বেঞ্জী সাহেব- শচীন ভৌমিক [ প্রিয় গল্প সংগ্রহ ] Benji Shaheb -Sachin Bhowmick

বেঞ্জী সাহেব। নাম জিজ্ঞেস করলে বলত—ফিলিপ ডি রোজারিও। অথচ বাইরের লোক ডাকে ওই বেঞ্জী সাহেব বলে, কেউ কেউ বা পাগলা সাহেব। ফিলিপ ডি রোজারিও কি করে রূপান্তরিত হল বেঞ্জীতে, সেটা গভীর এক গবেষণারই বিষয়। কে জানে, এ’দেশের লোক ইংরেজীকে বলে ইঞ্জিরি, সে ‘ঞ্জ’ টাই ফিলিপ সাহেবের দু’টি প্রখর বেজীর মতো চোখ থাকায় ‘বেজী’ কথাটার সঙ্গে জুড়ে গিয়ে ওই অদ্ভুত শব্দটার উৎপত্তি হয়েছিল কিনা, ব্যঙ্গের পলস্তারাতেই বুঝি বেজী দাঁড়িয়েছিল বেঞ্জীতে।

বেঞ্জী সাহেব- শচীন ভৌমিক [ প্রিয় গল্প সংগ্রহ ] Benji Shaheb -Sachin Bhowmick

বেঞ্জী সাহেব নামেই সাহেব। ইংরেজী ভাষায় তার জ্ঞান ‘টেক্ টেক্, নো টেক্ নো টেক্, একবার তো সি’—জাতীয়। ব্যাস্, তার বেশী নয়। খ্রীষ্টধর্মে দীক্ষা ওদের এক পুরুষের মাত্র। শোনা যায়, হঠাৎ মেঘনাপার রাণীচক গাঁয়ে নিকলসন নামে এক বুড়ো পাদ্রী হাজির হয়েছিলেন একদা, পরম কারুণিক যীশুর বাণী নিয়ে তিনি এদের গাঁয়ের পাপী-উদ্ধারের মহৎ ব্রত নিয়ে জোর প্রচারণায় নেমে যান,লোভের কাজল টেনে সারা রাণীচকের জেলে, ভূঁইমালী নমশূদ্রদের দীক্ষিত করে ফেলেন খ্রীষ্টধর্মে।

দেখতে দেখতে একটা গির্জে গজিয়ে উঠল তরাসগঞ্জে, স্কুল গড়ে উঠল দুধপলাশপুরে সেন্ট নিকলসন ইনষ্টিটউট নামে, বোর্ডিং-এর নাম রাখা হল মহারাণী ভিক্টোরিয়া ছাত্রাবাস। এমনকি মেঘনাপার রাণীচকে একটা ছোট্ট স্টিমার স্টেশন পর্যন্ত হয়ে গেল বুড়ো নিকলসনের চেষ্টায়। ভিনি, ভিডি, ভিসি। এই নিকলসনের আমলেই বেঞ্জী সাহেবের বাপ কুঞ্জ ভূঁইমালী খ্রীষ্টান হয়ে গেল। কুঞ্জ ভূঁইমালীর ছেলের নাম হল—ফিলিপ ডি রোজারিও।

ফাদার নিকলসনকে আমি দেখিনি। তবে শুনে শুনেই তার সম্বন্ধ অনেক জেনেছিলাম। আমি ছিলাম সেন্ট নিকলসনের স্কুলেরই ছাত্র, ভিক্টোরিয়া বোর্ডিংএরই বোর্ডার। নিকলসনের কথা আমরা শুনেছি হেড মাস্টার স্যামুয়েল হরেন সরকারের গদগদ বক্তৃতায়, আর মাঝে মাঝে তাঁর স্থলাভিষিক্ত ফাদার গ্রেগরীর
সুসমাচার পাঠের ফাঁকে ফাঁকে। অজস্র ‘ট’ ভারাক্রান্ত বাংলায় ঈশ্বরের পুত্রের কাহিনীর মাঝে মাঝে তেজপাতার মতো ছড়ানো থাকতো টুকরো টুকরো নিকলসনের গল্প।

বেঞ্জী সাহেবের সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎকার মনে রাখবার মতো। সাহাদের ছোটবাবু নতুন ঘোড়া কিনেছে। মস্ত কালো এক আরবী ঘোড়া। ঘোড়াটা দেখা গেল একটু পাগলাটে গোছের। পিঠে উঠেছো কি কথা নেই, খানিকবাদে এমন বিশ্রী চার’পা ছুড়ে উর্ধ্ব শ্বাসে দৌড়োবে যে সওয়ারকে ছিটকে না ফেলে সে আর থামছে না। বাগ মানতে সহিস গলদঘর্ম। মনে আছে ছোটবাবু প্রথমবার চড়তে গিয়েই পড়ে পা মচকালেন চৌষটি টাকা ভিজিটের ডাক্তার এলো ঢাকা থেকে।

সহিসটি থাকতো আমাদের বোর্ডিং-এর সর্বশেষ ছোট কানা কুঠুরীটায়। সঙ্গে ছিল তার দুটি মেয়ে আর একমাত্র ছেলে ঘেটু। ওই তার সংসার। দুরন্ত ছেলে এই ঘেটু। বুদ্ধিতে পাকা, শয়তানিতে চৌকস, স্বাস্থ্যে টইটম্বুর। একদিন রোববারের দুপুরে আস্তাবল থেকে বাপের চোখ ফাঁকি দিয়ে ঘেটু ঘোড়া নিয়ে উধাও। সহিসের চেঁচামেচিতে জানা গেল ঘটনাটি। খোঁজ, খোঁজ, খোঁজ, কোথায় গেল………

বেলা তিনটে নাগাদ রক্তাক্ত মৃত ঘেটুকে পৌছে দিয়ে গেল কিছু লোক। নকুড়হাটা পোলের নিচে নাকি পড়েছিল দেহটা, ঘাড়টা ভেঙে দুমড়ে গেছে, মুখটা থ্যাঁতলানো, সারা গায়ে ক্ষতচিহ্ন। নিহত ঘোড়াটাকে পাওয়া যায় তিনদিন বাদে সেনডাঙার পুলিশ স্টেশনে। জনা দুই শিশুকে মেরে ফেলে আরও অনেককে আহত করে এক মুখ ফেনা নিয়ে পাগলা ঘোড়াটি যখন তাণ্ডবে মেতে উঠেছিল তখন বড় দারোগার নাকি গুলি করা ছাড়া অন্য উপায় ছিল না।

পুলিশ-টুলিশের হাঙ্গামা চুকতে বেশী সময় লাগল না। তারপর ঠিক হল, আমরা বোর্ডিং-এর ছেলেরাই ঘেটুকে শ্মশানে নিয়ে যাবো।

শ্মশানে গিয়ে যখন পৌঁছুলাম তখন বেলা গড়িয়ে আসছে। সারা রাস্তা ধরে সহিসটি বাচ্চা ছেলের মতো একটানা কেঁদেছে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে। মেয়েটিও। মৃতদেহ নামিয়ে মেঘনার জলে হাত পা ধুয়ে সব ওপরে উঠেছি, এককোণে কাঠ মেপে মেপে দিচ্ছিল শ্মাশানের মধু ডোম, এমনি সময় ছেঁড়া একটা হাঁটু পর্যন্ত গোটানো ফুলপ্যান্ট, আঙুল বেরিয়ে থাকা কেড-শু, (যার রঙ কোনদিন সাদা ছিল বললে এখন ইতিহাস বংশক্রম বিচার করে তবে বিশ্বাস করতে হবে) কালো রঙের সাদা ছোপ ছোপ একটা ছেঁড়া শার্ট, বেঢপ-একটা ফেল্টের টুপি, কাঁধে একটা চটা-ওঠা প্লেট ক্যামেরার বোঝা,– এই বিচিত্র বেশভূষায় একটা লোক এসে হাজির হল।

লোকটার গায়ের রঙ অস্বাভাবিক কালো, আর মুখটায় যেন আরেক প্রস্ত আলকাতরা মাখানো। চোখ দুটো বেড়ালের চোখের মতো ছুঁচালো, কুতকুতে; লাল আর তীক্ষ্ণ, একটা বন্য হিংস্রতার ক্রুর। অস্বস্তিকর চাউনি। এসেই নিরুত্তাপ কণ্ঠে প্রশ্ন করে বসল,– মড়ার ছবি তুলতে হবে কেন?

–ছবি?—সমস্বরে প্রশ্ন করলাম আমরা।

–হ্যাঁ, ছবি না তো ম্যাজিক লণ্ঠন? তা ম্যাজিকও বলতে পারো। এমন ছবি তুলে দেব যে দেখে মনে হবে জ্যান্তো,– নিষ্ঠুর কর্কশকণ্ঠে একগাল হেসে নেয় সে,– কি, দেব তুলে? চার্জ খুব কম, ‘ডেথ কনসেশান’ পাবে তার ওপর। তুলবো?—আশ্চর্য, লোকটার কণ্ঠস্বর কি নিরুদ্বিগ্ন, শান্ত। যেন কোন পিকনিকের ছবি তুলতে এসেছে ও, এমনি খুশিয়াল। শিবকে যে সবচেয়ে আপনভোলা নির্লিপ্ত কল্পনা করা হয়, তিনি কি এর চেয়েও নির্বিকার? এর চেয়েও উদাসীন?

আশ্চর্য মানুষ তো! আমাদের বিস্ময়ের ঘোরই কাটতে চায় না। খানিক বাদে একজন শুধোল সহিসকে,– কি সহিস, ছেলের কোন ছবি রাখবে নাকি? আবার হাউমাউ করে এক পশলা কেঁদে নিয়ে সে জানালো, এ’রকম বীভৎস ক্ষতবিক্ষত মুখের ছবি রাখলে সে পাগলা হয়ে যাবে। না, তার কোন ছবি চাই না ছেলের।

পাগল নাকি,– কৌতুক কণ্ঠে হাসিতে ফেটে পড়ে লোকটি,– তোমার ছেলের চেহারা কোন কালে যিশাস ক্রাইস্ট ছিল বাপু, এতেই বরং বেশ চমৎকার দেখাচ্ছে। আত্মহত্যার কেসগুলোতে মাইরী চেহারাটা যেন আরো খোলতাই হয়। সেদিন রাজু মল্লিকের মেয়েটার কেরোসিন-পোড়া মুখটা, আহা, যেন মাদার মেরীর মতো দেখাচ্ছিল। শালী কোন পরপুরুষের ইয়ে ধরেছিল পেটে কে জানে। তা বেটির মরতেও হল। মরলো কেরোসিন ঢেলে—হো—হো করে এক ঝলক তেতো অশ্লীল হাসি হেসে ওঠে বেঞ্জী।

–চুপ করো,– লোকটার অসহ্য ইতরতায় চিৎকার করে ওঠে আমাদেরই একজন।
–যাও তুমি কেটে পড়। আমাদের কোন ছবিটবি চাই নে। এখন যাও,– আরেকজন তাড়া লাগাল।
–চাই না ছবি? খুব সামান্য চার্জ ছিল কিন্তু। পার শট ওনলি সিক্স আনাস। আর মাইরী, ওই ছুঁড়ি দুটো কেমন কেঁদে কেঁদে বেড়ে সুন্দরী হয়ে গেছে। ওই দুটোকে মড়ার পাশে বসিয়ে ছবি তুললে, আঃ চমৎকার ছবি হয়। মনে হবে বায়োস্কোপের ফাস্ট ক্লাস একখানা সিন। হুঁ—তুমি এক্ষুনি এখান থেকে যাবে কিনা বলো,– আমাদের একজন তেরিয়া হয়ে রুখে উঠলো। জামার আস্তিন গুটোতে থাকে সে রীতিমতো।

চুপ করে যায় বেঞ্জী। কয়েকটি মুহূর্ত কুতকুতে লাল চোখ মেলে তাকিয়ে থাকে বোবার মতো। তারপর হঠাৎ হেসে ওঠে খলখল করে,– শালার এদিক নেই, ওদিন। যে না একটা প্যাঁচার মতো মড়া তার জন্যে দরদ কতো, একেবারে পঞ্চম জর্জের মতো মেজাজ—বলেই আর দেরি করে না, মুখ ফিরিয়ে হাঁটা শুরু করে। সিংবাজার হাটমুখো রাস্তাটা ধরে বরাবর চলে যায়। কোথায় যাচ্ছে কে জানে?
পাগল নাকি,– বিস্ময়ে বলে উঠেছিলাম আমি।
–আজ্ঞে না বাবু, উই বেঞ্জী সাহেব, ওনার ওই প্রকৃতি,– বিকৃত উচ্চারণে বেঞ্জী সাহেবের পরিচয় জানায় মধু ডোম,– মড়া আলেই কুত্থেকে খবর পেয়ে যান, তক্ষুনি ছবি তুলতে আয়েন পাগল সাহেব, শকুনের মতো গন্ধ পান মড়ার। আর তেনার কথাবারতা উই রকম, পাগলের মতোন। কিন্তু খারাপ মুনিষ নন।

বেঞ্জী সাহেবকে সেই আমার প্রথম দেখা। আলাপটা তার বেশ কিছুদিন পরের ঘটনা। সে এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা।

দুধপলাশপুর থেকে মেঘনার দূরত্ব মাইলটাক পথ। প্রায় রোজ বিকেলেই আমরা কয়েকজন বন্ধুবান্ধব হাঁটতে হাঁটতে চলে যেতাম মেঘনা পার রাণীচক স্টিমার ঘাটে। কোনদিন খালি জেটিটার সামনে গিয়ে বসতাম পা ঝুলিয়ে, কোনদিন একটু দূরে মার্টিন সাহেবের পোড়ো বাংলা বাড়িটার বারান্দায় বসে আসর গুলজার করতাম, আবার কোনদিন মোটরলঞ্চের ঘাটে ভাসমান পল্টুনটায় গিযে বসতাম। এখানে মেঘনার চেহারাটা ভয়াল। এপার থেকে ওপার ধু-ধু। কালো কালো ঢেউয়ের দাপটে পল্টুন কাঁপতো থরথরিয়ে, অজস্র ঢেউয়ের মুকুটে পশ্চিমী রোদ রুপো গলাতো, ফেনার হাসিতে খুশির নুপুর বাজাতো, আর হাওয়ায় ভাসতো জলের মদো মদো গন্ধ। মেঘমিতা দুর্বার নদী মেঘনা, কালাবদর। ভাবতে এখনো রোমাঞ্চ জাগে, চোখের সামনে স্রোতবতী অজগরটা নড়ে ওঠে, দুর্বিনীত কালো ঘোড়ার মতো নেচে ওঠে উচ্ছৃঙ্খল নদীটা।

সেদিন রোজকার মতো বেড়াতে বেরিয়েছিলাম আমরা। মোট তিনজন। ঢেউএ দোল খাওয়া পল্টুনটার ওপর বসে সাহাদের ছোট বৌ’র বাচ্চা না হওয়ার কারণ থেকে ফুটবল টুর্নামেণ্টে আমাদের স্কুলের পরাজয়, হেডপণ্ডিতের নস্যির কৌটো চুরি থেকে, কাননবালার অভিনয় সব রকম আলোচনায় আসর সরগরম। একেবারেই খেয়াল করিনি ওদিকে আকাশে ঘনিয়ে আসছে আসন্ন ঝড়ের সংকেত কালবৈশাখী। মেঘের মুখ দেখে মেঘনা কামনাতুর আনন্দে উদ্বেল, বেপথুমতী শবরীর উল্লাসে যেন মেতে উঠেছে সে।

যখন খেয়াল হল ঝড় শুরু হয়ে গেছে। সোঁ-সোঁ হাওয়ার শিসটানা আওয়াজে কানে তালা ধরিয়ে দেয়। সেই সঙ্গে অশান্ত মেঘনার মাতলামি। প্রচণ্ড ঢেউ-এ আঁচড়াচ্ছে লোহার পল্টুনটা । ধুলোঝড় মেঘে চারদিক অন্ধকার। ব্রীজ পেরিয়ে হোস্টেলের দিকে দৌড়ুতে শুরু করলাম। কিন্তু যাবো কি, এক পা এগোচ্ছি তো হাওয়ায় হাটিয়ে দিচ্ছে দু’পা। এগোনো যাচ্ছে না। খানিক চেষ্টা করে ব্যর্থ হলাম। তখন আমাদের একজন চেঁচিয়ে বলল,– ওই যে আলো দেখা যাচ্ছে, ওখানে চলো উঠি। এ ঝড়ে এগোনো যাবে না মোটেই।

বেশ। রাজি সবাই। এবার সবার দৌড় আলোর নিশানায়। কোন পথে কোন জায়গায় যাচ্ছি কিছু জানি না। সে কি প্রাণান্তকর দৌড়। কাছে এসে দেখি সেটা মার্টিন সাহেবের পোড়ো বাংলোটা। কিন্তু এ বাড়িতে তো মানুষ থাকে না, তবে আলো এলো কোত্থেকে? ছমছম করে উঠল গা। ঝড়ের পাল্লায় এ কোথায় এসে হাজির হলাম আমরা?…
কিন্তু পেছনে সামনেঝড়ের চাবুক, ভাববার সময় কোথায় তখন। দৌড়ে বারান্দায় উঠে দাঁড়ালাম। সমস্ত বাংলো বাড়িটাই ঝড়ের দাপটে মটমট করে উঠেছে, হঠাৎ একটা দমকা হাওয়ায় চালের খানিকটা শন করে উড়ে চলে গেল। ভয়ে ভয়ে মুখ ঘুরিয়ে তাকালাম ঘরের ভেতরে আলোটার দিকে।

কে? জানালা দিয়ে একটা মুখ বেরিয়ে আসে। লণ্ঠনের লালাভ আলোয় লোকটাকে চিনতে কষ্ট হল না আমাদের। বেঞ্জী সাহেব। চমকে উঠলাম তিনবন্ধু। সেই শ্মশানচারী ফোটোগ্রাফার।
কে তোমরা, এসো ভেতরে এসো, ছাত্র বুঝি? –ভাবলেশ নিরুত্তাপ কণ্ঠ। দরজার দিকে এগোচ্ছিলাম আমরা হঠাৎ ধমকে উঠল বেঞ্জী সাহেব,– আঃ, ওদিকে নয়। দরজা এখন খোলা যাবে না। হয় জানালা দিয়ে এসে ঢোকো, নইলে বাইরে পড়ে ভেজো। যতসব জ্বালাতন বাবা– ।

তিনজনই মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলাম বার কয়েক। দরজা থাকতে জানালা কেন, কে জানে। লোকটার খারাপ মতলব-টতলব নেই তো কিছু?—
কালা নাকি তোমরা, শুনতে পাও নি? ঝড়ের ঝপটায় ভিজছ কেন, চলে এসো না ভেতরে। দরজাটা বন্ধ করতে অনেক সাজসরঞ্জাম কসরত করতে হয়েছে আমাকে। সে আমি কিছুতেই খুলতে পারবো না; বাইরে তোমরা মরে গেলেও না।–

অগত্যা নিপাট জানালা দিয়ে একে একে তিনজনই ভেতরে ঢুকলাম। না, বেঞ্জী সাহেব বলেছে ঠিকই । ভাঙা দরজাটা যে-ভাবে নানা ভাঙা আসবাবপত্রের স্তূফ দিয়ে ঠ্যাক দেওয়া হয়েছে, এখন তা সরাতে গেলেই হাওয়ার দাপটে বিস্ফোরণ অনিবার্য।

–হুঁ, তা হোস্টেলের ছাত্রই তো দেখছি। তা এত রাত্রে মেঘনা পারে আসা হয়েছিল কেন, মড়া পোড়াতে?—মুখটা কুৎসিত বিকৃত করে প্রশ্ন করে বেঞ্জী সাহেব।
চোখ ফিরিয়ে নিলাম। ও মুখের দিকে বেশীক্ষণ তাকালে সৌন্দর্যের সংজ্ঞাটাই বোধ হয় ভুলে যাবো। আলোটার চারদিকে কতগুলো জহরব্রতী পোকার প্রার্থনা শোনা যাচ্ছে আর বাইরে একটানা ঝড়ের গোঙানি।

সে রাতেই বেঞ্জী সাহেবের সঙ্গে আলাপ হল আমাদের। গভীর আলাপ। আবহাওয়া আর পরিবেশ কোনটার প্রভাবে কে জানে, আমাদের কয়েকাটি প্রশ্নের পরই থেকে, কখনও উত্তেজিত হয়ে, কখনও বিকৃত মুখভঙ্গী করে, কিছুটা অনাবশ্যক পায়চারি করে, ভাঙা কথার জটলায় যে গল্প গুলোও বলল—সেগুলোকে এক করলে যে সুসম্পূর্ণ একটা কাহিনী গড়ে ওঠে, তা যেমন করুণ, তেমনি মর্মস্পর্শী। যেন এক বিয়োগান্তক নাটকের পরাজিত সম্রাটের উপাখ্যান। তেমনি নিষ্ফলতা।

না আজকে ফসিল বেঞ্জী সাহেবকে দেখলে বোঝা যাবে না আগেরকার সেই যুবক ফিলিপ ডি রোজারিওকে। আজকের শিলাপাহাড়ের তলায় কোথাও নেই সে অনুভুতির এতটুকু অঙ্কুর, সে বিরাট প্রাণৈশ্বর্যের, সে কন্তুরীনাভির এতটুকু সুবাসও নেই। আজ শুধু তার ভস্মাবশেষ, আজ শুধু তার মমির কাঠিন্য।
কিন্তু একদিন সত্যি সত্যি এই বেঞ্জী সাহেবেরও হাসি কান্নার দিন ছিল, সর্বঋতুর আকাশ ছিল, সর্বরঙের সিস্ফনি।
আর ছিল টগর।

উপেন জলদাসের একমাত্র মেয়ে টগর দাসী। খ্রীষ্টান নয় ওরা, হিন্দুই। তবু কোন জাদুমন্ত্রে কে জানে, কে বলবে কোন দুঃসাহসে ভর দিয়ে ধর্ম অধর্মের সমস্ত বেড়া ডিঙিয়ে একটা ছেলে আর একটা মেয়ে ক্রমে একে অন্যের মনমানুষ হয়ে উঠল।

কিশোর বয়সেই ক্লাস সিক্সে তিনবার গড়াগড়ি দিয়ে সেই সে যেদিন গির্জে থেকে বেরিয়ে ডুমুরগাছের তলায় হঠাৎ রেবেকার ঢিলে ছেঁড়া শাড়িটা এক হ্যাঁচকা টানে খুলে দিয়ে দৌড়ে পালিয়েছে, তারপর মামাবাড়িতে পাঁচদিন ফেরারী জীবন কাটিয়ে এসে সারা পিঠে কুঞ্জর বেতের দাগ নিয়ে চারদিন না খেয়ে যে ন’দিন স্কুল কামাই করল বেঞ্জী সাহেব, সেখানেই তার স্কুল জীবনের ইতি।

তখনও অবিশ্যি মনের আকাশে কোন তারা ছিল না, পদ্মপাতায় তখনো শিশির বিন্দুতে মুক্তো জ্বলেনি। মেঘনায় সাঁতার দিতে গিয়ে পায়ে কাপড় জড়িয়ে যায় টগরের। তাকে বাঁচিয়েছিল কে? কে আবার, বেঞ্জী সাহেব। তারপর কি অবাক, দেখা গেল সেই কিশোরী টগরই ওর ভালো ভালো লাগার মেঘনা সাঁতারে একদিন ওর ভালোবাসার মাটিতে উঠে বসেছে। গরঠিকানার ভাঙা নৌকা বুঝি শুকতারার নির্দেশ পেয়ে ময়ূরপঙ্খী হয়ে উঠেছে হঠাৎ। ওরা তখন দু’জন দু’জনের কাছে হার মেনে বসলো তা আর ভেবে ভেবে বুঝতে পারলো না কিছুতেই, পৃথিবীটা রাতারাতি এত সুন্দর হল কেমন করে।….

টগরের বাপের তীব্র শাসন ছিল, আর কুঞ্জর শাসনও ছিল সমান হিংস্র। তবু টগর আর বেঞ্জীর বিনা সাক্ষাৎকারে একটি দিনও কাটে নি, কোন নিষেধের প্রাচীরই বাদ সাধতে পারে নি ওদের মনের ফল্গুস্রোতে। দিনগুলো গান হল, আর রাতগুলো কবিতা। একরাশ প্রজাপতি-দিনের মৌসুমী। কিন্তু ভুললে চলে না, আজকের পর কাল আছে। আর কালের পর পরশু। তাই একদিন হাপুস কেঁদে জানায় টগর, তার নাকি বিয়ে।

চোয়ালদুটো শক্ত হয়ে ওঠে ফিলিপের, চোখের মণিদুটো ঝলসে ওঠে ফসফরাসের মতো।– বিয়ে? তারপর খপ করে ওর একটা হাত ধরে ফেলে বলে,– চল, আমরা তাহলে পালাই টগর।
পালাবো?—ফ্যালফ্যাল করে বোকাটে দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে টগর। কোন জবাব দেয় না।

তক্ষুনি সায় না দিলেও কয়েকদিন আলাপের পর শেষ পর্যন্ত ঠিক হল ওরা পালাবে। কোথায় যাবে? কোথায় আবার—কোলকাতা। কোথায় উঠবে? ফিলিপের এক মামাতো ভাই নাকি কাজ করে কোন এক মোটর মেরামতের কারখানায়, সেখানে ফিলিপ চিঠি লিখে দিয়েছে এর মধ্যে। টাকা? ফিলিপ কথা দেয়, সে ভাবতে হবে না, তার ব্যবস্থাও ভাবা আছে।

রাণীচক ষ্টিমার ঘাটের ওয়েটিংরুমে সেদিন একা একা সারারাত ব্যর্থ প্রতীক্ষায় কাটিয়ে দিল টগর। রাত দেড়টায় ষ্টিমার এলো, লোক ওঠানামা করলে, সার্চলাইট ঘুরল, সিটি বাজাল সারেড়, চলেও গেল তারপর, শূন্য হয়ে গেল স্টেশন। কিন্তু ফিলিপের কোন হদিস নেই। সারারাত শ্বাসরুদ্ধ প্রতীক্ষার পর ভোরের দিকে টলতে টলতে বাড়ি ফিরে এল টগর। নির্ঘুম রাত্রি আর নিদারুণ নিষ্ফল প্রতীক্ষার পর টগরকে কেমন দেখাচ্ছিল সে শুধু বলতে পারবে সেই অভিসার রাত্রির শেষ প্রহর।

ভুল নয়, সব খবরগুলোই ঠিক ঠিক জানতো ফিলিপ। জানতো কাল স্কুলের মাইনে, আর একদিন আগে সমস্ত টাকাটা স্কুলে হেডমাস্টারের ড্রয়ারে জমা থাকে। এই খবরটুকু জানতো বলেই, সে রাতেই টগরকে নিয়ে পালাবার ব্যবস্থা পাকা করে রেখেছিল ফিলিপ। কিন্তু একটা নতুন খবর জানতো না ও, জানতো না যে আজকাল গরম হলে দরোয়ান বেটা তার ঘরে না শুয়ে টিচার্স রুমের বড় টেবিলটার ওপর শোয়, দক্ষিণমুখী জানালার সুবাতাস দাক্ষিণ্যের আরামে। বিপত্তি ঘটল তাই। অভাবিত অঘটন।

ড্রয়ারটা নকল চাবিতে খুলেছিল ঠিকই, কিন্তু ড্রয়ারটা টানবার সঙ্গে সঙ্গে একরাশ কাঁচা পয়সা-ভাঙানি ঝনঝন আওয়াজ করে উঠল। পেছনে দৌড়ুবার আর অবসর পেল না ফিলিপ। তার দীর্ঘ দুটি সবল বাহু সাঁড়াশির মতো ওর গলায় চেপে বসেছে। শ্বাসরুদ্ধ হয়ে আসে ফিলিপের, চোখের সামনে চাপ চাপ অন্ধকার দানা বেঁধে ওঠে।
চার মাসের আর. আই. হয়ে গেল ফিলিপের। সশ্রম কারাদণ্ড।

ইতিমধ্যে নির্দিষ্ট দিনেই বিয়ে হয়ে গেল টগরের। স্বামীর সঙ্গে চলে গেল সে ভিন গাঁ শ্বশুরবাড়ি। ঘোড়াশাল ছাড়িয়ে সেই কলমীগঞ্জ না মৌপতা যেন।
চারমাস পর ছাড়া পেল ফিলিপ। কিন্তু বাপের চৌকাঠ সে মাড়াতে পারল না। দূর দূর করে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিল কুঞ্জ, খেঁকিয়ে উঠল সতেরো বছর পর ফের বিয়ে করা কুঞ্জর নতুন বৌ।

অনির্দিষ্ট লক্ষ্যহীন যাত্রা শুর হল ফিলিপের, নোঙরহীন নৌকা।
এটা আর ওটা। টুকিটাকি ইতিউতি কাজকিসিমে কাটল কিছুদিন। মনের ভেতর একটা বোবা শূন্যতা, চোখের সামনে মেঘলাঞ্ছিত বিবর্ণ আকাশের কুহেলী। তার জীবনের রঙই বুঝি হারিয়ে গেছে, ফুরিয়ে গেছে সব ফুলের গন্ধ। এমন কি টগরেরও।
টগর? ফুঃ, সব ঝুটা।

নরসিংদি স্টেশনে ওস্তাদের চায়ের দোকানে কাজ করতে করতে হাসি পেত তার। সুতীক্ষ্ণ চোখদুটোর পাতা পড়ত ঘনঘন। সব ধোঁয়া। দিলখোশ তো সব খোশ। একটা বেপরোয়া ‘যা-খুশী-তাই’ করবার নেশায় উন্মত্ত হয়ে ওঠে ফিলিপ। নির্বিকার চিত্তে মদ ধরে ও, ফোর্থ ক্লাস মফস্বল টকিতে বসে শিস টানে, অশ্লীল কথায় আসর গেঁজিয়ে তোলে, পকেট ভারি থাকলে বে-পাড়ায় গিয়ে দু’চার রাত কাটিয়ে আসতেও পেছ’পা হয় না।
তারপর যুদ্ধ।

সেকেণ্ড ওয়ার্লড ওঅর।বোমা বরুদ রক্তের নির্মম ব্যবসা। সেকেন্ড ফ্রণ্ট, ঈস্টার্ন রাইফেল, রয়েল ইণ্ডিয়ান আর্মি, কুমায়ুন রেজিমেণ্ট, ডিফেন্স ব্যাটালিয়ন, প্লটুন নাম্বার সিক্স বাই এফ…
যুদ্ধে যোগ দিল ফিলিপ। সৈন্যবাহিনীতে ভর্তি হল বণ্ড সই করে। ট্রেনিং-এ ঘুরলে হরেক জায়গা, বাংলাদেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে। শেষ সেন্টার ছিল তেজগাঁ। তারপরই বরাবর ফ্রন্টে।
কিন্তু ফ্রন্টে যাওয়ার আগেই—

সেদিন একঘেয়ে টিপটিপ বৃষ্টি হচ্ছিল সকাল থেকে। বিশ্রী স্যাঁতসেঁতে আর গুমোট আবহাওয়া। মনমেজাজ তেমন শরীফ ছিল না ফিলিপের। দিনটা আবার রোববার। সাপ্তাহিক মাইনেটা যথারীতি কাল পাওয়া গেছে। দু’চার পাঁইট টেনে আসবে নাকি?

থাক, ভালো লাগছে না। বাইরে বেরুলেই তো কাদা আর ঘ্যান-ঘ্যানে বৃষ্টি। তারচেয়ে চুপচাপ শুয়েই থাকা যাক, সেই ভালো।
সন্ধ্যা হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। শেডের ভেতরকার কালো টুপিওয়ালা মৃদু বাল্বগুলো জ্বলছিল মিটমিট করে। কয়েকটা বর্ষার পোকা ম্লান আলোটার চারপাশে ঘুরপাক খাচ্ছিল। সেদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে কখন তন্দ্রায় চোখদুটো জড়িয়ে এল, ঘুমে ভরে গেল চেতনার সমস্ত আকাশ। ঘুমিয়ে পড়ে ফিলিপ।

এই শালা ওঠ,– চাপা কণ্ঠে ডাকতে থাকে কে, ধাক্কা দিয়ে ফের বলে—ওঠরে শালা, খাসা একটা মাল পাওয়া গেছে, চল–
আরে চল না, দ্বিতীয় জনের ধাক্কা।

চোখ রগড়ে উঠে বসে ফিলিপ, বুঝতে বুঝি খানিকক্ষণ সময় লাগে ওর। বাইরে তখন বৃষ্টির একঘেয়ে কান্না। মনটা হঠাৎ কেমন চাঙা হয়ে ওঠে ফিলিপের। ম্যাজম্যাজ শরীরে মেয়েদের বিনুনির মতো সর্পিল একটা অনুভূতি পাক খেয়ে ওঠে। নিমিষে উঠে দাঁড়িয়ে বলে, কোথায় রে, কদ্দুর? লোভী চোখে প্রশ্ন করে সে। এ’রকম অভিসারে বেরুনো সৈনিকজীবনে তার নতুন নয় কিছু।
–কাছেই, ভাগুচরণের খালি গুমটি ঘরে এনে রাখা হয়েছে। চ’শীগগির। শালা ভিখিরী হলেও কড়া মাল মাইরী। চ’চ’—

সবসুদ্ধ ছ’জন। ছ’টি জানোয়ার। ছ’টি ক্ষুধার্ত হায়েনা। একজনের হাতের মুঠোয় একটা হাফ পাউণ্ড রুটির টুকরো। এই টুকরো আর সামান্য কিছু পয়সা, বড়জোর টাকাখানেক, ব্যস ছ’জনের জন্যে মেয়েটির ঐ মজুরী। উপায় নেই, তাড়া করে ফিরছে তেরশ পঞ্চাশ।

বাই টার্ন যেতে হবে, একের পর এক। শংকরই ঢোকে প্রথমে। গুমটিঘরের বাইরে ওরা বাকি পাঁচজন গজল্লা জুড়ে দেয়, নোংরা প্যাচপ্যাচে হাওয়ায় ভাসে আনকোরা আর্মি কোয়ালিটি লাকি স্ট্রাইকের গন্ধ। মাঝে মাঝে একজন উঠে একটু পাহারা দেয়, চারদিকে সতর্ক নজর রাখে, বুটের তলায় কাদাজলের বুদ্ধুদের আওয়াজ শোনা যায়। টিনের চালে বেজে চলে বৃষ্টির একটানা নূপুর।
তারপর আনোয়ার, মাইকেল, রাধিকাচরণ, হিমাংশু। একের পর এক। ঢুকল; বেরুলো।

–এবার যা ফিলপে, মাগী পটলই তুলেছে কিনা কে জানে। যা—

দরজাটা ঠেলে ঘরে ঢোকে ফিলিপ। ঘরের কোনে একটা ধুমায়িত লণ্ঠন ধুম্রউদিগরণে চিমনিটাকে কালো করে তুলেছে। আলোর বদলে লণ্ঠনটা যেন অন্ধকারের ঘনত্বটাকে প্রকট করে তুলেছে।
কোণের দিকে, যেখানে অন্ধকারটা সবচেয়ে জমাট, সেখানে একটা ছেঁড়া চটের ওপর শুয়ে আছে মেয়েটি, সাড়াশব্দহীন, নিশ্চল দেহ। মরেই গেছে নাকি? মেরে ফেলেছে নাকি ওরা? ভয় পায় ফিলিপ। মেয়েটির মুখের ওপর হাত রেখেই সে চমকে ওঠে। জল-জল ভেজা-ভেজা কি যেন লাগল হাতে।
পকেট থেকে পেন্সিল টর্চটা বের করে ফিলিপ। জ্বালে।

না, হয়তো প্রচণ্ড চিৎকার করাই উচিত ছিল ওর। কিন্তু বোবা বিস্ময়ে সে শুধু দাঁড়িয়ে থাকে নিশ্চল পাথরের স্ট্যাচুর মতো। হাত থেকে পড়ে গিয়ে নিভে-যাওয়া টর্চটা গাড়িয়ে গড়িয়ে চলে গেল কোথায়। মেয়েটির গালে চাকা চাকা দাগ। রক্ত জমাট। কোনটা থেকে আবার রক্ত চুইয়ে চুইয়ে এসে পড়েছে কানের পাশে রুক্ষ চুলের অরণ্যে। উঃ, অসহ্য।
অসম্ভব তার এখানে দাঁড়িয়ে থাকা। টগরের বোজা চোখের তীব্র দৃষ্টি যেন তাকে সুচের মতো বিদ্ধ করছে। মাথার শিরা দুটিতে গতিবেগের কুরুক্ষেত্র।
দৌড়ে বেরিয়ে এল ও। উত্তেজনায় হাঁপাচ্ছে ক্লান্ত কুকুরের মতো। সারা শরীরে ঘামের ফোয়ারা।

–কিরে শালা, মেয়েটাকে একেবারে গয়া করে এলি নাকি। খতম একেবারে?
–জানি না, নিরুত্তাপ জবাব দেয় ফিলিপ।

পরদিনই ডেজার্ট করে ফিলিপ। বণ্ডের প্রাচীর টপকে সৈন্যবাহিনী থেকে পালায় ও। পেছনে ওয়ারেন্টের শিকারী দৃষ্টি ঘুরবে জানে ফিলিপ, জানে ধরতে পারলে কোর্ট মার্শাল হয়ে যাবে হয়তো। তবু বেপরোয়া ফিলিপকে পরদিন ভোরের প্যারেডের সময় তন্নতন্ন করে খুঁজে পাওয়া গেল না কোথাও। ফিলিপ-ডি-রোজারিও—ফেরারী।
তারপর কতো শহর, কতো গ্রামে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে ঘুরে বেড়ালো ফিলিপ। আজ এখানে কিছুদিন, তারপর আচমকা হাওয়া, কিছুদিন বাদে দেখা গেল আরেক জায়গার বাজারে সিগারেট কিনছে ও। বর্ধমানের গণ্ডগ্রাম থেকে মেদিনীপুর শহরে, পূর্ণিয়া থেকে কোলকাতার শহরতলি, কতো জায়গাই না ঘুরে বেড়ালো। ঘা খেয়ে খেয়ে মনের মাটি কখন পাথর হয়ে উঠল, পলিমাটি রূপ নেয় শিলাপাহাড়ে।

পূর্ণিয়া থাকতেই ক্যামেরায় হাতেখড়ি। ওখানে এক ফটো-গ্রাফারের দোকানে চাকরের কাজ করত ও। তারপর কিছুদিন নাম ভাঁড়িয়ে নারায়ণগঞ্জে ফটো তোলার কাজ শেখে ও। এই নারায়ণগঞ্জের ফটোগ্রাফারটি ছিল শ্মশানের ফটোগ্রাফার। মৃত লোকদের ছবি তোলাই তার ব্যবসা। নাম মনে আছে গগন কুশাই। অভ্যাসে অভ্যাসে তার হৃদয়ানুভূতিগুলো কংক্রীট হয়ে গেছে। প্রথমে এই শুষ্ক মমতাহীন নিষ্ঠুর লোকটার সাহচর্য কেমন অসহ্য মনে হত ফিলিপের, কিন্তু ক্রমে সেও নির্বিকার উদাসীন শ্মাশান ফটোগ্রাফারই হয়ে উঠল। মমতার অঙ্কুর চাপা পড়ে গেল ব্যর্থতার পাষাণে।

শ্মশান ছাড়াও আরেকটু বিস্তৃততর ছিল গগনের ব্যবসা। নারায়ণগঞ্জের বিশেষ হাটহাঙ্গামা খুনজখম, অ্যাকসিডেন্ট, ইত্যাদির ছবিও তুলত সে। কোলকাতার কোন এক দৈনিক পত্রিকার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল গগনের।
সেদিন ট্রেনে চাপা পড়া একটি গর্ভবতী মেয়ের ছবি তুলে আনে গগন। ফিল্মগুলো প্রিন্ট ও ডেভলপের দায়িত্ব পড়ে ফিলিপের ওপর।
নেগেটিভটায় চোখ আটকে যায় ফিলিপের। গাড়ির চাকাটা পেটের ওপর দিয়ে চলে গেছে। পেট থেকে নিচের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সব দলা-পাকানো একরাশ মাংসপিণ্ডে রূপান্তরিত হয়েছে,আলাদা করে চেনবার এতটুকু উপায় নেই। কিন্তু মুখটা স্পষ্ট। স্পষ্ট বোজা চোখ দুটিও। প্রিন্ট করার পর আর সন্দেহ করবার কারণ রইল না।
টগর।

উঃ, এখানেও টগর? টগর কি ওকে তাড়া করে ফিরবে চিরকাল? সারা জীবন? দাঁতে দাঁতে চাপে ফিলিপ। তারপর কি ভেবে সমস্ত নেগেটিভগুলো আর প্রিন্ট কয়টি নষ্ট করে ফেলে। না, এ টগরের বীভৎস ছবি কাগজে ছাপানো চলবে না, কিছুতেই না। ক্যামেরাটা কাঁধে ফেলে দৌড়ে বেরিয়ে যায় ফিলিপ।
খোঁজ নেয় হাসপাতালে, ছুটে যায় মর্গে, লাশ-কাটা ঘরে। এই খানিকক্ষণ—ওরা জানায়, ওকে শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
শ্মশানে?

শ্মশানমুখো দৌড়য় ফিলিপ। পথে পকেটের সমস্ত পয়সা দিয়ে একরাশ ফুল কেনে। ওকে আজ ফুল দিয়ে মনের মতন করে সাজাবে ফিলিপ, শেষবারের মতো সারা জীবনের জমাট ভালবাসা আজ ফুলে ফুলে উজাড় করে দেবে।
কিন্তু দেরি হয়ে গেছে, অনেক দেরি। চিতাটা জ্বলছে দাউ-দাউ লেলিহান শিখায়, শেষবারের তীব্রতায়।
এই দাঁড়াও, একটু দাঁড়াও,– বোকার মতো হাঁপাতে হাঁপাতে বলে ফিলিপ, চমকে ওঠে ওরা। হাসপাতালের কয়েকজন নতুন ডোম। এরা চেনে না ফিলিপকে। একজন শুধোল,– তোর কুছ হয় নাকি এই পাগলী বিটি?
আমার?—নির্বোধ চোখে তাকায় ফিলিপ,– কি হয়? না কিছু হয় না। কি আবার হবে।

হোহো করে হেসে ওঠে ওরা।
–এ ভি আউর এক পাগলা আছে।
সমস্ত ফুলগুলো লকলকে চিতার আগুনে ছুঁড়ে দেয় ফিলিপ। সে চিতাবহ্নি ওর হৃদয়ের যেটুকুও মমত্ববোধের অস্তিত্ব ছিল তাও পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। পেছন ফিরে বেরিয়ে আসে ও।
সে রাতেই নারায়ণগঞ্জ ছাড়ল ফিলিপ।
তারপর?………

তারপর আর কি, ঘুরতে ঘুরতে ফের এখানে। দেশের মাটিতে। থাকবার আস্তানা বলতে কিছু নেই। সাজসরঞ্জাম যা-কিছু তা পলাশডাঙার ভাঙা নীলকুঠীর জঙ্গলকীর্ণ অপরিসর একটু কুঠুরিতে রাখে। আর শোওয়া? কোনদিন সিংবাজার হাটের ছাউনির তলায়, কোনদিন সাহাবাবুদের মণ্ডপঘরের সিঁড়িতে। কোনদিন এই পোড়ো বাংলোবাড়িটায়, কোনদিন বা মীনাবাজার ভাঙা মসজিদের চত্বরে। যখন যেখানে হয়।
এ তল্লাটে সব শ্মশানেই ঘুরে বেড়ায় ফিলিপ। ছবি তোলে, নরসিংদি থেকে প্রিন্ট করিয়ে এনে মৃতের বাড়ি পৌঁছে দেয়। শ্মশানে মড়া এলে যেন বাতাসের মুখে খবর পায় ও, মুহূর্তে সেখানে গিয়ে হাজির।
ফিলিপ?

না, এখানে ও বেঞ্জী সাহেব। লোকমুখে কিভাবে কে জানে, ওর নামটা রূপান্তরিত হয়েছে ঐ বেঞ্জীতে। সবাই জানে ও হচ্ছে শ্মশানচারী বেঞ্জী সাহেব। আবার কেউ কেউ বলে,– পাগলা সাহেব।
ওর জাতধর্ম যে কি তা এ তল্লাটে সবার কাছেই আজো রহস্যময়। খৃষ্টান? তবে শেতলাতলায় ও যখন মাথা নোয়ায় তখন পাকা পনেরো মিনিটে একবারও মাথা তোলে না কেন? হিন্দু? তা’হলে মুন্সীপুরে গরু কাটার খবর পেলে ও কেন ছোটে গোস্ত খাবার দাওয়াত আদায়ের জন্যে? মুসলমান? তা’হলে কখনো মধু ডোমের সঙ্গে ওরকম জারিয়ে জারিয়ে শুয়োর খেতে

পারতো? অদ্ভুত, বিচিত্র এই বেঞ্জী সাহেব। জীবন্ত একটা দুর্বোধ্যতা যেন।

বেঞ্জী সাহেব গল্প শেষ করলেন একসময়। ওর গল্প শুনতে শুনতে আমরা টেরই পাই নি এর মধ্যে কখন ঝড় থেমে গেছে। নির্মেঘ আকাশ ভেসে যাচ্ছে চাঁদের আলোয়। মেঘনার বুকে অজস্র জ্যোৎস্নার মদির সোহাগ। বাংলো বাড়িটার ভাঙা সিঁড়ির বুকে ঢেউিএর ছলাৎ ছলাৎ শব্দের মিষ্টি জলতরঙ্গ। মন্ত্র মুগ্ধ আমরা তিনজন। বেঞ্জীও নিশ্চুপ।

হঠাৎ সমস্ত সুর কেটে গেল বেঞ্জীর কর্কশ কণ্ঠে। মোমের মতো মসৃণ নিস্তব্ধতা ভেঙে টুকরো টুকরো করে তেতো গলায় বলে উঠল ও,– কি, হোস্টেলে ফেরার নামই নেই দেখছি। এবার ঘরে গিয়ে মরো না কেন বাপু। কতো আর জ্বালাবে, বকে বকে তো ফেনা তুলে ফেললাম মুখে। যাও, এবার কেটে পড়ো তো বাছাধনরা।– কুৎসিত বিশেষণকে লজ্জা দেবার মতো বিকৃত হয়ে উঠল কাজল কালো মুখটা।
চোখ ফিরিয়ে নিলাম আমরা। তারপর না, দরজা নয়, জানালা দিয়েই বেরিয়ে পড়লাম তিনজন নিঃশব্দে।

[ বেঞ্জী সাহেব- শচীন ভৌমিক [ প্রিয় গল্প সংগ্রহ ] Benji Shaheb -Sachin Bhowmick ]

শচীন ভৌমিক কে আরও পড়ুন:

মন্তব্য করুন