• ২২/১০/২০২০

Breaking News :

১৯৭২ সালের ৯ এপ্রিল ঢাকায় আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে সভাপতি হিসেবে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ

আমার প্রিয় ভাই ও বোনেরা,

সভা শুরু করার পূর্বে আওয়ামী লীগের এই কাউন্সিল সভায় আমরা প্রস্তাব করতেছি, যে সমস্ত ভাইয়েরা স্বাধীনতা সংগ্রামে এবং যুদ্ধের পরে আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীসহ বাংলাদেশের যেসব কৃষক যে সব বুদ্ধিজীবী, পুলিশ, বিডিআর, সেনা বাহিনীর লোকেরা যারা শহীদ হয়েছেন, প্রথমে আমরা তাঁদের জন্য প্রস্তাব করছি এবং শোকসংসপ্ত পরিবারের জন্য শোক প্রস্তাব করছি এবং আপনারা তাদের আত্মার মাগফেরাৎ কামনা করে আমরা মোনাজাত করছি।

(মোনাজাত)

দেশবাসী ভাই ও বোনেরা, উপস্থিত অতিথিবৃন্দ আপনারা আমার আন্তরিক অভিনন্দন গ্রহণ করেন। গত কাউন্সিল সভায় আপনারা যোগদান করেছিলেন। সেবারে আমরা যে প্রস্তাব গ্রহণ করেছিলাম এবং যে প্রস্তাব দিয়েছিলাম। তা কার্যকর করতে আওয়ামী লীগ চেষ্টা করেছে। আওয়ামী লীগের আমার বড় ভাই এবং সহকর্মী যাদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল, যাদের সঙ্গে আমরা দীর্ঘ ২৩/২৪ বৎসর কাজ করেছি, সে অনেক কর্মী এবং অনেক নেতা আজ আমাদের মধ্যে নাই, তারা শহীদ হয়েছেন। শহীদ হয়েছেন বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ মুক্তিযোদ্ধারা, সরকারী কর্মচারীরা, সৈনিক বাহিনীর ভাইয়েরা, পুলিশ বাহিনীর ভাইয়েরা, শ্রমিক ভাইয়েরা, ছাত্র ভাইয়েরা, বিশেষ করে যাকে আমরা বিডিআর বলি, বাংলাদেশ রাইফেলসের কর্মীরা। ওদের ফিরে পাবনা। ওরা আর পৃথিবীর বুকে ফিরে আসবে না। ওদের ডাক দিয়েছিলাম সংগ্রাম করার জন্য, দেশকে মুক্ত করার জন্য, ওরা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ইতিহাস বেশী আমি তর্জ্জমা করতে চাইনা তবে কিছুটা ইতিহাসের প্রয়োজন আছে। হঠাৎ স্বাধীনতার সংগ্রাম শুরু হয় নাই। স্বাধীনতার শুরু হয়েছে অনেকদিন পূর্বে এবং সকল সময়ে সকল কথা বলা যায় না। আন্দোলনের মধ্যে থেকেই বুঝে নিতে হয়। এটা আপনারা জানেন এবং বুঝেন। সহকর্মীরা জানতেন এবং বুঝতেন। আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত হবার পর থেকে তাদের জীবন বাজী রেখে নৌকা চালাতে হয়েছে। কোনদিন তারা ভাটিতে নৌকা চালাতে পারেন নাই- কয়েক মাস ছাড়া। আওয়ামী লীগের কর্মীদের ত্যাগ তীতিক্ষার স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। এই জন্য এখন লেকা থাকবে যে আজ বাংলাদেশ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। লেখা থাকবে হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ পুলিশ বাহিনীর ইতিহাস। যারা শহীদ হয়েছে স্বাধীনতার জন্য। কর্তব্য রয়েছে দেশবাসীর, কর্তব্য রয়েছে আওয়ামী লীগ কর্মীদের। স্বাধীনতা পাওয়া যেমন কষ্টকর, স্বাধীনতা রক্ষা করা তেমনি কষ্টকর। স্বাধীনতা, রাজনৈতিক স্বাধীনতা পাওয়া যেতে পারে, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা না হলে রাজনীতি ব্যর্থ হয়ে যায়। ইতিহাস, ছয় দফার পিছনেও ইতিহাস ছিল। আওয়ামী লীগ জন্মের পর থেকে স্বায়ত্ত্বশাসনের ইতিহাস-সে ইতিহাসের পিছনেও অনেকটা ইতিহাস ছিল। এ কথা সত্য যে শুধু শহীদ এই সংগ্রামেই হয়েছে তা নয়। বাংলার মানুষ বার বার শহীদ হয়েছে। ১৯৫২ সালে শহীদ হয়েছে বাংলার ছেলেরা, ১৯৫৪ সালে হাজার হাজার কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছিল এবং অনেকে মৃত্যুবরণ করেছিলেন ও শহীদ হয়েছিলেন। ১৯৫৮ সালে মার্শাল ল জারি হওয়ার পরেও আওয়ামী লীগের অন্যান্য দল ব্যান্ড হওয়ার পরেও সেখানে অনেকের জান দিতে হয়েছিল। ১৯৬২ সালে সোহরাওয়ার্দী সাহেব গ্রেফতার হওয়ার পরেও অনেকের জান দিতে হয়েছিল এবং অনেকে জেল খেটেছিল। ১৯৬৬ সালে ৬ দফা আন্দোলনের ফলে ১৭ই জুন তারিখে আমার ছেলেরা জীবন দিয়েছিল। ১৯৬৯ সালে ১১ দফার আন্দোলনে ছাত্ররা যে আন্দোলন শুরু করে, আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দেরা সেখানে গিয়ে তাদের সহযোগিতা করে আন্দোলন চালিয়ে যায়, তখন অনেকে শহীদ হয়েছিলেন। বাংলার ইতিহাস শুধু যে রক্তের ইতিহাস তা নয়, বাংলার ইতিহাস শুধু যে নির্যাতনের ইতিহাস তা নয়। বাংলার ইতিহাস শুধু যে আন্দোলনের একবারেই আমরা সংগ্রাম করেছি তা নয়, এ সংগ্রাম শুরু হয়েছে অনেক দিন আগে থেকেই। শুধু জনগণের খালি আওয়ামী লীগের সংগ্রাম হলেই চলবে না, সঙ্গে সঙ্গে এটা জনগণেরও সরকার, সাড়ে সাত কোটি মানুষ-মানুষেরও সরকার। এটা সম্পর্কে পরিস্কার থাকা দরকার। আপনাদের কাজ করতে হবে। বিরোধী দলে থাকা এক রকমের পন্থা। আর সরকারী পক্ষে রাজনীতি করাও অন্য রকম পন্থা এবং সেখানে গঠনমূলক কাজ দিয়ে মূলত এগিয়ে যেতে হবে। অত্যাচার-অবিচার যেন না হয়। জুলুম যেন না হয়। লুটতরাজ যেন না হয়। দেশের মানুষকে ভালবেসে মন জয় করতে হবে। তোমাদের কাছে আমার নির্দেশ, তোমাদের কাছে আমার আবেদন, তোমাদের প্রতিজ্ঞা করতে হবে যে, আমাদের কাছে রাতের আরাম দিনের উত্তাপ হারাম, আমাদের দুঃখী মানুষের সেবায় উৎসর্গ করতে হবে।

ভাইয়েরা আমার, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যেতে চাইলে অনেক বার যেতে পারত। ক্ষমতার জন্য আওয়ামী লীগ জন্মগ্রহণ করে নাই। বাংলাদেশে শোষণহীন সমাজ গঠন করার জন্যই আওয়ামী লীগের জন্ম হয়েছে। শোষণহীন সমাজ গড়ে তুলুন। আমাদের নীতি বিপরীত। নীতির সঙ্গে আপোষ হয় না। সেই জন্য জীবনে নীতির সঙ্গে আপোষ করতে পারি না। দরকার হলে দলের লোকজন যদি বেঈমানী করে তার সঙ্গেও আমি আপোষ করতে রাজী নই। নিয়মের উর্ধ্বে উঠতে হবে। নিয়ম যেখানে ধ্বংস সেখানে একবার যদি কেউ নীল হয়ে যান, সে জীবন কোন দিন আর মাথা উঁচু করে দাড়াতে পারবেন না। শুধু আপনার মুখে কালী দেবেন, কালী দেবেন এই দেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের মুখে। যেই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সাড়ে সাত কোটি মানুষ স্বাধীন হয়েছে। সে আওয়ামী লীগের মুখ কালি হয়ে যাবে। দেশের মানুষের মুখ কালি হয়ে যাবে। আওয়ামী লীগ কর্মীদের দায়িত্ব যথেষ্ট রয়েছে। এই দায়িত্ব থেকে তারা রেহাই পেতে পারেন না।

আমরা শৃঙ্খলা রাখতে চাই, আমরা গণতন্ত্র কায়েম করতে চাই। কিন্তু গণতন্ত্র মানে উশৃঙ্খলতা নয়। গণতন্ত্র মানে সেখানে গোপনে পোস্টার দিয়ে ষড়যন্ত্র নয় এবং আমাদের বন্ধুত্ব নষ্ট করার ষড়যন্ত্র করছে সেটাও নয়। সেখানে সরকারের একটু শক্ত হতে হবে এবং শক্ত হবে, ভাল হইতে হবে সন্দেহ নাই এবং সেটাও আমরা করতে চাই না। জনগণই করবে সে বিশ্বাস আমার আছে। আর জনগণকে আমি চিনি, জনগণ আমাকে চিনে। জনগণ আমাদের ভালবাসে, আমরা জনগণকে ভালবাসি। আমাদের পররাষ্ট্রনীতি, আমাদের বৈদেশিক নীতি পরিস্কার। আওয়ামী লীগের বৈদেশিক নীতি পরিস্কার এবং তা মেনে চলে। নিরপেক্ষ ইনডিপেনডেন্ট ফরেন পলিসি। আমাদের ফরেন পলিসি, বৈদেশিক নীতি পরিস্কার। আমরা কোন যুদ্ধে সংঘাতে বিভ্রান্ত হতে চাই না এবং কবর না। আমরা সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে বাস করতে চাই, আমরা সহাবস্থানে বিশ্বাস করি। আমরা সামাজ্যবাদ, আমরা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে। আমরা দুনিয়ার দুঃখী মানুষ যেখানে সংগ্রাম করবে, তার পক্ষে বাংলাদেশ দাঁড়াবে। কারণ আমরা দুঃখী, আমরা কষ্ট সহ্য করেছি। আমরা রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্যে স্বাধীনতা নিয়েছি। আমরা যেখানে দুনিয়ার সকল মজলুম মানুষ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করবে। আমরা তার পাশে গিয়ে দাড়াব।

(অসমাপ্ত)

Read Previous

১৯৭২ সালের ৫ এপ্রিল তারিখে বাংলাদেশ বেতারে দেশ আমার মাটি আমার অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু র বক্তৃতা

Read Next

১৯৭২ সালের ৯ এপ্রিল ছাত্র ইউনিয়নের ত্রয়োদশ কাউন্সিলে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ