স্ট্রিকিং [ Streaking ] শচীন ভৌমিক

অভিধানে পাবেন স্ট্রিকিং (Streaking)-এর মানে হচ্ছে Moving very rapidly like lightning,, বাংলায় এক শব্দে বলা যায় ‘বিদ্যুৎগতি’। .অবশ্য কাঞ্চনজঙ্ঘা যেমন কাঞ্চনবাবুর জঙ্ঘা নয়, বিদ্যুৎগতিও, বলা বাহুল্য, বিদ্যুৎবাবুর গতি নয়। স্ট্রিকিং হল আজকালকার নতুন একটা হিড়িক,নতুন একটা ফ্যাড।

মার্কিন দেশে এর জন্ম হয়েছে ১৯৭২ সালে, এখন সারা পৃথিবীতেই কলেজের ছেলেমেয়েরা এই নতুন নেশায় মেতেছে। স্ট্রিকিং হল সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে দৌড় লাগানো। বার্থ ডে সুটে ভাগম্‌ ভাগ। উদোম উদ্যম বলা যায় আর কি। শুরু হয় বছর তিনেক আগে আমেরিকার ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়। ভিয়েৎনাম যুদ্ধের প্রতিবাদে দুজন ছাত্র ন্যাংটো হয়ে দৌড় লাগিয়েছিল। দুজনেই পড়ল, না নিমুনিয়ার কবলে নয়, পুলিশের কবলে। ওদের কয়েক মাস কারাবাস হয়েছিল।

স্ট্রিকিং [ Streaking ] শচীন ভৌমিক - For Adults Only - by Sachin Bhowmikএর কিছুদিন পর দুটি সুশ্রী মেয়ে টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ে স্ট্রিকিং করল। তপ্ত ইতিহাসের নগ্ন পাতায়, না স্যরি, নগ্ন ইতিহাসের তপ্ত পাতায় এ দুজনের নাম উল্লেখ থাকবে। কেননা এরাই পাইওনিয়ার। মেয়ে স্বাধীনতার অগ্রদূতী বা বলা যায় নগ্নদূতী। এরপর শুরু হল এই ফ্যাড। সাউথ ক্যারোলিনা। বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫০৮ জন ছাত্র-ছাত্রী স্ট্রিকিং-এর রেকর্ড স্থাপন করলে।

কিছুদিন পর কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের এই নগ্নতার রেকর্ড ভঙ্গ করল একসঙ্গে ১২০০ ছাত্র-ছাত্রী উদোম নৃত্য করে। শুরু হয়ে গেল প্রতিযোগিতা। কে কত বেশি এই নগ্নতার প্রদর্শনী করতে পারে বা কত উদ্ভট ন্যাংটো স্টাণ্ট দেখাতে পারে। শুরু হল তার নব নব আবিষ্কার।

এ বছরের ৬ই মার্চ ওয়েস্ট জর্জিয়ার পাঁচজন পুরুষ ছাত্র প্লেন ন্যাংটো অবস্থায় প্যারাসুট নিয়ে লাফ দিয়েছে। এই অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখার জন্য নিচে দু’হাজার লোক উপস্থিত ছিল। করতালি দিয়ে তারা অভ্যর্থনা করেছে এই সফল পঞ্চপাণ্ডবকে। কানাডায় একজন প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় (ফ্রিজিং পয়েণ্টের বিশ ডিগ্রী নিচে) স্ট্রিকিং করে দুঃসাহসের পরিচয় দিয়েছে। নিউজিল্যাণ্ড ও ইওলন্ডের টেস্ট ম্যাচের সময় ত্রিশ হাজার দর্শকদের সামনে নিউজিল্যান্ডের একজন ছাত্র ন্যাংটো হয়ে দৌড় লাগিয়েছে মাঠে।

লন্ডনের এক মদের দোকানের মালিক বিজ্ঞাপন দিয়েছিল যে কোন মেয়ে যদি ন্যাংটো হয়ে আসে তাকে এক বোতল বিয়ার ফ্রি দেওয়া হবে। একটি মেয়ে উদোম হয়ে দৌড়ে গাড়ি থেকে নেমে ফ্রি বোতল সংগ্রহ করে দৌড়ে গাড়িতে চেপে চলে যায়। খদ্দেররা মদ না খেয়ে ই নিশ্চয়ই মাতাল হয়ে উঠেছিল। বুঝতেই পারছেন এ হিড়িকের ফিরিস্তি দিলে বিরাট লম্বা হবে তার আকৃতি।

স্ট্রিকিং-এর এই হিড়িকের আগে আমেরিকায় Mooningবলে একটা fad চালু হয়েছিল। হঠাৎ জনসমক্ষে পাৎলুন খুলে পাছা দেখানো হচ্ছে এই খেলার নাম। নিতন্ব প্রদর্শন। নিতম্ব যেহেতু পূর্ণচন্দ্র স্বরূপ গোলাকৃতি তাই এই পাগলামীর নাম দেওয়া হয়েছিল Mooning । শিশুসুলভ অন্যকে অপমান করার এই নিতম্ব প্রদর্শন প্রতিবাদ করার এক অভিনব প্রক্রিয়া।

God father ছবির শুটিঙের সময় মার্লন ব্রাণ্ডো স্টুডিওতে, রাস্তায়, আউটডোর লোকেসনে প্রচুর mooning করেছেন। অন্যান্য অভিনেতা অভিনেত্রীরাও বাদ যান নি। Last Tango in Paris ছবির শেষ পার্টি দৃশ্যে মার্লন ব্রাণ্ডোর সাজেসান অনুযায়ীই বার্তোলুসি নায়ক ও নায়িকা প্যান্ট খুলে পাছা দেখিয়ে পার্টির গণমান্য লোকদের চোক কপালে তোলার দৃশ্যটি চিত্রায়িত করেছেন। Mooning -এর ঢেউ শেষ হতেই শুরু হয়েছে Streaking এর ঝড়।

মনোবৈজ্ঞানিকরা এই অভূতপূর্ব পাগলামীর নানারকম ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। ইমোরি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকোলজির প্রধান মাইক নিকোলাস বলছেন-এটা হল জীবনে অসফলতার করুণ প্রতিবাদ, frustration-এর এক নতুন বিজ্ঞাপন। ক্যালিফোর্নিয়ার এক বিখ্যাত সাইকোলজিস্ট মনে করেন এইfad জনসমক্ষে আত্মপরিচয় প্রকাশ করার এক দুশ্চেষ্টা। বিখ্যাত হওয়ার জন্য সম্মানজনক কর্ম-পটুতার প্রয়োজন, নইলে দুর্নামজনক shocking কিছু করার প্রয়োজন।Shock দিয়ে জনমনকে আকর্ষণ করার জন্যই এই নগ্নতার ছড়াছড়ি।

এক কথায় Publicity Stunt. Streaking করে সামাজিক কানুনকে ভাঙাতে রয়েছে অন্যায় করে গোপন এক আত্মপ্রত্যয় লাভ। পাপ, অন্যান্য, অপরাধ চিরকালই সামাজিক নাগপাশ বন্ধন থেকে মুক্তির উপায়। সুতরাং লোভনীয়। অস্কার ওয়াইল্ড এজন্যই লিখেছিলেন, ‘আমি যা ভালবাসি তা হয় অসামাজিক, অনৈতিক বা বেআইনী।”

নগ্ন হয়ে প্রতিবাদ করা এ যুগের কোন নব্য আবিষ্কার নয়। ৯০০ বৎসর আগে লর্ড অফ কভেনট্রির ধর্মপত্নী লেডী গোডিভা নগ্ন হয়ে ঘোড়ার পিঠে চড়ে রাস্তায় ঘুরে ঘুরে ওয়াকেউইকশায়ারের প্রজাদের উপর অত্যধিক শুল্ক ধার্যের প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। স্বামীরই বিরুদ্ধে এই প্রতিবাদ। জনগণের হয়ে লেডী গোডিভা স্বামীর বিরুদ্ধে এই streaking করেছিলেন। স্বামী বাধ্য হয়ে শুল্ক তুলে নিয়েছিলেন। Sex দেখিয়ে Tax তুলে নেওয়ার দুষ্টান্ত বোধ হয় এই প্রথম।

আমার মনে হয় shreaking আর streaking একসঙ্গে শুরু হলে দিল্লী সব দাবী মেনে নিতে বাধ্য হবে। ইংলন্ডের লেডী গোডিভার আগে এই নগ্ন প্রতিবাদ গ্রীসেও অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সভ্যতার অগ্রদূত গ্রীস কেন পিছিয়ে থাকবে? সালামীস দ্বীপ যুদ্ধে অধিকৃত হওয়ার পর নাট্যকার সফোক্লস এথেন্সের রাজপথে এক নগ্ন শোভাযাত্রার অধিনায়কত্ব করেছিলেন। শোভাযাত্রার শোভা নিশ্চয়ই নগ্নতায় বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়েছিল। কি বলেন? সরকারের বিরুদ্ধে streaking-এর প্রতিবাদ যারা করছেন তারা সম্ভবত পাগল। কেননা সে গল্প নিশ্চয়ই জানেন যে এক পাগল ন্যাংটো হয়ে ঘুরে বেড়াত। একজন বললে, এই, তুই কাজড় পরিস না কেন?
পাগল জবাব দিয়েছিল, কি করব, আমার কোন পাড়ই পছন্দ হয় না।

সে পাগল আর আজকালকার streaker-দের মধ্যে তফাত কি? সে ন্যাংটো থাকত পাড় পছন্দ হয় না বলে, আর এরা ন্যাংটো থাকছে কেননা এদের সরকার পছন্দ হয় না বলে। দুই একই।

সম্প্রতি দিল্লী, কোচিন, মাদুরাই, আমেদাবাদে কিছু ছাত্র streaking করেছে বলে খবলের কাগজে ছাপা হয়েছে। (ছাত্রীরা কেন পিছিয়ে আছেন?) এরা পশ্চিমী এই পাগলামী নকল করেছে মাত্র। উদ্দেশ্য পাবলিসিটি স্টান্ট দেখিয়ে আত্মপ্রত্যয় লাভ করা। কিন্তু এরা জানে না এই নগ্নতার উগ্রতা পশ্চিমের দান নয়। এটা আমাদের দেশে প্রাচীন ইতিহাসে অনেক আগেই ছিল। অনেক পশ্চিমী সামাজিক নেতা বলেছেন যে streaking আসলে nudist আন্দোলনেরই একটা নতুন শাখা।

বিংশ শতাব্দীর গোড়াতে জার্মানীতে এই নগ্নতার নব্য সংস্কৃতির জন্ম হয়।জার্মান ভাষায় Nacktbultur মানে nackd culture শুরু হয় কয়েকজন নগ্নতাবাদীর অধিনায়কত্বে। তাঁরা নগ্নতার সপক্ষে বহু সামাজিক বৈজ্ঞানিক যুক্তি উত্থাপন করে প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে নগ্নতা খুবই স্বাস্থ্যকর আন্দোলন। এই আন্দোলন ক্রমে সারা বিশ্বে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে জার্মান, স্ক্যাণ্ডিনেভিয়া, ফ্রান্স, ইংলন্ড-, আমেরিকা, কানাডা, যুগোশ্লাভিয়া, স্পেন, চেকোশ্লোভাকিয়া ও অন্যান্য দেশে নিউডিস্ট কলোনী গড়ে ওঠে। প্রচুর জায়গা নিয়ে এই নগ্নতাবাদীরা ক্লাব, বাসস্থান, সুইমিং-পুল, রেস্তোরাঁ বানিয়ে রীতিমত আধুনিক শহর বানিয়ে নিয়েছে। নিউডিস্টরা সবাই একসঙ্গে নগ্ন থাকেন, আর স্ট্রিকাররা বস্ত্র পরিহিত জনসমক্ষে নগ্ন হচ্ছেন, তফাত হল এই।

কিন্তু না আমেরিকা বা জার্মান, না লেডী গোডিভা বা সফোক্লেস এই নগ্ন আন্দোলনের পুরোধা। এই আন্দোলনের জন্মস্থান হল আমাদের প্রাচীন ভারতবর্ষ। ভিরমী খাবেন না। এটাই ফ্যাক্ট।

আজ থেকে চার হাজার বৎসর আগে মহারাজা জনক তৎকালীন বিখ্যাত ঋষি, মুনি ও মহাজ্ঞানীদের এক সম্মেলন আহ্বান করেছিলেন। সে জ্ঞানভারতীর সভায় মহাজ্ঞানেশ্বরী গার্গী এসেছিলেন সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে। বিদ্যার, জ্ঞানের এত বড় বিদগ্ধ নারী নগ্ন হয়ে আসায় অন্যান্য মুনি ঋষিরা অবাক। কয়েকজন গার্গীর এই নির্লজ্জতার সমালোচনা করায় গার্গী জবাব দিয়েছিলেন, ‘আপনারা সত্যিকারের বেদান্তের অর্থ বোঝেন না।

সত্যিকারের বৈদান্তিক কখনও নগ্নদেহে শুধু দেহের নগ্নতা দেখতেন না, দেখতে পেতেন দেহাতীত সে মহাসত্যকে, সে মহাজ্ঞানকে, সে মহাবিদ্যাকে-যে শক্তির অন্য নাম হল ঈশ্বর। দেহ তো অনিত্য অসত্য, যা সত্য তা অমর,তা দেহাতীত।’ ঋষিরা স্বভাবতই চুপ। জ্ঞানেশ্বর ঋষিদের কি ঋষি কাপুরের মত ব্যবহার শোভা পায়? গার্গী তো আর আজকের ডিম্পল নয়। তিনি ছিলেন এম্পল। এম্পল অফ ফ্লেস নয়, এম্পল অফ নলেজ।

এছাড়া শ্রীকৃষ্ণ যখন গোপীদের বস্ত্র হরণ করে বৃন্দাবনে নিউডিস্ট কলোনী স্থাপন করেছিলেন সেটা কি বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভের জার্মানদের অনেক অনেক আগে নয়? বলুন? জার্মানদের এই নগ্নতাবাদের দর্শনের অনেক আগে কি মহাজ্ঞানী মহাবীর জৈনধর্মের দিগম্বর সাধু সম্প্রদায়ের সৃষ্টি করেন নি? জৈনধর্মের এই সম্প্রদায়কে বলা হয় ‘দিগম্বরপ’। আকাশই বস্ত্র যাদের, অর্থাৎ দিগম্বর থাকাই যাদের ধর্ম অর্থাৎ নগ্নতাবাদী। তাহলে? এসব কি আজকের কথা?

সেদিন কোপেনহেগেনে যৌন স্বাধীনতার জোয়ারে নারী পুরুষের নানাবিধ যৌন সঙ্গমের ছবির বই বাজারে বেরিয়েছে। কত বিভিন্ন আসন, কত বিচিত্র বিকারগ্রস্ত ভঙ্গী। কিন্তু আমাদের খজুরাহো আর কোণারকের মিথুনভঙ্গী ও প্রক্রিয়ার বিভিন্নতার কাছে এসব তো পান্তাভাত। কোণারকে যা বহুকাল আগে জনসমক্ষে প্রকট ছিল, সেটা মাত্র কাল কোপেনহেগেনে প্রচারিত হচ্ছে।

কে আবিস্কর্তা? ভারতবর্ষের কোণারক, না পশ্চিমের কোপেন-হেগেন? সামাজিক দুঃসাহসিক বিবর্তন যা পশ্চিমে নতুন, তা ভারতবর্ষের অনেক পুরোনো কালের ইতিহাস। অজন্তা ইলোরার টপলেস মেয়েরা অনেক আগে নগ্ন বক্ষ কক্ষ দেখিয়েছেন। ইওরোপ আমেরিকায় টপলেস রেস্তোরাঁ তো সেদিনকার শিশু। ফ্রয়েড য়ুঙ্গ মাস্টার ও জনসনের অনেক আগেই ব্যাৎস্যায়ণ ‘কামশাস্ত্র’ লিখে-ছিলেন। নতুনটা কি?

পশ্চিমের হিপি আন্দোলনের গোড়ায় দেখবেন শিবঠাকুরের করসেশন। নাট্যবস্তু মহাকাব্য সব আমাদেরই দান। এককালে Random Harvest লিখে হিলটন হৈচৈ ফেলে দিয়েছিলেন কেননা উনি নতুন এক নাট্য উপকরণAmnisia মানে স্মৃতিলোপ এ উপন্যাস প্রথম ব্যবহার করেছিলেন। একেবারে বাজে কথা। Random Harvest-এর অনেক আগে কালিদাস এই স্মৃতিলোপ ব্যবহার করেছিলেন তাঁর অমর মহাকাব্য ‘অভিজ্ঞানশকুন্তলম্‌’ গ্রন্থে। তাহলে বস্ত্রলোপ থেকে স্মৃতিলোপ সব ভারতবর্ষেরই অবদান।

বস্ত্রলোপের কথা লিখতে গিয়ে স্মৃতিলোপে চলে এসেছি। আসুন আবার বস্ত্রহরণ করা যাক। ইদানীং ভারতবর্ষের প্রায় ৫০% ভাগ নরনারী এক না এক ধরনের streaking করছে। সেটা দারিদ্র্যের জন্য। বস্ত্র বা চরিত্র কোনটাই নেই গরীবদের। থাকবে কোত্থেকে, অন্ন না পেলে বস্ত্রও জোটে না, চরিত্রও থাকে না।Pygmalion-এ বার্নার্ড শ এক দরিদ্র চরিত্রের মুখে বলেছেন- Morality? We can’t aford it? সত্যি এই বস্তুতান্ত্রিক সভ্যজগতে নৈতিকতাও মূল্য দিয়ে কিনতে হয়। টাকা না থাকলে মরালিটিও সংরক্ষণ করা যায় না। বাধ্যতামূলক নগ্নতা বাদ দিলে থাকে শখের নগ্নতা। সেটা অবশ্য আমার চোখের পক্ষে খুবই উপাদেয় মনে হয়।

বিদেশীদের কাছ থেকে আমাদেরই শেখানো জিনিস নতুন করে ধার করছি আমরা। তবে সত্যি বলব, ইংলন্ডে একটি নিউডিস্ট কলোনী দেখেছি আমি। সব স্বপ্ন তাতে ধুলো হয়ে গেল। যা ভাবছেন তার উল্টো। ছেলেরা কেউই এপোলো নয়, মেয়েরাও ৩৬´´ ২২´´ ৩৬´´ নন। ভেবেছিলাম র্যাকুয়েল ওয়েল্‌চ, সোফিয়া লোরেন, ব্রিজিট বার্ডটের ছড়াছড়ি হবে। তার বদলে ঝুলন্ত স্তন, দুরন্ত নিতন্ব ও সঙ্গে দুলন্ত ভুঁড়ি নিয়ে যেসব নগ্ন বামারা ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন তারা দ্বিপদী হাতি। স্বপ্নো কা সাথী কদাপি নয়। তাই বলছি নগ্ন আন্দোলনের মুশ্‌কিলও আছে। নগ্নিকারা মোটেই সুন্দরী নন। সুন্দরীরা বেশি নগ্ন হতে চান না বোধহয়। ফিগার ভাল যাদের তারা বেশি ইগার নন। কথাটা অবশ্য সর্বৈর সত্য নন। অনেক বিখ্যাত নরনারী নগ্নতার পূজারী।

চার্চিল স্নান করার পর অনেক্ষণ নগ্ন হয়ে চুরুট মুখে পায়চারি করতে ভালবাসতেন। একবার আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট দরজায় নক্‌ করেছিলেন। নগ্ন অবস্থাতেই অন্যমনস্ক চার্চিল বললেন, কাম ইন। রুজভেল্ট বিবস্ত্র চার্চিলকে দেখে হতভম্ব। চার্চিল হাসি মুখে হাত বাড়িয়ে বললেন,Now you know Great Britain has nothing to hide from America, সেন্স অফ হিউমার বিব্রত পরিস্থিতিকে রক্ষা করেছিল। কাগজে নিশ্চয়ই পড়েছেন জ্যাকলিন ওনাসিস গ্রীসে তাঁর স্বামীর প্রাইভেট দ্বীপে যখন নগ্ন হয়ে সমৃদ্রস্নান করেছিলেন তখন রোমের এক প্রেস ফোটোগ্রাফার টিলিফোটো লেন্স দিয়ে ছবি তুলেছেন। সে ছবি সর্বত্র ছাপা হয়েছিল।

ভারতবর্ষের প্রাক্তন মার্কিন রাষ্ট্রদুত জন কেনেথ গলব্রেথ এ ঘটনার পর এক পার্টিতে জ্যাকিকে দেখে হেসে বলেছিলেন Hello jackie, I failed to recgnise you with your clothes on.

গ্রেটা গার্বো নগ্ন হয়ে সুইমিং পুলে সাঁতার কাটতে ভালবাসেন। স্বর্গীয় মেরিলিন মনরো নগ্ন হয়ে শুতে ভালবাসতেন। একজন রিপোর্টার প্রশ্ন করেছিল – You sleep without anything on?? মার্লিন জবাব দিয়েছিল, Of course not, I sleep with the radio on বুঝুন ঠ্যালা। আমেরিকার অনেক গৃহকর্মী স্বামী অফিস চলে গেলে নগ্ন হয়ে বাড়ির কাজকর্ম রান্না-বান্না করেন। Jaybird club আছে এই গৃহবধুদের জন্য। সেখানে বস্ত্র কাজকর্মে কি রকম বাধা সৃষ্টি করে তার আলোচনা হয়ে থাকে। নগ্নতাবাদের এই হিড়িকে বলা বাহুল্য হাস্যকৌতুকেও অনেক ‘নগ্ন কৌতুকী’-র সৃষ্টি হয়েছে। সেসব কৌতুকীর কিছু সংকলন করেছি। আপনাদের শোনাচ্ছি।-

একজন বললে : আমি নিউডিস্ট ক্লাবের প্রেসিডেণ্ট রবার্টসনের বাড়িতে গিয়েছিলাম। চাকর এসে দরজা খুলে দিলে।
বন্ধু : কি করে জানলে যে ও চাকর?
প্রথম ব্যক্তি : ঝি যে নয় সেটা তো স্পস্ট দেখতেই পাচ্ছিলাম।

বাবা মশা ছেলেমেয়েদের ডেকে বলল, দুষ্টুমী কর না, আজ তোমাদের পিকনিকে নিয়ে যাব, সেখানে প্রচুর খাবার পাবে। বুফে লাঞ্চ বলতে পারো।
মা মশা : কোথায় বলতো?
বাবা মশা : শহরের বাইরে নতুন একটা নিউডিষ্ট কলোনী খুলেছে, সেখানে।

স্বর্গে শার্লক হোম্‌সের ডাক পড়ল। ঈশ্বর বললেন, দেখহে, স্বর্গ থেকে ইভ উধাও হয়েছে। স্বর্গে গুজব হল পৃথিবীতে অনেক নগ্ন পল্লীর চলন হয়েছে সেখানে ইভ নিউডিস্টদের সঙ্গে যোগদান করেছে। শুনেছি হাজার হাজার নরনারী নগ্ন থাকছে। তাদের মধ্যে থেকে খুঁজে ইভকে ধরে আনতে পারবে?

ঈশ্বরের অনুমতি পেতেই হোমস্‌ পৃথিবীতে এসে এক ঘণ্টার মধ্যেই ইভকে ধরে এন হাজির করলেন ঈশ্বরের কাছে। ঈশ্বর অবাক। ঈশ্বর বললেন, হাজারো নগ্ন মেয়ের মধ্যে থেকে কি করে ইভকে খুঁজে বার করলে তুমি?

শার্লক হোমস্‌ বললে, এলিমেণ্টারী মাইলর্ড, আমি জানতাম ইভ এডামের হাড় থেকে জন্মেছে, মায়ের পেট থেকে ভূমিষ্ঠ হয়নি। ফলে ইভের নাভি থাকবে না। সুতরাং হাজার হাজার ন্যাংটো মেয়ের মধ্যে আমি সেই মেয়েটিকে খুঁজছিলাম যার নাভির ফুটো নেই। এর পর পেতে আর কষ্ট কি বলুন।
ঈশ্বর বলা বাহুল্য চমকিত ও চমৎকৃত হয়েছিলেন।

ইংলন্ডে ব্রাইটন অঞ্চলে একটা নিউডিস্ট কলোনীর বাইরে বোর্ড রয়েছে। তাতে লেখা Please bare with us.
নিউডিস্ট কলোনীতে একটি ছেলে ও মেয়ে হাত ধরাধরি করে হেঁটে যাচ্ছে।
ছেলেটি হঠাৎ বলল, এখন আমার দিকে তাকিও না। আমার মনে হচ্ছে আমি তোমার প্রেমে পড়ে গেছি।

নিউডিস্ট হনিমুন হোটেল। জোড়ায় জোড়ায় নগ্ন বাদী নব- বিবাহিত স্বামীস্ত্রীরা ঘর দখল করেছে। কোন ঘর আর খালি নেই। এরপর এক দম্পতি এল। ম্যানেজার বলল, ঘর সব বুক্‌ড হয়ে গেছে। খোলা ছাদে যেতে চান তো দরজা খুলে দিতে পারি। ওরা এখন যায় কোথায়? সুতরাং ছাদেই চলে গেল। ছাদে আলসে ছিল না। স্বামী স্ত্রী জড়াজড়ি করে চুমু খাওয়ার সময় উত্তেজনায় ধারে চলে আসে ও দুজনেই নিচে ফুটপাথে পড়ে যায়। পতনে দুজনেই সংজ্ঞা হারায়। এক মাতাল রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল। সে দুজনকে ওভারে জড়াজড়ি অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে দৌড়ে এসে হোটেলের কড়া নাড়ল। ম্যানেজার দরজা খুলতেই মাতাল বলল, আপনাদের হোটেলের সাইনবোর্ডটা নিচে পড়ে গেছে।

কৌতুকী আর কত দেব। streaking-এর এই হৈচৈ দেখে চমকাবার কিছু নেই। নগ্নতার আদি জন্ম এদেশেই। আমাদের ইতিহাসে, শিল্পে, কাব্যে, ধর্মে তার নজির রয়েছে। বৃটিশ সভ্যতার ভিক্টোরিয়ান যুগের মনোভাব এদেশে এখনও রয়ে গেছে। ফলে রক্ষণশীলতার আমরা আর এক extreme-এ পৌঁছে গেছি। এত ঢাক্‌-ঢাক্‌ও ভাল নয়। সম্প্রতি দিল্লীতে এক হোটেলে একজন বাথরুমে উর্কি দিচ্ছিল বলে ধরা পড়ে। পরে জানা যায় সে যে বাথরুমে উর্কি দিচ্ছিল তাতে যে মেয়েটি চান করছিল সে তারই স্ত্রী! ছ’বৎসর বিয়ে হয়েছে ওদের। কিন্তু স্বামী বেচারা এই ছ’বৎসরে তার স্ত্রীকে সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় একবারও দেখে নি। কি ট্র্যাজেডী। নিউডিজম্‌ এর আরেক অন্তিম।

নিউডিজমের গুণ অনেক। বয়ঃসন্ধির ছেলেদের পুরুষাঙ্গের দৈর্ঘ্য নিয়ে দুর্ভাবনায় মুখ ব্রনে ভরে যায়, মেয়েদের দুর্ভাবনা হল স্তনের উচ্চতা নিয়ে। দেহমুখী সাহিত্য ও দেহধর্মী বিজ্ঞাপন দেখে এই অর্থহীন মনোবিকার। নগ্নতার স্বাধীনতা থাকলে ওই সব বিকার লোপ পাবে। দেখুন রীতিমত কঠিন যুক্তি। দর্শনকাম বা প্রদর্শনকাতরতারও উপশম হবে। কি ঠিক কিনা?

আজেবাজে যৌন কাগজ কেউ পড়তে চাইবে না। ছবির বই কিনবে না লুকিয়ে লুকিয়ে। ‘প্লেবয়’-এর ব্লাকমার্কেট উঠে যাবে। তারপর ধরুন আমাদের এই শ্রেণী যুদ্ধের এক বিরাট অস্ত্র হল বস্ত্র। পোশাক দিয়েই চেনা যায় কে ধনী কন্যা আর কে গরীবের মেয়ে, কে মন্ত্রী আর কে সামান্য যন্ত্রী, কে অভিনেত্রী ও কে দেশনেত্রী, কে রাজা আর কে প্রজা, কে পুলিশ আর কে নক্সাল, কে শিক্ষক আর কে কৃষক, কে ছাত্রী আর কে ধাত্রী, কে মহারানী আর কে ডাক্তারনী, কে মহীয়সী আর কে পাপীয়সী, কে নায়ক আর কে গায়ক, কে গৃহবধূ আর কে বারবধূ। তাই না? পোশাক খুলে নিন, দেখবেন শুধু দুটোই শ্রেনী-নারী ও পুরুষ।

ঈশ্বরের সৃষ্ট এই শ্রেণীভেদ অবশ্য উচ্ছেদ করা সম্ভব নয়। (এই ভেদেই তো জীবনের বেদ রয়েছে। এই difference দেখেই তো ফরাসীতে সেই বিখ্যাত উক্তি রয়েছে Viva la difference,মানে জয় হোক এই ভেদের।)

রাজনৈতিক পণ্ডিতরা আশা করি আমার সাজেসান ভেবে দেখবেন। সাম্যবাদের প্রথম সিঁড়ি চড়তে হলে বস্ত্র ত্যাগ হল প্রধান উপায়। ধনীদের কাপড় ধরে টান দিন আগে, তারপর জমি ধরে টান দিন, তারপর অর্থের পুঁজির দিকে হাত বাড়ান।

নগ্নতার সপক্ষে সবচেয়ে বড় যুক্তি হল মেয়েদের শাড়ি কাপড়ের চাহিদার হাত থেকে রেহাই পাওয়া। ছেলেদের তাতে কি রকম টাকা বাঁচবে ভেবে দেখুন। বেনারসী দাও, সিফন দাও, সিল্ক দাও, কাঞ্জিভরম দাও, ভয়েল দাও, ম্যাক্সি দাও, লুঙ্গী দাও, মিনি দাও, বেলবট্‌স দাও, স্ট্রেচ প্যাণ্ট দাও, হট প্যাণ্ট দাও, সারারা দাও, আরও কত নিত্য নতুন ফ্যাশান অনুযায়ী নিত্য নতুন চাহিদা। ওসব থেকে মুক্তি পাবেন। স্বামীরা, বাবারা বেঁচে যাবেন। বিয়ের কনেকে চেলি পরতে হবে না, মন্ত্র পড়লেই চলবে, বাসরঘরে কনেকে দেখতে ঘোমটা তুলতে হবে না, চোখ তুললেই হবে।

কাপড় কেনার খরচই শুধু বাঁচবে না, কাপড় ধোওয়ার যাবতীয় খরচও বাঁচবে, সেলাইয়ের খরচও বাঁচবে। মেয়েদের নিজেদের মধ্যে ‘শাড়িটা খুব মিষ্টি। কোথা থেকে কিনেছ ভাই?’ জাতীয় যাবতীয় অর্থহীন বাক্য বিনিময় কমে যাবে। কম লাভ? সুতরাংstreaking-এর জয় হোক। এই নিবারণ থেকেই জাগরণ আসবে। আজকে যদি আমরা কাপড় খুলে এক হতে পারি, কালকে আমরা তাহলে হৃদয় খুলে এক হতে পারব। ঐক্যবদ্ধ ভারতের প্রথম পদক্ষেপ হল ঐক্যবদ্ধ নগ্নতা। streaking মানেই Awakeing সুতরাং মাভৈঃ।

স্ট্রিকিং [ Streaking ] শচীন ভৌমিক

শচীন ভৌমিক কে আরও পড়ুন:

মন্তব্য করুন