বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ১৯৭০ সালের নভেম্বর মাস [ Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman Speech : 1970, November ]

বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ১৯৭০ সালের নভেম্বর মাস

বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ১৯৭০ সালের নভেম্বর মাস [ Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman Speech : 1970, November ]

১৯৭০ সালের নভেম্বরে বঙ্গবন্ধুর বেতারে ভাষণ

পাকিস্তানঅর্জনের দীর্ঘ তেইশ বছর পর আগামী ৭ই ডিসেম্বর এই প্রথম জাতীয় ভিত্তিতে জনগণের সরাসরি ভোটে দেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। আজ থেকে ২৪ বছর আগে স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াবার রঙ্গীন বুক বেঁধে এমনি করেই একদিন জনগণ ভোট দিয়েছিলেন পাকিস্তানের পক্ষে, কিন্তু দিন না যেতেই দেখেছেন পাকিস্তানে জন্মলগ্নে জনগণের দেয়া সুস্পষ্ট ম্যান্ডেটের প্রতি এদেশের এক শ্রেণীর নেতার বিশ্বাসঘাকতার ফলে সব স্বপ্ন তাদের ভেঙ্গে খান খান হয়ে গিয়েছে।

বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ১৯৭০ সালের নভেম্বর মাস [ Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman Speech, Year 1970, Month November ]

কেবল বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষই নয়, সারা দেশের বারো কোটি মানুষই আজ ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে নিজ দেশে পরবাসী। পরাধীন আমলেও এ চেহারা এদেশের মানুষের ছিল কিনা তা আপনারাই বিচার করবেন। স্বাধীনতা উত্তর জীবনে বিগত ২৩টি বছর ধরে সীমাহীন অত্যাচার-নির্যাতন লাঞ্ছনা-গঞ্জনা, শোষণ ও বঞ্চনা এদেশের মানুষকে পোহাতে হয়েছে, তার সাক্ষী কেবল আমি বা আমার দলই নয় আপনারাও।

আপনাদেরই সন্তান-ছালাম, বরকত বুকের রক্ত ঢেলে রাজপথে যে সংগ্রামী চেতনায় আমাদের উদ্বুদ্ধ করে গিয়েছিল, তারই সূত্র ধরে এদেশের আরও শত শত সোনার সন্তানের আত্মদানের পরে হাজার হাজার ছাত্র, শ্রমিক রাজনৈতিক কর্মীর অপরিসীম নির্যাতন ভোগের ফলশ্রুতিতে এদেশের মানুষ আজ তাদের অধিকার ফিরে পেতে চলেছে। জনগণের নিরবিচ্ছিন্ন সংগ্রামের সৃষ্ট ফসল হিসেবে এবারই সর্বপ্রথম দেশের আপামর মানুষের মতামত নিয়ে তাদেরই নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা দেশের ভাবী শাসনতন্ত্র রচনার দায়িত্ব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

বিগত দুই যুগের তিক্ত অভিজ্ঞতার পর নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণেরই মতামত নিয়ে পাকিস্তানের বুকে শোষণহীন, ইনসাফের সমাজ প্রতিষ্ঠার উপযোগী একটি শাসনতন্ত্র প্রণয়নের যে সুযোগ আজ এসেছে, তার যথাযথ সদ্ব্যবহার ও নির্ভর প্রয়োগের উপরই এদেশের আপামর জনসাধারণের ভবিষ্যত নির্ভরশীল।

পাকিস্তানের বিগত তেইশ বছরের ষড়যন্ত্রের রাজনীতির ধারাক্রমে জাতি আজ এক চরম সঙ্কট সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। এই সঙ্কট থেকে জাতিকে মুক্ত করার জন্য দেশব্যাপী যে নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছে তাকে উপলক্ষ্য করে প্রতিপক্ষীয় রাজনীতিকরা সেই পুরাতন প্রতিক্রিয়াশীল শোষক সম্প্রদায়ের প্রভুদেরকেই আবার ক্ষমতার আসনে বসার জন্য উন্মক্ত হয়ে উঠেছেন। একটু তলিয়ে দেখলেই তাদের একারসাজির মাজেজা বুঝা আপনাদের পক্ষেও কঠিন কিছুই নয়।

আপনারাই দেখেছেন। গণবিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল শোষণ চক্রের এই বাঙ্গালী দালালরা পাকিস্তানের জন্মাবধি নির্বাচন এড়িয়ে জনগণ থেকে নিজেদেরকে সযত্নে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে রেখে কখনও পশ্চাৎদ্বার দিয়ে, কখনও বা লাজ লজ্জার মাথা খেয়ে সরাসরি গিয়ে কুচক্রী ও কায়েমী স্বার্থের সঙ্গে হাত মিলিয়ে গণস্বার্থের সমাধির উপর নিজেদের ভাগ্যের ইমারত গড়েছেন, আবার আন্দোলন দেখলেই পিঠটান দিয়ে আরাম কেদারায় শুয়ে নতুন কোন সুযোগের প্রতীক্ষায় দিন গুজরান করেছেন।

আমাদের বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষের অপপ্রচারের উদ্দেশ্য আর কিছুই নয়, জনগণকে বিভ্রান্ত করে নিজেদের, মুরব্বীদের হয়ে গোপন অভিসন্ধি চরিতার্থ করা। কে না জানে যে, এবারকার নির্বাচনের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। নির্বাচন হওয়ার সাথে সাথে জাতীয় পরিষদের সদস্যরা কিংবা কোন রাজনৈতিক দল ক্ষমতার মসনদে গিয়ে বসে পড়বেন, সে সুযোগ সেখানে নেই। ১২০ দিনের মধ্যে শাসনতন্ত্র প্রণয়নই হবে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাজ। শাসনতন্ত্র প্রণয়ন সমাপ্ত করার পরই কেবল উঠতে পারে মসনদে বসার প্রশ্ন, তার আগে কখনই নয়।

নির্ধারিত মেয়াদের আগে শাসনতন্ত্র তৈরির কাজ সমাধা করতে না পারলে দেশ বিপর্যয়ের কোন অতল গহ্বরে নিক্ষিপ্ত হবে তা ভাবতেও দেশপ্রেমিক মাত্রেরই গা শিউরে উঠার কথা। এতে বিচলিত বোধ করবেন না কেবল তাঁরাই, যাঁরা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে জনগণকে দূরে সরিয়ে রেখে অনিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ক্ষমতায় বহাল হওয়ার খোয়াব দেখেন অথবা সে কাজে সিদ্ধহস্ত।

আওয়ামী লীগ জনগণের ইচ্ছা অনিচ্ছায় বিশ্বাসী, আর বিশ্বাসী বলেই তাঁদের হয়ে জন্মাবধি তারা সংগ্রাম করে এসেছে। জনগণের অভিরুচি অনুযায়ী দেশ শাসিত হউক, এই কামনাই তাদের সংগ্রামী চেতনার মূল উৎস। তাই পাকিস্তানের জন্মলগ্নেই জনগণের সুস্পষ্ট ম্যান্ডেটের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে দেশকে যখন বিপদে পরিচালিত করার ষড়যন্ত্র হয়, তখন তা নস্যাৎ করার জন্য তারা দেশব্যাপী জাতীয় ভিত্তিক সাধারণ নির্বাচন চেয়েছে।

আর জনগণের প্রতি আশ্বাসহীন, দেশ ও দেশের সম্পদ লুট করে ভাগ্য গড়ার নীতিতে বিশ্বাসী আমাদের প্রতিপক্ষীয় এক শ্রেণীর রাজনীতিকরা কায়েমী স্বার্থ, আমলাতন্ত্র ও পশ্চিমাঞ্চলের সামন্তনেতৃত্বে জোতদার, জায়গীরদারদের সাথে হাত মিলিয়ে দেশব্যাপী সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সব প্রচেষ্টাই এ যাবৎ নস্যাৎ করে এসেছেন। আজও সে চেষ্টার বিরাম নেই।

ইতিহাসই স্বাক্ষ্য দেবে, এই বাংলার আপামর মানুষই প্রকৃত প্রস্তাবে পাকিস্তানএনেছিল। সুজলা সুফলা শস্যশ্যামলা এই সোনার বাংলাকে শোষণের চারণ ক্ষেত্র পরিণত করার দূরভিসন্ধিতে মেতে নেপথ্যের এক শ্রেণীর কুচক্রীরা যে মতলব এঁটেছিল, এই বাংলার মীর জাফররাই বাব বার সে মতলবের বাস্তবায়নের প্রধান হাতিয়ার হয়ে কাজ করে এসেছে, আর তাই এদেশের তেরো কোটি মানুষের আজ এ দূরাবস্থা।

১৯৫৪ সালে ঐতিহাসিক নির্বাচনে কায়েমী স্বার্থ, আমলাতন্ত্র ও পশ্চিমাঞ্চলের সামন্তবাদী নেতৃত্বের চক্র ও চক্রান্তের প্রতিভূস্থানীয় যে মুসলিম লীগকে বাংলার বুক থেকে সমূলে উচ্ছেদ করা হয়েছিল, কয়েকটি মাস না যেতেই বাংলার কোন সে ছদ্মবেশী “সু-সন্তানরা” সেই মুসলিম লীগ চক্রের সাথেই রাতারাতি হাত মিলিয়ে বাংলার সাত কোটি মানুষের স্বার্থবিরোধী শাসনতন্ত্র রচনার মত্ত হয়েছিলেন, তাও কারও অজানা নয়।

পরবর্তীকালে দেশে জাতীয় ভিত্তিতে সাধারণ নির্বাচনের প্রস্তুতিপূর্বে রাতের অন্ধকারে ক্ষমতা দখলকরে ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান যখন বারো কোটি মানুষের শত অধিকার ছিনিয়ে নিয়ে দেশব্যাপী ‘কবরে শান্তি’ প্রতিষ্ঠায় যত্নবান হয়েছিলেন, মোনেম খাঁ জাতীয় বাংলার কোন সে মীরজাফর সেই স্বৈরাচারী শাসকের গললগ্ন হয়ে সোনার বাংলাকে অপর অঞ্চলের উপনিবেশ তথা শ্মশানে পরিণত করার চক্রান্ত বাস্তবায়নের পবিত্র দায়িত্ব পালনে সদা সচেষ্ট ছিলেন, যে কাহিনীরও পুনরাবৃত্তির প্রয়োজন পরে না।

তাই বলি, বাংলা আর বাঙ্গালির ইতিহাস সিরাজউদ্দৌলা বনাম মীরজাফরের ইতিহাস, বাংলার ইতিহাস বাংলার আপামর মানুষ বনাম জনাব মোনেম খাঁদেরই ইতিহাস। এ ইতিহাস বড় করুন, বড় মর্মন্তÍদ। এই ইতিহাস আবার গৌরবদীপ্তও বটে। বাংলার কচি প্রাণ সালাম বরকতের তপ্ত তাজা রক্তের পিচ্ছিল পথে নুরুল আমীনের আর সার্জেন্ট জহুর মনুমিয়া, আসাদ, শম্ভু, আলাউদ্দিন আর আনোয়ারদের শোক সন্তপ্ত পিতা ভ্রাতা ভগিনীর তথা অশ্রুর রোষানলে মোমেন খাঁনের ক্ষমতার আসনচ্যুতিও এদেশের ইতিহাসের কত গৌরবোজ্জল অধ্যায়।

তবু শিক্ষা তাদের হয়নি। হয়তো বা অতীতে যারা ইসলামের দোহাই দিয়ে এ দেশকে কায়েমী স্বার্থের অবাধ শোষণক্ষেত্রে পরিণত করে রেখেছিলেন আপনি, আমিও সে ইতিহাস থেকে কোন শিক্ষা নিতে পারিনি। সে শিক্ষা যদি তাদের হত: অথবা দেশবাসী যদি তা থেকে কোন শিক্ষা গ্রহণে সক্ষম হতেন তাহলে ১৯৬৯ এর প্রচন্ড গণ-অভ্যুত্থানের মুখে সেদিন যাঁরা নিজ নাম ঠিকানা গোপন করে পালিয়ে বেড়াতে বাঁধ্য হয়েছিলেন, তারা আজ আবার তাদেরই কথিত এদেশের গরু-ছাগল দরবারে ভোটপ্রার্থী হন বা হতে পারে কোন দুঃসাহসে। মানুষের বিচার-বুদ্ধিও প্রতি এ এক বিরাট চ্যালেঞ্জ,এক মহা অগ্নিপরীক্ষা। এ চ্যালেঞ্জের জবাব জনসাধারণ কিভাবে দিবেন, এ অগ্নি-পরীক্ষায় কিভাবেই বা তাঁরা উত্তীর্ণ হতে চান, তা তাঁদেরই বিবেচ্য।

তবে, আমি যা বুঝি, আমার দলীয় সহকর্মীরা যা বুঝেন অথবা এ দেশের সংগ্রামী ছাত্র, কৃষক ও শ্রমিক সমাজ যা বুঝেন এক কথায় তা হল এই যে, এবারকার সাধারণ নির্বাচনই বাংলার সাড়ে সাত কোটি তথা সারা দেশের তেরো কোটি মানুষের ভাগ্য নির্ধারণের প্রথম ও শেষ সুযোগ। গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দিয়ে কেউ যদি ভেবে থাকেন ভবিষ্যত বংশধরদের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা বিধানে তিনি সক্ষম হবেন, তবে ভুল করবেন নিঃসন্দেহে। আর সে ভুলের প্রায়শ্চিত্ত হয়তো বা কোনদিনই আর সম্ভব হবে উঠবে না।

জনগণের এতদিনের সংগ্রাম সাধনা, ত্যাগ ও তিতীক্ষার পর দেশের শাসনতন্ত্র প্রণয়নের দায়িত্ব ও সুযোগ আবারও যদি সাধারণ মানুষের স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক অধিকার এবং গণতান্ত্রিক নীতি বিরোধী সেই একই পুঁজিবাদী, ধনকুবের, দুর্ণীতিপরায়ণ স্বার্থশিকারী, আমলাতন্ত্র বা একনায়কত্ববাদের হাতে চলে যায় তাহলে দেশ ও দশের সর্বনাশ অবধারিত। আর বয়স্ক ভোটাধিকার ভিত্তিক আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকালে জনগণ ভোটাধিকারটুকুর যথাযথ সদ্ব্যবহার ও নির্ভূল প্রয়োগের মাধ্যমে কুচক্রীদের হাত থেকে সে দায়িত্ব ও সুযোগ যদি ছিনিয়ে আনতে পারেন তবেই দেশ ও দশের কল্যাণ। এই কারণেই আওয়ামী লীগ আসন্ন নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং জাতীয় পরিষদে বাংলাদেশের প্রতিটি আসনে প্রার্থী দাঁড় করিয়েছে।

ভুললে চলবে না যে, পাকিস্তানে এবারই সর্বপ্রথম জনগণের সত্যিকার প্রতিনিধিদের দ্বারা এ দেশের মানুষের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের মূল সম্পদ শাসনতন্ত্র রচিত হতে চলেছে। বাংলাকে শোষণের হাত থেকে বাঁচাতে হলে, এ দেশের বারো কোটি মানুষকে সত্যিকার মুক্তির সন্ধান দিতে হলে চাই মুক্ত কণ্ঠের আওয়াজ-সে আওয়াজ তুলতে হবে বাংলারই জন প্রতিনিধিদের। পশ্চিম পাকিস্তানের অসহায় মানুষের ভোটে যারা নির্বাচিত হয়ে আসবেন তাদের অধিকাংশই জীবনে সামন্ত স্বার্থেরই প্রতিভু। তাদের কণ্ঠে কখনও কৃষক শ্রমিক তথা সর্বহারা মানুষের স্বার্থের কথা ধ্বনিত হতে পারে না বরং নিজেদের স্বার্থেই তারা চাইবেন গণ-স্বার্থকে দাবিয়ে রাখতে।

জাতীয় পরিষদে তাদেরকে মোকাবিলা করে এদেশের আপামর মানুষের স্বার্থ ও অধিকার ছিনিয়ে এনে পাকাপাকিভাবে শাসনতন্ত্রে স্থান দেওয়ার নিশ্চয়তা দিতে পারে কেবল বাংলার মানুষের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ঐক্য। ভিন্ন ভিন্ন দলের পৃথক চিন্তাধারার প্রতিনিধিদের কণ্ঠে বেসুরা আওয়াজ উঠতে বাধ্য। তার উপর রয়েছে বাংলার মীরজাফরদের ভূমিকা। ইতিমধ্যেই অন্যান্য রাজনৈতিক দল কেউ একশত কেউ বা ৩০/৪০টি আসনে দলীয় প্রার্থী দাঁড় করিয়েছেন। একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে এসব দলের সব কয়টিরই শিকর পশ্চিম পাকিস্তানে। বাংলাদেশের জন্য তাদের এমনই দরদ যে পশ্চিম পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য আপ্রাণ প্রয়াস পেলেও, বাংলাদেশের বেলায় যে কয়টি আসন পাওয়া যায় ভাল-এই নিয়মেই তাঁরা নির্বাচনে নামছেন।

তারা যে বাংলার তথা আপামর জনসাধারণের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব গ্রহণে ইচ্ছুক নয়, তার সবচাইতে বড় প্রমাণ তারা নির্বাচনে বাংলাদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের কোন চেষ্টাই করতে চান না। তারা জানেন, যেন তেন গুটিকয়েক আসন যদি তারা এখান থেকে পার করিয়ে নিতে পারেন তাহলে তাদেরকে বগল দাবা করে যে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যাপারে বাংলাকে সংখ্যালঘু করে নিজেদের স্বার্থ আদায়ের পথ ঠিকই করে নিতে পারবেন। এ দুরভিসন্ধি সম্পর্কে তাই বাংলার মানুষকে সজাগ থাকতে হবে।

আরেকটি প্রশ্ন হল, নির্বাচনকে সামনে রেখে আজ অনেক দলই বাংলার জন্য কুম্ভীরাশ্রু বর্ষণ করে চলেছেন। কিন্তু কিভাবে দেশের দু’অঞ্চলের মধ্যকার অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর হবে, কি করে পশ্চিম পাকিস্তানের ক্ষুদ্রতর প্রদেশগুলির মানুষের স্বার্থ সংরক্ষিত হবে, তার কোন কর্মসূচিই জনসাধারণের সামনে তাঁরা ঘোষণা করেননি। ব্যক্তিগত স্বার্থের রাজনীতি আওয়ামী লীগ করে না। রাজনীতির অঙ্গনে ঢাক ঢাক গুড় গুড় নীতিতেও আমরা বিশ্বাসী নই। তাই, জনগণের জন্য যা চাই তা সুস্পষ্ট ভাষায়, সরাসরি ঘোষণা করি।

এ কারণে, আমাদের বহু নির্যাতনও পোহাতে হয়, কখনও রাষ্ট্রদ্রোহী, কখনও বিচ্ছিন্নতাবাদী আবার কখনও বিদেশী চোরের আখ্যাও আমাদের পেতে হয়েছে। তবু জনগণের জন্য যা সত্য ও সুন্দর বলে জেনেছি তা থেকে আমা কখনও বিচ্যুত হয়নি। রক্তচক্ষুর সামনে সত্যকে বর্জন করিনি, রক্তচক্ষু দিয়েই তার জবাব দিয়েছি। দীর্ঘ তেইশ বছর অত্যাচার, নির্যাতন, শাসন-শোষণ আর বঞ্চনার তিক্ত অভিজ্ঞতার আলোকে বিচার করে সর্বশেষ কর্মসূচি হিসেবে আমার দল ৬ দফাকে জাতির সামনে পেশ করেছে। এদেশের সংগ্রামী ছাত্র সমাজও ৬ দফার সারবত্তা অনুধাবন করে তাদের ১১ দফা কর্মসূচীতে ৬ দফাকে স্থান দিয়ে সংগ্রাম করে চলেছে।

পাকিস্তানের ১৩ কোটি মানুষের সত্যিকার মুক্তিচিন্তার স্বর্ণফসল হিসেবে কাউন্সিল অধিবেশনে ও কর্মীসমাজ সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত ৬ দফা। এই কর্মসূচীকে আওয়ামী লীগ কারও উপর জোর করে চাপিয়ে দিতে চায়নি। ৬ দফার গুণাগুণ বিচারের ভার আমরা জনগণের উপরই ছেড়ে দিয়েছি। ৬ দফা বাংলার শ্রমিক কৃষক মজুর মধ্যবিত্ত তথা আপামর মানুষের মুক্তির সনদ ৬ দফা শোষকের হাত হতে শোষিতদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক অধকার ছিনিয়ে আনার হাতিয়ার, ৬ দফা মুসলিম, হিন্দু, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধদের নিয়ে গঠিত বাঙ্গালী জাতির স্বকীয় মহিমায় আত্মপ্রকাশ আর নির্ভরশীলতা অর্জনের চাবিকাঠি, ৬ দফা বাঙ্গালির আত্মমর্যাদার সম্মানজনক আত্মপ্রতিষ্ঠার দাবী, ৬ দফার সংগ্রাম আমাদের জীবন মরণের সংগ্রাম।

তাই এবারকার নির্বাচনে আমার দলের জয়ের অর্থ ৬ দফারই জয় আর ৬ দফার জয়ের অর্থ এদেশের লাঞ্চিত ও বঞ্চিত সাধারণ মানুষের মুক্তি সংগ্রামের জয়।

আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করা হচ্ছে আমরা ইসলামের বিশ্বাসী নই। একথায় জবাবে আমাদের সুস্পষ্ট বক্তব্য সর্বস্ব ইসলামে আমা বিশ্বাসী নই। আমরা বিশ্বাসী-ইনসাফের ইসলামে। আমাদের ইসলাম হযরত রসূলে করীম (সঃ) এর ইসলাম, যে ইসলাম জগতবাসীকে শিক্ষা দিয়েছে ন্যায় ও সুবিচারের অমোঘ মন্ত্র। ইসলামে সুবক্তা সেজে পাকিস্তানের মাটিতে বরাবর যারা অন্যায়, অত্যাচার, শোষণ বঞ্চনার পৃষ্ঠপোষকতা করে এসেছেন, আমাদের সংগ্রাম সেই মোনাফেকদেরই বিরুদ্ধে।

যে দেশের শতকরা ৯৫ জনই মুসলমান, সে দেশের ইসলাম বিরোধী আইন পাশের সম্ভাবনার কথা ভাবতে পারেন কেবল তাঁরাই যাঁদের ঈমানই আদতে নাজুক আর ইসলামকে যারা ব্যবহার করেন দুনিয়াটা ফায়েস্তা করে তোলার কাজে। অতএব আমরা যারা আল্লাহ মজলুম বান্দাদের জন্য সংগ্রাম করছি, তারা ইসলামের বিরোধীতা করাতো দূরের কথা বরং ইসলামের বিধান মতে সমাজে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠারই উমেদার, আর সে ব্যাপারে প্রতিবন্ধক হলেন তারাই যারা ইসলাম বিপন্নের জিগির তুলে জনগণকে ধোকা দিতে চান।

কথা তোলা হয়েছে যে নির্বাচনী ঐক্যজোটে সম্মত না হয়ে আমরা বাংলার স্বার্থেরই ক্ষতি করছি। বন্ধুগণ বাংলার স্বার্থের নিশ্চয়তা বিধানের জন্যই আমরা নির্বাচনী ঐক্যজোটে আর বিশ্বাসী নই। অতীতে বহুবার, এমনকি ১৯৫৪ সালে ঐক্যজোট গঠনের তিক্ত অভিজ্ঞতা আমাদের রয়েছে। বাংলার মানুষ গভীর আশায় বুক বেঁধে যুক্তফ্রন্টকে জয়যুক্ত করেছিল, কিন্তু আমরা দেখেছি যুক্তফ্রন্টের নাম নিয়েই আওয়ামী লীগ সদস্যরা ছাড়া আর সব অন্য দলের সদস্যরাই কেন্দ্রের সেই ধিকৃত দলটিতে ভিড়ে গিয়েছেন, যে দলকে দুদিন আগে বাংলার আপামর মানুষ বাংলার মাটি থেকে সমূলে উৎখাত করেছে।

ফলতঃ সর্বনাশ হয়েছে বাংলার আর বাঙ্গালির, সর্বনাশ হয়েছে এদেশের তেরো কোটি মানুষের। তাই এবার আর আমরা ভিন্ন চিন্তাদর্শের মানুষের সাথে ঐক্যচোট গঠন করে সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি করতে চাইনে। এবার আমাদের কথা হল কর্মসূচি বলতে কিছু থেকে থাকলে তার ভিত্তিতে জনগণের দরবারে যান, জনগণ আপনাকে গ্রহণ করলে জাতীয় পরিষদে গিয়ে প্রয়োজন হলে আপনার সাথে ঐক্যজোট গঠন করব, এখন নয়।

জাতির এ মহা সন্ধিক্ষণে বাংলার জননায়ক শেরে বাংলা পরলোকে, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীও আজ আমাদের মাঝে নেই। মানিক ভাই এর ক্ষুরধার লেখনিও আজ চিরতরে স্তব্ধ। প্রাচীন নেতাদের মধ্যে যাঁরা বেঁচে আছেন তাঁরা অতীতের নিয়মে এখনও পশ্চিমাঞ্চলের সেই কায়েমী স্বার্থের কাছে নিজেদের বিকিয়ে রেখেছেন, নয়তো নির্জীব নিস্কর্মা হয়ে বসে পড়েছেন, অন্যের শলা পরামর্শের বশীভূত হয়ে কথা ও কাজে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছেন। শত প্রতিকূলতা মুখে গর্দাণ খাড়া রেখে কথা বলার মত নেতৃত্বের আজ বড় অভাব।

নিজের সীমাবদ্ধ সামর্থে দেশবাসীর খেদমত করতে গিয়ে অতীতে বহু পরীক্ষার আমাকে সম্মুখীন হতে হয়েছে। আমার সংগ্রামী জীবনের স্বল্প ও সাধনার আলোকে বিচার করে নিশ্চিতই আজ আমি বুঝতে পারছি ভাগ্যহত বাংলার, এদেশের আপামর তথা সাধারণ মানুষের চাওয়া পাওয়ার বাসনাকে সার্থকরূপ দেওয়ার যে বিরাট গুরু দায়িত্ব আজ আমাদের সামনে, সে দায়িত্ব আজ আমাকেই স্কন্ধে তুলে নিতে হচ্ছে। এদেশের ভাগ্যহত মানুষের ভাগ্য প্রণয়নের দায়িত্ব মাটি হতে অঙ্কুরিত আওয়ামী লীগকেই গ্রহণ করতে হবে। আমি ও আমার দল সে দায়িত্ব গ্রহণে সম্পূর্ণ প্রস্তুত, কেবল প্রয়োজন জনগণের দোয়া আর শুভেচ্ছা যা কিনা আমাদের এবারের চলার পথে একমাত্র পাথেয়।

ব্যক্তিগত কৈফিয়ত হিসেবে জনগণের খেদমতে একটিই মাত্র আমার বক্তব্যঃ নিজেদের জীবনের বিনিময়ে যদি এদেশের ভাবি নাগরিকদের জীবনকে কন্টকমুক্ত করে যেতে পারি, আজাদী আন্দোলনের সূচনাতে এদেশের মানুষ মনের পটে যে সুখী সুন্দর জীবনের ছক এঁকেছিল সে স্বপ্নের বাস্তব রূপায়ণের পথ কিছুটাও যদি প্রশস্ত করে যেতে পারি তা হলেই আমার সংগ্রাম সার্থক মনে করব।

বন্ধুগণ, আমি ক্ষমতার প্রত্যাশি নই। তবু আমার প্রতিপক্ষেরা আমাকে এ অপবাদ দিয়ে চলেছেন। বিগত ২৩ বছর ধরে ক্ষমতার আসন আমি করে কখন আঁকড়ে ধরেছি তার বিবরণ তারা দেন না। বিগত গোল টেবিল বৈঠকের সময়ে আমাকে প্রধান মন্ত্রীদের পদ গ্রহণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। আমি তা দু’পায়ে ঠেলে দিয়েছি।

এতে আমার প্রতিপক্ষের বন্ধুদের অনেক কষ্টও হয়েছেন। কিন্তু ব্যক্তিগত লাভালাভ বা স্বার্থের বখরায় শরীক হয়ে দেশবাসীর স্বার্থ জলাঞ্জলি দেয়া আমার রাজনীতির লক্ষ্য কোনদিন ছিল না, আজও নাই। তাই রুষ্ট হলেও প্রধান মন্ত্রীত্বের প্রলোভনের মুখে বাংলা ও বাঙ্গালির স্বার্থের প্রশ্নের নিজ বিবেককে আমি বিকিয়ে দিতে চাইনি। তাঁদের দৃষ্টিতে এ আমার অপরাধ হতে পারে কিন্তু আমার মনে হয় দেশবাসীর দৃষ্টিতে নয়।

বন্ধুগণ, ক্ষমতার প্রত্যাশী আমি নই, তবে শক্তির প্রত্যাশি আমি বটে-কায়েমী স্বার্থসম্পন্ন অনিচ্ছুক মহলের হাত থেকে দেশবাসীর স্বার্থ ছিনিয়ে আনতে শক্তি আমরা চাই-ই-চাই। সে শক্তি জোগাতে পারেন কেবল জনগণই। এ কারণে জনগণের খেদমতে একটিই মাত্র আমার প্রার্থনা জাতীয় পরিষদে দাঁড়িয়ে বাংলার মানুষের হয়ে এক কণ্ঠে আওয়াজ তুলে বাংলা ও বাঙ্গালীর স্বার্থ ও অধিকার যাতে আমরা আদায় করে আনতে পারি, তার জন্য জাতীয় পরিষদে বাংলাদেশে ১৬২টি আসনের প্রত্যেকটি আসনে জনগণ আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীকেই ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করুন।

কারণ জনগণের শাসনতন্ত্র চাহিদামত পাশ করিয়ে আনতে হলে অনিচ্ছুক প্রতিপক্ষের মোকাবিলায় আমরা চাই নির্ভেজাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা। এই সংখ্যাগরিষ্ঠতাই হচ্ছে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বিজয়ের চাকিকাঠি। এই সংখ্যাগরিষ্ঠতা যদি আপনারা আমাকে জাতি, ধর্ম ও দলমত নির্বিশেষে দেন, তাহলে আমি ওয়াদা দিচ্ছি, আপনাদের স্বার্থ ও অধিকার আমি আদায় করে আনবই। আর যদি আপনাদের বিচারে ভুল হয়, আবার যদি পার্লামেন্টে গিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শের দরুন বাংলার প্রতিনিধিরা দলে দলে ভাগ হয়ে বসে বেসুরো আওয়াজ তুলেন, তাহলে হাতে পেলেও সবই আমাদের নাগালের বাইরে চলে যাবে, আর তার অর্থ হবে এদেশের বারো কোটি মানুষ ও তাদের ভবিষ্যত বংশধরদের সর্বনাশ। এ সর্বনাশে আপনি আমি জ্ঞানতঃ শরীক হতে পারি কিনা, তা বিচারের ভার আপনাদের উপরই আমি ছেড়ে দিচ্ছি।

বাংলার মীরজাফরদের সম্পর্কে আমি আপনাদের সজাগ করে দিয়ে এই কথাই বলতে চাই যে, তেইশটি বছরের অত্যাচার, অবিচার, শোষণ ও শাসনে বাংলার মানুষ আজ নিঃস্ব, সর্বহারা। ক্ষুধায় তাদের অন্ন নেই, পরনে নেই বস্ত্র, সংস্থান নেই বাস্থানের। বাংলার অতীত আজ সুপ্ত, বর্তমান অনিশ্চিত, ভবিষ্যত অন্ধকার। জাতির এ হেন দুর্দিনে বাংলার ভবিষ্যত সন্তানদের বাঁচাবার দায়িত্ব আপনার। জাতীয় জীবনের বৃহত্তর ক্ষেত্রে এ দায়িত্ব পালনের সুযোগ যদি আপনারা আমাকে ও আওয়ামী লীগকে দেন তাহলে এদেশের কৃষক-শ্রমিক-ছাত্র-মধ্যবিত্ত, যারা আজ সর্বস্ব হারিয়ে রিক্ত ও শূন্য হস্ত, তাদের মুখে ইনশাল্লাহ আমরা হাসি ফুটাতে পারব এ বিশ্বাস আমাদের আছে।

বাংলার সকল অধিবাসী সে সংখ্যাশুরুই হইক বা সংখ্যালঘুই হউক সকলকেই আজ দেশাত্ববোধ নিয়ে জেগে উঠতে হবে, মরণপণ করে বাংলার মান ইজ্জত রক্ষার জন্যে এগিয়ে আসতে হবে। গড্ডালিকা প্রবাহে গা ঢেলে দিয়ে আজও যারা ঘুমিয়ে আছেন তাদেরকে এবার ডাক দিয় কেবল বলে যেতে চাই, জাগো বাঙ্গালি জাগো। তোমাদের জাগরণেই এদেশের বার কোটি মানুষের মুক্তি।

সামন্ত নেতৃত্ব লাঞ্চিত পশ্চিম পাকিস্তানের আপামর মানুষও আজ তোমাদের দিকেই তাকিয়ে আছে। তোমরা তাদের নিরাশ করো না।

 

আরও দেখুন:

মন্তব্য করুন