অভিজাত কারে বল, তারে আমি চিনি যে

অভিজাত শব্দটিতে আমার বিশ্বাস নাই। শ্রদ্ধা তো থাকার প্রশ্নই ওঠে না।

আমরা জেনেছি- অজিভাত মানে সঙ্গবন্ধ ডাকাতদল বা লুণ্ঠনকারী। অভিজাতরা বংশ পরস্পরায় লুণ্ঠনকে শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, আর চায় নিজেদেরকে শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে। তারা হবু (wanna be) অভিজাতদের এবং ন্যাংটা অনুগ্রহ প্রত্যাশীদের পালে (লালনপালন করে), তাদের ডাকাতির বৈধতা দেবার জন্য, তাদের লুণ্ঠনকে শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দেবার জন্য।

ঢাকা শহরে আসার আগে অভিজাত বিষয়টি কখনও অনুভব করিনি। এখানে আসার পরে তার নগ্ন অস্তিত্ব অনুভব শুরু করলাম প্রথম। মজার বিষয় হচ্ছে – সেই অনুভব আমাকে দু-চার পুরুষ ধরে তথাকথিত অভিজাতরা দেয় নি। দিয়েছে হবু (wanna be) অভিজাতরা। সূর্যের চেয়ে বালির উত্তাপ তো বেশি হবেই। সেই ওয়ানা-বি অভিজাতরা ডিফাইন করতে চায় – আমাদের ক্লাস, সোসাইটি, বা-ছাল। আমি শুধু হাসি !

এখানে এসে জানলাম -আমরা যেখান থেকে বড় হয়ে এসেছি, সেটাকে নাকি অভিজাত বলে দাবী করা যায়। অথচ সেই তথ্য ওখানে আমাকে কেউ শেখায়নি। আমাদের ধরে যে দু দশঘর মানুষ বসবাস করতো, আমার মুরুব্বীরা তাদের খেড়ুকাঠি (শরীরের অংশ) বলতো। তারা কখনও শেখাননি – খেড়ুকাঠিরা আমাদের প্রজা। বরং শিখিয়েছে খেড়ুকাঠিরা আমাদের শুভাকাঙ্ক্ষী। আমাদের ভালবাসার মানুষ। তাদের ভালমন্দ দেখা আমাদের দায়িত্ব।

ঢাকায় এসব অভিজাততন্ত্রের কুৎসিত রূপ দেখলাম। কয়েক পুরুষ ধরে তথাকথিত অভিজাত হয়ে ওঠাদের আচরণ যতটা কুৎসিত, তারচেয়ে অনেক বেশি কদাকার ওয়ানা-বি অভিজাতদের আচরণ।
– আমার দাদু ক্যাডিলাকে চড়তেন, নানা অমুক ছিলেন, অমুক তমুত ছিলেন। আমরা এত পুরুষ ধরে এই এই সম্পদ ভোগ করছি। আমি অমুক যায়গায় যাই না, অমুক যায়গায় খাই না, অমুক টাইপের লোকের সাথে মিশি না, আমার ওনার-তেনার সাথে সম্পর্ক। ইত্যাদি, ইত্যাদি।
তখন বেয়াড়া মুখ বলে ফেলে – তো? আমার দাদু কৃষক ছিলেন, ঘোড়ার গাড়িতে চড়তেন। তো?

একবার মনেমনে একটা সিদ্ধান্ত নিলাম এদের একটু খচে (screw-up) দেখা যাক। সেই কারণেই অনেকটা – সাত তারা হোটেলে থাকলাম বিরস মুখে, আবার বস্তিতে কাটালাম দুদিন গান শুনে আর রুটি-ঝোল খেয়ে। ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের ফার্স্ট ক্লাসে চড়লাম, আবার লাইনের বাসেও ঝুললাম। প্লাটিনাম ক্রেডিট কার্ড মুচড়ে ফেললাম, হাজার ডলারের শ্যাম্পেন ছিটিয়ে নষ্ট করলাম, অভিজাত রমণীকে দিয়ে আমার পানিয় বহন করালাম, তাদের দিয়ে জুতোর ফিতেও খোলালাম, চরম আগ্রহ তৈরি করার পরে আমার শয্যাসঙ্গী হবার আগ্রহকে প্রত্যাখ্যান করলাম। এসব করতে যে আমি খুব এনজয় করেছি, তা ঠিক না। করেছি শুধুমাত্র একটা অবৈধ প্রথাকে পায়ে পিষে ফেলার আনন্দ নিতে। আজ বুঝি সেটা করতে গিয়ে কিছু অন্যায় করেছি (যতটা না করলেও চলত)। এই পথে হয়ত কারও হৃদয় ভেঙ্গেছি, তাদের সবার কাছে ক্ষমা চাই। দেখলাম এটা এক ধরনের প্রতিযোগীটা, যার কোন শেষ নেই। এক ধরনের খুশির অন্বেষণ, যা কোনদিন পাওয়া যাবে না। অনন্ত, ক্লান্তিকর এক অর্থহীন রেস।

এসব কথার জন্য মনে করার দরকার নাই আমি রবিন হুড চিন্তার মানুষ। আমি প্রত্যেকের সম্পদ তৈরি করার অধিকারকে স্বীকৃতি দেই। সেটা ভোগ করাকে অবৈধ মনে করি না। আমি সহ্য করতে পারি না শুধুমাত্র এই “ব্লাডি এলিট” সাঁজা। নিজেকে অন্য সবার চেয়ে বংশ গুনে উচ্চতর সাঁজার প্রবণতা।

ভাইরে আমি এলিট স্বীকৃতি দেই জ্ঞানে। সেটা যিনি অর্জন করেছেন শুধুমাত্র তাকে। তার বংশধরকে না। এলিট স্বীকৃতি দেই আত্মত্যাগে। সেটা যিনি করেছেন শুধুমাত্র তাকে। তার উত্তরাধিকারীকে না।
আমি ডিজএপ্রভ করি এলিট তন্ত্রকে। আর শুধুই করুণা অনুভব করি ওয়ানা-বি এলিটদের প্রতি।

মন্তব্য করুন