Sufi Faruq (সুফি ফারুক)

আমার হজ্জ যাত্রা – মায়ের সাথে তীর্থ যাত্রা (পর্ব ২) আর্টিকেল ওপিনিয়ন, নোট, প্রেস

যখন মসজিদুল হারামের পাশে আমাদের জন্য নির্ধারিত বাসার সামনে পৌঁছলাম, তখন অনেক রাত। একটু তন্দ্রামতো এসেছিলো। আমাদের গাইডের হ্যান্ডমাইকের আওয়াজে ঘুম ভাঙলো। সব হাজি গাড়ি থেকে বেরিয়ে পাশাপাশি দাঁড়ালাম। সিদ্ধান্ত হলো, সকালের নাশতার পর আমরা একসাথে কাবায় যাবো। ওখানে তাওয়াফ, সায়ি ও নামাজ শেষ করে বাইরে আসবো। এরপর চুল ছেঁটে এহরাম ভাঙার মাধ্যমে প্রথম ওমরাহ পালন শেষ হবে। গাইড সবার রুমের চাবি বুঝিয়ে দিয়ে ফজরের নামাজ নিজের ঘরে পড়ে নিতে পরামর্শ দিলো।

আমি কাবা দেখার জন্য চরম উত্তেজিত ছিলাম। তখনই একবার ঘুরে আসতে চাই বলে গাইডকে জানালাম। সে হেসে বললো, জীবনের প্রথমবার যখন দেখবেন, তখন দিনের আলোতে দেখেন।

নতুন বিছানায় ঘুম তেমন একটা হলো না। শেষ রাতে চোখ বুঁজতেই ফজরের নামাজের জন্য মা ডেকে দিলেন। গরমপানি দিয়ে একটা ভালো গোসল দিয়ে ক্লান্তি কিছুটা কমলো।

নামাজ শেষ করে মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ অন করতেই তাজ্জব। একটা ওপেন ওয়াইফাই সিগন্যাল পাওয়া যায়। সিগন্যাল স্ট্রেংথ ভালো। কানেক্ট করার চেষ্টা করতেই কানেক্ট হয়ে গেল, অ্যান্টিভাইরাসটাও আড়মোড়া ভেঙে আপডেট হয়ে গেলো। তার মানে ইন্টারনেট কাজ করছে! খবরে অবশ্য দেখেছিলাম, হাজিদের ওয়াইফাই সুবিধা দেয়া হবে। তবে কাবা থেকে একমাইল দূরে সেটা আশা করিনি। মনটা দ্বিগুণ ভাল হয়ে গেলো। মোবাইলে রোমিং পার্টনার মবিলি সিলেক্ট করলাম। ওয়েলকাম, বিভিন্ন অফারসহ ৭/৮ টা এসএমএস পেলাম। আরবিতেই বেশিরভাগ। কিছুক্ষণ পরে ইনবক্সে পলা আর ভাইয়ার মেসেজ পেলাম।

সকালে বেশিক্ষণ খালিপেটে থাকতে পারি না। ভাবলাম, হাজিদের জন্য নির্ধারিত নাশতা হয়তো ৮টার আগে পৌঁছাবে না। নাশতাসহ টুকিটাকি কেনার উদ্দেশ্যে নিচে নামলাম। আমাদের দেশের মতোই রেসিডেন্সিয়াল বিল্ডিংগুলোর নিচে সারি সারি দোকান। সম্ভবত হাজিদের জন্যই ফজরের আজানের আগে থেকেই খুলে আছে।

প্রথম দোকানের সামনে দাঁড়াতেই দোকানদার লম্বা সালাম দিয়ে চট্টগ্রামের স্থানীয় টোনে জানতে চাইলো কী চাই। দোকানে ঢোকার পর থেকেই কখন এসেছি, কী করি, সাথে কে, কদিন মক্কায় আছি, ইত্যাদি প্রশ্নের সাথে আন্তরিক উপদেশ, বেশি করে তরল খাবেন, রোদে কম যাবেন, ইত্যাদি। সওদা দেখার ফাঁকে জিজ্ঞেস করলাম বাড়ি চিটাগাং কোথায়। বললো, কক্সবাজার। আমি বললাম, কক্সবাজার কোথায়? এবার বিব্রত হয়ে মিনমিনে গলায় উত্তর, বার্মা। একটু অবাক ও বিরক্ত হয়ে মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললাম। তারও দন্তপাটি প্রস্ফূটিত হলো।

লাবান, দুধ, চায়ের পাতা, কলা, জ্যাম আর গরম রুটি নিলাম। একাটা ওয়াটার হিটার নিলাম। দাম মোটামুটি সস্তাই বলা যায়। মিডলইস্ট দেশগুলোর ব্রেড কালচারটা আমার খুব পছন্দ। ফজরের পরেই বেকারির গাড়িগুলো দোকানে এসে যায়। হরেক রকমের সুস্বাদু রুটি। দোকানে রুটিগুলো এমনভাবে রাখে যেন কিছুসময় গরম থাকে। বাইরে থেকে আসা হাজিদের বেশি করে তরল খাবার খাওয়া উচিৎ। লাবান আর দুধই সবচেয়ে ভালো অপশন। যতোদিন ছিলাম, লাবান আর দুধ নিত্যসঙ্গী ছিলো।

আটটার পরে নাশতা এলো। রুটি, সবজি, মিষ্টি দিয়ে বেশ ভালো প্যাকেজ। তবে তার যা পরিমাণ, তাতে আমি আর মা খাবার পরেও ৪ জনার খাবার থাকে। ফেরত দিতে চেয়ে জানলাম ব্যবস্থা নেই। আমরা একজনের নির্ধারিত খাবার খেলাম। বাকিটা নষ্ট হলো। এই ব্যাপারটা আমার একদম সহ্য হয় না। অথচ আরবে খাবার নষ্ট করাটাই সংস্কৃতি। একজনের জন্য ন্যূনতম দুজন খাবার উপযুক্ত খাবার রাখবে। এবং একজনের জন্য নির্ধারিত খাবার অন্য কেউ খাবে না। পরবর্তীতে আমাদের গাইডকে একটু শক্ত কথায় জানিয়েছিলাম। তার পক্ষে যতোখানি সম্ভব ব্যবস্থা নিয়েছিলেন।

খাওয়া দাওয়া শেষে সবাই বিল্ডিং-এর তলায় একত্রিত হলাম। আমাদের গাইড ওমরার নিয়মকানুন নিয়ে সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা দিলেন। বক্তৃতাশেষে একসাথে হারামের দিকে যাত্রা। উদ্দেশ্য, প্রথম ওমরাহ পালন। এরপর যে কদিন থাকা হবে, তার মধ্যে যে কেউ চাইলে আরও ওমরাহ পালন করতে পারবে। সেক্ষেত্রে মিকাতের বাইরে গিয়ে এহরাম বেঁধে আসতে হবে।

রাস্তা খুব বেশি না হলেও যাত্রাটা খুব উপভোগ করলাম। এহরাম-পরা একদল মানুষ প্রায় নিঃশব্দে এগিয়ে চলেছে। রাস্তায় আরও কয়েকটা দলের সাথে দেখা হলো। কয়েক মিনিটের মধ্যেই এক বিরাট স্রোতের সাথে মিশে গেলাম।

আরেকটি বিষয় লক্ষ্ করা শুরু করলাম। হাজিদের বিষয়ে স্থানীয়দের আন্তরিকতা ও সাবধানতা। রাস্তা দিয়ে একজন হাজিকে পার হতে দেখলেও গাড়িগুলো দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। হাজি রাস্তার ওপাশে না পৌঁছানো পর্যন্ত কোনো গাড়ি এগোচ্ছে না।

আমাদের গাইড জানালো, সামনের রাস্তাটার বাঁক ঘুরলেই মসজিদুল হারাম দেখা যাবে। আমার প্রায় নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিলো ……..

 

 

 

এডিট- এসএস



আপনার মন্তব্য দিন