বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ১৯৭১ সালের জানুয়ারি মাস [ Bangbandhu Sheikh Mujibur Rahman’s Speech, January Month, 1971 ]

বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ১৯৭১ সালের জানুয়ারি মাস [ Bangbandhu Sheikh Mujibur Rahman’s Speech, January Month, 1971 ]

বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ১৯৭১ সালের জানুয়ারি মাস

১৯৭১ সালের ৩ জানুয়ারী সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ

[৩ জানুয়ারী, ১৯৭১ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে আনুমানিক ২০ লাখ লোকের এক সমাবেশে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে নবনির্বাচিত আওয়ামী লীগ দলীয় সদস্যগণ জনগণের সামনে শপথ গ্রহণ করেন। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রতীক নৌকার আকৃতিবিশিষ্ট প্রায় ১২ ফুট উঁচু ও ১২০ ফুট দীর্ঘ মঞ্চে সভার প্রারম্ভে ৬-দফা ও ১১-দফার প্রতীক হিসাবে বঙ্গবন্ধু ৬টি ও ১১ টি কবুতর উড়িয়ে দেন। ঢাকায় এ যাবৎকালের বৃহত্তর জনসমাবেশে ১৫১ জন এম,এন,এ ও ২৬৭ জন এম.পি.এ-কে শপথবাক্য পাঠ করাবার পর বঙ্গবন্ধু বিবিধ প্রসঙ্গ উল্লেখ করে ৫০ মিটিটের একটি নীতি নির্ধারণী ভাষণ দেন। নিচে সে ভাষণের অংশ উদ্ধৃত হলো।]

বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ১৯৭১ সালের জানুয়ারি মাস [ Bangbandhu Sheikh Mujibur Rahman's Speech, January Month, 1971 ]

শুরু করার আগে আমি ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৬-র ৭ জুনের আন্দোলন এবং ১৯৬৮-৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের সকল শহীদের প্রতি আমার শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি। আমি আমার সব এমএনএ এবং এমপিএ-সহ প্রতিজ্ঞা করছি, এসব শহীদের রক্ত বৃথা যাবে না। গত ৭ জুনের পর আপনাদের সামনে রেসকোর্সে এই প্রথম উপস্থিত হয়েছি। নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে এবং বাংলাদেশের জনগণ এই নির্বাচন জয়ের মাধ্যমে তাদের সংগ্রামের প্রথম পর্যায় অতিক্রম করেছে।

আমরা জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি। শুধু বাংলারই নয়, আমরা সারা পাকিস্তানেরই ‘মেজরিটি’। আমরা যে শাসনতন্ত্র রচনা করবো, সেটাই জনগণ গ্রহণ করবে এবং তা বানচালের অধিকার কারো নেই। মরহুম নেতা শহীদ সোহরাওয়ার্দী বলেছেন, শাসনতন্ত্রের প্রশ্নে জনগণের রায়ই শেষ কথা। আর সে রায় আমরা পেয়েছি। যদি কেউ এ রায়ের বিরোধিতা করে তবে রক্তক্ষয় হবে এবং যে অভ্যুত্থান ঘটবে তা কউে রোধ করতে পারবে না।

পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র ৬-দফার ভিত্তিতে প্রণীত হবে এবং তাতে ১১-দফার প্রতিফলন থাকবে, কেউ তা রোধ করতে পারবে না। ৬-দফা ও ১১-দফা এখন আর আওয়ামী লীগের সম্পত্তি নয়, বাংলার জনগণ গত নির্বাচনে ৬-দফার পক্ষে রায় দিয়েছেন। ৬-দফা পরিবর্তন আর পরিবর্ধনের কোন ক্ষমতা বা অধিকার এখন আর আওয়ামী লীগ বা আমার নেই।

কিন্তু সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ বলে আমরা পশ্চিম পাকিস্তানের সহযোগিতা নেব না এ ধরনের কথা আমরা বলি না। আমরা অবশ্যই তাদের সহযোগিতা কামনা করি। কিন্তু একটি কথা আমি পরিস্কার ভাষায় বরে দিতে চাই নীতির প্রশ্নে কোন আপোস নাই।

আমরা দেশের একটি শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করবো, কারণ আমরা এই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের প্রতিনিধি। এই প্রক্রিয়ায় যারা বাধা সুষ্টি করবে তাদেরকে নির্মূল করা হবে।

অতীতে আমাদেরকে হিন্দুদের এজেন্ট হিসাবে আখ্যা দেয়া হয়েছিল এবং দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকের মর্যাদা দেয়া হয়। কারণ আমরা বাঙ্গালি। এ দেশের প্রতি আমাদের আনুগত্যের ব্যাপারে প্রশ্ন তোলা হয়। আমরা অনেক অন্যায় সহ্য করেছি। অন্যায়ের শিকার কিভাবে হয় তা আমরা জানি। তাই আমরা পশ্চিম পাকিস্তানীদের প্রতি ন্যায় বিচার করব। যদিও আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, আমরা করাচীকে পাকিস্তানের রাজধানী করতে দিয়েছি। পূর্ব বাংলা থেকে পশ্চিম পাকিস্তানীদের জন্যে প্রথম জাতীয় পরিষদের ৬টি আসন ছেড়ে দিয়েছি। কিন্তু প্রতিদানে আমরা কি পেলাম? অবিচার।

কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরিতে তোমরা ৮৫ জন, আমরা ১৫ জন। সামরিক বিভাগে তোমরা ৯০ জন, আমাদের দিয়েছ্  ১০ জন। বৈদেশিক সাহায্যের তোমরা খরচ করছ ৮০ ভাগ, আমাদের দিয়েছো ২০ ভাগ। মহাপ্রলয়ে দক্ষিণ বাংলার ১০ লাখ লোক মারা গেল। লাখ লাখ লোক অসহায় অবস্থায় রইলো। রিলিফ কাজের জন্যে বিদেশ থেকে হেলিকপ্টার এসে কাজ করে গেল-অথচ ঢাকায় একখানা মাত্র সামরিক বাহিনীর হেলিকপ্টার ছাড়া পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আর কোন হেলিকপ্টার আসলো না। আমরা এসব বে-ইনসাফির অবসান করব।

বাংলার গরীব আর পাঞ্জাব, সিন্ধু, বেলুচিস্তান ও সীমান্ত প্রদেশের গরীবের মধ্যে কোন পার্থক্য নাই। আমাদের সংগ্রাম পশ্চিম পাকিস্তানের দুঃখী মানুষের বিরুদ্ধে নয়, বরং যেসব শোষকদের কারণে বাংলার মানুষ গৃহহারা হয়েছে, বাস্তুহারা হয়েছে, সর্বস্বান্ত হয়েছে তাদের কিরুদ্ধেই আমাদের সংগ্রাম। এসব শোষকের সাথে কোন আপোস নাই।

আওয়ামী লীগ সরকার যদি গঠন হয় তবে দেশে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি গ্রহণ করা হবে। ধনীকে আরও ধনী এবং গরীবকে আরও গরীব হতে দেয়া হবে না।

আমি পুনঃর্ব্যক্ত করছি, যে যাই বলুক না কেন, ব্যাংক, বীমা ও পাট ব্যবসা জাতীয়করণ করা হবে। শিল্প-প্রতিষ্ঠান এবং কল-কারখানার শেয়ার শ্রমিকদের মদ্যে বিতরণ করা হবে। ২৩ বছর দেশের গরীব জনগণকে কায়েমি স্বার্থান্বেষী মহল শোষণ করেছে। আওয়ামী লীগ এই শোষনের শেষ দেখতে চায়। শুধুমাত্র কয়েক মাস সময় আছে, লুটপাট যা করার করে নেন। এরপর আর সময় পাবেন না।

আমার দল ক্ষমতায় যাওয়ার সাথে সাথেই ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফ করে দেবে। আর ১০ বছর পর বাংলাদেশের কাউকেই জমির খাজনা দিতে হবে না। পশ্চিম পাকিস্তানের বেলায়ও এই একই ব্যবস্থা অবলম্বন করা হবে। আইয়ুবী আমলে বাস্তুহারা হয়েছে বাংলার মানুষ।

সরকারের খাস জমিগুলো বন্টন করা হয়েছে ভূড়িওয়ালাদের কাছে। তদন্ত করে এদের কাছ থেকে খাস জমি কেড়ে নিয়ে তা বন্টন করা হবে এবং চর এলাকায়ও বাস্তুহারাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে। আমি কৃষক এবং শ্রমিকদের কথা দিচ্ছি, আওয়ামী লীগ তাদের আদর্শের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবে না, কারণ আমি বিশ্বাস করি আওয়ামী লীগের মাথা কেনার মতো ক্ষমতা পূঁজিপতিদের নেই। এরা কেউ এমনকি আমি নিজেও যদি বিশ্বাসঘাতকতা করি তবে আমাদের জীবন্ত কবর দেবেন।

এবছর প্রদেশে ১৭ লাখ টন খাদ্যশস্যের ঘাটতি ছিল। আমরা আর খাদ্য আমদানির উপর নির্ভরশীল হতে পারি না। সেচ ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে শীতকালীন শস্য চাষের ব্যবস্থা করতে হবে।

গত ২০ বছর ধরে শুনে এসেছি টাকা নেই, টাকা নেই। এবার আমি দেখিয়ে দেব বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্যে টাকা পাওয়া যায় কিনা।

পূর্ব পাকিস্তানের উপকূল এলাকার মানুষদের ঘূর্ণিঝড় ও সামুদ্রিক বানের কবল থেকে রক্ষা করার জন্যে ‘৬২ সাল থেকে শুধু পরিকল্পনার কথাই শুনে আসছি। সাম্প্রতিক মহাপ্লাবনে যেসব এলাকার বাঁধ ছিল সেখানে লোকক্ষয় কম হয়েছে আর বাঁধহীন এলাকাগুলোর জনমানবের চিহ্ন হাজার জনসাধারণের মধ্যে মাত্র ৬ হাজার লোক এ বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেয়েছে। ‘৬২ সাল থেকে সাইক্লোনের হাত থেকে এদের বাঁচানোর জন্যে যে টাকা এসেছে তার হিসাব দিতে হবে এবং অবিলম্বে উপদ্রুত এলাকায় দ্রুত পুনর্বাসনের ব্যাপক কর্মসূচী নিতে হবে।

জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসাবে আমরাই চতুর্থ পাঁচশালা পরিকল্পনা তৈরি করব। বর্তমান সরকারের কোন অধিকার নেই এটা তৈরি করার। আপনাদের চতুর্থ পাঁচসালা পরিকল্পনায় পূর্ব পাকিস্তানের প্রাপ্য ১১০০ কোটি টাকা ব্যয় হতে হবে। বাংলাদেশের স্বল্প আয়ের কর্মচারী, ছাত্র এবং শিক্ষকদের প্রয়োজন অনুসারে চতুর্থ পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে।

আমরা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বিশ্বাসী। আওয়ামী লীগ সরকার প্রতিবেশী ভারত, চীন, রাশিয়া, ইরান, আফগানিস্তান, তুরস্ক, সিংহল ও বার্মাসহ সকল দেশের সাথে বিরোধ দেখা দিলে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখবে, কারে সাথে শত্রুতা নয়। কোন বিরোধ দেখা দিলে শান্তিপূর্ণভাবে তার সমাধান করা হবে। আমরা কাশ্মীর এবং ফারাক্কা সমস্যা শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করতে চাই। অধিকৃত আরব এলাকা পুনরুদ্ধারের জন্যে পাকিস্তানী জনগণ সবসময়ই আরবদের সাহায্য করে যাবে।

আমি বৃহৎ শক্তিবর্গের প্রতি অস্ত্র প্রতিযোগিতা হ্রাস করে সে অর্থ দিয়ে দরিদ্র দেশের সাহায্যে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছি। বর্তমানে অস্ত্র প্রতিযোগিতায় ব্যয় করা বিপুল অর্থের এক-দশমাংশও যদি জনগণের জন্যে খরচ করা হয় তবে পৃথিবী থেকে দারিদ্র্য মুছে যাবে এবং তাতে বৃহৎ শক্তিবর্গের মর্যাদাই বৃদ্ধি পাবে। অস্ত্রের মাধ্যমে বিজয়ের দিন অতীত হয়ে গেছে। বর্তমানে শুধু ভালবাসার মাধ্যমইে অপরকে জয় করা যেতে পারে।

আমি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে ধন্যবাদ দেব এ জন্যে যে নির্বাচন অনুষ্ঠান করে তিনি ওয়াদা রক্ষা করেছেন। তবে তাঁর কর্মচারীদের একাংশ আজও নির্বাচনের ফলাফল বানচালের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। এরা সম্প্রতি ঢাকায় একটি গোপন সভায় মিলিত হয়েছে। নির্বাচন ফলাফল বানচালের ষড়যন্ত্র থেকে এসব কর্মচারীকে বিরত রাখার জন্যে প্রসিডেন্ট ইয়াহিয়ার প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।

আইয়ুব আমলের একযুগে পদস্থ সরকারী কর্মচারীদের মাথা খারাপ হয়ে গেছে। আমি এদের হুশিয়ার করে দিতে চাই, জনগণের কর্তা হবার আশা ত্যাগ করুন, জনতার সারিতে নেমে জনগণের খাদেম হনো। না হয় ইয়াহিয়া সাহেব তো ৩০৩ করেছেন, আমরা শুধু জনতাকে বলে দেব ‘ভাল লোক নয়, বের করো বাড়ি থেকে’। আমি সবার হাতে লাঠি দেখতে চাই। সবাই লাঠি তৈরী রাখুন। আমি হুকুম করলেই লাঠি ব্যবহার করে তাদের শায়েস্তা করবেন। প্রয়োজন হলে এদের কামান-বন্দুককেও লাঠি হাতে বাংলার মানুষ রুখবে।

ষড়যন্ত্র এখনো শেষ হয়নি। নির্বাচন শেষ না হতেই খুন করা হয়েছে আমার এক সহকর্মীকে। যে যুবক বাংলার জন্যে ত্যাগ স্বীকার করেছিল, জেল খেটেছিল সেই আহমদ রফিককে আমি মনোনয়ন দিয়েছিলাম প্রাদেশিক পরিষদে। তাকে চোরের মতো তার বাড়ীর সামনে ১৩টি খায়ে হত্যা করা হয়েছে। তাদের মনে রাখা উচিত, চুরি করে বিপ্লব করা যায় না।

খুলনায় আমার ছোট ভাই সংগ্রামী কর্মী মমতাজকে ডেকে নিয়ে খুন করা হয়েছে। যে কোন ষড়যন্ত্র বাঙ্গালিরা প্রতিহত করবে। প্রয়োজন হলে বাঁশের আর সুন্দরীর লাঠি নিয়ে এসব সন্ত্রাসীবাদী তৎপরতাকে নস্যাৎ করে দেবে। অবশ্য আমার নির্দেশের আগে কিছু করতে যাবেন না। আপনারা এমন কিছু করবেন না যাতে শান্তি বিঘ্নিত হয়। বর্তমানে শান্তি রক্ষা করাই গুরুত্বপূর্ণ, আর তাই আমরা আমাদের কর্মী হত্যাও সহ্য করে আছি।

নির্বাচনের পরদিন থেকেই নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম হু হু করে বাড়তে শুরু করেছে। এটাও এক ধরনের ষড়যন্ত্র। কারা এসব করেছে? তারা কি সেইসব ভূড়িমোটা পুঁজিপতি নয়, যারা এখনই দাম বাড়িয়ে পরিস্থিতি গোলাটে করে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে জনতাকে ক্ষেপিয়ে দেয়ার শেষ চেষ্টা করছে?

তারা এখনো লোভের মধ্যে রয়েছে, আমি তাদের হুঁশিয়ার করে দিতে চাই, অনেক খেয়েছেন, এবার মুখ বন্ধ করুন, নচেৎ জিহ্বা কাটা যাবার সম্ভাবনা আছে। এসব পূঁজিপতিরাই যে নির্বাচনের সময় ইসলামরক্ষার নামে, সংহতির নামে আওয়ামী লীগকে কোন না কোন উপায়ে পরাস্ত করার জন্যে পূর্ব বাংলায় টাকা ঢেলেছেন তা আমাদের জানা আছে।

এক শ্রেণীর লোক নির্বাচনের সময় ‘ইসলাম গেল, ইসলাম গেল’ বলে চিৎকার করেছেন। নির্বাচনের জয়ের ফন্দি খুঁজছেন পিডিপি করে, ইসলাম ফ্রন্ট করে, আরো কতকিছু করে। অথচ নির্বাচনের পর কি কেউ নামাজ পড়তে নিষেধ করেছে, রোজা রাখতে নিষেধ করেছে? যদি না করে থাকে তাহলে এসব অপপ্রচারের জন্যে কি তাদের ‘ধোড়ড়া’ মারা উচিত নয়?

এ দেশে ইসলাম, মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান-সবই থাকবে এবং বাংলাদেশও থাকবে। হিন্দু ও বৌদ্ধদের ওপর গত এক দশকে যে অত্যাচার হয়েছে তারও অবসান হবে। মহিলাদের মান, অধিকার প্রদান করা হবে এবং তারা আর দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক থাকবে না। ২৩ বছর পর এ দেশে কোন মোহাজের নেই। সবাই এখন বাঙ্গালি। মোহাজেরদের আমি বাংলার মাটির সাথে মিলে যাবার আহ্বান জানাই। এখনো যেসব মোহাজের পুনঃর্বাসিত হননি, তাদের সবাইর পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে।

যে সব রাজবন্দী বিনা বিচারে এবং যে সব রাজনৈতিক ও ছাত্রনেতা ও কর্মী বিভিন্ন মেয়াদে কারাগারে রয়েছেন, অবিলম্বে তাদের ছেড়ে দিন এবং রাজনৈতিক ও ছাত্রকর্মী ও নেতাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলা ও গ্রেফতারী পরোয়ানা রয়েছে সে সব কিছুই প্রত্যাহার করুন। নতুবা আমরা কয়েক মাস পরেই ক্ষমতায় যাচ্ছি, তখন সব কিছু করব।

প্রধানমন্ত্রী হবার কোন ইচ্ছা আমার নেই। প্রধানমন্ত্রী আসে এবং যায়। কিন্তু যে ভালবাসা ও সম্মান দেশবাসী আমাকে দিয়েছেন, তা আমি সারাজীবন মনে রাখবো। অত্যাচার নিপীড়ন এবং কারাগারে নির্জন প্রকোষ্ঠকেও আমি ভয় করি না। কিন্তু জনগণের ভালবাসা যেন আমাকে দুর্বল করে ফেলেছে।

[সূত্র ঃ পূর্বদেশ, সংগ্রাম ও দৈনিক পাকিস্তান, ৪ জানুয়ারি, ১৯৭১]

 

১৯৭১ সালের ৪ জানুয়ারী ঢাকায় রমনা গ্রীনে ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ

[আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ ১৯৭১ সনে সংগঠনের ২৩ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করেন। এ উপলক্ষে ৪ জানুয়ারি, ১৯৭১ তারিখে ঢাকার রমনা গ্রীণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেন। অনুষ্ঠানে প্রদত্ত ভাষণে বঙ্গবন্ধু বাংলা ও বাঙ্গালির প্রকৃত ইতিহাস রচনার জন্যে লেখকদের প্রতি আহ্বান জানান যাতে করে পাকিস্তানী শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতার প্রণীত বাঙ্গালির বিকৃত ইতিহাস বর্জন করা যায়। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য, ‘পাকিস্তান, দেশ ও কৃষ্টি’ নামক এ ধরনের একটি বই ছাত্রদের আন্দোলনের মুখে ১৯৭০ স্কুলের পাঠ্যসূচি থেকে প্রত্যাহার করা হয়। তাঁর ভাষণের অংশবিশেষ উদ্ধৃত হলো।]

বাংলার মানুষ বিশেষ করে ছাত্র এবং তরুণ সম্প্রদায়কে আমাদের ইতিহাস এবং অতীত জানতে হবে। বাংলার যে ছেলে তার অতীত বংশধরদের ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারে না সে ছেলে সত্যিকারের বাঙ্গারি হতে পারে না। আজো বাংলাদেশের গৌরবময় ইতিহাস রচিত হয়নি। নতুন করে বাঙ্গালির ইতিহাস রচনা করার জন্যে দেশের শিক্ষাবিদের প্রতি আমি আহ্বান জানাচ্ছি। এই ইতিহাস পাঠ করে যেন বাংলার ভবিষ্যৎ বংশধররা তাদের গৌরবময় অতীতের পরিচয় পেয়ে গর্ব অনুভব করতে পারে এবং মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে।

অতীতে বাংলাদেশের গৌরবময় ইতিহাসকে বিকৃত করার সুপরিকল্পিত চেষ্টা করা হয়েছে। বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যকে ধ্বংস করার চেষ্টা করা হয়েছে। আমার মুখের ভাষাকে কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, আরবি হরফে বাংলা লেখার চেষ্টা করা হয়েছে, হরফ-সংস্কার, ভাষা সংস্কার, বানান-সংস্কারের চেষ্টা করা হয়েছে। আমরা আন্দোলন করে তা রুখেছি।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুলকে বাদ দিয়ে বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের কথা ভাবা যায় না। কিন্তু এর উপর বারবার হামলা এসেছে। ভেবে অবাক হতে হয় কাজী নজরুলের কবিতার শব্দ পরিবর্তন করা হয়েছে। গানের শব্দ বদল করে রেডিওতে গাওয়া হয়েছে। তারা মুসলমানী করিয়েছেন। এ অধিকার তাদের কে দিল?

নির্বাচনের ফলাফলই বলে দিচ্ছে বাঙ্গালি, বাঙ্গালি হিসেবেই বেঁচে থাকবে, কেউ তা রুখতে পারবে না। এবারকার নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণ তাদের রায়ের মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছে যে, বাংলাদেশের সম্পদ এবং বাঙ্গালির ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের অধিকার আর কোন মতেই দাবিয়ে রাখা যাবে না। বিগত ২৩ বছর ধরে একটানা শোষণ ও অবিচারের ফলে বাঙ্গালিরা আজ দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত হয়েছে। আওয়ামী লীগ এই অন্যায় ও অবিচার মেনে নিতে পারে না। জনগণের স্বাধীনতার ফলভোগকে নিশ্চিত করার জন্যে আওয়ামী লীগ শেষ পর্যন্ত লড়ে যাবে।

ষড়যন্ত্রকারীরা শেষ হয়নি, তারা এখনো আছে। তাদের চক্রান্তে সহজে ক্ষমতা হস্তান্তরিত নাও হতে পারে। কায়েমি স্বার্থবাদী মহলের সকলের উস্কানির মুখেও তোমাদের একতাবদ্ধ থাকতে হবে। তোমাদের সংগ্রামের ঐতিহ্য বজায় রেখে তোমরা ঝিমিয়ে পড়ো না, ঘুমিয়ে যেয়ো না। আস্তে আস্তে চল, নীতি নিয়ে চল, কারণ ষড়যন্ত্রকারীরা এখনো সচল, রাজনৈতিক দলের মধ্যে নেতা, নীতি, সংগঠন ও আত্মত্যাগ-এই চারটি বিষয়ে একনিষ্ঠ থেকে এগিয়ে যেতে হবে।

দেশে যদি বিপ্লবের প্রয়োজন দেখা দেয়-তবে সে বিপ্লবের ডাক আমিই দেব। যদি ৬-দফা আদায়ের সংগ্রামকে ষড়যন্ত্র করে ব্যর্থ করে দেয়া হয়, তবে কয় দফা দিতে হবে তাও আমার জানা আছে। অতিবিল্পবী কয়েকটা স্লোগান বা রাতের অন্ধকারে আকস্মিকভাবে নিরীহ, নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করার মধ্য দিয়ে বিপ্লব হয় না। বিপ্লবের উদ্ভব হয় মাটি থেকে এবং এর একটা বিশেষ ব্যবস্থা ও ধাপ রয়েছে।

আজো বাংলাদেশের ইতিহাস রচিত হয়নি। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে বাঙ্গালরি গৌরবময় ভূমিকাকে চাপা দেয়ার অপচেষ্টা করা হয়েছে। স্বাধীনতা সংগ্রামের স্মৃতিকে পর্যন্ত উপেক্ষা প্রদর্শন করা হয়েছে। স্বাধীনতার জন্যে বাংলার হাজার হাজার ছেলে আন্দামান দ্বীপান্তর হয়েছে, বাংলার বহু সন্তান ফাঁসির মঞ্চে ঝুলেছে, চট্টগ্রামের পাহাড়ে অস্ত্রাগারে লুণ্ঠন করে ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়েছে। সিপাহী বিদ্রোহ ব্যারাকপুর থেকে শুরু হয়েছিল। সেদিন বাঙ্গালীদের কেউই বেঈমানী করেনি। বড় নেতাদের দেশের লোকেরাই বেঈমানী করেছিল। তিতুমীর বাঁশের কেল্লা বানিয়ে সংগ্রাম করে শহীদ হয়েছেন। কিন্তু পাকিস্তানের ইতিহাসে তাঁর উল্লেখ নেই। তাঁদের বীরত্ব ও ত্যাগ তিতীক্ষার গাথা ভিত্তিক ইতিহাস রচনার জন্যে শিক্ষাবিদদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। এইবার আর তারা ব্যান করতে যদি ব্যান করার চেষ্টা করে তবে আমরাই তাদের ব্যান করে দেব।

তোমরা আত্মকলহে লিপ্ত হয়ো না। আজ ছাত্রলীগ কর্মীদের মধ্যে একতার প্রয়োজন সবচাইতে বেশি। এই একতা অক্ষুন্ন না থাকলে ৬-দফার সংগ্রাম দূর্বল হয়ে পড়বে। ছাত্রলীগের মতো বৃহত্তর প্রতিষ্ঠান ভেঙ্গে যেতে পারে, এমন কিছু করো না।

[সূত্র ঃ আজাদ, দৈনিক পাকিস্তান, পূর্বদেশ, ইত্তেফাক, ৫ জানুয়ারি,১৯৭১]

 

১৯৭১ সালের ১১ জানুয়ারি পটুয়াখালী জেলার সদর দপ্তরে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ

[৭ জানুয়ারি, ১৯৭১ রাতে গোলাম মোস্তফা নামক এক যুবককে সন্দেহজনকভাবে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে ঘোরাঘুরি করতে দেখে আটক করা হয়। তার কাছে ছোরা পাওয়া যায় এবং পুলিশের কাছে সে স্বীকার করে যে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার জন্যে তাকে নিয়োগ করা হয়েছিল। এ ঘটনায় বিরাট চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয় এবং প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া এ ঘটনার সংবাদ শুনে স্বস্তি প্রকাশ করে বঙ্গবন্ধু কাছে বার্তা পাঠান। বরিশাল, পটুয়াখালী ও নোয়াখালীর ঘূর্ণিঝড় বিধ্বস্ত অঞ্চলে ৬ দিনের সফরে বঙ্গবন্ধ ঘটনার দিন রাতে লঞ্চযোগে মঠবাড়িয়া রওয়ানা হয়ে যান।

দূগর্ত এলাকার ৯টি জাতীয় ও ২১টি প্রাদেশিক পরিষদের স্থগিত নির্বাচন ১৭ জানুয়ারী অনুষ্ঠিত হয়। বঙ্গবন্ধুর এ সফর ছিল এ এলাকায় তাঁর শেষ নির্বাচনী সফর। বঙ্গবন্ধুর সাথে আলোচনার জন্যে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ১১ জানুয়ারী ঢাকা আসেন। বঙ্গবন্ধুও তাঁর সফর সংক্ষিপ্ত করে একই দিন ঢাকা ফিরে আসেন। এ সফরে বঙ্গবন্ধু প্রতিদিন অগণিত সভায় বক্তৃতা করেন। ১১ জানুয়ারী তিনি নবগঠিত পটুয়াখালী জেলার সদর দফতরের জনসভায় যে ভাষণ দেন তার অংশবিশেষ এখানে উদ্ধৃত হলো।]

এটা প্রমাণিত হয়েছে যে আমি এবং আমার দলই বাংলাদেশের একমাত্র মুখপাত্র। গত নির্বাচনে জনগণ ৬-দফা ও ১১-দফার পক্ষে যে রায়  দিয়েছে। আগামী নির্বাচনেও জনগণ আমার দলের পক্ষে ভোট দেবেন। আমি আবারও বলছি দেশের শাসনতন্ত্র অবশ্যই ৬-দফার ভিত্তিতে প্রণীত হবে। তাতে কোনরূপ বাধা দান করা হলে তার পরিণাম ভয়াবহ হবে।

নির্বাচনে হেরে গিয়ে ষড়যন্ত্রকারীরা বাংলাদেশের দাবি স্তব্ধ করার জন্যে ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করেছে। পাবনা থেকে আওয়ামী লীগের নবনির্বাচিত এমপিএ আহমদ রফিক এবং খুলনার আরেক পার্টি-কর্মী মমতাজকে নির্বাচনের পর পরই খুন করা হয়েছে। সেদিন আমার ঢাকার বাড়িতে এক ঘাতককে গ্রেফতার করা হয়েছে এ কথাও নিশ্চয়ই আপনারা জানেন।

রাতের অন্ধকারে চোর-ডাকাতের মতো জনগণকে হত্যা করে তথাকথিত বিপ্লবী ও প্রতিক্রিয়াশীলরা কোনমতেই দেশের মঙ্গল করছে না। এরা জনগণকে বিশ্বাস করে না এবং জনগণের মতামতেরও তোয়াক্কা করে না। আমি এসব তথাকথি বিপ্লবী ও প্রতিক্রিয়াশীলদের চিনি। শিগগিরই এরা এদের কৃতকর্মের ফল ভোগ করবে।]

কায়েমি স্বার্থবাদী ও শাসকগোষ্ঠী আজো একের পর এক বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে চলেছে। এই মহলই ৮৩ বছর বয়সে দেশদ্রোহিতার অপরাধে শের-এ-বাংলা এ.কে.ফজলুল হককে অন্তরীণ ও মরহুম হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে কারাগারে নিক্ষেপ করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করেনি। অথচ এসব নেতা না হলে পাকিস্তান সৃষ্টি হতো না।

গত ২৩ বছর যাবৎ একটানা শোষণে গ্রামবাংলা আজ বিরান হয়ে গেছে। বৈদেশিক সাহায্য ও ঋণের শতকরা ৮০ ভাগ পশ্চিম পাকিস্তানের ব্যয় করা হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষকে ঘুর্ণিঝড়, বন্যা এবং সামুদ্রিক বানের ছোবল থেকে রক্ষার জন্যে গত ২৩ বছরে কিছুই করা হয়নি। প্রাকৃতিক দুর্যোগে অন্যান্য দেশ খাদ্য ও রিলিফ সামগ্রী নিয়ে এগিয়ে এসেছে কিন্তু আমাদের পশ্চিম পাকিস্তানী ভাইরা নীরব আছেন। রিলিফ দ্রব্য বিতরণে বিশৃঙ্খলা ও অবহেলার খবর পাওয়া যাচ্ছে।

সরকারী কর্মচারীরা ভূলে যাবেন না এটা আইয়ুব আমল নয়। দুই-তিন মাসের মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকার গঠিত হলেই রিলিফ কাজের পুঙ্খানুপুঙ্খন হিসাব চাওয়া হবে এবং এ ব্যাপারে কোন কর্মচারীর বিরুদ্ধে দূর্নীতি, দায়িত্বহীনতা কিংবা অবহেলার অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাকে কঠোর শাস্তি ভোগ করতে হবে। দুর্গত এলাকায় পর্যাপ্ত দ্রব্য অবিলম্বে প্রেরণ করতে হবে। মঠবাড়িয়া ও অন্যান্য দুর্গত এলাকার খাজনা অবশ্যই মওকুফ করতে হবে।

আইয়ুব খান রাতের অন্ধকারে পেছনের দরজা দিয়ে দেশের ক্ষমতা দখল করেন এবং জনগণকে কঠোর হাতে দমন করতে চেষ্টা করেন। তিনি জনগণকে মূর্খ ভেবেছিলেন। তাই জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নেন, কিন্তু এ দেশের মানুষ রক্তের বিনিময়ে সেই ভোটাধিকার অর্জন করেছে।

দুর্গত এলাকার আসন্ন নির্বাচনে সকল আওয়ামী প্রার্থীকে আমার এবং আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি হিসেবে ভোট দেয়ার জন্যে আপনাদের প্রতি আবেদন জানাচ্ছি। আওয়ামী প্রার্থীদের নির্বাচিত করলে বাংলাদেশের অধিকার আদায়ের প্রশ্নে আওয়ামী লীগের শক্তি বৃদ্ধি পাবে।

শোষণের আর নির্যাতনে সোনার বাংলাকে সর্বস্বান্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ আজ ভুভুক্ষ। কারো বিরুদ্ধে আমার শত্রুতা নেই। কিন্তু যারা বাংলাদেশকে লুট করেছে তাদের সঙ্গে কোন আপোস নাই। দেশকে এবং দেশের মাটিকে ভালবাসি বলেই আমি রাজনীতিতে আছি। আমি অন্যের পয়সা চাই না। কিন্তু বাংলাদেশের পাওনা কড়ায়-গন্ডায় ফিরিয়ে দিতে হবে। দুঃখী বাংলার মানুষের মুখের হাসি ফুটিয়ে তুলতে প্রয়োজনবোধে জীবন দান করতে আমি প্রস্তুত আছি।

[সূত্র ঃ দৈনিক পাকিস্তান, আজাদ, সংগ্রাম, পূর্বদেশ, ইত্তেফাক, ১২ জানুয়ারি, ১৯৭১]

 

১৯৭১ সালের ২৪ জানুয়ারি ঢাকার ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ

পূর্ব পাকিস্তান সঙ্গীত শিল্পী সমাজ বঙ্গবন্ধুর সম্মানে ২৪ জানুয়ারি, ১৯৭১ ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনষ্টিটিউটে এক সংবর্ধনার আয়োজন করে। শিল্পীদের পক্ষ থেকে প্রদত্ত মানপত্রে শিল্পী আবদুল আহাদ বঙ্গবন্ধুকে ‘বঙ্গ সংস্কৃতির অগ্রদূত’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। অনুষ্ঠানে সভানেত্রীত্ব করেন বেগম লায়লা আর্জুমান্দ বানু। শিল্পীদের পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধুকে সরোদ, সেতার, একতারা এবং জয় বাংলার রেকর্ড উপহার দেয়া হয়। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের পরপরই আইয়ুব সরকার রেডিও টেলিভিশনে রবীন্দ্র সঙ্গীত বন্ধ করার নির্দেশ দেয়। কতিপয় বুদ্ধিজীবি এক বিবৃতির মাধ্যমে সরকারের এই পদক্ষেপ সমথৃন করে। বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণে ভাড়াটিয়া বুদ্ধিজীবী ও তাঁবেদার শিল্পী প্রসঙ্গ উল্লেখ পূর্বক তাদের এ ধরনের কার্যকলাপের কঠোর সমালোচনা করেন। বাংলা সংস্কৃতি প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ভাষণের অংশবিশেষ উদ্ধৃত হলো।]

আজ ২৪ জানুয়ারি, এক অনন্যসাধারণ দিন। এই দিনে আমার মনে পড়ে ৬৯-এর গণঅভ্যূত্থানের বীর শহীদদের কথা। আইয়ুব বিরোধী সেই গণআন্দোলনে আসাদ, মতিউর, আনোয়ারা, ডঃ জোহা, জহুরুল হকরা জীবন দিয়েছে। আর তাদের রক্তের বিনিময়েই স্বৈরাচারীর পতন ঘটেছে। তাদের জীবন এবং অগণিত দেশপ্রেমিকের সংগ্রাম ও ত্যাগ তিতীক্ষার বিনিময়েই আজ দিগন্তে স্বাধিকারের সূর্যালোক ঝলমল করে উঠেছে। সেই বীর শহীদরা চিরস্মরণীয়। আমি তাদের শান্তি কামনা করি।

দেশের গণমুখী সংস্কৃতিকে বিকশিত করার উদ্দেশ্যে সাহিত্য-সঙ্গীতে কবি-সাহিত্যিক-শিল্পীদের জনগণের আশা-আকাঙ্খা, সুখ-দুঃখকে প্রতিফলিত করতে হবে। সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা ছাড়া রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্থহীন। তাই মাটি ও মানুষকে কেন্দ্র করে গণমানুষের সুপ্ত শক্তি ও স্বপ্ন এবং আশা-আকাঙ্খাকে অবলম্বন করে গড়ে উঠবে বাংলার নিজস্বঃ সাহিত্য-সংস্কৃতি।

আপনারা ভালবাসা এবং শান্তির অনেক গান গেয়েছেন। আজ বস্তির নিঃস্ব সর্বহারা মানুষের জন্যে গান রচনার দিন এসেছে। রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুলের মতো বিপ্লবী গান গাইতে হবে। মানুষের মনে প্রেরণা যোগাতে হবে। যদি এতে বাধা আসে, সেই বাধা মুক্তির জন্যে ৭ কোটি বাঙ্গালী এগিয়ে আসবে।

একটি জাতিকে পঙ্গু ও পদানত করে রাখার সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা তার ভাষা ও সংস্কৃতিকে বিনষ্ট করা। বাংলার মানুষ মুসলমান নয়, তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি নেই-এই ধরনের অভিযোগ দিয়ে বাঙ্গালির বিরুদ্ধে ২৩ বছর ধরে তাদের সাহিত্য-সংস্কৃতি বিনষ্ট করার ষড়যন্ত্র চলছে। আর বাংলার মানুষও এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে বিরামহীন সংগ্রাম চালিয়ে আসছে। ৫২ সালের ভাষা আন্দোলন শুধু বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আদায়ের আন্দোলন ছিল না, এ আন্দোলন ছিল বাংলার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির আন্দোলন।

জনগণ যখন অধিকার আদায়ের জন্যে সংগ্রাম করছিল, তখন এক শ্রেণীর শিল্পী-সাহিত্যিক-কবি গত ২৩ বছর মৌলিক গণতন্ত্রের প্রশস্তি গেয়ে নিজেদের ভবিষ্যৎ গুছানোর কাজে ব্যস্ত ছিলেন। তাঁরা কি আজ বুকে হাত দিয়ে বলতে পারেন যে, তাঁরা তাঁদের দায়িত্ব পালন করেছেন? কোন ৪০ জন ব্যক্তি রবীন্দ্র সঙ্গীতের বিবৃতি প্রদান করেছিলেন? কোনবিশেষ মহল তথাকথিত ইসলামের নামে নজরুলের গান ও কবিতার শব্দ বদলেছে? রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলকে বাদ দিয়ে বাংলা সাহিত্যের অস্তিত্বটা থাকে কোথায়? যে মৌলিক গণতন্ত্র ও ডিক্টেটরি শাসনের পতন ঘটাবার জন্যে বাংলার বীর ছাত্র-জনতা শ্রমিক বুকের রক্ত দিয়েছে, তাদেরই গুণকীর্তন করে, প্রবন্ধ লিখে, বেতার কথিকা প্রচার করে এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবি ও শিক্ষাবিদ পয়সা রোজগার করেছেন। বিএনআর-এর অর্থানুকুল্যে বই প্রকাশ করেছেন।

৪৭ সাল থেকে বাঙ্গালিদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু এখন অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। এখন যে কেউ স্বাধীনভাবে বাংলা ভাষায় কথা বলতে এবং নিজস্ব সংস্কৃতি চর্চা করতে পারে। যদিও জনগণ প্রাথমিকভাবে বিজয়ী হয়েছে, তবুও বিপদের আশঙ্কা এখনো দূরীভূত হয়নি। পথ এখনো কন্টকার্কীণ এবং অনিশ্চিত। সকল বিপদ ও অনিশ্চয়তার মোকাবিলা করার জন্যে আমি কবি সাহিত্যিকদের আহ্বান জানাচ্ছি।

স্বাধীনতা আন্দোলনের বীর সন্তান সূর্যসেন। এই অগ্নি-পুরুষই সর্বপ্রথম চট্টগ্রামের বুকে স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করেন। তাঁর স্মৃতির প্রতি যদি আমরা শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শন না করি তাহলে ভবিষ্যৎ বংশধরগণ আমাদেরকে কখনো সম্মান করবে না। ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতির সমৃদ্ধি ছাড়া কোন জাতিই উন্নতি করতে পারে না। আমি যখন বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির কথা বলি তখন সিন্ধু, পাঞ্জাবী, বেলুচী, পশতু তথা দেশের অন্যান্য অঞ্চলের ভাষা ও সাহিত্যের সম্মান সমৃদ্ধি কামনা করি। কারণ আঞ্চলিক পরিবেশ ও জনগণের ধ্যানধারণার ভিত্তিতে সংস্কৃতির বিকাশ ঘটতে পারে। ধর্মের নামে ভাড়াটিয়া সংস্কৃতি চাপিয়ে দেয়া মানুষের আত্মার স্পন্দনকে পিষে মারারই শামিল।

আমি স্বীকার করি আমাদের কবি, শিল্পী ও সাহিত্যিকরা এখনো তাঁদের ন্যায্য মর্যাদা পাচ্ছেন না। আমি আশ্বাস দিচ্ছি যদি আমরা ৬ ও ১১ দফা ভিত্তিক স্বায়ত্তশাসন লাভে সক্ষম হই, তাহলে শিল্পী ও সাহিত্যিকরা সবকিছুই পাবেন।

সবকিছুই হবে তাঁদের। ৬-দফা ও ১১-দফার ভিত্তিতে স্বায়ত্তশাসন অর্থই হচ্ছে রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাহিত্য-সাংস্কৃতিক স্বাধিকার। জয় বাংলা স্লোগানেরও লক্ষ্য এই সামগ্রিক স্বাধিকার অর্জন। জনগণের সরকার কায়েম হলে বাংলার মাটিতে জাতীয় সঙ্গীত প্রতিষ্ঠা ও একটি জাতীয় ‘ললিতকলা একাডেমী’ গঠন করতে হবে।

মনে রাখবেন, বিপদ আমাদের কাটে নাই। লক্ষ্য এখনো অর্জিত হয় নাই। চরম সংগ্রামের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। সেদিনের জন্যে প্রস্তুত হন। আপনাদের সদস্যা শুধু আপনাদেরই নয়-এ সমস্যা সারা জাতির। শিল্পীদের স্বাধীনতার প্রশ্নে জাতিই এগিয়ে আসবে।

[সূত্র ঃ দৈনিক সংগ্রাম, ইত্তেফাক, দৈনিক পাকিস্তান ও আজাদ, ২৫ জানুয়ারি, ১৯৭১]

 

১৯৭১ সালের ২৯ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু সাংবাদিকদের সামনে বিবৃতি প্রদান করেন

[পাকিস্তানে স্বাসনতান্ত্রিক কাঠামো সম্পর্কে আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে আলোচনার জন্যে পাকিস্তান পিপল্স পার্টির চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো ১৫ জন বিশিষ্ট সদস্যসহ ২৭ জানুয়ারি ১৯৭১ করাচী থেকে ঢাকা আসেন। আওয়ামী লীগ প্রধানের বাসভবনে প্রথম দফা, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ভুট্টোর স্যুইটে দ্বিতীয় দফা এবং পুনরায় বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে মুজিব-ভুট্টো তৃতীয় ও শেষ দফা আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়। মুজিব-ভুট্টোর এ বৈঠক ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গবন্ধু তাঁর আলোচনায় ৬ দফার ভিত্তিতে দেশের ভবিষ্যৎ শাসনতন্ত্র রচনার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। তৃতীয় দফা আলোচনা শেষে ২৯ জানুয়ারী বঙ্গবন্ধু তাঁর বাসভবনে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের সাথে আলোচনা করেন। উক্ত আলোচনার অংশবিশেষ উদ্ধৃত হলো।]

জনগণের বিজয়কে নস্যাৎ করে দেয়ার জন্যে সুদীর্ঘকাল ধরে দেশে যে ষড়যন্ত্র ও সংগ্রাম চলছে,যে কোন ত্যাগের বিনিময়ে যে ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তকে প্রতিরোধ করা হবে। আমি ঘোরপ্যাঁচে বিশ্বাস করি না, আমি সোজা পথের পতিক এবং সমস্যাবলীর আমি সরাসরি সমাধান চাই।

গত ২৩ বৎসরে বাংলাদেশকে শাসন ও শোষণ করা হয়েছে। সেই পরিস্থিতি অব্যাহত রাখার উদ্দেশ্যে সনাতন ষড়যন্ত্র আজো চলছে। তবে ভরসা হচ্ছে, দেশবাসী আজ সম্পূর্ণ সচেতন ও জাগ্রত এবং ষড়যন্ত্র জালকে ছিন্নভিন্ন করে কায়েমি স্বার্থবাদকে খতম করার ক্ষমতা দেশবাসী রাখে।

আমি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় পরিষদ অধিবেশন আহ্বানের কথা বলেছি। দেশের জন্যে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দিয়ে একটি শাসনতন্ত্র প্রণয়নে আর বিলম্ব করা যায় না। দেশের দুর্ভিক্ষাবস্থা বিরাজমান, উপকুল অঞ্চলে ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত। এই অবস্থায় আমরা জড়ভরতের মতো বসে থেকে আমাদের মানুষকে মরতে দিতে পারি না। তাই পিপল্স পার্টির নেতাকেও আমি এ কথা বলেছি যে, শাসনতন্ত্র প্রণয়নের জন্যে এবং একটি বেসামরিক সরকার গঠন তরান্বিত করার জন্যে অবিলম্বে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ডাকা দরকার।

আওয়ামী লীগ শুধু বাংলাদেশেই সংখ্যাগরিষ্ঠ দল নয়, সমস্ত পাকিস্তানেই আওয়ামী লীগ নিরস্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ দল। তাই সমগ্র জাতির প্রতি আমার ও আমার দলের একটা দায়িত্ব আছে। আমি জোর দিয়ে বলতে চাই, সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে দেশের শাসনতন্ত্র প্রণয়নের পূর্ণ ক্ষমতা আওয়ামী লীগের আছে। তবুও জনাব ভুট্টো ও তাঁর দলসহ বেলুচ ও সীমান্ত অঞ্চলের আঞ্চলিক দল ও সংশ্লিষ্ট নেতাদের সহযোগিতা আমরা চাই। বেলুচিন্তান ও সীমান্ত প্রদেশের ছোট ছোট নেতাদের সঙ্গেও আমি আলোচনা করতে চাই। ঢাকায় এসে আলোচনা করার জন্যে আমি তাঁদের সাদরে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।

ষড়যন্ত্রকারীরা নির্বাচনের পর থেকে খুব তৎপর হয়েছে এবং অতীতের মতো নানা চক্রান্ত চালাচ্ছে। কিন্তু চক্রান্ত বা ষড়যন্ত্র দিয়ে আর সফল হওয়া যাবে না। চক্রান্তকারীদের জানা উচিত যে, তারা আগুনের সাতে লড়াই করছে। আপনারা আগুন নিয়ে আর খেলবেন না। বাংলাদেশের মানুষকে শোষণ করার চেষ্টা করবেন না-বাংলাদেশের মানুষকে আর শোষণ করা যাবে না।

[সূত্র ঃ ইত্তেফাক ও দৈনিক পাকিস্তান, ৩০ জানুয়ারি,১৯৭১]

 

আরও পড়ুন:

মন্তব্য করুন