রাগের রস ভিত্তিক গ্রুপ [ Raga Group based on Rasa ]

রাগের রস ভিত্তিক গ্রুপ [ Raga Group based on Rasa ] : ভারতীয় নাট্য, কাব্য ও অলঙ্কার শাস্ত্রে রসের রূপ ভিন্নতর। এই রস সৌন্দর্যবোধের একটি ভিন্নতর দশায় উপস্থাপন করা হয়। প্রত্যক্ষ স্বস্তি-অস্বস্তিবোধের সূত্রে যে আনন্দের সৃষ্টি হয়, তার প্রত্যক্ষভাবে ইন্দ্রিয়ের অধীন। মানুষ একে বাস্তব সত্য দিয়ে অনুভব করে। এর অবস্থান মনের উপরিতলে।

রাগের রস ভিত্তিক গ্রুপ [ Raga Group based on Rasa ]
রাগের রস ভিত্তিক গ্রুপ
এই তলে মানুষ কোনো কল্পলোক তৈরি করতে পারে না বা করে না। আর যখন তা করে, তখন সে মনজগতের দ্বিতীয় তলে প্রবেশ করে। এই তলে প্রত্যক্ষভাবে ইন্দ্রিয়ের কোনো ভূমিকা নেই কিন্তু ইন্দ্রিয়বাহিত অনুভূতির প্রভাব আছে। কল্পলোকে মানুষ ভাবের নতুন জগৎ তৈরি করে। কিন্তু সেখানে বাস্তব জগতের সাথে চলে দ্বন্দ্ব। এই দ্বন্দ্বের লক্ষ্য থাকে সত্যের কাছে যাওয়ার প্রচেষ্টা। ধরা যাক, আপনার কোনো একজন প্রিয় মানুষকে কেউ প্রহার করছে।

বাস্তব জগতে এই ঘটনা থেকে আপনার মনে ক্রোধ, করুণা ইত্যাদির জন্ম নেবে। কিন্তু ওই প্রিয় ব্যক্তি যদি এমন কোনো অভিনয় করে, যেখানে তাঁকে কিছুলোক প্রহার করবে। এক্ষেত্রে দর্শক প্রথমেই বাস্তব জগৎ ছেড়ে কল্পলোকে যাওয়ার মানসিকতা নিয়েই তাঁর অভিনয় দেখতে বসবে। দর্শক দেখবে প্রহারের পুরো অভিনয়টি বাস্তবের মতো হচ্ছে কিনা, কিম্বা প্রহারের কারণে প্রিয় ব্যক্তিটির অভিব্যক্তি যথাযথভাবে ফুটে উঠছে কিনা।

রাগের রস ভিত্তিক গ্রুপ [ Raga Group based on Rasa ]

যদি হয় তাহলে দর্শক চমৎকৃত হবেন, অভিনয়গুণের প্রশংসা করবেন। আর এর ভিতরে দিয়ে প্রিয় মানুষটি করুণা রসের সৃষ্টি করবেন। আর প্রহারকারী ব্যক্তি ক্রোধ রসটিও দান করবেন। আর যদি অভিনয়টা ঠিক না হয়, আপনার প্রিয় মানুষটি অত্যাচারিত হওয়ার পর ঠিকমতো আহাজারি না করে, তবে তা নিয়ে দর্শকের আহজারির অন্ত থাকবে না। মূলত এইভাবে বাস্তবের ঘটনা কল্পজগতে নান্দনিক হয়ে উঠে, প্রকাশের সততার সূত্রে। এই জাতীয় ঘটনায় শিশুরা বাস্তব জগত থেকে চট করে কল্পলোকে প্রবেশ করতে পারে না। ফলে কেউ যদি তার মাকে মারার অভিনয় করে, তখন সে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে।

কল্পলোকের ভাবনার সাথে বাস্তবজগতের সাযুজ্য খুঁজে পাওয়ার চেষ্টার ভিতরে সামঞ্জস্য রক্ষা করাটা জরুরি। সততা এবং সামঞ্জস্যের ভিতর দিয়ে অভিনেতারা ছোটো ছোটো আনন্দ তৈরি করেন। এই সব আনন্দের সমন্বয়ে গড়ে উঠে সুন্দর উপস্থাপন। আর ভিতর দিয়ে মনের গভীরে যে নানারূপ সৌন্দর্য সৃষ্টি এবং মনকে দ্রবীভূত করে, তাই হলো রস।

ভারতীয় দর্শনে নানান শাস্ত্রে নানাভাগে ভাগ করা হয়েছে। যেমন−

ভরতের নাট্যশাস্ত্র বিচারে রস ৮ প্রকার।

এগুলো হলো−শৃঙ্গার, হাস্য, করুণ, রৌদ্র, বীর, ভয়ানক, বীভৎস ও অদ্ভুত। নাট্যশাস্ত্রের শান্তরসকে করুণ রসের অন্তর্গত বিষয় হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে।

কাব্যশাস্ত্রে রস ৯ প্রকার।

এগুলো হলো−শৃঙ্গার, বীর, করুণ, অদ্ভুত, হাস্য, ভয়ানক, বীভৎস, রৌদ্র ও শান্ত। কেউ কেউ এর সাথে বাৎসল্য নামক একটি অতিরিক্ত রসের কথা বলে থাকেন। এই অতিরিক্ত প্রকরণ যুক্ত করলে রসের সংখ্যা দাঁড়ায় ১০টি।

কাব্যশাস্ত্রের ১০টি রস ।

রাগের রস ভিত্তিক গ্রুপ [ Raga Group based on Rasa ] :

১. রাগের রস – শৃঙ্গার (Shringara Rasa, love):

শৃঙ্গ শব্দের অর্থ হলো কামেদেব। শৃঙ্গের আর (আগমন) হয় যাতে, তাই শৃঙ্গার। এর অপর নাম আদিরস। নরনারীর দৈহিক সম্ভোগের ইচ্ছায় যে অনুরাগের সৃষ্টি হয়, তাকেই শৃঙ্গার একেই বলা হয়। প্রেমপ্রকাশ কাব্যে এই রসের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।

২. রাগের রস – বীর (Vira Rasa, heroism):

দয়া, ধর্ম, দান এবং যুদ্ধের নিমিত্তে এই রসের উদ্ভব হয়। এর প্রত্যেকটির ভিতরে জয় লাভের ভাব থাকে। যার দ্বারা প্রতিকুল পরিবেশকে পরাজিত করে জয়ী হওয়ার উদ্দীপনা প্রকাশ করা হয়। একই সাথে এতে থাকে বীরোচিত প্রতীজ্ঞা। ভায়নক, শান্ত রস বিরোধী। যেমন−

বারিদপ্রতিম স্বনে স্বনি উত্তরিলা
সুগ্রীব; “মরিব, নহে মারিব রাবণে,
এ প্রতিজ্ঞা শূরশ্রেষ্ঠ, তব পদতলে!
-মেঘনাদ বধ, সপ্তম সর্গ। মধুসূদন

৩. রাগের রস – করুণ (Karuna Rasa, melancholia):

আকাঙ্ক্ষা নষ্ট হলে, অকল্যাণ হলে, প্রিয়জন বিয়োগ ইত্যাদিতে এই রসের সৃষ্টি হয়। মূলত শোকের ভাব এতে প্রকাশ পায়। শৃঙ্গার এবং হাস্যরস এর বিরোধী। যেমন−
কাঁদিলা রাক্ষসবধূ তিতি অশ্রুনীরে
শোকাকুলা। ভবতলে মূর্ত্তিমতী দয়া
সীতারূপে, পরদুঃখে কাতর সতত,
কহিলা− সজল আঁখি সখীরে;−
“কুক্ষণে জনম মম, সরমা রাক্ষসি!
-মেঘনাদ বধ, নবম সর্গ। মধুসূদন

৪. রাগের রস – রৌদ্র /রুদ্র (Raudra Rasa, fury) :

ক্রোধ রস থেকে এই রস উৎপন্ন হয়। ক্রোধের উগ্রতা এবং ভয়ঙ্কর রূপ হলো এই রস। এই কারণে ক্রোধকে এর স্থায়ীভাব হিসেবে উল্লেখ করা হয়। অলঙ্কার শাস্ত্রে একে রক্তবর্ণ ও রুদ্রদৈবত নামে অভিহিত করা হয়েছে। যেমন−

“কি কহিলি, বাসন্তি? পর্ব্বত-গৃহ ছাড়ি,
বাহিরায় যবে নদী সিন্ধুর উদ্দেশে,
কার হেন সাধ্য যে সে রোধে তার গতি?
-মেঘনাদ বধ, তৃতীয় সর্গ। মধুসূদন

৫. রাগের রস – অদ্ভুত (Adbhuta Rasa, amazement) :

আশ্চর্যজনক কোনো বিষয় থেকে উদ্ভুত বিস্ময়কর ভাবই হলো অদ্ভুত রস। সাধারণ অলৌকিক কোনো বিষয়কে এই রসকে উজ্জীবিত করা হয়। যেমন−

“সবিস্ময়ে রঘুনাথ নদীর উপরে
হেরিলা অদ্ভুত সেতু, অগ্নিময় কভু,
কভু ঘন ধূমাবৃত, সুন্দর কভু বা
সুবর্ণে নির্ম্মিত যেন! ধাইছে সতত
সে সেতুর পানে প্রাণী লক্ষ লক্ষ কোটি
হাহাকার নাদে কেহ; কেহ বা উল্লাসে!
-মেঘনাদ বধ, অষ্টম সর্গ। মধুসূদন

৬. রাগের রস – ভয়ানক (Bhayanak Rasa, terror):

ভয় থেকে এই রসের উদ্ভব। বিপদজনক বা ভীতিপ্রত কোনো বিষয় থেকে মনে যে ভাবের সঞ্চার হয়, প্রকাশই ভয়ানক।

৭. রাগের রস – বীভৎস (Bhibatsa Rasa, disgust):

কোনো কুৎসিৎ বিষয়ের প্রতি ঘৃণা থেকে বিভৎস রসের সৃষ্টি হয়।

৮. রাগের রস – হাস্য (Hasya Rasa, comic):

কৌতুকজনক বাক্য বা আচরণ থেকে এই রসের উদ্ভব হয়।

৯. রাগের রস – শান্ত (Shanta Rasa, tranquility):

চিত্তকে প্রশান্ত দেয় এমন ভাব থেকে শান্ত রসের উদ্ভব হয়।

১০.রাগের রস – বাৎসল্য:

সন্তানের প্রতি স্নেহের যে ভাবের উদ্ভব ঘটে, তাই বাৎসল্য রস

রাগের রস ভিত্তিক গ্রুপ [ Raga Group based on Rasa ]

কখনো কখনো মনজগতের এই দ্বিতীয়তলে সৃষ্ট সৌন্দর্য শ্রোতা-দর্শকদের এতটাই গভীরে টেনে নেয়। সে তখন রসজগতে দ্রবীভূত হয়ে যায়। সে কারণে অভিনয় দেখে মানুষ কাঁদে, হাসে, ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। শোনা যায় ইতালি অভিযান শেষ নেপোলিয়ানের একদল সৈন্য, লিওনার্দো দ্যা ভিন্সি যে ঘরটিতে The Last Supper ছবিটি এঁকেছিলেন, সেই ঘরে আশ্রয় নিয়েছিল।

যিশুখ্রিষ্টের পরম ভক্তদের কেউ কেউ তখন, যিশুর সাথে প্রতারণাকারী জুডাথের উদ্দেশ্য জুতো ছুঁড়ে মারে। ফলে সে সময়ও ছবিটি ক্ষতিগ্রস্থ হয়। মূলত এই সৈনিকরা প্রথমে মনোজগতের দ্বিতীয় স্তরে প্রবেশ করে একটি রৌদ্ররস দ্বারা দ্রবীভূত হয়েছিল। এরপর এরা ছবিটির বিষয়বস্তুটির সাথে এতটাই গভীরভাবে মিশে গিয়েছিল যে, তাদের কাছে ছবির জুডাথ মনের গভীরতলে বাস্তব হয়ে উঠেছিল।

এখানে ছবির সৌন্দর্য নিয়ে সৈনিকরা মাথা ঘামায় নি। ছবিটি নষ্ট হয়ে যাবে এই মমতাও তাদের ছিল না। এই ছবিটি ঘটনাক্রমে একদল মানুষের সুকুমার প্রবৃত্তিকে নষ্ট করে দিয়েছিল। এই কারণে এই ছবিটিকে সৌন্দর্যহীন বলা যাবে। একটি কারণে ছবিটি সৌন্দর্যের দাবিদার হয়ে উঠে। তা হলো এর সততা এবং তার সমন্বয়। ছবিটির এই সততা এবং সমন্বয় সৈনিকদের বাস্তব জগত থেকে ভুলিয়ে ঠেলে দিয়েছিল কল্পজগতে।

আরও পড়ুন:

ঘোষণা:

শিল্পীদের নাম উল্লেখের ক্ষেত্রে আগে জ্যৈষ্ঠ-কনিষ্ঠ বা অন্য কোন ধরনের ক্রম অনুসরণ করা হয়নি। শিল্পীদের সেরা রেকর্ডটি নয়, বরং ইউটিউবে যেটি খুঁজে পাওয়া গেছে সেই ট্রাকটি যুক্ত করা হল। লেখায় উল্লেখিত বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত যেসব সোর্স থেকে সংগৃহীত সেগুলোর রেফারেন্স ব্লগের বিভিন্ন যায়গায় দেয়া আছে। শোনার/পড়ার সোর্সের কারণে তথ্যের কিছু ভিন্নতা থাকতে পারে। আর টাইপ করার ভুল হয়ত কিছু আছে। পাঠক এসব বিষয়ে উল্লেখে করে সাহায্য করলে কৃতজ্ঞ থাকবো।

*** এই আর্টিকেলটির উন্নয়ন কাজ চলমান ……। আবারো আসার আমন্ত্রণ রইলো।

মন্তব্য করুন