১ম থেকে ২৫ মার্চ – ১৯৭১ এর ঘটনাপ্রবাহ

অগ্নিঝরা মার্চঃ বেদনার, সংগ্রামের, যুদ্ধের, স্বাধীনতার, মানবতার, স্বপ্নের আর বেঁচে থাকার মাস

স্বায়ত্তশাসনসহ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তির ছয়টি দাবি নিয়ে, ১৯৬৬ সালে, ঐতিহাসিক ছয় দফা ঘোষণা করেন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান। এর অল্প সময়ের মধ্যেই দলের সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি। চষে বেড়াতে শুরু করেন বাংলার মাঠ-প্রান্তর। এসময় ‘ছয় দফা: আমাদের বাঁচার দাবি’ শিরোনামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করে দেশজুড়ে বিলি করা হয়। তুমুল গণজোয়ার শুরু হয় ছয় দফার পক্ষে। তা দেখে ভয় সৃষ্টি হয় পাকিস্তানি জান্তাদের মনে। ছয় দফা ঘোষণার পরের তিন মাসে দেশজুড়ে ৩২টি জনসভা করেন বঙ্গবন্ধু এবং প্রায় প্রতিবারই তাকে আটক করা হয়। অবশেষে বাঙালির জাগরণ দমানোর জন্য দীর্ঘ মেয়াদের জন্য জেলে ঢোকানো হয় জাতির স্বপ্নপুরুষ শেখ মুজিবকে। কিন্তু লাভ হয়নি। ছয় দফা ঘোষণা করে জাতীয় মুক্তির যে বীজমন্ত্র তিনি রোপণ করেছিলেন, তা ততদিনে শাখা-প্রশাখায় ছড়িয়ে গেছে প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে।

এই ছয় দফাকে কেন্দ্র করেই স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর হয়ে ওঠে পুরো জাতি। যার প্রভাব পড়ে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে। পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের মোট ৩১৩ আসনের মধ্যে ১৬৭ আসনে জিতে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে আওয়ামী লীগ। নৌকা প্রতীকের কাণ্ডারি হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে হয়ে ওঠেন অখণ্ড পাকিস্তানের সর্বোচ্চ নেতা। কিন্তু পাকিস্তানি জান্তা ও নির্বাচনের পরাজিত পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনীতিকরা ষড়যন্ত্র করতে থাকে। অনেক টালবাহার পর, ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও, স্বৈরাচার জেনারেল ইয়াহিয়া খান ১ মার্চ দুপুরে, সেই অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন। এরপরই ফুঁসে ওঠে আপামর বাঙালি। চূড়ান্ত আন্দোলন শুরু করার নির্দেশ দেন বঙ্গবন্ধু।

মূলত, মার্চের প্রথম দুপুর থেকেই এই আন্দোলনের সূচনা। প্রথমে শান্তিপূর্ণভাবে পাকিস্তানি হানাদারদের অসহেযোগিতা করার নির্দেশ দেন বঙ্গবন্ধু। কিন্তু জান্তারা সেই আন্দোলনে গুলি চালিয়ে শতাধিক মানুষের রক্তে রাজপথ রক্তাক্ত করে তোলে। ক্রমেই কঠোর থেকে কঠোর অবস্থানের নির্দেশনা দেন বাঙালির সর্বোচ্চ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান।

১-৬ মার্চ

১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিজয় এবং সরকার গঠনের পরও, পাকিস্তানি জান্তা কর্তৃক তা বাতিল করার ইতিহাস ভুলে যাননি বঙ্গবন্ধু। তাই ১৯৭০-এর জাতীয় নির্বাচনের একচেটিয়া বিজয়ের পরও ,পুরোদস্তুর সতর্ক হয়ে প্রতিটি পদক্ষেপ নিতে থাকেন তিনি। দেশজুড়ে তখন ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগানের জয়ধ্বনি, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর,বাংলাদেশ স্বাধীন কর’ স্লোগানে স্লোগানে স্বাধীনতার উম্মাদনায় তখন মগ্ন জনতা। কিন্তু পাকিস্তানিদের পরিকল্পনা আঁচ করতে পেরেছিলেন বঙ্গবন্ধু। তাই দেশবাসীকেও ধীরে ধীরে প্রস্তুত করছিলেন। স্বৈরাচার ইয়াইয়া যখন ১ মার্চ বেতারে ঘোষণা দিয়ে ৩ মার্চের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বাতিল ঘোষণা করে, তখন উত্তাল হয়ে ওঠে সারা দেশ। দেশব্যাপী ২ ও ৩ মার্চ হরতালের ঘোষণা দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

কিন্তু আন্দোলন নস্যাৎ করার জন্য রাতেই পাকিস্তানি জান্তারা কার্ফ্যু ঘোষণা করে। কিন্তু তাদের রক্ত চক্ষুকে উপেক্ষা করে মিছিল বের করে শ্রমিক-ছাত্র-জনতা। একাধিক স্থানে মিছিলের ওপর গুলি চালায় হানাদাররা। কিন্তু গণমানুষের প্রতিরোধের মুখে ২ মার্চ অচল হয়ে পড়ে পুরো বাংলাদেশ। এদিনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম ওড়ানো হয় বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত পতাকা। পাকিস্তানিদের নৃশংসতার প্রতিবাদ জানিয়ে বঙ্গবন্ধু এদিন একটি বিবৃতি দেন। অবিলম্বে সামরিক আইন প্রত্যাহার ও জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের আল্টিমেটাম দেন তিনি। একই সঙ্গে ৭ মার্চ পর্যন্ত আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। ৩ মার্চ থেকে ৬ মার্চ পর্যন্ত প্রতিদিন আধাবেলা হরতালের ঘোষণা করেন বঙ্গবন্ধু। সব রকমের সরকারি-বেসরকারি অফিস, ব্যাংক, সচিবালয়, কোর্ট-কাচারি, যোগাযোগ ব্যবস্থা, কলকারখানা, শিল্প-বাণিজ্যিক সংস্থা, বন্ধ করার নির্দেশ দেন। ৩ মার্চকে ঘোষণা করেন জাতীয় শোক দিবস।

২ মার্চ দিন ও রাতে, ঢাকাসহ সারাদেশে হানাদার বাহিনীর গুলিতে শতাধিক ব্যক্তি নিহত ও কয়েকশ’ মানুষ আহত হয়। কিন্তু তাতে দমে না গিয়ে, উল্টো আন্দোলনের গতি বৃদ্ধি পায় ৩ মার্চ। বিকালে পল্টন ময়দানে ছাত্রলীগের জনসভায় বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতে পাঠ করা হয় স্বাধীনতার ইশতেহার। জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীত, বাংলাদেশের ভৌগলিক সীমারেখা, রাষ্ট্রীয় মূলনীতি ও রাষ্ট্রের রূপরেখা ঘোষণা করা হয়।

৪ মার্চ আরো উত্তাল হয়ে ওঠে দেশ, দাবানলের মতো ছড়িয়ে যেতে থাকে আন্দোলন। চট্টগ্রামে নিহত হয় শতাধিক ব্যক্তি। ‘পিন্ডি না ঢাকা- ঢাকা, ঢাকা’ স্লোগানে প্রকম্পিক হয়ে ওঠে পুরো দেশ। অস্ত্র সংগ্রহ করতে শুরু করে ছাত্র ও যুব নেতারা। দেশব্যাপী সংগ্রাম কমিটি গঠনের কাজ শুরু হয়। বঙ্গবন্ধুর ডাকে শুরু হওয়া অসহযোগ আন্দোলন এগিয়ে যেতে থাকে স্বাধীনতার দিকে। মূলত এই ভূখণ্ডের ওপর থেকে কর্তৃত্ব হারিয়ে ফেলে পাকিস্তানি হানাদাররা।

১৯৭১ সালের মার্চের প্রথম সপ্তাহেই পুরোপুরিভাবে ভেঙে পড়ে পাকিস্তানিদের শাসন ব্যবস্থা। শহরের শান্তি রক্ষার্থে আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীরা টহল দিতে শুরু করে। রেডিও পাকিস্তান ঢাকা কেন্দ্রে ‘ঢাকা বেতার কেন্দ্র’ এবং পাকিস্তান টেলিভিশন ‘ঢাকা টেলিভিশন’ নামে অনুষ্ঠান প্রচার শুরু করে। বেতার ও টেলিভিশনে বাজতে শুরু করে দেশাত্মবোধক গান। যেকোনো মূলে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার জন্য জনগণকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেন বঙ্গবন্ধু। ৫ ও ৬ মার্চেও একই অবস্থা বিদ্যমান থাকে। অফিস-আদালত ও খাজনা বন্ধ রেখে অসহযোগ আন্দোলন চালিয়ে যেতে বলেন বঙ্গবন্ধু। এমনকি ৭ তারিখে সার্বিক নির্দেশনা দেবেন বলেও জানান।

৭ মার্চ: চূড়ান্ত রণ-কৌশলের নির্দেশনা দেন বঙ্গবন্ধু

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ স্বাধীনতা সংগ্রামের টার্নিং পয়েন্ট হয়ে দাঁড়ায়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ এসে সমবেত হয় ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। কয়েক বর্গ মাইল এলাকা লোকারণ্য হয়ে যায়। ‘তোমার দেশ আমার দেশ, বাংলাদেশ বাংলাদেশ’ স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে চারপাশ। উড়তে থাকে বাংলাদেশের পতাকা। পরিবেশিত হয় জাতীয় সংগীত। বেলা ৩টার পর মঞ্চে ওঠেন বাঙালির আশা-আকাঙক্ষার প্রতীক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। স্বাধীনতার জন্য সার্বিক নির্দেশনা দেন তিনি। পাকিস্তানকে পুরোপুরিভাবে অচল করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, ‘আজ থেকে বাংলার সচিবালয়, কোর্ট-কাচারি, আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সবকিছু অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ থাকবে।… যে পর্যন্ত আমার এ দেশের মুক্তি না হবে, খাজনা, ট্যাক্স বন্ধ করে দেওয়া হলো।… দুই ঘণ্টা ব্যাংক খোলা থাকবে যাতে মানুষ তাদের মায়নাপত্র নেবার পারে। কিন্তু পূর্ব বাংলা থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে এক পয়সাও চালান হতে পারবে না।’

কিন্তু তীব্র অসহযোগ আন্দোলনের কারণে গরিব-দুঃখী মানুষের যেনো সমস্যা না হয়; সেজন্য রিকশা, ঘোড়ার গাড়ি, লঞ্চ, রেল চালু রাখতে বলেন বঙ্গবন্ধু। এছাড়াও চাকরিজীবীদের ২৮ তারিখে গিয়ে বেতন তোলার নির্দেশনাও দেন। যার যা আছে, তাই নিয়ে, ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে চূড়ান্ত নির্দেশ দিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ এরপর সারা দেশে ছড়িয়ে পড়তে থাকে অসহযোগ আন্দোলনের ঢেউ। জীবন বাজি রেখে আপামর জনতার যুদ্ধে নামার পেছনে এই ভাষণের প্রভাব অনবদ্য। এমনকি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এর প্রভাব ছিল ব্যাপক। পরবর্তীতে বিশ্বব্যাপী অনেক গবেষণা হয়েছে এই ভাষণ নিয়ে। বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণকে একটি অনন্য রণকৌশলের দলিল বলে অভিহিত করেছেন কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রো। দক্ষিণ আফ্রিকার অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছেন, ‘এটি আসলে স্বাধীনতার মূল দলিল।’

৮ মার্চ

পাকিস্তান বেতারে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচারে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। পত্রপত্রিকাগুলোও ফলাও করে এ খবর প্রচার করে। ‘পরিষদে যাওয়ার প্রশ্ন বিবেচনা করিতে পারি, যদি—’ এটা ছিল দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান সংবাদের শিরোনাম। এ ছাড়া প্রথম পৃষ্ঠায় ‘আজ থেকে আমার নির্দেশ—’ নামে আরেকটি খবর ছাপা হয়, যেখানে বঙ্গবন্ধুর বেশ কিছু দিকনির্দেশনা ছিল। আমরা সেখানে পাই—বঙ্গবন্ধু ঢাকায় যারা স্থানীয় নয় এমন লোকদের ঢাকা ছাড়ার জন্য আদেশ দেন। তা ছাড়া সবখানে সেদিন থেকে কালো পতাকা উড্ডয়ন করার নির্দেশও দেন। এই দুটি নির্দেশই পরবর্তী দিনের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। দৈনিক সংগ্রাম একমাত্র পত্রিকা, যারা ৮ মার্চের পত্রিকায় বঙ্গবন্ধুর ভাষণের একটি অংশ তুলে দিয়ে শিরোনাম দিয়েছিল—‘এবার স্বাধীনতার সংগ্রাম : মুজিব’।
তা ছাড়া সেদিন আরেকটি ছোট্ট ব্যাপার সংঘটিত হয়। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি ও তৎকালীন ডাকসুর সহসভাপতি আ স ম আবদুর রব ও সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কুদ্দুস মাখনসহ আরো অনেক ছাত্রনেতা মিলে একটি বিবৃতি দেন। যেখানে তাঁরা বঙ্গবন্ধুর ভাষণের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন। এটি ছোট ঘটনা হলেও প্রভাব ছিল ব্যাপক।

৯ মার্চ

বঙ্গবন্ধুর আদেশগুলো কতটা কার্যকর ছিল তার প্রমাণ মেলে পরের দিনের পত্রিকায়। ৯ মার্চের ইত্তেফাকের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ ছিল ‘অস্থানীয়দের ঢাকা ত্যাগের হিড়িক : এসব তবে কিসের আলামত?’ এ ছাড়া এক দিনের মধ্যেই ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির একটি জরুরি সভায় ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’ ঘোষণার প্রস্তাব অনুমোদন। ওই সভায়ই আরেকটি প্রস্তাব দেওয়া হয়, যেটিতে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বাংলাদেশে জাতীয় সরকার’ গঠনের জন্য অনুরোধ করা হয়। যদিও বাংলাদেশ পরিচয় হয়নি, তবু ছাত্ররা স্বাধীন বাংলাদেশের একটি সরকারের কল্পনা করা শুরু করে দিয়েছিলেন; যেটি অনেক সংবাদপত্র গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করে।
সেদিন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। বঙ্গবন্ধুর রেসকোর্সের ভাষণের দুই দিন পর অর্থাৎ ৯ মার্চ একটি ভাষণ দেন মওলানা ভাসানী। তিনি সেই ভাষণে বলেন, ‘১২ মার্চের মধ্যে যদি স্বাধীনতা দেওয়া না হয় তাহা হইলে আমি ও শেখ মুজিব পুনরায় ১৯৫২ সালের মত একযোগে আন্দোলন করিব—প্রধানমন্ত্রী হইতে আমরা যাইবো না।’ এ খবরও তখনকার পত্রিকায় প্রথম পাতায় বড় পরিসরে ছাপা হয়েছিল।

১০ মার্চ

“ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় সংসদের জরুরী সভায় ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’ ঘোষণার প্রস্তাব অনুমোদন” শিরোনামে একটি খবর প্রকাশিত হয় দৈনিক ইত্তেফাকে। এ ছাড়া মওলানা ভাসানীর ভাষণ ও স্বাধীনতায় একাত্মতা প্রকাশের ব্যাপারে ১৯৭১ সালের ১০ মার্চ দৈনিক সংবাদের শিরোনাম ছিল ‘মুজিবের সঙ্গে একযোগে আন্দোলন করিব : ভাসানী’। দৈনিক সংবাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘অশীতিপর বৃদ্ধ রাজনৈতিক নেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী গতকাল (মঙ্গলবার) পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত এক বিরাট জনসভায় বক্তৃতাকালে অবিলম্বে বাংলার স্বাধীনতা প্রদানের জন্য প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খানের প্রতি আহ্বান জানান। মওলানা বলেন, ‘১২ মার্চের মধ্যে যদি স্বাধীনতা দেওয়া না হয় তাহা হইলে আমি ও শেখ মুজিব পুনরায় ১৯৫২ সালের মত একযোগে আন্দোলন করিব, প্রধানমন্ত্রী হইতে আমরা যাইবো না।’

১১ মার্চ

বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন পাকিস্তানি বাহিনীর প্রশাসনিক কাজে যেন বাঙালিরা সহায়তা না করে। ৭ই মার্চের ভাষণে সেটা বলেছিলেন তিনি। তাঁর কথা কার্যকর হয় মাত্র পাঁচ দিনের মাথায়। ১৯৭১ সালের ১১ মার্চ সরকারি ও আধা সরকারি প্রায় সব কার্যালয় বন্ধ করে দেওয়া হয়। আদালত থেকে শুরু করে অনেক প্রশাসনিক কর্মকর্তাই স্বাধীনতার ডাককে সমর্থন করে কর্মস্থল থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বের হয়ে আসেন।এমনকি সিনেমা শুরুর আগে, সিনেমা হলেও পাকিস্তানের জাতীয় সংগীতের পরিবর্তে ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’ গানটি বাজানো শুরু হয়। এটি ছিল পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের প্রথম বর্ষণ মাত্র।
তবে কূট-কৌশলী ভুট্টো এক তারবার্তায় বঙ্গবন্ধুকে জানান, তিনি ঢাকায় এসে কথাবার্তা বলতে রাজি। এদিকে পশ্চিম পাকিস্তান মারাত্মকভাবে অর্থনৈতিক সংকটে পড়তে যাচ্ছিল। ১১ মার্চ থেকে দেখা যায় পাকিস্তানের বড় পত্রিকাগুলো কাগজের সংকটে পড়েছে। সংকট এত তীব্র ছিল যে ডনের মতো বড় পত্রিকাও ১৪ পৃষ্ঠা থেকে ১০ পৃষ্ঠা ছেঁটে ফেলতে বাধ্য হয়েছিল। কারণ তাদের নিউজপ্রিন্টের কাগজ যেত খুলনা নিউজপ্রিন্ট থেকে। পশ্চিম পাকিস্তানে কাগজের চালান বন্ধ করে দেয় খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিল। এভাবে চলতে থাকলে পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনীতি মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে জানিয়ে সেদিনই ইয়াহিয়া খান ব্যবসায়ীদের একটি বার্তা দেন।

১২ মার্চ

লাহোরে সেদিন একটি সংবাদ সম্মেলন হয়। সেখানে এয়ার মার্শাল আজগর আলি খান বলেন, লাহোরের জন্যই ঢাকার এই অবস্থা। শেখ মুজিবকে ক্ষমতা হস্তান্তর না করলে অবস্থা আরো অবনতির দিকে যেতে পারে বলে তিনি মনে করেন। অন্যদিকে ধীরে ধীরে পাকিস্তানের প্রতি ক্ষোভ ফুঁসে উঠছিল। পাকিস্তান সরকার থেকে পাওয়া পদবি ফিরিয়ে দেন জাতীয় পরিষদের সদস্য মোহাম্মদ জহির উদ্দীন। ১৫ সদস্যের একটি দল বগুড়ার জেল থেকে পালিয়ে বের হয়। লন্ডনের ‘দ্য টেলিগ্রাফ’-এ ছাপা হয়, এই মুহূর্তে পাকিস্তানের শক্তি প্রয়োগ করা হবে ভুল সিদ্ধান্ত ও অকার্যকর। এদিকে জাতীয় পরিষদ বেশ পাকাপোক্ত হয়ে সংঘবদ্ধ হতে শুরু করে। সুফিয়া কামালকে সভাপতি মেনে সারা আলীর তোপখানা রোডের বাসায় মহিলা পরিষদের একটি সভা হয়। পাড়ায় পাড়ায় মহিলা সংগ্রাম পরিষদ গঠনের আহ্বান জানানো হয়।

১৩ মার্চ

ইত্তেফাকে প্রাধান্য পায় মহিলা পরিষদের খবর। সংবাদের শিরোনাম ছিল, ‘পাড়ায় পাড়ায় মহিলা সংসদ গঠনের আহ্বান’। অন্যদিকে প্রশাসন প্রায় অচল হয়ে গিয়েছিল। সামরিক কর্তৃপক্ষ সব সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাকে কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দেয়। বলা হয়, ১৫ তারিখের মধ্যে যোগ না দিলে বেতন বাতিল ও বহিষ্কার করা হবে। মার্শাল ল ও ১১৫ ধারা জারি হয়। এ ঘটনাকে বঙ্গবন্ধু এক ধরনের উসকানি বলেও মন্তব্য করেন। সেদিন শিল্পী জয়নুল আবেদিন পাকিস্তান সরকার কর্তৃক পাওয়া পদবি ও বিশেষ পুরস্কার ফিরিয়ে দেন। অন্যদিকে পাকিস্তানিরা বড় হত্যাকাণ্ডের প্রস্তুতি নিচ্ছিল চুপিসারে। তারই ধারাবাহিকতায় বিদেশি কূটনীতিকদের অপসারণ করা হচ্ছিল ধীরে-সুস্থে। মার্চের ১৩ তারিখেই অপসারণ করা হয় পশ্চিম জার্মানির ৬০ জন, জাতিসংঘের ৪৫ জন, ইতালি, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও ফ্রান্সের ৪০ জনসহ মোট ২৬৫ জন বিদেশিকে।

১৪ মার্চ

রেসকোর্স ময়দানের ভাষণে অসহযোগ আন্দোলনের প্রায় এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে। সংগ্রাম দানা বাঁধতে শুরু করেছে বিভিন্ন জায়গায়। বঙ্গবন্ধু এই দিনে দ্বিতীয়বারের মতো আবারও অসহযোগ আন্দোলনের জন্য সবাইকে আহ্বান করেন। তিনি সেদিন বঙ্গবন্ধু তার বিবৃতিতে বলেন, ‘… আমাদের ভবিষ্যৎ বংশধররা যাতে স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হিসাবে এবং মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করতে পারে, সেজন্য আমরা মরতেও প্রস্তুত।… মুক্তির লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম চালিয়ে যাব।… বাংলাদেশের মুক্তির উদ্দীপনা নিভিয়ে দেওয়া যাবে না।’
পিপলস পার্টির নেতা ভুট্টো দুই দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের এক নতুন ফর্মুলার কথা বলেন। সেখানে তিনি জানান পাকিস্তানের দুই বড় দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে। তিনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখাও করতে চান। দিন দিন লাহোরের অবস্থা খারাপ হচ্ছিল। পূর্ব পাকিস্তান যেমন কাগজ দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল, তেমনি পশ্চিম পাকিস্তান থেকে কোনো চালানই গ্রহণ করা হচ্ছিল না। ১৪ তারিখ হঠাৎ খবর আসে ঢাকায় পাঠাতে না পারায় লাহোরে মণের পর মণ ফল নষ্ট হয়ে গেছে। ঢাকা থেকে পানের চালান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় করাচিতে পানের দাম বেড়ে দেড় শ রুপি হয়ে যায়।

১৫ মার্চ

পাকিস্তানি স্বৈরাচার জেনারেল ইয়াহিয়া ঢাকায় আসে ১৫ মার্চ। কালো পতাকা দেখানো হয় তাকে। কোথাও কোথাও স্বাধীন বাংলার পতাকাও ওড়ানো হয়।
‘বাঁচাও! বাঁচাও! বাংলার অসহযোগে পশ্চিমা শিল্পপতিদের নাভিশ্বাস’। ১৫ মার্চের দৈনিক ইত্তেফাকের শিরোনাম। এই সংবাদে করাচি, লাহোরসহ পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন ব্যাবসায়িক ভঙ্গুর অবস্থার কথা বলা হয়। লেখা হয়, ‘করাচীতে বর্তমান প্রতি সের পান ১৫০ টাকায় বিক্রয় হইতেছে। ঢাকা হইতে পান না যাইতে পারায় করাচীতে পান বিরল হইয়ে পড়িয়াছে।’ সেদিন গুরুত্বপূর্ণ দুটি ঘটনা ঘটে। একটি হলো করাচিতে ভুট্টো সংবাদ সম্মেলনে বলেন, শেখ মুজিবকে নিয়ে সরকার গঠন করা উচিত। আর দ্বিতীয় হলো প্রায় নজিরবিহীন নিরাপত্তা বেষ্টনীতে ঢাকায় আসেন ইয়াহিয়া খান। বিমানবন্দরে সাংবাদিক ছিল নিষিদ্ধ। মূলত দুটি ব্যাপারই ছিল এক প্রকার ফাঁদ। কিন্তু এই ফাঁদের যোগ্য জবাব দেন শেখ মুজিব সেদিনই। তিনি বলেন, ‘কে আসল বা কে কী বলল, তা নিয়ে আমরা ভাবছি না। অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম করেই যাব।’ তিনি সেদিন আরো বেশ কিছু দিকনির্দেশনা দেন। যেগুলো পাকিস্তানিদের রাজনৈতিক কৌশলকে আরো দুর্বল করে দিয়েছিল। এ দিন বেতারের সব কর্মকাণ্ড বাংলায় প্রচলন করার এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

১৬ মার্চ

১৬ মার্চ দৈনিক ইত্তেফাকে আটটি পয়েন্টে আগের দিন (১৫ মার্চ ১৯৭১) দেওয়া দিকনির্দেশনা প্রকাশ করে বঙ্গবন্ধুর ছবিসহ প্রতিবেদনের শিরোনাম দেওয়া হয়—‘সর্বসাধারণের প্রতি আমার নির্দেশ’। এ ছাড়া সেই প্রতিবেদনের নিচেই আরেকটি খবর প্রকাশিত হয় এই শিরোনামে—‘চট্টগ্রামে বেতার কেন্দ্রে সকল কাজে বাংলা প্রচলনের সিদ্ধান্ত’।১৬ মার্চ থেকে শুরু হয় আলোচনা। মূলত আলোচনার নামে পাকিস্তানিরা সময়ক্ষেপণ করছিল এবং তাদের সেনাবাহিনী ও অস্ত্র আনছিল। সেদিন দুপুরে বঙ্গবন্ধুর বাসায় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া আসেন দেখা করতে। রুদ্ধদ্বার বৈঠক করলেও কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি।

১৭ মার্চ

দেশের সংকটময় অবস্থায়ও শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিনে বিভিন্ন সংস্থা ও শিল্পীরা শুভেচ্ছা জানাতে আসে। এর মাঝেই ইয়াহিয়া খান বৈঠকে বসতে চান। বঙ্গবন্ধু নিজের জন্মদিনে দ্বিতীয় বৈঠকে বসেন। সেদিনও কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলোতে পাকিস্তান ইস্যু নিয়ে আলোচনা চলছিল বেশ। সেদিন নিউজউইকের একটি নিজস্ব পর্যালোচনাও প্রকাশ করা হয়। সেখানে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর বর্তমান সিদ্ধান্ত যে অকার্যকর ও ভুল, সেটি উল্লেখ করা হয়। সেখানে আন্তর্জাতিক বিখ্যাত কূটনীতিকদের বিভিন্ন মতামত সামনে রেখে প্রতিবেদক লোরেন জেনকিনসন লেখেন ‘পূর্ব এবং পশ্চিমাঞ্চল বিচ্ছিন্ন হবে এটা কোনো প্রশ্ন নয়। বরং পরিস্থিতি হঠাৎ এতদূর গড়িয়েছে যে, পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চল কি পরবর্তী সপ্তাহে কিংবা আগামী মাসে অথবা দুই বছর পর বিচ্ছিন্ন হবে এটাই প্রশ্ন।’ সেদিন ভারত প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেয়। ভারতের আকাশসীমায় বাংলাদেশগামী উড়োজাহাজ নিষিদ্ধ করে দেশটি।

১৮ মার্চ

‘ভারতের উপর দিয়া বাংলাদেশগামী সকল বিদেশী বিমান চলাচল নিষিদ্ধ’। এটি ছিল ১৮ মার্চ ১৯৭১ সালের দৈনিক সংবাদের একটি প্রতিবেদন। সেখানে লেখা হয়, ‘ধারণা করা হইতেছে যে, বিদেশি বিমানযোগে পশ্চিম পাকিস্তান হইতে গোলযোগপূর্ণ পূর্ব পাকিস্তানে সৈন্য বহন বন্ধ করার উদ্দেশ্যে ভারত সরকার অনুরূপ ব্যবস্থা অবলম্বন করিয়াছেন।’

১৯ মার্চ

এই দিন ইত্তেফাকের খবর—‘আমি শেখ মুজিব বলছি : এ তদন্ত কমিশন চাহি নাই’। তার পরও সেদিন তৃতীয় দফায় মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠক চলে। সেদিন প্রথমবারের মতো সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সাধারণ জনগণের একটি সংঘর্ষ হয় ঢাকার বাইরে জয়দেবপুরে। মূলত সামরিক বাহিনীর অতর্কিত হামলার কারণেই সংঘর্ষের সৃষ্টি। এলাকায় জারি হয় কারফিউ।

২০ মার্চ

চতুর্থবারের মতো বঙ্গবন্ধু-ইয়াহিয়া বৈঠক হয়। ৯০ মিনিটের সেই বৈঠকে শুধুই সময় নষ্ট করেন ইয়াহিয়া। সেদিনের ইত্তেফাকে ছাপা হয়, ভারতের নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণ বঙ্গবন্ধুর কর্মকাণ্ড ও তাঁকে ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যাপারে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন।

২১ মার্চ

ভোর ৬টা। বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ প্রথম পতাকা উত্তোলন করে। সকাল ৯টায় তারা পল্টনে জয়বাংলা কুচকাওয়াজ করে। দুপুর ১টায় বায়তুল মোকাররমে ছাত্র সমাবেশের আয়োজন করা হয়। সেদিন ভুট্টো গোপনে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সঙ্গে বৈঠক করেন। তবে ঢাকার পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। প্রত্যেক বাসার ছাদে উড়ছিল বিভিন্ন আকৃতির পতাকা। যার মধ্যে ফুটে আছে বাংলাদেশের মানচিত্র। সেদিন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ফের বৈঠক করেন ইয়াহিয়া।

২২ মার্চ

বঙ্গবন্ধু তাঁর দাবিতে অনড়। ভুট্টোর উপস্থিতিতে ইয়াহিয়া-মুজিব বৈঠক চলে। মানুষের মধ্যে ধারণা জন্মায় এবার হয়তো এসব শেষ হতে চলেছে। হয়তো নাটকীয় সিদ্ধান্ত আসবে। নয়তো সামরিক শাসনের অবসান ঘটবে। পরের দিনের পত্রিকাগুলোতেও এর ছাপ লক্ষ করা যায়। সেদিন ছাত্রসংগ্রাম সংসদ একটি যুগোপযোগী কাজ করে। তারা একটি পরিকল্পিত পতাকার মাপ ও বিবরণ প্রকাশ করে, যা স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনে পাকিস্তানি কৌশলের কফিনে শেষ পেরেক ছিল।

২৩ মার্চ

২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসকে ‘প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে পালনের নির্দেশ দেন বঙ্গবন্ধু। তিনি ধানমন্ডির নিজ বাড়িতেও স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন এদিন। দেশজুড়ে শুরু হয় পাকিস্তানি পণ্য বর্জন।সব বড় অফিস বন্ধ। ২৩ তারিখ পাকিস্তান দিবস থাকলেও শুধু প্রেসিডেন্টের বাসভবনে পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলিত ছিল। আর কোথাও দেখা যায়নি। পাকিস্তান দিবসে বরং উড়ছিল বাংলাদেশের নতুন পতাকা।

২৪ মার্চ

ছোট ছোট পাকিস্তানি দল ঢাকা ত্যাগ করতে শুরু করে। ইয়াহিয়া-মুজিবের দফায় দফায় বৈঠকে কোনো সিদ্ধান্ত না এলেও ‘কোনো প্রকার নতি স্বীকার করা হবে না’ বলে সাফ জানিয়ে দেন বঙ্গবন্ধু। তাজউদ্দীন আহমদ বলেন, ‘আওয়ামী লীগের বক্তব্য শেষ। আর অপেক্ষা নয়। দিনের পর দিন অপেক্ষা চলে না।’ সেদিন ঢাকার মিরপুরে একটি বাড়ি থেকে বাংলাদেশি পতাকা নামাতে বাধ্য করা হয়। আরেক জায়গায় একজন শিক্ষককে ছুরিকাঘাত করা হয়। পুলিশ একজনকে গ্রেপ্তার করলেও পাকিস্তান আর্মি তাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য চাপ দেয়।

২৫ মার্চ

ইয়াহিয়া খান সাদা পোশাকে গোপনে ঢাকা ছেড়ে চলে যান। এই খবর পাওয়া মাত্র দলীয় নেতাকর্মীদের মাধ্যমে দেশের সব প্রান্তে স্বাধীনতার চূড়ান্ত বার্তা পাঠাতে শুরু করেন বঙ্গবন্ধু। রাতের অন্ধকারে ঘুমন্ত বাঙালির ওপর হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠে সশস্ত্র পাকিস্তানি সেনারা। সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। স্বাধীনতার ঘোষণায় তিনি বলেন, ‘…এটাই সম্ভবত আমার শেষ বার্তা। আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন।… পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর শেষ সৈন্যটিকে বাংলার মাটি হইতে বিতাড়িত না করা পর্যন্ত এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জন না করা পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবেন….।’ (অনূদিত)। ২৫ মার্চ রাত ১২টার পর তথা ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধুর নিজের কণ্ঠের এই ঘোষণা বিশেষ ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে সম্প্রচারিত করা হয়। চট্টগ্রামের নোঙর করা এক বিদেশি জাহাজও এই বার্তা গ্রহণ করে। রাতেই চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতারা এই বার্তা কপি করে বিভিন্ন স্থানে পাঠিয়ে দেন।

২৭ মার্চ

আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিমান পত্রিকগুলোতে এই স্বাধীনতা ঘোষণার কথা ফলাও করে প্রচার করে। ব্রিটেনের ‘দ্য টাইমস’ পত্রিকার শিরোনামে বলা হয় ‘…শেখ মুজিব ডিক্লেয়ার্স ইস্ট-পাকিস্তান ইন্ডিপেন্ডেন্ট’। দ্য গার্ডিয়ানের সংভাদে বলা হয়, ‘একটি গোপন বেতার কেন্দ্র থেকে শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়েছে’। ফিন্যান্সিয়াল টাইমস ও দ্য টেলিগ্রাফ পত্রিকাতেও শেখ মুজিব কর্তৃক স্বাধীনতা ঘোষণার কথা বলা হয়েছে।

ব্যাস, শুরু হয়ে যায় যায় মুক্তিযুদ্ধ। সর্বোচ্চ নেতার নির্দেশ পাওয়ার পর দলে দলে যুদ্ধে যোগ দেন কিশোর-তরুণ থেকে শুরু করে শ্রমিক-কৃষক, ছাত্র-জনতা সবাই। বঙ্গবন্ধুর নামে পরিচালিত হতে থাকে এই যুদ্ধ। অবশেষে ত্রিশ লাখ মানুষের আত্মদানের বিনিময়ে অর্জিত হয় মহান স্বাধীনতা।
বঙ্গবন্ধুই বাঙালি জাতির সেই সৌভাগ্যবান পুরুষ, যাকে কেন্দ্র করে দুহাজার বছরের লালিত স্বপ্ন পূরণ করেছি আমরা। শোষিত মানুষের জন্য সংগ্রামী চেতনার কারণে স্বাধীনতার পর বিশ্বনেতৃবৃন্দের কাছে বিশেষ মর্যাদা পান তিনি। বাঙালির মুক্তিদাতা থেকে বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠেন সারা বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর, একজন গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বনেতা।