বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ১৯৭০ সালের জুন মাস [ Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman Speech : 1970, June]

বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ১৯৭০ সালের জুন মাস – সংগ্রহ

বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ১৯৭০ সালের জুন মাস [ Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman Speech : 1970, June]

১৯৭০ সালের ৭ জুন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দেয়া ভাষণ

ভাইয়েরা আমার আজ দুটি কথা বলতে চাই। উনি আপনাদের অতি পরিচিত কুমিল্লা জেলার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন, যুক্তফ্রন্ট করেন। আমাদের শ্রদ্ধেয় মাইন ভাই, সাধারণ সম্পাদক, যে মাইন ভাইকে আপনারা সবাই চিনেন, তার সব বায়েয়াপ্ত করা হয়। জেলখানায় তাকে বন্দী করা হয়। তাকে হত্যা করা হয়। আওয়ামী লীগের ইতিহাসের, জনগণের মুক্তির ইতিহাসের সঙ্গে তিনি জড়িত। তিনি মৃত্যুবরণ করলেও তিনি মরে নাই। যতদিন এই দেশের মানুষ থাকবে, তার জীব প্রদীপ নিভে গেলেও এদেশের মানুষ তার দাবী আদায় করতে পারবে।

ভাইয়েরা আমার, পাকিস্তানের ইতিহাস, দুঃখের ইতিহাস। বাইশ বৎসর হয়ে গেল, পাকিস্তানের সরকার এই দেশের দুঃখি মানুষের মুখে হাসি ফুটাতে পারে না। বাইশ বৎসর হয়ে গেল…..

(এই আপনারা বসেন, আপনারা বসেন)

ভাইয়েরা আমার, যে কথা বলছিলাম-আজ আপনাদের সামনে বিরাট পরীক্ষা। আপনারা কি করবেন, কি করেছেন, আপনারা ‘স্বাধীন দেশের মতো’ বাস করতে চান কি চান না?

(জনগণ চাই বলে চিৎকার করে)

বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ১৯৭০ সালের জুন মাস [ Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman Speech : 1970, June]আমি আপনাদের সামনে বলতে চাই। আপনাদের সামনে বিরাট পরীক্ষা। আমরা পুনরায় রক্ত দিয়ে জনগণের ভোটা প্রদান করেছি। আইয়ুব খান এক রক্ত দানব। এই রক্ত দিয়ে জনগণের ভোট আদায় করা হয়েছে। আইয়ুব খান আপনাদের ভোট কেড়ে নিতে চেয়েছিল। আইয়ুব খান গণতন্ত্র কেড়ে নিতে চেয়েছিল। এদেশ তা প্রত্যাখান করেছিল। আপনি কেন তা সাদরে গ্রহণ করলেন, যাতে আপনারা পাকিস্তানে গণতন্ত্র রাষ্ট্র কায়েম করতে চেয়েছিলেন এবং ভোটাধিকারের হাত থেকে রক্ষা পেতে পারেন। এই জন্য গণতন্ত্র চেয়েছিলেন?

ভাইয়েরা আমার আজ ২২ বৎসর স্বাধীনতা পেয়েছি। কি পেয়েছি আমরা? পেয়েছি বিরাগ হাওয়া, পেয়েছি গুলি, পেয়েছি অত্যাচার, পেয়েছি জুলুম, পেয়েছি হুঙ্কার, পেয়েছি দূর্ণীতি, পেয়েছি বুক খা খা করা আর্তনাদ। গরীব যখন কিছু দাবী করে, তাদের উপর গুলি চালিয়ে দেওয়া হয়। শ্রমিক যখন দাবী করে, তাদের অত্যাচার করা হয়। মুজুর যখন দাবী করে, তাদের উপর জুলুম করা হয়। ২২ বছরের ইতিহাস, খুনের ইতিহাস। ২২ বছরের ইতিহাস মীর জাফরের ইতিহাস। ২২ বছরের ইতিহাস, খুবই করুণ ইতিহাস।

ইতিহাস গৃহহারা সর্বহারার আর্তনাদের ইতিহাস, আমরা সংগ্রাম করেছি। ২২ বছর কেটে গেল আমরা জীবন যৌবন ঘোরের মধ্যে কাটিয়ে দিয়েছি। কিন্তু পেলাম কি আজ আমরা। আজকে দেশের মধ্যে গ্রামে গ্রামে হাহাকার। সব পুড়ে দাউ হচ্ছে। মানুষ না খেয়ে কষ্ট পাচ্ছে। আমার দেশের গরীব ভাইয়েরা উদরে ভাত দেয়না, গায়ে কাপড় দেয়না, ঋণের বোঝা দিন দিন বেড়ে চলছে। আজকে ২২টি পরিবার পাকিস্তানের সমস্ত সম্পত্তির মালিক হয়েছে। গরীব দিন দিন গরীব হয়ে গেছে। বড়লোক দিন দিন বড় লোক হয়ে যাচ্ছে।

এই জন্য পাকিস্তানের সাথে সংগ্রাম সংলাপ। আজ এই রেসকোর্স ময়দানের পাশে বাংলাদেশের দুইজন মহান নেতা যারা বাংলার মানুষের জন্য, পাকিস্তানের জন্য নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সেই শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এই রেসকোর্স ময়দানের পাশে তারা চিরনিদ্রায় ঘুমিয়ে আছেন। শোষক গোষ্ঠি এই বুদ্ধ নেতাদের অনুমান করতে পারেন নাই। ৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগ পর্যুদস্ত হওয়ার পরে পরিকল্পনা করে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হককে জেলের মধ্যে বন্দি করে, ২০০০ লোককে গ্রেফতার করে।

আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা খুনের আসামী দিয়ে আওয়ামী মুসলীম নেতাদের জেলের মধ্যে বন্দি করে। মৃত্যুকালে সোহরাওয়ার্দী ভিয়েনা হয়ে পাকিস্তানে আসবেন না, সেই সোহরাওয়ার্দী সাহেবকে করাচি জেলের মধ্যে বন্দি করে রাখে। জাতীয় নেতা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এই সোহরাওয়ার্দী শুয়ে আছে রেসকোর্স ময়দানে এই সোহরাওয়ার্র্দী উদ্যানে।

পাকিস্তানের রাজনীতি হয়েছে ষড়যন্ত্রের রাজনীতি। মরহুম কাদের ভাইয়ের মৃত্যু হয়েছে শহীদ হয়েছে, আজ পর্যন্ত ইনকুযুয়ারি রেজাল্ট বের হয় নাই। যিনি ইনকুয়ারি করতে গেছেন, তাকেও মৃত্যু বরণ করতে হয়েছে। পাকিস্তান খান সাহেবরা লাহোরে হত্যা করলো জাতীয় চার নেতা। পাকিস্তান হওয়ার পর থেকে তারা গরীবদের শোষণ করার জন্য যে উপায়ে উৎপাত করতে শুরু করল। যারে পায় তারে গুলি করে হত্যা করতে শুরু করল। আমারে বন্দী করে জেলের মধ্যে রাখা হল। নানা উপায়ে অত্যাচার অবিচার করা হল।

আমরা এই ষড়যন্ত্রের রাজনীতির উৎখাত চাই। আপনারা শিক্ষা গ্রহণ করেন ইতিহাস থেকে। আজন্মের ফল, কপালের লিখন। তারা সাধারণ নির্বাচন ঘোষণা করেছেন। তারপর থেকে শুরু হয়েছে, মিরপুরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধানোর চেষ্টা করা হয়েছে। অজ্ঞাত শ্রমিকদের হত্যা করা হয়েছে। অসংখ্য মিল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। দুনিয়ার (প্রচুর) শ্রমিকদের হত্যা করা হয়েছে। আপনাদের জেল দেওয়া হয়েছে। শোষকদের ধারা আজো শেষ হয় নাই। আমি ষড়যন্ত্রকারীদের সাবধান করে দিতে চাই-আগুন নিয়ে খেলা করোনা, তোমাদের দিন ফুরিয়ে গেছে। ষড়যন্ত্র করে, ইলেকশন বানচাল করে, একনায়কত্ব কায়েম করে গদিতে গমন করার চেষ্টা কর না।

যেমন আইয়ুব খানকে গদিচ্যুত করা হয়েছে, তোমাদের তা মনে রাখা দরকার। তোমরাও মনে রেখো ষড়যন্ত করে দেশ শাসন করা যায় না। গুলি চালিয়ে দেশ শাসন করা যায় না। দেশ শাসন করতে হয়, ভালবাসা মহব্বত দিয়ে। দেশকে ভালবাসতে হয় দশের জন্য কাজ করে। যদি বাড়াবাড়ি কর, যদি আবার ষড়যন্ত্র কর-তাহলে লক্ষ লোকের সামনে দাঁড়িয়ে এদেশের মানুষের পক্ষ থেকে হুশিয়ার করে দিয়ে বলতে চাই-আমি তোমার ফাঁসি কাষ্টে যখন ভয় করি নাই, আমার মা-বোন-ভাইরা যখন গুলি খেতে শিখেছে, আওয়ামী লীগ কর্মীরা যেহেতু গুলি খাইতে পারে, রাজপথের কর্মীরা যখন গুলি খেতে শিখেছে, শ্রমিকরা যেহেতু গুলি খেতে জানে-প্রস্তুত হয়ে যাও, ষড়যন্ত্র যদি করো, এর মধ্যেই করো।

দরকার হয় মৃত্যু বরণ করব। তোমরা চেষ্টা করেছ, আমরা সকলেই জানতে চাই যে, দল নির্বাচিত হয় জনগণের দ্বারা, জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিরা এদেশে শাসনতন্ত্র কায়েম করবেন। ব্যক্তিগত কোন লোকের ক্ষমতা নাই পাকিস্তানে গণতন্ত্র দেয়া। যদি কেউ ষড়যন্ত্র করে থাকেন, ভুল করেছেন। ষড়যন্ত্র আর কইরেন না, আর কইরেন না। বাঁধা দিব। দরকার হয় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করব। দরকার হয় শহীদ হবো, কিন্তু পাকিস্তানের গরীব দুঃখী মানুষকে আর শোষণ করতে দেব না।

 

(অসমাপ্ত)

বি,দ্র- ভাষণটি সিডি থেকে শুনে লেখা হয়েছে।

আরও দেখুন: