবং কোনও অনুষ্ঠানে পান থেকে চুন খসলে সমালোচকদের চিঠির ঝড় বয়ে যেত। মাথার ওপরে ছিলেন গুরুস্থানীয়, অভিজ্ঞ শিল্পীরা। পশ্চিমবঙ্গের প্রধান কণ্ঠশিল্পীরা তখন এক একটি জ্যোতিষ্কের মতো বিরাজ করছেন। সকলেই বেতারের সঙ্গীতানুষ্ঠানগুলি মন দিয়ে শুনতেন, প্রয়োজনমতো তারিফ ও বকনি দুটিই আসত তাঁদের কারুর কারুর কাছ থেকে। আকাশবাণীর কর্মকর্তারাও ছিলেন সজাগ। কোনও অনুষ্ঠান অপছন্দ হলে তাঁরা খোলাখুলি বলতেন। বেতার- অনুষ্ঠানে ভাল গাইলে, আধুনিক গানের সুর ভাল লাগলে তেমনি তাঁরা ডেকে প্রশংসা করতেন। আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্রে তখন সঙ্গীতাচার্য জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ সঙ্গীত বিভাগের প্রয়োযোজক। ছিলেন গোপাল দাশগুপ্ত মতো গুণী সঙ্গীতবোদ্ধা ও গীতিকার- সুরকার। দীপালি নাগ ছিলেন কলকতা কেন্দ্রে। ভারতীয় ও বাংলার সঙ্গীতে দীপালি নাগের মতো মেধাবী মননশীল, সৃজনশীল, শিক্ষিত মানুষ ও সঙ্গীতজ্ঞ সারা পৃথিবীতেই বিরল। আরও অনেকের মতো তাঁর মূল্যায়ন তো দূরের কথা, তাঁর উল্লেখও কাউকে করতে দেখিনি কোথাও গত কয়েক দশকে। এই সমাজ ও এই জাতির সঙ্গীতবোধ ও সঙ্গীত যে ক্রমশ রসাতলে যাবে, তাতে আর অবাক হওয়ার কী আছে? এঁদেরই সঙ্গে ছিলেন এককালের বিখ্যাত ম্যান্ডোলিনশিল্পী, সুরকার, সঙ্গীতবোদ্ধা সুরেন পাল। পাশ্চাত্য সঙ্গীত বিভাগে ছিলেন বুলবুল সরকার, আর এক রসিক, বোদ্ধা মানুষ। কলকাতা কেন্দ্রের চাকুরে যন্ত্রশিল্পীদের মধ্যে ছিলেন আলোকনাথ দে। এককথায় জিনিয়াস। ছিলেন ওস্তাদ আলি আহমেদ হুসেন। শ্যামল বসুর মতো তবলাশিল্পী। মানিক পাল। বাংলার পল্লীসঙ্গীতের একাধিক যন্ত্রে সুদক্ষ কণিবাবুর সঙ্গে রসকলি কাটা, কণ্ঠি- গলায় মন্দিরা- শিল্পী, মহারসিক ‘বাবাজি’ ছিলেন। এস্রাজে ছিলেন বিজলিবাবু। সকলেই দুর্দান্ত দক্ষ ও অভিজ্ঞ। সকলেই আমার গুরুস্থানীয়। আকাশবাণীর আধুনিক গানের অুষ্ঠানে এঁরা সহযোগিতা করতেন। গানের সুরে বিসদৃশ বা অগ্রণযোগ্য কিছু কানে গেলে এঁদের মুখের ভাব সেইরকমই হত। অর্থাৎ, আধুনিক বাংলা গানের যে দীর্ঘ ধারা, তার আওতায় থেকেই সুর করতে হত, গাইতে হত। তার মানে এই নয় যে মার্কামারা কিছু বহুব্যবহৃত ছাচে ফেলতে হত প্রতিটা গান। মনে রাখা দরকার, উনিশ শতক থেকে বিশ শতকের ওই সময় পর্যন্ত বাংলা গানের সুর বিচিত্র পথে গিয়েছে, ধারাবাহিক পরীক্ষানিরীক্ষঅয় সামিল থেকেছে।

আকাশবাণীর অনুমোদিত গীতকারদের গানেই সুর করতাম আমি। অমিয় চট্টোপাধ্যায়, মিহির বন্দ্যোপাধ্যায়, অমিয়জীবন মুখোপাধ্যায়। একবার কবিতা সিংহর লেখা একটি গানও সুর দিয়ে গেয়েছিলাম। গানটি ছিল ব্যতিক্রমী। সূর্যবন্দনা। অনুমোদিত গীতিকাররা আধুনিক বাংলা গানের প্রচলিত রীতমাফিরই গান লিখতেন। তাঁরা জানতেন গানের কাঠামোর বিভিন্ন অংশ কেমন হওয়া দরকার। প্রত্যেকের গানেই সঞ্চারী- অংশটি থাকত। পরে আধুনিক বাংলা গানের দেহ থেকে সঞ্চারী প্রায় উঠেই গিয়েছে। আজকের অনেক সুরকার বোধহয় জানেনই না, সঞ্চারী রচনার প্রকরণ কেমন। ওই গীতিকারদের কোনও কোনও গান নি:সন্দেহে রীতিমত সুলিখিত ছিল। কিন্তু ছয়ের দশকের শেষ ও সাতের একেবারে গোড়ায় আমি এই গানগুলিকে বা আবাল্য শেখা, গাওয়া কোনও গানকেই আর মন থেকে মেনে নিতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল- আমার সময়ের কথা, আমার কথা যদি গানের মধ্যে দিয়ে বলতে হয় তো আমার গান লিখতে হবে। আত্মিক সঙ্কট এমনই হয়ে দাঁড়াল যে আকাশবাণীর অধিকর্তাকে চিঠি দিয়ে আমি ১৯৭৩ সালেই বেতার আধুনিক গানের অনুষ্ঠান করা একবারে কমিয়ে দিই। ওই সময় থেকে অবিরাম চেষ্টা করতে করতে আমি ১৯৭৪ সালে কেমন আকাশ দেখালে তুমি এ কেমন আকাশ জন্মভূমি। আমার বয়স তখন পঁচিশ। তারপর কিছু গান লিখেছি, কিন্তু ১৯৭৯ সালে আামর লেখা ‘ভাল লাগছে না অসহ্য এই দিনকাল’‘কে তৈরি করেছিল তাজমহল, ‘তেমার আমার স্বাধীনতা’ শহিদ কাদরির একটি কবিতার প্রেরণায় ‘রাষ্ট্র মানেই কাটাতারে ঘেরা সীমান্ত’- এই গানগুলি তৈরি করার পর এবং বন্ধুবান্ধবদের শোনানোর পর তবেই আমার মনে হতে শুরু করে যে আমি বোধহয় গান বাঁধতে পারি একটু-আধটু। তারপর থেকে আমি নিয়মিত গান রচনা করে চলেছি, থামিনি। কিন্তু আমার সেই গান বেঁধে যাওয়া ও গেয়ে যাওয়ার ত্রিসীমানায় এমন স্বপ্ন বা উচ্চাশা ছিল না যে গানগুলি অনেক লোক শুনবে। সত্যি বলতে অল্পবিস্তর লেখালিখি করেও বিজ্ঞাপনে সঙ্গীতের কাজ করে (কারণ, ইলেকট্রনিক সঙ্গীতসৃষ্টির কাজটি আমি ১৯৮০ থেকেই ক্রমাগত শিখে গিয়েছি ও রপ্ত করেছি) নিজের খরচ চালিয়ে বাকি সময়ে বাংলা গান বাঁধব, গাউব, বন্ধুরা কখনও শুনবেন- এই রকম ধারনাই আমার ছিল। জীবন কী বিচিত্র, নানান পেশা, বিভিন্ন ঘাটের জল খেয়ে, গানবাজনাকে পেশা করার পর এই লেখাটি লেখার সময় (২০০৫ সালের আগস্ট মাস) আমি অনেকটা সেই সুখকর অবস্থাতেই পৌছে গিয়েছি। তবে বাংলা গান যে আমি ধারাবাহিকভাবে বেঁধে যাব, সঙ্গীত নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা চালিয়ে যাব, সেই সঙ্কল্প আমার ১৯৭৯ থেকেই ছিল-কোনও ঐতিহাসিক কর্তব্যসাধন বা মহৎ উদ্দেশ্যে নয়, এই কাজটি আমি ভালমতো করতে শিখেছি এবং এই কাজটি করে আমি সবচেয়ে বেশি আনন্দ পাই বলে।

১৯৮৫ সালে আমেরিকার স্থায়ী চাকরি ছেড়ে কলকাতায় চলে এসে বন্ধদের সঙ্গে গানবাজনা নিয়ে মেতে ছিলাম। তার মদ্যে আমি অনেক গান বেঁধে ফেলেছি এবং তখনও সমানে বেঁধে যাচ্ছি। তখনও একা গাইব- এই ভাবনাটি ছিল না। আমেরিকা থেকে ফেরার কিছুদিনের মধ্যেই টের পেয়ে গেলাম রোজগারের কোনও ব্যবস্থাই করিনি আমি। সঞ্চিত অর্থ শেষ। কলকাতায় চাকরি খুঁজছি, এমন সময় ভয়েস অফ জার্মানি থেকে সিনিয়র এডিটরের চাকরির প্রস্তাব পেয়ে গেলাম। কিন্তু বাংলা গান নিয়ে কাজ করে যাওয়ার সঙ্কল্প থেকে আমি পেশাদার বেতার সাংবাদিক হিসেব আবার কাজ করার সুযোগ পেয়েও সরে আসিনি। জার্মানিতে আমি ৩৭ বছর বয়সে ক্লাসিকাল গিটার শিখতে শুরু করি। তার আগে কখনও গিটারে হাত দিইনি। আমি যদি চাইতাম, জার্মানি থেকে বেতার- সাংবাদিকতার কাজ নিয়ে পৃথিবীর অন্য কোথাও চলে যেতে পারতাম। সে চিন্তা আমার ছিল না। ১৯৮৯ সালে ভয়েস অফ জার্মানির চাকরি ছেড়ে কলকাতায় ফিরে গান বাঁধতে বাঁধতে, একে- তাকে গান শোনাতে শোনতে শেষে মনে হল কারুর কারুর ভাল লাগছে গানগুলো। ১৯৯০ সালের সম্ভবত ফেব্রুয়ারি মাসে ইন্দ্রনীল গুপ্ত নামে এক ভদ্রলোকের সঙ্গে দৈবাৎ আলাপ হয়ে যায়। তিনি আমার তৈরি খান দুই গান শুনে ফেলেন। একদিন তিনি এসে উপস্থিত-সল্টলেক স্টেডিয়অমে কলকাতা উৎসবে আমায় গান গাইতে হবে। আমার গান। কোনও আপত্তিই শুনলেন না তিনি। আমায় যেতে হল। কেউ আমায় চেনে না, আমার নাম শোনেনি, গান তো দূরে কথা। ‘হেমন্ত মঞ্চে’ বিভিন্ন নামী শিল্পী বাংলা গান গাইছেন। লক্ষ্য করলাম, শ্রোতারা নিস্তেজ। কেউ কেউ ঠোঙা থেকে খাওয়ার বের করে খাচ্ছেন। দুরুদুরু বুকে উঠলাম। গিটার নিয়ে গাইলাম ‘তিন শতকের শহর/তিন শতকের ধাঁধা/ সুতানুটির পারে নেমে এল সাহেবজাদা’। সতের বছর পর আবার গাইছি। আমার বয়স তখনই একচল্লিশ। স্নায়ুর ওপর এত চাপ যে গিটারটা ভাল করে বাজাতেও পারছি না। আশ্চর্য, এক নাম-না-জানা মাঝবয়সী লোকের গাওয়া সম্পূর্ণ অচেনা একটি গান দর্শকরা মন দিয়ে শুনতে শুরু করেছেন। সকলের করতালি আমায় সাহস দিচ্ছে। এরপর ছোট একটি কি বোর্ড বাজিয়ে গাইছি তোমাকে চাই। কউ শোনেনি আগে। ভিড় বাড়ছে। খাওয়া থেমে গিয়েছে। অসংখ্য মানুষ উৎকর্ণ। আরও করতালি। দেখতে পাচ্ছি, বুঝতে পারছি শ্রোতারা স্তম্ভিত এই ধরনের গান শুনে। কিন্তু গানগিুলি যে তাঁদের ভাল লাগছে সেটা তাঁরা নিজেরাই সম্যক বুঝছেন এবং তা জানিয়েও দিচ্ছেন। শেষ গান ‘গড়িয়াহাটার মোড়’ আবার একটি অপরিচিত গান। লোকে লোকারণ্য হেমন্ত মঞ্চের সামনেটা। এমনকি পুলিশ বাহিনীও গান শুনছে। তারপর ঘটল, তা অভূতপূর্ব। মানুষ আমায় আর ছাড়তে চাইল না। কিন্তু উদ্যোক্তাদের নির্ঘণ্টের প্রতি সম্মান জানিয়ে আমায় নেমে যেতেই হল। মঞ্চ থেকে নেমে গেলাম এই হতচকিত বোধ ও উত্তেজনা নিয়ে যে বাংলা গানে একটি নতুন যুগ এসে পড়েছে। আমার ধারণা দীর্ঘকাল পর আধুনিক বাংলা গানে নয়ের দশকে যে পরিবর্তন এল, তার প্রথম ঘোষণা হয়ে গেল ১৯৯০সালের বসন্তে, কলকাতার সল্টলকে স্টেডিয়ামে, কলকাতা উৎসবের ‘হেমন্ত মঞ্চ’-এ। সে দিনের অনুষ্ঠানে যাঁরা উপস্থি ছিলেন তাঁদের কারুর আর সেই মুহূর্তের কথা মনে পড়ে কিনা জানি না। স্মৃতি স্বল্পায়ু। কিন্তু আমার এই ধারণা ভ্রান্ত নয় যে কলকাতা উৎসবের ওই বিশেষ সন্ধেতেই আধুনিক বাংলা গানের একটি যুগমুহূর্ত সূচিত হয়ে গিয়েছিল। আমার আগে যে শিল্পীরা গাইছিলেন তাঁরা সকলেই প্রতিষ্ঠিত। সে- আসরে তাঁদের গাওয়া গানগুলিও ছিল সকলের মোটামুটি পরিচিত। অথচ শ্রোতাদের মধ্যে তেমন কোনও উৎসাহ প্রচলিত গান শুনে অবসর কাটানোর স্বাভাবিক ইচ্ছের বেশি কিছু দর্শকদের ছিল বলে মনে হচ্ছিল না। কিন্তু সম্পূর্ণ অপরিচিত এক গায়কের গলায় (গায়কটি আবার নিজেই একাধিক যন্ত্র বাজিয়ে গেয়ে চলেছে, সঙ্গে কোনও যন্ত্রশিল্পী নেই- এও এক নতুন দৃশ্য) কোনও দিন কোথাও না-শোনা তিনটি নতুন গান শুনে কয়েক হাজার প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ যে ভাবে উদ্বেল হয়ে উঠলেন, যেভাবে তাঁরা নতুন গানগুলিকে সর্বান্তঃকরণে গ্রহণ করলেন, তা নিঃসন্ধেহে এক ঐতিহাসকি ঘটনা। আধুনিক বাংলা গানের বহমানতায় এক সন্ধিক্ষণ চিহ্নিত হয়ে গেল। ১৯৯১ সালে চিত্রপরিচালক তরুণ মজুমদারে ‘অভিমানে অনুরাগে’ ছবির জন্য একটি গান তৈরি করে গেয়ে- বাজিয়ে রেকর্ড করার সুযোগ পেয়েছিলাম তাঁরই বদান্যতায়। আমার কপাল চিরকালই খুব ভাল, সম্ভবত সেই কারণেই ছবিটি বেরতে পারেনি। আর ১৯৯২ সালের এপ্রিল মাসে এইচ এম ভি বের করল ‘তোমাকে চাই’। ‘তোমাকে চাই’ অ্যালবামটি কিন্তু গানের বাজারে নাম করতে কয়েক মাস সময় লেগে গিয়েছিল। শুনেছি, প্রথম দিকে অ্যালবামটি মোটেও বিক্রি হয়নি। পরে হতে শুরু করেছিল। অ্যালবামটি প্রকাশ করার সময় এইচ এম ভি একটি বিজ্ঞাপন দিয়েছিল। তারপর আর নয়। ‘তোমাকে চাই’-কে কেন্দ্র করে নানান নাটক হয়েছে সে সময়। কিন্তু সবচেয় নাটকীয় যে ঘটনা সেটি ওই অ্যাবামটি মানুষের কাছে পৌছনোর ক্ষেত্রে। গানবাজনার রেকর্ড সারা পৃথিবীতেই সর্বযুগে জনগণের কাছে পৌছতে পেরেছে বেতারের মাধ্যমে। আমাদের দেশ তার ব্যতিক্রম নয়। বরাবর রীতিটি ছিল; রেকর্ড বেরবে, তারপর তা বেতার থেকে প্রচারিত হবে। বেতারে না বাজলে কোনও গানের রেকর্ড বৃহত্তর সমাজে প্রচারিত হওয়ার কোনও উপায়ই বলতে গেলে ছিল না। ‘তোমাকে চাই ‘ যখন বেরল, আকাশবাণীর এফ এম বেতারপ্রচার তখনও শুরু হয়নি। আকাশবাণীর মিডিয়াম ওয়েভ অনুষ্ঠানে মিউজিক ক্যাসেট বাজানোর নিয়ম ছিল না, রীতি ছিল শুধু গ্রামোফোন ডিস্ক বাজানোর। ‘তোমাকে চাই’ বেরিয়েছিল ডিস্ক হিসেবে নয়, ক্যাসেট হিসেবে। সুতরাং প্রকাশের সময় বা তার কয়েক বছরের মধ্যে এই অ্যালবামের কোনও গান আকাশবাণী থেকে প্রচারিত হয়নি। এত বড় একটা বাধা সত্ত্বেও গানগুলি সাধারণ শ্রোতাদের কাছে পৌছতে পেরেছিল শুধু মানুষে মুখে-মুখে ছড়িয়ে পড়া কথার জন্য। পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষই হয়ে দাঁয়েছিলেন ‘তোমাকে চাই’-এর একমাত্র বিজ্ঞাপন। তাঁদের উৎসাহই এই অ্যালবাটিকে ছড়িয়ে দিতে পেরেছিল দিকে দিকে। এমন ঘটনা শুধু এ-দেশে কেন, পৃথিবীর কোনও দেশেই তার আগে ঘটেনি। বেতারের মতো প্রচারমাধ্যমে সক্রিয় ভূমিকা ছাড়াগানের একটা আস্ত অ্যালবাম অসংখ্য মানুষের ঘরে ও মনে পৌঁছাতে পারে, সঙ্গীতের বাজারে (যে- বাজার তার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত ধুকছিল) বিক্রীর হুজুগ জাগিয়ে তুলতে পারে, পাইকারি ও খুচরো বিক্রেতাদের দোকানে দোকানে ফেলে দিতে পারে অদৃষ্টপূর্ব আলোড়ন- সমাজে ও সঙ্গীত ইন্ডাষ্ট্রিতে এ এক সম্পূর্ণ নতুন যুগান্তকারী অভিজ্ঞতা।
‘তোমাকে চাই’ প্রকাশ, দেখতে দেখতে তার ক্রমান্বয়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা ও গানের বাজারে তার বিপুল সাফল্য গবেষণার বিষয় হতে পারে। আমার ধারণা, এমন ঘটনা যদি পাশ্চাত্যে ঘটত, তা হলে সে গবেষণা এতদিনে হয়েও যেত।