Sufi Faruq Ibne Abubakar (সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর)

আমার হজ্জ যাত্রা – মায়ের সাথে তীর্থ যাত্রা (পর্ব ৩) আর্টিকেল ওপিনিয়ন, নোট, প্রেস

আমার হজ্জ যাত্রা – মায়ের সাথে তীর্থ যাত্রা (পর্ব 3)

রাস্তার বাঁকটা ঘুরতেই গলির মাথায় হারাম শরিফের একটি মিনার দেখলাম। বুকের মধ্যে দুলে উঠলো। বহু আকাঙ্ক্ষার, বহু স্বপ্নের, বহু প্রতীক্ষার – মসজিদুল হারাম। এটিই প্রধান হারাম মসজিদ। এটা পৃথিবীর একমাত্র মসজিদ – যেটার যেকোনো দিকে দাড়িয়ে কেবলা পাওয়া যায় !!!

গলির দুদিক দিয়ে ঝুলে আছে বহুতল হোটেলগুলো। তার মধ্যে দিয়ে এর বেশি কিছু দেখা গেল না। ভিড়ের সাথে এগিয়ে চললাম। এক পর্যায়ে মসজিদের এক দিকের পুরোটা দেখা গেল। আমার মায়ের অভিব্যক্তি দেখে মনটা চার গুন ভালো হয়ে গেল। বুঝেতেই পারছেন অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ মানুষ হিসেবে তার খুশির পরিমাণ।

মুল মসজিদের সীমানার চারদিক দিয়ে সান বাঁধানো সার্কেল। অনেকখানি এলাকা জুড়ে। সেই সার্কেলে বিভিন্ন দিকের রাস্তা এসে মিশেছে। মসজিদে ঢোকার আগে এখানেই হাজ্বীরা প্রস্তুত হয়। প্রয়োজনে ওজু-গোসল করে। কখনো প্রার্থনার মাঝে ওখানে এসে হাঁটাচলা করে। পরে দেখেছি – জুম্মার নামাজ সহ গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলোতে জামায়েত এই সার্কেল ছাড়িয়ে যায়। এমনকি রাস্তাগুলো ছাড়িয়ে, অন্য এলাকা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।

হারাম মসজিদটি শ্বেত পাথরে বাঁধানো এক বিশাল স্থাপনা। মসজিদের চারদিকে একবার না ঘুরলে পুরো সাইজ বোঝা সম্ভব না। প্রায় গোল আকৃতির বিরাট তিন তলা ভবন। বহু বছর ধরে স্থাপনাটি ক্রমশ বড় হয়েছে। তখন শুনেছি – মসজিদ ১০ লক্ষাধিক লোকের এক সাথে নামাজ আদায়ের যায়গা ছিল। ক্রমশ সেটা ৪০ লক্ষ লোকের জন্য তৈরির পরিকল্পনা।

ভবনের চারদিক দিয়ে কিছুদূর পর পর ঢোকার/বেরোনোর গেইট। গেইটগুলো কয়েকবার গোনা শুরু করে, বিভিন্ন কারণে শেষ করতে পারিনি। ঐতিহাসিক সাফা-মারওয়া পাহাড়ও এখন মসজিদের মধ্যে পড়ে গেছে। প্রতি বছর বাড়তি মুসল্লি যায়গা দিতে সীমানা বড় হচ্ছে।

বাঁধানো সার্কেলের মধ্যে কিছুদূর পর পর পানি পানের যায়গা। জমজমের পানির ট্যাপের লাইন। পাশে কিছু কিছু ডিজপজেবল গ্লাস রাখা। এখন জমজম মানে আর কুপ না। সেই ঐতিহাসিক কুপের উপরে বসানো গভীর নলকূপ। পাম্পের মাধ্যমে পানি সাপ্লাই হয়।

মসজিদের বাইরে ভূগর্ভে কয়েক-তলা মিলিয়ে টয়লেট-বাথরুম। পরিমাণে যথেষ্ট এবং পরিচ্ছন্ন। ক্লিনর বাহিনী নিয়মিত পরিষ্কার করছে। ওজুর পাশাপাশি গোসলেরও ব্যবস্থা আছে। টয়লেটে নামা এবং ওঠার জন্য সিঁড়ির পাশাপাশি এস্কেলেটর দেখলাম। আমি হোটেল থেকে ওজু করে বেরিয়েছিলাম। তারপরও আয়োজন দেখার জন্য আর একবার ওজু করতে গেলাম।

ইতোমধ্যে আমাদের গাইড সবাইকে আব্দুল আজিজ গেইটে এক হতে বললেন। আমরা সেখানে পৌঁছে একে একে জমজমের পানি পান করলাম। সবাই সারিবদ্ধভাবে দাড়িয়ে গাইড এর বক্তৃতায় মনোযোগ দিলাম। আমাদের গাইড ওমরাহ শেষ করার জন্য, কাজগুলো কয়েকবার করে বুঝিয়ে দিলেন।

আমাদের আশেপাশে আরও অনেকগুলো গ্রুপ ছিল। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আসা বিভিন্ন চেহারা মানুষের দল। কালো, সাদা, বাদামী মিলিয়ে একাকার। কোন ভিআইপি, সিআইপি নেই – যেন সেই ছেঁড়া ছাতা – রাজ ছত্র মিলে একই বৈকুণ্ঠের দিকে যাত্রা। বেশিরভাগ লোকই এহরামের কাপড় পরা। তবে তামাত্তু হাজিদের মধ্যে যাদের ওমরাহ শেষ, তারা সাধারণ পাঞ্জাবী, পায়জামা, লুঙ্গী পরে আছে। যেসব হাজ্বী আগে এসেছেন তাদের মধ্যে উত্তেজন কম। কিন্তু নতুনদের মসজিদে ঢোকার জন্য উত্তেজনা দেখার মত।

মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, চায়না থেকে আসা দলগুলো অপেক্ষাকৃত বড়। এদের চলাফেরা বেশ মজার। দেখে বোঝা যায় এরা চরম ইউনাইডেট এবং ডিসিপ্লিন্ড। এসব দলের সদস্যরা পরস্পরকে চেনার জন্য একই ধরনের কিছু একটা পরে থাকে। এরা প্রায় সব সময় লাইন ধরে চলাফেরা করে। গ্রুপ থেকে দুরে যায় না।

মসজিদে ঢোকার আগে – আমরা দেশি কায়দায় সবাই জুতে হাতে নিয়ে নিলাম। গাইড সবাইকে থামিয়ে, জুতো রাখার যায়গা দেখিয়ে দিলেন। তারপর এক মজার নিয়মের কথা শোনালেন। হারাম শরিফের বাইরে জুতো রেখে, শর্ত ত্যাগ করে ভেতরে যেতে হবে। বাইরে বেরোবার পরে, নিজের জুতো খুঁজে না পেলে, পছন্দমত একজোড়া পরে, চলে আসা যাবে। এটাই নিয়ম এবং এতে কোন অপরাধ নেই।

আমরা আব্দুল আজিজ গেইট দিয়ে ভিতরে ঢুকছিলাম। সেখানে প্রতিটি হাজ্বীর উপরে নজর রাখছে পুরুষ এবং মহিলা প্রহরী। সন্দেহ হলে মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে দিয়ে চেক করছে। হাজ্বীরা এদিক ওদিক চলে গেলে – হাজ্বী, হাজ্বী বলে চেঁচিয়ে ইশারা করে দিক নির্দেশনা দিচ্ছে। তবে পুরো এলাকায় কোন আর্চওয়ে দেখিনি। যতদূর মনে পড়ে – পুরুষ রক্ষীদের খাকি পোশাক এবং মহিলা রক্ষীদের কালো বোরখা পরা ছিল।

আমি মার হাত ধরে মসজিদে ঢুকলাম। পাথরের কারণে ভেতরটা অপেক্ষাকৃত ঠাণ্ডা। এ পর্যন্ত মাকে নিয়ে আসাতে পারায় সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এগোতে থাকলাম। চোখ খুঁজছে কালো রঙএর কাবা ঘর। মুসলিমদের পবিত্রতম মসজিদ।

(চলবে)



আপনার মন্তব্য দিন