ঝিনুক – শচীন ভৌমিক [ প্রিয় গল্প সংগ্রহ ] Jhinuk – Sachin Bhowmick

ঝিনুক [ Jhinuk ] : বন্ধুর বিয়েতে দিনকয়েক আগে জব্বলপুরে গিয়েছিলাম। বন্ধুটি সেখানে এক কারখানার একজন জাঁদরেল চাকুরে। ঝকঝকে কোয়ার্টার নিয়ে থাকেন। কলোনীর গতানুগতিক একঘেয়ে অসার জীবনের মধ্যেও বন্ধুটি কিন্তু কাব্যের সন্ধান ঠিক পেয়ে গিয়েছিলেন। ফ্যাক্টরীরই চাকুরে একটি মেয়ের সঙ্গে তাঁর প্রণয় ও শেষ পর্যন্ত বিবাহ। কিন্তু আমার গল্প এদের নিয়ে নয়।

তবে এরাই আমার সেতু। নইলে সে বিয়ের পার্টিতে সন্দীপ ভাদুড়ীর সঙ্গে আমার আলাপ হওয়ার সুযোগ ঘটত না। বিয়ের পার্টিতে একা সমস্ত আসর সরগরম করে রেখেছিলেন। এই ভাদুড়ী। কলোনীর কেন্দ্রমণি তিনি। দু’মিনিটে ভদ্রলোক আমাদের সঙ্গে প্রচুর ভাব জমিয়ে ফেললেন। প্রচুর খেলেন,, হোহো করে প্রচণ্ড হাসলেন, আর লম্বা টানে এক একবারে আধ ইঞ্চিটাক পুড়িয়ে বর্মা চুরুটের ধোঁয়া ওড়ালেন আকাশে। তারপর হঠাৎ এক সময়,–আমার কাজ আছে, চলি,–বলে মাথায় টুপী চড়িয়ে ওভার-কোটের কলার দুটো উঁচু করে লম্বা লম্বা পা ফেলে চলে গেলেন রাস্তা ধরে।

হঠাৎ ওরকম আকস্মিক চলে যাওয়ায় সমস্ত আসরটাই কেমন মিইয়ে গেল। তিন হাজারী অফিসারের স্ত্রীর শাড়িতে বেশী লোকের চোখ আর স্বাদ খুঁজে পেল না, দু’হাজারী দুটি পাঞ্জাবী মেয়ের চেষ্টাকৃত কলহাস্যেও নয়, এমন কি কলোনীর সুন্দরী শ্রেষ্ঠা ঊষা ডেকার হাত, সুধাংশু চৌধুরীর হাতের মুঠোয় মধ্যে ধরে থাকা প্রকাশ্য নাটকীয় দৃশ্যটাতেও কারুর তেমন উৎসাহ দেখা গেল না।ঝিনুক - শচীন ভৌমিক [ প্রিয় গল্প সংগ্রহ ] Jhinuk - Sachin Bhowmick

বুঝলাম, সন্দীপ ভাদুড়ীই কলোনীর আসল লোক। উনিই এই তারার রাজ্যে শুকতারা।

[ ঝিনুক – শচীন ভৌমিক [ প্রিয় গল্প সংগ্রহ ] Jhinuk – Sachin Bhowmick ]

পরদিন সন্দীপবাবু দুপুরে আমাকে তাঁর বাসায় খাবার জন্যে একটা চিঠি দিয়ে নেমন্তন্ন করে পাঠালেন। আমার বন্ধুটি হেসে বললেন—নাও ভাদুড়ীর সঙ্গে আলাপ করে এসো ভালো করে। তোমরা লেখক মানুষ, এরকম টাইপ চরিত্র তোমাদের স্বভাবতঃই টানবে। প্রচুর দেশ ঘুরেছে, প্রচুর অভিজ্ঞতা লোকটার। লোকটা সত্যি আমাদের কাছে একটা মিস্ট্রি।
দরজা খুলেই ইংরেজী কেতায় সাদর অভ্যর্থনায় মুখর হয়ে উঠেলেন ভাদুড়ী। চেয়ার টেনে বসতেই বললেন,–কিছু মনে করবেন না, নেমন্তন্ন করেছি বটে, তবে মেয়েদের হাতের রান্না খাওয়াতে পারলাম না। স্ত্রী বাপের বাড়ি, তাই খাবার আসবে ক্যান্টিন থেকে। আমি এখন একা।

–তাতে কি,–আমি প্রসঙ্গটা এড়াতে চাইলাম,–খাওয়াটা তো আসল নয়, আপনার সঙ্গে আলাপ পরিচয় হচ্ছে, এটাও কি আমার কম লাভ।
সিগারেট ধরিয়ে একবার ঘরটায় চোখ বুলিয়ে নিলাম। একদিকে দেয়াল জোড়া একটা মস্ত পোর্ট্রেট স্টাডি, অন্যদিকের দেয়ালে গুটিকয় ওয়াটার কালার ল্যাণ্ডস্কেপ্। একটা ক্রেয়নের কাজও রয়েছে।

–বাড়িতে বুঝি কেউ ছবি আঁকেন? প্রশ্নটা না করে থাকতে পারলাম না।

–হ্যাঁ, এ অধমই আঁকে।

–আপনার আঁকা? আপনার দেখছি অনেক গুণ?

–দোষের খবর তো রাখেন না, দোষ তার চেয়েও বেশী।
মাঝের পোর্ট্রে টটার দিকে আঙুল দেখিয়ে বললাম,–কিছু যদি মনে না করেন, প্রশ্ন করতে পারি কি এটা কার ছবি? সম্ভবত আপনার স্ত্রীর?

–যদি বলি, না, এ আমার কেউ নয়, অথচ কারুর চেয়ে কমও নয়? মিটমিট করে একটু হেসে নিয়ে বললেন ভাদুড়ী,–সাহিত্যিক মানুষ গল্পের গন্ধ পেয়ে খুব উৎসাহিত বোধ করছেন নিশ্চয়ই?
হেসে বললাম,–স্বাভাবিক। তবে সব কৌতুহলের কি নিবৃত্তি করা চলে।

[ ঝিনুক – শচীন ভৌমিক [ প্রিয় গল্প সংগ্রহ ] Jhinuk – Sachin Bhowmick ]

–না, তা চলে না, তবে এ কৌতুহল আমি আপনার মেটাবো। আসুন তার আগে খাওয়ার পাটটা চুকিয়ে ফেলি।
ভাদুড়ী চাকরকে ডেকে টেবিল সাজাতে বললেন।
খাওয়ার পর আমার সিগারেট আর ভাদুড়ীর চুরুটের ধোঁয়া যখন ঘরের মাঘ-ম্লান রৌদ্রের লালচে আলোর বল্লমগুলোকে নীলচে করে তুলেছে, তখন ভরাট গলায় বলতে শুরু করলেন ভাদুড়ী।

–তখন আমি আবাদানে। সেখানকার এক কারখানায় কাজ করি। মাঝে মাঝে এখানে ওখানে বসরা, বাগদাদ ঘুরে বেড়াই। ভালো পয়সা আয় করি, সুখেই আছি। আবাদানে বাঙালী যে খুব বেশী ছিল তা নয়, তবে ইণ্ডিয়ান ছিল প্রচুর। বিকেলে আমাদের মেসে আড্ডা হ’ত জোর, পলিটিক্স থেকে হলিউড সবই ছিল আলোচনার বিষয়। ওখানে মাঝে মাঝে এক্সকারসনের প্রোগ্রাম ঠিক হত।
একবার আমরা ঠিক করলাম বাহেরিন যাবো। সবসুদ্ধু আমরা চারজন। আমি, রঙ্গস্বামী বলে এক মাদ্রাজী, কার্লেকর নামে এক বম্বেওয়ালা আর শান্তারাম নামে এম মারাঠী। আমরা ভারতবর্ষের চারজন চার প্রদেশের স্পেসিমেন রওনা হলাম বাহেরিন। স্টিমার ঘাটের কাছে ভেড়ার আগেই দেখি বেশ কয়েকজন ভারতীয় দাঁড়িয়ে আছেন ঘাটে। আমরা নামতে না না্মতেই এসে আমাদের ছেঁকে ধরলেন। সবারই এক প্রশ্ন,–হোয়াইটস ইওর নেম? ইউ আর ফ্রম—

–ম্যাড্রাস। বলতে না বলতেই দুইজন মাদ্রাজী টেনে নিয়ে গেল রঙ্গস্বামীকে।

–বোম্বে। কথাটা না বেরুতেই প্রায় চ্যাংদোলা করে নিয়ে গেল কার্লেকরকে।

মারাঠীরা তো শান্তারামকে পেয়ে কোরাস গাইতে শুরু করে দিল। আর আমি বাঙালী বলার সঙ্গে সঙ্গে যেন মেছোহাট বসে গেল সেখানে।

[ ঝিনুক – শচীন ভৌমিক [ প্রিয় গল্প সংগ্রহ ] Jhinuk – Sachin Bhowmick ]

এ বলে না আমার বাসায় চলুন আর ও বলে, না আমার ওখানে। চার মাস পরে নাকি এখানে এই প্রথম আরেকজন বাঙালী নামল। সুতরাং এ বাঙালীকে কেউ ছাড়তে রাজি নয়। টানা-হ্যাঁচড়ায় আমার প্রাণ ওষ্ঠাগত। শেষ পর্যন্ত জিতে গেল একজন মাছ দিয়ে। অর্থাৎ তার বাসায় আজ মাছ আনা হয়েছে, সুতরাং তারই জিৎ। ওসব জায়গায় সবচেয়ে আক্রা হচ্ছে মাছ। মাছের বাজীতে হেরে গিয়ে আর সবার মুখ চুন। তবে প্রত্যেকের অনুরোধ রইল অন্তত একদিন, নিদেনপক্ষে একবেলা যেন আমি তাদের ওখানে খাই।

ভদ্রলোকের নাম ভগীরথ চক্রবর্তী। আমি বাঙালী, তায় আবার বামুন দেখে তার আনন্দ আর ধরে না। হৈহৈ করে আমাকে নিয়ে তার বাড়িতে হাজির। দরজা ধরে সে কি ধাক্কা আর চীৎকার, –কই গো এদিকে এসো। দেখো আজ কাকে ধরে নিয়ে এসেছি।

দরজা খুলে একটি অল্পবয়সী সুশ্রী বৌ আমাকে দেখে মাথায় ঘোমটা তোলার একটা ব্যর্থ প্রয়াস করলে।

তাই দেখে চক্রবর্তী মহা খাপ্পা,–ও, আবার কোন চং। ঘোমটা দিয়েই যদি থাকবে, তবে আর ভদ্র লোককে আনা কেন? এতদিন বাদে একজন বাঙালী এনেছি আর উনি ঘোমটা দিয়ে লজ্জাবতী হলেন।

–না না সে কি,–খুশী ঝলমলে মুখে বলে বৌটি,–আসুন আসুন, এ ঘরে আসুন। ইস, কতদিন বাদে যে বাঙালীর মুখ দেখছি। বৌটি এমনভাবে তাকিয়ে রইল আমার দিকে যে, আমার রীতিমতো অস্বস্তি লাগতে লাগল।
চক্রবর্তীর চেয়ে অনেক ছোট তার বৌ। দেখে মনে হয় দ্বিতীয় পক্ষ। পরে অবিশ্যি জানলাম আমার অনুমান মিথ্যে হয় নি। প্রথম পক্ষ মারা যাওয়ার পর এক মাস কাটিয়েই চক্রবর্তী দেশে গিয়ে বিয়ে করে ফিরে এসেছেন প্রায় আট মাস। বৌটির বয়েস অল্প, মিষ্টি চেহারা, সুন্দর স্বভাব। মনে হয় চক্রবর্তীর মতো ঐরকম মাজবয়সী টেকো-মাথা ভদ্রলোক একে বিয়ে করে অন্যায় করেছেন।

[ ঝিনুক – শচীন ভৌমিক [ প্রিয় গল্প সংগ্রহ ] Jhinuk – Sachin Bhowmick ]

আরো লক্ষ্য করে দেখলাম, যতক্ষণ চক্রবর্তীর কাছে কাছে থাকে, মেয়েটি খুব ভয়ে ভয়ে চলাফেরা করে। হাসিটাও কেমন জোর করা, কথাগুলো জড়ানো। যেই বক্রবর্তী অফিসে চলে গেলেন, হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো যেন তার বৌ। ঘোমটা নয়, মুখের অস্বাচ্ছন্দ্যের ভাবটা যেন খসে গেল এইবার। সারা মুখে আলো ঝলসে উঠল।

চেয়ার টেনে দুজনে মুখোমুখী বসে যতোরাজ্যের গল্প। বাপের বাড়ির কথা, দেশ-গাঁয়ের কথা, কবে কোথায় ভূত দেখে ভয় পেয়েছিল তার গল্প—পিসিমাকে একবার কি করে ওরা ভাইবোনে মিলে ভূত সেজে ভয় দেখিয়েছিল, জামাইবাবুকে কেমন এপ্রিল ফুল করে জব্দ করেছিল ইত্যাদি। ঘুমে চোখ জড়িয়ে এলে বলত, উঁহু ঘুমুলে চলবে না। যান, চোখে জল দিয়ে আসুন। এতদিন বাদে একজন কথা কওয়ার লোক পেয়েছি, ঘুমটুম এসব ফাঁকি শুনব কেন। প্রাণের সুখে কথা বলি নি। তারপর আপনি চলে গেলে আবার তো সেই বোবা হয়ে থাকা্ উঃ, অসহ্য। প্রাণ বেরিয়ে যায় এরকম মরুভূমিতে পড়ে থাকতে। ভাইবোনদের মধ্যে জানেন আমি ছিলাম সবচেয়ে বেশী কথা বলিয়ে। সারাদিন বকবক করতাম, আর তার ভাগ্যেই কিনা এই শাস্তি।

হেসে বললাম,–কেন চক্রবর্তী? আর এ ছাড়াও এখানে আরো কয়েকঘর বাঙালী রয়েছেন, তাদের সঙ্গে কথা বলেটলেও তো সময় কাটাতে পারেন?

হঠাৎ মেয়েটির সমস্ত মুখ ম্লান হয়ে গেল। বলল,–না, চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু ওরা কেউ আমার সঙ্গে প্রাণ খুলে কথা বলতে চায় না। কেন জানেন? আমার আগের দিদি নাকি খুব ভালো লোক ছিলেন। সবাই তাঁকে ভালোবাসত খুব। আমি গেলে তাই ওদের সবার আগে মনে পড়ে যায় আগের দিদির গল্প। ইনিয়েবিনিয়ে আমাকে ওরা সে সব গল্প শোনাবে। আর গল্প বলার সময় এমন-ভাবে তাকায় যেন আগের দিদিকে আমিই মেরে ফেলে তার জায়গা জুড়ে বসেছি। আচ্ছা বলতে পারেন আগের দিদি ভালো ছিল সেটা কি আমার দোষ?

[ ঝিনুক – শচীন ভৌমিক [ প্রিয় গল্প সংগ্রহ ] Jhinuk – Sachin Bhowmick ]

কান্নায় ভেঙে আসে বৌটির গলা। তারপর যেন সাপের মতো ফণা তুলে ওঠে সে। জলভেজা চোখ দুটোতে আগুন ঠিকরে পড়ে—কেন কেন এই বুড়ো আমায় বিয়ে করে আনল? কেন এই বুড়ো প্রথম বৌয়ের সঙ্গে সঙ্গেই গিয়ে চিতেয় উঠলো না? আর বিয়ে যদি করবেই তবে রাজ্যের মেয়ে থাকতে আমাকে বিয়ে করতে গেল কেন? কেন? কি অপরাধ করেছি আমি যে আমার এই শাস্তি? ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নায় লুটিয়ে পড়ল বৌটি। তারপর দৌড়ে সে পাশের ঘরে চলে গেল। তার অভিশপ্ত জীবনের কান্নার লজ্জা আজ সে কোথায় লুকোবে?

তারপর দু’দিন এবেলা এ-বাড়িতে ওবেলা ও-বাড়িতে করে কাটালাম আমি। আর লক্ষ্য করলাম কথায় কথায় চক্রবর্তৗর কথা উঠলেই সবাই তার প্রথম পক্ষের বৌয়ের গুণগানেই মুখর, একবারও কেউ এ বৌয়ের কথা তুললে না। এই দু’দিন বৌটি বেশ হাসিখুশি-ভাবে থাকল। ইচ্ছে করে আমি আর ও প্রসঙ্গে কথা তুলি না। যেন সে সব হঠাৎ ভূতে পাওয়া গল্প, দুঃস্বপ্ন মাত্র। কিন্তু না, আমি বুঝি। আমি বুঝি ওর হাসির তলায় কোন বেদনা লুকিয়ে আছে, চোখের জলের নিচে কোন বিদ্যুৎ। মাঝে মাঝে মনে হত আমার, আজ যদি জীবন্ত হয়ে চক্রবর্তীর প্রথম পক্ষ সামনে এসে দাঁড়ায়, ও বুঝি বাঘিনীর মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলবে। তার জন্যেই স্বামীকে তার অপরিমেয় ঘৃণা, প্রতিবেশীদের সাহচর্য দুঃসহ।

যেদিন সন্ধ্যাবেলা আমার ফেরবার কথা, সেদিনেই এক কাণ্ড করে বসল বৌটি। দুপুরে হঠাৎ দু’হাতে আমার একটা হাত চেপে ধরে আকুলকণ্ঠে বলল,–আপনি আমার ধর্মভাই, আপনি আমাকে বাঁচান।
মুহূর্তে সমস্ত শরীর আমার আড়ষ্ট হয়ে উঠল। বললাম,–আমি আর আপনার কি করতে পারি বলুন?

[ ঝিনুক – শচীন ভৌমিক [ প্রিয় গল্প সংগ্রহ ] Jhinuk – Sachin Bhowmick ]

ষড়যন্ত্র-চাপা গলায় বলল বৌটি,–আপনি আমাকে এখান থেকে নিয়ে চলুন। আমি এখান থেকে পালিয়ে যাবো। এখানে থাকলে আর বাঁচব না, দম বন্ধ হয়ে মারা যাব। এখানে কেউ আমার আপন নয়, কেউ নয়। সেকি ভয়ের আকুল কণ্ঠ। সে মুখ যদি দেখতেন, সে গলা যদি আপনি শুনতেন। কিছুতেই তা সহ্য করা যায় না।

ছাইয়ের মতো সাদা সে মুখ। কান্নায় ভেজা গলা। এখানে থাকতে আমার ভয় করে, ভয়ানক ভয় করে। আমার স্বামীকে আমি একটুও ভালবাসি না। তার জন্যেই আমার এই দুঃখ, এই অদৃষ্ট। আমার এ দুর্ভাগ্যের জন্যে ওই দায়ী। প্রথম বৌকে খেয়েছে, আমাকেও খাবে।

–ছিঃ ছিঃ এসব কি বলছেন আপনি।–আমি বাধা দেবার চেষ্টা করি।

–ঠিক বলছি।–রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলে বলে বৌটি,–জানেন, যখন একা থাকি তখন মনে হয় একদিন ঐ প্রথম পক্ষের দিদি এসে আমায় গলা টিপে মেরে ফেলবে। ঘুমুতে পর্যন্ত পারি না। মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয় গলায় দড়ি দিতে। আত্মহত্যা করতে ইচ্ছে হয় আমার। অসহ্য এভাবে বেঁচে থাকা। এ ভার আমি আর বইতে পারছি না।

–না না, ওকি সব যা-তা ভাবছেন। ওসব ভাবাও পাপ।

–তবে আমাকে নিয়ে চলুন। নিয়ে চলুন এই মরুভূমির বাইরে। আপনি আমার ভাই, বোনের জন্যে এটুকু আপনি করুন। আমার হাতে জমানো কিছু টাকা আছে। এ’ছাড়া গয়না আছে অনেক। কোলকাতা পর্যন্ত পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা করলেই হয়ে যাবে। সেখানে আমার বড়দির বাসা আছে। তারপর আর আপনার দায়িত্ব নেই।

–সে হয় না দিদি—কাঁপা কান্নাভরা গলায় বললাম আমি,–মন শক্ত করে এখানেই থাকুন। স্বামীর সঙ্গে মনের মিল করে-

–থাক।–মুহূর্তে সোজা হয়ে উঠে দাঁড়ালো বৌটি,–কোন উপদেশ আমি শুনতে চাই না।
অগ্নিবর্ষী দৃষ্টিতে একবার আমার দিকে তাকিয়ে দুপদাপ পা ফেলে চলে গেল।

[ ঝিনুক – শচীন ভৌমিক [ প্রিয় গল্প সংগ্রহ ] Jhinuk – Sachin Bhowmick ]

বিকেলে বেরিয়ে যাবার সময় একবার শুধু দেখা দিয়েছিল ও। স্বামীর পেছনে আধো-ঘোমটায় ঢেকে দাঁড়িয়েছিল চুপচাপ। নিস্পন্দ প্রতিমার মতো। একেবারের বেশী দু’বার আর চোখ তুলে তাকাতে পারি নি ওর দিকে।
চক্রবর্তীর অজস্র লৌকিকতা শুনতে শুনতে কখন যে ষ্টিমারে উঠে বসেছিলাম খেয়াল নেই। ষ্টিমারের ভোঁ যখন বাজলো তখন বুকের ভেতরটা যেন মোচড়া দিয়ে উঠল। ষ্টিমারের ভোঁ ত নয়, এ যেন একটি করুণ অভিশপ্ত বধূর বুক ফাটা চিৎকার।–

সিগারটা নিভে গিয়েছিল ভাদুড়ী দেশলাইটা খুঁজে নিয়ে তাতে ফের অগ্নিসংযোগ করলেন। মাঘ মাসের শীতকাতুরে দিন ফুরিয়ে এসেছে এরই মধ্যে। ঘরে ধুপছায়া অন্ধকার। শুধু সিগারেটের টিনটা ভাদুড়ী নিঃশব্দে বাড়িয়ে দিলেন আমার দিকে। আমি কলের পুতুলের মতো একটা তুলে ঠোঁটে গুঁজলাম।

তারপর আর কি। তারপর আবাদানে চলে এলাম আমি। হাজারো কাজের ঝামেলায় ডুবে গেলাম। সেই করুণ বধূটির ম্লান মুখ ক্রমে হারিয়ে গেল স্মৃতির কোঠা থেকে। প্রায় ভুলেই গেলাম বাহেরিনে কাটানো তুচ্ছ কয়টি দিনের কথা।

প্রায় দু’বছর বাদে হঠাৎ অফিসের কাজে আমার বাহেরিন যাওয়ার কথা উঠল। নামটা মনে পড়তেই পুরনো কয়েকটা ছেঁড়া দিন কুয়াশা কেটে যাওয়া দিগন্তের মতো জেগে উঠল মনের আকাশে। দু’বছর বাদে গিয়ে ফের হাজির হলাম সেখানে।

[ ঝিনুক – শচীন ভৌমিক [ প্রিয় গল্প সংগ্রহ ] Jhinuk – Sachin Bhowmick ]

–গিয়েছিলেন? তারপর? আমার উৎকণ্ঠা গলার আওয়াজে উদ্বেল হয়ে ওঠে।

–তারপর আর কি—গিয়ে পৌঁছাতেই বাঙালীদের মুখে খবরটা পেলাম। আমি চলে আসবার ছ’মাস পরেই আত্মহত্যা করে মরেছে চক্রবর্তীর দ্বিতীয় পক্ষ। সারা শরীরে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। আর একটা চিঠিতে চক্রবর্তীকে লিখে গিয়েছিল তার মৃত্যুর পর আর কোন মেয়েকে বিয়ে করে মেয়েটির জীবনকে এভাবে যেন ব্যর্থ করে না দেয়। এই তার শেষ অনুরোধ।

শুনে সমস্ত শরীর আমার হিম হয়ে এলো। আরো শুনলাম, চক্রবর্তী ফের বিয়ে করবার জন্য দু’মাসের ছুটি নিয়ে দেশে গেছে মাস খানেক হলো।

চুপ করলেন ভাদুড়ী। শুধু দানা বাঁধা অন্ধকারে তাঁর সিগারেটের লাল আলোটা জ্বলে উঠল একবার। বাইরে রাস্তা দিয়ে জোর আওয়াজ তুলে একটা মোটর বাইক চলে গেল। তারপর সব চুপচাপ।

–কিন্তু ছবি? আরম্ভের অধ্যায়ে ফিরে এলাম আমি।

–ওঃ, ওটার জন্যে আমাকে খাটতে হয়েছে একটু। ভগীরথ চক্রবর্তীর স্ত্রীর মৃত্যুর পর স্থানীয় বাঙালীরা মিলে একটা শোকসভার আয়োজন করেছিলেন।সে উপলক্ষে শোকজ্ঞাপক একটি পুস্তিকা ওরা ছেপেছিলেন। তার মলাটে বৌটির বিয়ের পোশাকে তোলা তার একমাত্র ছবিটি ছাপা হয়ে ছিল। প্রত্যেক বাঙালী-বাড়ি ঘুরে ঘুরে আমি শেষ পর্যন্ত এক বাসায় ঐ বইটা পেয়েছিলাম। তারপর সেটা থেকেই অনেক দিন ধরে আমার সমস্ত ক্ষমতা দিয়ে এই ছবিটি আমি এঁকেছি। ক্রিটিকদের কাছে এ ছবির মূল্য যাই হোক, আমার কাছে এর মূল্য অসীম। আপনি তো শিল্পী মানুষ, কথা-শিল্পী। আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন,পয়সা দিয়ে এর দাম হয় না্ আর্টের বিজ্ঞান দিয়েও নয়। দাম হয় শুধু মানুষের হাস্যকর অক্ষমতা দিয়ে। –উপন্যাসের শেষ পৃষ্ঠার মতো স্তব্ধ হয়ে গেলেন ভাদুড়ী।

বুকের ভেতরটা কেমন শুকিয়ে উঠেছিল আমার। গলা যেন কাঠ। ক্লিষ্ট কণ্ঠে বললাম,–আমি এখন উঠি সন্দীপবাবু।

চমকে মুখ তুললেন ভাদুড়ী,–সে কি মশাই, এখন যাবেন কি, বসুন। চা খেয়ে তবে যাবেন। দাঁড়ান চা আনতে বলি। গা ঝাড়া দিয়ে উঠে আলোটা জ্বালিয়ে দিয়ে হঠাৎ বেরিয়ে গেলেন ভাদুড়ী।

[ ঝিনুক – শচীন ভৌমিক [ প্রিয় গল্প সংগ্রহ ] Jhinuk – Sachin Bhowmick ]

শচীন ভৌমিক কে আরও পড়ুন:

মন্তব্য করুন