উত্তর ভারতীয় সঙ্গীত রীতি/ধারা [ North Indian Music]

উত্তর ভারতীয় সঙ্গীত [ North Indian Music ] রীতিতে বিশুদ্ধ শাস্ত্রীয় ধারায় পাশাপাশি কিঞ্চিত লঘু একটা ঐতিহ্যবাহী উপশাস্ত্রীয় ধারার প্রচলন চলেছে। কিঞ্চিত লঘু মানে এই নয় যে তা লঘু সঙ্গীত। কঠোর রীতি-বদ্ধ ধারার বিশুদ্ধ শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মাঝ থেকে মনোরঞ্জনের উদ্দেশ্যে কিছুটা ছুটি নেয়া বলা যায়। তবে সেসব উপশাস্ত্রীয় ধারার সঙ্গীত গাইবার জন্য শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের তালিম নেয়া জরুরী।

উত্তর ভারতীয় সঙ্গীত  [ North Indian Music ] রীতিতে বিশুদ্ধ শাস্ত্রীয় ধারা :

ধ্রুপদ-ধামার [ Dhrupad- Dhamar of North Indian Music ] :

বর্তমানে প্রচলিত উত্তর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত [ North Indian Music ] রীতির মধ্যে সবচেয়ে পুরনো ধারা। কঠোর বিধিবদ্ধ রাগ, তাল ও গায়কীর মাধ্যমে গাওয়া হয় এই গান।  ধামার ধ্রুপদের মতোই একটি সঙ্গীত রীতি। ধ্রুপদ’ শব্দ ‘ধ্রুবপদ’ শব্দের অপভ্রংশ। ‘ধ্রুব’ অর্থ স্থির, নির্দিষ্ট ও সত্য এবং ‘পদ’ অর্থ কথাযুক্ত গীত। তাই ‘ধ্রুবপদ’ বা ‘ধ্রুপদ’ বলতে এক প্রকার ধীর, স্থির, গম্ভীর ও বীরত্বব্যঞ্জক সঙ্গীতকে বোঝায়।

ভারতবর্ষে ধ্রুপদ গানের চর্চা কখন থেকে শুরু হয় তা সঠিকভাবে বলা দুষ্কর। মহর্ষি ভরতের সময় ‘ধ্রুবা’ নামে এক প্রকার গানের প্রচলন ছিল, যার পরম্পরা চলছিল খ্রিস্টীয় নবম-দশম শতক পর্যন্ত। তবে আধুনিক ধ্রুপদ গানের আবিষ্কারক হিসেবে গোয়ালিয়রের রাজা মানসিংহ তোমরকে ধরা হয়। কেউ কেউ বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ নায়ক গোপাল ও তাঁর সমসাময়িক নায়ক বৈজুকে ধ্রুপদ গানের প্রবর্তক বলে মনে করেন। তাঁদের মতে ধ্রুপদের আগে ‘প্রবন্ধ’ নামে এক প্রকার গানের প্রচলন ছিল। তার অনুকরণে ধ্রুপদ গানের সৃষ্টি হয়। কিন্তু অধিকাংশের মতে রাজা মানসিংহ তোমরই ধ্রুপদ গানের স্রষ্টা। তাঁর সহধর্মিণী মৃগনয়নীও ধ্রুপদ গানে বিশেষ পারদর্শিনী ছিলেন।

ধ্রুপদ গানে সাধারণত চারটি ‘তুক্’ বা ভাগ থাকে, যথা স্থায়ী, অন্তরা, সঞ্চারী ও আভোগ। তবে কেবল স্থায়ী ও অন্তরা এ দুই তুক্বিশিষ্ট ধ্রুপদ গানের প্রচলন আছে। এ গান প্রধানত হিন্দি, উর্দু বা ব্রজভাষায় রচিত এবং এতে শৃঙ্গার, শান্ত অথবা বীররসের প্রাধান্য থাকে। একাধিক তালে ধ্রুপদ গায়ন প্রচলিত, যথা চৌতাল, সুরফাঁক, ব্রহ্মতাল, তেওড়া, রুদ্রতাল, ঝাঁপতাল ইত্যাদি। এ সকল তাল পাখোয়াজ অথবা মৃদঙ্গে বাজানো হয়।

ধ্রুপদ সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন:

খেয়াল [ Kheyal of North Indian Music ] :

খেয়াল বর্তমানে প্রচলিত উত্তর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত [ North Indian Music ] রীতির মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ধারা। বিধিবদ্ধ শাস্ত্রীয় নিয়ম নীতির দিক থেকে খেয়ালের অবস্থান দ্বিতীয়; অর্থাৎ ধ্রুপদ-ধামারের পরে। খেয়াল ধ্রুপদের চেয়ে কিছুটা লঘু সঙ্গীত হিসেবে বিবেচিত। খেয়ালে এতে কল্পনা অনুযায়ী নানাবিধ অলঙ্কার প্রয়োগ ও তানবিস্তার দ্বারা সৌন্দর্য রচনার সুযোগ আছে।

North Indian Music, Ustad Amir Khan (1912-1974), India (Vocal /Founder of Indore Gharana) উত্তর ভারতীয় সঙ্গীত রীতির ওস্তাদ আমির খান খেয়াল কে একটি ভিন্ন মাত্রায় পৌঁছেছিলেন এবং তারানা নিয়ে বিস্তর গবেষণা করেছিলেন।
ওস্তাদ আমির খান খেয়াল কে একটি ভিন্ন মাত্রায় পৌঁছেছিলেন এবং তারানা নিয়ে বিস্তর গবেষণা করেছিলেন।

খেয়ালের উৎপত্তি সম্পর্কে বিভিন্ন মতবাদ প্রচলিত আছে; তবে যে মতবাদটি সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য তা হলো:  কাওয়ালি থেকে খেয়ালের উৎপত্তি হয়েছে। দিল্লির পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের কাওয়াল নামক একটি যাযাবর সম্প্রদায় সাধারণত ভক্তিমূলক যে গান গাইত তার নাম কাওয়ালি। এ কাওয়ালি থেকেই কালক্রমে খেয়াল গানের উৎপত্তি হয়। বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ আমীর খসরু (১২৫৩-১৩২৫) কাওয়ালি গানের সংস্কার করে একে একটি প্রথাবদ্ধ রূপদানের মাধ্যমে খেয়াল গানের সূচনা করেন।

খেয়াল দু প্রকার–ছোট খেয়াল (Fast Kheyal) ও বড় খেয়াল (Slow Kheyal)। আমীর খসরু প্রবর্তিত খেয়ালই ছোট খেয়াল এবং পনেরো শতকে জৌনপুরের সুলতান হুসেন শাহ্ শর্কী যে খেয়াল প্রবর্তন করেন তা বড় খেয়াল নামে পরিচিত। উপরিউক্ত দুপ্রকার খেয়ালেই দুটি বিভাগ থাকে–স্থায়ী ও অন্তরা; আবার প্রতিটি বিভাগে থাকে দুটি বা তিনটি করে চরণ।

ছোট খেয়াল চপল গতির, তাই এর রচনা খুব সংক্ষিপ্ত। এর স্থায়ী ও অন্তরা সাধারণত দুচরণে রচিত। এ গানের বন্দিশ সাধারণত ত্রিতাল বা দ্রুত একতালে বাঁধা হয়। ছোট খেয়ালে বিস্তারের সুযোগ নেই। প্রথমে মধ্যলয়ে, পরে দ্রুতলয়ে গান শেষ করা হয়। গানকে ছোট-বড় তান, বোলতান, সরগম ইত্যাদির মাধ্যমে অলঙ্কৃত করা হয়।

বড় খেয়াল বিলম্বিত লয়ের। এতে বিলম্বিত লয়ে বিশেষ প্রণালীতে আলাপ করা হয়, যাকে বলা হয় বিস্তার। বড় খেয়ালের সঙ্গে আ-কার বা বাণী যোগ করে মন্থর গতিতে এর বিস্তার ঘটানো হয়। এতে স্থায়ী ও অন্তরা উভয়েরই বিস্তার হয়। বিস্তার হওয়ার পর চারগুণ বা আটগুণ লয়ে অধিকাংশ তান করা হয়। এতে বিভিন্ন প্রকার তান ও বোলতান করারও নিয়ম আছে। বড় খেয়ালে কণ্ বা স্পর্শস্বরের প্রয়োগ দ্বারা সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা হয়।

খেয়াল গানের চরম উৎকর্ষ সাধিত হয় আঠারো শতকে সম্রাট মোহাম্মদ শাহের দরবারের প্রসিদ্ধ বীণকার নেয়ামৎ খাঁর (সদারঙ্গ) হাতে। তিনি অজস্র খেয়াল গান রচনা করেন এবং খেয়ালে নানা প্রকার বিস্তার ও বোলতান প্রয়োগ করে নতুনরূপে খেয়ালের প্রচলন করেন। তিনি তাঁর শিষ্যদের যে খেয়ালরীতি শিক্ষা দেন, শিষ্যপরম্পরায় তা-ই পরবর্তীকালে বিস্তার লাভ করে। খেয়াল গানের উন্নতির ক্ষেত্রে তাঁর পুত্র ফিরোজ খাঁর (অদারঙ্গ) অবদানও অসামান্য।

খেয়াল এক চমৎকার সঙ্গীতশৈলী। এর বিষয় সাধারণত শৃঙ্গাররসাত্মক এবং এর প্রকাশ ঘটে সঙ্গীতের শিল্পসৌন্দর্যের মাধ্যমে। খেয়ালে ভক্তিরসেরও প্রাধান্য থাকে। হিন্দি ও  উর্দু ভাষায় খেয়ালগুলি রচিত। খেয়াল গানের সঙ্গে তালযন্ত্র হিসেবে তবলা সঙ্গত করা হয়। একতাল, ত্রিতাল, আড়াচৌতাল, ঝুমরা ইত্যাদি তাল খেয়ালের সঙ্গে বাজানো হয়। সুন্দর তাল ও সঠিক নিয়ম অনুযায়ী গীত হলে খেয়াল শ্রোতার মনে অপূর্ব আনন্দ সঞ্চার করে। তাই সঙ্গীতজগতে খেয়াল বেশ জনপ্রিয় এবং অধিক প্রচলিত একটি গায়ন পদ্ধতি। বর্তমানে রাগসঙ্গীতের শাখাসমূহের মধ্যে খেয়ালের স্থান সর্বাগ্রে। বাংলায় যেসব সঙ্গীত-ঘরানার প্রচলন আছে, সেসবের মধ্যে খেয়াল-ঘরানা অন্যতম।

খেয়াল সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন:

তারানা [ Tarana of North Indian Music ] :

তারানা [ Tarana ] সচরাচর খেয়াল শেষে সচরাচর খেয়ালের শেষে গাওয়া হয়। তারানা প্রচলিত উত্তর ভারতীয় শাস্ত্রীয় [হিন্দুস্তানি , North Indian Music] সঙ্গীত রীতির মধ্যে অন্যতম একটি ধারা। তারানা এক ধরনের সাহিত্য যেখানে ফার্সি এবং আরবি ফোনেম বা উচ্চারণ রীতির উপরে ভিত্তি করে, কিছু শব্দ এবং অক্ষর (যেমন “ওদানি”, “তোদানি”, “তাদিম” এবং “ইয়ালালি”) এর মাধ্যমে রচনা করা হয়। এটাকে কেউ কেউ অর্থহীন শব্দ বলেছেন। তবে ওস্তাদ আমীর খানের মতে তারানার অর্থ আছে।

তারানা মাধ্যম ( madhya laya) বা দ্রুত (drut laya) গাওয়া হয়। বলা হয়ে থাকে এটা হজর আমির খুসরো উদ্ভাবন করেছিলেন। এটি সূফী কবিতার কালবানা রূপের অনুরূপ। আধুনিক যুগে তারানা নিচেয় সবচেয়ে বেশি কাজ করেছেন ওস্তাদ আমির খান। তিনি এই গায়ন রীতির উৎপত্তি এবং ব্যবহৃত শব্দ-বর্ণ নিয়ে গবেষণা করেছেন এবং রীতিকে জনপ্রিয় করতে সাহায্য করেছেন। নিসার হোসেন খান তারানা গানের জন্যও সুপরিচিত ছিলেন।

১.৫. সারদা

উত্তর ভারতীয় সঙ্গীত  [ North Indian Music ] রীতিতে উপশাস্ত্রীয় ধারা :

২.১. ঠুমরি

২.২. দাদরা

১.৩. কাওয়ালী

২.৪. গজল

২.৫. চৈতি

২.৬ কাজরি

২.৭. টাপ্পা

 

 

সিরিজের বিভিন্ন ধরনের আর্টিকেল সূচি:

গান খেকো সিরিজ- সূচি
শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ব্যাকরণ বা শাস্ত্র সূচি
রাগ শাস্ত্র- সূচি
রাগ চোথা- সূচি
রাগের পরিবার ভিত্তিক বা অঙ্গ ভিত্তিক বিভাগ
ঠাট ভিত্তিক রাগের বিভাগ
সময় ভিত্তিক রাগের বিভাগ
ঋতু ভিত্তিক গান (ঋতুগান) এর সূচি
রস ভিত্তিক রাগের বিভাগ
উত্তর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের রীতি/ধারা
সঙ্গীতের ঘরানা- সূচি
সুরচিকিৎসা- সূচি
শিল্পী- সূচি
প্রিয় গানের বানী/কালাম/বান্দিশ- সূচি
গানের টুকরো গল্প বিভাগ

Declaimer:

শিল্পীদের নাম উল্লেখের ক্ষেত্রে আগে জ্যৈষ্ঠ-কনিষ্ঠ বা অন্য কোন ধরনের ক্রম অনুসরণ করা হয়নি। শিল্পীদের সেরা রেকর্ডটি নয়, বরং ইউটিউবে যেটি খুঁজে পাওয়া গেছে সেই ট্রাকটি যুক্ত করা হল। লেখায় উল্লেখিত বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত যেসব সোর্স থেকে সংগৃহীত সেগুলোর রেফারেন্স ব্লগের বিভিন্ন যায়গায় দেয়া আছে। শোনার/পড়ার সোর্সের কারণে তথ্যের কিছু ভিন্নতা থাকতে পারে। আর টাইপ করার ভুল হয়ত কিছু আছে। পাঠক এসব বিষয়ে উল্লেখে করে সাহায্য করলে কৃতজ্ঞ থাকবো।

*** এই আর্টিকেলটির উন্নয়ন কাজ চলমান ……। আবারো আসার আমন্ত্রণ রইলো।

“উত্তর ভারতীয় সঙ্গীত রীতি/ধারা [ North Indian Music]”-এ 1-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন