মফস্বল শহরের সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় আধুনিক প্রযুক্তির আলো পৌঁছে দেওয়া এবং নতুন প্রজন্মকে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করার এক সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য নিয়ে শুরু হয়েছিল ‘প্রুক্তি উৎসব’। এটি মূলত উদ্যোক্তা ও প্রযুক্তি সংগঠক সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর-এর একটি অনন্য সামাজিক ও শিক্ষামূলক কর্মসূচি। বিংশ শতাব্দীর শেষলগ্নে যখন সারা বিশ্বে তথ্যপ্রযুক্তির জোয়ার শুরু হয়েছে, ঠিক তখন কুষ্টিয়ার মতো একটি মফস্বল জেলায় এ ধরনের আধুনিক চিন্তার বীজ বপন করা ছিল এক দুঃসাহসিক উদ্যোগ। এই উৎসবের মাধ্যমেই কুষ্টিয়ার প্রান্তিক জনপদে প্রথম প্রযুক্তির জাগরণ ঘটে, যা পরবর্তীতে একটি মাইলফলক হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
![প্রযুক্তি উৎসব লোগো Technology Festival Logo প্রযুক্তি উৎসব [ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এর কর্মসূচি] 1 প্রযুক্তি উৎসব লোগো](https://sufifaruq.com/wp-content/uploads/2010/02/প্রযুক্তি-উৎসব-লোগো-Technology-Festival-Logo-300x300.png)
প্রযুক্তি উৎসব কর্মসূচি
এই আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৯৯ সালে। সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এবং তাঁর কয়েকজন উদ্যমী বন্ধু মিলে এই অভাবনীয় উদ্যোগটি গ্রহণ করেন। সে সময় তাঁদের প্রতিষ্ঠিত এবং পরিচালিত সামাজিক সংগঠন ‘প্রযুক্তিতে কুষ্টিয়া’-র ব্যানারে এই উৎসবের সূচনা হয়। সুফি ফারুক তখন এই সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। তাঁদের মূল পরিকল্পনা ছিল সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবইয়ের গণ্ডি থেকে বের করে তথ্যপ্রযুক্তি অভিমুখী শিক্ষায় উৎসাহিত করা। সেই লক্ষ্যেই তারা সে সময়ের আধুনিক হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার এবং ইন্টারনেটের মতো বিষ্ময়কর সব উদ্ভাবনের সাথে স্থানীয়দের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেন।
![প্রযুক্তি উৎসব কুষ্টিয়া Technology Festival Kushtia প্রযুক্তি উৎসব [ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এর কর্মসূচি] 2 ২০১১ সালের প্রযুক্তি উৎসব, কুষ্টিয়া](https://sufifaruq.com/wp-content/uploads/2010/02/প্রযুক্তি-উৎসব-কুষ্টিয়া-Technology-Festival-Kushtia.jpg)
প্রযুক্তি উৎসবের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল সমসাময়িক যুগের সফল তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবীদের সাথে শিক্ষার্থীদের সরাসরি সংযোগ স্থাপন। বিশেষ করে প্রোগ্রামিং, নেটওয়ার্কিং এবং ডেটাবেস ম্যানেজমেন্টের মতো জটিল সব বিষয়ে যারা ইতোমধ্যে জাতীয় পর্যায়ে সফল হয়েছিলেন, তাঁদের কুষ্টিয়ায় নিয়ে আসা হয়। এর ফলে স্থানীয় শিক্ষার্থীরা কেবল তাত্ত্বিক জ্ঞান নয়, বরং কর্মক্ষেত্রে প্রযুক্তির বাস্তব প্রয়োগ সম্পর্কেও সম্যক ধারণা লাভ করে। এই সেতুবন্ধনটি সে সময় কুষ্টিয়ার তরুণদের মধ্যে প্রবল উৎসাহ ও উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছিল, যা এর আগে মফস্বল পর্যায়ে কখনো দেখা যায়নি।
আয়োজনের ব্যাপকতা বিবেচনায় এটি কেবল কুষ্টিয়ার স্থানীয় কোনো অনুষ্ঠান থাকেনি, বরং এটি একটি জাতীয় রূপ পরিগ্রহ করেছিল। কুষ্টিয়া পাবলিক লাইব্রেরি মাঠে আয়োজিত এই তিন দিনব্যাপী উৎসবে অংশ নিয়েছিল দেশের প্রায় সব স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বিশেষ করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (সাস্ট), এবং কুয়েট-রুয়েটের মতো প্রতিষ্ঠানের মেধাবী শিক্ষার্থীরা স্টল সাজিয়ে তাদের উদ্ভাবন প্রদর্শন করেছিলেন। এর পাশাপাশি বিভিন্ন প্রযুক্তি নির্ভর বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাও এই আয়োজনে সামিল হয়ে একে একটি বিশাল মিলনমেলায় পরিণত করেছিল।
এই আয়োজনকে একটি সফল জাতীয় উৎসবে রূপ দিতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায় থেকে অভূতপূর্ব সহায়তা পাওয়া গিয়েছিল। বিশেষ করে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি) এবং বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি (বিসিএস) এই উৎসবের কারিগরি ও নীতিনির্ধারণী বিষয়ে সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক বিভিন্ন সেমিনার এবং বিশেষায়িত কর্মশালার মাধ্যমে কুষ্টিয়ার সচেতন মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সমর্থ হয় ‘প্রযুক্তিতে কুষ্টিয়া’। তথ্যসেবা প্রদানের পাশাপাশি এই ধারাবাহিক আয়োজনগুলো কয়েক বছর নিয়মিতভাবে চলতে থাকে, যা স্থানীয় পর্যায়ে একটি শক্তিশালী প্রযুক্তি সচেতন সমাজ গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
তৎকালীন সময়ে কুষ্টিয়া জেলাকে একটি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধ অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে সংগঠনটি কাজ শুরু করেছিল। বিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দক্ষ জনসম্পদ তৈরি এবং সেই জনসম্পদকে কাজে লাগাবার মতো নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টির পথ প্রশস্ত করা ছিল এই আন্দোলনের মূল ভিত্তি। শুরুতে কেবল শিক্ষার্থী ও তরুণদের নিয়ে কাজ শুরু করলেও দ্রুতই এর পরিধি বিস্তৃত হয়। বাইরের সফল উদ্যোক্তাদের কুষ্টিয়াতে কাজ করার পরিবেশ তৈরি করা এবং প্রযুক্তির মাধ্যমে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আনা ছিল এই কর্মসূচির দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য।
এই মহৎ ও বিশাল কর্মযজ্ঞকে সফল করতে তৎকালীন সময়ের অনেক বরেণ্য শিক্ষাবিদ ও জাতীয় নেতৃত্ব এগিয়ে এসেছিলেন। প্রফেসর কায়েস উদ্দিন, প্রফেসর মু. লূৎফর রহমান, প্রফেসর ড. আবুল আহসান চৌধুরী এবং ড. এম আলাউদ্দিনের মতো গুণী মানুষেরা তাঁদের জ্ঞান ও পরামর্শ দিয়ে এই আন্দোলনকে বেগবান করেন। এছাড়াও জাতীয় পর্যায়ের প্রযুক্তি নেতা আবদুল্লাহ এইচ কাফি এবং স্থানীয় পর্যায়ের শিক্ষানুরাগী আব্দুর রউফ ও দানবীর আলাউদ্দিন আহমেদ প্রমূখ এই উদ্যোগে ছায়ার মতো পাশে ছিলেন। এই আন্দোলনের কণ্ঠস্বর হিসেবে ‘প্রযুক্তিতে কুষ্টিয়া’ নিয়মিত “কম্পিউটার নিউজ” নামে একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করত, যা সে সময় প্রযুক্তি বিষয়ক তথ্যের প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করেছে।
আজকের এই ডিজিটাল যুগে এসে আমরা গর্বের সাথে লক্ষ্য করি যে, কুষ্টিয়ার তরুণ প্রজন্ম ফ্রিল্যান্সিং এবং আন্তর্জাতিক মানের তথ্যপ্রযুক্তি পেশায় দেশের অন্যান্য জেলার তুলনায় বেশ এগিয়ে রয়েছে। এই অগ্রগতির মূলে রয়েছে ১৯৯৯ সালে শুরু হওয়া সেই ‘প্রযুক্তি উৎসব’গুলোর সুদূরপ্রসারী প্রভাব। সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর-এর সেই সময়ের দূরদর্শী চিন্তা ও কঠোর পরিশ্রমই আজ কুষ্টিয়ার কয়েক প্রজন্মকে প্রযুক্তিনির্ভর ক্যারিয়ার গড়তে অনুপ্রাণিত করেছে।
আরও দেখুন: