চলে গেলেন আধুনিক সিঙ্গাপুরের জনক লি কুয়ানো

রাজনীতিতে যাদের আসক্তি আছে, তারা হয়ত সিঙ্গাপুরের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ানো কে চিনবেন। কেউ চেনেন তাকে আধুনিক উন্নত সিঙ্গাপুরের জনক হিসেবে। আবার কেউ চেনেন তাকে একনায়ক, ভোট ডাকাত, মিডিয়া হত্যাকারী হিসেবে। যে যাই ভাবুন, আন্তর্জাতিক রাজনীতি তিনি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি! শুধুমাত্র অবকাঠামো উন্নয়ন নয়, ভৌগলীক অবস্থানকে সর্বচ্চ অর্থনৈতিক ব্যাবহার, মেধা সংগ্রহের রাজনীতি, খোলাবাজারের অর্থনীতির সুবিধা নেয়া, আর্থিক সুবিধা বাড়িয়ে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ – এরকম বিভিন্ন বিষয়ে তার চিন্তা এবং সিদ্ধান্ত গবেষণার বিষয়। সেই কিংবদন্তি আজ ইহলোক ছেড়ে চলে গেলেন।

অর্থনৈতিক উন্নয়নে সিঙ্গাপুরের উত্থান রূপকথার চেয়ে কম নয়। এ দেশ নিজস্ব প্রাকৃতিক সম্পদ বলতে কিছুই নেই। তেল-গ্যাস-হীরা-সোনার খনি তো দুরের কথা খাবারের জন্য সুপেয় পানিটাও আমদানি করতে হয় প্রতিবেশী দেশ মালয়েশিয়া থেকে। কি ভাবে ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটি থেকে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ মাথাপিছু আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে ৫৫ লাখ মানুষের এই দেশ? কার ছোঁয়ায় বিস্ময়কর এই অগ্রগতি? ৭১৬ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের নগররাষ্ট্রটির এই বিস্ময়কর উন্নয়নের শ্রেয় সেই দেশের নাগরিকেরা একজন ব্যক্তিকেই দিয়ে থাকে তিনি হচ্ছেন আধুনিক সিঙ্গাপুরের জনক ও দেশটির প্রথম প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ (Lee Kuan Yew)। তিনি ৩১ বছর ধরে দেশটির নেতৃত্ব দিয়েছেন। বর্তমানে তাঁর বড় ছেলে লি সিয়েন লং সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী। সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আজ (সোমবার, ২৩ মার্চ ২০১৫) ভোরে মৃত্যু হয় লি কুয়ানের। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে গত ৫ ফেব্রুয়ারি ওই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি।

‘হ্যারি’ লি নামে পরিচিত লি কুয়ানো জন্মগ্রহণ করেন ১৯২৩ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর। তার পূর্বপুরুষ চীন থেকে এই দ্বীপে এসেছিলেন তিন পুরুষ আগে। ১৯৫৪ সালে পিপলস অ্যাকশন পার্টির (পিএপি) গোড়াপত্তন করে ৪০ বছর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন লি কুয়ান। সেই পিএপি এখনো সিঙ্গাপুর শাসন করছে, পার্লামেন্টে বিরোধী দলের সদস্য আছেন মাত্র ছয়জন। এ কারণে, অনেক বিদেশী পর্যবেক্ষক সিঙ্গাপুরকে কার্যত একটি এক-দলীয় শাসনব্যবস্থা হিসেবে গণ্য করে থাকেন। তবে সিঙ্গাপুরের সরকার সবসময়েই একটি স্বচ্ছ, দুর্নীতিমুক্ত সরকার হিসেবে বহির্বিশ্বে পরিচিত। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের মতে সিঙ্গাপুর বহুদিন ধরেই এশিয়ার সবচেয়ে দুর্নীতিমুক্ত দেশ। ১৯৫৯ সালে তিনি তৎকালীন স্বায়ত্তশাসিত সিঙ্গাপুরের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার পর ১৯৬৩ সালে মালয়েশিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়। ৯ আগস্ট ১৯৬৫ সালে মালয়েশিয়ার সঙ্গ ছেড়ে পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে যাত্রা শুরু করে সিঙ্গাপুর। দারিদ্র্য ও অপরাধে জর্জরিত এই বন্দর শহরটি পরের তিন দশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যায় লি কুয়ানের নেতৃত্বে। বিশ্বে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করার পর ১৯৯০ সালে ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ান লি কুয়ান। তবে ২০১১ সাল পর্যন্ত তিনি মন্ত্রীসভার সদস্য ছিলেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ছিলেন পার্লামেন্টের সদস্য।

এই তিন দশকে সিঙ্গাপুরকে ভগ্ন অর্থনৈতিক অবস্থা থেকে তুলে এশিয়ার অন্যতম ধনী দেশে পরিণত করেন তিনি। দেশটির এই সাফল্যের জন্য বিশ্বে তিনি যেমন প্রশংসিত হয়েছেন, তেমনি কঠোর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা এবং বিরোধী মতের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগে হয়েছেন সমালোচিত। লি কুয়ানের সময়ে সিঙ্গাপুরে বাজারমুখী অর্থনীতির প্রসার ঘটালেও সংবাদপত্র ও ভিন্ন মতাবলম্বীদের কঠোর নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা হয়, যার ধারাবাহিকতা এখনো চলছে। এ কারণে আধুনিক সিঙ্গাপুরের স্বপ্নদ্রষ্টা হয়েও সমালোচকদের কাছে তিনি ছিলেন একজন স্বৈরশাসক।

বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতায় থাকাকালে তিনি যেসব প্রতিষ্ঠান দাঁড় করিয়ে গেছেন সেগুলোই দেশের সমৃদ্ধির ধারাবাহিকতা ধরে রাখবে বলে তারা মনে করেন। সিঙ্গাপুরে তিনি অত্যন্ত গভীর শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব।

সিঙ্গাপুরের ভবিষ্যৎ নিয়ে তার একটি সাক্ষাৎকার আগ্রহীদের জন্য যুক্ত করলাম :https://www.youtube.com/watch?v=ihiE4oGyYlQ

মন্তব্য করুন