Breaking News :

১৯৭২ সালের ১০ এপ্রিল বাংলাদেশ গণপরিষদে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ

১৯৭২ সালের ১০ এপ্রিল বাংলাদেশ গণপরিষদে উদ্বোধনী অধিবেশনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধ শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক উত্থাপিত স্বাধীনতা ঘোষণা সম্পর্কিত প্রস্তাব।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানঃ জনাব স্পীকার সাহেব, আপনার মাধ্যমে আমি আজ কয়েকটি বিষয় এখানে আলোচনা করতে চাই। আজ আমরা এখানে গণপরিষদে সদস্য হিসেবে বসবার সুযোগ পেয়েছি। আমরা আজকে বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে পেরেছি এবং বাংলাদেশকে আজ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। আমরা যে আজ বাংলাদেশের সার্বভৌম গণপরিষদে সদস্য হিসেবে কাজ করতে পারছি, সে সুযোগ এ দেশের জনসাধারণ তাদের রক্ত দিয়ে এনে দিয়েছে। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম অনেক দিন থেকে শুরু হয়। জনাব স্পীকার সাহেব, আপনার জানা আছে যে, ৩০ লাখ ভাই বোনের রক্তের বিনিময়ে এই স্বাধীনতা আমরা পেয়েছি। এই গণপরিষদের সদস্য হিসেবে নিশ্চয়ই আমাদের আত্মত্যাগের কথা আমরা স্মরণ করবো এবং মনে রাখবো। আমাদের মনে রাখতে হবে, যে রক্তের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি, সে রক্ত যেন বৃথা না যায়। রক্ত দিয়েছে এ দেশের লক্ষ লক্ষ ভাই-বোন, নিরীহ জনসাধারণ। রক্ত দিয়েছে এদেশের কৃষক, ছাত্র, শ্রমিক, বুদ্ধিজীবীরা, রক্ত দিয়েছে পুলিশ, রক্ত দিয়েছে প্রত্যেকটি বাঙ্গালী, এমনকি সরকারী কর্মচারীরাও রক্ত দিয়েছে এই স্বাধীনতা সংগ্রামে। নিষ্ঠুর বর্বর ইয়াহিয়া খানের খান সেনারা যে অত্যাচার করেছে, জুলুম করেছে তা থেকে বাংলাদেশের মা-বোনেরা পর্যন্ত নিস্তার পায়নি। লক্ষ লক্ষ মা-বোনকে নির্যাতন করা হয়েছে। এই পুলিশ সেনাদের আচরণের ইতিহাস দুনিয়ার আর কোথাও নাই।

আজ তাদের কথা আমরা স্মরণ করছি, স্মরণ করতে হয় আমার সহকর্মী সভ্যবৃন্দের কথা, যারা সেই গত নির্বাচনে নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাদের অনেককেই বন্দী করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে-তাদের নাম ঐ প্রস্তাবে রয়েছে, যে প্রস্তাব আমি আপনার মাধ্যমে পরিষদে পেশ করেছি।

তাছাড়া এই দেশের জানা অজানা লক্ষ লক্ষ লোক, আওয়ামী লীগের লক্ষ লক্ষ কর্মী স্বাধীনতার জন্যে জীবন দিয়েছিলেন, দলমত নির্বিশেষে যারা স্বাধীনতার জন্যে রক্ত দিয়েছেন, শহীদ হয়েছেন, তাদের ত্যাগের কথা কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করে আমাদের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা গ্রহণ করতে হবে। জনাব স্পীকার সাহেব, আজ স্বাধীনতা আমরা পেয়েছি, এর সাথে সাথে আমি চারটি স্তম্ভকে স্মরণ করতে চাই, যে স্তম্ভকে স্মরণ করতে চাই, যে স্তম্ভকে সামনে রেখে আমাদের দেশের সংবিধান তৈরী করতে হবে। গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষ। আমরা গণতন্ত্র দিতে চাই এবং গণতন্ত্র দিতেই আজ আমরা এই পরিষদে বসেছি। কারণ, আজ আমরা যে সংবিধান দেবো, তাতে মানুষের অধিকারের কথা লেখা থাকবে, যাতে ভবিষ্যতের কেউ জনগণের জানমাল নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে না পারে। এমন সংবিধানই জনগণের জন্য পেশ করতে হবে। আজ এখানে বসে চারটি স্তম্ভের উপর ভিত্তি করে আমাদের ভবিষ্যৎ বংশধরদের জন্যে এমন সংবিধান রচনা করতে হবে, যাতে তারা দুনিয়ার সভ্য দেশের মানুষের সামনে মাথা উচু করে রয়েছে, একটা বিরাট কর্তব্য আছে, আমি আমার বক্তৃতা বড় করতে চাই না। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের জন্যে যারা সংগ্রাম করে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন, তাদের সেই ইতিহাস আজ এখানে পর্যালোচনা না করলেও চলবে। কিন্তু বিশেষ কয়েকজন নেতার কথা স্মরণ করছি, যারা গণতন্ত্রে পূজারী ছিলেন-যেমন-হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হক, বর্বর পাকবাহিনীর হাতে নিহত ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। আর কলম দ্বারা সংগ্রাম করেছেন সেই জনাব তোফাজ্জল হোসেন, আমাদের মানিক ভাই। এদের কথা শ্রদ্ধার সাথে আমরা স্মরণ করতে চাই। স্মরণ করি ১৯৪৭ সাল থেকে আজ পর্যন্ত প্রত্যেকটি আন্দোলনের সময় যারা জীবন দিয়েছেন, যারা কারাগারে জীবন দিয়েছেন। গণতন্ত্রকে এ দেশের প্রতিষ্ঠা করার জন্যে যারা সংগ্রাম করেছেন, তাদের কথা যদি স্মরণ না করি, তাদের ইতিহাস যদি না লেখা হয়, তবে ভবিষ্যৎ বংশধরেরা জানতে পারবে না এই সংগ্রামের পিছনে কারা ছিলেন।

গত বছর নির্বাচন হলো। সেই নির্বাচনের পূর্ব থেকেই আমাদের জানা ছিল যে, বাংলাদেশ জনসংখ্যায় সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকা সত্ত্বেও তারা আমাদের কলোনি এবং বাজার করে রাখতে চায়। শুধু তাই নয়, তারা আমাদের সংস্কৃতি ও ভাষার উপর আঘাত করেছিল। আমাদের নাগরিক অধিকারের উপর আঘাত করে আমাদের কলোনি করে রাখতে চেয়েছিল। আমাদের সংগ্রাম তখন থেকেই চলছিল। আমরা জানতাম সংগ্রামকে ধাপে ধাপে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। এভাবে এগিয়ে আজ চরম সংগ্রামে পরিণত হয়েছে। ২৫ মার্চ তারিখের ইতিহাস আপনাদের জানা আছে। সেইদিন বর্বর পাক হানাদার বাহিনী কোন আইন-কানুন মানে নাই। কোন সভ্য দেশে তাদের কাজের তুলনা পাওয়া যায় না। প্রত্যেক সভ্য দেশে যুদ্ধের একটা নিয়ম আছে। কোনরূপ ওয়ানিং না দিয়েই অতর্কিতে কাপুরুষের মতো বাড়ি-ঘরে আগুন লাগিয়ে, দুধের বাচ্চা পর্যন্ত হত্যা করে তারা জঘন্য লীলায় মেতে উঠেছিল। অর্ডার দিয়েছিল আওয়ামী লীগের লোক যাকে পাও তাকেই হত্যা করো, কোনরূপ দয়ামায়া নাই। তাদের জঘন্য কাজ-কারবারের এমন সমস্ত ইতিহাস আমাদের হাত আছে, যা দেখলে শিউরে উঠতে হয়। আমাদের হাতে একজন জেনারেলের কাছে দরখাস্ত করা কাগজ ধরা পড়েছে। তাতে আছে লুটপাট করো। এমনকি পাশবিক অত্যাচারের কথাও আছে। বর্বর ইয়াহিয়ার সেনাবাহিনীকে অসহায় ও নিরস্ত্র ৭ কোটি বাঙ্গালীর উপর কুকুরের মতো লেলিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেনাবাহিনী যদি যুদ্ধ ঘোষণা করতো, তবে আমরা সে যুদ্ধের মোকাবিলা করতে পারতাম। কিন্তু তারা অতর্কিত ২৫ মার্চ তারিখে আমাদের আক্রমণ করলো। তখন বুঝতে পারলাম যে, আমাদের শেষ সংগ্রাম শুরু হয়ে গেছে। আমি ওয়ারলেসে চট্টগ্রামে জানালাম বাংলাদেশ আজ থেকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। এই খবর প্রত্যেককে পৌঁছিয়ে  দেওয়া হোক, যাতে প্রতিটি থানায়, জেলায় প্রতিরোধ সংগ্রাম গড়ে উঠতে পারে। সেই জন্যে প্রয়োজনীয় নির্দেশও দিয়েছিলাম। এই ব্যাপারে আত্মসচেতন হতে হবে। দেশবাসী জানেন একই তারিখে দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রতিরোধ আন্দোলন শুরু হয়েছিল। এটা হওয়ার উপর থেকে হয় নাই। যদি কোন নির্দেশ না থাকতো, তবে কেমন করে একই সময়ে, একই মুহুর্তে সব জায়গায় সংগ্রাম শুরু হলো?

এখন যদি আমি ভারত সরকারের বিষয়ে না বলি, তাহলে অন্যায় করা হবে। আমাদের দেশের জনগণের যখন প্রাণভয়ে ঘরবাড়ি ছেড়ে, ছোট-ছেলে-মেয়ের নিয়ে পায়ে হেটে ভারতবর্ষে যায়, তখন ভারতের জনসাধারণ তাদেরকে বুকে টেনে নেয়। ভারতের জনসাধারণ, পশ্চিমবঙ্গের জনসাধারণ, মেঘালয়, ত্রিপুরা এবং আসামের জনসাধারণ বিশেষ করে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর সরকারকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। কারণ, তারা আমাদের জনসাধারণকে বুকে টেনে নিয়েছেন। স্মরণ করি ভারতের সেনাবাহিনীর ঐ সমস্ত জোয়ানদের, যারা আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে থেকে সংগ্রাম করেছে। আমি স্মরণ করি রাশিয়ার জনসাধারণ ও সরকারকে, যারা নিশ্চিতভাবে আমাদের সাহায্য করেছে। তারা প্রকাশ্যে আমাদের গ্রেফতারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন এবং বাংলাদেশ ধ্বংশলীলা করার বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদ করেছেন। স্মরণ করি গ্রেট বৃটেনের জনসাধারণকে, পশ্চিম জার্মানির জনসাধারণকে, যারা আমাদের আন্দোলনকে সমর্থন করেছিলেন। যারা যারা সমর্থন করেছিলেন, তাদের সকলকে আমাদের এ গণপরিষদের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানাই। এমনকি জাতিসংঘে রাশিয়া তিনটি ভেটো দিয়েছিল, তা না হলে সেখানে যে ষড়যন্ত্র চলছিল, তাতে বাংলাদেশের অবস্থা কি হতো তা বলতে পারি না। যে সমস্ত পূর্ব ইউরোপীয় দেশ আমাদের সমর্থন দিয়েছিল, বিশেষ করে পোল্যান্ড, তাদের প্রত্যেককে এবং তাদের জনসাধারণকে আমি এই পরিষদের মাধ্যমে ধন্যবাদ জানাতে চাই এবং স্মরণ করতে চাই।

জনাব স্পীকার সাহেব, এসব কথা বলতে গেলে ভাষা আসে না, মানুষ ভাবপ্রবণ হয়ে যায়। সে জন্য এগুলো বলা আমার পক্ষেও কষ্টকর। কারণ, আমি ভাবপ্রবণ হয়ে যাই। আমরা দেখতে পাই আমাদের লক্ষ লক্ষ মা-বোনকে অত্যাচার করা হয়েছে এবং আমাদের হাজার হাজার ছেলে পঙ্গু অবস্থায় রয়েছে, তাদের জন্যে কিছুই করতে পারি নাই। আমাদের বাংলার গ্রামকে গ্রাম জ্বালিয়ে ছারখার করে দিয়েছে, আমাদের কারেন্সি নোট জ্বালিয়ে দিয়েছে। এ রকম কত নির্যাতনই না আমাদের লোককে সহ্য করতে হয়েছে এবং তারা যে সহনশীলতা দেখিয়েছেন সেজন্যে তাদেরকে যদি আমরা মোবারকবাদ না জানাই তাহলে অন্যায় করা হবে। আরযে সমস্ত দল আমাকে সমর্থন করেছে তাদেরকে আপনার মাধ্যমে ধন্যবাদ দিতে চাই এবং শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করতে চাই।

জনাব স্পীকার সাহেব, আমাদের সামনে আজকে বিশেষ কর্তব্য হলো জাতিকে একা সংবিধান দেওয়া এবং যতো তাড়াতাড়ি হয়ে, সেই সংবিধান দেবার চেষ্টা করা হবে। আমার সহকর্মী ভাইয়েরা, যারা এখানে উপস্থিত আছেন, আপনার মাধ্যমে তাদের সবাইকে বলে দিতে চাই যে, আপনার গাছতলায় বসে যুদ্ধ করেছেন, না খেয়ে যুদ্ধ করেছেন, পরনের কাপড়ও ছিল না। আমার সহকর্মীদের আত্মীয়-স্বজনের উপর অত্যাচার করা হয়েছে, তাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। মেম্বারদের যে অধিকার পাওয়ার আছে, সে অধিকার পুরোপুরি দেবার ক্ষমতা আমার নেই। যদি মাইক্রোফোন বিদেশ থেকে আনবার চেষ্টা করতাম, তাহলে তিন মাস সময় লাগতো, অনেক দেরি হয়ে যেতো। এই এসেম্বলি ভবন যে অবস্থায় ছিল, তাতে মাত্র ৩০০ মেম্বার বসার জায়গা ছিল, আজকে সেখানে ৪৫০ জন বসেছেন। যদি এই এসেম্বলি ভবনও না থাকতো, তবে গাছতলায় বসেও আমার মেম্বাররা সংবিধান রচনা করতেন-এই সুনিশ্চিত আশ্বাসটুকু দিতে পারি। আজকে আমাদের জনগণ কী অসুবিধায় আছে। তাদের থাকার মতো ঘর নেই, আমরা কিছু দিতে পারছি না, মানুষ কষ্ট করছে। হাজার হাজার লোক বেকার হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তাদেরকে সুযোগ-সুবিধা দিতে পারছি না। অর্থ নাই-জনসাধারণকে সুবিধা করে দিতে পারছি না। কিন্তু আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন-আপনার কাছে আবার বলছি যে, আমাদের সামনে কর্তব্য হলো সংবিধান তৈরী করা। আমরা প্রোগ্রাম অনুযায়ী আগামীকাল আবার বসবো। শুধু যে আমাদের দলীয় সদস্য থেকে কমিটি করবো তা নয়, দলমত নির্বিশেষে সকলের সঙ্গে আলোচনা করা হবে, জনগণকে যাতে তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী একটা সুষ্ঠু সংবিধান দেওয়া যায়, এই উদ্দেশ্যে সকলের মতামত চাইবো। এই সংবিধান মানবিক অধিকার থাকবে, যে অধিকার মানুষ চিরজীবন ভোগ করতে পারে। আমরা গত ২৩ বছর ধরে কী দেখেছি-শাসনতন্ত্রের নামে শাসনতন্ত্র, জনগণের নিরাপত্তার নামে মার্শাল ল জনগণের দাবী আদায়ের নামে প্রতারণা। আর বাংলাদেশের কথা উঠলে, হিন্দুস্থানের দালাল এই ধরনের কথা সারা জীবন শুনে আসছি। সেসব মতে এ দেশ থেকে উঠে যায়, সে জন্যে সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে এবং এ বিষয়ে সকলের সহযোগিতা কামনা করছি।

জনাব স্পীকার সাহেব, আপনি এই পরিষদের স্পীকার হয়েছেন। আবার আপনাকে জানাতে চাই যে, আমরা একটা গণমূখী সংবিধান তৈরি করতে চাই এবং সেই সঙ্গে এই আশ্বাস দিতে চাই যে, আপনি যতক্ষণ নিরপেক্ষ থাকবেন, আমাদের কাছ থেকে পূর্ণ সহযোগিতা পাবেন। আপনার কর্তব্যটুকু আইন ও আপনার বিবেক অনুযায়ী এবং পার্লামেন্টারি কনভেনশন মেনে নিয়ে পালন করবেন এই আশা করি। আপনি কোন দল বড়, কোন দল ছোট তা দেখবেন না, কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী বিচারও ইনসাফ করবেন। আমার দলের পক্ষে থেকে আপনাকে পূর্ণ সমর্থণ ও সহযোগিতা জানাবো।

এখানে যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, নজরুল ইসলাম তা পড়েছিলেন, আবার সংশোধন করে তা পেশ করা হবে। আপনার মাধ্যমে আমার সদস্য ভাইদেরকে ধন্যবাদ দিচ্ছি এবং আপনাকেও ধন্যবাদ দিচ্ছি। তারপর এসেম্বলি কর্মচারীরাও রাতদিন পরিশ্রম করে এতো তাড়াতাড়ি যে এই বন্দোবস্ত করতে পেরেছেন, সেই জন্যে তাদরেকেও ধন্যবাদ জানাচ্ছি। কারণ, আমি জানি তারা মাত্র কয়েক দিনের নোটিশে খুব পরিশ্রম করে এই বন্দোবস্ত করতে পেরেছেন। তারপর আমি ধন্যবাদ জানাই এই রিপোটারদেরকে, এখানে যারা কাজ করছেন। তারা যেন পরিস্কার, সুন্দর করে রির্পোট তৈরী করেন, তাতে ভুল ভ্রান্তি যেন না হয়, কারণ এটা একটা ইতিহাস হয়ে থাকবে। এই ইতিহাস যেন নষ্ট না হয়। এই কথা বলে আমার বক্তব্য শেষ করছি।

জনাব স্পীকার ঃ এই হাউসের সামনে যে প্রস্তাব ছিল তা সংশোধনের পরে যে আকারের হয়েছে, আমি তা পড়ে শুনাচ্ছি। সংশোধিত প্রস্তাব হচ্ছে।

“বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ঐতিহাসিক স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলাদেশের যে বিপ্লবী জনতা, কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, যুবক, বুদ্ধিজীবী, বীরঙ্গণা, প্রতিরক্ষা বিভাগের বাঙ্গালীরা, সাবেক ই পি আর পুলিশ আনসার মুজাহিদ ও রাজনৈতিক নেতা ও কর্মী বীর মুক্তিযোদ্ধারা নিজেদের রক্ত দিয়ে আমাদের স্বাধীনতা অর্জন করেছেন। আজকের দিনে বাংলাদেশের জনগণের ভোটে যথাযথভাবে নির্বাচিত বাংলাদেশ গণপরিষদ স্বশ্রদ্ধচিত্তে তাদের স্মরণ করছে।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার যে ঘোষণা করেছিলেন এবং যে ঘোষণা মুজিব নগর থেকে ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিলে স্বীকৃতি ও সমর্থিত একই সাথে এই গণপরিষদ তাতে একাত্মতা প্রকাশ করছে।

স্বাধীনতার সনদের মাধ্যমে যে গণপরিষদ গঠিত হয়েছিল আজ সে সনদের সাথেও এ পরিষদ একাত্মতা ঘোষণা করছে।

এক্ষণে এই পরিষদ বাংলাদেশের সাড়ে ৭ কোটি মানুষের আশা আকাঙ্খার সেই সব মূর্ত আদর্শ, যথা জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা, যা শহীদান ও বীরদের স্বাধীনতা সংগ্রামে আত্মত্যাগে উদ্ধুদ্ধ করেছিল, তার ভিত্তিতে দেশের জন্যে একটি উপযুক্ত সংবিধান প্রণয়নের দায়িত্ব গ্রহণ করেছে।

এই প্রস্তাবের পক্ষে যারা আছেন, তারা হ্যাঁ বলবেন।

সদস্যগণঃ (সমন্বয়ে) হ্যাঁ । না কেহই বলেন না।

জনাব স্পীকার ঃ এই প্রস্তাব গৃহীত হলো।

 

[সূত্র ঃ বাঙ্গালির কণ্ঠ, বঙ্গবন্ধু পরিষদ থেকে প্রকাশিত, পৃষ্ঠা ঃ ২৯০]

Read Previous

১৯৭২ সালের ৯ এপ্রিল ছাত্র ইউনিয়নের ত্রয়োদশ কাউন্সিলে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ

Read Next

১৯৭২ সালের ১১ এপ্রিল গণপরিষদে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ