Breaking News :

শহীদ ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব

২৫ মার্চের বিভীষিকাময় কালো রাতে পাকিস্তান হানাদারদের হত্যাকাণ্ডের প্রথম শিকার হয়েছিলেন যারা, তাদের একজন ক্ষণজন্মা মনিষী, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন দার্শনিক অধ্যাপক ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব। তিনি জি সি দেব নামেই সমধিক পরিচিত। তাঁর প্রকৃত নাম গোবিন্দচন্দ্র দেবপুরকায়স্থ। বাংলাদেশী বুদ্ধিজীবী-সম্প্রদায়কে ধবংস করার হিংস্র পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পাকিস্তানী সৈন্যরা নিবেদিতপ্রাণ মানবপ্রেমিক এই বরেণ্য শিক্ষককে হত্যা করে।

হানাদাররা যখন আক্রমণ করে, তখন তিনি তাদের সামনে দুহাত ঊর্ধ্বে তুলে ‘গুড সেন্স গুড সেন্স’ বলে তাদের থামানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু কিছুতেই কোনো কাজ হয়নি। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ব্রাশ ফায়ারে নির্মমভাবে হত্যা করে সদা হাস্যোজ্জ্বল জিসি দেব এবং তাঁর মুসলিম দত্তক কন্যার স্বামীকেও। তাঁর পালিত কন্যা রোকেয়া বেগম ঘটনার আকস্মিকতায় জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যান বিধায় বেঁচে গিয়েছিলেন। ২৬ মার্চ বিকেলে জগন্নাথ হলের পশ্চিম পাশে জিসি দেবের মরদেহ মাটিচাপা দেয়া হয়। ১৯৬৫ সালের পাকভারত যুদ্ধের সময় তাঁকে গ্রেফতার করে কারাগারে প্রেরণ করা হয়। জীবন বিপন্ন হতে পারে জেনেও তিনি দেশত্যাগ করেননি; স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গেও তিনি ছিলেন একাত্মতা।

১৯০৭ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সিলেট জেলার বিয়ানী বাজারের লাউতা গ্রামে ড. জি সি দেব। দেবের পূর্বপুরুষ ছিলেন ভারতের গুজরাটের বাসিন্দা এবং কুলীন। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় উত্থানপতনের কারণে তাঁর জনৈক পূর্বপুরুষ পঞ্চম শতকে গুজরাটের আদিনিবাস ত্যাগ করে সিলেটে চলে আসেন এবং এখানেই স্থায়িভাবে বসবাস শুরু করেন। পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য অনুসারে তাঁরা এখানে নব উদ্যোগে বেদ, বেদান্ত, উপরিষদচর্চা শুরু করেন। পিতার মৃত্যুর পর তিনি স্থানীয় মিশনারীদের তত্ত্বাবধানে বড় হন। ১৯২৯ সালে কলকাতার সংস্কৃত কলেজ থেকে দর্শন বিষয়ে বি.এ (সম্মান) এবং ১৯৩১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে এম.এ ডিগ্রি লাভ করেন। ‘রিজন, ইনটুইশন অ্যান্ড রিয়ালিটি’ নামক অভিসন্দর্ভ রচনা করে ১৯৪৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।

ড. জি সি দেব কোলকাতা রিপন কলেজের (বর্তমানে সুরেন্দ্রনাথ কলেজ) শিক্ষক হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু করেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকালীন সময়ে রিপন কলেজ কলকাতা থেকে দিনাজপুর স্থানান্তরিত হলে তিনিও কর্মসূত্রে দিনাজপুর আসেন। কিন্তু যুদ্ধ শেষে রিপন কলেজ পুণরায় কোলকাতায় স্থানান্তরের সময় তিনি দিনাজপুরে থেকে যাবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এবং সুরেন্দ্রনাথ কলেজের (বর্তমানে দিনাজপুর সরকারি কলেজ) প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেব যোগদান করেন। পরবর্তীতে ১৯৫৩ সালের জুলাইয়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। তিনি পূর্বতন ঢাকা হলের (বর্তমান- শহীদুল্লাহ হল) হাউস টিউটর হিসেবে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন, পরবর্তীতে একই বছর তিনি জগন্নাথ হলের প্রভোস্টের দ্বায়িত্ব পান। ড. দেব ১৯৬৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের চেয়্যায়ম্যানের দ্বায়িত্বভার গ্রহণ করেন এবং ১৯৬৭ সালে প্রফেসর পদে পদান্নতি লাভ করেন। তিনি ১৯৬০ থেকে আমৃত্যু পাকিস্তান দর্শন সমিতির নির্বাচিত সম্পাদকের দ্বায়িত্ব পালন করে গেছেন।

ষাটের দশকের শেষের দিকে ড. দেব পেনসেলভেনিয়ার wilkes-Barre কলেজে শিক্ষকতা করেন। স্বল্প সময়ের মধ্যেই তিনি সেখানে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন এবং সেখানে তার গুণমুগ্ধরা তার মানবিক দর্শন প্রচারের লক্ষ্যে The Govinda Dev Foundation for World Brotherhood প্রতিষ্ঠা করে।

১৯৬৭ সালে দর্শনে বিশিষ্ট অবদানের জন্য ‘পূর্ব পাকিস্তান শিক্ষিত সমাজ’ কর্তৃক সম্মানসূচক ‘দর্শন সাগর’ উপাধিতে ভূষিত হন। ১৯৮৬ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার তাঁকে মরণোত্তর ‘একুশে পদক’ প্রদান করে।

ড. জি সি দেব মোট গ্রন্থ নয়টি, যার মধ্যে দুইটি বাংলায় এবং সাতটি ইংরেজিতে৷
জীবদ্দশায় প্রকাশিত বইগুলো হচ্ছে-

  • Idealism and Progress (1952),
  • Idealism: A New Defence and a New Application (1958),
  • আমার জীবন দর্শন’ (১৯৬০),
  • Aspirations of the Common Man (1963),
  • The Philosophy of Vivekananda and the Future of Man
  • তত্ত্ববিদ্যা-সার (১৯৬৬),
  • Buddha, the Humanist (1969)

মৃত্যুর পরে প্রকাশিত বইগুলো হচ্ছে-

  • Parables of the East (1984),
  • My American Experience (1993)

জীবন ঘনিষ্ঠ মানবিক দর্শন প্রচারের জন্য চিরকুমার ড. জি সি দেব তাঁর সমস্ত সম্পত্তি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে দান করে গেছেন যা দ্বারা পরবর্তীতে ১৯৮০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন কেন্দ্র (ডিসিপিএস) প্রতিষ্ঠিত হয়।

গোবিন্দ চন্দ্র দেব
গোবিন্দ চন্দ্র দেব
Read Previous

শিলাইদহ ইউনিয়নে সুফি ফারুকের পেশা পরামর্শ সভার সেলাই প্রশিক্ষণের উদ্বোধন

Read Next

শুভ জন্মদিন ছোটগল্পের জাদুকর হাসান আজিজুল হক