Breaking News :

বাস্তবিক ও যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত সবসময় জনপ্রিয় মনে হবে না: হিন্দু কোড বিল প্রেক্ষাপট

ভারত-পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসে যাদের আগ্রহ আছে, তারা নিশ্চয়ই ভারতের “হিন্দু কোড বিল” বিষয়ে পড়েছেন। ভারত স্বাধীন হবার পরে পণ্ডিত নেহেরুর কেবিনেট এই বিলের মাধ্যমে হিন্দুসমাজ সংস্কারের সিদ্ধান্ত নেন। বিয়ে, তালাক, নারী অধিকার, পৈত্রিক সম্পত্তিতে উত্তরাধিকারের মতো সংবেদনশীল বিষয় ছিলো এই বিলে। বিগত সময় ধরে চলে আসা সনাতনী কুসংস্কার, ধর্মের নামে অনাচার ও অধিকারহরণ বন্ধ করাই ছিলো এই বিলের উদ্দেশ্য। যুগোপযোগী এবং বাস্তবিক সিদ্ধান্তই ছিল এই বিলের সারকথা।

বিদেশ থেকে উচ্চশিক্ষা পাওয়া, ইতিহাস ও শাস্ত্রে সুপণ্ডিত ড. বি আর আম্বেদকার ওই কেবিনেটের আইনমন্ত্রী ছিলেন। তিনিই এই বিলের প্রণেতা এবং প্রধানমন্ত্রী নেহেরুর সমর্থনেই তিনি বিলটি প্রস্তুত করে সংসদে উত্থাপন করেন।

যথারীতি মৌলবাদী হিন্দুরা এর বিরোধিতায় রাস্তায় নেমে আসে। তারা বিভিন্ন শ্লোক দিয়ে ব্যাখ্যা করেন, এটা হিন্দুধর্মের প্রতি সরাসরি আক্রমণ। তাই ধর্মরক্ষায় এই বিল বন্ধ করতে হবে। একজন হিন্দু হিসেবে, এই বিল বন্ধ করা ধর্মীয় দায়িত্ব। দীর্ঘদিন ধরে একে-অন্যকে-গালি-দেয়া হিন্দুবাদী সংগঠনগুলোও এই ইস্যুতে এক হয়ে যায়। তারা বলে, আমাদের ধর্ম ও সামাজিক আইন সৃষ্টিকর্তাপ্রদত্ত বেদ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। কোনো মানুষের এই বিষয়ে আইন করার অধিকার নেই।

ড. আম্বেদকার উত্তর দেন, হিন্দুধর্মের সাথে আমার কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু সমস্যা আছে ভিন্ন জনের ভিন্ন ব্যাখ্যা নিয়ে। বিভিন্ন হিন্দুবাদীরা তাদের সুবিধামতো শাস্ত্রের ব্যাখ্যা করে বিভিন্ন সামাজিক কুকর্মের বৈধতা দেয়। তাই একটি স্পষ্ট আইন দিয়ে নিয়ন্ত্রণ না করলে, অনাচার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।

এতে মৌলবাদীরা আরও ক্ষেপে গিয়ে তাঁকে এবং তাঁর সরকারকে নাস্তিক আখ্যা দেয়। সরকার সেকুলারাইটিস রোগে আক্রান্ত বলে প্রচার করা হয়। ধর্মান্ধদের এরকম উন্মত্ততা দেখে কংগ্রেসের দুর্বল মানসিকতার লোকজন ঘাবড়ে যায়। তারাও আম্বেদকার ও নেহেরুকে বিলটি পাশ না করে ফেরত নেবার জন্য অনুরোধ করতে থাকে।

আম্বেদকার তার সিদ্ধান্তে অনড় ছিলেন। পণ্ডিত নেহেরুও নৈতিকতার দায় থেকে সমর্থন উঠিয়ে নিতে পারছিলেন না। তাই তিনি ঘোষণা দেন, এই বিলটি ফেরত নিলে তিনি ক্ষমতায় থাকার নৈতিক অধিকার হারাবেন। তাই কোনোভাবেই তিনি বিল ফেরত নিতে চান না, বরং পুনরায় পাশ করার চেষ্টা করতে চান।

যারা সরাসরি মৌলবাদী হিসেবে পরিচয় দিতে লজ্জা পেতেন, কিন্তু মনে মনে মৌলবাদী, তারা এই বিলের একটু অন্যভাবে সমালোচনা করেন। তারা বলেন, শুধু এক ধর্মের জন্য আইন বানানো কতোটুকু উচিত? একাধিক বিয়ে করা যদি হিন্দুদের জন্য নাজায়েজ হয়, তবে মুসলমানদের জন্য জায়েজ কেন? যাদের ভোটে সরকার ক্ষমতায় এসেছে সেই সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের নিয়ন্ত্রণে আইন বানানো হলে, মুসলমান ও অন্য সংখ্যালঘুদের জন্য আইন বানানো হচ্ছে না কেন? সরকার কি মুসলিমদের ভয় পায়?
বিল পাশ করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন নেহেরু। সরকারের সময়ও শেষ হয়ে আসছিলো। এসময় আম্বেদকার নেহেরুকে আবেদন করেন যে তাঁর শরীর খারাপ হচ্ছে। তিনি বিল পাস হবার পরেই নিজেকে ডাক্তারের হাতে ছাড়তে চান, তার আগে না। নেহেরু আবার চেষ্টা করেন। আরও ভয়াবহ বিরোধিতা আসে।

বছরখানেকের মধ্যেই ভারতের প্রথম সাধারণ নির্বাচন। নির্বাচনের প্রস্তুতি নেবার জন্য সময় দরকার ছিলো। তাই সব দিক বিবেচনা করে, পণ্ডিত নেহেরু বিল ফেরত নেবার সিদ্ধান্ত নেন। তবে ঘোষণা দেন, কংগ্রেস যদি পুনরায় ক্ষমতায় আসে, তখন এই বিল পুনরায় উত্থাপন হবে। ওই সেশনে বিল পাশ না হওয়ায় ড. আম্বেদকার অভিমানে ইস্তফা দেন এবং চিরদিনের জন্য কংগ্রেস ত্যাগ করেন।

ভারতের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিলো সেই হিন্দু কোড বিল। এটাই মনে হচ্ছিলো জেতা-হারার ফ্যাক্টর। এটা ছিলো অনেকটা হিন্দু মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে নেহেরু আর কংগ্রেসের নৈতিক যুদ্ধ। হিন্দুবাদীরা শুধু আইনের বিরোধিতা করেই ক্ষান্ত হয়নি, তারা নেহেরুর বিরুদ্ধে নির্বাচনে প্রার্থী দেয় এবং নির্বাচিত হলে এই বিল চিরকালের জন্য আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করার প্রতিশ্রুতি দেন। এলাহাবাদের ফুলপুর আসনে নেহেরুর বিরুদ্ধে দাঁড়ান সে সময়ের বিখ্যাত ধর্মনেতা প্রভুদেব ব্রহ্মচারী।
হিন্দুবাদী নেতার জনপ্রিয়তা এবং প্রতিটি বক্তৃতায় নেহেরুর হিন্দু কোড বিলের পক্ষে বক্তৃতা শুনে মনে হচ্ছিল, নেহেরুর হার অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু হিন্দুবাদীদের লম্ফঝম্প বেশি হলেও শেষ পর্যন্ত ভোটে জয়লাভ করেন নেহেরু। তাঁর দল কংগ্রেস নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সংসদে ফিরে আসে। ফিরে এসেই তিনি পুনরায় সেই বিল তোলেন। ১৯৫৬ সালের মধ্যে ৪টি আইনে ভাগ হয়ে বিলটি পাশ হয়।

অনেক বছর পার হয়ে গেছে। আজ সেসব ইতিহাস। ভারত ড. আম্বেদকারকে ভারতরত্ন ঘোষণা দিয়েছে, সংবিধান নির্মাতার সম্মান দিয়েছে, দলিতের ও নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রবাদপুরুষ আখ্যা দিয়েছে। এমনকি আজকের বিজেপিও তাঁর সংস্কারকে সম্মান দেখায়। কিন্তু দুঃখের বিষয়, সেই ড. আম্বেদকারকে মরতে হয়েছিলো নাস্তিক, দেশবিরোধী, ছুপা মুসলিমসহ আরও বহু গালিময় আখ্যা নিয়ে।

সমসাময়িক ইতিহাস নিয়ে রাজনীতিবিদদের শিক্ষা নেয়া দরকার। তবে সবচেয়ে বেশি শিক্ষা নেয়া দরকার আমাদের সাধারণ জনগণের। মনে রাখতে হবে, ধর্ম, জাতীয়তাবাদ বা অন্য যেকোনো নামে উন্মাদনা যতো বেশিই হোক, শেষ পর্যন্ত সত্যেরই জয় হয়। উন্মাদনা দেখে ভুল পথে হাঁটলে হয়তো সাময়িক জয় বলে মনে হতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা পরাজয় হয়েই দেখা দেয়।

Read Previous

শুভেচ্ছা – স্থপতি ইয়াফেস ওসমান

Read Next

প্রযুক্তিতে বাংলাদেশের হাট কর্মসূচির লিফলেট