Sufi Faruq (সুফি ফারুক)

কোন পথে গেল গান – কবীর সুমন -৭ বই সংগ্রহ

Kabir Sumon | কবীর সুমন

পশ্চিমবঙ্গের অনেক মানুষ অপরিচিত, সেই ভাবে দেখতে গেলে গানের দুনিয়ায় নবাগত (আমার প্রথম দুটি রবীন্দ্রসঙ্গীতের গ্রামোফোন ডিস্ক বেরিয়েছিল ১৯৭২ ও ১৯৭৩ সালে, মোটেও তেমন জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি সেগুলি, যদিও আকাশবাণী থেকে সেই রেকর্ড দুটি কালেভদ্রে বাজাত) এক মধ্যবয়সী লোকের বাঁধা- গাওয়া গান যেভাবে বেতারের কোনও মধ্যস্থ-ভূমিকা ছাড়াই দলে দলে গ্রহণ করে নিলেন, তা থেকে যে-কারুর বুঝতে পারার কথা যে অর্থপূর্ণ, যুগোপযোগী আধুনিক বাংলা গানের অভাব তারা সচেতনভাবে বা নিজেদের অজান্তেই বোধ করছিলেন। বিশেষ একটি মুহূর্তে মনের মতো কিছু গান পেয়ে তাঁরা আঁকড়ে ধরলেন সেই গানগুলি। ‘তোমাকে চাই’-এর মধ্যে দিয়ে আধুনিক বাংলা গানে একটি নতুন পরিসর তৈরি হয়ে গেল। অনেক বাঙালির মনে জেগে উঠল আধুনিক বাংলা গান সম্পর্কে নতুন প্রত্যাশা। তার পরের বছর নচিকেতা চক্রবর্তীর প্রথম অ্যালবাম এই বেশ ভাল আছি, প্রকাশ করল এইচ এম ভি। প্রচ্ছদে লেখা হল ‘জীবনমুখী বাংলা গান’। এই নামটি তার আগে কখনও শুনিনি। আমার অ্যালবামে অমন কোনও নাম ছাপা ছিল না। লেখা ছিল ‘বাংলা গান’। পরে আধুনিক বাংলা গান লেখা হতে থাকে। ওই সময় শুভেন্দু মাইতির বাংলা লোকসঙ্গীতের একটি অ্যালবামও বের করে এইচ এম ভি। তাতে ও লেখা ছিল ‘জীবনমুখী লোকসঙ্গীত’। কেউ যদি তার স্বরচিত গানকে ‘জীবনমুখী’ আখ্যা দিতে চান তো তাতে কারুর আপত্তি থাকার কথা নয়। এ তো ব্যক্তিগত অভিরুচির ব্যাপার। কিন্তু দেখা গেল, বাংলার সমাজে নতুন আধুনিক গানকে বড্ড বেশি লোক ‘জীবনমুখী’ নামে ডাকছে। নচিকেতা চক্রবর্তী তার এই বেশ ভাল আছি প্রকাশিত হওয়ার মূহূর্ত থেকে আমার চেয়ে অন্তত ঢের বেশি জনপ্রিয়। সম্ভবত সেই কারণেই এই অধমের গানগুলিকেও অসংখ্য মানুষ ‘জীবনমুখী’ বলতে শুরু করেছিলেন। পত্রপত্রিকার লেখায়, বেতার টেলিভিশনের আলোচনায় আমাকেও ‘জীবনমুখী’শ্রেণীতে ফেলে দেওয়া হতে থাকে। সঙ্গীতকে পেশা করার ব্যাপারে আমার পিতৃদেব আমার প্রথম- যৌবন থেকে যে হুশিয়ারি আমায় দিয়ে এসেছিলেন (তোকে ছেলেবেলা থেকে এত যে গান শেখার ব্যবস্থা করে দিলাম সেটা তুই সঙ্গীতকে পেশা করবি বলে নয়, একদিন ভাল শ্রোতা হয়ে উঠবি বলে) তা ওই সময় থেকেই বারবা মনে হতে থাকে। বাবা মাঝে মাঝেই বলতেন, গানটাকে পেশা করিস না। দেখবি বড় কষ্ট পাবি। মানুষ তোকে বড্ড কষ্ট দেবে। ১৯৯২ সালের পর থেকে ক্রমাগত বুঝতে পেরেছি কী সত্যি কথাই না বলেছিলেন তিনি। নচিকেতা চক্রবর্তীর আত্মপ্রকাশের পর থেকে নানান পত্রিকায় শুরু হল দু’জনকে লডিয়ে দেওয়ার খেলা। কেন জানি না, বাঙালি ও ভারতীয়রা এই ব্যাপারটা খুব পছন্দ করে। সম্ভবত তারা ভারী শান্তি প্রিয় ও সৌহার্দ্যপূর্ণ বলে। শক্তিশালী পারফমার, দক্ষ কণ্ঠের অধিকারী, চমৎকার হারমোনিয়াম বাদক নিচিকেতা
৮১
চক্রবর্তী অতি অল্পকালের মধ্যেই অসংখ্য মানুষের মন জয় করে ফেললেন। তাঁর তৈরি গানগুলিও অনেকেরই খুব ভাল লাগতে শুরু করল। সঙ্গীতকার ও মঞ্চশিল্পী হিসেবে এ তাঁর বড় কৃতিত্ব। কালক্রমে তিনি অন্য কয়েকজন শিল্পীর জন্যেও গান রচনা করেছেন। এক সময়ে জোরাল সুকণ্ঠের অধিকারী এবং গণঙ্গীত ও পল্লীসঙ্গীতের বিভিন্ন আঙ্গিকে অভ্যস্ত শুভেন্দ মাইতি নতুন ধারার বাংলা গানের পরিমন্ডলে একটি বিশিষ্ট স্হান নেন ন’এর দশকে। তাঁর সঙ্গে আমার আলাপ ১৯৯০ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষদিকে। কারুর কাছে আমার কথা শুনে দেখা করতে এসেছিলেন তিনি। ঘরে বসে আমার গান শোনার পর বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে গিয়ে তিনি আমার গানের কথা বলেন। এইচ এম ভি’র নবপ্রতিভা- সন্ধান বিবাগের ম্যানেজার সোমনাথ চট্টোপাধ্যয়ের কাছেও। সত্যি বলতে, আমার গানগুলি রেকর্ড করার ব্যাপারে আমার তখনও বিশেষ উৎসাহ ছিল না। শুভেন্দৃ মাইতিই উৎসাহ দিতে থাকেন। বাংলা গান তিনি তার আগেই সম্ভবত রচনা করেছিলেন। কিন্তু ১৯৯০ সালের পর তিনি নিজেও যে গান তৈরির ব্যাপারে নতুন উদ্যাম বোধ করেন তাতে সন্দেহ নেই। এর পর তিনি অনেক আধুনিক বাংলা গান রচনা করেন, তার মধ্যে একটি, ‘মঈনুদ্দিন কেমন আছো’ বেশ পরিচিতি লাভ করে। স্বরচিত গান তিনি অনুষ্ঠানে নিজেই গাইতেন। গণসঙ্গীতে ও লোকসঙ্গীতে দক্ষ শুভেন্দু মাইতির গায়কীতে দাপট ছিল। তার সুরেও ওই দুই গোত্রের সঙ্গীতের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। সঙ্গীতকার হিসেবে তার যে ভূমিকা, সংগঠক, নতুন শিল্পীদের উৎসাহদাতা এবং বিভিন্ন মহলের মধ্যে যোগাযোগস্থাপনকারী হিসেবে তার ভূমিকা তার চেয়ে বড়। শুনেছি নচিকেতা চক্রবর্তীর সঙ্গে এইচ এম ভির যোগাযোগও তিনিই ঘটিয়েছিলেন। তার পরেও বিভিন্ন তরুণ শিল্পী, গীতিকার ও সুরকারকে তিনি উৎসাহ দিয়েছেন বলেই শুনেছি। গত এক দশকে শুভেন্দু মাইতি একাধিক গানের এলবাম করেছেন, তাতে তার স্বরচিত গান স্থান পেয়েছে। ন’এর দশকে আমার রচনাগুলির ধাক্কায় নতুন বাংলা গান তৈরি ও পরিবেশন করার যে অদৃষ্ট পূর্ব উদ্যম কলকাতায় দেখা যায় তার পরিমণ্ডলে শুভেন্দু মাইতির ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। অসম্ভব উদ্যোগী, গতিশীল ও আবেগপ্রবণ এই মানুষটি এক সময়ে নতুন ধারার বাংলা গান নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখেছিলেন।
১৯৯৩ সালে জ্ঞানমঞ্চে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠান অঞ্জন দত্তর গান আমি প্রথম শোনার সুযোগ পাই। তার ও তার ছেলে নীলের সঙ্গীত পরিবেশনার আঙ্গিক আমায় মুগ্ধ করে। চমৎকৃত হই তার কয়েকটি রচনা শুনে। মনে হয়েছিল নাগরিক চেতনা থেকে তিনি গান বাঁধছেন। তাঁর গানের ধরা দিয়ে তাঁর পরিবেশ, খুঁটিনাটি বিষয়, নানান চরিত্র, মানুষের নিঃসঙ্গতা, নাগরিক জীবনের বিচ্ছিন্নতা, সেই সঙ্গে এক পরিশিলিত ‘হিউমার’ যা বাংলা গানে বিরল। নচিকেতা চক্রবর্তীর গানে ভারতীয় গানের ইডিয়ম বেশি পাচ্ছিলাম, আর অঞ্জনের গানে পাশ্চাত্যের
৮২
গানের। মনে হচ্ছিল গানবাজনায় তাঁদের ব্যক্তিত্ব আলাদা। অঞ্জন দত্তর ক্যাসেটেও ‘জীবনমুখী’ কথাটি কখনও ছিল না, তবু আমার মতো তিনিও জনমানসে ‘জীবনমুখী’ হয়ে ওঠেন। এই বিশেণটি ঢালাও ভাবে প্রয়োগ করে করে মানুষের মনে এটিকে পাকাপোক্ত করে দেওয়ার ব্যাপারে বাংলার মিডিয়া যে জোরালো ভূমিকা রেখেছে, তা অতুলনীয়। সাংবাদিক ও সমালোচকরা যদি এই ভুল ও মিথ্যে ব্যাপরটি নিয়ে হঠাৎ অত ব্যস্ত না হয়ে পড়ে গানগুলি একটু শুনতেন তো এর চেয়ে কম মেহনত হত তাঁদের। বেচারিরা! অঞ্জন দত্তও বেশ তাড়াতাড়ি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। বাংলা গানের আসর ও বাজার ততদিনে জমজমাট, সেই সঙ্গে মিডিয়ার কোনও কোনও মহলের এক অদ্ভূত বৈরী মনোভাব- যেন, নতুন বাংলা আধুনিক গান লিখে- সুর করে- গেয়ে কেউ কেউ মহাপাপ করে ফেলেছেন। শুনেছি পশ্চিমবঙ্গের খুবই শক্তিশালী একাধিক ব্যক্তির উদ্যোগে সোনার বাংলা’ নামে ভারী মনোগ্রাহী ও সত্যনিষ্ঠ একটি দৈনিক পত্রিকা বেরত। সেই পত্রিকার সম্পাদকমণ্ডলী সম্ভবত আমার প্রেমে পড়েছিলেন। কারণ আমার ব্যঙ্গচিত্র এবং আমার ও আমার গান সম্পর্কে দুর্দান্ত সব লেখা ছাপিয়ে ছাপিয়ে সেই পত্রিকার কর্ণধারার একদিন এতই ক্লান্ত হয়ে পড়লেন যে, অত ভাল পত্রিকাটি উঠেই গেল। আহা! আমার ও আমার গানের মুণ্ডপাত করার ফাঁকে ফাঁকে ওই পত্রিকাটি বেচারি অঞ্জন দত্তরও বন্দোবস্ত করতে শুরু করেছিল। শুনতে পেতাম শুধু আমাদের দু’জনের প্রেমেই তারা দিশাহারা। আর কারুর প্রতি তারা কৃপাদৃষ্টি দিতেন না, বরং প্রশান্তিই ছাপাতেন। আহা! বাঙ্গলির নিতান্তই দুর্ভাগ্য যে অত সুখপাঠ্য ও সত্যনিষ্ঠ একটি পত্রিকায় লালবাতি জ্বলল এক অশুভ প্রহরে। খেয়াল করছিলাম, অনেকে যেমন মন দিয়ে নতুন নতুন গান শুনছেন, আরও অনেকে তেমনি গানবাজনা আদৌ শুনছেন না, তা নিয়ে কথা বলছেন ও লিখছেন বেশি, আগে লোকে গান শুনত বেশি গান নিয়ে কথা বলত কম। নয়ের দশকের পর লোকে খুব কথা বলতে শুরু করল গান নিয়ে। ১৯৯০ সালেই, আলাপ হয়েছিল মৌসুমি ভৌমিকের সেঙ্গ। পরে তিনিও গান লিখেতে, সুর করতে ও গাইতে শুর করেন। কণ্ঠের এক পৃথক আবেদন- লেখা ও সুরে একটা আলাদা বৈশিষ্ট্য তাঁকে বিশেষ একটি জায়গা দিয়েছে। তাঁর প্রথম অ্যাবাম ‘তুমি চিল হও’ বেরোয়া এইচ এম ভি থেকে। তার পরেও তিনি স্বরচিত গানের বিভিন্ন অ্যালবাম করেছেন। অনেক দিন তিনি তাঁর নিজস্ব ভঙ্গিতে গান বেঁধে গেয়ে চলেছেন। ‘তুমি কোথায় ছিলে অনন্য’ মৌসুমি ভৌমিকের স্মরণীয় একটি গান। আধুনিক বাংলা গানের আসরে গান- কারিগর ও কণ্ঠশিল্পী হিসেবে মৌসুমি ভৌমিকের আগমনের ঠিক পরেই সম্ভবত কাজি কামাল নাসের এলেন। চমৎকার লিরিক লেখার ক্ষমতা তাঁর। বাংলা গানের সনাতন কিসিম তিনি ভাল বোঝেন।
৮৩
বাংলা গান গাওয়ার অভ্যেসও তাঁর আগে থেকেই ছিল। মননশীল, রুচিবান কাজি কামাল নাসের এক দশকের ওপর বিভিন্ন ধরনের বাংলা আধুনিক গান তৈরি করে এসেছেন, করে নিতে পেরেছেন নিজের একটি জায়গা। যন্ত্রসঙ্গীত- আবহ রচনাতেও তিনি দক্ষ। তাঁকে প্রফেশনাল গীতিকার- সুরকার বলা যায়। একাধিক কোম্পানির লেবেলে তাঁর তৈরি গান নানান শিল্পী গেয়েছেন। আকাশবাণীর অনুমোদিত গীতকার ও হয়ে উঠেছেন তিনি এক সময়ে। তাঁর নানান রচনার মধ্যে ‘একটা অন্য রকম গান’ ও ‘মেঘলা মেঘলা দিন’ নয়ের দশকে আধুনিক বাংলা গানের সম্ভারে নিঃসন্দেহে দুটি স্মরণীয় অবদান।
নয়ের দশকের গান- কারিগরদের মধ্যে কাজি নাসেরর রচনায় আধুনিক বাংলা গানের সনাতন আদল খুব স্পষ্টভাবে ধরা দিয়েছিল। একমাত্র তাঁর গানেই সঞ্চারী- চিন্তা দেখা দিয়েছে মাঝে মাঝে। শুধু তাই নয়, বাংলা পল্লীগীতির সুরের প্রভাবও এগিয়ে যাননি তিনি। এই একটি জায়গায় নয়ের দশকের নতুন বাংলা গান (গান কারিগরদের গান) আধুনিক বাংলা গানের ধারার থেকে আলাদা হয়ে পড়ে। বাংলার পল্লীসঙ্গীতের সুর ছন্দ কিসিমের প্রভাব বরাবরই অল্পবিস্তর পড়েছে, কাজি কামাল নাসেরের গানেও। কিন্তু তার বাইরে প্রভাবটি প্রায় নেই। এটা লক্ষ্যণীয়, কারণ পল্লীগীতির সুর- ছন্দ-কিসিম এড়িয়ে আধুনিক বাংলা গান তৈরির ধারাবাহিকতা রক্ষা করা কঠিন, তা অযৌক্তিকও। বাংলার মানুষ হলে, বাংলা গানের আবহে বড় হয়ে উঠলে কীর্তিন, বাউল, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া ইত্যাদির প্রভাবে আদৌ না থাকাটা আমার কাছে অন্তত একটু অদ্ভুত লাগে। আধুনিক বাংলা গানের যে সব রূপ আমরা দীর্ঘকাল ধরে পেয়েছি, তা থেকে বাংলার পল্লীগীতির স্পর্শ বাদ পড়েনি। নয়ের দশক থেকে যাঁরা আধুনিক বাংলা গানের সুরকার হয়ে উঠলেন, তাঁদের বেশিরভাগই কি তা হলে আধুনিক বাংলা গানের ঐতিহ্যময় ইডিয়মণ্ডলি থেকে সাঙ্গীতিকভাবে দূরে? আধুনিক বাংলা গানের সুরে পল্লসঙ্গীতের সুর ও আঙ্গিক চিরকালই সূক্ষ্মভাবে মিশেছিল। সেই সূক্ষ্ম উপস্থিতিটাই যেন লোপ পেতে লাগল। সঙ্গীত রচনা, সুর দেওয়া এক গভীর মনস্তত্ত্বের বিষয়। দীর্ঘকালের সঙ্গীতস্মৃতি সুর রচনার প্রক্রিয়ায় মাঝে মাঝেই ধরা দেয়। কোনও সুরকারের একাধিক সুর শুনেই একজন বোদ্ধা ব্যক্তি মোটের ওপর আন্দাজ করে নিতে পারেন, তিনি কী ধরনের গান ও বাজনা শুনেছেন এবং কতটা। নয়ের দশকে থেকে যাঁরা বাংলা গানের সুরকার হিসেবে এলেন তাঁদের অনেকের সুর ও আঙ্গিক শুনে পরিশীলিত শ্রেতাদের বুঝে নেওয়ার কথা এঁদের বেশিরভাগ কী ধরনের গানবাজনা শুনে অভ্যস্ত। সন্ধা মুখোপাধ্যায় একবার আমায় বলেন, তাঁর শুরু ওস্তাদ বড়ে গুলাম আলি খান সাহেব তাঁকে বলেছিলেন, সঙ্গীত শিক্ষার শতকরা আশি ভাগই হল শোনা। গুরুর কাছে তালিমের ভাগ কুড়ি। নয়ের দশক থেকে যে আধুনিক বাংলা
৮৪
গান শোনা যেতে লাগল, তার সুর – তাল- চন্দ- আঙ্গিক ওই যুগপুরুষের উক্তির আওতায় বিচার করলে বোঝা যেতে বাধ্য, পশ্চিমবঙ্গের সাতের দশকের সুরকাররা যা যা শুনতেন, নয়- পরবর্তী সুরকাররা সম্ভবত সেগুলি আর ততটা শোনেননি। এর ফলে নতুন বাংলা গানের সুর- তালের জগতে একটা লক্ষ্যণীয় পরিবর্তন ঘটে গেল। আধুনিক বাংলা গান ক্রমশই তার মোকাম হারিয়ে ফেলতে লাগল। তালের ক্ষেত্রে, এমনিতেই বাংলা আধুনিক গানে বরাবরই ছয় ও আট মাত্রার প্রধান্য। কিন্তু তিন থেকে ছয়ের দশক পর্যন্ত নানান সুরকারের রচনায় সাত মাত্রা ও দশ মাত্রাও কখনও কখনও পাওয়া গিয়েছে। সাতের দশকে এই ব্যাপারটি কমতে থাকে। নয়ের সুরকারেদের মধ্যে ক’জন দাদরা, ডবল দাদরা, কাহারবা, অর্থাৎ সেই ছয় ও আট মাত্রার বাইরে গিয়ে অন্য কোনও তালে সুর করেছেন, গান বেঁধেছেনঃ তাল- ফেবতাও বলতে গেলে মিলিয়ে গিয়েছে। এখানেও সেই শোনার অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গটি এসে পড়তে বাধ্য। শিলাজিৎ ও পল্লব কর্তীনীয়াও জনসমক্ষে আসেন ও নাম করেন নয়ের দশকেই। দু’জনেই গান লিখেছেন, সুর করেছেন, গেয়েছেন। কিন্তু দু’জনের বৈশিষ্ট্য আলাদা। শিলাজিতের রচনা শুনলে মনে হতে চায় না যে তিনি আধুনিক বাংলা গানের ধারার সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করতে আগ্রহী। আর পল্লব কীর্তনীয়ার কিছু কিছু গান অন্তত সেই ধারা থেকে দূরে নয়। আমার এ- ও মনে হয়েছে যে পল্লব কীর্তনীয়ার গান- চিন্তায় রাজনৈতিক মতবাদের ভূমিকা বেশি।
৮৫
রাজনৈতিক মতবাদ ও বক্তব্যের কথা উঠলে যাঁর কথা বাংলা গানের আলোচনায় কিছুতেই বাদ দেওয়ার জো নেই, তিনি প্রতুল মুখোপাধ্যায়। নয়ের দশকের বেশ আগে থেকেই তিনি গণসঙ্গীতের আসরে ছিলেন। শুধু তাই নয়, তার তৈরি গান আমি অন্তত একাধিক গণসঙ্গীতশিল্পীর কাছে আটের দশকের মাঝামাঝিই শুনেছি। কিন্তু নয়ের দশকে তিনি অনেক বেশি খ্যাতি অর্জন করেন। ওই দশকে বাংলা গান পরিবেশন করা ও শোনার যে জোয়ার এসেছিল, তাকে প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের অনুষ্ঠান ও গানও ছিল সামিল। পরিবেশানয় তাঁর আঙ্গিক সম্পূর্ণ নিজস্ব। এক সময় তাঁর সঙ্গে যন্ত্র বাজলেও নয়ের দশকে তিনি খালি গলাতেই মঞ্চে গাইতে লাগলেন। সুরকার হিসেবে তিনি রীতিমতো বিশিষ্ট। অরুণ মিত্রসমেত বিভিন্ন কবির কবিতায় তিনি উল্লেখযোগ্য দক্ষতার সঙ্গে সুর দিয়েছেন। বস্ত্তত, এতক্ষণ যে শিল্পীদের কথা বললাম, তাদের মধ্যে স্রেফ সুরকার হিসেবেই প্রতুল মুখোপাধ্যায় হয়ত সবচেয়ে বিশিষ্ট, পৃথক। উল্লেখ করা দরকার, তাঁর সুরে বাংলার পল্লীসঙ্গীতের সুর ও কিসিম যেমন পাওয়া যায়, তেমনি মেলে হিন্দুস্থানি রাগসঙ্গীতের ছোঁয়া। শঙ্খ ঘোষের ‘বাবরের প্রার্থনা’য় সুর দিতে গিয়ে তিনি যেমন তোড়ি রাগ প্রায়োগ করেছেন সুকৌশলে, তেমনি তাঁর জনপ্রিয় গান ‘ডিঙা ভাসাও’ বয়ে নিয়ে চলেছে লোকগীতির আবেদন। স্থায়ী ও অন্তরারর সুর রচনায় প্রতুল মুখোপাধ্যায় থেকে থেকেই যে মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন, তা প্রমাণ করে দেয় তাঁর গানবাজনা শোনার অভিজ্ঞতা কী ধরনের ও কতটা। এখানে ওস্তাদ বড়ে গুলাম আলির উক্তিটি আবার স্মরণ করা যেতে পারে। তাঁর ‘স্লোগান দিতে গিয়ে’ গানটির সুর বাংলার আধুনিক গানের প্রতিষ্ঠিত ইডিয়মের প্রয়োগে যতটা আকর্ষণীয়, ততটাই তা চমকপ্রদ ‘স্লোগান’ কথাটি তিনি যেভাবে হঠাৎ নিচের সপ্তকে পুনরাবৃত্ত করেছেন সে জন্য। তেমনি তিনি এমন সুরও দিয়েছেন যা বৈপ্লবিকরকম নিরীক্ষানিষ্ঠা। ‘একটি বালক’ হয়ত তার সবচেয়ে জোরালো উদাহরণ। প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের সুর শুনলেই সুররসিক মানুষের বুঝে নেওয়ার কথা যে এই সুরকার গানের লিরিকে সুর প্রয়োগ নিয়ে রীতিমতো মাথা ঘামান। একই রকম সুর তাঁর ধাতে সয় না। তেমনি, গত অন্তত তিনটি দশকে পশ্চিমবঙ্গে যাঁরা গানে বা কবিতায় সুর দিয়েছেন, প্রতুল মুখোপাধ্যায়কে তাঁদের মধ্যে অন্যতম নিরীক্ষামনস্ক বলতে আমার একটুও দ্বিধা নেই। আমার অনুভব, কথা বা মতবাদ
৮৬
নয়, সঙ্গীতের নিরিখে বাংলা গানের ইতিহাস যদি কখনও লেখা হয় এবং লেখক যদি বাংলা গানের নিষ্ঠবান শ্রেতা হন তো সুরকার হিসেবে প্রতুল মুখোপাধ্যায়কে তিনি বিশেষ একটি আসন দেবেন। আমি লক্ষ্য করেছি, প্রতুল মুখোপাধ্যয়ের অনেক শ্রোতা তাঁর গান শোনেন প্রধানত রাজনৈতিক মতবাদের কারণে। সুরকার ও গীতিকার হিসেবে (সেই ভাবে বলতে গেলে সঙ্গীতের মাপকাঠিতে) তাঁর গানের বিচার কারা করেন ঠিক জানি না। তাঁর সুর দেওয়া ‘ও ছোকরা চাঁদ’ গানটি উপযুক্ত যন্ত্রানুষঙ্গে পরিবেশিত হলে সঙ্গীতময় আবেদনের দিক দিয়ে উপমহাদেশের প্রথম সারির গানগুলির সঙ্গে দিব্যি পাল্লা দিতে পারে বলে আমার বিশ্বাস। সঙ্গীতের আলোচনা সঙ্গীতের নিরিখেই হওয়া দরকার। সেখানে মতবাদগত কারণে কে কী বিশ্বাস করেন, কোন শিবিরের আওতায় কোন মত ব্যক্ত করেন তা সঙ্গীতের লোকের কাছে সম্পূর্ণ অবান্তর। ঠিক যেমন, ধরা যাক, মুক্তিযুদ্ধ ও গেরিলাযুদ্ধ বিষয়ে পাণ্ডিত্যপূর্ণ আলোচনা করতে পারেন ও করে থাকেন যাঁরা, নানা ধরনের যুদ্ধাস্ত্র, অস্ত্র বানিয়ে নেওয়ার কৌশল, অস্ত্র হাতে বা ঠেকায় পড়লে অস্ত্র ছাড়াই অতি প্রতিকূল অবস্থায় লড়াই করার অথবা নিজেকে বাঁচানোর অভিজ্ঞতা, গেরিলা যুদ্ধের রণকৌশল ইত্যাদি ক্ষেত্রে ব্যবহারিক জ্ঞান তাঁদের না থাকলে এগুলি নিয়ে মত না দেওয়াই ভাল। সমীর চট্টোপাধ্যায় ও নিজে গান লেখার পাশাপাশি কবিতাতেও সুর করেছেন। নয়ের দশকে তাঁর সুরও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে প্রধানত লোপামুদ্রা মিত্রর গাওয়া গানের অ্যালবামে মধ্যে দিয়ে। তাঁর ও প্রথম অ্যালবাম এইচ এম ভি ই প্রকাশ করেছিল। সমীর চট্টোপাধ্যায় নিজে সেতারশিল্পী, তাই রাগসঙ্গীতের কাছাকাছি তিনি। আধুনিক বাংলা গানের ধারাবাহিকতার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। বাংলার পল্লীগীতির সুরের আবহেও থেকেছে তাঁর রচনা। ‘হেই গো মা দুর্গা’ যেমন, বাংলা ঢোলের তালে বাঁধা। তাল ও ছন্দের প্রয়োগে তিনি যথেষ্ট আলাদা। তাঁর একটি শ্রুতিসূখকর গান ‘বাইরে খুব মেঘ করেছে’ সাত মাত্রায়। তেমনি জয় গোস্বামীর ‘রেণীমাধব’ কবিতাটিতে এমনিতেই পাঁচ বা অন্যভাবে দেখলে দশ মাত্রার যে চলন রয়েছে, এই কবিতায় সুর দিতে গিয়ে সমীর চট্টোপাধ্যায় তা সুরকারদের মধ্যে সমীর চট্টোপাধ্যায় এই ধরনের একাধিক দিক দিয়ে একটু আলাদা। একই সঙ্গে তিনি বাংলা আধুনিক গানের ধারাবাহিকতার অংশীদার, আবার নিজস্ব সঙ্গীতভাবনা ও সঙ্গীতপ্রয়োগে তিনি নিরীক্ষাপ্রবণ। স্বাগতলক্ষ্মী দাশগুপ্তও নয়ের দশকেই গীতকার, সুরকার ও গায়িকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তবে রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী হিসেবেই তিনি বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন কালক্রমে।
দুই ভাই, ময়ূখ ও মৈনাক, নয়ের দশকে উত্তরবঙ্গ থেকে কলকাতায় এসে বাংলা আধুনিক গান তৈরির কাজে হাত দেন। তাঁরাই সেই গানগুলি গাইতেন।
৮৭
এঁদের কাজে উত্তরবঙ্গের স্বরে ছোঁয়া পাওয়া গেল, পাওয়া গেল অনুচ্চ, মিঠে একটি মেজাজ। লিরিকেও এঁরা সেই অনুচ্চ গ্রাম বজায় রাখলেন। এদের গান শুনে মনে হচ্ছিল আধুনিক বাংলা গানের বহমান ধারায় থেকেই তাঁরা তাঁদের সুর-তাল প্রয়োগের স্বকীয়তার ছাপ রাখতে চান, লিখতে চান উপযুক্ত লিরিক। এঁরা আজও কাজ করে যাচ্ছে, চেষ্টা করছেন আজকের প্রতিকূল পরিবেশেরও কিচু পরীক্ষানিরীক্ষা চালাতে। সেটা করতে গিয়ে তাঁরা পরিশীলন ও একটা মানসিক-সাঙ্গীতিক মাপ বর্জন করছেন না। এতক্ষণ যাদের কথা লিখলাম তাঁরা গ্রামোফোন ডিস্ক নয় মিউজক ক্যাসেটের যুগের মানুষ। প্রযুক্তির বিবর্তনের কারণে তাঁরা সকলেই এমন একটা যুগে নতুন গান বাঁধা ও গাওয়ার চেষ্টা কছেন যখন একবারে দুটি বা বড়জোর চারটি নয় অন্তত আটটি দশটি গান দিয়ে ক্যাসেট ভরতেই হবে। এই দায় তিন থেকে সাতের দশকের গোড়া অবধি বাংলার সঙ্গীতকারদের ছিল না। থাকলে তাঁরা কী করতেন কে জানে।সারা বছর খেটেখুটে ভাবনাচিন্তা করে, বাছাই করে দুটি চারটি গান তৈরি করা আর বছরে আটটি দশটি করে গান তৈরি করতে বাধ্য হওয়া সম্পূর্ণ আলাদা ব্যাপার। সত্যি বলতে, ন’এর দশকে নতুন বাংলা গানের জগতে যাঁদের আগমণ, তারা সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে সেই ছ’এর দশকের পাশ্চাত্যের গানের সংরাইটারদের কাছাকাছি- নিজেরাই গান তৈরি করছেন, নিজেরাই গাইছেন। তফাৎ শুধু মোক্ষম একটি জায়গায়; পাশ্চাত্যের সংরাইটাররা নিয়মিত গান বেঁধে ও গেয়ে তারপর নাম করেছিলেন, রেকর্ড করার সুযোগ পেয়েছিলেন। পশ্চিমবঙ্গের এই নতুন ব্যক্তিদের মধ্যে খুব কম মানুষই ন’এর দশকের আগে নিয়মিত গান রচনা করেছেন। গান লেখা ও সুর করার প্রশিক্ষণ ও অভ্যেস অনেকেরই ছিল না। তেমনি, আমার তৈরি গান আমি কোন আঙ্গিকে গাইব তারও একটা অভ্যেসের প্রক্রিয়া আছে। সেটিও ছিল বেশিরভাগের ক্ষেত্রে অনুপস্থিত। ফলে, নির্মোহ হয়ে ভেবে দেখলে আমরা বলতে বাধ্য যে একনাগাড়ে গান বেঁধে গাইতে গিয়ে অনেকেই আশানুরূপ কাজ শোনাতে পারেননি কারণ সেই প্রস্তুতিই তাঁদের ছিল না। অনেক কাজই হয়ে দাঁড়িয়েছে কাঁচা হাতের, কাঁচা গলার কাজ। এ ছাড়াও তিন থেকে সাতের দশকের মধ্যে আধুনিক বাংলা গানের জগতে ( শিল্পসংস্কৃতির সব জগতেই এটা হতে বাধ্য যদি তা আধুনিক ধনতান্ত্রিক উৎপাদনব্যবস্তার অমোঘ পৌনঃপুনিকতায় সামিল হয়ে যায়) যে সর্বনেশে মধ্যমান কায়েম হয়ে গিয়েছিল তা নতুন বাংলা গানের পরিবেশেও চারিয়ে গেল, কারণ মধ্যমানের থেকে উন্নত মানের শিল্পসৃষ্টি সমানে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এই ক্ষমতা জগতে এত কম মানুষের মধ্যে দেখতে পাওয়া গিয়েছে সেটা নেহাতই ব্যতিক্রম। নতুন বাংলা গানের ক্ষেত্রে দেখা গেল আর- এক বাড়তি বৈশিষ্ট যা বিপজ্জনক; প্রফেসনাল জগতে যে কোন ক্ষেত্রে যে ন্যূনতম মান বজায় না রাখলেই নয়, সেই মান আর বজায় থাকল না। সাতের দশকের গোড়া পর্যন্ত
৮৮
আধুনিক বাংলা গান কথা- সুর যন্ত্রণুষঙ্গ মিলিয়ে সার্বিক বক্তব্যের দিক দিয়ে যুগোপযোগী না হয়ে উঠতে পারলেও স্বীকৃত লঘু সঙ্গীতের ন্যূনতম মান যা হোক করে হলেও বজায় থাকত। তার একটা কারন, প্রথাগত আধুনিক গান কিভাবে লিখতে হয় (যদিও তার অনেকটাই ছিল বিরক্তিকররকম একঘেয়ে, কল্পনাশক্তিহীন, অনাধুনিক) এবং সেই কথায় কিভাবে সুর দিতে হয়, সেই যুগের গীতিকার- সুরকাররা তা জানতেন। আকশবাণী ও গ্রামোফোন কম্পানিগুলির কষ্টিপাথরে তাঁদের ন্যূনতম যোগ্যতা যাচাই করা হত। তেমনি গায়- গায়িকারাও প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তর্ণ হয়ে তবেই আসতে পারতেন গানের ইন্ডাস্ট্রিতে, গানের জগতে। ক্যাসেটের যুগে সেসব বলাই আর না থাকায় অযোগ্য মানুষের অনধিকারচার্চার সুযোগ এসে পড়ল। গান লেখা, সুর করা ও গাওয়া যদি অতই সহজ হত তাহলে তো কথাই ছিল না। সারা পৃথিবীর গানের জগতে তাহলে অনেককাল আগেই দেখা দিত মাথামুণ্ডুহীন অরাজকতা। সেই অপরাজকতার যুগ শুরু হয়ে গেল ন’এর দশক থেকে পুরোপুরি। শ্রেতারা এবং মিডিয়াও নিরঙ্কুশভাবে সবই শুনতে লাগলেন, সবাইকেই গ্রাহ্য করতে লাগলেন। আত্মবিশ্লেষণ ও আত্মসমালোচনহীন, স্বঘোষিত বা বন্ধুমহল এমনকি রাজনৈতিক দল- ঘোষিত ‘শিল্পীর’ সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় যে অবস্হা অচিরেই দাড়াল তা হাস্যকর ও বিরক্তিকর। কয়েক বছর এইভাবে চলায়, আধুনিক সঙ্গীতের ভালমন্দ বিচারের ক্ষেত্রে আর কোন মাপকাঠিই রইল না। তাছাড়া, একিট ক্যাসেটে আট দশটি গান থাকলে এবং সমানে অসংখ্য ক্যাসেট বেরতে থাকলে ক’জন শ্রোতাই বা একটি ক্যাসেটের সবকটি গান মন দিয়ে শুনবেন? আগে গ্রামোফোন ডিস্কে দুটি বা চারটি গান থাকত। বেশি ডিস্কও বেরত না। লোক তবু মন দিয়ে শোনার অবকাশ পেত- তা সে যার ডিস্কই হোক। ক্যাসেটের নবযুগে শ্রোতারাও পড়লেন ঘোর বিপদে। ক্যসেটযুগের এই বৈশিষ্টের কারণে কোন কোন ক্যাসেটের অনেক গান লোকে আদৌ শোনেনি বা শুনলেও মন দিয়ে শুনে উঠতে পারেনি। গানবাজনা শোনা ছাড়াও মানুষের তো অন্যকাজও আছে। অত গান আর কত ক্যাসেট বেরলে মানুষ দিশেহারা বোধ করতে বাধ্য। তা থেকেই এক- সময়ে দেখা দেয় নিম্পৃহতা। পশ্চিমবঙ্গ সম্পর্কে যা যা বললাম তা বাংলাদেশের গানবাজনার জগতেও ঘটেছে। দুই বাংলাতে আজও এই অবস্থাই বর্তমান। ন’এর দশক থেকে পশ্চিমবঙ্গে ‘আম্মোও পারি আম্মোও পারি’ ধারণা থেকে এত মানুষ গান লিখে সুর করে গেয়ে বাজার মাত করার সংকল্প নিয়ে ফেললেন যে চারদিকে এক অদ্ভুত অবস্থা সৃষ্টি হল। বাজারে নাম করে যাওয়া কোনও কোনও নতুন গান-বাঁধা গায়কের সৃষ্টির ধাক্কায় এবং মিডিয়ায় তাঁদের সম্পর্কে তারিফমিশ্রিত উল্লেখে অনুপ্রাণিত অনেক বঙ্গসন্তান যেসব গান উপহার দিতে শুরু করলেন, সেগুলি শুনে সুস্থ মস্তিস্কের যে কোনও শ্রোতার মনে হওয়ার কথা- শুধু বাংলা গান কেন, কোনও স্বাভাবিক
৮৯
গানের সঙ্গেই এঁদের কোনও যোগ নেই। এঁরা এবং নাম করে যাওয়া কেউ কেউ গানবাজনা আদৌ শেখেননি। লেখার ক্ষমতা এঁদের অনেকেরই হয় একেবারেই নেই, অথবা থাকলেও তা নিতান্তই সীমিত। সুর বলতে এরা যে ঠিক কী বোঝেন , তাও আন্দাজ করা দুষ্কর। সুকুমার রায়ের ‘পাগলা দাশু’ তে একটি গল্প আছে কবিতা লেখা নিয়ে। একটি স্কুলে এক নতুন ছাত্র এল যে‘পোয়েট্রি’ লেখে। কিছুদিনের মধ্যেই অন্যরাও তার দেখাদেখি কবিতা লেখা ধরল। তার একটির নমুনা: আহা যদি থাকত তোমার ল্যাজের ওপর ডানা/ উড়ে গেলই আপদ যেত করত না কউ মানা ‘ শেষ পর্যন্ত কাব্যব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে পড়ল স্কুলের প্রায় সব ছাত্রই। একদিন ইনস্পেক্টর এলেন স্কুল পরিদর্শনে। সকলে অপেক্ষা করছিল জুতসই একটা সুযোগের জন্য। ভদ্রলোকের সামনে কাব্য-বাহাদুরি দেখাতে একজন তার পকেট থেকে পদ্য লেখা একটা কাগজ বের করতেই, বাকি সকলেও যে যার পদ্য বের করে চেঁচিয়ে পড়তে লাগল। একটি বেড়াল ওপরের তলার কার্ণিশে দিবানিদ্রামগ্ন ছিলেন। সমবেত কিশোরকণ্ঠে বঙ্গকাব্যের ও হেন বিদঘুটে হট্টগোলে তিনি বিষমটিষম খেয়ে ছিটকে পড়লেন নিচে। নয়ের দশক থেকে পশ্চিমবঙ্গে গান লেখা- গাওয়া নিয়ে যা শুরু হল, তাকে একমাত্র মহাকবি, মহাপ্রজ্ঞ সুকুমার রায়ের ওই গল্পটি ছাড়া আর কিছুই মনে পড়ার কথা নয়। কালক্রমে ওই গল্পটিরই অকৃত্রিম পুনরাবৃত্তি ঘটতে দেখা গিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের নবগানের গনগনে আচে। সকলেই দেখা গেল ও দেখা যাচ্ছে সব কিছু জানে, পারে। এ জন্য কাউকে সঙ্গীত শিখতে হয় না বিশেষ। লেখার ব্যাপারটা তো নয়ই। সুর ? ওটা কোনও ব্যাপারই নয়। পশ্চিমবঙ্গ ও প্রতিবেশী বাংলাদেশের অসংখ্য অনুপ্রাণিত গানযোদ্ধা এই বিশ্বাসগুলিকে হাতিয়ার করে নিয়ে এগিয়ে চলেছেন ভবিষ্যতের দিকে। মাঝেমাঝেই কানে আসে আমিই নাকি বাংলা গানের এ হেন যুগ পরিবর্তনের মূলে। শুনে, কখন ও মনে হয় আমি মহাকবি সুকুমারের গল্পের সেই নতুন পড়ুয়াটি, যে ‘পোয়েট্রি’ লিখত এবং যার দেখাদেখি অন্য পড়ুয়ারাও পদ্য লিখতে শুরু করে। কখনও আবার মনে হয় আমি ওই গল্পের বেড়ালটা, নববঙ্গকাবানিনাদের আকস্মিকতায় যিনি ভয়ানক বিষম খেয়ে কয়েক তলা ওপর থেকে হাত- পা ছুঁড়তে ছুঁড়তে নিচে পড়ে যাচ্ছেন।আমার অনুমান, বাংলার আরও অনেক মানুষ এখন বাংলা গানের চোটে ওই বেড়ালটির দশা প্রাপ্ত হয়েছেন।
তারই মাঝখানে হঠাৎ দু’একটি সুষ্ঠ গান যে শোনা যায়নি তা নয়। কিন্তু ঝড়ের মতো প্রকাশিত নতুন গানের সংখ্যার অনুপাতে তা কিছুই নয়। অনুপাতের কথা উঠলই যখন, তখন বলতেই হয় নয়ের দশকেই কলকাতার শিল্পীদের মধ্যে ও ইন্ডাস্ট্রিতে ‘রিমেক’ প্লাবন শুরু হওয়ায় মিডিয়া ‘রিমেক’ ‘বনাম নতুন গান’ এর ( মিডিয়া অবশ্য ইচ্ছে করেই অযৌক্তিকভাবে ‘জীবনমুখী’ বলতে, নতুন গান
৯০
বলত না ) কাজিয়া লাগানোর মহৎ উদ্যোগ শুরু করে দিয়ে যে অনুপাতবোধেরর পরিচয় দেয় তার কথা। শ্রোতাদের মধ্যেও শুরু হয়ে যায় বিভাজন। একমাত্র শ্রীকান্ত আচার্য বাদে সে মুহূর্তে খ্যাতি অর্জন করা আধুনিক গানের আর কোনও শিল্পী নতুন গানের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে স্পষ্টভাবে কিছু বলেননি বোধহয়। সঙ্গীতরসিক, সুগায়ক শ্রীকান্ত আচার্য তাঁর পরিশীলিত মনেরই পরিচয় দিয়েছেন এ প্রসঙ্গে। ‘চলতি হাওয়ার পন্থী’ হতে চাওয়া দোসের কিচু হবে কেন? নতুন গানের পাশাপাশি ‘রিমেক’ গানের বাজার তৈরি হয়ে যাওয়ায় কোনও শিল্পী সেই ধরনের গান করতেই পারেন। তাকে তাঁর কোম্পানির যদি লাভ হয় তো সামাজিক অর্থনৈতিক দিক দিয়ে তা ভালই। সমস্যা দেখা দিতে পারে যখন ‘রিমেক’ গানের একক মহিমাকীর্তন করতে গিয়ে কেউ নতুন গান ও তার সব শিল্পীর প্রতি কটাক্ষ করতে শুরু করেন। মিডিয়ার এক অংশের সৌজন্যে সেটাই শুরু হয়ে গিয়েছিল্ সেই তালে দু’একজন ‘রিমেক- তারকা’ তাল মেলাতে ভোলেননি সে সময়ে। কালক্রমে দেখা গেল ‘রিমেক’ গান কিছুটা সময় ধরে ভাল ব্যবসা দিলেও,তার আবেদন কমছে ।অর্থাৎ নতুন ধারার বাংলা গান এবং রিমেক কোনওটাই আর হালে সেই প্রথম দিকের পানি পাচ্ছে না।
নতুন সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তা ও মূল্য সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ দীর্ঘকালআগে বলেছিলেন, নব সৃষ্টি যত দোষই থাক, মুক্তি সেই কাঁটা পথেই। সাবেক সৃষ্টি পুনরাবৃত্তি সম্পর্কেও বলেছিলেন তিনি মোক্ষম : অজন্তা ইলোরার ছবি ভাল, তাই বলে কি বাকি জীবনে আমরা তার ওপর দাগা বুলিয়ে কাটিয়ে দেব? এমনিতে সারাক্ষণ রবীন্দ্রনাথ আওড়ানো ‘শিক্ষিত’ বাঙালিরা নতুন ধারার বাংলা গান এবং সাবেক গানের মাহাত্মা বিষয়ে ভাবনাচিন্তা করা ও বক্তব্য রাখার সময় রবীন্দ্রনাতের এই কথাগুলি মনে রাখেন না। রাখলে আসলে বিপদ, তা হলেই আর একপেশে হওয়া যায় না। নতুন কোনও জিনিস, বিশেষ করে গানবাজনার মতো বিনোদনমূলক জিনিসে নতুনত্ব এলে অনেকেই উৎসাহিত বোধ করেন। বাংলার শ্রোতারা কয়েক বছর সেই উৎসাহ দেখিয়েছেন, পয়সা খরচ করে একের পর এক অনুষ্ঠানে গেছেন, ক্যাসেটের পর ক্যাসেট কিনেছেন। ১৯৯২ পরবর্তী গণ- উৎসাহ স্বাভাবিকভাবেই স্তিমিত হয়ে এসেছে কয়েক বছর পর। সত্যি বলতে, নতুন শিল্পীরা ও বাংলার জনগণের প্রশ্রয় ও সমর্থনের প্রতি ধারাবাহিকভাবে সুবিচার করতে পারেননি। নাগাড়ে আট- দশটা গান বেঁধে গেয়ে ক্যাসেটবন্দী করে যাওয়া আর অনুষ্ঠানের প্রাবলা- দুটোই ধারাবাহিকভাবে, উৎকর্ষ বজায় রেখে চালিয়ে যাওয়া খুবই দুস্কর। অতি উৎপাদন, অতি- বিপণন আর অতি পরিবেশন সর্বনাশ ডেকে এনেছে বাংলা গানের, সমানে ডেকে আনছে। ভাল মন্দ বিচারের ক্ষমতা এমনকি ( সন্দেহ হয়) স্পৃহাও হারিয়ে ফেলেছেন অনেকে এই অতি সব কিছুর পরিণামে। এস পড়েছে অবসাদ ও একঘেয়েমি। এক ধরনের একঘেয়েমি ‘তোমাকে চাই’
৯১
প্রকাশের আগে আধুনিক বাংলা গানের জগতে বিরাজ করছিল। আমি কোনটা কতটা জানি, বাস্তবিকই করতেপারি, আমার সীমাবদ্ধতা কোথায়, কোথায় আমার ক্ষমতা, কোন ক্ষেত্রে আমি অক্ষম এই সব দিকে মানুষ যদি নিরষ্কুশ সততা নিয়ে নিজের সঙ্গেএকটা বোঝাপা করে নিতে না পারে তো তার জীবনে অনেক কিছু গুলিয়ে যেতে বাধ্য। কোথাও তার একটু ক্ষমতা থাকলেও অচি্রেই তা অপব্যবহার ও বোধের অভাবহেতু নষ্টও হয়ে যেতে পারে। এই ব্যাপারগুলি শিল্প- সাহিত্য- নাকট- চলচ্চিত্রের অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো আধুনিক বাংলা গানেও বেদনাদায়ক ও বিরক্তিকর পরিণাম ডেকে এনেছে। একক শিল্পীদের গানের পাশাপাশি বাংলা ব্যান্ডের যুগ শুরু হওয়ার পর তরুণ সমাজে তার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির সঙ্গে সেই ব্যান্ডধারার ওপরে ও নতুন ধারার বাংলা গানের ক্ষেত্রে উৎকর্ষের ধারাবাহিকতা ও সৃজনশীলতার যে অভাব ও নানান মৌলিক দ্বন্দ্ব দেখা গিয়েছিল, সেগুলিই ক্রমান্বয়ে বর্তেছে। এখন ও বর্তাচ্ছে সামনে। উপযুক্ত তালিম, শিক্ষা, দক্ষতা ও প্রতিভা ছাড়া সৃজনশীল কাজ করা ও চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব। আজ বিশ্বায়ন, মৌলিক পণ্যায়ন এবং নানান পণ্যের বিক্রয়মুখী বিজ্ঞাপন প্রচার অভিযানে বাংলা রক ব্যান্ড ও তার শিল্পীদের যে শ্রেষ্ঠীরা সমানে কাজে লাগাচ্ছে, তারা আর যাই হোক, সঙ্গীতের ভাল চায় না। সঙ্গীত নিয়ে তারা চিন্তিতই নয়। তেমনি ইলেকট্রনিক মিডিয়া ও তাদে চব্বিশ ঘন্টার খাই মেটাতে নানান ধরনের গানবাজনাকে যে ব্যবহার করছে, তার কোথাও রসবোধ, মন্দকে বর্জন করে ভালকে মদত দেওয়া, পরিমিতি বজায় রাখার কোনও অভিলাষ নেই। আজ এটা চলছে, অতএব এটাই চালিয়ে যাও। এই হল দর্শন। এর ফলে আবার সেই সব কিছু গুলিয়ে যাওয়া, জট পাকিয়ে যাওয়া, এমন এক পরিবেশ সৃষ্টি হওয়া যেখানে সৃজনশীল কাজ ক্রমশ দুরূহ হয়ে উঠতে বাধ্য। ভাল সৃষ্টি কখনও কিলোগ্রাম ওজনে সমানে হয়ে যেতে পারে না। এই বোধটাই সেখানে উবে যায়, সেখানে কোনও উৎকৃষ্ট কাজই আর সম্ভব নয়।
সাংস্কৃতিক কাজকর্মের উৎকর্ষ নিয়ে আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলি সত্যিই আদৌ চিন্তিত কিনা, নাকি তারা এই ধরনের কাজ ও সে কাজের কাজিদের নিজেদের দলের স্বার্থসিদ্ধির জন্য ব্যবহার ও অপব্যবহার করতে চায়, তা আজও বুঝে উঠতে পারিনি। যা দেখা যায় বামপন্থীরাই সংস্কৃতির ব্যাপারে সবচেয়ে উৎসাহী। নয়ের দশকে শক্তিশালী বামপন্থী রাজনৈতিক দল জড়িয়ে পড়েছিল নতুন গানের দশকের ডামাডোলে। দস্ত্তরমতো দলাদলি, এ শিবিরে ও শিবিরে তিক্ততা, পত্রিকায় লেখালিখি, একজনের বিরুদ্ধে দল পাকানো, অস্বস্তিকর, দলীয় পো ধরতে নারাজ এমন শিল্পী ও তাঁর গান নিয়ে কোনও কোনও কর্তাব্যক্তির উষ্মা, তাঁদের অনুগামী ও সমর্থকদের কাজে লাগানো, স্বাধীনচেতা, ধামা না ধরা ব্যক্তিটির এগনোর পথ আটকাতে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া সবই চলতে থাকে বছরে পর বছর। সেই সঙ্গে চলে অপপ্রচার, ব্যক্তিগত কুৎসা রটানোর
৯২
সুপরিকল্পিত উদ্যোগ, যার রেশ এক যুগ পরে আজও রয়েছে।

 

বিচিত্র পথে এগিয়েছে বাংলা আধুনিক গান রাজ্যে। কার্যত, গুণমানের ধারাবাহিকতার অভাবে যথার্থর সঙ্গে স্থুল অনর্থ মিশিয়ে ফেলার অদ্ভুত আগ্রহে, পরিশীলিত ও আধুনিক সাঙ্গীতে- কাব্যিক উক্তির বদলে ক্রমান্বয়ে বেশি মাত্রায় স্থুলতার বাহুল্যে (কারণ, ক্রমেই দেখা গেল পরিশীলন ও সূক্ষ্মতার চেয়ে স্থূলতাই বেশি হর্ষ জাগাতে পারে সংখ্যাগুরু অর্বাচীন শ্রোতাদের মধ্যে), স্বাভাবিকতা নামে জিনিসটি অতি আপত্তিকর জ্ঞানে নিরস্কুশ বর্জিত হওয়ায়,গানের উৎকর্ষের চেয়ে অন্যান্য বিষয় অনেক বেশি গুরুত্ব পেয়ে যাওয়ায়, ক্যাসেটের যুগে যোগ্যতার কোনও মাপকাঠি আর না থাকায়,গানে ও সঙ্গীতে কোনওরকম শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ ছাড়াই বেশ নাম করা যাবে,জলসায় ডাক পাওয়া যাবে,টাকা পয়সা হবে এই ধারণা মারাত্মকভাবে ছড়িয়ে পড়ায় এবং ওই ধারণার সত্যতা বাস্তবিকই প্রমাণিত হয়ে যাওয়ায় ক্রমাগত আরও বেশি সংখ্যায় নতুন গান (সত্যিই কি গান- পদবাচ্য?) ও রিমেক গানের ক্যাসেট বেরনোয় বাংলা আধুনিক গানের ক্ষেত্রটাই গেল আদ্য প্রান্ত গুলিয়ে। অনেকদিন আগে গ্রুপ থিয়েটারে একটি নাটকের সংলাপে শুনেছিলাম: এ যেন বেনারসের রাস্তা। ষাঁড়ে মানুষে- গোবরে- প্যাঁড়ায় লেপ্টালেপ্টি। নয়ের দশকেই বাংলা আধুনিক গান যে রূপ নিতে শুরু করেছিল, সেটি এবং গানের সমকালীন ধ্বনি ও অবয়বের কথা ভাবলে ওই উপমাটাই খালি মাথায় আসে। গানবাজনা শিখে, গান লেখা ও সুর করার আগে প্রচুর গান ও বাজনা ভালমতো শুনে,নিজের ক্ষমতার মাপ নিয়ে, সবিনয়ে, গান রচনার নিরন্তর অনুশীলনে সামিল হয়ে একটু মনে রাখার মতো গান তৈরি করা ও গাওয়ার চেয়ে গানবাজনাকে হাতিয়ার করে নাম ও অর্থ উপার্জনের পথেই মন গেল চলে। বেচারা বাংলা গান আর কোন পথে যাবে, সেই পথেই গেল, ক্রমাগত যাচ্ছে।