Breaking News :

১৯৭২ সালে ১৮ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্ট উদ্বোধনকালে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ

মাননীয় প্রধান বিচারপতি, মাননীয় বিচারপতিগণ, সুধীবৃন্দ, বারের সদস্যবৃন্দ, উপস্থিত ভদ্রমন্ডলী ও ভদ্রমহিলাগণ, মহিলা আছেন তাই বলতে হলো, আপানারা আমাকে সুযোগ দিয়েছেন আপনাদের সঙ্গে দেখা করার। আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। আপনাদের সঙ্গে মিশা  সৌভাগ্য আমার হয়েছে। আমার অনেক বাল্যকালের সহকর্মী এখানে আছেন, যাদের সঙ্গে রাজনীতি করেছি, পড়েছি, খেলেছি, তারা অনেকেই উপস্থিত আছেন।

আজ সত্যিই আনন্দ প্রকাশ করতে হয় এজন্য যে, স্বাধীন বাংলার মাটিতে আজ আমাদের স্বাধীন সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। স্বাধীন জাতি হিসাবে যদি স্বাধীন সুপ্রিমকোর্ট না থাকে তাহলে সে জাতি পরিপূর্ণতা লাভ করতে পারে না। আমাকে স্মরণ করতে হয় আপনাদের এই বারের অনেক সদস্য- যারা জালেম পাকিস্তানের সৈন্য বাহিনীর কাছে শহীদ হয়েছেন। আপনাদের অনেক সহকর্মী, মরহুম মশিউর রহমান, মরহুম আমিনউদ্দিন, আরো অনেকে শহীদ হয়েছেন। অনেক বারের সদস্য তাদের কালো কোর্ট ত্যাগ করে গেরিলা ট্রেনিং নিয়ে অস্ত্র বাংলার মধ্যে ঢুকেছিল যুদ্ধ করার জন্য-বর্বর বাহিনীর বিরুদ্ধে।

আপনাদের অনেকেই আজ বেঁচে নেই। আমি জানি, তারা অনেকেই আমার সহকর্মী, তাদের কথা স্মরণ না করলে অন্যায় করা হবে। আজ এই শুভদিনে স্মরণ করতে হবে, লক্ষ লক্ষ মানুষ, লক্ষ লক্ষ কৃষক ভাই, যারা শহীদ হয়েছেন এদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামে, যারা জীবন দিয়েছে, যারা পঙ্গু হয়ে ঘরে আছে, তাদের কথা স্মরণ করতে হয়। যদি তাদের কথা আমরা ভুলে যাই, তাহলে স্বাধীনতা মিথ্যা হয়ে যাবে। যাদের ত্যাগের বিনিময়ে আজ আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। যাদের ত্যাগের বিনিময়ে আমরা আমাদের জাতীয় পতাকা উঠাতে পেরেছি। যাদের ত্যাগের বিনিময়ে আজ আমাদের সুপ্রিমকোর্ট, আজ আমাদের দেশে আইনের শাষণ হতে চলেছে, তাদের আমাদের স্মরণ করা প্রয়োজন।

আমি নিশ্চই সুখী হতাম, যেমন আমি পি.জি হসপিটালে গিয়ে দেখি যে, এত জন ডাঃ এর নাম, যারা শহীদ হয়েছে। তাদের নাম লেখে ফলক করে রাখা হয়েছে। আমি সুখি হতাম বারের সদস্য ভাইয়েরা-যে যে সহকর্মীরা, যারা শহীদ হয়েছেন। এই সুপ্রিম কোর্টের গেটে এসে দেখতে পেতাম যে শহীদের নাম সেখানে লেখা রয়েছে, আমি সুখি হতাম। বেয়াদবী মাফ করবেন, আপনাদের আমি অভিযোগ করছি না। আজ, জনাব আমাদের মাননীয় বিচারপতি তার কথা তুলেছেন, বারের প্রেসিডেন্ট আমাদের এটর্নি জেনারেল, আইনের শাসনে আমরা বিশ্বাস করি এবং আইনের শাষণ প্রতিষ্ঠিত করার জন্যই অনেক আমরা সংগ্রাম করেছি এবং এই আইনের শাষণ প্রতিষ্ঠিত করার জন্য অনেক মানুষের রক্ত দিতে হয়েছে। বাংলাদেশে আইনের শাসনই প্রতিষ্ঠিত হবে। সেজন্যই শাসনতন্ত্র এত তারাতারি দেয়েছিলাম। যদি ক্ষমতায় থাকার ইচ্ছা, যদি রাজনীতি করতাম আপনারা নিশ্চই আমার পাশে যারা বসে আছেন জানেন যে, তালে তাল মিলিয়ে গালে গাল মিলিয়ে বহুকাল ক্ষমতায় থাকতে পারতাম। কিন্তু ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করি নাই, রাজনীতি করেছিলাম মানুষের মুক্তির জন্য। সে মানুষের মুক্তি মিথ্যা হয়ে যাবে, যদি মানুষ তা শাসনতন্ত্র না পায়। আইনের শাসন না পায়। দেশের অবস্থা আপনারা ভালো করে জানতেন জানেন, আপনারা বুদ্ধিজীবি মানুষ, আপনারা লেখা-পড়া করেন। আপনারা আইন নিয়া আলোচনা করেন। দেশের সমস্যা আপনাদের সামনে আসে। দেশের অবস্থা আপনারা ভালো করে জানেন।

অনেকেই আপনারা এখানে ছিলেন। অনেকেই রাত্রে ঘুমাতে পারেন নাই, রাত্রে ইয়ানাফসি ইয়ানাফসি করে আপনাদের দিন কাটাতে হয়েছে। অনেকের দেশ ত্যাগ করে মাতৃভূমি ত্যাগ করে চলে যেতে হয়েছিল। অনেকেই আত্ম গোপন করেছিলেন। আপনারা জানেন যে কি পৈচাশিক তান্ডবলিলা আমার বাংলাদেশের মাটিতে হয়েছে। পুরা অর্থনীতি ভেঙ্গে চুরমার করা হয়েছে। স্বসশ্র বাহিনীকে ধ্বংস করা হয়েছে, পুলিশ বাহিনী, বিডিআরকে ধ্বংস করা হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্যকে নষ্ট করা হয়েছে। কোর্টও সব ধ্বংস করা হয়েছে। একটা ভস্মিভূত দেশের উপরে দেশ স্বাধীন হয়েছে। তারপরেও যাতে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় সেই দিক দিয়ে আমরা নজর দেবার চেষ্টা করেছি, যাতে আপনাদের অসুবিধা না হয়।

আপনারা নিশ্চই আল্লার কাছে শুকর করবেন, যে বেতন আপনারা পান, কোর্টে আপনারা আসেন, গাড়ি আপনার চড়েন, পেট্রোল আপনারা পান, রাত্রে ঘুমাতে পারেন, আপনাদের শুকর করা প্রয়োজন। কারণ কি ছিলো আপনাদের, আপানারা ভালো করে জানেন? কি দিয়ে এই দেশ শাসনভার গ্রহণ করেছি সে অবস্থা আপনারা ভালো করে জানেন। আমি এই বিষয়ে আলোচনা করতে আপনাদের কাছে চাই না। কিন্তু আমরা চাই যে, আইনের শাসন হউক। বহুদিন আমরা দাবি করেছি যে, আজকে শাসনতন্ত্র হয়ে গেছে। শাসনতন্ত্র পরিপূর্ণতা লাভ করতে পারে আমরা কিভাবে কাজ করি তার উপর নির্ভর করে।

কাগজে অনেক ভালো ভালো কথা লেখা থাকে। দুনিয়ার কোন শাসনতন্ত্রেই খারাপ কথা লেখা নাই। কিন্তু সেটা যদি আমরা মনে প্রাণে বিশ্বাস করে কাজ করে এগিয়ে না যাই তাহলে দেশের মধ্যে বিশৃংখলা সৃষ্টি হয়। আমাদের শাসনতন্ত্র আমাদের আদর্শ আছে। যে আদর্শের উপর ভিত্তি করে এই রাষ্ট্র পরিচালিত হবে। যেমন চারটা স্তম্ভের উপরে এই দেশের, আমরা তাকে ফান্ডামেন্টাল রাষ্ট্র আদর্শ আমরা বলি। চারটা রাষ্ট্রীয় আদর্শের উপর ভিত্তি করে এই দেশ চলবে। এইটাই হইল মূল কথা। এইটাকেই যদি ধ্বংস করতে কেউ না পারে, যেমন এক্সিকিউটিভ, যেমন আইনসভা তেমনি আপনাদের সুপ্রিম কোর্টেরও অধিকার রয়েছে যাতে এর উপরে কেউ হস্তক্ষেপ করতে না পারে। আপনারা যখন বলেন, আমরাও তখন বলেছি এবং আমরা এটা বিশ্বাস করি যে, জুডিশিয়ারি সেপারেট হবে এক্সিকিউটিভ থেকে। অনেকে বলেন, কমপ্লিট সেপারেশন। কোন রাষ্ট্রে কোনকিছুই কমপ্লিট সেপারেশন হয় না। একই সঙ্গে একটা অন্যটার সাথে অঙ্গাঅঙ্গীভাবে জড়িত। একই রাষ্ট্রের কাঠামোর মধ্যে যে অরগান গুলি থাকে যেমন জুডিসিয়ারি একটি অরগান, যেমন এক্সিকিউটিভ একটি অরগান। এরমধ্যে যদি কোপারেশন না থাকে, তাহলে সেদেশের মধ্যে কেওয়াজ সৃষ্টি হওয়ায়, যে কেওয়াজের ফলে শেষ পর্যন্ত ১৯৫৮ সালের পর থেকে আপনাদের যে দশা হয়েছিল সে দশাই হবে। একটার সঙ্গে অন্যটা অঙ্গাঅঙ্গীভাবে জড়িত। কিন্তু যার যার যেখানে ক্ষমতা রয়েছে সেটাকে নিশ্চই প্রতিপালন করবেন।

আমরা আইনের শাসনে বিশ্বাস করি। আপনারা আইনের শাসন পরিচালনা করবেন। আইনের মধ্যে যদি গোলমাল হয়, সেখানে আপনাদের সংশোধন করার ক্ষমতা রয়েছে। মনে করেন তাতে পরিপূর্ণতা হচ্ছে না। আপনাদের ক্ষমতা রয়েছে নতুন আইন পাশ করা। এমন আইন পাশ করা উচিত হবে না দেশের মধ্যে রেশারেশি সৃষ্টি হয়।

সেজন্য আইনের শাসন করতে হলে, দেশের যে আমাদের শাসনতন্ত্রের মধ্যে যে মৌলিক জিনিস রয়েছে সেটাকে মেনে নিয়েই করতে হবে বলেই বিশ্বাস করি। আমি আইনজীবি নই, আপনারা আইনজীবি আপনারা ভালো বুঝেন, আপনারা বুদ্ধিজীবি, আপনারা ভালো বুঝেন। আমি আইনজীবি কোন দিন হতে পারি নাই, তবে আসামী হওয়ার সৌভাগ্য আমার যথেষ্ট হয়েছে জীবনে। আপনাদের কাছে সেটি আমার অনুরোধ থাকবে দেশের শাসনতন্ত্রকে যাতে উপযুক্ত ব্যবহার করা হয়, সেদিকে আপনারা নজর রাখবেন। কারণ সে ক্ষমতা শাসনতন্ত্রে আপনাদের দেওয়া হয়েছে। যে আইন শাসনতন্ত্রের নাকচ করার অধিকার আপনাদের রয়েছে। কিন্তু অনেক সময় বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়ে যায়। সেদিকে আমাদের খেয়াল রাখা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। আমি আপনাদের এ্যাডভাইজ দিতে চাইনা, আপনারা এ জিনিসটা আমার চেয়ে অনেক ভাল বুঝেন, আপনারা করবেন, আপনাদের পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে। কেউ কোনদিন হস্তক্ষেপ করবে না আপনাদের অধিকারের উপরে। সে সম্বন্ধে আপনারা নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন এবং যতটা তাড়াতাড়ি হয় আমরা চেষ্টা করব যাতে জুডিশিয়ারী সেপারেটভাবে কাজ করতে পারে।

দ্বিতীয় কথা, আমাদের মাননীয় প্রধান বিচারপতি বলেছেন, যে ইংরেজী ভাষায় অনেক কিছু আমাদের চলছে। ইংরেজী ভাষা আমাদের রক্তের মধ্যে কিছু কিছু আচর করেছে সন্দেহ নাই এবং ইংরেজী ভাষা আমাদের পরিভাষার প্রয়োজন সেটাও বুঝি, কিন্তু এ পরিভাষার জন্য যদি চিন্তা করি, হয়ত বাংলা ভাষা হবে না। সে জন্যই আমরা শাসনতন্ত্রে কোন ভাষা মিডিয়া রাখি নাই, যে পাঁচ বৎসরে দশ বৎসরের মধ্যে বাংলা থেকে ইংরেজীতে পৌঁছতে হবে। আপনারা চেষ্টা করুন যেভাবে আপনাদের ভাষা আসে তার মধ্য থেকেই জাজমেন্ট লেখার চেষ্টা করুণ। এভাবেই যা শেষ পর্যন্ত ভাষায় পরিণত হয়ে যাবে। আমরা আর পরিভাষা কমিটি করার কথা চিন্তা করছি না। তাহলে জীবনে আর ভাষা হয় নাই। অনেক পরিভাষার ইতিহাস রয়েছে। মাননীয় প্রধান বিচারপতি সাহেব, বেয়াদবী মাফ করবেন। এইটা আমাদের, যা আমি দেখেছি, অনেক দেশে ঘুরেছি যারা তাদের অক্ষর পর্যন্ত নাই, তারা নিজের ভাষায় কথা বলে, নিজের ভাষায় লেখে এবং জাজমেন্ট দেয়।

অল্প কথায় লেখুন, যতটুকু পারা যায়, লেখা যায়, আমরাও চেষ্টা করতেছি, আমাদেরও অসুবিধা হয়ে যায়, আমরাও মাঝে মধ্যে অসুবিধা ফিল করি, এই যে ফিল করি বলে বললাম, হয়ে যায়, আমাদেরও হয়। কিন্তু আমরা চেষ্টা করতেছি আর কিছু না পারি যখন ইংরেজী লেইখা নিয়া আসে এইটা বাংলায় সাইন করে দেই। যে বাবা বদলায় নিয়া আসো, ঐটা আমরা করছি, তাই আমরাও আশা করব যে, আপনাদের হাইকোর্টে, সুপ্রিম কোর্টের যেখানে আপনারা লেখতে আরম্ভ করেছেন। অফিস-আদালতে বলেছি যতগুলি টাইপ রাইটিং মেশিন দরকার চেষ্টা করব আপনাদের পৌঁছাবার জন্য।

সহযোগীদের জন্য আমরা কাজ করতেছি, শিগগির কাজ শেষ করে যত তাড়াতাড়ি হয় তা আপনারা পাবেন। আপাদের অসুবিধা আছে সে আমরা বুঝি, সে অসুবিধা দূর করতে যতটা সাহায্যের প্রয়োজন, পয়সা নাই, অর্থ নাই তাহলে কোন কৃপনতা করবো না, আশ্বাস আপনাদেরকে দেবার পারি। কিন্তু কমিশন করে আর সময় নষ্ট করতে চাইনা, এ কাজটা করব।

কমিশন শুনলে মাঝে মাঝে নিজের কাছে ভয় পাই। বহু কমিশন ২৫ বছরে শুনেছি, এটার জন্য আমরা নিজের কাছে একটু আতংকগ্রস্থ হয়ে পরি। যদিও আমাকে মাঝে মাঝে করতে হয়। কমিশন করতে হয়, পে-কমিশন করতে হয় তাহলে আমিও আতংকগ্রস্থ হয়ে পরি। আর আপনাদের এখানে আসার সময় বিচারপতি সাহেব বারবার দেখিয়েছেন, বারের বিল্ডিংটা আমরা ঐটা এখনও হয় নাই। কাজ শুরু হইয়া নাকি বন্ধ হয়েছে। যাক, এটা যেন বন্ধ না হয়, চেষ্টা করে দেখব, কাজ যেন শুরু য় সেটা দেখব। শিগগিরই কাজ শুরু হয়ে যাবে। খতম কবে হবে বলতে আমি পারি না। তবে সময় একটু লাগবে, তবে শিগগিরই শুরু হবে যে সম্বন্ধে নিশ্চিত থাকেন। আমরা চাই সেটাকে ঠিক করার জন্য, যেমন ধরেন, আমাদের কাছে যখন আমরা এখানে আসার সঙ্গে সঙ্গে বারের থেকে বলল যে, আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা লাগবে বই কনিার জন্য। আমাদের কিছু ছিল না কিন্তু যেইটা চেয়েছেন, সেইটা আমরা আপনাদের দিয়া দিয়াছি। বৈদেশিক মুদ্রা দিয়া দিচ্ছি, বই কিনা নিয়া আসেন এই বারের লাইব্রেরির জন্য। বৈদেশিক মুদ্রা চেয়েছেন দেরি করি নাই। যা চেয়েছেন তাই দিয়েছি। যদি এরকম কোন জিনিসের প্রয়োজন হয়, যখন চাবেন যতটুকু আমরা পারি নিশ্চই করব। আমি একটু ওয়াদা কম করি আপনারা জানেন, কারণ বাংলাদেশের মানুষকে দাঁড়ায়ে প্রথমেই বলেছিলাম আমি তিন বৎসর আমি কিছু দিবার পারব না। যদি কিছু পারি ভালো কথা, দেবার পারবনা বলেই আমি শুরু করি। কারণ মিথ্যা ধোকা দিয়া লাভ নাই কিছু। নাই দেশের মধ্যে কিছু। যারা বড় বড় কথা বলেন ভেতরে ঢুকলে বুঝতে পারতেন, বোধ হয় পাগল হয়ে শেষ পর্যন্ত অনেকেরই যেতে হত। আপনাদের পাবনাতে যেতে হতো অনেকেরই। এ দেশের কি অবস্থা ছিল! যাই হউক, আপনারা আমার বেয়াদবী মাফ করবেন, আপনারা যে আমার সুযোগ দিয়েছেন আজ আমার স্বাধীন দেশের সুপ্রিমকোর্টে আমার যে সৌভাগ্য হয়েছে। সেজন্য আপনাদের আমি আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।

আইনের শাসন এদেশে হবে এবং আমাদের শাসনতন্ত্র যে হয়েছে, আমরা চেষ্টা করব সকলে মিলে চেষ্টা করব যাতে এটার যে আদর্শ দেয়া হয়েছে আদর্শকে রক্ষা করা এবং এখানে সুপ্রিমকোর্টের অনেক দায়িত্ব রয়েছে এবং আপনাদের যে সাহায্য সহযোগিতা প্রয়োজন, আপনারা সেটা পাবেন। আপনাদের কোন কাজে আমরা ইন্টারফেয়ার করতে চাইনা। আমরা চাই যে, দেশে আইনের শাসন কায়েম হউক। তবে একটা কথা আছে, দেশের অবস্থা আপনাদের বিবেচনা করে চলা উচিত। অনেক সময় যদি বেশি আপনারা করতে যান তবে দেশের মধ্যে আইন শৃংখলার অবস্থা খারাপ অবস্থা সৃষ্টি হয়, তবে যেমন আমিও কষ্ট ভোগ করব, আপনিও কষ্ট ভোগ করবেন, সেদিকে আপনাদের খেয়াল রাখারও প্রয়োজন আছে।

বেয়াদবী মাফ করবেন, যদি একটা গল্প আপনাকে বলি, ধরেণ আমরা একটা আসামী ধরলাম, আপনাদের ক্ষমতা আছে, পাওয়ার আছে হয়ত এটা পারবেন। কিন্তু সে ডাকাত তিনটা মার্ডার করছে, এখানে হাইজ্যাক করতেছে, গাড়ী ধরতেছে, লুট করতেছে, তাকে ধরে আনা হলে বন্ধুকসহ ধরে নিয়ে আসা হল। পরের দিন যে লোক খবর দিল, তাহলে তাকে আমরা গ্রেফতার করে আমরা ছেড়ে দিলাম জেলখানা থেকে। তিনি বেল পাইয়া গেলেন, যাইয়া যে খবর দিলেন তাকে গিয়ে মার্ডার করলেন, আমরা তাকে জামিন দিয়ে দিলাম, তারপরের দিন যদি আইসা হাইকোর্টের জর্জ সাহেবকে বাড়ীর থেকে আবার হাইজেক করে নিয়া যাবে তখন আইনের অবস্থা কি হয়।

সেই জন্যই আমি বলি আমাদের ওতোপ্রোতোভাবে সবকিছু জড়িত। কিন্তু দেশের অবস্থা দেশের মানসিকতা, দেশের আবহাওয়া বিবেচনা করেও চলতে হবে। তা না হলে শুধু আইন করে চলেনা কোন কিছুই। স্বাধীন দেশের প্রত্যেকটি অরগানের সাথে অন্যান্য অরগান অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। একটা বাদ দিয়ে আরেকটা চলতে পারে না, চললেও কষ্ট হয়।

সেজন্য যখন বলেন কমপ্লিট ইন্ডিপেন্ডেট, সেখানে আমি বলি না ইন্ডিপেডেন্ট। কারণ রাষ্ট্রের কাঠামোর মধ্যেই এবং শাসনতন্ত্রের ভেদ কাঠামোর মধ্যেই আমাদের সবকিছুতেই চলতে হবে। এজন্যই আমাদের যার যা কর্তব্য আমাদের পালন করতে হবে।

সেজন্য আমি আবার আন্তরিক ধন্যবাদ দিয়ে, যে সুযোগ দিয়েছেন সেজন্য আপনাদের আবার আন্তরিক ধন্যবাদ দিচ্ছি। আপনাদের যদি কোন ব্যাপারে কোন অসুবিধা হয় আপনারাও এদেশের সন্তান। আমি সেজন্য নির্বাচন ও দিয়ে দিয়েছি। যদি আবার জনসাধারণ যাদের ভোট দিবেন তারা আসবেন, তবে শাসনতন্ত্র যা দেয়া হয়েছে এ শাসনতন্ত্র দুনিয়ায় এত তাড়াতাড়ি কেহ দিবার পারেন নাই। এত বিপদ আপদ, এত অভাব-অনটন, দুঃখ-কষ্টের মধ্যে শাসনতন্ত্র দিয়েছি। এত তাড়াতাড়ি এজন্য দিয়েছি যে আইনের শাসনে বিশ্বাস করি এবং সেজন্যে শাসনতন্ত্র দেয়া হয়েছে। আশা করি আজ আমরা স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক। আজ আমাদের শাসনতন্ত্র হয়েছে যার জন্য বহু রক্ত গেছে এ দেশের আজ আমাদের সুপ্রিম কোর্ট হয়েছে। যার কাছে মানুষ বিচার আশা করে। সেই কথা বলে আপনাদের আন্তরিক ধন্যবাদ দিয়ে বারকে ধন্যবাদ দিয়ে, হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি থেকে বিচারপতিগণকে এবং যারা উপস্থিত আমার মুরব্বি আছেন তাদেরকে, যারা আমার সহকর্মী আছেন তাদেরকে যারা উপস্থিত ভদ্রমন্ডলী, ভদ্রমহিলা আছেন তাদেরকে আমার আন্তরিক ধন্যবাদ দিয়ে বিদায় নিচ্ছি। জয় বাংলা।

 

সংগ্রহ-সিডি থেকে

Read Previous

১৯৭২ সালের ২৮ জুন সিলেটের বন্যাদূর্গত এলাকায় বঙ্গবন্ধুর ভাষণ

Read Next

মাধবীর জন্যে – পূর্ণেন্দু পত্রী