Sufi Faruq Ibne Abubakar (সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর)

সলিমুল্লাহ এতিমখানা – তিন বছরের যুদ্ধের আজ বিজয় জয়, নোট

সলিমুল্লাহ এতিমখানা - তিন বছরের যুদ্ধের আজ বিজয়

একদিন সন্ধ্যায় আমরা কয় বন্ধু জড়ো হয়েছি এক তিন তারা হোটেলে। উপলক্ষ এক প্রবাস ফেরত এক বন্ধুর নিমন্ত্রণ। পানাহার আড্ডা জমে উঠেছে। এর ফাঁকে ফোনে খবর পেলাম – সলিমুল্লাহ এতিম খানার বাচ্চাদের খাবার বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। রান্না ঘরে যা ছিল তা দিয়ে দুপুর পর্যন্ত চলেছে। কিন্তু রাতে তাদের অভুক্ত থাকতে হবে। এতগুলো শিশু না খেয়ে থাকার কথা শোনার পরে দাওয়াতের সুর ভেঙ্গে গেল। ওখান থেকে সবাই মিলে এতিম খানায় রওয়ানা দিলাম।

গিয়ে শুনলাম সংকট তৈরি হয়েছে এতিম খানার বহুমূল্যের জমিকে কেন্দ্র করে। এতিমখানার কমিটি ও মুতাওয়াল্লিরা মিলে জমিটি গ্রাস করতে চায়। এক ডেভেলপারের সাথে যোগসাজশে ইতোমধ্যে অসম্ভব শর্তে জমিটি হস্তান্তর করে দিয়েছে। ডেভেলপার সেই জমি দখল নিয়ে বহুতল ভবন নির্মাণ করছে। জমির খেকোদের বিরোধিতা করার কারণে শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরা কমিটির বিরাগভাজন হয়েছে। প্রথমে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বন্ধ করেছিল, এরপর শিশুদের খাবার খরচের চেক সই বন্ধ করে দিয়েছে।

নুরানি চেহারার সেই কমিটির লোক আর মুতাওয়াল্লিদের ছবি দেখে বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল, এরা অন্তরে এতখানি পশু হতে পারে। সে রাতে যার পকেটে যা ছিল তা দিয়ে রাতের খাবার আর পরের দিনের নাস্তার আয়োজন করা হল। কিন্তু চিন্তায় পড়ে গেলাম- চেক সমস্যার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত শত শত শিশুর নিয়মিত খাবার নিয়ে।

সবাই মিলে স্থির করলাম বাসায় ফিরে আমরা সবাইকে কথাটা জানানোর চেষ্টা করবো। ফেসবুক, ব্লগ, কাগজ, টেলিভিশন- যেখানে যেখানে সম্ভব। তারপর কাল সকালে এসে স্থির করা যাবে কি করা যেতে পারে।

ফিরতে ফিরতে বিস্তারিত জানিয়ে সবাই ফেসবুকে স্ট্যাটাস লিখতে শুরু করলাম। সবাই দেয়া শুরু করলো। হাসান ফিরতে ফিরতে মোবাইলে পত্রিকায় জন্য রিপোর্ট রেডি করে ফেলল। অন্য মিডিয়া বন্ধুদের জানিয়ে দেয়া হল।

আশ্চর্য বিষয় হচ্ছে- রাত ২ টা বাজার আগেই মাসের ১৫ দিনের খাবার চালানোর নিশ্চয়তা পাওয়া গেল। সবাইকে এতিমখানায় এসে নিজে হাতে ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানিয়ে ঘুমাতে গেলাম।

পরবর্তী দিনটি এরকম হবে ভাবতেও পারিনি। কারণ এক রাতের মধ্যেই প্রায় দুই মাসের খাবার বন্দোবস্ত হয়ে গিয়েছিল। পরের দিন আমাদের আবার লেখালেখি করতে হয়েছে সাহায্য আপাতত বন্ধ রাখার জন্য।

এরপর তা নিয়ে মানব-বন্ধন হয়েছে, প্রেস কনফারেন্স হয়েছে, প্রতিবাদ হয়েছে। পাশাপাশি অনিক আর হক এর মতো কিছু হৃদয়বান মানুষের উদ্যোগে চলেছে আইনি লড়াই। আমরা খুব নিয়মিত খোঁজ না রাখতে পারলেও তারা লড়াইটা আন্তরিকভাবে চালিয়ে গেছে।

আজ সেই দীর্ঘ সংগ্রামের ফল এসেছে। মহামান্য আদালত রায় দিয়েছে ওই দুষ্কৃতিকারী কমিটি, মুতাওয়াল্লি এবং পাপের পার্টনার ডেভেলপার কোম্পানির বিরুদ্ধে। সেই সম্পত্তি আজ থেকে আবার এতিমখানার। আজ- অসচ্ছল শিক্ষক আর তার এতিম শিক্ষার্থীরা জয়ী হয়েছে কোটি টাকার প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির বিরুদ্ধে।

এখান থেকে শিখেছি অনেক কিছু:
– জীবনে এরকম ১টি ঘটনা দরকার এদেশের মানুষের প্রতি বিশ্বাস ফিরে আসার জন্য।
– জীবনে এরকম ১টি ঘটনা দরকার বিচার বিভাগের প্রতি বিশ্বাস ফিরে আসার জন্য।
– যার কেউ নাই, তার সামাজিক নেটওয়ার্ক আছে।
– বন্ধুরা সবাই মিলে ধরলে অসম্ভবকে সম্ভব করা সম্ভব।
– সত্যের জন্য নিঃস্বার্থ হয়ে লড়াই করলে জয় হবেই এমনকি খুব শক্তিশালী মিথ্যার বিরুদ্ধে হলেও।
– আরও অনেক কিছু হয়ত শিখেছি যা এখন লিখতে পারব না। হয়ত বয়সের সাথে সাথে রিয়েলাইজেশন হবে।

তবে মামলার এই রায়ে সব কিছু শেষ হয়ে যায়নি।
এরকম একটি ষড়যন্ত্র, এত দিনের হয়রানি, হুমকি-ধমকি শুধুমাত্র জমি ফেরত দেয়ায় শোধ হবে না। এখানে একটা বড় দুর্নীতি হয়েছে। সুধিজন, সাংবাদিক, রাজনীতিক সবার কাছে অনুরোধ- আপনরা এই বিষয়টি নিয়ে কথা বলুন। এটি এমন একটি বিষয় যেটা নিয়ে সংসদে আলোচনা হওয়া দরকার। এর সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের শাস্তি দেয়া দরকার। যেন আমাদের এতগুলো শিক্ষার পাশাপাশি তাদের অন্তত একটা শিক্ষা হয়- এতিমদের অধিকার নষ্ট করতে নাই। এই পাপের সাজা অত্যন্ত শক্ত।



আপনার মন্তব্য দিন