Sufi Faruq (সুফি ফারুক)

শোনার প্রস্ততি গান খেকো

কি শুনবো ?
শুনবেন রাগ। তার বিভিন্ন রঙ্গে সাঁজানো রুপ। বিভিন্ন ধরনের পরিবেশন। কন্ঠ সহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের পরিবেশন। শুদ্ধ শাস্ত্রীয়, উপশাস্ত্রীয়, মিশ্র সব। শুনবেন যেটা কানে-মনে সহ্য হয়।

শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শোনা মানে, কোন একটি রাগ বা কম্পোজিশন শোনা। হতে পরে গলায় বা যন্ত্রে। সেই রাগের উপরে বিভিন্ন ধরনের জনরার (genre), বিভিন্ন ধরনের গায়কি/গাতকরিতে (style) এ বিভিন্ন ধরনের কম্পজিশন শোনা এবং তার মজা নেয়া। ব্যস !

সাধারন রাগাশ্রয়ী হালকা গান-বাজনা শুনতে শুনতেই কান তৈরি হয়। একটি রাগের গনবাজনা শুনতে শুনতে, ক্রমশ কানে-মনে রাগের রুপ (আবয়ব, রস) ধরা দিতে থাকে। আবেগের নিদ্রিষ্ট অবস্থানের সাথে, রাগের ম্যাপিং হতে শুরু করে। যেকোন ঘটনায় আপনার মন সেই অবস্থাতে গেলেই, রাগটাকে শুনতে ইচ্ছে করে। তখন রাগটাকে শুনলে, প্রিয় মানুষের সাথে সঙ্গ দেবার অনুভূতি হয়। নির্দিধায় সুখ-দুক্ষ শেয়ার করার সুখ পাওয়া যায়।

রাগটা যখন আরও প্রিয় হয়, প্রিয় মানুষের মতই তাকে আরও বেশি জানতে ইচ্ছে করে। জানতে ইচ্ছে করে – তার প্রতিটি অঙ্গ দেখতে কেমন, কোথায় তার জন্ম, বাড়িঘর, বেড়ে ওঠা, চলন-বলন, ইতিহাস, বিবর্তন, সঙ্গী-সাথির বিস্তারিত। তার পুরো অবয়বকে স্পষ্ট দেখতে ইচ্ছে হয়। জানাশোনার এই পথ পরিক্রমায় প্রেম-ভালবাসা বাড়তে থাকে।

যুগে যুগে ওস্দাদরা একেকটি রগকে, আরও সাঁজিয়ে গুছিয়ে উপস্থাপনের জন্য, বিভিন্ন ধরনের কায়দা উদ্ভাবন করেছেন। সেই কাজগুলোকে চিনতে ইচ্ছে হয়। বিভিন্ন ঘরানা বা পরিবেশনশৈলির বিশেষত্ব বুঝতে ইচ্ছে হয়। বিশেষত্বগুলো কখন, কিভাবে এবং কতখানি ফুটে উঠছে – সেটাকে জানতে ইচ্ছে হয়। সেই জানার যাত্রায়, সঙ্গীতের কারিগরি বিষয়গুলোর সাথে পরিচয় হতে থাকে, রাগের রূপটাও স্পষ্ট হতে থাকে।

তাই অন্য যেকোনো শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মতোই, ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বেশি মজা নেবার জন্য, ক্রমশ জানাশোনার ক্ষুধাটা বাড়তে থাকে। যত বেশি জানা যায়, মজাটা ততই বাড়তে থাকে। একসময় নেশার মতো হয়ে যায়। এক জীবনে যেহেতু শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে সবকিছু জানাশোনা শেষ হয় না, তাই একটা মিষ্টি প্রেমের অপুর্নতা নিয়ে মরা যায়।

শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের পরিবেশন:
শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের পরিবেশন মানে:- গাওয়া-বাজানোর মাধ্যমে একটি রাগ পরিবেশন। একটি রাগ শুধুমাত্র আকার (আ,ই,উ শব্দ করে) বা সারগম দিয়ে (সা-নি) গেয়ে বা বাজিয়ে পরিবেশন করা যায়। রাগের অবয়ব পুরো প্রতিষ্ঠা করা যায়। একসময় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মুলরীতিটা এরকমই ছিল। তবে যুগেযুগে, পরিবেশন আরও আকর্ষণীয় করার জন্য, সঙ্গীতকে বিভিন্ন রকম ভাবে সাঁজগোজ করা হয়েছে। মানুষ বিভিন্ন ধরনের গায়ন/বাজনা রীতি (genre: dhrupad, khayal) উদ্ভাবন করেছে। বিভিন্ন যায়গার লোকসঙ্গীতের গায়কী (style) থেকেও এসেছে বিভিন্ন রকম গায়কী-অঙ্গ । বড় শিল্পিদের গায়কি/গাতকারির স্বতন্ত্রতা নিয়ে তৈরি হয়েছে বিভিন্ন ঘরানা (gharana) বা স্কুল। বিভিন্ন ঘরানা, বিভিন্ন গায়নরীতিতে, বিভিন্ন রাগে তৈরি হয়েছে সুন্দরসব বান্দিশ (composed composition) । তাই রাগ ছাড়াও, গায়ন শৈলীর ভিন্নতা, শ্রোতাকে অন্য ধরনের স্বাদ নেবার সুযোগ করে দিয়েছে। এজন্য একই রাগ, ভিন্ন রীতিতে, ভিন্ন অঙ্গে, ভিন্ন ঘরানার গায়কের কাছে শুনে, ভিন্নরকম মজা পাবেন।

তাই শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শোনা মানে, বিভিন্ন রাগের পাশাপাশি, সেসব বৈচিত্রের মজা নেয়া। যত শুনতে থাকবেন, তত এসব বৈচিত্র আপনার কাছে স্পষ্ট হবে। শোনার মজা বাড়তে থাকবে, নেশাও বাড়তে থাকবে।

শোনার জার্নিটা যেভাবে হতে পারে।

আমাদের শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শোনা শুরু হতে পারে হালকা উপ-শাস্ত্রীয় সঙ্গীত দিয়ে (light/semi classical)। মানে রাগাশ্রয়ী হালকা গানবাজনা। শ্রোতা হিসেবে, যেকোনো রাগের বিশুদ্ধ রূপ বোঝার চেষ্টা করার আগে, ওই রাগের হালকা গানগুলো (উপশাস্ত্রীয় ও সাধারণ গান/বাজনা) যথেষ্ট পরিমান শোনা দরকার। এগুলো এমনিতেই আশেপাশে থেকে শোনার অভ্যাস থাকার কারণে, আলাদা করে (শোনা শেখার) পরিশ্রম করতে হয় না। আবার এতে কান তৈরি হতেও সুবিধা হয়। উপশাস্ত্রীয় জনরা গুলোর মধ্যে শোনা যায় – গজল, ঠুমরি, রাগাশ্রয়ী প্লেব্যাক- আধুনিক, টপ্পা, কীর্তন, কাজরি, হরি, চৈতি, রাগাশ্রয়ী রবীন্দ্র-নজরুল ইত্যাদি।

এরপর ক্রমশো আগাতে হবে শুদ্ধ শাস্ত্রীয় (classical) গানের দিকে। শুদ্ধ গায়ন রীতির মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত ধারাদুটো হলো – ধ্রুপদ (Dhrupad) এবং খেয়াল (Kheyal)। ধ্রুপদ খুব প্রাচীন এবং সবচেয়ে শুদ্ধ হলেও খেয়ালের মতো অতটা সার্বজনীন এবং জনপ্রিয় হয়নি। ধ্রুপদ শোনা যায় বিশেষ কোন অনুষ্ঠানে, বিশেষত প্রার্থনা অনুষ্ঠানে। আজকাল শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অনুষ্ঠানগুলোতে মূলত খেয়াল রীতিতেই গান বাজনা করা হয়। কন্ঠশিল্পিদের পাশাপাশি (গায়ক) দের পাশাপাশি যন্ত্র শিল্পীরাও (গাতকার) মুলত খেয়াল গায়নশৈলী ফলো করে বাজান। সুতরাং কণ্ঠের পারফরমেন্স বুঝতে পারলেই যন্ত্রের পারফর্মেন্সর অনেকটাই বোঝা যাবে। যেটুকু সামান্য পরিবর্তন আছে, সেটার নোটও শেষে যুক্ত করা হবে।

প্রথমে উপশাস্ত্রীয় সঙ্গীতগুলো দিয়ে গানবাজনা শুরু করুন। এর মাধ্যমে রাগের চেহারার সাথে পরিচিত হতে চেষ্ট করুন। এরপর যাবো শুদ্ধ শাস্ত্রীয় রীতির গানবাজনার দিকে। বৈঠকি পারফরমেন্সগুলো বোঝার চেষ্টা করবো। মনে রাখতে হবে – বৈঠকি পারফরমেন্স এবং রেকর্ডিং রিলিজ এক জিনিস নাও হতে পারে। কারণ রেকর্ডিঙে (সময়ের কারনে) পুরো খেয়ালের বদলে, অনেক সময় খেয়ালের যেকোনো একটি অংশ প্রকাশিত হয়। বৈঠকি আসরে সচরাচর খেয়ালের সবগুলো অংশ, ক্রমানুষারে গাওয়া/বাজানো হয়।

রেকর্ডেড সঙ্গীত দিয়ে শুরু:
প্রথমে যেকোনো একটি রাগ বেছে নিন। এরপর ওই রাগের – প্লেব্যাক, আধুনিক, গজল, রবীন্দ্র-নজরুল, টপ্পা, কীর্তনগুলো পছন্দমত শুনতে থাকুন। পাশাপাশি বোঝার চেষ্টা করতে থাকুন – গানগুলোর মধ্যে কোথায় যেন সুরের মিল আছে। রিপিট দিয়ে বারবার শুনতে শুনতে, মিলগুলো খুঁজে পাওয়া যাবে। যেখানে মিল, সেখানেই আসলে রাগের কারসাজি। এরকম ১/২ দিন শুনতে পারেন (তবে বোঝার জন্য সময় বেশি লাগলে দোষের কিছু নেই)।

মনে রাখবেন – যে কদিন একটি বিশেষ রাগকে মাথায় বসাবার চেষ্টা করছেন, ওই কদিন অন্য রাগের বা মিশ্র রাগের গান/বাজনা না শোনই ভাল। তাতে মনোযোগটা ভাল থাকে। রাগের রুপ, রং চেহারাটাও মাথায় বসতে সুবিধা হয়।

এরপর রাগের রূপরেখা এবং আবহাওয়াটা বোঝার জন্য, যেকোনো বাদ্যযন্ত্র নিয়ে (হারমোনিয়াম হতে পারে), আমার প্রতিটি রাগ নোটের “স্বর ব্যবহার” সেকশনটা নিয়ে বসবেন। মনোযোগ দিয়ে বারবার পড়তে হবে। পাশাপাশি বাজিয়ে/গেয়ে দেখার চেষ্টা করতে হবে। গাওয়া/বাজাবার সময়, আগে শোনা গানগুলোর সাথে মিল খুঁজে বের করার চেষ্টা করতে হবে। গানের পুরো সুরের সাথে মিল না খুঁজে, গানগুলোর মধ্যে কমন সুরের সাথে মিল খুঁজতে হবে। একটা সুর যখন আপনার কানে-মনে ধরা দেবে, তখন এক ধরনের স্বর্গীয় সুখের আবেশ অনুভব করতে পারবেন। সে সুখ শুধু অনুভব করা যায়, বর্ণনা কেউ করতে পারবে না। যদি মনে হয় – কিছুই হচ্ছে না, তার পরেও থামবেন না। ফলটা বোঝার জন্য একটু সময় দিতে হবে।

রাগ নোটে “স্বর ব্যবহার” সেকশনটা নিয়ে খেলাধুলা করার পরে, স্বর-মল্লিকা ও লক্ষনগীত শুনে, স্বরগুলোর চলাফেরা বোঝার চেষ্টা করতে হবে। যতক্ষণ দু চারটি মিল আপনি খুঁজে না পাচ্ছেন, ততক্ষণ হালকা গানগুলো শুনতে থাকুন। পাশাপাশি “স্বর-ব্যবহার” সেকশনটি দিয়ে খেলুন, স্বর-মল্লিকা-লক্ষনগীত শুনুন, গাইতে/বাজাতে চেষ্টা করুন।

কাজের ফাঁকে ফাঁকে ওই রাগের যন্ত্র সঙ্গীতগুলো ছেড়ে রাখতে পারেন। রাতে শোবার সময় হালকা করে ছেড়ে রাখলে ভাল কাজে লাগে।

একটু আরাম আসলে – এরপরে শোনা শুরু করুন স্লো আলাপ শোনা। সেখানে স্বরের ব্যাবহারগুলো ধরার চেষ্টা করুন। ধরতে না পারলেও অসুবিধা নাই, চেষ্টা করে গেলেই কাজটা হয়ে যাবে।

একই রাগে গাওয়া/বাজানো ২৫ টি বিভিন্ন ধরনের কম্পোজিশন নিয়মিত শোনার চেষ্টা করতে হবে। অল্প কয়েকদিনেই আপনি এই রাগটি চিনে যাবেন। যে কেউ গাওয়া শুরু করলেই, নিজের অজান্তেই বলে উঠবেন – অমুক রাগ গাইছে। সেখানে দু একবার ভুল হলেও লজ্জার কিছু নাই, কারণ অনেক বড় সঙ্গীতজ্ঞদেরও অনেকদিন ধরে না শোনা রাগ ধরতে কষ্ট হতে পারে।

সঙ্গীত শোনা শুরু করার জন্য, প্রথমে দরকার একটা ভাল অডিও লাইব্রেরী। সেখানে একটি রাগের – পরিচিত সব জনরার, বিখ্যাত প্রতিটি ঘরানার, প্রচলিত সব তালের, অন্তত ২৫ টি গান/বাজনা থাকা দরকার। সেরকম একটি লাইব্রেরী গুছিয়ে উঠতে অনেক সময় লাগে। ওরকম একটি লাইব্রেরীর আকার-প্রকার এত বড় হয়, সেটার ব্যবস্থাপনাও ভীষণ কঠিন। সেটা মাথায় রেখে, আমরা প্রতিটি রাগের শ্রোতা সহায়িকা নোটের সাথে, ওই রাগের বিভিন্ন ধরনের গান/বাজনার অনলাইন লিংকগুলো গুছিয়ে দেব (অফলাইনের জন্য DVDতৈরি করছ)।

এভাবে রাগের সাথে মোটামুটি পরিচয়টা ঘটে গেল, ক্রমশ বৈঠকি রীতের গানবাজনা শোনার দিকে আগাতে হবে। কারন শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মুল মজা বৈঠকি রীতিতে। বৈঠকি পারফরমেন্স নিদ্রিষ্ট কিছু নিয়মের মধ্যে দিয়ে হয়। তাই পারফরমেন্স বোঝা এবং মজা পাবার জন্য পারফরমেন্সের রীতিনীতিগুলো জানা দরকার। এই নিয়ে থাকছে পরের পর্বের আয়োজন – শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের পরিবেশন (Understanding Hindustani Classical Music Performance)।



আপনার মন্তব্য দিন