সঙ্গীতে ঘরানা কি বা কিভাবে তৈরি হয়?

অনেক পন্ডিত/ওস্তাদরা বলেন – কোন পরিবার যদি, পরপর তিন প্রজন্ম ধরে একই কাজ করতে থাকে এবং ওই তিন পুরুষের সমন্বিত কাজের মধ্য দিয়ে, কাজটি করার কোন স্বতন্ত্র শৈলী (Style) তৈরি করতে পারে, তবে তাদের ঘরানা তৈরি হয়। মানে – শুধু শৈলীটা উদ্ভাবন করলেই হবে না, পরে দুটি প্রজন্মকে, গুরু শিষ্য পরম্পরা মাধ্যমে, শিক্ষিত করতে হবে এবং চর্চা অব্যাহত রাখতে হবে। প্রজন্ম মানে রক্তের সম্পর্ক জরুরী নয়। যেকোনো একটি শৈলীর একনিষ্ঠ ছাত্রকে (যারা গুরু-শিষ্য রীতিতে শিক্ষা নেয় তাদেরকে) ওই পরিবারের সদস্য ধরা হয়। যিনি এরকম একটি পারিবারিক শিক্ষায় সুশিক্ষিত, তাকে “ঘরানা-ওয়ালা” বলে।

শুধুমাত্র সঙ্গীতেই নয়, ঘরানা মানে যেকোনো ধরনের কাজের ঘরানা হতে পারে। যেসব কাজ সৃষ্টিশীল এবং ক্রমশ উন্নয়নের বিষয় আছে, সেরকম সব কাজেই ঘরানা তৈরি হতে পারে। কেউকেউ তার জীবদ্দশায় নিজের শ্রম, মেধা দিয়ে একদম স্বতন্ত্র শৈলীর জন্ম দিয়ে যান। আবার কেউকেউ এক বা একাধিক শৈলীতে শিক্ষা নিয়ে, সেসব শৈলীর সবচেয়ে সুন্দর জিনিসগুলো মিলিয়ে, নিজের একটি শৈলী তৈরি করেন। যেটা পরবর্তীতে চর্চার মাধ্যমে ঘরানা হয়ে যায়। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে, ওই ঘরানার শিল্পীরা, সেই শৈলী আরও পরিশোধিত করেন, ঘরানাকে আরও সমৃদ্ধ করেন। কণ্ঠসঙ্গীতে যেরকম ঘরানা আছে, একইভাবে বাদ্যযন্ত্রেরও (সিতার, শারদ, তবলা) নামকরা বিভিন্ন ঘরানা রয়েছে।

ভারতবর্ষে অনেক নামী সঙ্গীত ঘরানা রয়েছে। যেসব ঘরানার কোনকোনটি প্রায় ৩০ প্রজন্ম সঙ্গীতের সাথে রয়েছে। তবে কোন ঘরানাকে ছোট বা বড় বলা ঠিক হবে না। কোন একটি অখ্যাত ঘরানা একজন গুনি শিল্পীর গুনে বিখ্যাত হতে পারে। আবার খুব বিখ্যাত ঘরানায়, দীর্ঘদিন গুনি শিল্পী না জন্মাবার কারণে, সৃতির অন্তরালে চলে যেতে পারে।

যেহেতু ঘরানা তৈরি হতে কয়েক প্রজন্ম দরকার, সেহেতু কেউ তার জীবদ্দশায় ঘরানা তৈরি করে, নামকরণ করে যেতে পারে না। ওস্তাদ আলাউদ্দীন খান (১৮৬২ -১৯৭২) বাবার মতো ১১০ বছরের আয়ুষ্কাল তো আর সবার ভাগ্যে হয় না। ভারতীয় উপমহাদেশে আমার জানামতে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি তার ঘরানার বাড় বাড়ন্ত সুনাম দেখে যেতে পেরেছেন।

ঘরানা সংস্কৃতি দীর্ঘ দিনের হলেও ঘরানা শব্দটি অফিসিয়ালি জনপ্রিয় হয়েছে উনিশ শতকে। এসময়ে বিভিন্ন রাজদরবারে গায়কেরা রুজির প্রয়োজনে রাজদরবার ছেড়ে বিভিন্ন শহরে গিয়ে বসবাস শুরু করেন। সাধারণ শ্রোতাদের মধ্যে তাদের পরিচিতির স্বতন্ত্রতা তৈরির জন্যই তারা ঘরানার নাম ব্যাবহার করতেন। যে যেই রাজদরবারে ছিলেন (বা যেই এলাকায় তার জন্ম), তিনি সেখানকার নাম অনুযায়ী ঘরানার নামের পরিচিতি শুরু করেন। এভাবেই আজকের পরিচিত বিভিন্ন ঘরানার পরিচয় হয়েছে। তবে “ডাগর” দের মতো পরিবারের পরিচয়েও কিছু ঘরানা আছে।

ধ্রুপদ গায়নশৈলী বহু যুগের। অনেকগুলো পরিবার বহু যুগ ধরে ধ্রুপদ সঙ্গীতের সাধনা করে আসছে। এরা মূলত বিভিন্ন বড় প্রার্থনায়ে এবং রাজ দরবারে গান করতেন। এরা ১৮শ শতকে যে যেই রাজ দরবারের সাথে ছিলেন, সেসব দরবারের নাম অনুযায়ী সেসব ঘরানার নাম হয়েছে (মথুরা, রামপুর, জয়পুর, বেনারস, দারভাঙ্গা, বিষ্ণপুর)। খেয়াল বেশি জনপ্রিয় হওয়ায়, এরা পরবর্তীতে বেশিরভাগই নিজেদেরকে খেয়াল রীতির দিকে নিয়ে গেছেন।

 

 

সঙ্গীতের ঘরানা- সূচি

সঙ্গীতে ঘরানা কি বা কিভাবে তৈরি হয়?

ঘরানা সংস্কৃতি ও গুরু শিষ্য পরম্পরা

সঙ্গীতে ঘরানার মধ্যে পার্থক্যে কোথায়?

জয়পুর-আত্রাউলি ঘরানা

সূচি:

গান খেকো সূচি
সঙ্গীতের ব্যাকরণ সূচি
রাগ শাস্ত্র সূচি
রাগ চোথা সূচি
পরিবার ভিত্তিক/রাগ অঙ্গ ভিত্তিক রাগের গ্রুপ
ঠাট ভিত্তিক রাগের গ্রুপ
সময় ভিত্তিক রাগের গ্রুপ
ঋতু ভিত্তিক রাগ/গান সূচি
রস ভিত্তিক গ্রুপ
ঘরানা ভিত্তিক গান বাজনা
শিল্পী সূচি
প্রিয় গানের বানী/কালাম/বান্দিশ সূচি

 

Declaimer:

শিল্পীদের নাম উল্লেখের ক্ষেত্রে আগে জ্যৈষ্ঠ-কনিষ্ঠ বা অন্য কোন ধরনের ক্রম অনুসরণ করা হয়নি। শিল্পীদের সেরা রেকর্ডটি নয়, বরং ইউটিউবে যেটি খুঁজে পাওয়া গেছে সেই ট্রাকটি যুক্ত করা হল। লেখায় উল্লেখিত বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত যেসব সোর্স থেকে সংগৃহীত সেগুলোর রেফারেন্স ব্লগের বিভিন্ন যায়গায় দেয়া আছে। শোনার/পড়ার সোর্সের কারণে তথ্যের কিছু ভিন্নতা থাকতে পারে। আর টাইপ করার ভুল হয়ত কিছু আছে। পাঠক এসব বিষয়ে উল্লেখে করে সাহায্য করলে কৃতজ্ঞ থাকবো।

*** এই আর্টিকেলটির উন্নয়ন কাজ চলমান ……। আবারো আসার আমন্ত্রণ রইলো।

Read Previous

বেহেশতের বদলে আমি পুনর্জন্মই চাইবো – আশফাকউল্লাহ খান । কবিতা সংগ্রহ । স্মৃতিচারণ

Read Next

সঙ্গীতে ঘরানার মধ্যে পার্থক্যে কোথায়?