Breaking News :

১৯৭২ সালের ২৮ জুন সিলেটের বন্যাদূর্গত এলাকায় বঙ্গবন্ধুর ভাষণ

ভাইয়েরা ও বোনেরা, জেল থেকে বের হয়ে আসার পরে আপনাদের কাছে আমি আসতে পারি নাই। কেন আসতে পারি নাই, তা আপনারা জানেন। এক মূহুর্তও সময় পাই নাই। দেশের অবস্থা আপনারা ভাল করে জানেন। পাকিস্তানের বর্বর সামরিক বাহিনী আমার বাংলাদেশকে খতম করে দিয়ে গেছে। ত্রিশ লক্ষ লোককে হত্যা করেছে, লক্ষ লক্ষ ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়ে গেছে। লক্ষ বললে ভুল হবে, কোটি কোটি ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়ে গেছে। এক কোটি লোক দেশের মায়া ত্যাগ করে জীবনের মায়ায় ভারতবর্ষে আশ্রয় নিয়েছিল। আর যারা ছিলেন, তারা অনেক কষ্টে দিন যাপন করেছে। দুই লক্ষ মা-বোনের উপর অত্যাচা করা হয়েছে। রেল লাইন, রাস্তা, লঞ্চ, ট্রাক, বাস, পোর্ট শতকরা পঞ্চাশ ষাট ভাগ ধ্বংস করে দিয়ে গেছে। এত বড় পাষন্ড দুনিয়ার ইতিহাসে দেখা যায় নাই, যা পাকিস্তানের বর্বর সেনাবাহিনীরা করেছে আমার দেশে। সেদিন যদি ভারত বর্ষ এবং তার প্রধানমন্ত্রী মিসেস গান্ধী বাংলাদেশকে সহায়তা না করতো চিরদিনের মতো বাংলাদেশের মানুষের কি হতো সে কথা চিন্তা করলে শিহরীয় উঠতে হয়। আমার এক কোটি লোকরে খাবার দিয়েছে। আমার ছেলেকে সাহায্য করেছে। আমার সামরিক বাহিনীর লোকরা, আমার পুলিশ, আমার বিডিআর, আমার ছাত্র, আমার যুবক, আমার বুদ্ধিজীবী, আমার কৃষক, আমার শ্রমিক ভাইয়েরা অস্ত্র তুলে ধরেছিল। আমি বলে গিয়েছিলাম-সাতই মার্চ তারিখে আমি বলে গিয়েছিলাম, “এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম”। আমি জানতাম জীবনেও মনে হয় আমি আর আপনাদের কাছে ফিরে আসতে পারব না, যখন আমাকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যায়। কিন্তু ফিরে এসেছি। আপনারা দোয়া করেছেন। আপনারা রক্ত দিয়েছেন। আজ বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। ধ্বংসস্তুপের মতো একটা দেশ পেয়েছি। মানুষের ঘরে খাবার নাই। মানুষের গায়ে কাপড় নাই। স্কুল-কলেজ ধ্বংস করে দিয়ে গেছে। মালপত্র ধ্বংস করে দিয়ে গেছে। কি করে আমি এ দেশকে বাঁচাবো? আমি চিন্তা করলে শিহরীয়া উঠি। তারপরে প্রাকৃতিক দূর্যোগ। আজ আমরা কোন মতে দুনিয়া থেকে ভিক্ষা করে চাল এনেছি। একমাত্র ভারতবর্ষ আমাকে সাড়ে সাত লক্ষ টন খাদ্য দিয়েছেন। আর অন্যান্য দেশ রাশিয়া, আমার বহু রাষ্ট্র ইউএসএ, কানাডা, অষ্ট্রেলিয়া আমাকে খাবার দিয়েছেন, আমি আনছি। আমার পোর্ট নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। আমার জাহাজ নাই। আমাকে বিদেশ থেকে মাল আনতে হবে। এছাড়াও আপনারা জানেন যে, লোকের দুঃখ, আমি লোকের জন্য সংগ্রাম করেছি। এই ২৪ বৎসর এই দেশ পাকিস্তানীদের কলোনী হয়েছিল।

কি দিব আমি আপনাদের। বলেন? কি দেবার পারব? আছে কি? খাজনা? এাপ করে দিয়েছি। ২৫ বিঘা জমির খাজনা? মাপ হয়ে গেছে। গরীব কর্মচারীদের ২৫ টাকা হারে বেতন বাড়ায়া দেয়া হয়েছে। গ্রামে গ্রামে কিছু কিছু খাবার এবং রিলিফ এবং এতিমের টাকা আমি পৌঁছাইয়া দিয়েছি। আপনাদের কিছু দিবার পারি নাই। আমি মিথ্যা কথা বলতে পারি নাই। আমি ধোকা কারো দেই না। ওটা আমার অভ্যাস নাই। আর প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রী হবার জন্য আমি রাজনীতি করি নাই। আমি রাজনীতি করেছিলাম আমি আমার সাড়ে সাত কোটি মানুষের মুক্তির জন্য। এখন আমার রাজনৈতিক মুক্তি হয়েছে, এখন আমার অর্থনৈতিক মুক্তি প্রয়োজন। এটা না হলে স্বাধীনতা বৃথা হয়ে যাবে। বাংলার মানুষ যদি পেটভরে ভাত না খায়, যদি বাংলার মানুষ সুখে বাস না করে। বাংলার মানুষ যদি অবিচার-অত্যাচারের হাত থেকে না বাঁচতে পারে-এই স্বাধীনতা বৃথা হয়ে যাবে। সেজন্য আপনাদের কাছে আমার অনুরোধ, যে যেখানে আছেন, যে যে কাজে আত্মনিয়োগ করেন- আমি দেখে এলাম, সিলেটে গিয়েছিলাম, সুনামগঞ্জে আসলাম, আরো কয়েক জায়গায় যাব, বন্যায় সিলেটের সর্বনাশ হয়ে গেছে। একেতো আমাদের পাকিস্তানের বর্বরা শেষ করে দিয়ে গেছে। তারপরে আবার বন্যায় যা কিছু ছিল শেষ করে দিয়ে গেছে। কি করব বলেন? তবে এইটুকু আপনাদের বলতে পারি, বাংলাদেশে যা কিছু আছে শুধু গরীবের জন্য। ব্যয় হবে কোন শোষকের পেটে যাবে না-এতটুকু বলতে পারি এবং যা আছে রিলিফের জন্য আপনারা চিন্তা করবেন না। যেখান থেকে হয় ইন্শাল্লাহ পেটভরে দিবার পারব না, যতদূর পারি কিছু কিছু পৌঁছাবার চেষ্টা করা হবে। তবে কত পার-আমি তা বলতে পারি না। কারণ আমার ব্যাংকে সেই পয়সা নাই যে আপনাদের কাছে ওয়াদা করতে পারি। কারণ ওয়াদা করে আমি বরখেলাফ করি নাই। ওয়াদা আমি করতে পারি না। তাই আপনাদের কাছে আমার অনুরোধ রইল আপনাদের একটা কাজ করতে হবে। আমি জানি আপনাদের বাড়ি ঘর নাই। আপানদের খাবার নাই। আপনারা কষ্ট করে এর মধ্যেও আসছেন। আপনাদের ধন্যবাদ দিচ্ছি।

বন্যা নিয়ন্ত্রণ করতে বড় সময় লাগবে। পয়সা নাই, টাকা নাই, এখন শুধু আমি মানুষকে বাঁচাবার চেষ্টা করতাছি। যেন দু’বেলা ভাত কোন মতে খেতে পায় কিনা? খাজনা মাফ করে দিয়েছি, লবণ কর মাফ করে দিয়েছি, ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনাসহ মাফ করে দিয়েছি। টাকা আমি কোথায় পাব? কোত্থেকে আসবে? হ্যাঁ বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য পয়সা প্রয়োজন হবে। আপনারা কার্ড….। আমি প্রত্যেকটি গ্রামে গ্রামে টাকা দিয়েছি বিলাইয়া দিচ্ছি। বন্যা নিয়ন্ত্রণের প্ল্যান করা হচ্ছে। আমার বন্ধু ওসমানী সাহেব, জেনারেল ওসমানী এখানে আছেন। আমার ফরেন মিনিষ্টার আব্দুস সামাদ আজাদ সাহেব আছেন। এরা জানে, এরা আমার সহকর্মী। ২৪ ঘন্টা আমার সঙ্গে আছে। একই হারে প্রত্যেকটা লোকের ১৬ ঘন্টা ১৮ ঘন্টা কার করতে হয়। কারণ কোথা থেকে জোগার করব চিন্তা করতে হয়। বন্যার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে নিশ্চয়ই। না করলে বাংলাদেশ বাঁচবে না। সুষ্ঠ প্ল্যান করে বন্যা নিয়ন্ত্রণে হাত দিতে হবে। সরকারী কর্মচারী, আওয়ামী কর্মচারী, ছাত্র ভাইয়েরা সবাইকে অনুরোধ করছি আপনারা গ্রামে গ্রামে দুঃখী মানুষের পাশে দাঁড়ান। চিন্তা কইরেন না, খাবার কিছু পৌঁছাইয়া যেভাবেই হয় দেয়া হবে। সুষ্ঠুভাবে যেন বন্টন হয়-সেদিকে খেয়াল রাখবেন। আমি ৪০ লাখ টাকা ঘোষণা করিয়া দিলাম। দরকার হয় আরো দেয়া হবে কিছু দুঃখী মানুষের মুখে যেন হাসি ফুটে, তাই আপনাদের কাছে আমার অনুরোধ। তাই আরো দরকার হয়, খাবার আপনাকে কম দিয়েছে, দরকার হয় আরো পৌঁছাইয়া দেয়া হবে। কিন্তু দেখেন যেন সুষ্ঠুভাবে বন্টন হয়। যাতে গরীব দুঃখী পায়। সেদিকে খেয়াল রাখবেন।

শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনো। বাবা মারে ইজ্জত করতে শিখো। শিক্ষকের ইজ্জত করতে শিখো। আমার মনে হয় তোমাদের মধ্য থেকে এ জিনিসটা দূর হয়ে গেছে, কোন দিন মানুষ হতে পারবানা। আমার নামের সাথে বিপ্লবী মুজিবুর রহমান বলা হতো কিন্তু আমি বেয়াদব ছিলাম না। যুবকদের ছাত্রদের অনুরোধ করি যে, মেহেরবানী করে স্লোগানটা একটু কম দিয়ে পড়ালেখা কর, আর বাবার পয়সা নষ্ট বেশী কইরনা। আর তোমাদের কাজ হচ্ছে দেশের মধ্যে কারা কারা দূর্ণীতি করে সেদিকে খেয়াল রাখা। দেশের কাজ কর। বড় বড় বক্তৃতা বাদ দাও। যখন কিছু করতে হবে আমি জান আগেও দিচ্ছি ভবিষ্যতের দিব-তোমাদের চিন্তা করতে হবে না। আর মেহেরবানী করিয়া একটা কথা অনুরোধ করব সকলকে, ভিক্ষা করে দুনিয়া থেকে যা আনি, যাতে গরীব পায়। দূর্ণীতি যেন হয়ে টাকার কুমিড়ে যেন না খেয়ে ফেলে দেয়, সেদিকে আপনাদের খবর রাখতে হবে। গরীবের জন্য কষ্ট করে আনা হয়, মধ্য থেকে চুরি করে যেন না খাওয়া হয়। এবার বেশী সুবিধা হবে না কারণ একটু সময় লাগতাছে আমাদের-কেমন করে বদমাইশ, গুন্ডা, লুইচ্ছা, চোর দমন করতে হয়-বাংলার জনগণকে আমি অনুরোধ করছি যেমন তোমরা সামরিক বাহিনী পাকিস্তানীদের সেই দস্যুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলা, এখন তোমাদের করতে হবে অত্যাচারের বিরুদ্ধে, অবিচারের বিরুদ্ধে, জুলুমের বিরুদ্ধে, শোষণের বিরুদ্ধে এবং তা যদি করতে হয় তাহলে যাতে ঘুষখোর, বদমাইশ, গুন্ডা, লুইচ্ছা-তাদের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ হতে হবে। দেশের জনগণকে সংঘবদ্ধ হতে হবে। দেশের জনগণ সংঘবদ্ধ হলে পুলিশ, সরকারি কর্মচারী এবং সকলেই সাহায্য করবে।

Read Previous

১৯৭২ সালের ৭ জুন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ

Read Next

১৯৭২ সালে ১৮ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্ট উদ্বোধনকালে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ