কাগজ [ Kagoz ] – শচীন ভৌমিক

কাগজ [ Kagoz ] নিয়ে বসে মগজে যখন কিছু গজাচ্ছে না তখন কলকেয় একটা টান দিতেই মনে হল কাগজ নিয়েই গজগজ করা যাক খানিকটা,গজগজ না করতে পারি,গুজগুজ করা যাক। আমাদের জীবনে কাগজের স্থান অনেকটা জায়গা জুড়ে রয়েছে। খবলের জন্যও কাগজ রয়েছে, খাবারের জন্যেও কাগজ। প্রণম্য শাস্ত্র গীতা, রামায়ণ, মহাভারত, কোরান শরিফ, বাইবেলে রয়েছে কাগজ। আবার,মুখ মোছার জন্য টিসু পেপার থেকে পিছন মোছার জন্য টয়লেট পেপার পর্যন্ত সর্বত্র কাগজের জয়জয়কার। মোটা মোটা থিসিস লিখে এই কাগজ মারফতই অনেকে নিজেদের দিগ্‌ গজ প্রমাণিত করছেন।

কাগজ [ Kagoz ] – শচীন ভৌমিক - Sachin Bhowmick, Story Script Writer, 800px-Hindi Film Cinema by Mustafa Khargonewala, alias Camaal Mustafa Sikandera
Sachin Bhowmick [ শচীন ভৌমিক ]
কাগজ ধার্মিকদের জন্য শাস্ত্র হয়েছে,আবার বিপ্লবীদের জন্য অস্ত্র। কাগজ কথাটায় ‘গজ’ রয়েছে বলেই মনে হয় অনেক সাহিত্যিকরা হাতির মত মোটা মোটা উপন্যাস লিখেছেন। সত্যি বলতে আমাদের সভ্যতার অগ্রগতির সম্পূর্ণ ব্যাপারটাই কাগজী,একমাত্র নেবু ছাড়া কাগজী সব কিছুই শিক্ষা সংস্কৃতির ধারক। প্রেমপত্র,থেকে আত্মহত্যার পত্র (যদিও দুটো একই। প্রেম ও আত্মহত্যায় কোন তফাত নেই। মেয়ে ও মৃত্যুতে কি তফাত? ম্যারেজ আর মার্ডার মানে একই। বিবাহ যা,উদ্বাহও তাই। বাসর রাত মানেই শেষের রাত, ফুলশয্যাই শূলশয্যা, নারীকেই জাপানী ভাষায় সম্ভবত বলে ‘হারাকিরি’উম্যান’ মানে আসলে ‘আমেন’।) সর্বত্রই কাগজ।

একজন কাগজেই লেখে ‘আমি তোমাকে এত ভালবাসি যে তোমার জন্যই বেঁচে আছি।’ আবার আরেকজন কাগজেই লেখে-‘আমি তোমাকে এত ঘৃণা করি যে তোমার জন্যই মরতে যাচ্ছি’। বুঝুন কাণ্ড কাগজেই একজন ‘ভালবাসি’ করে মরছে, আরেকজন ‘ফাঁসি দিচ্ছি’ বলে বাঁচছে। তার মানে পেপার কারুর কাছে পাঁপরের মত কুড়মুড়ে, কারুর কাছে ‘পিপারে’র মত চিড়চিড়ে। এই কাগজেই বিপ্লবী সাহিত্য লিখে কেউ জেলে গেছেন, কেউ আবার জেলে গেছেন অশ্লীল সাহিত্য লিখে। দিগ্‌ গজ সাহিত্য বা দিগম্বর সাহিত্য-দু’ক্ষেত্রেই কাগজের প্রয়োজন। এই কাগজেই তিন নদীর সঙ্গমের ছবি ছাপা হয়েছে (প্রয়াগের সঙ্গমতীর্থের) আবার তিনজন নরনারীর একত্রে দৈহিক সঙ্গমের ছবিও ছাপা হয়েছে (কোপেনহেগেনের নগ্নসঙ্গতীর্থে)। আর কত বলব বলুন।

প্রফেসরের নোট থেকে উকীলের প্রোনোট এবং সর্বোপরি আমাদের জীবনে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় যে বস্তু সেই টাকার নোট, সব কিছু কাগজেই তৈরি। যে টাকা না থাকলে আপনি পাতলা রঙিন কাগজের ঘুড়ি কিনতে পারবেন না, পাতলা রঙিনশাড়ির ছুঁড়িও না। ভাবুন তাহলে কাগজ কি বস্তু। এ বস্তু ছাড়া মানুষের অবস্থান অসম্ভব। এ বস্তু না থাকলে আপনি আসলে উদ্বাস্তু। বুঝেছেন?

কাগজ নিয়ে আলোচনা করতে করতে একটা কৌতুকী মনে পড়ছে। কৌতুকীটা যুদ্ধ নিয়ে শুরু, কাগজ দিয়ে শেষ। শুনুন।
একজন নারীবিদ্বেষী স্বাস্থ্যবান যুবক খুবই দেশভক্ত। একদিন সে ঠিক করল সে যুদ্ধে সৈনিক হিসেবে নাম লেখাবে। বন্ধুরা তার সাহসকে প্রশংসা জানাল। সে বীরদর্পে রিক্রুটিং অফিসে নাম লেখাতে গেল। কিন্তু হঠাৎ কি ভেবে নাম না লিখিয়ে ফিরে এল। বন্ধুরা ঘিরে ধরল তাকে। বলল, কি রে, মরবার ভয়ে ফিরে এলি? এই তোর দেশভক্তি? এই তোর সাহস? ছেলেটি বলল, আরে না, সেজন্য নয়। মেয়েদের হাতে লাঞ্ছনা হতে হবে ভেবেই জয়েন করলাম না।

বন্ধুরা অবাক, সে কি রে, যুদ্ধে মেয়েরা আসে কোত্থেকে। ছেলেটি বলল, তবে শোন্‌। ধর সৈনিক দলে নাম লেখালাম। দেন দেয়ার আর টু পসিবিলিটিস্‌-হয় আমাকে পিছনে রাখবে, নয় ফ্রণ্টে পাঠাবে। পিছনে রেখে দিলে নো প্রবলেম। কিন্তু ফ্রণ্টে পাঠাল এগেন দেয়ার আর টু পসিবিলিটিস্‌। হয় যুদ্ধে আমি শত্রুকে মারব নয়তো শত্রু আমাকে মারবে। আমি শত্রুকে মারলে নো প্রবলেম, কিন্তু শত্রু আমাকে মারলে দেয়ার আর টু পসিবিলিটিস্‌। হয় আমি আহত হব অথবা নিহত হব। আহত হলে নো প্রবলেম কিন্তু নিহত হলে দেয়ার আর টু পসিবিলিটিস্‌। হয় ওরা আমাকে জ্বালিয়ে দেবে নয়তো ওরা আমায় করব দেবে। জ্বালিয়ে দিলে নো প্রবলেম্‌, কিন্তু কবর দিলে দেয়ার আর টু পসিবিলিটিস্‌।

ওরা পাথুরে জায়গায় কবর দেবে বা মাটি চাপা দিয়ে কবর দেবে। পাথর দিয়ে কবর দিলে নো প্রবলেম, কিন্তু মাটি চাপা দিয়ে কবর দিলে দেয়ার আর টু পসিবিলিটিস্‌। হয় আমার কবলের ওপর বড় বড় গাছ জন্মাবে, নয়তো ঘাস জন্মাবে। ঘাস জন্মালে নো প্রবলেম, কিন্তু বড় গাছ জন্মালে দেয়ার আর টু পসিবিলিটিস্‌ হয় সে গাছের কাঠ দিয়ে ফার্নিচার তৈরি হবে, নয়তো সে গাছের কাঠ থেকে কাগজ তৈরি হবে। ফার্নিচার তৈরি হলে নো প্রবলেম। কিন্তু কাগজ তৈরি হলে দেয়ার আর টু পসিবিলিটিস্‌। হয় সে কাগজ দামী ভাল কাগজ হবে, নয়তো সস্তা বাজে কাগজ তৈরি হবে।

দামী কাগজ হলে নো প্রবলেম, কিন্তু সস্তা বাজে কাগজ তৈরি হরে দেয়ার আর টু পসিবিলিটিস। হয় সে কাগজ দিয়ে খবলের কাগজ তৈরি হবে নয়তো সে কাগজ দিয়ে টয়লেট পেপার তৈরি হবে। খবলের কাগজ হলে নো প্রবলেম, কিন্তু টয়লেট পেপার হলে দেয়ার আর টু পসিবিলিটিস।

বন্ধুরা ভির্মি খায় আর কি! এরপরও কি দুটো পসিবিলিটিস্‌ হতে পারে ওরা ভেবে পাচ্ছিল না। কিন্তু ছেলেটা বলে চলল, বুঝলি না এখনো। দেখ, টয়লেট পেপার হয় পুরুষরা ব্যবহার করবে, নয়তো মেয়েরা ব্যবহার করবে। পুরুষরা ব্যবহার করলে আমার কোন আপত্তি নেই। কিন্তু মেয়েরা আমাকে তাদের বট্‌ম্‌ সাফ করার জন্য ব্যবহার করবে এ আমি কিছুতেই সহ্য করতে রাজী নই ভাই। সেইজন্যই আমি যুদ্ধে যেতে রাজী হলাম না। মেয়েদের পায়ুর জন্য আমি আমার আয়ু কখনই দেব না।
বন্ধুরা সবাই ঊর্ধ্বনেত্র হয়ে দিনের আকাশেই অজস্র তারা দেখতে পেয়েছিল কিনা আমার জানা নেই।

দেখলেন তো যুদ্ধ থেকে কাগজে নেমে আর অসাধারণ কৌতুকী!

কাগজ আজকের আবিষ্কার নয়! খুবই প্রাচীন ব্যাপার। এই বস্তুর আবিষ্কারক হল শচীন। মাফ করবেন, ওটা শচীন হবে না, হবে চীন। হ্যাঁ, চীনদেশ প্রথম আবিষ্কার করেছে এই কাগজ। চীনের এই মহৎ আবিষ্কার আজকাল কৌচিন থেকে ইন্দোচীন,যে কোন অর্বাচীন থেকে যে কোন শচীন, সবাই কলঙ্কিত করে চলেছে। ৫৯৪ সনে এইা কাগজ চীনদেশে জন্মগ্রহণ করেছে। মেঘে মেঘে অনেক বেলা হয়েছে তারপর। সেদিনের চায়না অনেক সেয়ানা হয়েছে। কাগজ মারফতই আমরা জানতে পারছি যে চায়না আজকাল অন্য কোন দেশের ময়না হতে চায় না।

এখন অনেকের কাছে সে গয়না, আর অনেকের কাছে হায়না।
কাগজ চীনী ব্যাপার কিন্তু কাগজ ছাপার যন্ত্র হল মার্কিনী আবিষ্কার। ১৮০৯ সনে জনৈক ডিকিনশন আমেরিকান নেশনকে এই মেশিন উপহার দেন। লোককলা থেকে হয়ে গেল যন্ত্রকলা। ব্যাস, শুরু হল যন্ত্রণা।

তবে এর আগেই যন্ত্র ছাড়া কাগজ মারফত ছাপার কাজ শুরু হয়ে গিয়েছিল। ছাপার যন্ত্র প্রথম তৈরি হয় জার্মানীতে। আবিষ্কারক গুটেনবার্গ। ১৩৯৪ সালের ব্যাপার। ছাপার কাজ ব্যবসায়িকভাবে শুরু হয় ১৪৪৮ সালে। সংবাদপত্র প্রথম ছাপা হয় ১৫৮২ সালে ইংলন্ডে। ধর্মীয় কাগজ। নিয়মিতভাবে নিউজ বুলেটিন প্রকাশিত হয়েছে ১৬৬২ সাল থেকে। এ’ও ইংলন্ডের কাজ। তার মানে চীন, জার্মানী, ইংলন্ড-,আমেরিকা সবার দান রয়েছে এই কাগজ ও মুদ্রণের ইতিহাসে। সারা বিশ্বে কাগজ সবচেয়ে বেশী ব্যবহার হয় সংবাদপত্র মুদ্রণে। মানে খবলের কাগজে। রাজনীতির জন্য সংবাদপত্র একান্ত প্রয়োজনীয়। মানে কনস্ট্রিটিউশন থেকে কনষ্টিপেশন সর্বত্র খবলের কাগজের দরকার।

গদীতে বসে কাগজ না পড়লে মাথা পরিষ্কার হয় না, আবার কমোডে বসে কাগজ না পড়লে কারুর পেট পরিষ্কার হয় না। ফ্রেশ মেয়েদের মত সকালে ফ্রেশ কাগজ পাওয়ার জন্য সবাইকার প্রচণ্ড- আগ্রহ থাকে। ফ্রেশনেস চলে গেলে মেয়েদের যেমন কদর কমে যায়, পড়া হয়ে গেলে কাগজেরও সেই একই অবস্থা। সকালের তাজা কাগজ যেন তাজা একটি নগ্ন সোমত্ত মেয়ে। লুফে নেয় সকলে। পরে কি হয়? কি আবার, নো চার্ম। খবর পড়া কাগজ আর কাপড় পরা মেয়ের কি আর আকর্ষণ বলুন। কাগজে আর মেয়েতে অনেক মিল কিন্তু।

দেখুন, কাগজের শেষের পাতায় থাকে স্পোর্টস্‌ সেকসন, মেয়েদেরও, ইয়ে, মানে, স্পোর্টস্‌ সেকসনটা শেষের দিকেই থাকে। নয় কি? এছাড়া খবলের কাগজ আগাগোড়া মিথ্যেয় ভরা,মেয়েরাও তাই। কাগজে খালি ফল্‌স, আর মেয়েদের খালি ফল্‌সি। কাগজের দিকে তাকালে প্রথমে চোখে পড়ে বিজ্ঞাপন,মেয়েরাও আজকাল শুধু বিজ্ঞাপন। একজন বলেছেন, Papers are for crying and lying মানে সংবাদপত্র শুধু নানা দুঃসংবাদে ভর্তি থাকে আর থাকে ঝুড়ি ঝুড়ি মিথ্যে। মেয়েরাও তাই। ওরা crying-এর জন্য বিখ্যাত, আর lying-এও ওদের জুড়ি নেই। সে lie মানে মিথ্যে কথাই হোক বা শোয়াই হোক। যে সব ছেলেরা lie বলা মেয়েদের লাই দেয় তারা জানে কত তাড়াতাড়ি ওরা বিছানায় lie down হয়ে যায়। এ ব্যাপারে সব মেয়েরই এক রা।

সে মালাইয়ের মত নরম মেয়েই হোক, বা ভিলাইয়ের মত শক্ত মেয়ে। দেখলেন তো কত মিল। নতুন কাগজ আর নতুন মেয়ে তো নেশা মশাই। সর্বনাশা নেশা বলা যায়। নেশা কেটে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সব সুরঞ্জনাই তখন আবর্জনা। সব পেপারই তখন টয়লেট পেপার। মেয়েদের সঙ্গে শুধু খবলের কাগজের তুলনা চলে বললে কম বলা হয় না। বইয়ের সঙ্গে তুলনা করেছেন অনেকে। বিশেষ করে ডিটেকটিভ নভেলের সঙ্গে। দেখুন এটাও কাগজেরই ফসল। রহস্য উপন্যাসের রহস্যের নিরসন করতে হলে কোথায় পাবেন সেটা? উপন্যাসের অন্তিম ভাগে।

মেয়েদেরও সব রহস্যের সমাধান থাকে অন্তিম ভাগেই। ডিটেকটিভ নভেলের শেষের দিকের পা খুলুন। আহা, বইয়ের আবার পা হয় না কি, আমি বলছিলাম পাতা খুলুন, দেখবেন সব রহস্যের সমাধান সেখানে,রহস্যময়ী নারীজাতির সঙ্গে হুবহু মিল রহস্যময় উপন্যাসের। ডিটেকটিভ গল্পে থাকে সাসপেন্স, সারপ্রাইজ সলিউশন। মেয়েদের মধ্যেও পাবেন এই ত্র্যহস্পর্শ। সেজন্যই আমার এক বন্ধুকে সর্বদা দেখি হয় সে বৌকে নিয়ে প্রমত্ত,নয় কোন হত্যা কাহিনী নিয়ে মত্ত। বৌ বা বই, একটা হলেই তার সময় কেটে যায়।

কাগজের বইয়ের সঙ্গে মেয়েদের তুলনা করলাম বলে অনেকে গোঁসা করবেন। কিন্তু গোঁসাই মশাই, বই কেন, ফুলের সঙ্গেও ওদের তুলনা চলে। কবিরা আকচারই করছে। Fool মাত্রই মেয়েদের ফুল বলছে, বিউটিফুল বলছে। সেটা কি ফুল জানেন? কাগজের ফুল। এখানেই মেয়েদের সঙ্গে কাগজের সম্পর্কে শেষ নয় কিন্তু। আজকাল মেয়েরা ফ্রক ছেড়ে শাড়ি ধরলেই সবাই বলে যে ওরা নাকি উড়তে থাকে। উড়বেই তো, কেননা এই উড্ডীয়মান ছুঁড়ি আর উড্ডীয়মান ঘুড়িতে কোন তফাত নেই। আর ঘুড়ি,বলা বাহুল্য,কাগজেরই।

কাগজ বলতে গেলে সূর্যের চাইতেও বেশী জনপ্রিয়। জিজ্ঞেস করুন কাউকে, সকালে উঠে সে সুর্য দেখেছে ক’বার? আম্‌তা আম্‌তা করবে। কিন্তু সকালে উঠে কাগজ দেখে প্রায় সবাই। আমাদের ভোর হয় সুর্যোদয়ে নয়, হকারোদয়ে। হকার এসে উদয় হলেই সকাল হয়। এক কবি নাকি লিখেছিলেন,

শুনিয়াছি সূর্য তুমি ওঠ খুব ভোরে,
চক্ষে কভু দেখি নাই থাকি ঘুমঘোরে।

–খাঁটি কথা, একটা কথা মানতেই হবে কাগজ যে আবিস্কার করেছিল সে বোধহয় জানতই না একসময়ে এই কাগজ ফ্রাংকেনস্টাইন হয়ে উঠবে। কাগজ আমাদের দাস না হয়ে ক্রমে প্রভু হয়ে উঠেছে। এই কাগজের পাতায় হিটলারের ‘ম্যাইনকামফ্‌’পড়েই জার্মানী যুবকরা নাৎসী হয়ে উঠেছিল, মার্কস-এঙ্গেলের বই পড়েই দেশ-বিদেশে হাজার হাজার মার্কসবাদী হয়ে উঠেছে। চীনের মাও সে তুঙের লাল বই পড়েই হয়ে উঠেছে মাওয়ালী বা মাওবাদী। কাগজের জ্ঞানের পরই এত হানাহানি। একদিকে অশ্লীল সাহিত্য ও ছবি দেখে দেশে শরীর নিয়ে ছানাছানি, অন্যদিকে রাজনৈতিক মতবাদের বই পড়ে দেশ নিয়ে হানাহানি।

আজকাল কজন আর দর্শন বা ধর্মসাহিত্য পড়তে চায়। একটা যুগ ছিল যখন বাঙালী ছেলেমাত্রই ‘বঙ্গদর্শন’-এর ভক্ত ছিল, কিন্তু এখন বঙ্গ দর্শন নয় বঙ্গললনা দর্শনেই বঙ্গসন্তানরা উৎসাহী। সাক্ষাতে না হলে সিনেমায়। সিনেমায় না হলে কাগজে।

কাগজ অনেক সময় বেশ বিপদে ফেলে থাকে। যেমন দেখুন ওই ঘটনাটা। ফার্স্ট ক্লাসে দুজন মাত্র যাত্রী। একটি ছেলে ও একটি মেয়ে। গাড়ি হাওড়া স্টেশন ছাড়তেই ছেলেটি আলাপ করার অভিপ্রায়ে মেয়েটিকে বলল, আপনি আমার কাগজটা দেখতে চান?
কনভেন্টে পড়া দিল্লীর বঙ্গললনা চমকে উঠল। বলল, যদি সে চেষ্টা করেন তাহলে গাড়ি থামিয়ে আমি পুলিশ ডাকব।
বুঝুন ঠ্যালা, কাগজ পড়তে বলল ছেলেটি আর মেয়েটি কি উল্টো বুঝল।

আমার এক বন্ধু একদিন আমাকে একটি মেয়ের কাছে চড় খাওয়ার গল্প বলেছিল। সেটাও কাগজ-ঘটিত। সংবাদপত্র নয়, বই। সে তার ক্লাস ফ্রেণ্ড মেয়েটিকে গিয়ে বলেছিল, আপনার বুকটা দেখাবেন একটু।
সঙ্গে সঙ্গে রামচড়। বন্ধু বলল,গালে পাঁচআঙুলের দাগ বসে গিয়েছিল।
আমি বললাম, গাধা কোথাকার। বুকটা না বলে বইটার নাম নিয়ে দেখতে চাইলি না কেন? তাতে মেয়েটা ভুল বুঝত না নিশ্চয়ই। বরং বইটার নাম ‘শেরশায়রী’ বলতে পারত, আপনার ‘শেরশায়রীটা দেখাবেন একটু?
বন্ধু বলল, এভাবে বললে এতক্ষণে আমি জেলে থাকতাম।
প্রশ্ন করলাম, কেন?
বন্ধু, বইটার নাম ‘শেরশায়রী’ ছিল না।
প্রশ্ন করলাম কি ছিল?
বন্ধু বলল, বিবর।

এরপর,বলা বাহুল্য আমার বাক্যস্ফূর্তি হয় নি। কাগজ-এর বিপদে ফেলার ক্ষমতা দেখবেন? সেজন্য মাঝে মাঝে ভাবি এমন জায়গায় পালিয়ে যাওয়া উচিত যেখানে কোন কাগজ থাকবে না, বই থাকবে না, খাতা পত্র কালি-কলম কিছু না। কাগজহীন সেই শান্তির পৃথিবীর ঠিকানা জানা আছে কারুর? থাকলে জানাবেন। যতদিন সেই বিনকাগুজে দেশে যেতে না পারছি ততদিন অবশ্য কাগজ ছাড়া বাঁচা যাবে না। অন্তত সরকারী প্রেসে ছাপা দিস্তে দিস্তে কড়কড়ে টাকার নোট তো চাইই। এইা ধরনের কাগজ যদি গজের ওজনে পাই তবে আর কিছু চাইনে।

সত্যি বলছি। বিদ্যের কুমড়ো হওয়ার চাইতে টাকার কুমীর হওয়া ঢের ভাল মশাই। তখন কাগজে এসব হিজিবিজি লিখে আপনাদের জ্বালাব না। বচন ফকিরের হাত থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় আপনাদের বলে দিলাম। ফকিরের গাঁজা থেকে বাঁচার ফিকির বলে দিলাম। আজই খুলুন ‘বচন ফকির নিধন ফান্ড’। .আমার হানি চান তো মানি দিন। বচন ফকিরকে খারিজ করার একমাত্র উপায় তাকে রিচ করে দেওয়া। ভেবে দেখুন। মুক্তিমন্ত্র দিয়ে দিয়েছি, দেরী করবেন না।

[ কাগজ [ Kagoz ] – শচীন ভৌমিক ]

শচীন ভৌমিক কে আরও পড়ুন:

মন্তব্য করুন