বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ১৯৭০ সালের অক্টোবর মাস [ Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman Speech : 1970, October]

বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ১৯৭০ সালের অক্টোবর মাস – সংগ্রহ

বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ১৯৭০ সালের অক্টোবর মাস [ Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman Speech : 1970, October]

১৯৭০ সালের ২৮ অক্টোবর সাধারণ নির্বাচন প্রাক্কালে বঙ্গবন্ধুর রেডিও-টিভি ভাষণ

[সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনের প্রাক্কালে পাকিস্তান টেলিভিশন সার্ভিস ও রেডিও পাকিস্তান কর্তৃক আয়োজিত “রাজনৈতিক সম্প্রচার” শীর্ষক বক্তৃতামালায় পাকিস্তান আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম বক্তা ছিলেন। ২৮ অক্টোবর, ১৯৭০ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বেতার ও টিভিতে নিন্মলিখিত ভাষণ দেন। পূর্ব পাকিস্তানের শ্রোতাদের জন্যে বাংলায় ও পশ্চিম পাকিস্তানের শ্রোতাদের জন্যে ইংরেজিতে রেকডিং করা হয়। বাংলা ভাষণের পূর্ণ বিবরণ নিম্নরূপ।]

বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ১৯৭০ সালের অক্টোবর মাস [ Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman Speech : 1970, October]যে সঙ্কট আজ জাতিকে গ্রাস করতে চলেছে তার প্রথম কারণ, দেশবাসী রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। দ্বিতীয়, জনগণের এক বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ অর্থনৈতিক বৈষম্যের কবলে পতিত। তৃতীয়, অঞ্চলে অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বৈষ্যমের জন্যে সীমাহীন অবিচারের উপলদ্ধি জন্মেছে। প্রধানতঃ এগুলোই বাঙ্গালীর ক্ষোভ অসন্তোষের কারণ। পশ্চিম পাকিস্তানের অবহেলিত মানুষেরও আজ একই উপলদ্ধি।

আওয়ামী লীগের মেনিফেষ্টোতে এসব মৌলিক সদস্যা সমাধানের একটা সুষ্পষ্ট পথনির্দেশ করা হয়েছে। দেশে প্রকৃত প্রাণবন্ত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতেই হবে। সেই গণতন্ত্র মানুষের সকল মৌলিক স্বাধীনতা শাসনতান্ত্রিকভাবে নিশ্চিত করা হবে। আমাদের মেনিফেষ্টোতে রাজনৈতিক দল, শ্রমিক সংস্থা, স্থানীয় স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের সুষ্ঠু বিকাশের রূপরেখা নির্দেশ করা হয়েছে। সংবাদপত্র ও শিক্ষার পূর্ণ স্বাধীনতায় আমরা বিশ্বাসী। সমাজে ক্যান্সারের মত যে দূর্ণীতি বিদ্যামান তাকে নির্মূল করতে আমরা দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ।

বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় শোষণ ও অবিচারের যে অসহনীয় কাঠামো সৃষ্টি করা হয়েছে, অবশ্যই তার আমূল পরিবর্তন সাধন করতে হবে। জাতীয় শিল্প সম্পদের শতকরা ৬০ ভাগের অধিক আজ দু’ডজন পরিবার করায়ত্ত্ব করেছে। ব্যাংকিং সম্পদের শতকরা ৮০ ভাগ এবং বীমা সম্পদের শতকরা ৭৫ ভাগ এ দুই পরিবারের কুক্ষিগত। ব্যাংকের লগ্নীকৃত অর্থের শতকরা ৮২ ভাগ আজ মোট জমাকারীদের মাত্র শতকরা ৩ জনের মধ্যে সীমাবন্ধ। দেমে যে করপ্রথা কায়েম রয়েছে, তা বিশ্বের সবচাইতে পশ্চাদমুখী ব্যবস্থা।

বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলিতে যখন প্রত্যক্ষ করের মাধ্যমে মোট জাতীয় উৎপাদনের শতকরা ৬ ভাগ আদায় করা হয় সেক্ষেত্রে আমাদের দেশে প্রত্যক্ষ করের মাধ্যমে মোট জাতীয় উৎপাদনের শতকরা ২ ভাগ অর্থ আদায় হয়। অপরপক্ষে, লবণের মত অত্যাবশ্যকীয় দ্রব্যাদির উপরেও নিপীড়নমূলক পরোক্ষ কর বসানো হয়েছে। সংরক্ষিত বাজার, ট্যাক্স হলিডে, বোনাস ভাউচারের বিপুল পরিমাণে সাবসিডি প্রদান এবং কৃত্রিমভাবে নিম্নহারে বিদেশী মুদ্রার ঋণ, অর্থ বরাদ্দ প্রভৃতি ব্যবস্থা একচেটিয়াবাদ ও কার্টেল প্রথার সুযোগ করে দিয়েছে।

ছিটেফোঁটা ভূমি সংস্কার সত্ত্বেও সামন্ত প্রভূরা রাজকীয় ঐশ্বর্যের অধিকারী রয়েছেন। তাঁরা সীমাহীন সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছেন। তাঁদের সমৃদ্ধি ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। কিন্তু তারই পাশাপাশি অসহায় দরিদ্র কৃষকের অবস্থার দিন দিন অবনতি ঘটেছে। কেবলমাত্র বেঁচে থাকার তাগিদে জনসাধারণ দিনের পর দিন গ্রাম ছেড়ে শহরে বলে আসছে। সরকারী পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশের মোট শ্রমশক্তির একপঞ্চমাংশ অর্থাৎ প্রায় ৯০ লক্ষ শ্রমজীবি মানুষ আজ বেকার। জীবনযাত্রার দ্রুত ব্যয়বৃদ্ধির সম্পূর্ণ চাপ এসে পড়েছে শিল্প শ্রমিক মেহনতি সম্প্রদায়ের উপর। মুদ্রা মজুরী যা বাড়ছে তার তুলনায় জীবনযাত্রার ব্যয় দ্রুতগতিতে বেড়ে চলেছে। জীবনযাত্রার সীমাহীন ব্যয় বৃদ্ধির চাপ স্কুল কলেজের শিক্ষক, স্বল্প বেতনভুক্ত কর্মচারী, বিশেষ করে চতুর্থ শ্রেণীর সরকারী কর্মচারী আজ হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করছেন।

অর্থনৈতিক বৈষম্যের ভয়াবহ চিত্রের দিকে তাকালে দেখা যাবে গত বাইশ বছরে সরকারী রাজস্ব খাতের মোট ব্যয়ের মাত্র পনেরো শত কোটি টাকা মত (মোট ব্যয়ের পঞ্চমাংশ) বাংলাদেশে খরচ করা হয়েছে। অথচ এর পাশাপাশি পশ্চিম পাকিস্তানে খরচ করা হয়েছে পাঁচ হাজার কোটি টাকারও বেশি। দেশের সর্বমোট উন্নয়ন ব্যয় খাতে বাংলাদেশের মোট ব্যয়ের এক তৃতীয়াংশ অর্থাৎ মাত্র তিন হাজা কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। পশ্চিম পাকিস্তানে ব্যয় হয়েছে ছয় হাজার কোটি টাকা।

বিশ বছরে পশ্চিম পাকিস্তানে তেরো শত কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা আমদানী করেছে। বাংলাদেশের তুলনায় পশ্চিম পাকিস্তানে তিনগুণ বেশি বিদেশী দ্রব্য আমদানী করা হয়েছে। নিজস্ব বিদেশী মুদ্রা আয়ের চাইতেও পশ্চিম পাকিস্তান বাড়তি দু’হাজার কোটি টাকা মুল্যের বিদেশী দ্রব্য আমদানী করতে পেরেছে, তার কারণ বাংলাদেশের অর্জিত পাঁচশ কোটি টাকার বিদেশী মুদ্রা পশ্চিম পাকিস্তান কুক্ষিগত করেছে। তার উপরেও সর্বপ্রকার বিদেশী সাহায্যের শতকরা ৮০ ভাগ পশ্চিম পাকিস্তানে ব্যবহৃত হয়েছে।

সরকারী চাকরী ক্ষেত্রের পরিসংখ্যানও ঠিক একই রকমের মর্মান্তিক। স্বাধীনতার তেইশ বছর গত হয়েছে কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরিতে বাঙ্গালীর সংখ্যা আজও মাত্র শতকরা ১৫ ভাগ। দেশরক্ষা সার্ভিসে বাঙ্গালীর সংখ্যা মাত্র ১০ ভাগেরও কম। সার্বিক অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এ প্রকট বৈষম্যের ফলে বাংলার অর্থনীতি আজ সম্পূর্ণরূপে ধ্বংসের মুখে। বাংলার বেশিরভাগ প্রামাঞ্চলের দুর্ভিক্ষজনিত অবস্থা বিরাজ করছে। জনগণকে শুধুমাত্র অনাহারের কবল থেকে রক্ষা করার জন্যে ১৭ লক্ষ টন খাদ্যশস্য আমদানি করতে হচ্ছে।

দেশে যে মুদ্রাস্ফীতি প্রকট থেকে প্রকটতর হচ্ছে তার শিকারে পরিণত হয়ে চলেছে বাংলার অসহায় মানুষ। পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশে অত্যাবশ্যকীয় দ্রব্যের মূল্য শতকরা ৫ থেকে ১০০ ভাগ বেশি। পশ্চিম পাকিস্তানে যেক্ষেত্রে মোটা চাউলের দাম ২০ টাকা থেকে ২৫ টাকা সেক্ষেত্রে বাংলাদেশে ঐ একই চাউলের দাম গড়ে ৪৫ থেকে ৫০ টাকা। বাংলায় যে আটার দাম প্রতি মন ৩০ ে কে ৩৫ টাকা, পশ্চিম পাকিস্তানে তা ১৫ থেকে ২০ টাকা। পশ্চিম পাকিস্তানে প্রতি সের সরিষার তেলের দাম মাত্র আড়াই টাকা, কিন্তু বাংলাদেশে প্রতি সের তেলের দাম পাঁচ টাকা। করাচীতে যে সোনার দাম প্রতি ভরি ১৩৫ থেকে ১৪০ টাকা, ঢাকায় সে সোনার মূল্য প্রতি ভরি ১৬০ থেকে ১৭০ টাকা। তারপরেও পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বাংলার সোনা আনার ব্যাপারে কাষ্টমস এর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

গত বাইশ বছরে কেন্দ্রীয় সরকার দেশের অর্থনীতির যে কাঠামো গড়ে তুলেছেন এসব অবিচার তারই পুঞ্জিভূত ফলশ্রুতি। এ অবিচার দূর করার সাধ্য কেন্দ্রীয় সরাকারের নেই। এ সত্যটি প্রমাণিত হয়েছে চতুর্থ পাঁচসালা পলিকল্পনায়। কেন্দ্রীয় সরকার যত বড় শক্তিশালই হোক না কেন অতীতের অন্যায় অবিচার দূরীকরণে সে যে সম্পূর্ণ ব্যর্থ-চতুর্থ পরিকল্পনার ব্যয় বরাদ্দে সে ব্যর্থতার স্বীকৃতি লিপিবদ্ধ রয়েছে।

আওয়ামী লীগের ৬ দফা কর্মসূচী, যে, কর্মসূচী ছাত্রসমাজের ১১-দফা কর্মসূচীতে অন্তর্ভূক্ত রয়েছে সে কর্মসূচী আঞ্চলিক অন্যায়-অবিচারের বাস্তব সমাধানের পথনির্দেশ করেছে। কেন্দ্রীয় আমলাতন্ত্রে যেখানে বাংলার প্রতিনিধত্ব মাত্র শতকরা ১৫ ভাগ এবং দেশে যে ধরনের শাসন ব্যবস্থা কায়েম রয়েছে তাতে কেন্দ্রীভূত অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার কাছ থেকে সুবিচার আশা করা যায় না। বাংলাদেশ ও অন্যান্য অঞ্চলের রাজনৈতিক  প্রতিনিধিরা বৃহত্তর ব্যয় বরাদ্দ আদায়ের চেষ্টা করলে আঞ্চলিক উত্তেজনাই বৃদ্ধি পাবে এবং তার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হিসেবে ফেডারেল সরকারের অস্তিত্বই বিপন্ন হবে।

এ অবস্থায় সমস্যাসমূহের একমাত্র সমাধান হতে পারে শাসনতান্ত্রিক কাঠামোর পূনবির্ন্যাস করে এবং ফেডারেশনের ইউনিটগুলো আওয়ামী লীগের ৬ দফার ভিত্তিতে পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসন প্রদান করে। প্রস্তাবিত এ স্বায়ত্বশাসনকে পুরোপুরি কার্যকরী করার জন্যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ক্ষমতাও অবশ্যই দিতে হবে। এ জন্যেই মুদ্রা ব্যবস্থা ও অর্থনীতি এবং বিদেশী মুদ্রা অর্জনের উপর ফেডারেশনের ইউনিটগুলির নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতাদানের ব্যাপারে আমরা সব সময়ই গুরুত্ব দিচ্ছি।

এ কারণে আলাপ-আলোচনার ক্ষমতাও ফেডারেশনের ইউনিট সরকারগুলোর হাতে অর্পণ করা উচিত। এভাবে আমরা কেন্দ্রকে সন্দেহ, সংশয় ও বিভেদ সৃষ্টির অভিযোগের আঁওতার ঊর্ধ্বে রাখতে চাই। ফেডারেশনের ইউনিটগুলিকে অর্থনৈতিক ভাগ্যনিয়ন্ত্রণের পূর্ণ ক্ষমতা প্রদান, ফেডারেশন সরকারকে পররাষ্ট্র বিষয়, দেশরক্ষা বিষয় ও নিরাপত্তামূলক শর্ত সাপেক্ষে মুদ্রা ব্যবস্থার দায়িত্ব দিয়ে একটা ন্যায়সঙ্গত ভারসাম্যমূলক ফেডারেল সরকার পরিকল্পনা নিখিল পাকিস্তান সার্ভিস বিলোপ সাধন করা হবে এবং ফেডারেল সার্ভিস ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হবে!

জনসংখ্যার ভিত্তিতে সকল অঞ্চল থেকে ফেডারেল চাকরিতে লোক নিয়োগ করা হবে। আমরা আরও বিশ্বাস করি যে, ফেডারেশনের ইউনিটগুলি যদি মিলিমিয়া অথবা প্যারা-মিলিটারি বাহিনী গঠন করে, তবে তারা কার্যকরীভাবে জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার সাহায্য করতে সক্ষম হবে। আমাদের প্রস্তাবিত ফেডারেল পরিকল্পনা সংশয় ও বিরোধের অবসান ঘটিয়ে শক্তিশালী পাকিস্তানের নিশ্চয়তা বিধান করবে। যে অঞ্চলের মানুষ অপর অঞ্চলকে উপনিবেশ বা বাজার হিসেবে ব্যবহার করতে চান বোধগম্য কারণেই তারা আমাদের এ প্রস্তাবিত পরিকল্পনার বিরোধিতা করবেন। কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের পরিকল্পনা পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের পুর্ণ সমর্থন পাবে।

আমাদের বিশ্বাস, শাসনতান্ত্রিক ও কাঠামোর মাধ্যমইে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে দেশে একটা সামাজিক বিপ্লব ঘটানো সম্ভব এবং অন্যায়, অবিচার ও শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার প্রয়োজন মেটানোর জন্যে দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। এ উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যে বেশবাসীর কঠোর পরিশ্রম ও বিপুল ত্যাগ স্বীকারের প্রয়োজন। আমাদের ডাকে সাড়া দিয়ে দেশবাসী তখনই সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টায় আত্মনিয়োগ করবেন যখন ত্যাগ স্বীারের সাথে সাথে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি সকল শ্রেণী সকল অঞ্চলের মানুষের মধ্যে সমানভাবে বন্টন করার আশ্বাস আমরা দিতে পারবো! অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির অংশ নিশ্চিত করার জন্যে অর্থনৈতিক কাঠামোতে অবশ্যই আমূল পরিবর্তন আনতে হবে।

জাতীয়করণের নামে ব্যাংক ও বীমা কোম্পানীগুলোসহ অর্থনীতির মূল চাবিকাঠিগুলোকে জনগণের মালিকানায় আনা অত্যাবশ্যক বলে আমরা বিশ্বাস করি। অর্থনীতির সবক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ উন্নয়ন সাধিত হবে জনগণের মালিকানায়। নতুন ব্যবস্থায় শ্রমিকগণ শিল্প ব্যবস্থাপনায় ও মূলধন পর্যায়ে অংশীদার হবেন। বেসরকারি পর্যায়ে এর নিজস্ব ভূমিকা পালন করার সুযোগ রয়েছে। একচেটিয়াবাদ ও কার্টেল প্রথা সম্পূর্ণভাবে বিলোপ সাধন করতে হবে। কর ব্যবস্থাকে সত্যিকারের গণমুখী করতে হবে। সৌখিন দ্রব্যাদির ব্যাপারে কড়া নিধিনিষেধ আরোপ করতে হবে।

ক্ষুদ্রায়তন ও কুটির শিল্পকে ব্যাপকভাবে উৎসাহ দিতে হবে। কুটিরশিল্পের ক্ষেত্রে কাঁচামাল সরবরাহের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। তাঁতীদের ন্যায্য মূল্যে সূতা ও রং সরবরাহ করতে হবে। তাদের জন্যে অবশ্যই বাজারকরণ ও ঋণ দানের সুবিধা করে দিতে হবে। সমবায়ের মাধ্যমে ক্ষুদ্রাকৃতির শিল্প গড়ে তুলতে হবে। গ্রামে গ্রামে এসব শিল্পকে এমনভাবে ছড়িয়ে দিতে হবে যার ফলে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে বিভিন্ন প্রকার শিল্পসুযোগ পৌঁছায় এবং গ্রামীণ মানুষের জন্যে কর্ম সংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

এযাবৎ বাংলার আঁশ পাটের প্রতি ক্ষমাহীন অবজ্ঞা প্রদর্শন করা হয়েছে। বৈষম্যমূলক বিনিয়োগ হার এবং পরগাছা ফড়িয়া বেপারীরা পাটচাষীদের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত করেছে। পাটের মান, উৎপাদনের হার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধির বিশেষ প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। পাট ব্যবসা জাতীয়করণ, পাটের গবেষণার উপরে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ এবং পাট উৎপাদনের হার বৃদ্ধি করা হলে জাতীয় অর্থনীতিতে পাট সম্পদ সঠিক ভূমিকা পালন করতে পারে। তুলার প্রতিও একই ধরনের গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। সেজন্য আমরা মনে করি, তুলা ব্যবসাও জাতীয়করণ করা অত্যাবশ্যক। তুলার মান ও উৎপাদনের হার বৃদ্ধি করার প্রয়োজন রয়েছে। বিগত সরকারগুলো আমাদের অন্যতম অর্থকরী ফসল চা, ইক্ষু ও তামাকের উৎপাদনের ব্যাপারেও যথেষ্ট অবজ্ঞা প্রদর্শন করেছেন। এর ফলে এসব অর্থকরী ফসলের উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে।

একটা স্বল্প-সম্পদের দেশে কৃষি পর্যায়ে অনবরত উৎপাদন হ্রাসের পরিস্থিতি অব্যাহত রাখা যেতে পারে না? দ্রুত উৎপাদন বৃদ্ধির সকল প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে হবে। চাষীদের ন্যায্য ও স্থিতিশীল মূল্যের নিশ্চিয়তা দিতে হবে।

প্রকৃত প্রস্তাবে আমাদের গোটা কৃষি ব্যবস্থাতে বিপ্লবের সূচনা অত্যাবশ্যক। পশ্চিম পাকিস্তানে জায়গীরদারী, জমিদারী সরদারী প্রথার অবশ্যই বিলুপ্তি সাধন করতে হবে। প্রকৃত কৃষকের স্বার্থে গোটা ভূমি ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। ভূমি দখলের সর্বোচ্চ সীমা অবশ্যই নির্ধারিত সীমার বাইরের জমি এবং সরকারি খাস ভূমিহীন কৃষকের মধ্যে বন্টন করতে হবে। কৃষি ব্যবস্থাকে অবশ্যই আধুনিকীকরণ করতে হবে। অবিলম্বে চাষীদের বহুমুখী সমবায়ের মাধ্যমে ভূমি সংহতি সাধনে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। সরকার এজন্যে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন।

ভূমি রাজস্বের চাপে নির্দিষ্ট কৃষককূলের ঋণভার লাঘবের জন্যে অবিলম্বে আমরা ২৫ বিঘা জমি পর্যন্ত জমির খাজনা বিলোপ এবং বকেয়া খাজনা মওকুফ করার প্রস্তাব করেছি। আমরা বর্তমান ভূমি রাজস্ব প্রথাও তুলে দেবার কথা ভাবছি।

প্রাকৃতিক সম্পদের সর্বাধিক উন্নয়নের জন্যে বৈজ্ঞানিক তৎপরতা চালাতে হবে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আমাদের বন সম্পদ, ফসলের চাষ, গো-সম্পদ, হাঁস-মুরগীর চাষ, দুগ্ধ খামার, সর্বোপরি মৎস্য চাষের ব্যবস্থা করতে হবে। পানি সম্পদ সম্পর্কে গবেষণা এবং নৌ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করার জন্যে অবিলম্বে একটি নৌ-গবেষণা ইনস্টিটিউট স্থাপন করা প্রয়োজন। অর্থনৈতিক মৌলভিত্তির যে প্রথম তিনটি স্তর সেগুলোকে অবশ্যই অগ্রাধিকার দিতে হবে। বন্যা নিয়ন্ত্রণকে অবশ্যই প্রথম কর্তব্য হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। জরুরী অবস্থার ভিত্তিতে একটা সুসংহত ও সুষ্ঠু বন্যা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচী বাস্তবায়ন করা আশু প্রয়োজন।

পশ্চিম পাকিস্তানে জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততা দ্রুতগতিতে দূরীভূত করতে হবে। পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে বিজলী সরবরাহ করতে না পারলে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি সাধিত হতে পারে না। একটি সম্প্রসারিত কর্মসূচি বাস্তবায়িত করে গ্রামে গ্রামে বিজলী সরবরাহ করতে হবে। এর দ্বারা পল্লী অঞ্চলে ক্ষুদ্রায়তন শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে পারে। পাঁচ বছরে আমরা বাংলাদেশে ২৫০০’ কিলোওয়াটস বিজলী উৎপাদন করতে চাই। রূপপুর আণবিক শক্তি এবং জামালগঞ্জের কয়লা প্রকল্প অবিলম্বে বাস্তবায়িত করতে হবে। প্রাকৃতিক গ্যাস অবিলম্বে পুরোপুরিভাবে কাজে লাগাতে হবে।

তৃতীয় অর্থনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা। যমুনা নদীর উপর সেতু নির্মাণ করে উত্তরবঙ্গের সাতে সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপনের বিষয়টিকে আমরা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিই। সিন্ধু ও পাঞ্জাবের বিভিন্ন স্থানে সিন্দু নদের উপর এবং বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষা ও কর্ণফুলির উপরেও সেতু নির্মাণ করতে হবে। আভ্যন্তরীণ নৌ ও সামুদ্রিক বন্দরের উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সড়ক ও রেল ব্যবস্থার উপরও আমরা যথাযথ গুরুত্ব দিয়েছি।

সু-সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্যে শিক্ষাখাতে পুঁজি বিনিয়োগের চাইতে উৎকৃষ্ট বিনিয়োগ আর কিছু হতে পারে না। ১৯৪৭ সালের পর বাংলাদেশে প্রাথমিক স্কুলের সংখ্যা হ্রাস পাওয়ার পরিসংখ্যান একটা ভয়াবহ সত্য। আমাদের জনসংখ্যার শতকরা ৮০ জন অক্ষরজ্ঞানহীন। প্রতি বছর ১০ লক্ষেরও অধিক নিরক্ষর লোক বাড়ছে। জাতির অর্ধেকেরও বেমি শিশুকে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। শতকরা মাত্র ১৮ জন বালক ও ৬ জন বালিকা প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করছে। জাতীয় উৎপাদনের শতকরা কমপেক্ষ ৪ ভাগ সম্পদ শিক্ষা খাতে ব্যয় হওয়া প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি।

কলেজ ও স্কুল শিক্ষকদের বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করতে হবে। নিরক্ষরতা অবশ্যই দূর করতে হবে। ৫ বছর বয়স্ক শিশুদের বাধ্যতামূলক অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষাদানের জন্যে একটা ‘ক্র্যাস প্রোগ্রাম’ চালু করতে হবে। মাধ্যমিক শিক্ষার দ্বার সকল শ্রেণীর জন্যে খোলা রাখতে হবে। দ্রুত মেডিক্যাল ও কারিগরী বিশ্ববিদ্যালয় সহ নয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দারিদ্র যাতে উচ্চ শিক্ষার জন্যে মেধাবী ছাত্রদের অভশাপ হয়ে না দাঁড়ায় সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে।

জীবনের সর্বক্ষেত্রে বাংলা ও উর্দু যাতে ইংরেজীর স্থান দখল করতে পারে- সে ব্যাপারে অবিলম্বে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আঞ্চলিক ভাষার বিকাশ ও উন্নয়নের ব্যাপারে উৎসাহ সৃষ্টি করতে হবে।

নাগরিক জীবনের সমস্যাবলীর দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাবো- নিম্ন আয়ের লোকজন অমানুষিক পরিবেশের মধ্যে বসবাস করছেন। তথাকথিত ইম্প্রুভমেন্ট ট্রাস্টগুলি বিত্তবানদের জন্যে বিলাসবহুল আবাসিক এলাকা নির্মাণে ব্যস্ত। আর এদিকে বাস্তুহারা ও বিত্তহীননের দল এতটুকু আশ্রয়ের সন্ধানে মাথা কুটে ফিরছে। ভবিষ্যত নগর উন্নয়ন পরিকল্পনা সংখ্যাগরিষ্ঠ দরিদ্র নগরবাসীর সুযোগ-সুবিধার নিশ্চয়তা থাকতে হবে। অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে অল্প খরজে শহরে বাসগৃহ নির্মাণের ব্যবস্থার প্রয়োজন।

চিকিৎসা ক্ষেত্রের এক করুণ পরিবেশ বিদ্যমান। আমাদের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৯০ ভাগ মানুষ সামান্যতম চিকিৎসার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত। প্রতি ইউনিয়নে একটি করে পল্লী চিকিৎসা কেন্দ্র এবং প্রতি থানা সদরে একটি করে হাসপাতাল অবিলম্বে স্থাপন করা প্রয়োজন। চিকিৎসা গ্রাজুয়েটদের জন্যে ন্যাশনাল সার্ভিস প্রবর্তনের প্রয়োজন। পল্লী এলাকার জন্য ন্যাশনাল সার্ভিস প্রবর্তনের প্রয়োজন। পল্লী এলাকার জন্য বিপুল সংখ্যক মেডিকেল পার্সন্যালদের ট্রেনিং দেওয়া দরকার।

গণআন্দোলনের মতই শিল্প শ্রমিকরা অর্থনীতি ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকেন। ট্রেড ইউনিয়ন গঠন, যৌথ দর কষাকষি এবং ধর্মঘটের ব্যাপারে তাদের মৌলিক স্বীকৃতি দিতে হবে। তাদের নিজেদের এবং সন্তানদের বেঁচে থাকার মত মজুরী, বাসগৃহ, শিক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগের ব্যবস্থা করতে হবে। শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার ন্যায্য হিস্যাদানের মাধ্যমে তাদের কাছ থেকে শিল্প উৎপাদন সকল খাতে সর্বোচ্চ পরিমাণ উপাদান বৃদ্ধি করতে হবে।

অর্থনীতির সর্বত্র মজুরীর কাঠামো ন্যায়-বিচারের ভিত্তিতে পুনবিন্যাস করতে হবে। ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতির গ্রাস থেকে নিম্ন বেতনভূক্ত কর্মচারী ও অল্প উপার্জনশীল ব্যক্তিদের বাঁচাবার জন্যে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীলতা আনতে হবে।

সকল নাগরিকের সমান অধিকারে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসী। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের নিশ্চয় জানা আছে যে, আমরা সব সময়ই সাম্প্রদায়িকতার বিরোধিতা করে আসছি। সংখ্যালঘুরাও অন্যান্য নাগরিকদের মতই সমান অধিকার ভোগ করবে। আইনের সমান রক্ষাকবচ সর্বক্ষেত্রেই পাবে। উপজাতীয় এলাকা যাতে অন্যান্য এলাকার সাথে পুরোপুরি সংযোজিত হতে পারে, তারা যাতে জীবনের সর্বক্ষেত্রে অপর নাগরিকদের মতোই সুযোগ সুবিধা ভোগ করে, এজন্যে উপজাতীয় এলাকা উন্নয়নের ব্যাপারে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে হবে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম, উপকুলীয় দ্বীপসমূহ এবং উপকূলবতী এলাকায় বসবাসকারীরা যাতে জাতীয় জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে-সেজন্য তাদের সম্পদের সদ্ব্যবহারের  উদ্দেশ্যে বিশেষ উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।

জাতীয় জীবনের সাথে মোহাজেরদের একাত্ম হয়ে যাওয়া উচিত। এর ফলে স্থানীয় জনগণের সাথে মিলেমিশে সর্বক্ষেত্রে তারা স্থানীয় জনগণের মতই সমান সুযোগ সুবিধা ভোগ করতে পারবেন।

৬ দফা বা আমাদের অর্থনৈতিক কর্মসূচি ইসলামকে বিপন্ন করে তুলেছে বলে যে মিথ্যা প্রচার চালানো হচ্ছে সে মিথ্যা প্রচারণা থেকে বিরত থাকার জন্যে আমি শেষবারের মত আহ্বান জানাচ্ছি। অঞ্চলে অঞ্চলে এবং মানুষে মানুষে সুবিচারের নিশ্চয়তা প্রত্যাশী কোনকিছুই ইসলামের পরিপন্থী হতে পারেনা।

পররাষ্ট্র নীতির মতো গুররুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে আমাদের বক্তব্য হচ্ছে- আজ বিশ্ব জুড়ে যে ক্ষমতার লড়াই চলছে সে ক্ষমতার লড়াইয়ে আমরা কোনমতেই জড়িয়ে পড়তে পারি না। এজন্যে আমাদের অবশ্যই সত্যিকারের স্বাধীন এবং জোট নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে হবে।

আমরা ইতিমধ্যেই সিয়াটো, সেন্টো ও অন্যান্য সামরিক জোট থেকে সরে আসার দাবী জানিয়ে এসেছি। ভবিষ্যতেও এ ধরনের কোনও জোটে জড়িয়ে না পড়ার ব্যাপারে আমাদের বিঘোষিত সিদ্ধান্ত রয়েছে। সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ যে সংগ্রাম চলছে-সে সংগ্রামে আমরা আমাদের সমর্থন জানিয়েছি।

কারোর প্রতি বিদ্বেষ নয়, সকলের প্রতি বন্ধুত্ব- এ নীতির ভিত্তিতে বিশ্বের সকল রাষ্ট্রের করে প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহের সাথে আমরা শান্তি পূর্ণ সহ-অবস্থানে বিশ্বাসী। আমরা মনে করি প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহের সাথে পাকিস্তানে, সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়া উচিত, এর মধ্যে আমাদের জনগণের বৃহত্তর স্বার্থ নিহিত রয়েছে। সেজন্য প্রতিবেশীদের মধ্যে বর্তমান বিরোধসমূহের নিস্পত্তির উপর আমরা সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করি। জাতিসংঘের প্রস্তাব মোতাবেক কাশ্মীর সমস্যার একটি ন্যায়সঙ্গত সমাধানের উপর গুরুত্ব আরোপ করছি।

দেশবাসী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অধিকারী হলেই এসব কর্মসূচী ও নীতিমালার বাস্তবায়ন সম্ভবপর। আগামী নির্বাচন জাতীয় মৌলিক সমস্যাসমূহ বিশেষ করে ৬-দফার ভিত্তিতে স্বায়ত্বশাসনের প্রশ্নে গণভোট রূপে আমরা গ্রহণ করেছি।

রাজনৈতিক কারণে রাজনৈতিক কর্মী, ছাত্র, শ্রমিকের বিরুদ্ধে ও বিগত গণ অভ্যুত্থানকালীন দায়েরকৃত মামলা, গ্রেফতারী পরোয়ানা ও দন্ডাদেশের প্রত্যাহার করা হলে গণতন্ত্র পুনঃ প্রতিষ্ঠার জন্য সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি হবে। বিনা বিচারে আটক সকল রাজবন্দীকেও মুক্তি দিতে হবে।

জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে সশস্ত্র বাহিনীকে বেসামরিক প্রশাসনের গুরুভার বহণ করতে দেয়া কোন প্রকারেই উচিত নয়। রাজনীতিতেও সশস্ত্র বাহিনীর জড়িয়ে পড়া একেবারেই অনুচিত। উচ্চতর শিক্ষাপ্রাপ্ত পেশাদার সৈনিকদের জাতীয় সীমানা রক্ষার গুরুদায়িত্ব এককভাবে পালন করা বাঞ্চনীয়।

পরিশেষে আমি বলতে চাই, জাতি হিসেবে আমাদের সামনে যে চ্যালেঞ্জ এসেছে আমরা সাফল্যের সাথে তার মোকাবিলা করবোই। প্রকৃত প্রাণবন্ত গণতন্ত্র দেশে প্রতিষ্ঠা করতেই হবে। যাদের নিয়ে পাকিস্তান গঠিত, তারা শুধুমাত্র একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার মধ্যেই একত্রে বসবাস করতে পারে।

গণতন্ত্র ধ্বংসের যে কোন উদ্যোগে পরিণতিতে পাকিস্তানকেই ধ্বংস করবে। আমাদের ৬-দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে ফেডারেশনের ইউনিটসমূহকে পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসন মঞ্জুর করে অঞ্চলে অঞ্চলে সুবিচারের নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে। এ ধরণের ফেডারেল গণতান্ত্রিক কাঠামোর আওতায় দেশে সামাজিক বিপ্লবের সূচনার জন্যে প্রগতিশীল অর্থনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হবে।

আওয়ামী লীগ এ চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করতে আজ দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। আওয়ামী লীগ দেশবাসীর যে সমর্থন ও আস্থার অধিকারী হয়েছে তাতে আমরা বিশ্বাস করি যে, ইনশাল্লাহ, আমরা সাফল্যের সাথে এ চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করতে সক্ষম হবো।

 

১৯৭০ সালের ৩০ অক্টোবর জয়দেবপুরের জনসভায় বঙ্গবন্ধুর ভাষণ

আসন্ন ডিসেম্বরের নির্বাচন ক্ষমতা লাভের নির্বাচন নয়। এই নির্বাচনে স্বাধীনতার পর থেকে শোষিত ও অবহেলিত বাংলার ভাগ্য নির্ধারিত হবে। নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ৬-দফা কর্মসূচী বাস্তবায়ন করতে চায়। এর অর্থ এই দাঁড়ায় বাঙ্গালিরাই হবে তাদের নিজেদের সম্পদের মালিক। বাংলার উর্বর মাটিতে যেমন সোনা ফলে, ঠিক তেমনি পরগাছাও জন্মায়। একইভাবে বাংলাদেশে কতগুলো রাজনৈতিক পরগাছা রয়েছে, যারা বাংলার মানুষের বর্তমান দুঃখ-দুর্দশার জন্যে দায়ী। এসব রাজনৈতিক পরগাছা সামান্য লাভ ও মন্ত্রিত্বের লোভে বাংলার মানুষের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে শোষকদের এজেন্ট হিসেবে কাজ করেছে।

আসন্ন নির্বাচনে এসব রাজনৈতিক পরগাছাদের শুধু উৎপাটিতই করা হবে না, তাদেরকে চিরতরে সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করা হবে এই বাংলার মাটি থেকে।

শেরে বাংলা ফজলুল হকের আহ্বানেই ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট প্রার্থীদের জয়যুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু পরে সেই হক সাহেবকেই দেশদ্রোহী বলে আখ্যায়িত করা হয়েছিল। মরহুম হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, যিনি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অন্যতম সেনানী, তাঁর উপরও নেমে এসেছিল জেল-জুলুম ও অত্যাচারের খড়গ। বাংলার দুর্ভাগ্য ছাড়া এটা আর কি হতে পারে?

কিন্তু আমি সর্তক করে দিয়ে বলতে চাই, আমি শেরে বাংলার মতো তেমন বৃদ্ধ হয়ে পড়িনি। নির্বাচনের পর স্বার্থবাদী মহলে আবার ষড়যন্ত্র চালানোর চেষ্টা করলে তাদের সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করার জন্যে আমি গণআন্দোলনের ডাক দেব। বাংলার মানুষের কল্যাণ এবং মুক্তির জন্যে এটা আমার শেষ সংগ্রাম। গত গণঅভ্যত্থানের সময় জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে যেয়ে যাঁরা শহীদ হয়েছেন, তাঁদের ঋণ শোধ করতে প্রয়োজন হলে যাতে আমি জীবনও বিসর্জন দিতে পারি তার জন্যে আপনারা আমাকে দোয়া করবেন।

কারণ বীর শহীদদের সংগ্রামের ফলেই আমরা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্তি পেয়েছি। নির্বাচনের পর জনগণের বিজয়ের বিরুদ্ধে কায়েমি, স্বার্থবাদী মহলের যে কোন ষড়যন্ত্র রুখে দাঁড়ানোর জন্যে প্রয়োজন হলে গণআন্দোলন শুরুর যে পরিকল্পনা আমার রয়েছে তাতে অংশগ্রহণে প্রস্তুত থাকার জন্যে আমি আপনাদের আহ্বান জানাচ্ছি।

২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফ করার আওয়ামী লীগের প্রদত্ত প্রতিশ্রুতির যারা সমালোচনা করছেন, তাঁদের আমি জানিয়ে দিতে চাই, জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে এই প্রতিশ্রুতি অবশ্যই বাস্তবায়ন করা হবে। বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্যে প্রদত্ত কর মওকুফের সুযোগ প্রত্যাহারও আমরা প্রস্তাব করেছি।

কিছু সংখ্যক লোক জনগণের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে চায়। সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সব লোক সমান। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকেরা পাকিস্তানী যে কোন নাগরিকের মতোই সমান নাগরিক এবং সমান অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা ভোগের অধিকারী। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষার জন্যে আমি সংখ্যাগুরু নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানাই। (অংশ বিশেষ)

[সূত্র ঃ দৈনিক পাকিস্তান, ১ নভেম্বর,১৯৭০]

 

আরও দেখুন:

মন্তব্য করুন