Sufi Faruq (সুফি ফারুক)

আমাদের নেপথ্যের নায়কেরা উদ্যোক্তা উন্নয়ন, নোট, বই

আমাদের দেশে টেলিভিশন, চলচ্চিত্র, খেলাধুলা বা রাজনীতিতে বিভিন্ন ধরনের তারকা ছিল। এখনও আছে এবং নতুনরা তৈরি হচ্ছে। আমরা শিল্প-সাহিত্য, খেলাধুলায় – এরকম তারকা দেখতে অভ্যস্ত, দেখতে চাই। তবে অন্য খাতে খুব সফল মানুষদেরকে তারকা হিসেবে ভাবা অভ্যাস করিনি। অথচ এই কাজটা করা খুব দরকার ছিল। তাদের সফলতার স্বীকৃতির জন্যই শুধু না। দরকার আমাদের নিজেদের স্বার্থে, জাতির স্বার্থে। তাদের দেখিয়ে নতুনদের উৎসাহিত করার প্রয়োজনে। আরও সফল গল্প তৈরির স্বার্থে।

সেই তারকা মানে – যারা গণমাধ্যম, রাজনীতি বা খেলাধুলার লোক না হয়েও তারকা। বিশেষ ক্ষেত্রে কাজ দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা তারকা। যাদের ওই খাতের কোনা নায়কোচিত গল্প চালু থাকবে। গণমাধ্যমের তারকার মতই দেশে-বিদেশে ভক্ত-মহল থাকবে। তাদের নিয়ে মানুষ কল্পনা করবে, ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও মাতামাতি করবে। তাদের কথা লোকে আগ্রহ নিয়ে শুনবে, উপস্থিতিতে জনগণ জড় হবে। গণমাধ্যম তাদের ভাবনা নিয়ে মাথা ঘামাবে। স্থানীয় ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সম্মান থাকবে।

এখন সারা দেশে যে উদ্যোক্তা তৈরির আন্দোলন শুরু হচ্ছে। আমি কর্মী হিসেবে, বড় অভাব অনুভব করছি দেশি উদ্যোক্তা তারকার। নবীনদের সেমিনার-কর্মশালায় তারকা উদ্যোক্তাদের গল্প করতে হয়। দেশি পরিচিত উদ্যোক্তা তারকা না থাকায় বিদেশি উদ্যোক্তাদের গল্পই ঘুরে ফিরে আসে। গল্পগুলো অত্যন্ত মজার, সাহসের ও অনুপ্রেরণায় ভরপুর। কিন্তু বেশিরভাগ উদাহরণ যেন আমাদের সাথে মেলে না। পরিবার, সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি – প্রায় সবই আলাদা। তাই নবীনরা সেসব গল্পের সাথে নিজের জীবন মেশাতে পারে না। গল্পগুলো অত্যন্ত ভাল, কিন্তু আমাদের জন্য শুধুই গল্প হয়ে থাকে। কষ্ট করে গল্প বলায় আশানুরূপ ফল পাই না।

Samson H. Chowdhury

Samson H. Chowdhury

দু:ক্ষজনক; কিন্তু সত্য – আমাদের সামনে তুলে ধরার মত তেমন দেশি পেশাজীবী বা উদ্যোক্তা তারকা নেই। তারকা হবার মত অনেক সফল মানুষ ছিল। আমরা তাদেরকে তারকা করে তুলতে পারিনি। আকিজ উদ্দিন, স্যমসন এইচ চৌধুরী – এর অর্জন বিদেশে গল্পগুলোর চেয়ে কম না। সুন্দর করে উপস্থাপন করতে পারলে তাদের সংগ্রামের গল্প অনেক বিদেশি তারকাকে হার মানত। তাদের সৃষ্টির গল্প শ্রোতাকে শিহরিত করতো।

অসংখ্য গল্প ছিল। কিন্তু সেগুলো ঠিকমতো লেখা হয়নি। যা লেখা হয়েছে, তার ঠিকমত উপস্থাপন হয়নি। প্রায় সবারই সম্ভ্রান্ত বংশীয় পরিবারে জন্মগ্রহণ টাইপের কিছু জীবনী আছে। যেখানে তার জন্মগত ঐতিহ্য, দান খয়রাতি, ছেলে মেয়ের গল্পই প্রধান। অথচ তাদের গল্পের মুল উপকরণ হওয়া উচিৎ ছিল – তাদের কাজের কৌশল, সৃষ্টি, ঝুঁকি, বিফলতা, সফলতা। সেগুলোর নিয়ে বিস্তারিত কিছুই লেখা হয়নি। তারা যেই কারণে সফল, সেই কারণটিই থেকে গেছে অজ্ঞাত। সিনেমার মুল একশনের গল্পই মিসিং হবার মত। তাই সেই আধা প্রাসঙ্গিক গল্পগুলো জনপ্রিয় হয়নি। আজ সেগুলো থেকে বলার মত কিছু পাওয়া যায় না।

ব্যবসায়ীদের মধ্যে তারকা আছেন কয়েকজন। এরা প্রায় সবাই গণমাধ্যম, খেলাধুলা, ইত্যাদিতে নাম করে এসেছেন। উদ্যোক্তা হিসেবে পুরাণ খ্যাতিকে ছাড়িয়ে যেতে পারেননি। তাদেরও – ব্যবসার কৌশল, ইনোভেশন বা বিশেষ কিছুর গল্প প্রচলিত নাই। তাই এদের গল্পেও বলার কিছু নাই।

ভাল উদ্যোক্তা বা পেশাজীবী পেতে চাইলে আমাদের দেশিও মডেল তৈরি করতে হবে। আমাদের পর্দার পিছনের তারকাদের গণ-মানুষের তারকা বানিয়ে তুলতে হবে। তাদের জীবন, কাজ ও সংগ্রাম নিয়ে নাটক, সিনেমা বানাতে হবে। বায়োগ্রফি লেখতে হবে। সেই বায়োগ্রফি যেন – ছোটদের আকিজ, বড়দের আকিজ টাইপ না। লিখতে হবে – তার অসাধারণ ক্ষমতাগুলোর গল্প, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতার গল্প, ভেঙ্গে না পড়ার গল্প, তার উদ্ভাবন ও কর্মকৌশলের গল্প । সাথে – তার সাথে কাজ করা মানুষদের টেস্টিমনি যোগ করতে হবে। ইন্টারনেট সহ সকল গণমাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে হবে। সামাজিক নেটওয়ার্কে ফ্যান-পেজ বানাতে হবে। উইকির পাতাতে তাদের তথ্যগুলো যুক্ত করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় সমাবর্তনে বক্তৃতা দিতে ডাকতে হবে। গণমাধ্যমে তাদের উদ্ভাবন, কর্মকৌশল, ইত্যাদি নিয়ে কথা বলতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ – তাদেরকে নিয়ে সত্যিই গর্বিত হতে হবে। আপনাকে, আমাকে, সবাইকেই।

আমরা চাইলেই প্রতিটি খাতে তারকা তৈরি হবে। সেই তারার জ্যোতি হাজার নতুন তারার অনুপ্রেরণা হবে।

======
সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর
প্রধান নির্বাহী, বিজনেস ইনোভেশন এন্ড ইনকিউবেশন সেন্টার (বিআইআইসি)



আপনার মন্তব্য দিন