বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ১৯৫৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাস [ Speech of Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman, Year 1956, February ]

বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ১৯৫৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাস এর সংগ্রহ

বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ১৯৫৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাস

১৯৫৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাস – ১৫ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের গণপরিষদে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ [ করাচি, বুধবার, বিকেল ৩ টা ]

Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman : বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ১৯৫৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাস
Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman

করাচি, বুধবার, বিকেল ৩ টা

[প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন সংক্রান্ত প্রস্তাবিত সংশোধনী আলোচনার উদ্দেশ্যে মাননীয় ডেপুটি স্পিকার মিঃ সি.ই গিবন-এর সভাপতিত্বে করাচির অ্যাসেম্বলি চেম্বারে পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।]

মাননীয় ডেপুটি স্পিকার:

শেখ মুজিবুর রহমান।

শেখ মুজিবুর রহমান:

মহোদয়, জনাব আবুল মনসুর আহমদ কর্তৃক আনীত সংশোধনী প্রস্তাব সমর্থন প্রসঙ্গে আমি আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই …..।

মাননীয় ডেপুটি স্পিকার :

আপনার নিজের কি কোনো সংশোধনী প্রস্তাব নেই?

শেখ মুজিবুর রহমান:

জ্বি, মহোদ্বয়, রয়েছে। কিন্তু আমি সংশোধনী প্রস্তাবটি সম্পর্কে কিছু বলতে চাই।

মাননীয় ডেপুটি স্পিকার:

প্রথমটি সম্পর্কে?

শেখ মুজিবুর রহমান:

জ্বি, প্রথমটি সম্পর্কে।

মহোদয়, যদিও আমার বন্ধু জনাব জহিরুদ্দিন যৌথ নাকি পৃস্তক নির্বাচকমন্ডলীর প্রশ্নে আমাদের সিদ্ধান্তে উপনীত না-হওয়া পর্যন্ত এক্ষণে এই ধারা নিয়ে আলোচনা না-করার জন্য সরকার পক্ষকে অনুরোধ জানিয়েছিলেন, তথাপি তারা এই ধারা নিয়ে আলোচনার জন্য আমাদের বাধ্য করেছেন। মহোদয়, আমাদের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমাদের মরা-বাঁচার প্রশ্ন।

নিশ্চিত সমঝোতার ভিত্তিতে আমরা সমতার (Parity) প্রশ্নে সম্মত হয়েছিলাম, বলা হয়েছিলো সর্বত্র তথা সব ক্ষেত্রেই আমাদের জন্য সমতা নিশ্চিত করা হবে, ‘কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ করা হনি। সমতার যে মৌলিক নীতির ওপর আমরা সমতা বিধানের প্রশ্নে সম্মত হয়েছিলাম সেই মৌলিক নীতিই তারা ভঙ্গ করেছেন। সেই কারণে আমরা আর সমতা চাই না।

আমরা চাই জনসংখ্যার ভিত্তিতে প্রতিনিধিত্ব, কারণ আমি আগেই বলেছি এটা হলো গিয়ে পূর্ব বাংলার মানুষের জন্য এক অপরিহার্য, গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। শাসনতন্ত্রে আমরা কী ধরনের নির্বাচকমন্ডলী পেতে যাচ্ছি সেইটি আগে স্থির হওয়া দরকার, আমরা কি যৌথ নির্বাচকমন্ডলী না কি পৃথক নির্বাচকমন্ডলীর বিধান রাখতে যাচ্ছি।

এটা স্থির না হওয়া পর্যন্ত বিবেচনাধীন ধারা সম্পর্কে আলাচনা অর্থহীন। যদি তারা বলেন যে, মুসলমানরা একটি জাতি তাহলে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মুসলমানদের মধ্যে অবশ্যই সমতা রক্ষা করতে হবে। যদি তারা বলেন হিন্দুরা একটি জাতি তাহলে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের হিন্দুদের ক্ষেত্রেও সমতা রক্ষা করতে হবে। যদি তারা বলেন খ্রিষ্টান সম্প্রদায় একটি জাতি তাহলে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের খ্রিষ্টানদের ক্ষেত্রেও সমতা বিধান করতে হবে।

প্রশ্ন হলো মোট জনসংখ্যার শতকরা ৫৬ ভাগ রয়েছে পূর্ব বাংলায় আর শতকরা ৪৪ ভাগ রয়েছে পশ্চিম পাকিস্তানে; কিন্তু শুভেচ্ছার নির্দশন স্বরূপ সহযোগিতা প্রদানও ভ্রাতৃত্ববোধের কারণে এবং সর্বোপরি আমরা পাকিস্তানিরা ভাই-ভাই হিসেবে একসঙ্গে বাস করতে চাই এই মনোভাব প্রদর্শনের জন্য আমরা সমতার প্রশ্নটি মেনে নিয়েছিলাম। কিন্তু শাসক-চক্র যারা সরকার নিয়ন্ত্রণ করছে তারাই রাজনৈতিক অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে এবং সেই কারণে পাকিস্তানের কোনো কোনো জনগোষ্ঠীর মধ্যে সন্দেহ বিরাজ করছে এবং আমরা সম্প্রতি, শুভেচ্ছা ও সহযোগিতার উদ্দেশ্যে সমতার প্রশ্নে সম্মত হয়েছিলাম। আমরা পাকিস্তানির এবং সর্বোপরি আমরা পাকিস্তানিই বটে।

মাননীয় ডেপুটি স্পিকার:

এসব কথা আপনি আগও বলেছেন।

শেখ মুজিবুর রহমান:

এসব কথা পুনরাবৃত্তি আমাকে করতেই হবে, কারণ পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের জন্য এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এবং আমি আমরণ এ প্রশ্নের এই দিকটির প্রতি তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেই যাবো, কারণ তারা পাকিস্তানকে একেবারে শেষ করে ফেলেছে। আপনারা উভয় পক্ষের জন্য ৫০ : ৫০ হার স্থির করেছেন। ১৫০ টি আসনের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসবেন ৩০ জন হিন্দু সদস্য এবং পশ্চিম পাকিস্তানে ১৫টি আসনই যাবে মুসলমান সদস্যদের জন্য।

তাহলে মহোদয়, দেখুন যে এই পশ্চিম পাকিস্তানি নেতারা আমাদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে শাসন করতে চান। এটা সহ্য করা অসম্ভব। তাঁরা যৌথ বা পৃথক নির্বাচকমন্ডলীর প্রশ্নটির বিষয়ে আগে সিদ্ধান্ত না নিয়ে হাউসের অপরণ পক্ষে যেসব পূর্ব পাকিস্তানি নেতা তাঁদের সঙ্গে এখন বসে রয়েছেন তাদের ধোঁকা দিতে চান। তাঁরা যখন এই ধারার কথাই তুলেছেন তখন প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নটি অবশ্যই জনসংখ্যার ভিত্তিতে স্থির করতে হবে। আপনারা তা করছেন না কেন?

আপনারা দাবি করছেন আপনাদের দেশ একটি গণতান্ত্রিক দেশ, আপনার দাবি করছেন এটা ইসলামি দেশ; আপনারা দাবি করছেন এটা ন্যায়বিচারের দেশ; আপনারা সকলের প্রতি ন্যায়বিচার করবেন। এইটে যদি সত্য হয় তাহলে, মহোদয, আপনি অব্যশই গণতান্ত্রিক নীতিমালা মানবেন। আপনাকে অবশ্যই মানতে হবে যে জনসংখ্যা অনুসারেই প্রতিনিধিত্ব হওয়া বাঞ্জনীয়। মহোদয়, আমি আপনার মাধ্যমে তাদের কাছে জানতে চাইআমাদের এই দাবি তাঁরা মেনে নিচ্ছে না কেন? তাঁরা বলছেন, কোনো সমতা-টমতা নয়। এ ধরনের কথা বলার কারণ কি?

[ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ১৯৫৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাস [ Speech of Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman, Year 1956, February ] ]

আমার বন্ধুরা ইতোমধ্যে যথার্থই করেছেন যে আমরা যখন চাকুরিতে সমতার কথা বলেছি তখন তাঁরা তা ধন্যবাদের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেছেন; যখন আমরা ব্যবসায়-বাণিজ্যে সমতার প্রশ্ন তুলেছি তখন তাঁরা ধন্যবাদের সঙ্গে তাতে অসম্মতি জানিয়েছেন এবং আমরা যখন অন্য কিছু চেয়েছি তখনও তাঁরা ধন্যবাদ জানিয়ে এড়িয়ে গেছেন। তাঁরা বলেন যে, আমাদের তাঁরা যেটুকু দেবেন সেটুকুই আমাদের গ্রহণ করা উচিত। আমাদের এখন আমাদের অধিকার না করার সময় এসেছে।

অতীতে আমরা যেসব ভুল করেছি তা ভুলে গিয়েছি, কিন্তু আর নয় আমরা এখন আর কোনো রকম ভুল করতে যাচ্ছি না। আমরা বিরোধী পক্ষের বন্ধুদের বিশ্বাস করে ভুল করেছিলাম, যারা আমাদের পশ্চিম পাকিস্তানী বন্ধু নয় বরং পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকচক্র। এখন তাঁরা আমাদের শাসন করতে চান। এটিই আমার বক্তব্যের মূল কথা। আমি আপনাকে বলতে চাই যে, সমতার প্রশ্নটি এখন আর নেই। আমার পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ-সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং সে কারণে আমরা অবশ্যই জনসংখ্যার ভিত্তিতে প্রতিনিধিত্ব চাইবো। তাঁরা যদি অস্বীকৃতি জানান, আমাদের বলার কিছুই নেই।

আমরা জানি যে এ ব্যাপারে আমাদের ইউনাইটেড ফ্রন্টের বন্ধুদের সাহায্য-সহযোগিতা তারা পাবেন, যাঁদের কাউকে কাউকে মন্ত্রী করা হচ্ছে এবং তাঁরা বলতে পারেন “ঠিক আছে, আমরা মন্ত্রিত্ব পেয়েছি, আমরা তাঁদের পক্ষেই ভোট দিব।” কিন্তু সময় আসছে এবং তা ঘনিয়েই আসছে, তাঁরা পরিণাম ভোগ করবেন। এইটুকু বলে আমি জনাব আবুল মনসুর আহমদ-এর আনীত সংশোধনী প্রস্তাবটির প্রশংসা করছি ও তা সমর্থন করছি।

মাননীয় আব্দুল লতিম বিশ্বাস (পূর্ব বাংলা : মুসলিম):

মহোদয়, আমি কিছু বলতে …..

শেখ মুজিবুর রহমান:

আপনি আমাদর না-খাইয়ে মেরে ফেলেছেন।

মাননীয় ডেপুটি স্পিকার:

আপনি কি অনুগ্রহ করে এ কথা প্রত্যাহার করে নিবেন?

শেখ মুজিবুর রহমান:

মহোদয়, আমি বলেছি যে তিনি খাদ্যমন্ত্রী, অথচ আমরা না খেয়ে আছি। এটা কি অসংসদীয় ভাষা?

মাননীয় ডেপুটি স্পিকার:

এটা অসংসদীয় ভাষা নয়, তবে এটা নির্দয় মন্তব্য।

শেখ মুজিবুর রহমান:

এটা কটাক্ষ নয়।

মাননীয় ডেপুটি স্পিকার :

অনুগ্রহ করে আপনার মন্তব্য প্রত্যাহার করুন।

শেখ মুজিবুর রহমান :

আপনি যদি বলেন যে এটি নির্দয় মন্তব্য তাহলে আমি ভবিষ্যতে আমার বন্ধুর প্রতি দয়া প্রদর্শন করবো।

মাননীয় ডেপুটি স্পিকার :

মাননীয় সদস্যের সময় শেষ হয়ে গেছে।

জনাব জহিরুদ্দিন :

আমি মাত্র এক মিনিট সময় নেব। তাহলে, মহোদয়, সর্বপ্রথম আমার আপত্তি হলো প্রদেশিক স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে আপনি অনভিপ্রেত হস্তক্ষেপ করছেন যদি তা ইচ্ছাকৃতভাবে করা হয়ে থাকে। আর যদি তা ভুল হয়ে থাকে তাহলে অবশ্যই তা সংশোধন করতে হবে। আমার দ্বিতীয় অভিযোগটি হলো আমি সম্পূর্ণ নিশ্চিত যে আপনি এখানে একটা ভুল করছেন এবং আপনি যদি উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ না করেন তাহলে একটি চতুর সরকার আপনাকে যথেষ্ট ভোগাবে। এইটুকু বলেই আমি সংশোধনীটি সমর্থন করছি।

[ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ১৯৫৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাস [ Speech of Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman, Year 1956, February ] ]

শেখ মুজিবুর রহমান :

আমি এই মর্মে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই যে এটা তাঁরা ভুলবশত : বাদ দেননি; আমার কথা হলো তাঁরা ইচ্ছাকৃতভাবেই এর জন্য কোনো ব্যবস্থা রাখেননি। আমার বন্ধু সরদার আমির আজম খান-এর সংশোধনী প্রস্তাব থেকে আমি এ কথা প্রমাণ করতে পারি। মহোদয়, আমাদের এখানে নিটি লিস্ট রয়েছে- ফেডারেল লিস্ট, ঐকমত্য লিস্ট (Concurrent List) এবং প্রাদেশিক লিস্ট। এখন, মহোদয়, শাসনতন্ত্রে সুস্পষ্টভাবে লিখিত রয়েছে যে, আমরা প্রদেশগুলোকে কিছু ক্ষমতা প্রদান করছি।

কিন্তু মহোদয়, তাঁরা এই ধারা বলে অত্যন্ত চমৎকারভাবে ও সুকৌশলে কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে ক্ষমতা নিয়ে গেছেন। এখন, মহোদয়, এখানে লেখা হয়েছে যে সংসদ কোনো বিল পাশ করলেও তাতে সম্মতি প্রদানের জন্য তা গভর্ণরের নিকট প্রেরিত হবে। তিনি সম্মতি প্রদান করতে পারেন অথবা তিনি যা করতে পারেন তা হলো তিনি সম্মতি প্রদানের বিষয়টি ধরে রাখতে পারেন। গভর্ণর যদি তাঁর সম্মতি প্রদানের বিষয়টি ধরে রাখেন তাহলে সেটি পুনরায় আইনসভায় প্রেরিত হবে ……..

মাননীয় ডেপুটি স্পিকার :

আমি তা জানি।

শেখ মুজিবুর রহমান :

আপনি তা জানেন, কিন্তু তাঁরা বুঝতে পারছেন না। আমি তাদের বোঝাতে চেষ্টা করছি, আপনাকে নয়। আমার সম্মানীর বন্ধু জনাব জহিরুদ্দিন-এর বক্তব্য থেকে আপনি ইতোমধ্যে বুঝে ফেলেছেন, কিন্তু তাঁদের বোধগম্য হচ্ছে না……

মাননীয় ডেপুটি স্পিকার:

ভাগ্য পরীক্ষা করুন!

শেখ মুজিবুর রহমান :

মহোদয়, আমাদের দুর্ভাগ্য যে আমরা যা বলছি তাঁরা তা অনুধাবন করতে পারছেন না। আসল ব্যাপারটা হলো এখানে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, যদি প্রেসিডেন্ট তাঁর সম্মতি প্রদান থেকে বিরত থাকে তাহলে কী হবে……। আইনসভার কি এটা আলোচনা বা বিবেচনা বা পুনরায় পাশ করার ক্ষমতা রয়েছে?

তারপরে ঐকমত্য লিস্টের ক্ষেত্রে, গভর্ণর হয় বিলে তাঁর সম্মতি প্রদান করবেন নতুবা প্রেসিডেন্টের বিবেচনার জন্য বিলটি সংরক্ষণ করতে পারবেন। এখন, যদি এখানে লেখা থাকতো যে এটা ঐকমত্য লিস্টের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যাবে তাহলে এর কিছু অর্থ থাকতো; এ মর্মে তাঁরা কিছুই লেকেননি যাতে করে এমন কি প্রাদেশিক লিস্টের বিষয়াবলির ক্ষেত্রেও প্রেসিডেন্ট ভেটো (Veto) দিতে পারেন।

[ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ১৯৫৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাস [ Speech of Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman, Year 1956, February ] ]

মহোদয়, এখন কি আমাদের বুঝতে হবে এটা প্রাদেশিক লিস্ট না কি ঐকমত্য লিস্টের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে? যদি প্রাদেশিক লিস্ট কেন্দ্রের পরামর্শ অনুসারে কাজ করবেন।

মাননীয় ডেপুটি স্পিকার :

এবং গভর্ণরও তাঁর মন্ত্রীপরিষদের পরামর্শক্রমে কাজ করবেন।

শেখ মুজিবুর রহমান :

মহোদয়, গভর্ণরের বাস্তবিকপক্ষেই কোনো ক্ষমতা নেই; গভর্ণর হচ্ছেন প্রেসিডেন্টের এজেন্ট। গভর্ণর প্রদেশের জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি নন….

মাননীয় ডেপুটি স্পিকার :

আপনি কি বলতে চাইছেন যে প্রেসিডেন্ট প্রাদেশিক মন্ত্রীদের পাশাপাশি এমন ব্যক্তিকে প্রদেশের গভর্ণর হিসেবে নিয়োগ করতে পারেন যিনি আস্থাভাজন বা গ্রহণযোগ্য নন (Persona non-grate).

শেখ মুজিবুর রহমান :

তাঁরা বিগত আট বছর ধরে এটা করে আসছেন। সেই একই লোকজন ক্ষমতায় আসীন এবং একমাত্র আল্লাহ-ই জানেন তাঁরা আর কত দিন সুনিপুন কৌশল, চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র করে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকবেন এবং একমাত্র আল্লাহ-ই জানেন পাকিস্তানকে এই চক্রান্ত থেকে রক্ষা করা যাবে কি না! এটাই আমার অভিমত বা দৃষ্টিভঙ্গি।

এরপর মহোদয়, ঐকমত্য লিস্টের কথা ধরা যাক। মহোদয়, ঐকমত্যের লিস্ট প্রাদেশিক লিস্ট নয়। ঐকমত্য লিস্টের ব্যাপারে প্রদেশের কিছুই করার নেই, এটা কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে রয়েছে। এই ধারার ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ গভর্ণর সব সময়ই প্রেসিডেন্টের নিকট প্রেরণ করতে পারেন এবং প্রেসিডেন্ট যদি মনে করেন, তাঁর সম্মতি প্রদানের বিষয়টি ধরে রাখতে পারেন। কেন্দ্রীয় সরকারের এজেন্ট বা প্রতিনিধির মাধ্যমে প্রাদেশিক বিষয়াবলী কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে এসেছে।

[ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ১৯৫৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাস [ Speech of Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman, Year 1956, February ] ]

জনাব জহিরুদ্দিন, এটা কোনো ভুল নয়; এর পেছনে রয়েছে দুরভিসন্ধি : তাঁরা বলতে চান যে তাঁরা প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন দিচ্ছেন, আবার একই সময় তাঁরা প্রদেশের হাত থেকে সব বিষয় কেন্দ্রের হাতে নিয়ে যাচ্ছেন। আমি বলতে চাই জনগণ এত বোকা নয় যে তারা বুঝতে পারবে না কী করা যাচ্ছে; আপনারা এ দিকের জনগণকে ধোঁকা দিতে পারবেন না, কারণ তারা শাসনতন্ত্রের কিছুটা বোঝে এবং তারা জানে আপনারা কিভাবে দিচ্ছেন আর কিভাবে তা নিয়ে যাচ্ছেন। আপনারা শাসনতন্ত্রে বলছেন যে আপনারা একটি ধারা বলে কিছু দিচ্ছেন এবং আপনারা প্রদেশের যাবতীয় ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে নিয়ে যাচ্ছেন।

আমি বলতে চাই যে ঐকমত্য লিস্টের ক্ষেত্রে আপনারা ইচ্ছাকৃতভাবে লিখেছেন “For the consideration of the President” (প্রেসিডেন্টের বিবেচনার জন্য)। এর কিছু অর্থ থাকতে পারে। ঐক্যমত্য লিস্ট বা প্রাদেশিক লিস্টে কিছুই লেখা নেই। মহোদয়, আপনি জানেন প্রেসিডেন্টের সর্ব সময় ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার বিপদ কতখানি। পুনবিবেচনার জন্য কোনো ইস্যু এমন কি কেন্দ্রীয় আইনসভার নিকটও প্রেরণ করা হবে না। তাহলে তা আবর্জনার ঝুড়িতে ফেরে দেওয়ার হবে। এমনকি প্রাদেশিক আইনসভাও আত্মসমর্পণ করবে। আমি তাঁদের অনুরোধ করবো এই বিষয়টি বোঝার জন্য এবং জনগণকে তাঁরা কিভাবে ধোঁকা দিচ্ছেন তা অনুধাবন করা জন্য।

মাননীয় সরদার আমির আজম খান :

আমরা আমাদের বক্তব্য পেশ করতে পারি। মহোদয়, তাঁরা বিভ্রান্তির মধ্যে রয়েছেন এবং জনগণের মনেও তাঁরা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছেন।

(বক্তব্যকালে বাঁধা প্রদান)।

মাননীয় ডেপুটি স্পিকার :

(বিরোধী দলকে সম্বোধন করে): আপনারা বলছেন যে তাদের স্বভাব একটুতেই আহত হওয়া, কিন্তু আমি লক্ষ্য করছি যে আপনারাই আরও বেশি আহত হন।

শেখ মুজিবুর রহমান :

আমরা এতই অভিমানী যে কখনও কখনও সংসদের আমরা মরে যাওয়ার কথা ভাবি।

[ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ১৯৫৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাস [ Speech of Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman, Year 1956, February ] ]

১৯৫৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাস – ২৮ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ

করাচি, মঙ্গলবার, বিকাল-৩-০০ মিঃ, ২৮.০২.১৯৫৬

[জাতীয় সংসদে মহিলা-আসন সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়ে আলোচনার জন্য মাননীয় স্পিকর আব্দুল ওহাব খান-এর সভাপতিত্বে করাচির অ্যাসেম্বলি চেম্বারে পাকিস্তান গণ-পরিষদের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।]

জনাব জহিরুদ্দিনঃ

অপেক্ষা করুন। উদ্বিগ্ন হবে না। এটা আসছে। তাহলে, মহোদয়, অবস্থাটা দাঁড়াচ্ছে…..

শেখ মুজিবুর রহমানঃ

মহোদয়, এ বিষয়ে আমি দীর্ঘ বক্তৃতা দিতে চাই না, কারণ আমার বন্ধু এ বিষয়ে ইতোমধ্যেই যথেষ্ট বলেছেন। আমি শুধু এটুকু জানাতে চাই যে, পূর্ব বাংলাদ সংসদে যেখানে ৩০৯ জন সদস্য রয়েছেন সেখানে ১২টি আসন মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত। অথচ আমরা আমাদের শাসনতন্ত্রে মহিলাদের জন্য ১০টি আসনের বিধান রাখছি। তাহলে অবস্থাটা কী দাঁড়াবে?

আমরা নির্বাচকমন্ডলীর প্রশ্নে-যৌথ নির্বাচকমন্ডলী হিসাবে না কি পৃথক নির্বাচকমন্ডলী এখনও পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি, তবুও সংখ্যাঘুদের জন্য কতটি আসন থাকবে? পৃথক নির্বাচকমন্ডলীর ভিত্তিতে আমাদের পূর্ববাংলা সংসদে ৯টি আসন মুসলিম মহিলারা এবং ৩টি আসন অ-মুসলিম মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত রয়েছে। সে কারণে আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানাই যে আমাদের পূর্ব বাংলাদ সংসদ যখন মহিলাদের জন্য ১২টি আসন সংরক্ষিত রয়েছে তখন আমাদের জাতীয় সংসদে তাদের জন্য ২০টি আসন সংরক্ষণ করা হলে কী ক্ষতি রয়েছে, কারণ তারা পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক।

আমাদের মোল্লা সাহেবেরা এ ব্যাপারে ফতোয়া দিতে পারে এবং সরবে প্রতিবাদ করতে পারে, কারণ আমরা লক্ষ্য করছি যে কেউ কেউ বলা শুরু করে দিয়েছে যে আমাদের মেয়েদের গৃহের অভ্যন্তরেই থাকতে হবে এবং তাদের রাজনীতিতে নামা উচিত হবে না। এই কারণে আমি মাননীয় শিল্পমন্ত্রীর একটি পরামর্শ দানের কথা ভাবছিলাম, আর তা হলো তিনি যেন অসংখ্য বোরকা তৈরি করার নির্দেশ দান করেন। কারণ এ মোল্লারা যতই মহিলাদের ঘরের ভিতর থাকতে বলবে, ততই বেশি সংখ্যক বোরকার প্রয়োজন হবে।

[ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ১৯৫৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাস [ Speech of Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman, Year 1956, February ] ]

অতএব, মহোদয়, জাতীয় সংসদে মহিলাদের জন্য ২০টি আসন সংরক্ষণের বিষয় আমার বন্ধু জনাব জহিরুদ্দিন আনীত সংশোধনী প্রস্তাবটি সমর্থনের জন্য আমি তাদের প্রতি আবেদন জানাচ্ছি। কারণ মহিলারা আমাদের বোন এবং তাদেরও সমান অধিকার রয়েছে। তারাও পাকিস্তানের সমঅধিকার সম্পন্ন নাগরিক। তাদের জন্য যদি আমরা এইটুকু নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে না পারি? তা নাহলে পুরুষদের সঙ্গে উন্মুক্ত আসনের জন্য জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা তাদের পক্ষে কঠিন হবে।

আমরা যদি জনাব জহিরুদ্দিন এর সংশোধনী প্রস্তাবটি গ্রহণ করি, তাহলে আমাদের মহিলাদের জন্য একটা বড় ধরনের উপকার করা হবে এবং তা দেশের উন্নয়নের জন্যেও ভালো হবে এবং এইভাবে দেশের মুক্তির জন্য নারী ও পুরুষ একই সঙ্গে কাজ করতে পারবে।

জনাব ইউসুফ এ, হারুনঃ  মহোদয়, মনে হচ্ছে যে, বিরোধী দলের মাননীয় সদস্যরাই কেবল আমাদের নারী সমাজের অধিকারে একমাত্র সমর্থক।

শেখ মুজিবুর রহমান ঃ

আপনারা তো কেবল করাচির মহিলাদের অধিকারে সমর্থক।

মাননীয় ডেপুটি স্পিকার ঃ

শেখ মুজিবুর রহমান।

শেখ মুজিবুর রহমান ঃ

মহোদয়, জনাব ইউসুফ হারুন আনীত সংশোধন প্রস্তাব একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কিত এবং আমি নির্দিষ্ট বিষয়ে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। যাতে করে তিনি বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে পারেন। মহোদয়, একটি সংশোধনীতে বলা হয়েছে ঃ

“প্রধান নির্বাচন কমিশনার জাতীয় সংসদের সভায় সভাপতিত্ব করিবার জন্য প্রিজাইডিং অফিসার নিয়োগ করিবেন, যাহা করাচিতে অনুষ্ঠিত হবে এবং পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সভায় সভাপতিত্ব করিবার জন্য প্রিজাইডিং অফিসার নিয়োগ করিবেন, যাহা যথাক্রমে ঢাকা ও লাহোরে অনুষ্ঠিত হইবে।”

[ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ১৯৫৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাস [ Speech of Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman, Year 1956, February ] ]

মহোদয়, জাতীয় সংসদে থাকবেন একজন স্পিকার এবং স্পিকারেরই উচিত হবে প্রেসিডন্টে নির্বাচনের সভাপতিত্ব করা। আবার দেখা যাচ্ছে যে প্রধান নির্বাচন কমিশার প্রেসিডেন্ট কর্তৃক নিযুক্ত হন এবং আমরা ইতোমধ্যেই এই বিধান পাশ করছি যে, প্রেসিডেন্ট-নির্বাচনের বিষয়ে কোনো আইন-আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে না। তাহলে মহোদয়, এখন প্রশ্ন দাঁড়াচ্ছে যে, আইনসভা ও জাতীয় সংসদ উভয় ক্ষেত্রেই আমাদের হাউসের কার্যপ্রণালী রয়েছে। তাঁদের যুক্তি এমন হতে পারে যে, স্পিকার ভোট দান করতে পারবেন না কারণ তিনি হাউসের একজন সদস্য। কিন্তু মহোদয় কার্যপ্রণালী অনুসারে স্পিকারেরই উচিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সভাপতিত্ব করা। কারণ হাউসের যাবতীয় অনুষ্ঠানে তাঁকে সভাপতিত্ব করতে হবে।

(এই পর্যায়ে দুজন মাননীয় সদস্য নিজেদের মধ্যে কোনো কিছু আলোচনায় ব্যাপৃত ছিলেন এবং মাননীয় সদস্য শেখ মুজিবুর রহমান তা দেখে ফেলেন।)

শে মুজিবুর রহমান ঃ আমি দুঃখিত, আমাদের যুক্তি শোনার প্রতি তাঁদের কোনো আগ্রহ নেই। কারণ হাউসের এই পক্ষ থেকে আমরা কী বলতে পারি, তার তোয়াক্কাও করছেন না এবং তা শুনতেও আগ্রহীন নন। তাহলে, মহোদয়, অবস্থাটা এখন দাঁড়াচ্ছে যে প্রেসিডেন্ট প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিযুক্ত করবেন এবং এই প্রধান কমিশনার প্রিজাইডিং অফিসারদের নিয়োগ দান করবেন, যাঁরা সংসদের সভায় সভাপতিত্ব করবেন এবং প্রাদেশিক পরিষদের সভাতেও সবাপতিত্ব করবেন। জাতীয় সংসদে আমাদের একজন স্পীকার তো রয়েছেনই।

[ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ১৯৫৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাস [ Speech of Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman, Year 1956, February ] ]

আও দেখুন:

মন্তব্য করুন