বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাস [ Bangbandhu Sheikh Mujibur Rahman’s Speech, February Month, 1971 ]

বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাস [ Bangbandhu Sheikh Mujibur Rahman’s Speech, February Month, 1971 ]

বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাস

১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাস – ৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকার মৌলভী বাজারে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ

[১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাস – লাহোরে ভারতীয় বিান বোমা মেরে ধ্বংস করার জের হিসেবে ভারত ৩ ফেব্রুয়ারি ভারতীয় আকাশ-সীমার ওপর দিয়ে পাকিস্তানী সামরিক বিমানের চলাচল নিষিদ্ধ করে। এ নিষেধাজ্ঞা সামরিক-বেসামরিক সব ধরনের পাকিস্তানী বিমানের জন্যে প্রযোজ্য হয়। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে পাকিস্তানী বিমান চলাচল শুরু হয় কলম্বো হয়ে। মৌলভী বাজারে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১ মৌলভীবাজারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও রমান-লালবাগ থেকে প্রাদেশিক পরিষদে নবনির্বাচিত সদস্য গাজী গোলাম মোস্তফাকে সংবর্ধনা জানানো হয়। সংবর্ধনা সভায় বঙ্গবন্ধু যে ভাষণ দেন, তার অংশবিশেষ উদ্ধৃত হলো।]

বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাস [ Bangbandhu Sheikh Mujibur Rahman's Speech, February Month, 1971 ]আওয়ামী লীগ শুধু বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলই নয়, সারাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল। কাজেই শাসনতন্ত্র আওয়ামী লীগ একাই প্রণয়ন করতে পারে। তবে আমরা এ ব্যাপারে সকলের সহযোগিতা কামনা করবো। যদি কেউ সহযোগিতা করতে অস্বীকার করে তাহলে সেটা তার নিজ দায়িত্বেই করবে।

আমরা একটি শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করতে চাই এবং ৬-দফা পরিকল্পনা ভিত্তিতেই আমরা তা প্রণয়ন করবো। জনসাধারণ আমার দলের প্রতি আস্থা প্রকাশ করেছে এবং একমাত্র জনপ্রতিনিধিরাই দেশের শাসনতন্ত্র প্রণয়নের অধিকারী। ষড়যন্ত্র এখনো অব্যাহত রয়েছে। পাকিস্তানের রাজনীতি হচ্ছে-চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি। সে ষড়যন্ত্রের এখনো অবসান হয়নি। কিন্তু বাঙ্গালী রক্ত দিতে শিখেছে। তাই এখন আর কেউ তাদেরকে থামাতে পারবে না। এবার বাঙ্গালী বিশ্বে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করবে। ৬-দফা ও ১১-দফা ভিত্তিক শাসনতন্ত্র প্রণয়ন ও গণপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের পতে যতই ষড়যন্ত্র করা হোক না কেন, জনতা এবার অধিকার আদায়ে কামিয়াব হবেই।

বর্ষা মৌসুম শুরু হতে আর বেশি দেরি নাই। এ দেশে বর্ষাকালে উন্নয়ন কাজ প্রায় একরকম বন্ধই থাকে। তাই আমরা আশা করেছিলাম নির্বাচন শেষ হবার দু’এক মাসের মধ্যেই শাসনতন্ত্র প্রণয়ন শেষ করবো। আমরা আশা করেছিলাম জনগণের সরকার কায়েম হলে অন্তহীন সমস্যার জঞ্জাল সাফ করে বাংলার উন্নয়নমূলক কাজে জনপ্রতিনিধিগণ ঝাঁপিয়ে পড়বেন। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বানে বিলম্বের এত সাহস তারা কোথা থেকে পায় তা আমি জানি না।

যমুনার ওপর সেতু ও উপকূলীয় এলাকায় বাঁধ নির্মাণ, বাংলার বন্যা, বেকার, খাদ্য-এসব সমস্যা একদিনে সমাধান করা যাবে না। গ্রামের মানুষ এখন না খেতে পেয়ে দূর্ভোগ পোহাচ্ছে। বাংলাদেশেই ২০ লাখ টন খাদ্য ঘাটতি রয়েছে। সাধারণ মানুষ কিভাবে যে বেঁচে আছে, তা কল্পনা করা যায়। বাংলাদেশে ৭০ থেকে ৮০ লাখ মানুষ বর্তমানে বেকার। প্রদেশে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়ের ধ্বংসলীলা এবং চক্রান্তাকারী ও শোষণকারীরা এত বেশি সমস্যার সৃষ্টি করেছে যে, আমার দল ক্ষমতায় আসলেও সঙ্গে সঙ্গে সেসব সমস্যা সমাধান খুব কঠিন হবে।

[ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাস [ Bangbandhu Sheikh Mujibur Rahman’s Speech, February Month, 1971 ] ]

বাংলাকে আজ একটি বাজার ও উপনিবেশে পরিণত করা হয়েছে। আমরা আমাদের জনসাধারণকে মরতে বা শোষিত হতে দিতে পারি না। আমার দল শোষণকারীদের হাত থেকে সম্পদ ফিরিয়ে আনবে এবং তা জনসাধারণের মধ্যে বন্টন করে দেবে। আওয়ামী লীগরা সত্যবাদী এবং তারা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে না।

এ ব্যাপারে আমরা সবার সহযোগিতা কামনা করি। যদি প্রয়োজন পড়ে তাহলে আমরা আবার জেলে যাবো। তবুও আমরা নীতি থেকে বিচ্যুত হতে পারি না। আমি ও আমার দলের কর্মীরা খোদা ছাড়া আর কাউকে ভয় করেন না। যদি চক্রান্তকারীরা মনে করে থাকে যে, তাদেরকে ভীত করা যাবে তাহলে তারা ভুল করছে।

দলীয় প্রধানরা প্রস্তুত থাকবেন, সময় আসলে আমি আহ্বান করবো। ক্ষমতা আমাদের কাছেই আসবে। কেউ তা বন্ধ করতে পারবে না। ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণের উদ্দেশ্যে আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগ কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠক এবং ১৫ ফেব্রুয়ারি পার্লামেন্টারি পার্টির বৈঠক আহ্বান করেছি। আপনারা প্রতি মহল্লায় প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে ত্যাগের জন্যে প্রস্তুত হন।

ক্ষমতা পেলে জনগণের সমস্যার সার্বিক সমাধান করবো। ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফ এবং পৌর এলাকার ১ হাজার টাকা পর্যন্ত মূল্যের ঘর-বাড়ির পৌর করও মওকুফ করা হবে।

বাংলার মানুষের ভালবাসার প্রতিদানে আমার দেবার কিছুই নাই। একমাত্র প্রাণ দিতে পারি। আর তা দেয়ার জন্যে সবসময় প্রস্তুত আছি।

[সূত্র ঃ পূর্বদেশ, সংবাদ, আজাদ, দৈনিক পাকিস্তান, ১০ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭১]

[ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাস [ Bangbandhu Sheikh Mujibur Rahman’s Speech, February Month, 1971 ] ]

 

১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাস – ৩ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধুর সংবাদপত্রে দেয়া বিবৃতি

[১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাস – তথাকথিত কাশ্মীরী মুক্তিযোদ্ধা কোরেশী হাসিম এবং আশরাফ কোরেশী ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের শ্রীনগর থেকে নয়াদিল্লীগামী একটি ফকার বিমান ‘গঙ্গা’ হাইজ্যাক করে ৩১ জানুয়ারি, ১৯৭১ লাহোর বিমানবন্দরে নিয়ে যায়। হাইজ্যাকাররা বিমানটির আরোহী ও কর্মাদের বিমান থেকে নেমে যেতে দেয়। নিজেরা বিমানটির ভিতর বসে থাকে। তাদের দাবি অনুযায়ী বন্দি কাশ্মীরীদের মুক্তিদানে ভারতের অস্বীকৃতির পর ২ ফেব্রুয়ারি ডিনামাইট দিয়ে তারা বিমানটি ধ্বংস করে।

আহত অবস্থায় তারা পাকিস্তানী কর্তৃপক্ষের কাছে আত্মসমর্পণ করে। উল্লেখ্য, পাকিস্তানী, কর্তৃপক্ষ হাইজ্যাকারদের আপোস বা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে আত্মসমর্পণ করানোর কোন চেষ্টা করেনি। জুলফিকার আলী ভুট্টোসহ পশ্চিম পাকিস্তানী বহু নেতা বিমানটির উড়িয়ে দেয়াকে সমর্থন জানা। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান এ ঘটনার মধ্যে একটা চক্রান্তের আলামত দেখতে পান। তিনি ৩ ফেব্রুয়ারি সংবাদপত্রে এক বিবৃতি দেন। নিচে তা উদ্ধৃত হলো।]

ভারতীয় বিমানটিকে লাহোরে বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়া হয়েছে শুনে আমি বিস্মিত হয়েছি। বিমানটি যখন অপহরণ করা হয়েই গেছে, সেক্ষেত্রে এর পরবর্তী পর্যায়ে বিমানটিকে বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়া অবশ্যই বিন্দনীয়। লাহোর বিমানবন্দরে যাত্রীবাহী ভারতীয় বিমানটিকে ধ্বংস করার হাত থেকে রক্ষা করার জন্যে অর্থাৎ অপহরণের পরবর্তী পর্যায়ে বিমানটিকে যাতে ধ্বংস করতে না পারে সেজন্যে কর্তৃপক্ষ ক্ষিপ্র ও কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে পারতেন।

জাতীয় জীবনের এই সংকট মুহুর্তে যে কোন প্রকার অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি কেবল জনগণের বিরুদ্ধে চক্রান্তকারীদের ও অন্তর্ঘাতীদের ঘৃণ্য উদ্দশ্যকেই সফল করবে এবং এটা উপলদ্ধি করা উচিত ছিল। জনগণের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর বিঘ্নিত করার উদ্দেশ্যে এই ঘটনার সুযোগ নিয়ে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্যে কায়েমি স্বার্থবাদী মহলের সকল প্রচেষ্টা প্রতিহত করার জন্য জনসাধারণের সম্পূর্ণ সতর্ক থাকা উচিত।

আমি এই ব্যাপারে তদন্ত অনুষ্ঠানের জন্যে এবং স্বার্থসংশ্লিষ্ট মহল যাতে তাদের হীন উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যে এই ঘটনাকে ব্যবহার করতে না পারে সে উদ্দেশ্যে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্যে সরকারের প্রতি আহ্বান জানাবো।

[সূত্র ঃ পূর্বদেশ ও আজাদ, ৪ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭১]

[ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাস [ Bangbandhu Sheikh Mujibur Rahman’s Speech, February Month, 1971 ] ]

১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাস – ১৫ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমীতে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ

[১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাস – ১৯১৭ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণে আয়োজিত ভাষা আন্দোলনের স্মরণ সপ্তাহের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেন। একাডেমীর সভাপতি সৈয়দ মুর্তাজা আলী সভায় সভাপতিত্ব করেন। স্বাগত ভাষণ দেন একাডেমীর পরিচালক প্রফেসর কবীর চৌধুরী। অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের অংশবিশেষ উদ্ধৃত হলো।]

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি নয়, মূলত শুরু হয়েছিল ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ। এই দিনই বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে করাচীতে অনুষ্ঠিত জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে উর্দূকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার জন্যে প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। একমাত্র কুমিল্লার শ্রী ধীরেন্দ্রনাথ দত্তই উর্দূকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার প্রতিবাদ করেন এবং উর্দুর সাথে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানান। কোন বাঙ্গালি মুসলমান প্রতিবাদ করেন নি। এটা লজ্জাজনক ইতিহাস।

১৯৫২ সালের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন শুধুমাত্র ভাষার আন্দোলন ছিল না, বাঙ্গালির অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক তথা সার্বিক স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন এর সাথে জড়িত ছিল।

ভাষা আন্দোলনের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে আমি ঘোষণা করছি, আমার দল ক্ষমতা গ্রহণের দিন থেকেই সকল সরকারী অফিস-আদালত ও জাতীয় জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে বাংলা চালু করবে। এ ব্যাপারে আমরা পরিভাষা সৃষ্টির জন্যে অপেক্ষা করবো না। কারণ তাহলে সর্বক্ষেত্রে কোনদিনই বাংলা চালু করা সম্ভবপর হবে না। এ অবস্থায় হয়তো কিছু কিছু ভুল হবে, কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না। এভাবেই অগ্রসর হতে হবে।

স্বাধীনতার পর আমাদের সাথে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে আচরণ করা হয়েছে, আমাদের পশ্চিমবঙ্গের দালাল বলা হয়েছে। এমন কি ভাষা আন্দোলনকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে আমদানি করা হয়েছে বলা হতো। বাঙ্গালী হিসেবে আমরা অনেক উদারতার পরিচয় দিয়েছি। তা না হলে আমরা বাংলাকেই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানাতে পারতাম। কিন্তু সেদিন আমরা উর্দূর সাথে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানিয়েছিলাম।

[ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাস [ Bangbandhu Sheikh Mujibur Rahman’s Speech, February Month, 1971 ] ]

বাঙ্গালির স্বজাত্যবোধকে টুটি চেপে হত্যার জন্যে প্রতিক্রিয়াশীল চক্র বারবার এই অঞ্চলের সংস্কৃতি ও ভাষার উপর আঘাত হেনেছে, আর তাকে প্রাণ দিয়ে প্রতিহত করেছে এ দেশের তরুণরা। কিন্তু তাঁদের জবাবদিহি করতে হবে। আপনাদের লেখনী দিয়ে বের হয়ে আসা উচিত ছিল এ দেশের গণমানুষের দুঃখ-দূর্দশার কথা, স্বাধীনতা সংগ্রামীদের কথা। স্বাধীনতা আন্দোলনের বীর সন্তান সূর্যসেনের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের প্রচেষ্টাই করা হয় নাই। তাঁর কথা বলতে আপনারা ভয় পান। কারণ তিনি ছিলেন হিন্দু। এদের ইতিহাস লেখা এবং পাঠ করার জন্যে দেশবাসীর কাছে আহ্বান জানাই।

একদিন বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদের কথা বলা যেত না। কিন্তু আজ এই জাতীয়তাবাদ সত্য। একে রোধ করতে পারে এমন কোন ক্ষমতা নাই। এই প্রথমবারের মতো বাঙ্গালি জাতি একতাবদ্ধ হয়েছে। নিজেদের দাবিতে বাঙ্গালিরা আজ ঐক্যবদ্ধ।

ভাষা আন্দোলনের প্রত্যক্ষ ফল এই বাংলা একাডেমী। ১৯৫২ সালে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী এই ভবনে বসেই ভাষা আন্দোলনকারীদের উপর গুলির আদেশ দিয়েছিলেন। তাই যুক্তফ্রন্ট ১৯৫৪ সালে ক্ষমতায় এসে এখানে বাংলা একাডেমী প্রতিষ্ঠা করে। এই বাংলা একাডেমীকে কেন্দ্র করে স্বৈরাচারী সরার কত খেলাই না খেলেছে, তা এ দেশের মানুষের জানা আছে। বাংলা একাডেমীর মতো একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠানকে মাত্র ৩ লাখ টাকা সরকার বার্ষিক বরাদ্দ করেছে। এর জন্যে কাকে দোষ দেব! যারা এসব করেছে, সে আমলারা তো এ দেশেরই ছেলে। বাংলা একাডেমীর ভিতরের সব কথাই আমি জানি। লোক বদল করে নতুন নতুন লোক এনে বাংলা ভাষাকে ইসলামীকরণের যে চেষ্টা চালানো হয়েছে তাও জানি।

স্বাধিকার আন্দোলনের ক্ষেত্রে জাতীয় জীবনে ফেব্রুয়ারির গুরুত্ব অপরিসীম। বাংলা একাডেমী যে সপ্তাহ পালন করছে সে সপ্তাহ বাংলাদেশের জীবনে এক কঠিন সপ্তাহ। ফেব্রুয়ারির এই দিনেই বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছেন ভাষা আন্দোলনের শহীদেরা, এই সপ্তাহেই কুর্মিটোলার বন্দিশিবিরে হত্যা করা হয়েছে সার্জেন্ট জহুরুল হককে, এই সপ্তাহেই শহীদ হয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডঃ শামসুজ্জোহা, আর এই সপ্তাহেই কারফিউ নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করে আত্মহুতি দিয়েছে এ দেশের অসংখ্য মায়ের অসংখ্য নাম না জানা সন্তান।

[ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাস [ Bangbandhu Sheikh Mujibur Rahman’s Speech, February Month, 1971 ] ]

স্বৈরাচারী চক্র সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন একটি পরিবেশের সৃষ্টি করেছিল, যার ফলে কোন কোন প্রফেসরকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে বিদেশে চলে যেতে হয়েছিল। কিন্তু কই, বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন শিক্ষক তো সে স্বৈরাচারী কার্যকলাপের প্রতিবাদে তখন পদত্যাগ করেন নাই। তখন অধ্যাপকরা একযোগে পদত্যাগ করলে আন্দোলনে এত রক্তক্ষয়ের প্রয়োজন হতো না।

মুক্ত পরিবেশেই ভাষার বিকাশ হয়। ঘরে বসে ভাষার পরিবর্তন-পরিবর্ধন করা যায় না। এর পরিবর্তন-পরিবর্ধন হয় ব্যবহারের ভিতর দিয়ে। ভাষার গতি নদীর স্রোতধারার মতো। ভাষা নিজেই তার গতিপথ রচনা করে নেয়। কেউ এর গতি রোধ করতে পারে না। এই মুক্ত পরিবেশে বুদ্ধিজীবীরা নিজেদের অতীত ভূমিকা ভুলে স্বজাত্যবোধে উদ্দীপ্ত হয়ে বাংলা ভাষাকে গণমুখী ভাষা হিসেবে গড়ে তুলুন। জনগণের জন্যেই সাহিত্য। এ দেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নিজেদের লেখণীর মাধ্যমে নির্ভয়ে এগিয়ে আসুন, দুঃখী মানুষের সংগ্রাম নিয়ে সাহিত্য সৃষ্টি করুন। কেউ আপনাদের বাধা দিতে সাহস করবে না।

আমরা জনগণের দাবী আদায়ের জন্যে রাজনীতি করি। তবে তার মানে এই না যে, আমরা ক্ষমতা চাই না। আমরা দাবী আদায়ের জন্যেই ক্ষমতায় যেতে চাই। ক্ষমতা পেলে আমরা একটি সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েম করবো। আমাদের ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের মধ্যেই এ দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি নিহিত আছে। তবে দাবী আদায় না হলে আমরা ক্ষমতা ছেড়ে চলে আসবো।

জয় বাংলা।

[সূত্রঃ আজাদ, সংগ্রাম, ইত্তেফাক, দৈনিক পাকিস্তান, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭১]

[ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাস [ Bangbandhu Sheikh Mujibur Rahman’s Speech, February Month, 1971 ] ]

১৯৭১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ইঞ্জিনিয়ার্স ইনষ্টিটিউটে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ

[১৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭১ শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনষ্টিটিউটে আওয়ামী লীগ দলীয় জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নবনির্বাচিত সদস্যদের দু’দিনব্যাপী এক যৌথ অধিবেশনের উদ্বোধন করেন। নির্বাচনের পর এমএনএ এবং এমপিএ দের এটাই প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক। ঢাকায় পাকিস্তানআওয়ামী লীগের নির্বাহী কমিটির এক বৈঠকও আগের দিন অনুষ্ঠিত হয়।

দলীয় প্রধান তাঁর ভাষণে নবনির্বাচিত সদস্যদের জনগণের প্রতি তাঁদের দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেন এবং ৬-দফা ও ১১-দফার ভিত্তিতে প্রণীত শাসনতন্ত্রেই দেশ ও জনগণের কল্যাণ নিহিত আছে বলে তাঁর বিশ্বাসের কথা পুনরায় ব্যক্ত করেন। বঙ্গবন্ধু প্রধানত বাংলার ভাষণ দেন। মাঝে মাঝে, বিশেষ করে পশ্চিম পাকিস্তানী সদস্যদের উদ্দেশ্যে কিছু বলার সময় ইংরেজিতে বলেন। উক্ত ভাষণের অংশ বিশেষ উদ্ধৃত হলো।]

৩ জানুয়ারি রেসকোর্সের গণসমাবেশে আমি আওয়ামী লীগের নীতি ও লক্ষ্য স্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরেছি। আমি সেদিনও বলেছি, আজো বলছি, গণঅধিকার প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত নিরলসভাবে সংগ্রাম চালিয়ে যাব।

আমার জাতির সাথে ওয়াদাবদ্ধ আছি ৬-দফার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র তৈরি করার জন্যে। কোন পরিস্থিতিতেই আমরা আমাদের ওয়াদার সাথে বেঈমানী করতে পারি না। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, ৬-দফা ভিত্তিক শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করা হলে দেশের সব অঞ্চলের সাধারণ মানুষের উপকার হবে। যদি এই কর্মসূচী পুরোপুরি গ্রহণ করা হয় তাহলেই আমরা একসাথে ভাই ভাইয়ের মতো বাস করতে পারি।

কেউ ষড়যন্ত্র বা গণরায় বানচাল করার চেষ্টা করলে আমরা প্রস্তুত আছি। আমরা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি। তাই আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে চাই। কিন্তু তার মানে এই নয় যে বুকের ওপর মেশিনগান ধরে যেকোন শাসনতন্ত্র পাস করতে বললেই, আমরা তা মেনে নেবো। কেউ যদি মনে করে থাকেন তিনি আমাদের অন্য কিছু গ্রহণ করাতে পারবেন, তবে তিনি ভুল করেছেন।

যাঁরা ৬-দফার বিরোধিতা করছেন তাঁরা ভালভাবেই জানেন এই দফা কি। ৬-দফাকে নিয়ে নতুন করে আলোচনার কি আছে। ১৯৬৬ সালে এই কর্মসূচী দেয়া হয়েছে। তারপর আইয়ুবের রণহুঙ্কার, জেল-জুলুম, গুলি, আগরতলার মিথ্যা মামলাসহ অনেক কিছু হয়ে গেছে। এরপরেও যাঁরা ৬-দফা বুঝতে চান, তাঁরা বুঝেও বোঝেন না। কিন্তু তাঁরা ভুলে গেছেন যে, চাবি আমাদের হাতে, আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। কাজেই আর ভুল বোঝাবুঝির ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি না করে ৬-দফা গ্রহণ করাই ভাল।

আমার দল কোনদিন পশ্চিম পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে কথা বলেনি। বাংলাদেশ ও পশ্চিম পাকিস্তানের দরিদ্র জনসাধারণের মধ্যে কোন পার্থক্য নাই। ৬-দফা কর্মসূচি বাংলাদেশের সাথে পাঞ্জাব, সিন্ধু, বেলুচিন্তান ও সীমান্ত প্রদেশের জন্যে সমানভাবে প্রযোজ্য। শুধু বাংলার জন্যে নয়, পশ্চিম পাকিস্তানের এই ৪টি প্রদেশের জন্যেও আমরা ৬-দফার ভিত্তিতে স্বায়ত্তশাসন চাই। সেখানকার নির্যাতিত, শোষিত জনতার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে আমরা তাদের সাথে আছি।

দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে শাসনতন্ত্র প্রণয়নের যোগ্যতা আওয়ামী লীগের থাকলেও আমরা সবারই সহযোগিতা ও বন্ধুত্ব চাই। গণতান্ত্রিক দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠের ইচ্ছাই মেনে নেয়। গণতন্ত্রের রীতি অনুযায়ী আমরাই শাসনতন্ত্র রচনার ক্ষমতা পেয়েছি। আমরা শাসনতন্ত্র চাপিয়ে দিচ্ছ না। যাঁরা একথা বলেন কিংবা প্রচার করেন, তাঁরা মূলত গণতন্ত্রে বিশ্বাসী নন। তাঁদের থেকে ফ্যাসীবাদের গন্ধ পাওয়া যায়।

১৯৬৬ সালে লাহোরে যখন ৬-দফা কর্মসূচী ঘোষণা করি তখন তা আমরা ব্যক্তিগত সম্পত্তি ছিল। পরে তা আওয়ামী লীগের সম্পত্তি হয়।এবার নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ ৬-দফার পক্ষে রায়দান করেছে। তাই আজ আর কোন পরিবর্তন পরিবর্ধনের ক্ষমতা শেখ মুজিবুর রহমান বা আওয়ামী লীগের নাই।

বিলম্ব হলেও ৩ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসছে জেনে আমি সন্তোষ প্রকাশ করছি। এখন আমরা নিশ্চিন্ত মনে বসে শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করতে পারবো। এ অধিকার কারো কাছ থেকে ভিক্ষা করে আনতে হয়নি, সারাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ আওয়ামী লীগ প্রতিনিধিদের এই অধিকার দিয়েছেন। আওয়ামী লীগ ইতিমধ্যে শাসনতন্ত্রের খসড়া প্রণয়ন শুরু করেছে এবং জাতীয় পরিষদ অধিবেশনের আগে আগামী ২৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে খসড়া প্রণয়নের কাজ শেষ হবে। কেউ যদি ৭ কোটি মানুষের বুকে বন্দুক রেখেও অন্য কিছু মেনে নিতে বলে, তবে জনসাধারণ তা রুখে দাঁড়াবে এই বিশ্বাস আমার আছে।

জাতি আপনাদের ওপর কত বড় দায়িত্ব অর্পণ করেছে তা আপনাদেরকে ভাবতে হবে। পাকিস্তানের রাজনীতি ষড়যন্ত্রের রাজনীতি। গত ২৩ বছরে দেশে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তার জের এখনো শেষ হয়নি। তাদের এত সাহস, নির্বাচনের ঐতিহাসিক ফলাফলের ফলাফলের পরও ষড়যন্ত্র করছে। তারা জানে না যে তারা আগুন নিয়ে খেলা করছে। তারা জানে না যে বাংলার মানুষ জেগে উঠেছে। তারা জানে না, জাগ্রত জনগণকে কেউ কোনদিন দাবিয়ে রাখতে পারে না। কোন ষড়যন্ত্রের কাছেই আমরা মাথা নত করবো না। যত ষড়যন্ত্রই হোক না কেন, আওয়ামী লীগই দেশে সরকার গঠন করবে। আমি আমার দলীয় এমএনএ ও এমপিএদের প্রতি যেকোন পরিস্থিতিতে সংগ্রাম ও ত্যাগ স্বীকারের জন্যে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানাচ্ছি।

বাংলার মানুষের বিরুদ্ধে নতুন ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। এতবড় নির্বাচনের পরেও বিভিন্নভাবে দেশের অর্থনীতি পঙ্গু করার এবং সিকিউরিটি ছাড়া নোট বাজারে ছেড়ে মুদ্রাস্ফীতি ঘটানোর চেষ্টা চলছে। শোষককুলের এজেন্ট এবং এক শ্রেণীর কূচক্রী আমলা আমাদের এবং ৬-দফার মোকাবিলায় সমগ্র পশ্চিম পাকিস্তানকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য সিন্ধু, বেলুচিস্তান ও সীমান্ত প্রদেশের ক্যানভাস করে বেড়াচ্ছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যাবে বলে নানা ধরনের সমস্যার সৃষ্টি করা হচ্ছে, যাতে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গিয়ে অপ্রিয় হয়ে পড়ে।

আমরা পরিস্কারভাবে জানিয়ে দিতে চাই যে, আমরা ক্ষমতার জন্যে রাজনীতি করি না। জনগণের অধিকার আদায়ের জন্যেই আওয়ামী লীগ রাজনীতি করে। কে মন্ত্রী হবেন আর কে কি হবেন, সেসব প্রশ্ন দ্বিতীয় পর্যায়ের। এসব আমলার মনে রাখা উচিত যে, এ দেশে সরকার গঠন করলে একমাত্র আওয়ামী লীগই করবে। সেদিন সুদে-আসলে বাঙ্গালির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের মাসুল দিতে হবে। কাজেই ওসব ষড়যন্ত্রের খেলায় এখন কোন কাজ হবে না।

ষড়যন্ত্রকারীদের কথায় কান না দিয়ে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী যত তাড়াতাড়ি সম্ভব জনগণের প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্যে আমি প্রেসিডেন্টের প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছি। আপনি যেসব ওয়াদা করেছেন, দেরীতে হলেও আপনি তা পালন করে এসেছেন। জনসাধারণ গণআন্দোলনের মাধ্যমে তাদের দাবী আদায় করলেও আপনার আগমনেই জনগণের ভোটাধিকার স্বীকার ভোটাধিকার স্বীকার করে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং ইউনিট বাতিল করা হয়েছে। আশা করি, শাসনতন্ত্র প্রণয়ন এবং সরকার গঠনের প্রশ্নের আপনি জনগণের ইচ্ছার কাছে নতিস্বীকার করবেন।

পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো আমার সাথে বৈঠকের পর জানান যে, তিনি খুশিও নন, অখুশিও নন। আমিও তাঁর সঙ্গে আলোচনা করে সন্তুষ্টও নই, অসন্তুষ্টও নই। তবে আমি তাঁকে বলেছি যে, সংখ্যাগরিষ্ঠ লোক যা চায় তা মেনে নেয়া উচিত। অবশ্য আমি কাউন্সিল লীগ নেতা শওকত হায়াত খান, মওলানা নূরানী, বেলুচিস্তানের নওয়াব বুগতি ও বাহওয়ালপুরের প্রতিনিধির সঙ্গে আলোচনা করে সন্তুষ্ট হয়েছি। প্রয়োজন হলে ভবিষ্যতে অন্যান্য দলের নেতাদের সঙ্গেও আলাপ-আলোচনা করতে আমি প্রস্তুত আছি। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানী নেতাদের সঙ্গে আমি ৬-দফার ব্যাপারে কি আলোচনা করবো? তাঁরা কি এতদিনে ৬-দফার কর্মসূচি বুঝতে পারেন কি? নাকি তাঁরা ৬-দফা বুঝতে চান না?

যেসব পশ্চিম পাকিস্তানী আওয়ামী লীগ নেতা এখানে উপস্থিত আছেন, আপনারা সমগ্র পাকিস্তানে দুঃখী দরিদ্র জনগণের মুক্তির জন্যে সংগ্রাম করুন। কোনরকম ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি না করার জন্যে আমি অনুরোধ করছি।

সহকর্মী ভাইয়েরা আমার, আপনাদের দায়িত্ব অপরিসীম। জনগণ অনেক আশা, অনেক আস্থা নিয়ে আপনাদের নির্বাচন করেছে। চরম মূল্যের বিনিময়ে হলেও সেই আশা ও আস্থার মর্যাদা রক্ষা করতে হবে যেদিন আপনারা বাংলার মানুষের এই ভালবাসা ও আস্থার অমর্যাদা করবেন, সেদিনই আপনাদের মুজিব ভাইয়ের, আপনাদের এবং আপনাদের প্রিয় প্রতিষ্ঠান আওয়ামী লীগের মৃত্যু হবে। আর সেই সঙ্গে চিরতরে নির্মূল হয়ে যাবে বাঙ্গালির ভবিষ্যৎ আশা-আকাঙ্খা, স্বপ্ন-সাধ।

[সূত্র ঃ ইত্তেফাক, দৈনিক পাকিস্তান, পূর্বদেশ, আজাদ, দৈনিক সংগ্রাম ও সংবাদ, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭১]

 

১৯৭১ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি রাতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ

[১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল বাঙ্গালির ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠারও আন্দোলন। বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদের শ্রেষ্ঠ প্রবক্তা শেখ মুজিব ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে সাড়ে ৭ কোটি বাঙ্গালির সর্বাত্মক লাভ করেন। বায়ান্নোর পথ ধরে জনগণের বিজয় অর্জিত হয়। ১৯৭১ সালের ২০-২১ ফেব্রুয়ারির মধ্যরাতে ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে একটি মশাল মিছিল বের করা হয়। বঙ্গবন্ধু শহীদ মিনার পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ করে মিছিলের আগে মিনার চত্বরে এক বিরাট ছাত্র-জনসমাবেশে ভাষণ দেন। উক্ত ভাষণের অংশবিশেষ উদ্ধৃত হলো।]

বাঙ্গালিদের স্বাধিকার আদায়ের আন্দোলনে আরো রক্তদানের জন্যে ঘরে ঘরে প্রস্তুত থাকুন। বাঙ্গালি শহীদ হবে না। এবার তারা গাজী হয়ে বাঁচবে। যারা বুকের রক্ত দিয়ে দেশের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে, যারা নিজের রক্ত দিয়ে আমাকে মুক্ত করে এনেছে, মধ্যরাতে এই শহীদ মিনারে দাঁড়িয়ে আল্লাহর নামে শপথ নিয়ে বলছি, তাঁদের রক্তের ঋণ আমি শোধ করবোই। শহীদের আত্মা আজ বাংলার ঘরে ঘরে ফরিয়াদ করে ফিরছে, বাঙ্গালি তুমি কাপুরুষ হয়ো না, স্বাধিকার আদায় করো।

আমি আজ এই শহীদ বেদী থেকে বাংলার জনগণকে আহ্বান জানাচ্ছি, প্রস্তুত হও, দরকার হয় রক্ত দিব। নির্বাচনে আমরা বিপুল সাফল্য অর্জনের পরও বাংলার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র আজো চলছে। যে ষড়যন্ত্রের পরিণতি এই ২১ ফেব্রুয়ারি, যে ষড়যন্ত্রের পরিণামে বাঙ্গালিকে বারবার রক্ত দিতে হয়েছে, সে ষড়যন্ত্র আজো শেষ হয়নি। কিন্তু শোষকদের জানা উচিত, ৫২ সালে বাঙ্গালির যে রূপ ছিল, তার সাথে ৭১ সালের বাঙ্গালির অনেক পার্থক্য রয়েছে।

কারোর উপর আমাদের কোন আক্রোশ নাই। আমরা স্বাধিকার চাই। আমরা চাই আমাদের মতোই পাঞ্জাবী, সিন্ধু, বেলুচ, পাঠানরা নিজ নিজ অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকুক। কিন্তু তার মানে এই না যে ৭ কোটি বাঙ্গালী কারো গোলাম হয়ে থাকবে। ভ্রাতৃত্বের অর্থ দাসত্ব নয়-সম্প্রীতির, সংহতির নামে বাংলাকে আর কলোনি বা বাজার হিসেবে ব্যবহার করতে হবে না। শুধু গুলি খেয়ে নয়, না খেয়েও শহীদ হচ্ছে। যারা বাঙ্গালীর স্বাধিকারের দাবী বানচালের ষড়যন্ত্র করছে, বাঙ্গালিদের ভিখিরী বানিয়ে, ক্রীতদাস করে রাখতে চাচ্ছে, তাদের উদ্দেশ্যে যে কোন মূল্যে ব্যর্থ করে দেয়া হবে।

সামনে আমাদের কঠিন দিন। আমি আনাদের মাঝে নাও থাকতে পারি। মানুষকে তো একদিন মরতেই হয়। তাই আজ আমি আপনাদের এবং সারা বাংলার মানুষকে ডেকে বলছি, চরম  ত্যাগের জন্যে প্রস্তুত হোন। বাঙ্গালি যেন আর অপমানিত-লাঞ্চিত না হয়। শহীদদের রক্ত যেন বৃথা না যায়।

শহীদ স্মৃতি অমর হোক।

[সূত্রঃ পূর্বদেশ, ইত্তেফাক ও দৈনিক পাকিস্তান, ২৩ ফেব্রয়ারী, ১৯৭১]

আরও পড়ুন: