বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ১৯৭০ সালের ডিসেম্বর মাস [ Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman Speech : 1970, December]

বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ১৯৭০ সালের ডিসেম্বর মাস – সংগ্রহ

Table of Contents

বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ১৯৭০ সালের ডিসেম্বর মাস [ Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman Speech : 1970, December]

১৯৭০ সালের ১ ডিসেম্বর নির্বাচনের পূর্বে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ

আমার প্রিয় দেশবাসী ভাই-বোনেরা। আস্সালামু আলাইকুম। আমার সংগ্রামী অভিনন্দন গ্রহণ করুন।

আগামী ৭ই ডিসেম্বর সারাদেশব্যাপী জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে প্রথম সাধারণ নির্বাচনের তারিখ ধার্য করা হয়েছে। জনগণের ত্যাগ ও নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামের ফল হচ্ছে এই নির্বাচন। সারাদেশ ও দেশের মানুষকে তীব্র সংকট ও দুর্গতি থেকে চিরদিনের মতো মুক্ত করার সুযোগ এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গ্রহণ করা যেতে পারে।

বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ১৯৭০ সালের ডিসেম্বর মাস [ Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman Speech : 1970, December]দীর্ঘ তেইশ বছরের অবিরাম আন্দোলনের পথ বেয়ে শত শত দেশপ্রেমিকের আত্মদান, শহীদের তাজা রক্ত আর হাজার হাজার ছাত্র-শ্রমিক ও রাজনৈতিক কর্মীর অশেষ নির্যাতন ভোগ ও ত্যাগের বিনিময়ে বাংলাদেশের জনগণের সামনে আজ এক মহা-সুযোগ উপস্থিত। এই নির্বাচনের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, নির্বাচিত হবার পরপরই পরিষদ সদস্যরা বা রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতার গদিতে বসে পড়তে পারবেন না। তাঁদেরকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দেশের শাসনতন্ত্র প্রণয়নের কাজ সমাধা করতে হবে। বস্তুতঃ স্বাধীনতার তেইশ বছরের মধ্যে শাসনতন্ত্র প্রণয়ণের মূল দায়িত্ব এবং অধিকার সর্বপ্রথম এবারই জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা লাভ করেছে। তাই এই নির্বাচনের গুরুত্ব অপরিসীম।

আমার দেশবাসী-

আপনাদের দীর্ঘদিনের সংগ্রাম, ত্যাগ ও তিতীক্ষার পরও যদি কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষের প্রতিনিধিগণ দেশের ভবিষ্যৎ শাসনতন্ত্র প্রণয়নের দায়িত্ব থেকে বঞ্চিত হয় তাহলে পাকিস্তান, বিশেষ করে বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ চিরতরে দাসত্ব্যের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হবে। কেননা সম্পদ লুণ্ঠনকারী ও এক নায়কত্ববাদের প্রতিভূরা দেশের কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষের ইচ্ছানুযায়ী শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করার কাজে পদে পদে বাঁধা দেবে। ভোটাধিকারের নির্ভূল প্রয়োগের মাধ্যমে সেই মহা সুযোগ ও দায়িত্ব যদি আমরা কূচক্রীদের কাছ থেকে ছিনিয়ে আনতে পারি, তাহলে কৃষক-শ্রমিক-সর্বহারা মানুষের দুঃখমোচন এবং বাংলার মুক্তি সনদ ৬-দফা ও ১১-দফা বাস্তবায়িত করা যাবে। একমাত্র এই কারণেই আওয়ামী লীগ আসন্ন নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করতে যাচ্ছে এবং বাংলাদেশের প্রতিটি আসনে প্রার্থী দাঁড় করিয়েছে।

প্রিয় দেশবাসী-

কারাগার থেকে বেড়িয়ে আমরা জনসংখ্যা ভিত্তিক প্রনিধিত্ব অর্থাৎ এক ব্যক্তি ভোটের দাবী তুলেছিলাম, আর সেটা আদায় হয়েছে। তাই ভবিষ্যৎ শাসনতন্ত্র প্রণয়নের ক্ষেত্রে আমরা বিশেষ যোগ্যতা ও সুযোগের অধিকারী। এখন বাংলাদেশ থেকে নির্বাচিত পরিষদ সদস্যরা যদি একই দলের কর্মসূচী ও আদর্শের সমর্থক হন অর্থাৎ সফল প্রশ্নে তারা ঐক্যমতে থাকতে পারেন তবে আমরা অতীতে চাপিয়ে দেয়া সকল অবিচার বৈষম্যমূলক আচরণ, আইন-কানুন এবং বে-ইনসাফি শোষণের পরিসমাপ্তি ঘটাতে পারব।

আমাদের ঐক্যবন্ধ প্রচেষ্টা ও সম্মিলিত দাবীর মুখে দেশের অপর অংশের পরিষদ সদস্যগণ বাংলাদেশের মানুষের মুক্তি সনদ ৬-দফা ও ১১-দফা মেনে নিতে বাধ্য থাকবেন। এর কারণ, পরিষদে আমরা সংখ্যাগরিষ্ট থাকব। আর যদি আমরা বিভক্ত হয়ে যাই এবং স্বার্থের দ্বন্দ্ব ও মতাদর্শের অনৈক্যের দ্বারা প্রভাবাম্বিত হয়ে আত্মঘাতি সংঘাতে মেতে উঠি তাহলে যারা এদেশের মানুষের ভাল চান না ও এখানকার সম্পদের উপর ভাগ বসাতে চান তাদেরই সুবিধে হবে এবং বাংলাদেশে নির্যাতিত নিপীড়িত, ভাগ্যাহত ও দুঃখী মানুষের মুক্তির দিনটি পিছিয়ে যাবে।

আমার ভাই বোনেরা-

শেরে বাংলা আজ পরলোকে। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী আমাদের মাঝে নেই। যারা প্রবীনতার দাবী করছেন, তাদের অনেকাংশই হয় ইতোমধ্যেই পশ্চিম পাকিস্তানের এক শ্রেণীর বাঙ্গালী বিদ্ধেষিদের নিকট নিজেদের বিকিয়ে দিয়ে তল্পিবাহকের ভূমিকা গ্রহণ করেছেন; নয়ত নিঃস্কর্মা, নির্জীব হয়ে পরেছেন এবং অন্যের শলা পরামর্শের বহিভূত হয়ে কথায় ও কাজে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছেন। আমি নিশ্চিৎ বুঝতে পারছি ভাগ্য-বিপর্যস্ত মানুষের হয়ে আমাদেরকেই কথা বলতে হবে।

তাদের চাওয়া ও পাওয়ার স্বার্থক ও রূপদানের দায়িত্ব আওয়ামী লীগকেই গ্রহণ করতে হবে এবং সে কঠিন দায়িত্ব গ্রহণে আমরা সম্পূর্ণ প্রস্তুত। তার উপযোগী করেই আমাদের প্রিয় প্রতিষ্ঠান আওয়ামী লীগকে গড়ে তোলা হয়েছে। নিজেদের প্রাণ দিয়েও যদি এদেশের ভবিষৎ নাগরিকদের জীবনকে কণ্ঠকমুক্ত করতে পারি, আগামী দিনগুলোকে সকলের জন্য সুখি, সুন্দর ও সমৃদ্ধশালী করে তুলতে পারি এবং দেশবাসীর জন্য যে কল্পনার নক্সা এতদিন ধরে মনের পটে একেছিলাম-সে স্বপ্নের বাস্তব রূপায়নের পথ প্রশস্ত করে দুঃখের বোঝা যদি কিছুটাও লাঘব করে যেতে পারি- তাহলে আমাদের সংগ্রাম স্বার্থক হবে।

আমার প্রিয় দেশবাসী-

আমি ক্ষমতার প্রত্যাশী নই। কারণ, ক্ষমতার চেয়ে জনতার দাবী আদায়ের সংগ্রাম অনেক বড়। এখন নির্বাচনের মাধ্যমে বক্তব্য পেশ ও দাবী আদায়ের দায়িত্ব যদি আমার উপর ন্যস্ত করতে চান, তাহলে আমাদেরকে শক্তি সঞ্চয় করতে হবে। সে শক্তি হলো পরিষদে সংখ্যা গরিষ্ঠতা লাভ। কারণ, এই সংখ্যাগরিষ্ঠতা হচ্ছে অধিকার আদায়ের চাবি কাঠি। তাই আমার জীবনের সুদীর্ঘ সংগ্রামের এই ঐতিহাসিক যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আপনাদের কাছে আমার একটি মাত্র আবেদন-বাংলাদেশের সকল আসনে আওয়ামী লীগের মনোনিত প্রার্থীদেরকে ‘নৌকা’ মার্কায় ভোট দিন।

সংগ্রামী দেশবাসী,

সর্বশেষে আমি ব্যক্তিগত পর্যায়ে আপনাদের কাছে কয়েকটি কথা পেশ করতে চাই। আপনারা জানেন ১৯৬৫ সালের ১৭ দিনের যুদ্ধের সময় আমরা বাঙ্গালীরা কিরূপ বিচ্ছিন্ন, অসহায় ও নিরুপায় হয়ে পড়েছিলাম। বিশ্বের সঙ্গে এবং দেশের কেন্দ্রের সঙ্গে প্রায় আমাদের সকল যোগাযোগ ও সম্পর্ক ভেঙ্গে পরেছিল। অবরুদ্ধ দ্বীপের ন্যায় বাংলাদেশের সাড়ে সাতকোটি মানুষ কেবল মাত্র আল্লাহর উপরে ভরসা রেখে এক সীমাহীন অনিশ্চয়তার মুখে দিন কাটাচ্ছিল।

তথাকথিত শক্তিশালী কেন্দ্রের প্রশাসনযন্ত্র বিশেষ ভৌগলিক অবস্থানের কারণে সেদিনের সেই জরুরি প্রয়োজনের দিনেও আমাদের নাগালের বাইরে ছিল। তাই আমার নিজের জন্য নয়, বাংলার মানুষের দুঃখের অবসানের জন্য ১৯৬৬ সালে আমি ৬ দফা প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলাম। এই দাবী হচ্ছে আমাদের স্বায়ত্ব শাসন ও আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার আদায়ের দাবী, অঞ্চলে অঞ্চলে যে বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে তার অবসানের দাবী। এই দাবী তুলতে গিয়ে আমি নির্বাচিত হয়েছি।

একটার পর একটা মিথ্যা মামলা জড়িয়ে আমাকে হয়রানি করা হয়েছে। আমার ছেলে, মেয়ে, বৃদ্ধ পিতা-মাতা ও আপনাদের কাছ থেকে আমাকে ছিনিয়ে নিয়ে কারাগারে আটক রাখা হয়েছিল। আমার সহকর্মীদেরকেও একই অন্যায়- অত্যাচারের শিকার হতে হয়েছে। সেই দূর্দিনে পরম করুণাময় আল্লাহর আর্শিবাদ স্বরূপ আপনারাই কেবল আমার সাথে ছিলেন। কোন নেতা নয়, কোন দলপতি নয়, আপনারা-বাঙলার বিপ্লবী ছাত্র, শ্রমিক, যুবক ও সর্বহারা মানুষ রাতের অন্ধকারে কারফিউ ভেঙ্গে মনু মিয়া, আসাদ, মতিয়ুর, রুস্তম, জহুর, জোহা, আনোয়ারার মতো বাংলাদেশের দামাল ছেলে-মেয়েরা প্রাণ দিয়ে আন্দোলন গড়ে তুলে আমাকে তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার কবল থেকে মুক্ত করে এনেছিল।

সেদিনের কথা আমি ভুলে যাইনি, জীবনে কোনদিন ভুলব না, ভুলতে পারব না। জীবনে আমি যদি একলাও হয়ে যাই, মিথ্যা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার মত আবার যদি মৃত্যুও পরোয়ানা আমার সামনে এসে দাড়ায়, তাহলে আমিও শহীদদের পবিত্র রক্তের সাথে বেঈমানি করবো না। আপনারা যে ভালবাসা আমার প্রতি আজো অক্ষুন্ন রেখেছেন, জীবনে যদি কোনদিন প্রয়োজন না হয়, তবে আমার রক্ত দিয়ে হলেও আপনাদের এ ভালবাসার ঋণ পরিশোধ করবো।

প্রিয় ভাই ও বোনেরা

বাংলার যে জননী শিশুকে দুধ দিতে গুলীবিদ্ধ হয়ে তেজগাঁও নাখালপাড়ায় মারা গেল, বাংলায় যে শিক্ষক অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গনে ঢলে পড়ল, বাংলার যে শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তুলতে গিয়ে জীবন দিলো, বাংলার যে ছাত্র স্বাধীকার অর্জনের সংগ্রামে রাজপথে রাইফেলের সামনে বুক পেতে দিল, বাংলার যে সৈনিক কুর্মিটোলার বন্দী শিবিরে অসহায় অবস্থায় গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হলো, বাংলার যে কৃষক ধানক্ষেতের আলের পাশে প্রাণ হারালো-তাদের বিদেহী অমর আত্মা বাংলাদেশের পথে-প্রান্তরে, ঘরে-ঘরে গুরে ফিরছে এবং অন্যায় অত্যাচারের প্রতিকার দাবী করছে।

রক্ত দিয়ে, প্রাণ দিয়ে যে আন্দোলন তারা গড়ে তুলেছিলেন, সে আন্দোলন ৬-দফা ও ১১-দফার। আমি তাদেরই ভাই। আমি জানি, ৬-দফা ও ১১-দফা বাস্তবায়নের পরই তাদের বিদেহী আত্মা শান্তি পাবে। কাজেই আপনারা আওয়ামী লীগের প্রতিটি প্রার্থীকে নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে বাংলাদেশের প্রতিটি আসনে জয়যুক্ত করে আনুন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, যে জালেমদের ক্ষুরধার নখদন্ত জননী বঙ্গ ভূমির বক্ষ বিদীর্ণ করে তার হাজারো সন্তানকে কেড়ে নিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমরা জয়যুক্ত হবো।

শহীদদের রক্ত বৃথা যেতে পারেনা। অন্যায় সত্যের সংগ্রামে নিশ্চই আল্লাহ আমাদের সহায় হবে।

জয় বাংলা

সংগ্রহ-সিডি শুনে রচিত

 

১৯৭০ সালের ৬ ডিসেম্বর নির্বাচনের পূর্বে দেশবাসীর উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ

[পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সর্বপ্রথম প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে জাতীয় পরিষদের নির্বাচন হয় ৭ ডিসেম্বর, ১৯৭০ সালে। জনসংখ্যার ভিত্তিতে দেশের উভয় অঞ্চলের মধ্যে আসন বন্টন করা হয়। মোট ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৯০টি আসনের নির্বাচন ৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয়। পশ্চিম পাকিস্তানের একটি আসনের একজন  প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দিতার নির্বাচিত হন। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছাস বিধ্বস্ত পূর্ব পাকিস্তানের ৯টি আসনের নির্বাচন স্থগিত রাখা হয়। ২৫টি রাজনৈতিক দলের প্রার্থীসহ মোট ১,৫৫৫ জন প্রার্থী ২৯০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকায় ২টি কেন্দ্র থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। নির্বাচনের প্রাক্কালে ৬ ডিসেম্বর, ১৯৭০ আওয়ামী লীগ প্রধান দেশবাসীর উদ্দেশ্যে নিম্নোদ্ধৃত বাণী প্রদান করেন।]

উদ্দেশ্যে এবারই সর্বপ্রথম জনগণের সত্যিকার প্রতিনিধিদের দ্বারা এ দেশের মানুষের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের মূল সনদ শাসনতন্ত্র রচিত হতে চলেছে। বাংলাকে শোষণের হাত থেকে বাঁচাতে হলে, এ দেশের ১৩ কোটি মানুষকে সত্যিকার মুক্তির সন্ধান দিতে হলে চাই এক কণ্ঠের আওয়াজ, সে আওয়াজ তুলতে হবে বাংলারই জনপ্রতিনিধিদের, পশ্চিম পাকিস্তানের অসহায় মানুষের ভোটে যাঁরা নির্বাচিত হয়ে আসবেন, তাঁদের অধিকাংশই এ দেশের সামস্ত স্বার্থেরই প্রতিভূ। তাঁদের কণ্ঠে কখনো দেশের কৃষক-শ্রমিক তথা সর্বহারা মানুষের স্বার্থের কথা ধ্বনিত হতে পারে না। বরং নিজেদের স্বার্থই তাঁরা চাইবেন। গণস্বার্থকে দাবিয়ে রাখতে।

জাতীয় পরিষদে তাঁদের মোকাবিলা করে এ দেশের আপামর মানুষের স্বার্থ ও অধিকার ছিনিয়ে এনে পাকাপাকিভাবে শাসনতন্ত্রে স্থান দেয়ার নিশ্চয়তা দিতে পারে কেবল বাংলার মানুষের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ঐক্য। ভিন্ন ভিন্ন দলের পৃথক চিন্তাধারার প্রতিনিধিদের কণ্ঠে বেসুরো আওয়াজ উঠতে বাধ্য। তার উপর রয়েছে বাংলার মীরজাফরদের ভূমিকা। ইতিমধ্যেই আপনারা দেখেছেন অন্যান্য রাজনৈতিক দল কেউ ৯০/৯৫টি, কেউবা ৩০/৪০টি আসনে দলীয় প্রার্থী দাঁড় করিয়াছেন।

একটু লক্ষ করলেই দেখবেন, এসব দলের সব কয়টিরই শিকড় পশ্চিম পাকিস্তানে। বাংলাদেশের জন্যে তাদের এমনই দরদ যে, পশ্চিম পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্যে প্রয়াস পেলেও, বাংলাদেশের বেলায় যে কয়টি আসন পাওয়া যায়, ভাল-এই নিয়মেই তাঁরা নির্বাচনে নেমেছেন। তাঁরা যে বাংলার তথা আপামর জনসাধারণের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব গ্রহণে ইচ্ছুক নয়, তার সবচাইতে বড় প্রমাণ তাঁরা নির্বাচনে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের কোন চেষ্টাই করতে চান না। তাঁরা জানেন যেনতেন প্রকারে গুটিকয়েক আসনে যদি তাঁরা এখান থেকে তাঁদের প্রার্থীকে পার করিয়ে নিতে পারেন, তাহলে তাঁদেরকে বগলদাবা করে যে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যাপারে বাংলাকে সংখ্যালঘু করে নিজেদের স্বার্থ আদায়ের পথ ঠিকই করে নিতে পারবেন। এ দুরভিসন্ধি সম্পর্কে তাই বাংলার মানুষকে সজাগ থাকতে হবে।

ক্ষমতার প্রত্যাশী আমি নই। তবে শক্তির প্রত্যাশী আমি বটে-কায়েমি স্বার্থসম্পন্ন অনিচ্ছুক মহলের হাত থেকে দেশবাসীর স্বার্থ ও অধিকার ছিনিয়ে আনতে শক্তি আমার চাই-ই চাই। সে শক্তি যোগাতে পারেন কেবল আপনারাই। এ কারণে, আমাদের খেদমতে একটাই মাত্র প্রার্থনা জাতীয় পরিষদে দাঁড়িয়ে বাংলার মানুষের হয়ে এক কণ্ঠে আওয়াজ তুলে বাংলা ও বাঙ্গালির স্বার্থ ও অধিকার যাতে আমরা আদায় করে নিতে পারি তার জন্যে জাতীয় পরিষদে বাংলাদেশের ১৬২টি আসনে প্রত্যেকটি আসনে আপনারা আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীকেই ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করুন।

কারণ, আপনাদের চাহিদামতো শাসনতন্ত্র পাস করিয়ে আনতে হলে অনিচ্ছুক প্রতিপক্ষের মোকাবিলায় আমরা চাই নির্ভেজাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা। এই সংখ্যাগরিষ্ঠতা যদি আপনারা আমাকে জাতি, ধর্ম ও দলমত নির্বিশেষে দেন, তাহলে ওয়াদা দিচ্ছি, আপনাদের স্বার্থ ও অধিকার আমি আদায় করে আনবই। আর যদি আপনাদের বিচার ভুল হয়, আবার যদি পার্লামেন্টে গিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শের দরুন বাংলার প্রতিনিধিরা দলে দলে ভাগ হয়ে বসে বাইরে চলে যাবে। আর তার অর্থ হবে এ দেশের ১৩ কোট মানুষ ও তাদের ভবিষ্যৎ বংশধরদের সর্বনাশ। এ সর্বনাশে আমি আপনি জ্ঞানত শরিক হতে পারি কিনা তা বিচারের ভার আপনাদের উপরই আমি ছেড়ে দিচ্ছি।

[সূত্র ঃ দৈনিক ইত্তেফাক, ৭ ডিসেম্বর, ১৯৭০]

 

১৯৭০ সালের নির্বাচনে জয়লাভের পর ৯ ডিসেম্বরে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ

[আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের ৭ ডিসেম্বর নির্বাচনে ১৫৩টি আসনের মধ্যে ১৫১টি আসন লাভ করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকার ২টি আসন থেকে বিপুল ভোটে জয়ী হন। প্রাদেশিক কাউন্সিল লীগ প্রধান খাজা খায়ের উদ্দিন ১ লাখের বেশি ভোটে বঙ্গবন্ধুর কাছে পরাজয় বরণ করেন। এ নির্বাচনে অন্যান্য পরাজিত প্রার্থীদের মধ্যে ছিলেন ফজলুল কাদের চৌধুরী, কাজী আব্দুল কাদের, মাহমুদুল হক ওসমানী, অধ্যাপক গোলাম আজম, ফরিদ আহমদ, ওয়াহিদুজ্জামান, আব্দুর রহিম, নবাবজাদা নসরুল্লাহ খান, এয়ার মার্শাল আসগর খান।

জাতীয় পরিষদে নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিরাট সাফল্য ও নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর ৯ ডিসেম্বর, ১৯৭০ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগ অফিসে দেশী-বিদেশী সাংবাদিকদেও স্বাগত জানান এবং দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের প্রধান হিসাবে তার বিবৃতির প্রদান করেন। তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণকে স্বাগত জানান এবং দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের প্রধান হিসাবে তার বিবৃতির শেষে ‘জয় বাংলা’ উচ্চারণ করেন। বিবৃতির বঙ্গানুবাদ দেওয়া হলো।]

আমাদের জনসাধারণ একটি ঐতিহাসি রায় প্রদান করেন। একটি দূর্দমনীয় সংগ্রাম পরিচালনা করে তারা এই রায় প্রদান করার অধিকার নিজেদের জন্যে অর্জন করেছেন। এই সংগ্রাম পরিচালনার সময় হাজার হাজার মানুষ জীবন বিসর্জন দিয়েছেন এবং অগণিত লোক বছরের পর বছর ধরে উৎপীড়ন ও নির্যাতন ভোগ করেছেন। জনসাধারণের সংগ্রামের এই প্রথম মহান বিজয়ের জন্যে আমরা সর্বশক্তিমান আল্লাহ তায়ালার দরবারে শুকরিয়া আদায় করছি।

আমরা আমাদের শহীদানের স্মৃতির প্রতি সালাম জানাই। আমরা আমাদের জনসাধারণ, বীর ছাত্র সমাজ, মজুর ও কৃষকদের অভিনন্দন জানাই। আমরা যাতে একদিন প্রকৃত স্বাধীনতায় বসবাস করতে পারি তার জন্যে এরা বর্বরোচিত নির্যাতনের মুখেও অকুতোভয় সংগ্রাম করেছেন। আওয়ামী লীগের এই বিজয় প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের লাখো লাখো নির্যাতিত মানুষেরই বিজয়। আমাদের দেশের জনসাধারণের অর্থাৎ আমাদের ছাত্র, আমাদের মজুর এবং আমাদের কৃষক প্রাণঢালা ভালোবাসায় আমরা অভিভূত হয়ে পড়েছি।

এরা পরিস্কারভাবে প্রমাণ করেছেন যে, আওয়ামী লীগ হলো তাদের দল। আমরা এ বিষয়ে সুনিশ্চিত যে, তারা এই সত্যটি আগামী ১৭ ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য প্রাদেশিক নির্বাচনেও প্রমাণ করবেন। আমাদের দলীয় কর্মীরা নিরতিশয় বাধা-বিপত্তি সত্ত্বে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ চালিয়ে গেছেন। তারা আজ যথোচিতভাবে পুরস্কৃত হয়েছেন বলে মনে করার কারণ রয়েছে। জনসাধারণের মধ্যে বিরাট একতা ও ব্যাপক গণজাগরণই ছিলো আমাদের কর্মীদের পুরস্কার। জনসাধারণ প্রত্যেকটি ভোটকেন্দ্রে শান্তিপূর্ণভাবে এবং শৃঙ্খলার সাথে সাধারণ নির্বাচনে একটি পরিস্কার রায় প্রদান করেছেন। এই নির্বাচন ছিল বাংলাদেশের জন্যে গণভোটের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ রায় প্রদান।

যে যাই হোন না কেন, আমাদের লক্ষ্য সামনে রয়েছে এবং এই লক্ষ্যগুলো অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত আমাদের সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে। ৬-দফার ভিত্তিতে একটি শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করে একে সর্বতোভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। বাংলাদেশ এবং এর অগণিত জনসাধারণকে প্রকৃতির ধ্বংসলীলা ও কায়েমী স্বার্থ থেকে অবশ্যই রক্ষা করতে হবে। অন্যান্য বহুবিধ সমস্যা ছাড়াও ক্ষুধা, বেকারত্ব, রোগশোক, বন্যা-দূর্ভিক্ষ এবং নিরক্ষরতা প্রভৃতি সমস্যার সমাধান অতি জরুরী হয়ে পড়েছে। উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ে ১০ লাখ লোক মারা গেছে এবং বর্তমানে এ অঞ্চলগুলোতে ৩০ লাখ লোক শুধুমাত্র বেঁচে থাকার জন্যে মরণপণ সংগ্রামে লিপ্ত রয়েছে। উপকূলীয় অঞ্চলের জনসাধারণের এই অবস্থা আমাদের অতীতের শোষণ ও অবহেলার নিষ্ঠুরতাকেই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। আর সেই সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে আমাদের পাহাড় প্রমাণ কর্তব্যকে।

আমরা মনে করি, কায়েমি স্বার্থবাদীদে শোষণ ও প্রকৃতির অভিশাপ থেকে জনসাধারণকে রক্ষা করার জন্যে আমাদের সব শক্তি ও সহায়সম্বল নিয়োজিত করার পবিত্র ওয়াদা করাই হলো জনসাধারণের এই বিজয় উদযাপনের একমাত্র উত্তম পন্থা। এই উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যে আমরা শোষণমুক্ত একটি নতুন অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ওয়াদা করছি।

পশ্চিম পাকিস্তানের গণজাগরণের ঢেউ জেগেছে। আমাদের গণজাগরণের এই প্রথম লক্ষণকে স্বাগত জানাই। জনতাকে তাদের বাঙ্গালি ভাইদের বহুদিনের আশা-আকাঙ্খাকে আদায়ের জন্যে আমাদের সমর্থন করার উদ্দেশ্য আহ্বান জানাই। পক্ষান্তরে আমরাও আমাদের পক্ষ থেকে সামন্ততন্ত্র ও অন্যান্য কায়েমি স্বার্থবাদীদের নির্যাতন থেকে তাদের মুক্তি সংগ্রামে আমাদের সমর্থনের বিষয়ে নিশ্চয়তা দিচ্ছি।

আমরা বিশ্বাস করি যে, আমরা আজ যে ভয়াবহ চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছি, তা আমরা আমাদের জনগণের ব্যাপক সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টার মাধ্যমে মোকাবিলা করতে পারব। আমাদের জনসাধারণ আজ ভবিষৎ বংশধরদের সম্পর্কে তাদের দায়িত্বাবলী বিষয়ে সম্পূর্ণ সজাগ রয়েছে, এই বিশ্বাসের উপর নির্ভর করেই আমরা শক্তি ও আশা লাভ করি। গণঐক্যের দৃঢ় ভিত্তির উপরই একমাত্র আমাদের সমাজের পুনঃর্গঠন এবং অঞ্চলে অঞ্চলে ও মানুষের মধ্যে অবিচার দূর কার কার্যকরী কর্মসূচীতে রচিত হতে পারে। তাই আমরা আমাদের লাখ লাখ নির্যাতিত মানুষের দুর্গতি লাঘবে, স্বাধীনতা এবং সমৃদ্ধির জন্যে অতীতের সমস্ত তিক্ততা, বিভেদ এবং শত্রুতা ভুলে যেয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার আবেদন জানাচ্ছি।

জয় বাংলা

সূত্র ঃ পূর্বদেশ, ১০ ডিসেম্বর, ১৯৭০

 

১৯৭০ সালের ১১ ডিসেম্বর সন্দ্বিপ হাইস্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত জনসভায় বঙ্গবন্ধুর ভাষণ দেন

[জাতীয় পরিষদ নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর বঙ্গবন্ধু দ্বিতীয়বারের মতো ঘূর্ণিঝড় বিধ্বস্ত অঞ্চল পরিদর্শনের জন্যে ১০ ডিসেম্বর রাতে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেন। সপ্তাহব্যাপী এ সফরে বঙ্গবন্ধু নৌকা ও পায়ে হেঁটে বিঃধ্বস্ত এলাকার অনেক অংশ সফর করেন, প্রতিদিন অসংখ্য সভায় বক্তৃতা করেন। দলীয় ত্রাণতৎপরতা তদারক করেন। ১১ ডিসেম্বর সন্দ্বীপ হাই স্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত জনসভায় প্রদত্ত তাঁর ভাষণের অংশবিশেষ উদ্ধৃত হলো।]

আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয়ে আপনাদের সবাইকে আমি ধন্যবাদ জানাই। এটা আমার জয় নয়, এটা ৭ কোটি বাঙ্গালীর জয়। আমার কথা মতো কাজ করায় এবং সর্বদা আমাকে অকুণ্ঠ সমর্থন জানানোর জন্যে আমি জনগণের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

আমি পুনরায় জনগণের প্রতি আশ্বাস দিচ্ছি, ৬-দফার উপর ভিত্তি করেই দেশর শাসনতন্ত্র প্রণীত হবে। আওয়ামী লীগ এখন সংখ্যাগরিষ্ঠ দল এবং ইন্শাআল্লাহ আমরা এমন শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করবো যার ফলে বাঙ্গালীদের শোষণের যগের অবসান হবে। যদি নির্বাচনে জনগণ অন্যরকম সিদ্ধান্ত নিতো তাহলে তাদের কুকুর-বিড়ালের মতো মরতে হতো। এখন কেমন করে বাংলার দাবি ঠেকিয়ে রাখা হয় সেটা আমি দেখবো।

আমাকে কারাগার থেকে মুক্ত করার জন্যে আপনারা রক্ত দিয়েছেন এবং প্রয়োজন হলে সে ঋণ শোধ করার জন্যে আমিও রক্ত দান করবো।

আমি মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিতে অব্যস্ত নই। যদি আমি একবার কোন প্রতিজ্ঞা করি তাহলে সে প্রতিজ্ঞায় অটল থাকি। আর আমার এক প্রতিজ্ঞা রক্ষার দিন নিকটতর হয়েছে। শিগগিরই ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মাফ করে দেয়া হবে।

আমি অবিলম্বে পূর্ব পাকিস্তানের সমগ্র এলাকায় বাঁধ দেয়ার দাবি জানাচ্ছি। এজন্যে টাকা নেই এ কথা আমি আর শুনতে রাজি নই।

ঘূর্ণিঝড়-পীড়িত জনগণকে সাহায্যের ভিত্তিতে রিলিফ দিতে হবে। তাদের ঋণ দেয়ার কোন প্রশ্নই ওঠে না। কারণ, সব সাহায্যই বিদেশী রাষ্ট্রগুলো দিয়েছেন। সুতরাং টাকা পয়সা, হালের বলদ, বীজ, গৃহনির্মাণের সাজ-সরঞ্জাম এবং সবকিছু প্রয়োজনীয় দ্রব্যই তাদেও বিনামূল্যে দিতে হবে।

অন্যান্য দূর্গত অঞ্চল সফরকালে আমি দেখতে পেয়েছি, দূর্গত জনগণের কাছে যথাযথ ও প্রচুর সাহায্য-সামগ্রী পৌঁচাচ্ছে না। আমি সর্তক করে দিচ্ছি যে, এ ব্যাপারে কোন দায়িত্বহীনতা সহ্য করা হবে না, রিলিফ অর্থের কোনরকম অনিয়ম করতে দেয়া হবে না। রিলিফ কর্মকান্ডের সকল সংশ্লিষ্টকে স্মরণ রাখা উচিত যে আইয়ুব খানের দিন শেষ গেছে আমরা প্রতিটি পয়সার হিসাব নেব।

[সূত্রঃ দৈনিক পূর্বদেশ ও দৈনিক আজাদ, ১৩ ডিসেম্বর, ১৯৭০]

১৯৭০ সালের ১৪ ডিসেম্বর শেখ মুজিবুর রহমান কতৃক ইয়াহিয়া খানকে প্রেরনকৃত তারবার্তা

[১১ ডিসেম্বর, ১৯৭০ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে নির্বাচনে তাঁর দলের সাফল্যে অভিনন্দন জানিয়ে বার্তা পাঠান। নির্বাচনী সাফল্যে ভুট্টোও বঙ্গবন্ধুকে অভিনন্দন জানান। বঙ্গবন্ধু জবাবে ভুট্টোকেও অভিনন্দন জ্ঞাপন করেন। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের জবাবে শেখ মুজিবুর রহমান যে তারবার্তা প্রেরণ করেন তা নিম্নরূপ।]

চট্টগ্রাম ও ঘূর্ণি উপদ্রুত সন্দ্বীপ সফর শেষে ঢাকা ফিরে আমি আপনার অভিনন্দন বাণী পেয়েছি। এজন্যে ধন্যবাদ। বাংলাদেশের মানুষ অভূতপূর্ব একতা প্রদর্শন করে আমাদের ৬-দফা শাসনতান্ত্রিক ফর্মূলার স্বপক্ষে দ্ব্যর্থহীন রায় ঘোষণা করেছে। একমাত্র ৬-দফা কর্মসূচীর ভিত্তিতে প্রণীত শাসনতন্ত্রই অঞ্চলে অঞ্চলে ও মানুষে মানুষে সুবিচারের নিশ্চয়তা বিধান করতে পারে। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা জনগণের ইচ্ছা অনুসারে শাসনতন্ত্র রচনার ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনে সক্ষম হবেন, মহান আল্লাহর কাছে এটাই আমার প্রার্থনা।

[সূত্রঃ দৈনিক ইত্তেফাক, ১৫ ডিসেম্বর, ১৯৭০]

 

১৯৭০ সালের ১৯ ডিসেম্বর সংবাদপত্রের জন্য বঙ্গবন্ধুর প্রদানকৃত বিবৃতি

[১৭ ডিসেম্বর, ১৯৭০ তারিখে ৩১০ সদস্যবিশিষ্ট পূর্ব পাকিস্তানপরিষদের ২৭৯টি আসনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২৬৮ টি আসন লাভ করে। পিডিপি পায় ২টি, ওয়ালী ন্যাপ, জামাত ও নেজামে ইসলাম ১টি করে ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ৬টি আসন লাভ করে। সংরক্ষিত ১০টি মহিলা আসনও আওয়ামী লীগের সুনিশ্চিত। উল্লেখ্য, পূর্ব পাকিস্তানথেকে জাতীয় বা প্রাদেশিক পরিষদের কোথাও ৩ মুসলিম লীগের কোন প্রার্থী জয়লাভ করেনি। প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনী ফলাফল ঘোষিত হবার পর ১৯ ডিসেম্বর, ১৯৭০ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সংবাদপত্রে প্রকাশের জন্যে এই বিবৃতি প্রদান করেন।]

জাতীয় ও প্রাদেশিক উভয় পরিষদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নজিরবিহীন বিজয়ে আমি সর্বশক্তিমান আল্লাহ এবং আমার প্রিয় দেশাবাসী-ছাত্র, শ্রমিক ও কৃষকদের কাছে গভীর কৃতজ্ঞতায় অভিভূত হয়ে পড়েছিল। আমাদের ৬-দফা কর্মসূচীর পক্ষে এক ঐতিহাসিক রায় প্রদানের জন্য আমি জনসাধারণকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমরা এই রায় বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিতেছি। ৬-দফা কর্মসূচী ভিত্তিক ছাড়া কোন শাসনতন্ত্র হতে পারে না।

আমি চাল, খাওয়ার তেল ও অন্যান্য নিত্যব্যহার্য দ্রব্যাদির ক্রমবর্ধমান মূল্যের ব্যাপারটি গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছি। মনে হচ্ছে অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলার সৃষ্টির মাধ্যমে জনগণের কাছে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর বিঘ্নিত করার জন্য কায়েমি স্বার্থবাদীদের কোন চেষ্টারই একটি অংশ। তাদেরকে হুশিয়ার করে দিতে চাই যে, ঐ ধরণের অপরাধমূলক কাজের জন্য যারা দায়ী জনসাধারণ তাদেরকে ক্ষমা করবে না। যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় এই ধরনের শোষণ চলে অবশ্যই এমন একটি ব্যবস্থার দ্বারা এর অবসান ঘটাতে হবে যা আমাদের মেহনতী জনগণের প্রয়োজন মিটাতে সক্ষম।

বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ে ব্যাপক শস্যহানির দরুন আমরা যে দূর্ভিক্ষের হুমকির সম্মুখীন, এতে পর্যাপ্ত খাদ্যশস্য ও মওজুত ও বিতরণের আশু ব্যবস্থা গ্রহণ এবং এই ব্যাপারে কি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, তা জনগণকে জানানোর জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।

আমি আহ্বান জানাচ্ছি, বাংলাদেশের ঘুর্ণি-উপদ্রুত এলাকার রক্ষাপ্রাপ্ত মানুষের রিলিফের জন্য যে বৈদেশিক মুদ্রা ও অন্যান্য সাহায্য এসেছে, তার সমুদয় প্রাদেশিক সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনয়ন করা উচিত। রিলিফ হিসাবে প্রাপ্ত এই ধরনের অর্থের বোনাস রেটের সুবিধা দেয়া উচিত। প্রাপ্ত সমুদয় বৈদেশিক মুদ্রা অবশ্যই সম্পূর্ণরূপে বাংলাদেশের ঘূর্ণি-উপদ্রুত এলাকাসমূহে ব্যয় করতে হবে। যেহেতু কেন্দ্রীয় সরকারের আমলাদের দ্বারা রিলিফ কাজে সৃষ্টি বিঘ্ন সমূহ এখনো বিদ্যমান থাকার খবর পাওয়া যাচ্ছে, সেহেতু এ যাবৎ প্রাপ্ত সমুদয় বৈদেশিক মুদ্রা ও অন্যান্য সম্পদ এবং এ যাবৎ এর কি পরিমাণ ব্যবহার হয়েছে, সে ব্যাপারে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ হোক। এই ব্যাপারে যে মারাত্মক বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে, তা দূর করার উদ্দেশ্যে অবিলম্বে এই ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশ প্রদানের জন্য আমি প্রেসিডেন্টের প্রতি আহ্বান জানাই।

প্রেসিডেন্ট রাজনৈতিক তৎপরতা সংক্রান্ত অপরাধে দন্ডিতদের ক্ষমা প্রদর্শন করেছেন। আমরা এর প্রশংসা করি। আমরা সবসময় এ ধরনের ক্ষমা প্রদর্শন এবং রাজনৈতিক তৎপরতা সংক্রান্ত বিভিন্ন মামলায় দন্ডিতসহ সকল রাজবন্দীর মুক্তির দাবি জানিয়ে আসছি। আমরা আহ্বান জানাচ্ছি, এই ক্ষমা পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করা হোক এবং রাজনৈতিক তৎপরতা সংক্রান্ত অপরাধের ব্যাপারে কারাগারে আটক ছাত্র শ্রমিকসহ সকল রাজবন্দীর অবিলম্বে মুক্তি দেয়া হোক। রাজনৈতিক তৎপরতা সংক্রান্ত সকল মামলা এবং বিনা বিচারে আটক সকল রাজবন্দীরও মুক্তি দেয়া উচিত।

অন্যান্য মারাত্মক সমস্যাবলির মধ্যে ক্ষুধা, বেকারত্ব, নিরক্ষরতা ও বন্যা আমাদের সামনে রয়েছে। যাতে আমরা একটি উন্নততর ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে পারি, তজ্জন্য আমরা আমাদের জনগণের সক্রিয় সমর্থন ও সহযোগিতা নিয়ে সম্ভব সবকিছু করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি।

[সূত্রঃ সংবাদ, ২০ ডিসেম্বর, ১৯৭০]

১৯৭০ সালের ২৫ ডিসেম্বর পাবনার জনসভায় বঙ্গবন্ধুর ভাষণ

[২৫ ডিসেম্বর ১৯৭০ সকালে শেখ মুজিবুর রহমান তাজউদ্দিন ও ডঃ কামাল হোসেনকে সাথে নিয়ে পাবনা রওয়ানা হন। বিকেলে পাবনার পুলিশ ময়দানে আহমদ রফিকের স্বরণে প্রায় লক্ষ লোকের এক শোকসভায় বঙ্গবন্ধু ভাষণ দেন। পথে পাবনা পৌঁছে তিনি মরহুমের মাজারে ফাতেহা পাঠ করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারবর্গকে সাত্ত্বনা দিতে আহমদ রফিকের বাসভবনে যান। শোকসভায় বঙ্গবন্ধুর ভাষণের অংশবিশেষ উদ্ধৃত হলো।]

বাংলাদেশের শহীদদের তালিকায় আরো ২টি নাম অন্তর্ভূক্ত হল। তাঁরা হচ্ছেন আততায়ীর হাতে নৃশংসভাবে নিহত পাবনার আহমদ রফিক ও খুলনার মমতাজ উদ্দিন। তবে তথাকথিত বিপ্লবীদের রাজনৈতিক হত্যাকান্ডের মত মারাত্মক উস্কানিমূলক কর্মতৎপরতা সত্ত্বের পূর্ণ শান্তি বজায় রাখার জন্যে আপনাদেরকে আমি অনুরোধ করছি। আমার দল যীশুর নীতিতে বিশ্বাসী নয়। আমি একজন মুসলমান এবং আমি জানি কি করতে হয়। ঢিলটি মারলে যে পাটকেলটি খেতে হয়, আমি সে নীতিতে বিশ্বাসী। তবে আমি বলব তার আগে জনগণের উচিত সরকার এই ব্যাপারে কি করে, তার জন্যে অপেক্ষা করা। অবিলম্বে নবনির্বাচিত প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য আহমদ রফিক ও খুলনার মমতাজউদ্দিনের হত্যাকান্ডের জন্যে দায়ী ব্যক্তিদের সরকার শান্তি দিতে না পারলে বাংলার মানুষের ধৈর্যচ্যুতি ঘটতে পারে এবং তার মারাত্মক পরিণতির জন্যে সরকার দায়ী থাকবেন।

এই ধরনে জঘন্য কার্যক্রমে জড়িত একটি বিশেষ দল সবসময়ই জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করে যাচ্ছে। এসব রাজনৈতিক হত্যাকান্ড বাংলাদেশের বিরুদ্ধে পরিচালিত এক বিরাট ষড়যন্ত্রেরই অংশবিশেষ। প্রতিক্রিয়াশীল ও কায়েমী স্বার্থবাদী মহলের বিরুদ্ধে জনগণের ঐতিহাসিক বিজয়ের পর সেই ষড়যন্ত্রের জাল আবার নতুন করে বিস্তার শুরু করেছে। আপনারা ৬-দফা ও ১১-দফার পক্ষে ভোট দিয়েছেন। আপনারা আল্লাহর নিকট দোয়া করুন, শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য অর্জনের সকল রকমের বাধাবিপত্তি অতিক্রমের শক্তি যেন আমি পাই। আওয়ামী লীগ কিংবা ৬-দফা ও ১১-দফার দাবিতে ভোটদানকারী বাংলার মানুষ, কেউ দুর্বল নয়। আগামী ৩রা জানুয়ারি রমনা রেসকোর্সে আওয়ামী লীগ যে জনসভার আয়োজন করেছে, সেখানে আমি আমার পরবর্তী কর্মসূচী ঘোষণা করবো।

আহমদ রফিককে মনোনয়নের আগেও দুস্কৃতকারীরা তাঁকে ৩ বার ছুরি দিয়ে আঘাত করে, কিন্তু তিনি মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যান। এ ধরনের কার্যকলাপ অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে, নয়তো গুন্ডাদের জঘন্য কাজের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। শহীদদের স্বপ্ন অবশ্যই বাস্তবায়িত করা হবে। সবাইকে আমি নিহতদের আত্মার জন্যে দোয়া করতে বলছি।

[সূত্রঃ দৈনিক পাকিস্তান ও পূর্বদেশ, ২৭ ডিসেম্বর, ১৯৭০]

 

১৯৭০ সালের ২৮ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধুর পত্রিকায় দেয়া বিবৃতি

[২২ ডিসেম্বর ১৯৭০ প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত আওয়ামী লীগের সদস্য পাবনার আহমদ রফিক আততায়ীর ছুরিকাঘাতে খুন হয়। তার কিছুদিন আগে খুলনায় মমতাজ নামে আরেকজন আওয়ামী লীগ কর্মী আততায়ীর হাতে নিহত হন। এসব হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চরণ করে ২৮ ডিসেম্বর পত্রিকায় একটি বিবৃতি দেন। নিচে বিবৃতি উদ্ধৃত হলো।]

আমি এই নৃশংস হত্যাকান্ডে গভীরভাবে দুঃখ ভারাক্রান্ত, যার ফলে জনগণের সংগ্রামে নিবেদিত নির্ভীক সৈনিক এবং আওয়ামী লীগের দুইজন বিশিষ্ট সদস্যের মূল্যবান জীবনের অবসান ঘটল। আহমদ রফিকের বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপই পাবনার জনগণ তাঁকে এম,পি,এ নির্বাচন করেছিলেন। খুলনার মমতাজ ছিলেন আওয়ামী লীগের একজন বিশিষ্ট কর্মী। আমি এই দুই শহীদের শোকসন্তপ্ত পরিবারবর্গের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করছি।

তাঁরা গণ-দুশমন ও ষড়যন্ত্রকারীদের পূর্বপরিকল্পিত ও সুস্থ মস্তিস্ক হত্যাকান্ডের শিকারে পরিণত হয়েছেন। এই অমানুষিক চক্রান্তের পেছনে কোন গণবিরোধী মহল সক্রিয় রয়েছে জনগণের তা অজানা নয়। জঘন্য অপরাধীদের বিচারের জন্যে সত্বর ও কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণের জন্যে সরকারকে আহ্বান জানাচ্ছি। এ ব্যাপারে ত্বরিত এবং কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে জনগণের ধৈর্য্যরে বাঁধ ভেঙ্গে যেতে পারে এবং তারা এই সকল গণ-বিরোধী দুস্কৃতকারীদের বিরুদ্ধে পাল্টা আঘাত হানতে পারে।

[সূত্রঃ ইত্তেফাক ও সংবাদ, ২৫ ডিসেম্বর, ১৯৭০]

 

১৯৭০ সালের ৩১ ডিসেম্বর হোটেল পূর্বানীতে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ

[ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশনস-এর সাংস্কৃতিক ও চলচ্চিত্র বিষয়ক সাপ্তাহিকী ‘পূর্বানীর ষষ্ঠ বার্ষিকী উপলক্ষ্যে ৩১ ডিসেম্বর, ১৯৭০ ঢাকার হোটেল পূর্বানীতে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। রেডিও-টিভিতে রবীন্দ্র সঙ্গীত বন্ধ করার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে পূর্বানী উচ্চকণ্ঠ সমালোচক ছিল। আইয়ুব আমলে পূর্বাণীর প্রকাশনা দীর্ঘদিন সরকারী নির্দেশে বন্ধ রাখা হয়েছিল। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তাঁর ভাষণে ভাষা, সংস্কৃতি ও মানুষের প্রতি শিল্পী সাহিত্যিকদের দায়িত্বের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষণের অংশবিশেষ উদ্ধৃত হলো।]

শিল্পী, সাহিত্যিক এবং কবিদের জনসাধারণের আশা-আকাঙ্খা অবশ্যই প্রতিফলিত করতে হবে। তাঁরা তাঁদের মানুষ, তাঁদের মাতৃভূমি ও সংস্কৃতির জন্যে শিল্পচর্চা করবেন।

জনগণের স্বার্থে এবং বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে নতুন করে গড়ে তোলার জন্যে সাহিত্যিকদের প্রাণ খুলে আত্মনিয়োগ করার জন্যে আমি আবেদন জানাচ্ছি। আমি তাঁদের আশ্বাস দিচ্ছি, শিল্পী, কবি এবং সাহিত্যিকবৃন্দের সৃষ্টিশীল বিকাশের যে কোন অন্তঃরায় আমি এবং আমার দল প্রতিহত করবে। আজ আমাদের সংস্কৃতির সামনে কোন চক্রান্ত নেই, শাসন বা নিয়ন্ত্রণের বেড়াজাল নেই। শিল্পী-সাহিত্যিকরা আর মুষ্টিমেয় সুবিধাভোগী ব্যক্তিবর্গের জন্যে সংস্কৃতিচর্চা করবেন না। দেশের সাধারণ মানুষ, যারা আজও দুঃখী, যারা আজও নিরন্তর সংগ্রাম করে বেঁচে আছে, তাদের হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির উপজীব্য করার জন্যে শিল্পী, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিসেবীদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।

রাজনৈতিক ক্ষমতা না পেলে সংস্কৃতিকে গড়ে তোলা যায় না। বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক ক্ষমতা ছিল না বলেই বাংলা সংস্কৃতির বিকাশ হয়নি।

স্বাধীনতার পর বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির বিকাশের জন্যে প্রায় কিছুই করা যায়নি। শিল্পী, সাহিত্যিক এবং সংস্কৃতিসেবীদের তাঁদের সৃষ্টিশীল কাজের মাধ্যমে মানুষের আশা-আকাঙ্খা প্রতিফলিত করতে দেয়া হয়নি। যে সংস্কৃতির সাথে দেশের মাটি ও মনের সম্পর্ক নেই তা বেশিদিন টিকে থাকতে পারে না।

ধর্ম ও জাতীয় সংহতির নামে আমাদের সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার চেষ্টা করা হয়েছে। বাংলা সংস্কৃতির বিরুদ্ধে এই চক্রান্ত আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির বিকাশে অন্তরায় সৃষ্টি করেছে। কিন্তু আমাদের জনগণ এই চক্রান্ত প্রতিহত করেছে। আপনারা সবাই আমাদের মহান ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস জানেন।

বাংলা ভাষা ও বঙ্গ সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার জন্যে জাতীয় পুনর্গঠন ব্যুরো স্থাপন করা হয়েছে। পাকিস্তানবেতার এবং টেলিভিশনও এই ষড়যন্ত্রের দোসর। তারা রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রচার বন্ধ করে দিয়েছিল এবং আজও এ ব্যাপারে উঁচু মহলে জোর আপত্তি রয়েছে। জনগণ তাদের ভাষা ও সংস্কৃতির বিরুদ্ধে এই চক্রান্ত সহ্য করবে না। বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে যেসব বাঙ্গালি সরকারী সমর্থন পেয়েছেন, তাঁদের দিন আজ শেষ।

[সূত্রঃ আজাদ, ইত্তেফাক ও সংগ্রাম, ১ জানুয়ারী,১৯৭১]

 

আরও দেখুন:

মন্তব্য করুন