মনে কি আছে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের কথা?

পাকিস্তান সৃষ্টির ঠিক ছয় মাস দশদিন পর, ২৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮ সালে করাচীতে পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনে পূর্ব বাংলার কংগ্রেস দলীয় সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত সংশোধনী প্রস্তাবে ২৯নং বিধির ১নং উপবিধিতে উর্দু ও ইংরেজির পর ‘বাংলা’ শব্দটি যুক্ত করার দাবি জানান। তিনি যুক্তি উপস্থাপন করেন, পাকিস্তানের ৫টি প্রদেশের ৬ কোটি ৯০ লাখ মানুষের মধ্যে ৪ কোটি ৪০ লাখ মানুষ বাংলা ভাষাভাষী। সুতরাং বিষয়টিকে প্রাদেশিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাংলাকে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ভাষা হিসেবে দেখা উচিৎ। তাই তিনি গণপরিষদে উর্দু ও ইংরেজির পাশাপাশি বাংলা ভাষাকেও রাষ্ট্রভাষা হিসেবে অন্তর্ভুক্তির দাবি করেন। লিয়াকত আলী খান সাম্প্রদায়িক বক্তব্যের ভিত্তিতে এই দাবী নাকচ করে দেন। তৎকালীন পূর্ববাংলা থেকে নির্বাচিত সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম লিগ সদস্যরা বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিলেন। ১১ মার্চ পাকিস্তান গণপরিষদে রাষ্ট্রভাষা উর্দু বিল পাস হয়ে যায়। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত করাচীর অধিবেশন থেকে ঢাকায় ফিরে এলে, বিমানবন্দরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্ররা তাকে বিপুল সংবর্ধনা দেয়। সেই সূচনা।

এর পরই ১১ মার্চ ১৯৪৮, পূর্ব বাংলায় ‘ভাষা দিবস’ পালিত হয়; এবং ওই মার্চেই ২১ তারিখে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ সেখানে প্রথম ঘোষণা করেন Urdu, and Urdu shall be the state language of Pakistan ২৪ মার্চ তারিখে সেই একই ঘোষণা তিনি পুনরাবৃত্তি করলেন কার্জন হলে সমাবর্তন অনুষ্ঠানে; রেসকোর্স ময়দানে ছাত্রদের যে ‘নো’, ‘নো’ প্রতিবাদ উচ্চারিত হয়েছিলো, তা কার্জন হলে দ্বিগুণ ধ্বনিতে উচ্চারিত হলে থমকে গিয়েছিলেন জিন্না। ছাত্রদের এই সাহসের সূচনাটা করেছিলেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত।

পাকিস্তানের রাষ্ট্রতন্ত্র আবার বাংলা ভাষার উপর আঘাত হানে ১৯৫০ সালে। সেবার গণপরিষদে আরবি হরফে বাংলা লেখার প্রস্তাব উত্থাপিত হয়। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত এই প্রস্তাবের তীব্র প্রতিবাদ জানান।

ভাষা আন্দোলন গণ আন্দোলনে রূপ নিলে একুশে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২তে ভাষা আন্দোলনে অংশ গ্রহণকারী মিছিলরত ছাত্র-জনতার ওপর পুলিশ গুলি বর্ষণ করে। নিহত বরকত, সালাম, রফিক, জব্বার প্রমুখ। গণদাবীর মুখে পাকিস্তানের রাষ্ট্রতন্ত্র ১৯৫৬ সালে শাসনতন্ত্রে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও কার্যক্ষেত্রে তা ছিল চরমভাবে অবহেলিত। বাংলা ভাষাকে ধ্বংস করার প্রচেষ্টা চলতেই থাকে।
ভাষা আন্দোলনের প্রথম ভাষা সৈনিক ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের জন্ম বর্তমানের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার রামরাইল গ্রামে। আইনজীবী হিসাবে পেশাজীবন শুরু করলে অল্পদিনেই সফলতা অর্জন করেন। ১৯৩৭ সালে তিনি বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হন। বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন সংশোধন, বঙ্গীয় কৃষিঋণ গ্রহীতা ও বঙ্গীয় মহাজনি আইন পাসের সাথে ধীরেন দত্ত সংশ্লিষ্ট ছিলেন। তিনি ১৯৪২ সালে ভারত ছাড় আন্দোলনে যোগ দেন। ব্রিটিশ বিরোধী কার্যকলাপের জন্য তিনি বেশ কয়েকবার গ্রেফতার হয়ে বিভিন্ন কারাগারে বিনাশ্রম ও সশ্রম দণ্ড ভোগ করেন। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে তিনি কংগ্রেস দলের টিকিটে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হন। পাকিস্তানের সংবিধান রচনার জন্য ঐ বছর ডিসেম্বরে পূর্ববঙ্গ হতে তিনি পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৪৭ সালের পর একজন অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিক হিসেবে পাকিস্তানের রাজনীতিতে সক্রিয় অংশ গ্রহণ করেন। ১৯৫৪ সালের জুন মাসে পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশনে তিনি পূর্ব পাকিস্তানে গভর্নরের শাসন প্রবর্তনের বিরুদ্ধে একটি ছাঁটাই প্রস্তাব উত্থাপন করেন। ১৯৫৬ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর হতে ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর পর্যন্ত আতাউর রহমান খানের মন্ত্রীসভায় তিনি পূর্ব পাকিস্তানের স্বাস্থ্য ও সমাজকল্যাণ বিষয়ক মন্ত্রী ছিলেন।

পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি হওয়ার পর ১৯৬০ সালে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের উপর ‘এবডো’ (Elective Bodies Disqualification Order) প্রয়োগ করা হয়। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় তাঁকে গৃহবন্দি করে রাখা হয় এবং তখন থেকে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত থাকেন। এতদসত্ত্বেও বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত গুরুত্বপূর্ণ বাঙালি নেতৃবৃন্দের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক বজায় রাখতেন। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের পরপরই কুমিল্লায় নিজ বাড়িতে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করলেন। ২৫ মার্চের কালো রাতের পরে অনেকেই দেশ ত্যাগ করলেও তিনি দেশে থাকে যান।

পাকিস্তান গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত যে দুঃসাহসিক ভূমিকা পালন করেছিলেন তা পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী তথা সামরিক জান্তা ভোলেনি, ভুলতে পারেনি। স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে ২৯ মার্চ রাত দু’টোয় পাক হানাদাররা মহান ভাষা আন্দোলনের মহানায়ক ৮৫ বছরের বৃদ্ধ ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত ও তাঁর ছোট ছেলে দিলীপকুমার দত্তকে কুমিল্লার ধর্মসাগরের পশ্চিম পাড়ের নিজ বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায়। অসমর্থিত সূত্রে জানা যায়, ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে শহীদ হন ১৪ এপ্রিল, ১৯৭১। তাঁর বলিষ্ঠ কণ্ঠ সূচনা করে ছিল ভাষা আন্দোলনের, তাঁর রক্তে রঞ্জিত আমাদের স্বাধীনতা।

Read Previous

অসুরের সুরলোকযাত্রা

Read Next

দিনপঞ্জি – মার্চ মাস