• ২৭/১০/২০২০

Breaking News :

বিএনপি-জামাত ভারত বিরোধিতার রাজনীতি করবে না !!! তবে করবেটা কি?

সারা পৃথিবীতেই- সীমান্তবর্তী বড় দেশের বিষয়ে, ছোট দেশের মানুষের অনেক অভিযোগ থাকে, প্রত্যাশার অপূর্ণতার হতাশা থাকে। বর্ডার অর্জনের পরপরই এই সেন্টিমেন্ট সবচেয়ে তরতাজা থাকে। সময়ের সাথে সাথে (কোন বিশেষ কারণ না থাকলে) সেই দূরত্ব কমে। পরস্পরের প্রতি আস্থা তৈরি হয়। ভেঙ্গে-গড়ে বোঝাপড়ার একটা যায়গা তৈরি হয়।

ছোট দেশের সরকার যদি উন্নয়নের রাজনীতি করে বা জনগণকে দেবার মতো কোন প্রোগ্রাম থাকে, তবে তারা প্রতিবেশীর সাথে শান্তি আর সখ্যতার রাজনীতির পথে হাটে। আর সরকারের যদি দেবার মতো কিছু না থাকে, তবে তারা বড় রাজ্যকে জুজু হিসেবে জনগণের কাছে উপস্থাপন করে। সেই ভয়ানক জুজুর ভয় দেখিয়ে তারা রাজনীতি করে। সকল ব্যর্থতার দায় সেই প্রতিবেশী জুজু রাষ্ট্রের ষড়যন্ত্রের উপর চাপিয়ে, নিজেদের পিঠ বাঁচিয়ে, ক্ষমতায় থাকতে চায়।

পার্টিশনের পরে পাকিস্তানের শিকড়হীন শাসকরা সেই রাজনীতিই করতো। সর্বক্ষণ বর্ডারে অশান্তি বাধিয়ে রাখতো। শিক্ষা-গণমাধ্যমকে ভারত বিরোধী সেন্টিমেন্ট তৈরি করতে উপর্যুপরি ব্যবহার করতো। দেশরক্ষার নামে সেই ভণ্ডামির মাধ্যমে সেনা-শাসন বা সেনা সমর্থিত এলিট শাসন বজায় রাখতো। নিজেদের কায়েমি স্বার্থে বাধা আসলেই, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সংসদ বা কেবিনেট ভেঙ্গে দিতো ভারতের দালাল ট্যাগ দিয়ে।

ভারত-বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সেই বিষয়টি খুব বেশি প্রাসঙ্গিক হয়েছে। কারণ স্বাধীনতা-উত্তর সেই বর্ডার আবেগ ব্যাবহার করে গড়ে উঠেছিল বিএনপির রাজনীতি। যেই ৬টা দল: জাগদল (জিয়া প্রতিষ্ঠিত), মুসলিম লীগ, ন্যাপ (ভাসানী), ইউনাইটেড পিপলস পার্টি, বাংলাদেশ লেবার পার্টি ও বাংলাদেশ তফসিলি সম্প্রদায় ফেডারেশন নিয়ে বিএনপি গঠন করা হয়, এরা বেশিরভাগই পাকিস্তান আমলের সেই ভারত বিরোধী প্রচারণার রাজনীতির সৈনিক। দেশের মানুষের উন্নতির জন্য কাজ করার মেধা, দৃঢ়তা, সততা কোনটার প্রমাণই এরা পাকিস্তানে দিতে পারেনি। তাই তাদের ভারত বিরোধিতার রাজনীতি করা ছাড়া উপায় ছিল না। এদের রাজনীতির সহজ অস্ত্র ছিল – ভারতের জুজু ভয় এবং ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যাবার ভয়। এরাই দেশপ্রেম আর ভারত বিরোধিতাকে সমার্থক হিসেবে দাড় করিয়েছিল। এরাই সেসময় তারা প্রায় প্রতিষ্ঠিত করেছিল – যে ভারত বিরোধিতা করেন না, তিনি দেশদ্রোহী, অমুসলিম এবং ভারতের দালাল। পাকিস্তান ভেঙ্গে যাবার আগে পর্যন্ত তারা এই সেন্টিমেন্টটির উপর রাজনীতি করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। আর বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরে তারা পাকিস্তানের সেই রাজনীতির উত্তরাধিকারী হিসেবে, সেই রাজনীতিই করেছেন, করছেন।

তাই ভারত বিরোধিতা বিএনপির রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। প্রায় মেরুদণ্ডের মতো। এই স্তম্ভটির সাথে বিএনপির রাজনীতির আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট যুক্ত। যেমন আওয়ামীলীগকে ভারতের দালাল হিসেবে প্রচার, হিন্দু ঘেঁষা দল হিসেবে প্রচারের মাধ্যমে নিজেদেরকে (অটো) অপেক্ষাকৃত দেশপ্রেমিক বা ইসলাম প্রেমিক প্রচার করার সুযোগ।

কিন্তু আজ বিএনপির নেতাদের কাছে এ কি শুনছি আমরা? তারা বলছেন -বিএনপি ভারত বিরোধী রাজনীতি করে না !!! তাই সেখানে প্রশ্ন আসতেই পারে- ভারত বিরোধিতার মতো ভিত্তিপ্রস্তর ভেঙ্গে দিলে, এই বিএনপি কি আর সেই বিএনপি থাকে?

আমি বিএনপির সমর্থক না, তাদের রাজনীতিতে বিশ্বাসও করি না। তাই সে দলের কি হল তা নিয়ে আমার ভাবনা খুব বেশি নেই। আমি বরং আজ বিএনপিকে অভিনন্দন জানাবো এই কারণে যে- তার আজ এত যুগ পরে এসে তাদের মনের কথাটি মুখে এনেছে।

হ্যাঁ ভারত প্রেম বিএনপির মনের কথা। প্রকৃত অর্থে বিএনপি কোনদিন ভারত বিরোধী দল ছিল না। তারা ভারত বিরোধী সেন্টিমেন্টটি শুধুমাত্র জনগণে ধোঁকা দিয়ে সমর্থন আদায় করতে ব্যাবহার করেছে। রাজনৈতিক জাঁতাকলে পড়ে আজ সেটা সর্বসমক্ষে প্রকাশ হচ্ছে দেখে একটি জাতিয় সত্য উদ্ঘাটনের আনন্দ পাচ্ছি। জনগণের বিএনপির বহুরূপী ধোঁকা থেকে মুক্তি পাবার সুযোগ দেখছি। বিএনপির এতদিন ধরে প্রচার করে আসা হিসেবগুলোর মিথ্যের চাদর একে একে খসে পড়ছে বলে স্বস্তি পাচ্ছি।

বিএনপি সবসময় ভারতের প্রভুদের সাহায্যে ক্ষমতায় বসায় বিশ্বাস রাখে। তাদের জ্ঞানী সমর্থকদের সমীকরণ শুনতাম। দিল্লির মসনদ ভাজপা (ভারতীয় জনতা পাটি)-এর দখল থাকলে ইসলামাবাদে ক্ষমতা পায় মুসলিম লীগ আর ঢাকা’য় গদিতে বসে বিএনপি-জামাত। ঐতিহাসিকভাবে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের। কংগ্রেসের সাথে ভাজপা’র বিরোধ থাকায় বাংলাদেশের ক্ষমতায় হিন্দুত্ব জাতীয়তাবাদী দলটি কখনও মেনে নেবে না বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে। এসব সমীকরণে ভর করে গত বছর যখন ভারতের সাধারণ নির্বচনে এনডিএ (জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট) জয়লাভ উপলক্ষে মিষ্টি বিতরণ করে বিএনপি-জামাতের লোকজন !!! ভারতের ষোড়শ লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা হওয়ার পরপরই বিএনপির বিভিন্ন ফেসবুক পাতার মাধ্যমে জানতে পারলাম – তারেক রহমানের গিয়াস উদ্দিন আল মামুন ছাড়াও আরেক জন কাছের বন্ধু আছে। তাঁর নাম: নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদী, ফ্রম গুজরাট। শাকাহারী এই ভদ্রলোক গুজরাটি ভাষায় কবিতা লিখতে ভালোবাসেন এবং ভারতের পঞ্চদশ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করতে যাচ্ছেন। মোদীর সাথে তারেকের বন্ধুত্ব দেড় যুগ / দেড় দশকের। আবার বিএনপি-জামাত কর্মীদের তখন দিনগোনা শুরু, এই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের পতন হল বলে। পালে আরও হাওয়া লাগায়, খালেদা জিয়া। তিনি নতুন পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেন। মার্কেটে তখন জোর হাওয়া, শপথ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত তারেক এবং খালেদা জিয়া। মোদী দিল্লির মসনদে বসবে আর এই দিকে আওয়ামী লীগের সরকার পড়বে। দেখতে দেখতে ২৬ মে ২০১৪ চলে আসে। নরেন্দ্র মোদীর শপথ অনুষ্ঠানে রাইসিনা হিলের রাষ্ট্রপতি ভবনে প্রায় চার হাজার দেশি-বিদেশি বিশিষ্ট ব্যক্তি আমন্ত্রণ পেলেও, বিএনপি’র কাওকে দেখা যায় না !!! তবে ক’দিনের মধ্যে মোদী গল্পের সিকুয়েল আসে, গণমাধ্যমে জানানো হয় তারেক জিয়াকে ভারত সফরে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। এক বছর হয়ে গেল বেগম জিয়া বা তার সন্তানকে দেখা গেল না ৭ নম্বর, রেস কোর্স রোডের বাড়ীতে কিংবা, সাউথ ব্লকের পিএমও-তে! আবার এইতো সেদিন – মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ভারত সফর শেষ হওয়ার পরপরই বরখাস্ত হন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং। বিএনপি-জামাত শিবিরে বিশাল উৎসব। যেন প্রেসিডেন্ট ওবামা বলে গেছেন, সুজাতা সিং থাকলে বাংলাদেশের ক্ষমতা থেকে আওয়ামী লীগকে সরানো যাবে না। নরেন্দ্র মোদী সেই প্রেসক্রিপশনে মেনে সুজাতা সিংকে সরিয়ে দিয়েছে। এবার আওয়ামী লীগকে সরানোর পালা। বিএনপি-জামাতের সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার করে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার এখনও বহল তবিয়তে টিকে আছে !

বিএনপি প্রচার করে তারা ইসলামিক জাতীয়তাবাদের ধারক-বাহক, আস্তিক/নাস্তিকের সনদ দেওয়া কর্তৃপক্ষ। হায়রে ইসলামিক জাতীয়তাবাদ ! নরেন্দ্র মোদী প্রকাশ্যে ১০০ ভাগ হিন্দুত্ব-বাদী নেতা। যেই গুজরাত দাঙ্গার ঘটনায় বিএনপি-জামাত এদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন করলো, সেই দাঙ্গার ঘটনায় আজ পর্যন্ত তিনি দুঃখ প্রকাশও করেন নি। সেই মোদী ভারতের প্রধানমন্ত্রী হচ্ছে বলে উল্লাস প্রকাশ করেছে ইসলামিক জাতীয়তাবাদী দুই দল বিএনপি এবং জামাত !!! খালেদা জিয়া বাসা ছেড়ে গুলশান কার্যালয়ে বসে (৭ জানুয়ারি রাত সাড়ে ১০টায়) ভাজপা সভাপতি অমিত শাহ কর্তৃক স্বাস্থ্যের খবর নেয়া বিষয়ক মিথ্যা খবরের উচ্ছ্বাসিত প্রচার করে!! । এই অমিত শাহ কে ২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গার জন্য দায়ী কার হয়। যিনি এক মুসলিম দম্পতিকে অপহরণ এবং বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে হারিয়েছেন গুজরাট মন্ত্রীসভার গৃহ-মন্ত্রীর (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) চাকরী। এ অভিযোগে ৩ মাস জেল খেটে জামিনে মুক্ত হন এই গুজরাটি রাজনীতিবিদ। তিনিই হলেন ইসলামিক জাতীয়তাবাদী নেতার শক্তির খাম্বা !

বিএনপি প্রকাশ্যে ভারত বিরোধিতা করে (আর তলে তলে ভারত প্রেম করে) আমাদের কি লাভ করে দিয়েছে? বিএনপি-জামাতে দেখাতে পারবে না দ্বিপাক্ষিক একটা ইস্যুতে সফল সমাধান। অথচ ভারতকে সব চেয়ে বেশি সুবিধা দিয়েছে বিএনপি-জামাত। দেশের বাজার তো তারাই উন্মুক্ত করে দিয়েছে ভারতের ব্যবসায়ীদের। জাপানি রিকন্ডিশন গাড়ি ছলে-বলে বন্ধ রেখে ভারতের গাড়িতে বাজার সয়লাব করেছে। ভারতীয় অপসংস্কৃতির দোহয় দিয়ে ভারতীয় শিল্পীদের এ দেশে পারফর্ম করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন জিয়াউর রহমান। খালেদা জিয়া তারই উন্মুক্ত করে দিয়েছিলনে ভারতীয় টিভি চ্যানেলের প্রচার। ১৯৯৭ সালে পার্বত শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের সময় তৎকালীন বিরোধী দল বিএনপি ব্যাপক বিষোদগার করে বলেছিল, এই চুক্তি ভারতের স্বার্থে করা হল, এর ফলে দেশের ফেনী পর্যন্ত ভারত হয়ে যাবে। কিন্তু পরবর্তীতে ২০০১-২০০৬ সালে বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালীন চুক্তির বিরুদ্ধে একটা কথাও বলেনি, বরং তা বাস্তবায়নের জন্য লোক দেখানো কিছু নিষ্ফল পদক্ষেপও নিয়েছিল। খালেদা জিয়া প্রথম দফায় ক্ষমতায় থাকার সময় ভারত সফরে গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যার কথা আলোচনা করতে ভুলে গেলেও, শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে ভারতের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ৩৩ হাজার কিউসেক পানির নিশ্চয়তাসহ ৩০ বছর মেয়াদী গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি করেন এবং ৩০ বছর পার হলে অটোমেটিক মেয়াদ বৃদ্ধির শর্ত যুক্ত করেন। অথচ খালেদা জিয়া এই চুক্তিকে বলে ছিলেন ‘নতজানু চুক্তি’ এবং এর মাধ্যমে বাংলাদেশকে বিকিয়ে দেয়া হয়েছে। তিনি কিন্তু পরেন টার্মে ক্ষমতায় ছিলেন। তিনি সে চুক্তিবাতিল করে নতুন করে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি করেনি। বিএনপি-জামাত ১৯৭৫-পরবর্তী ৪০ বছর ধরে ‘মুজিব-ইন্দিরা’ স্থলসীমান্ত চুক্তিকে (LBA)’ ‘গোলামির চুক্তি’ বলে এসেছে। ১৯৭৫-১৯৮১, ১৯৯১-১৯৯৬ (জামাতের সমর্থন নিয়ে), ২০০১-২০০৬ (জামাতের সাথে) তারা ক্ষমতায় ছিল। সেই ‘গোলামির চুক্তি’ বাতিল করতে তো টু শব্দটি করেনি !!

এই হল বিএনপি-জামাতের ভারতবিরোধীতার রাজনীতি। ভারতবিরোধিতার স্লোগান তুলে ধর্না দেয় দিল্লির দরবারে। বিভিন্ন ব্যক্তি এবং সংগঠনের গায়ে ‘ভারতের দালাল’ ট্যাগ লাগিয়ে ‘ভারত হয়ে যাবে’ জপ করে ৪০ বছর ধরে রাজনীতির করছে তারা। এখন তো জনগণের কাছে পরিষ্কার কারা ‘ভারতের কি’! যে সব বিএনপি-জামাত নেতা এতদিন ভারতবিরোধী রূপকথা শুনিয়ে কর্মীদের উজ্জীবিত করেছে; গেল এক বছর তারা কর্মীদের শুনিয়ে এসেছে, এই নরেন্দ্র মোদীর সরকার শেখ হাসিনাকে পদত্যাগের বাধ্য করে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ব্যবস্থা করে দিচ্ছে। বিএনপি-জামাত ক্ষমতায় আসবে। লন্ডন থেকে তারেক জিয়া দেশে ফিরে আসবে। মুক্তি পাবে যুদ্ধাপরাধীরা।

তাই বিএনপি-জামাত ভারতের শাসকদের সমর্থন পাবার জন্য আজ মরিয়া। তারা তাদের নিজের ইসলামি জাতীয়তাবাদী পরিচয়কে বিসর্জন দিয়ে নির্লজ্জ ভারত তোষণে নিযুক্ত হয়েছে। গত বছর জুনের শেষে দিকে ভারতের বিদেশমন্ত্রী (পররাষ্ট্রমন্ত্রী) সুষমা স্বরাজের ঢাকা সফরে, প্রোটোকল শিকেয় তুলে, তিন বারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া মাত্র ১০ মিনিটের জন্য দেখা করে ধন্য হলেন (এই ঘটনায় মনে পড়ে বিএনপি প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট জিয়ার কথা। তিনিও ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোরারজী দেশাইয়ের সাথে দেখা করার জন্য হোটেল লবিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন কয়েক ঘণ্টা)। আজ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ঢাকায় আসা উপলক্ষে বিএনপি-জামাত বিয়ের উৎসবে মেতেছেন। বিএনপি-জামাত তাদের নানান লবি ধরে জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে খালেদা জিয়ার সাথে তাঁর মিটিংয়ের- অন্তত একটা ফটো সেশনের। যেটা দেখিয়ে নেতাকর্মীদের বলতে পারে, আর ক’টা দিন সবুর করো, পাকা কথা হয়ে গেছে, ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করছে খালেদা জিয়াকে পিএমও, তারেক জিয়াকে ‘হাওয়া ভবন’ আর সাঈদীকে মাইক্রোফোন।

তবে যেখানে পিঁয়াজ থেকে শুরু করে কোম্পানির সিইও, বামপন্থি বিপ্লব (!) থেকে শুরু করে ডানপন্থী উগ্রতা, এমনকি ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ও আমদানি হয়েছে সীমান্তের ওপার থেকে; সেখানে নয়াদিল্লী’র খরা-ঝড়-বৃষ্টি-শীত-বসন্তের প্রভাব ঢাকায় পড়বে না, তা হয় না। না চায়লেও শুধু মাত্র ভৌগলিক কারণে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশ: আফগানিস্তান, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, মায়ানমার, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ আর বাংলাদেশের রাজনৈতিক হিসাব-সমীকরণে ভারত ফ্যাক্টর। দেশবিভাগের পর থেকে পাকিস্তানি নেতা আর জেনারেলরা ‘ভারত বিরোধিতা’র ইমোশনাল কথা বলে উল্টো রথে দেশটাকে নিয়ে গেছে ব্যর্থ রাষ্ট্রের দিকে। আমাদের দেশেও ‘ভারত’ ইস্যুটা কাজে লাগিয়ে, বিএনপি-জামাত প্রচার করে- এ দেশর স্বাধীন সার্বভৌমত্বের প্রতি একমাত্র হুমকির নাম ‘ভারত’। আর এই হুমকি মোকাবেলা করতে পারে একমাত্র ‘সাচ্চা দেশপ্রেমিক’ জোট ‘বিএনপি-জামাত’। কিন্তু এই ‘সাচ্চা দেশপ্রেমিক’ এতবার ক্ষমতায় থেকেও আদায় করে আনতে পারেনি কোন ন্যায্য অধিকার, সমাধান করতে পারেনি একটাও বিবদমান ইস্যুর। জ্ঞানিজনেরা বলে গেছেন, ‘দেশ কি দিয়েছে তা নয়, দেশকে কি দিয়েছ তা ভাব।’ একটু ভেবে দেখুন তো বিএনপি-জামাত জোট কিছু রূপকথার গল্প, কয়েকটা সস্তা স্লোগান আর ঘৃণার রাজনীতি ছাড়া আর কি দিয়েছে?

বিএনপি-জামাতের রাজনীতির সব চেয়ে বহুল আলোচিত স্লোগান ছিল ‘আওয়ামী লীগকে ভোট দিলে দেশ ভারত হয়ে যাবে।’ ১৯৯৯ সালের ১১ নভেম্বর তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া , ঢাকার সাভারে এক বক্তৃতায় বলেছিলেন, “বর্তমান সরকার বাংলাদেশকে ভারতের অঙ্গরাজ্য করবার জন্য সব কিছু পাকাপোক্ত করেছে। তিনি (শেখ হাসিনা) আজ প্রধানমন্ত্রী নন। অঙ্গরাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে চান। এই সরকার ধর্মের উপর আঘাত হানছে। এখন সন্ধ্যায় মসজিদ থেকে আজান ভেসে আসে, কিছু দিন পর ভেসে আসবে উলুধ্বনি, শংখধনি”। আওয়ামী লীগ ১৯৭১-৭৫, ১৯৯৬-২০০১ এবং ২০০৮ থেকে বর্তমানে দেশের ক্ষমতায় আছে। দেশ তো ভারত হয়নি। তার উপরে দীর্ঘ দিনের জল-স্থল-সীমানা সহ বহু দ্বিপাক্ষিক ইস্যু সমাধান হয়েছে। এদিকে ভাগ্যের নির্মম পরিহাস- সেই বিএনপি-জামাত স্বাধীন সার্বভৌম দেশে ভারতীয় হস্তক্ষেপের জন্য মরিয়ে হয়ে উঠেছে।

আজ বিএনপি-জামাতের কথায় কাজে স্পষ্ট, তারা ভারত বিরোধী সেন্টিমেন্ট প্রচারের রাজনীতি করবে না। বরং ক্ষমতায় যাবার জন্য তারা যেকোনো মূল্যে ভারতের আশীর্বাদ প্রত্যাশী। সেই আশীর্বাদের প্রয়োজনে তারা তাদের দলের ভিত্তি ও দর্শনকে বিসর্জন দিতে চায়। এতদিনের দলিয় অবস্থানকে মিথ্যা ঘোষণা করতে চায়। স্বার্থের জন্য এসব করা বিএনপির জন্য নতুন কিছু না। কিন্তু সেই লেনদেন গোপন করে ভারত বিরোধী ইমেজ ধরে রাখাই ছিল তাদের রাজনীতির ভিত্তি। আজ যদি তারা সেটুকুও বিসর্জন দেয়, তবে দল হিসেবে তাদের আর থাকে কি?

পরিশেষে দু লাইন যোগ করি:- বাইরে বিরোধিতা, গোপনে প্রেম- এটা হয়ত চলে। তবে সেই প্রেমেও বিশ্বস্ত থাকতে হয়। কিন্তু বিএনপি-জামাতের প্রেমে বড় ছাঁকা খেয়েছিল ভারত। যারা দুটি ঘা আজও দগদগে হয়ে আছে। আইএসআইএর পয়সা নিয়ে সেভেন সিস্টারের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের “স্বাধীনতা সংগ্রামী” বলে সহায়তা করা, আর ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলা।

Read Previous

উদ্যোক্তা সিরিজ- ব্রান্ডিং-০১

Read Next

কবিতা আর কবির ভক্ত রাজনীতির কবি বঙ্গবন্ধু