Breaking News :

কোন পথে চলেছে আমাদের প্রাণের ফুটবল?

বাংলাদেশ জাতীয় দলে বিদেশি খেলানোর উদ্যোগের খবর শুনে অনেক বড় ধাক্কা খেলাম।

ফুটবল বাঙালির প্রাণের খেলা। বিভাগউত্তর কালে কলকাতার ফুটবলে পূর্ববাংলার দাপটের ইতিহাস কারো ভুলে যাওয়ার কথা নয়। পৃথিবীর ইতিহাসে যুদ্ধকালীন প্রথম ফুটবল দল ‘স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল’ ছিল আমাদের। ফুটবল গ্রাস রুট লেভেলে কতটা জনপ্রিয় ছিল তা এই সময় বলে বোঝানো সম্ভব নয়। নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত মহল্লার মাঠ থেকে জাতীয় স্টেডিয়াম কাঁপিয়েছে ফুটবল। কিন্তু তারপরে? আমাদের অবস্থা এই পর্যায়ে পৌঁছে যে আমদের জাতীয় দলে ভাড়াটে ফুটবল খেলাতে হচ্ছে!

হাল আমলে ক্রিকেট এগিয়ে গেলেও; বাঙালির ফুটবলের ভালোবাসা আজও কমেনি। এদেশে ল্যাটিন-ইউরোপিয়ান জাতীয় দলগুলোর সাথে সাথে সমান জনপ্রিয় ইউরোপের ফুটবল ক্লাবগুলো। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে জাতীয় দলের যেকটা ফুটবল ম্যাচ হয়েছে দর্শকের কমতি দেখিনি। তাহলে এই দুর্দশায় কেন আমাদের ফুটবলে?

ইউরোপের ক্লাব ফুটবল সংস্কৃতি যখন ডানা মেলেছে তখন তো আমাদের এখানেও শুরু হয়েছিল ক্লাব ফুটবলের জয়যাত্রা। আমাদেরও রয়েছে শত বছর পুরনো ক্লাব। আমাদের ফুটবল স্বর্ণযুগে যারা কর্তাব্যক্তি ছিল তারা হয়তো দূরে চিন্তা করেনি কিংবা তাদের ভবিষ্যৎ চিন্তা করার মত সমর্থ ছিল না। দেশে পেশাদার ফুটবল লীগ চালু হলেও ক্লাবগুলো কি পেশাদার হয়েছে? এখনও স্থায়ী আয়ের উৎস তৈরি করেছে? রয়েছে নিজেদের মাঠ?

গত ছয় বছর জেলা পর্যায়ে ফুটবল না হওয়ায় সারা দেশে প্রায় পাঁচ হাজার ফুটবল ক্লাব বন্ধ হয়ে গেছে। সম্ভাবনাময় খেলোয়াড়রা ফুটবল ছেড়ে বেছে নিয়েছেন অন্য পেশা। কেউ হয়েছেন মুদি দোকানদার, কেউ ভ্যানচালক। আবাহনী ও মোহামেডানের সঙ্গে টেক্কা দেওয়া ওয়ান্ডারার্স, দিলকুশা, ইস্টএন্ড আজাদ স্পোর্টিং ক্লাব, জায়ান্ট কিলার সেসব ক্লাব এখন সাইনবোর্ডসর্বস্ব হয়ে পেড়েছে। বিজেএমসি, পিডব্লুডি, ওয়াপদা, সাধারণ বীমা, রেলওয়ে, কাস্টমস, পোস্ট অফিস, চলন্তিকা ও বিআরটিসির মতো অফিসপাড়ার ক্লাবগুলোর হারিয়ে গেছে।

দেশে ফুটবলারের অভাব হলেও ‘সাচ্চা’ ফুটবল সংগঠকের অভাব দেখি না! ক্লাবে-বাফুফে-তে পোস্ট বাগিয়ে প্রায় গণমাধ্যমে দেখি ফুটবল নিয়ে তাদের নাকে কান্না। দেশে মানসম্মত ফুটবলার নেই, মাঠ নেই, একাডেমি নেই। গত কয়েক বছর ধরে ঘরোয়া ফুটবলে ক্লাবগুলো দেশি স্ট্রাইকার নিয়ে দল না সাজিয়ে সস্তায় বিদেশি স্ট্রাইকার এনে দল সাজিয়ে দেশি স্ট্রাইকার তৈরির পথ বন্ধ করেছে। নিরুৎসাহ করা হয়েছে দেশি খেলোয়াড় তৈরিতে।

যেখানে সিলেট একাডেমি নিয়ে বাফুফের নাটক স্টার প্লাসের সিরিয়ালে রূপ নেয়, সেখানে অর্থনীতিতে আমাদের থেকে পিছিয়ে থাকা নেপালের অল নেপাল ফুটবল ফেডারেশনের (আনফা) রয়েছে তিনটি ফুটবল একাডেমি। এর বাইরে ব্যক্তিগতভাবে চলছে আরও দুটি। গত দশ বছরে নেপাল যেখানে এগিয়ে গেছে সেখানে আমরা লাল-সবুজ জার্সি পারানোর জন্য ফুটবলার ভাড়া করছি। আমার ভাইয়েদের কাছে আমাদের জাতীয় দলের জার্সির যে গুরুত্ব তা কি বিদেশি পেশাদার খেলোয়াড়ের কাছে সমান। ক্রিকেটে যে তৃপ্তি নিয়ে বলি হাবিবুল বাশার সুমন আমার এলাকার বড় ভাই। সেই তৃপ্তি কি পাবো বাইরে থেকে কাওকে ভাড়ায় নিয়ে এসে? আমার দেশের ছেলেরা জিতলে যে আনন্দ পাই। বিদেশি খেলিয়ে জিতলে কি সেই আনন্দ পাবো?

ভাড়াটে প্লেয়ার খেলানো পৃথিবীতে নতুন নয়। তাই বলে কি ওরা নিজেদের খেলোয়াড় তৈরির রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে?

আমাদের ফুটবলকর্তা বলছে জাতীয় দলে ভাড়ায় প্লেয়ার খেলানোটা সাময়িক। এখানে ”সাময়িক” বলতে কত দিন বোঝানো হয়েছে? যে তিনজন ফুটবলার নেয়া হচ্ছে তাদের বয়স ত্রিশ বা এর কাছাকাছি। তারা কতদিন খেলতে পারবে? গত কয়েক দশকে আমরা যে পিছিয়ে পড়েছি, তা কি এই ‘সাময়িক’ সময়ের মধ্যে সেরে যাবে? নাকি মৃত্যুর পথে আরো এক ধাপ এগিয়ে যাবে আমাদের প্রাণের ফুটবল।

Read Previous

পেশা পরামর্শ সভা | ক্যারিয়ার গাইড | চাকরির টার্গেট ঠিক করা

Read Next

ইনবক্স মেসেজ – আমাদের ও কি পরিণতি হবে মুক্তিযোদ্ধা আইয়ুব খানের মত?